শুক্লপক্ষের পরিশেষে - পর্ব ৩১ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

শুক্লপক্ষের পরিশেষে - নবনীতা শেখ
-“সময় দিয়েছি ৬ মাস। আমাকে আটকানোর। এই ৬ মাসে না পারলে ও আর কখনই আমাকে ডিস্টার্ব করবে না।”

শরৎ বাঁকা হাসে,
-“বোকাফুল!”

প্রিয় কিছু বলে না। চায়ের ডেট শেষ হলে শরৎ প্রিয়কে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। পকেট হাঁতড়ে ফোনটা বের করে। বুড়ো আঙ্গুলের সাহায্যে দক্ষ হাতে ফ্রেন্ডস গ্রুপে টাইপ করে, “স্পেশ্যাল মানুষটাকে নিয়ে আজকের এই সন্ধ্যেটাকে স্পেশ্যাল বানাব। আজ আড্ডা হবে না। উইশ মি গুডলাক।”

সিন হলো সবার। সবাই গুডলাক জানানোর সাথে বিভিন্ন মজা নেওয়া শুরু করল। শরৎ ততক্ষণে ফোন পকেটে পুড়ে ফেলেছে। পাশে বাইক স্ট্যান্ড করা। উঠে হেলমেট পরে নিল। প্রিয়কে পিছে উঠতে না দেখে বলল,
-“আমি পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যেতে পারি না। আর আজ রিকশা পাবেন না। আপাতত আমার এই হাওয়াইজাহাজ ছাড়া গতি নেই। লাজ-লজ্জা এক সাইডে সামলে নিয়ে উঠে পড়ুন। আমি লজ্জা দেবো না আপনাকে।”

প্রিয়র গাল দুটো লাল হতে থাকে,
-“আমি লজ্জা পাব বলে উঠছি না, আপনাকে কে বলল? বেশি বেশি ভাবেন, নীরজ ভাই। উঠছি আমি।”

প্রিয় উঠে বসতে নিলে শরৎ বলে,
-“তার মানে লজ্জা দিতে পারব? পার্মিশন আছে?”

প্রিয় গোপনে হাসে। শরৎ তা ধরতে পেরে বলে,
-“ম্যাডাম, উঠে বসুন। আর কিছুক্ষণ এখানে থাকলে চালান কাটবে।”

প্রিয় এদিক-ওদিক তাকিয়ে উঠে বসল। এক হাত শরতের কাঁধে রাখতে গিয়েও রাখল না। শরৎ হেসে ফেলে। বাইক স্টার্ট করার আগ মুহূর্তে বলে ওঠে,
-“আমার কাঁধ এটা, রেস্ট্রিকটেড পার্কিং এরিয়া নয়। হাত রাখলে হাতসহ পয়সা কাটা যাবে না। নির্দ্বিধায় রাখুন।”

প্রিয় হাত রেখে বলল,
-“এত ঢং করছেন কেন, নীরজ ভাই?”

শরৎ বাইক স্টার্ট করে বলল,
-“ঢং? ওহে কন্যা, ওটা আপনাদেরই কাজ। আমাদের নয়।”
-“নীরজ ভাই, আপনি বড্ড বেশি কথা বলছেন।”
-“চুপ থাকব?”

প্রিয় এতক্ষণ লজ্জা পেয়ে বেশ অনেক কিছুই বলে ফেলেছিল। কিন্তু সে চায় না শরৎ থামুক। মিনমিনে স্বরে বলল,
-“না।”

শরৎ বাতাসের তেজে কিছু শুনতে পেল না। তাই আবারও শুধাল,
-“কী? থামব?”

প্রিয় জোরে বলল,
-“উঁহু! কথা বলুন। আপনাকে শুনতে ভালো লাগছে।”

প্রিয়র অকপটে স্বীকারোক্তিতে একটা পাতলা হাসির রেখে ধরা দিলো শরতের ঠোঁটে। 

—————

-“শোন মিস্টার প্রহর, এখন রাত্রির আট ঘটিকা। আর তুই বোধহয় ভুলে বসেছিস আগামী দিনটা আমার দিন। মানে আমার জন্মদিন। এনি প্ল্যান ফর মি, বেইবি?”

আয়াত ভীষণ উত্তেজিত গলায় কথাখানা বলে থামল। প্রহর চুপ থেকে সবটা শুনে তারপর হাতঘড়ির দিকে দেখল। আটটা কুড়ি বাজে। আয়াতের কথাকে শুদ্ধ করে বলল,
-“ইট'স এইট টুয়েন্টি পিএম..”

আয়াত ক্ষেপে উঠল,
-“তো? তোর কাছে আমার বার্থডে আগে নাকি আজগুবি কাহিনি আগে? আশ্চর্য! কোথায় তুই জান-প্রাণ দিয়ে আমার বার্থডে সেলিব্রেট করায় লেগে যাবি। তা নয়, এত রিল্যাক্সড বসে আছিস!”

প্রহর কপাল কোঁচকাল। মিহি আওয়াজে বলল,
-“বার্থডে সেলিব্রেট করার মতো কিছু?”

আয়াত দমে গেল। আর কিছু বলল না। ওর ফুলকো গালটা প্রহর ভিডিয়ো কলিংয়ের মাধ্যমে দেখতে পেল। বেশ ভালো লাগল দেখতে। আয়াত পড়ার টেবিলে বসে আছে। সামনে ফোন স্ট্যান্ডে ফোন রাখা। পরনে কালো রঙের টিশার্ট। দুই হাতের কনুই টেবিলের ওপর রাখা। হাতের তালুদ্বয়ের সম্মিলিত স্থানটিতে থুতনি দ্বারা মুখের ভর রাখা। ফুলকো গালে ঠোঁট কামড়ে ধরে, ভ্রু কোঁচকানো। চোখ দুটো ছোট ছোট হয়ে আছে। সরু নাকটা ফুলে ফেঁপে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। প্রহর এক ধ্যানে তা লক্ষ করে গেল। 
আঁড়চোখে প্রহরের গতিবিধি লক্ষ করতে গিয়ে আয়াত আটকে গেল। নিজের দিকে এমন অভদ্র নজরে প্রহরকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আয়াত কেশে উঠল। প্রহরের বিমুগ্ধ নজরে ভাঁটা পড়ল। নিজের শক্ত রূপটা পুনরায় তুলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
-“পানি খাও।”

আয়াত পানি খেয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“ওভাবে তাকিয়ে আছিস কেন, ভাই? তোর চাহনি মাত্রাতিরিক্ত নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছে।”

স্বাভাবিকভাবেই প্রহর শুধাল,
-“তাকাতেও পারব না?”

বিষয়টা হজম করে নিয়ে আয়াত বলল,
-“নাহ, তাকা তুই! চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে তাকা, ইন ফ্যাক্ট তুই চাইলে খুলে নিয়েও তাকাতে পারিস। আই ওয়োন্ট মাইন্ড..”

প্রহর মনে মনে হাসল। প্রকাশ্যে মাথা নাড়ল, 
-“হুঁ।”

আয়াত কিছু একটা ভেবে চওড়া হেসে বলল,
-“ইন্ট্রোভার্ট আর এক্সট্রোভার্টের জুটি ভীষণ দারুণ হয়, জানিস? একজন যেমন নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে না, অন্যজন তেমন কিছু লুকোতে পারে না। একজন আগুন তো অন্যজন পানি। প্রহর, তুই থেকে যা আমার হয়ে। আমি তোকে অসম্ভব ভালোবাসি।”

প্রহর পলক ঝাপটিয়ে সুদৃঢ় নজরে চেয়ে রইল। ঠোঁট নাড়ল অস্পষ্ট,
-“থেকে গেলাম..”

—————

প্রিয় বাসায় ফেরার রাস্তায় ব্রিজের ধারে একটা আইস্ক্রিম পার্লার দেখে শরৎকে থামতে বলল। শরৎ রাস্তার পাশে বাইক পার্ক করল। প্রিয় নামার পর সে নেমে হেলমেট খুলতে খুলতে বলল,
-“এই ঠান্ডা ওয়েদারে কার আইস্ক্রিম খেতে ইচ্ছে করে, প্রিয়? বলবেন আমাকে?”

প্রিয় আইস্ক্রিমের অর্ডার দিয়ে শরতের দিকে তাকাল। চোখ পিটপিট করে উচ্চারণ করল, 
-“আমি।”
-“স্ট্রেঞ্জ লেডি!”
-“হ্যাঁ, তো?”
-“কিছু নয়।”
-“কেন কিছু নয়, নীরজ ভাই? কিছু হওয়া উচিত। আসুন, ঝগড়া করি।”

শরৎ হেসে ফেলে,
-“আপনাকে দেখে আর ঝগড়া আসে না, ম্যাডাম।”
-“আসা উচিত। আমরা ঝগড়া যার-তার সাথে করতে পারি না। আমরা যাদের..”

প্রিয়র কথা সম্পূর্ণ করল শরৎ,
-“আমরা যাদের ভীষণ পছন্দ করি, কিংবা যাদের ভীষণ অপছন্দ করি—কেবল তাদের সাথেই ঝগড়া করতে পারি।”

প্রিয় শুধাল,
-“আপনি আমাকে পছন্দ করেন না, নীরজ ভাই?”

ঢাকার ব্যস্ত শহরের এই খোলা আকাশের নিচে শরৎ প্রিয়র চোখে চোখ রেখে বলল,
-“একটু বেশিই পছন্দ করি।”

প্রিয় সে চোখে স্থির তাকিয়ে আছে। শরৎ নিজের কথা সম্পূর্ণ করে পালটা শুধাল,
-“আপনি কি অপছন্দ করেন আমায়, প্রিয়?”

বিমুগ্ধ প্রিয় সোজাসাপটা বলল,
-“উঁহু। পছন্দ করি। আপনি ভীষণ মনের মতো মানুষ, নীরজ ভাই। কিন্তু..”

শরৎ নতমুখী হয়ে হাসল,
-“এক্সপ্লেনেশন লাগবে না, প্রিয়। এটুকু এনাফ।”

প্রিয় আর কিছু বলল না। আইস্ক্রিম বানানো শেষ হলে, আইস্ক্রিম দুটো নিয়ে একটা শরতের হাতে দিলো, অন্যটা নিজে নিল। তারপর বিল পে করতে গেলে শরৎ বলল,
-“আমি দিচ্ছি।”

প্রিয় নেতিবাচকতা প্রকাশ করল, 
-“একদম না। কেউ আমার খরচ নিজে মেটাক, আমার পছন্দ নয়।”
-“এটা তো আমিও বলতে পারি। আপনি আমার বিলটাও নিজে দিতে চাইছেন।”

প্রিয় বলল,
-“এত কাহিনি করছেন কেন?”
-“আপনি কি চুপ আছেন?”
-“উফ! আসেন, ফিফটি-ফিফটিতে আসি।”

শরৎ হেসে ফেলল প্রিয়র এহেন কথা শুনে,
-“আজ্ঞে না। আপনি জব করেন না, প্রিয়। যেদিন জব পাবেন, সেদিন ট্রিট দেবেন। আজকেরটা আমার পক্ষ থেকে।”

প্রিয় তবুও মানতে রাজি নয়,
-“নিজেকে চালানোর মতো এনাফ ইনকাম আমার আছে, নীরজ ভাই।”
-“ওহ আচ্ছা, তাই? তা করেন কী?”

প্রিয় হাতের কর গুনে বলল,
-“দুটো টিউশনি করাই। ক্লাস টেনের ও টুইলভের। আর কন্টেন্ট রাইটিংয়ের মাধ্যমেও একটা হেলদি অ্যামাউন্ট আসে। মেয়ে মানুষ বলে অপজিশন সাইটকে কোনো কিছুতে কম মনে করবেন না।”

শরৎ মানিব্যাগ বের করে টাকা পে করে বলল,
-“করব না। বাট আজকেরটা আমিই দেবো। আপনাকে আমি মেয়ে মানুষ বলে নয়, বরঞ্চ আমার চেয়ে বয়সে ছোট একটা পিচ্চি ভাবছি। আর আপনি আমার প্রিয় মানুষও বটে। আমি সাথে থাকতে কী করে আপনাকে দিয়ে পে করাই? ওসব বাদই দিই। আপনি যদি নীহনকে নিয়ে বের হন, ফিফটি ফিফটি ভাগাভাগিতে বিবেকে বাঁধবে না?”

প্রিয় এবার দমে যায়। আইস্ক্রিম গলে যাচ্ছে। আমতাআমতা করে বলতে লাগে,
-“হয়েছে হয়েছে। পে করুন। বাট নেক্সট টাইম আমি।”
-“ওকে ম্যাডাম।”

প্রিয় আর শরৎ এগিয়ে গিয়ে ব্রিজের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। চুপ হয়ে আকাশ দেখতে এমন সময় খারাপ লাগছিল না। শরৎ বলে,
-“শ্রেয়ানের বিষয়টা আমার পছন্দ হচ্ছে না।”

প্রিয় নিজের ব্যক্তিগত বিষয়ে অন্য কারো মতামত এখন আর পছন্দ করে না। তবে আজ খারাপ লাগল না। বরঞ্চ ভালোই লাগল। ঠোঁট চেপে হেসে বলল,
-“এই তো, আর সামান্য কটা মাস।”
-“হ্যাঁ, সামান্য কটা মাসে আপনি আবার পিছলে যান। আর আমি দেখতে থাকি।”
-“আপনি এত চেতছেন কেন, নীরজ ভাই?”

প্রিয় হাসতে হাসতে কথাটি বলে শরৎের দিকে তাকায়। শরৎ দাঁতে দাঁত পিষে চাপা কণ্ঠে বিরবির করে,
-“আমার যে কোথায় লাগছে, তা আপনি বুঝবেন না। ইচ্ছে করছে শ্রেয়ানকে ধরে পিস পিস করে কেটে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে আসতে। শালার খেক শেয়াল কোথাকার। ছ্যাহ!”

খুবই ধীর আওয়াজে বললেও, প্রিয় কথাগুলো শুনতে পেয়ে হো হো করে হেসে উঠল। তখন ওর ফোন বেজে উঠল। দেখল শ্রেয়ানের কল। প্রিয় বলল,
-“শয়তানের নাম নিতে নিতেই শয়তানের কল। নীরজ ভাই, আপনি এই মুহূর্তে এই শয়তানটার নাম উচ্চারণ করে চরম অন্যায় করেছেন।”
-“তা শাস্তি কী পাব?”
-“পরে ভেবে-চিন্তে বলব।”

শরৎ মাথা নেড়ে বলল,
-“এখন পিক করবেন?”

প্রিয় দুষ্ট হাসল,
-“হুঁ।”

কল কেটে গিয়ে পুনরায় রিং হতেই প্রিয় কল রিসিভ করে স্পিকারে দিয়ে দিলো। যান্ত্রিক মুঠোফোনে ওপাশ থেকে শ্রেয়ানের আওয়াজ এলো,
-“বেইবি, আ'ম্মিসিউ...”

শরতের মুখ ফসকাতে চাইলো। প্রিয়কে বলে উঠতে চাইলো,
-“প্রিয়, ও আপনাকে বেইবি ডেকেছে। ওকে এক্ষুনি আব্বু ডাকুন।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp