এক সমুদ্র ভালবাসার পরেও
যার অন্যের প্রতি থাকে ঝোঁক,
সেই মানুষটা আমার না হোক।
কারো উপর ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়ে
আমাকে যে দেখায় ব্যস্ত থাকার নাটক,
সেই মানুষটা আমার না হোক।
আমার দূর্বলতায় বারংবার আঘাত করে কাঁদিয়ে
যার বড্ড বেশি লাগে সুখ,
সেই মানুষটা আমার না হোক।
বুঝলে, শ্রেয়ান? সেই মানুষটা আমার না হোক। তোমাকে শোধরানোর জন্য আমি সময় দিয়েছিলাম পাক্কা চার বছরের অধিক। সময় ঘুরে আজ সাড়ে পাঁচবছর। তুমি শোধরাওনি। তারপর আমি তোমার বাড়ানো দূরত্বে দেয়াল টেনে দিলাম।”
শ্রেয়ান আর উপায় না পেয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। কান্নারত আওয়াজে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলতে লাগল,
-“আই প্রমিজ, আর কষ্ট দেবো না। খুব ভালোবাসি তোমায়। খুব সুখে রাখব। প্রমিজ করছি, লাস্ট সুযোগ দাও।”
-“দিলে?”
-“ভালো রাখব।”
-“ভীড় পছন্দ করি না, শ্রেয়ান।”
শ্রেয়ানের মনে পড়ল, এই বাক্যটা সে কারণে-অকারণে একাধিকবার বলেছে। অথচ বোধহয় প্রিয়র মুখে তা আক্ষরিক অর্থেই মানাল। শ্রেয়ান কান্নার গতি বাড়াল,
-“ভালোবাসি। আমি সবাইকে ছেড়ে দিয়েছি। শুধু তোমাকে ছাড়তে পারিনি। তুমি ছাড়া গতি পাচ্ছি না।”
-“বিশ্বাস করি কীভাবে?”
-“বিয়ে করে নাও তাহলে।”
-“বিয়ের পর পালটাবে না, তার কী গ্যারান্টি?”
-“আর একটা সুযোগ দিয়েই দেখো। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না, প্রিয়শ্রী! ট্রাস্ট অন মি, প্লিজ!”
শ্রেয়ানের কান্না থামছে না। প্রিয় চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলে। এই কান্না তার হৃদয় ছোঁয় না। তবুও বলে,
-“আচ্ছা দিলাম, সেই সাথে সময় দিলাম গোটা অর্ধেক বছর।”
শ্রেয়ানের কান্না থামল। তার অধরে লেপটাল মুচকি হাসি। বলল,
-“মিসড দ্যাট ইউ!”
-“কিন্তু এই সময়ের মধ্যে যদি আমি আবারও তোমার কাছে ফেরার জন্য আগ্রহ না পাই, তাহলে তুমি আমাকে আমার মতো ছেড়ে দেবে—কথা দাও আমায়। আর সত্যিকারের পুরুষ হয়ে থাকলে এ থেকে যেন হেরফের না হয়।”
নিজের ওপর ওভার কনফিডেন্ট শ্রেয়ান বিনাবাক্যব্যয়ে মেনে নিল,
-“ঠিকাছে, সোনা।”
-“কাল কল দিয়ো, ঘুমাব এখন।”
-“আচ্ছা, ঘুমাও। শুভ রাত্রি।”
প্রিয় কল কেটে দিলো বিপরীতে ‘শুভ রাত্রি’ না জানিয়েই৷ সে ঘুমোতে গেল না। দোলনার দোলনগতি বাড়িয়ে দিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল।
সে ভীষণ চঞ্চলা নারীকে হুট করেই নিশ্চুপ হয়ে যেতে দেখেছে।
সে পুরুষ মানুষকেও ছলনা করে কাঁদতে দেখেছে।
—————
ভোরের দিকে ফোন সুইচ অফ করে ঘুমোতে গিয়ে, ঘুম থেকে উঠল বারোটার দিকে। একটা লম্বা শাওয়ার নিয়ে বারান্দা-রুমে কিছুক্ষণ পায়চারি করে যখন রুম থেকে বেরোল, পুরো বাড়িকে কিছুটা অন্যরকমভাবে দেখতে পেল। পার্থক্যটা ধরতে পারল না, শুধু টের পেল সামথিং ইজ রং।
বুয়া রান্না করছে, নাহারা বসার ঘর পরিষ্কার করছে। প্রিয় প্লেটে খাবার বেড়ে খেতে খেতে সবকিছু দেখতে লাগল। তারপর ভ্রু-কুঁচকে নাহারাকে বলল,
-“কেউ আসবে, আম্মু?”
নাহারা কুশনটা সোফায় রেখে প্রিয়র দিকে তাকাল, তারপর আবার কাজে মন দিয়ে বলল,
-“হ্যাঁ।”
প্রিয় আর মাথা ঘামাল না। খাওয়া শেষে তৈরি হয়ে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরোতে নিলে নাহারা বলে ওঠে,
-“আজ যাওয়ার প্রয়োজন নেই।”
-“কেন?”
-“তোমাকে দেখতে আসবে।”
প্রিয় হতাশার শ্বাস ফেলে বলল,
-“আর কত?”
-“আর কত মানে?”
-“বলেছি তো এখন বিয়ে করব না।”
-“বয়স কত তোমার?”
-“২৩।”
-“বিয়ে করতে কী সমস্যা?”
-“ইচ্ছে করে না, আম্মু। একটু বোঝো।”
-“সমস্যাটা খুলে বললে তো বুঝব। ওই ছেলের সাথেও তো যোগাযোগ নেই। তবে?”
প্রিয় ইতস্তত করতে লাগে। সে বিয়েতে জড়াতে চাইছে না। বোঝাতেও পারছে না কিছু। উত্তেজিত হয়ে ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে লাগে। শরীরটা যখন খারাপের দিকে চলে আসে, তখন টেবিল থেকে পানির গ্লাস নিয়ে এক চুমুকে শেষ দেয়।
নাহারা লক্ষ করে প্রিয়র অবস্থাটা। প্রিয় ঘামছে, হাত কাঁপছে কেমন করে। নাহারা নরম হলো। জিজ্ঞেস করল,
-“খুলে বলো।”
-“আম্মু, বিয়েটাই কি সব? বিয়ে মানে একটা বাঁধাপরা। একটা মানুষ আমার লাইফকে কন্ট্রোল করবে। আমার প্রতিটি কাজে তার পারমিশন নিতে হবে। আমার শ্বাস ফেললেও তাকে জানাতে হবে। তার মর্জিমতো আমাকে চলতে হবে। তার এটা ভালো লাগবে না, মানে এটা করা যাবে না। তার এখানে যেতে ইচ্ছে করে না, মানে আমিও যেতে পারব না। সে তার সাথে কথা বলতে চায় না, মানে আমিও বলতে পারব না। মোদ্দাকথা সেই পুরুষটা আমাকে কন্ট্রোল করবে। আমি কী করে নিজেকে কোনো পুরুষের একচ্ছত্র সম্পত্তি বানাব, বলো? ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। আমি পারব না বিয়ে করতে, পারব না..”
কথাগুলো বলার সময় প্রিয়র গলা কেঁপে কেঁপে উঠছিল। নাহারা এগিয়ে গিয়ে একহাতে ওর বাহু ধরে। কোমল গলায় বলে,
-“এসো, বসি।”
প্রিয়কে ধরে সোফায় বসিয়ে, নিজে তার পাশে বসে পড়ে। তারপর বলে,
-“বিয়ে মানে এসব নয়, প্রিয়। বিয়ে একটা মিষ্টি সম্পর্ক। জীবনের একটা সময় গিয়ে তোমার বাবা-মাকে তুমি পাবে না। তোমার সন্তানেরাও আর তোমার থাকবে না। সবাই নিজ নিজ জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। ঠিক তখন তোমার গল্প করার সঙ্গী হিসেবে তুমি তোমার স্বামীকে পাবে। স্বামী মানে কোনো গেইমার নয়, যে তোমাকে কন্ট্রোল করবে। স্বামী তোমার অভিভাবক। বিয়ের আগে আমরা তোমার ভালো-মন্দ বুঝেছি, বিয়ের পর স্বামী বুঝবে। কিন্তু তার মত চাপিয়ে দেবে না। তোমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু হয়ে তোমাকে সব কাজে উপদেশ দেবে। একইভাবে তুমিও তোমার স্বামীর ওপর অধিকার খাটাবে। বিয়ের প্রতি এত উদাসীনতা এনো না। সবাইকেই বিয়ে করতে হবে।”
প্রিয় উদাস গলায় বলে,
-“আমি আমার জীবনটাকে কারো হাতে তুলে দিতে পারব না।”
-“কী বললাম, বোঝোনি? বিয়ে মানে একটা অধিকারের সম্পর্ক, বন্ধুত্বের সম্পর্ক, ভাগাভাগির সম্পর্ক।”
-“আম্মু, আমি আমার জীবনের মূল্যবান সময়গুলো কারো সাথে ভাগাভাগি করে নিতে পারব না।”
-“করতে হবে। নিয়মের বাইরে যেতে পারো না তুমি।”
-“আম্মু, প্লিজ!”
নাহারা হতাশ হয়,
-“কী সমস্যা তোমার? যেগুলো বলছ, এগুলো কোনো সিরিয়াস ইস্যু নয়। আসল কথাটা বলবে?”
প্রিয় বড়ো করে একটা দম ফেলে সত্যটা বলে দেয়,
-“শ্রেয়ানের থেকে ঠকে যাওয়ার পর কাউকেই আর বিশ্বাস হয় না, আম্মু। কম বয়সে একটা ভুল করেছিলাম, সারাজীবন শাস্তি পাব।”
ব্যাপারটা বুঝতে পারে নাহারা। প্রিয়র মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
-“তবে সময় দিচ্ছি কিছুটা। নিজেকে প্রস্তুত করো। সব ছেলে ঠকায় না। কেউ কেউ আজীবন পাশে থেকে আগলে যায়। তোমার আব্বু কিন্তু আজ অবধি আমাকে উঁচু গলায় একটা শব্দও বলেনি।”
প্রিয় তাকায় নাহারার দিকে। নাহারা মলিন হাসে,
-“আম্মু তোমায় ভালোবাসে, মা।”
-“আমিও বাসি তোমায়।”
—————
প্রিয় ভার্সিটি থেকে ফেরার পর ফোন অন করে দেখে, শ্রেয়ানের অজস্র কল, ম্যাসেজ। প্রিয়র অদ্ভুত চমৎকার লাগে। তার ভেতরের পৈশাচিক সত্তা হাসতে লাগে। প্রিয় কল ব্যাক করে না আর। শ্রেয়ান ম্যাসেজ ডেলিভার্ড হতে দেখে ঘন্টা খানেক পর নিজেই কল দেয়। প্রিয় সময় নিয়ে রিসিভ করে।
ওপাশ থেকে শ্রেয়ান বলে,
-“আম্মিসিউ ব্যাডলি, বেবি। কী করছ?”
-“বিশেষ কিছু করছি না।”
-“আমাকে জিজ্ঞেস করবে না কী করছি?”
-“হ্যাঁ, বলো।”
-“অফিস থেকে ফিরলাম, সোনা।”
-“ওহ।”
-“ভিডিয়ো কলে এসো না, প্রিয়শ্রী! তোমায় একটু দেখি।”
-“ইচ্ছে করছে না।”
প্রিয়র ইচ্ছের বিরুদ্ধে শ্রেয়ান আর কিছু বলল না। প্রিয় যে শ্রেয়ানের কাছে ফিরেছে, তাতেই শ্রেয়ান খুশি। সে হাসি হাসি মুখে বলল,
-“গান শুনবে, প্রিয়শ্রী?”
-“শোনাও।”
শ্রেয়ান গুনগুন করে সুর তুলল। তারপর গাইতে লাগল,
আমি মিথ্যে বলেছি
কতো মিথ্যে বলেছি নিজেকে,
এক রূপকথার মতো
বদলে যাবে এই জীবন শেষে....
প্রিয় চুপ করে থাকে। তারপর নরম গলায় বলে,
-“ঘুম পাচ্ছে। ঘুমাব।”
-“আচ্ছা।”
প্রিয় কল কেটে দেয়। তবে ঘুমায় না। ফোন ঘাটতে থাকে, এটা সেটা করতে থাকে। হয়তো শ্রেয়ান ভাবছে প্রিয় ফিরেছে, কিন্তু প্রিয় চায় অন্য কিছু হোক, আরও একটা অবহেলার খেলা হোক।
—————
শ্রেয়ানকে অবহেলা করতে করতে প্রায় দু'মাস কাটল। দিনে একবার কথা হয়, তাও কয়েক মিনিটের জন্য। আবার অনেক সময় দেখা যায় কয়েকদিন পর পর কথা হচ্ছে। শ্রেয়ান অসংখ্যবার দেখা করতে বলেছে। প্রতিবারই প্রিয় ব্যস্ততা দেখিয়েছে। শ্রেয়ান আর প্রিয়কে এরপর জোর করতে পারেনি।
আজ ক্যাম্পাস থেকে ফিরতে ফিরতে প্রিয়র সন্ধ্যে হলো। বাড়ির গাড়ি নিয়ে আসেনি, এদিকে রিকশাও পাচ্ছে না। অগত্যা হেঁটে হেঁটে রওয়ানা হলো। চলতি পথে অনাকাঙ্ক্ষিত এক পরিচিত মুখ দেখে প্রিয় থমকে যায়। শরৎ নিজেও চমকায়। করিম বলে,
-“সফেদ মামা, চা লও।”
শরৎ চায়ের কাপটা নেয়। তারপর আবার প্রিয়র দিকে তাকায়। পরক্ষণেই মুচকি হাসে, এগিয়ে যায় খানিকটা,
-“কী খবর, প্রিয়? ভালো আছেন?”
প্রিয় ইতস্তত করতে করতে বলল,
-“ভালো, আপনি?”
-“আমিও। তা হঠাৎ এদিকে?”
-“আমি তো এদিক দিয়েই যাই, আজ রিকশা পাচ্ছিলাম না তাই হেঁটে। কিন্তু আপনি?”
-“আমি রোজ সপ্তাহে এখানে আসি।”
শরৎ পুনরায় হেসে বলল,
-“আমরা খুব কাছাকাছি ছিলাম, প্রিয়। কেবল যোগাযোগের অভাবে দূরত্বটা বেড়েছিল।”
প্রিয় হাসে। শরৎ ফুটপাতের ধারে ফেলানো বেঞ্চিতে বসে পড়ে, প্রিয়ও বসে। শরৎ করিম মামাকে ডাক দেয়,
-“মামা আরেক কাপ চা দেও।”
তারপর প্রিয়কে বলে,
-“আনএক্সপেক্টেড মিটিং ছিল, প্রিয়। সহজ হন। একটু কথা বলি, এরপর আমি আপনাকে আপনার বাসায় ড্রপ করে আসব।”
-“না না, এসবের প্রয়োজন নেই। আমি একা যেতে পারব।”
-“সরি ম্যাডাম, আমি আপনাকে একা ছাড়তে পারব না।”
প্রিয় আর কিছু বলে না। চা দিলে তা নিয়ে খেতে থাকে। শরৎ বলে,
-“শরীর ভালো?”
-“জি।”
-“পড়াশোনা কেমন চলে? এখন মাস্টার্সে না?”
-“হ্যাঁ, ভালোই চলছে।”
-“এরপর কীসের চিন্তা আছে?”
-“একটা জব। এখন থেকেই বিভিন্ন জায়গায় এপ্লাই করছি, হচ্ছে না ঠিক।”
-“আপনার বাবার যা আছে, তাতে নিজের জবের প্রয়োজন আছে কি?”
-“বাবারটা বাবার জায়গায়, আমারটা আমার। আর আমার মতে, প্রতিটি মেয়েকেই সাবলম্বী হওয়া উচিত।”
প্রিয়কে খানিকটা রেগে যেতে দেখে শরৎ হাসে,
-“দারুণ ব্যাপার। প্রিয়, শুনুন।”
-“শুনছি, বলুন।”
-“আপনাকে হুট করে দেখে আমার অদ্ভুত ভালো লাগছে। আর ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। কী আশ্চর্য না? আমাদের মন কিছু কিছু সময় এমন অদ্ভুত কিছু চেয়ে বসে, যা ভীষণ অসম্ভব।”
প্রিয় চুপ হয়ে যায়। শরৎ চওড়া হেসে আকাশে তাকায়, চায়ের কাপে চুমুক দেয়। থেমে থেমে বলে,
-“আপনাকে আমি খুব বুদ্ধিমতী ভেবেছিলাম, প্রিয়। অথচ আপনি আবারও একই জায়গায় ডুবলেন?”
প্রিয় অবাক হয়ে যায়, ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারে না। শরৎ আবারও হেসে ফেলে,
-“আপনার টাইমলাইনের ওই ছেলেটার আনাগোনা বেড়েছে, লাই দিয়েছেন আপনি অবশ্যই। কেন?”
প্রিয় প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে বলে,
-“সময় দিয়েছি ৬ মাস। আমাকে আটকানোর। এই ৬ মাসে না পারলে ও আর কখনই আমাকে ডিস্টার্ব করবে না।”
শরৎ বাঁকা হাসে,
-“আর আপনার ধারণা—আপনি আবারও ওই ছেলের প্রতি দূর্বল হবেন না, কিংবা ও এত ইজিলিই ছেড়ে যাবে?”
প্রিয় ওপর-নিচ মাথা দোলায় ধীরগতিতে। বিড়বিড় করে শরৎ,
-“বোকাফুল!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………