শুক্লপক্ষের পরিশেষে - পর্ব ৩২ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

শুক্লপক্ষের পরিশেষে - নবনীতা শেখ
যান্ত্রিক মুঠোফোনে ওপাশ থেকে শ্রেয়ানের আওয়াজ এলো,
-“বেইবি, আ'ম্মিসিউ...”

শরতের মুখ ফসকাতে চাইলো। প্রিয়কে বলে উঠতে চাইলো,
-“প্রিয়, ও আপনাকে বেইবি ডেকেছে। ওকে এক্ষুনি আব্বু ডাকুন।”

তা বলল না শরৎ। প্রিয় রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। ফোনটা সামনে রেখে বলল,
-“হুম, এরপর?”

শ্রেয়ান বলল,
-“কী করছ, বেইবি?”

প্রিয় শরৎের দিকে তাকিয়ে ওকে রাগে ফুঁসতে দেখল। মিহি হেসে শ্রেয়ানকে বলল,
-“বাড়ির বাইরে আছি।”

ওপাশ থেকে শ্রেয়ানের চিন্তিত আওয়াজ এলো,
-“এত রাতে?”
-“আমার ইচ্ছে।”
-“দেখো প্রিয়শ্রী, তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি এখন আর কিছু বলি না। তাই বলে তুমি যাচ্ছে তাই করে বেড়াতে পারো না। রাত করে এদিক-সেদিক কী? শহরের মানুষ ভালো না, সোনা। তুমি লোকেশন সেন্ড করো আমায়। আমি পিক করছি। ইউ ডোন্ট হ্যাভ ইনি আইডিয়া, এরা কত খারাপ!”

প্রিয় হেসে ফেলল,
-“বাট আই হ্যাভ মাচ আইডিয়া এবাউট ইউ, শ্রেয়ান। আই গ্যেস, তোমার চেয়েও বাজে কিছু ফেইস করতে হবে না।”

শ্রেয়ান চুপ থাকল। গতদিন ধানমণ্ডির এই অ্যাপার্টমেন্টে এসেছে শ্রেয়ান। উদ্দেশ্য ছিল খুব জলদি দেখা করবে প্রিয়র সাথে। এখন প্রিয়কে বাড়ির বাইরে থাকতে দেখে চটজলদি কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল। পরনের কালো রঙা টিশার্ট আর গ্রে ট্রাউজারটা চেঞ্জ না করেই বেরোতে চেয়েছিল। পকেটে প্রয়োজনীয় ক্যাশ ঢুকিয়ে কারের চাবি হাতে নিতেই প্রিয় কথাটা বলে উঠল। শ্রেয়ান চাবিটা মুঠোবন্দি করে ফেলল। গম্ভীর আওয়াজে বলল,
-“তুমি কি একবারও বলতে পারো আমি তোমার সাথে বাজে বিহেভ করেছি? আমি তোমাকে তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কখনও ছুঁয়েছি?”

প্রিয় নেতিবাচকতা প্রকাশ করে বলল,
-“সবাই শরীর ছুঁয়ে কলঙ্কিত করে না, কেউ কেউ মন ছুঁয়ে মস্তিষ্ক নিয়ে খেলতে পছন্দ করে। তুমি ওমন একজন। একটা সাই...”

প্রিয়র কথা সম্পূর্ণ করল শ্রেয়ান,
-“সাইকো বলো আর যাই বলো, তোমারই তো।”

প্রিয় আগ্রহ দেখাল না। শরৎের দিকে তাকাল। সে হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। সেভাবে তাকিয়েই শ্রেয়ানকে বলল,
-“একটু ব্যস্ত আছি, শ্রেয়ান। রাখছি, হুঁ?”

শ্রেয়ান ত্বরিতে বলল,
-“এই! রাখবে না। আমি কলে থাকি। কথা বলো। সবসময় শুধু রাখি রাখি কোরো না। আমাকে টাইম দাও তুমি। ৬ মাস সময় দিলে, অথচ দিনে একবার একমিনিটের জন্য কথা বলো না, দেখা করো না। এভাবে চলবে?”

প্রিয় হাসল,
-“অভিযোগ করছ, শ্রেয়ান?”
-“কেন? করতে পারি না?”
-“অবশ্যই পারো। আচ্ছা, শুনি। ৫ মিনিট দিচ্ছি, ফটাফট অভিযোগগুলো করে ফেলো দেখি।”

শ্রেয়ান অভিযোগের পসরা সাজাতে থাকে,
-“তুমি আগের মতো অভিমান করো না।”
-“মান ভাঙাতে না এলে, অভিমানেরা মুখ ফিরিয়ে নেয়, আসতে চায় না।”
-“আগের মতো সময় দাও না।”
-“সময়গুলো দামী হয়ে গেছে, বুঝে-শুনে খরচ করি এখন।”
-“আমার খোঁজ নাও না।”
-“নিজেকে ভালো রাখায় ডুবে গেছি, অন্য কেউ মরলেও বিচলিত হই না।”
-“আমার জন্য তুমি কান্না করো না।”
-“চোখের জলেরাও একসময় শুকিয়ে যায়।”
-“তুমি আমায় ভালোবাসো না, প্রিয়শ্রী।”
-“এখনও আশা করো?”

শ্রেয়ানের দীর্ঘশ্বাস প্রিয় শুনতে পেল। সামান্য হেসে বলো,
-“ওয়েল ট্রাই। চেষ্টা করে যাও আর ৪ মাস। এর আগে যদি হাঁপিয়ে যাও, জানিয়ো।”

শ্রেয়ান বলল,
-“আমার ভালোবাসা তুমি এই ৬ মাসেই উপলব্ধি করতে পারবে। তখন আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারবে না।”
-“দ্যাটস দ্য স্পিরিট! চালিয়ে যাও। আমি রাখছি।”

কল কেটে দিলো প্রিয়। রেলিং থেকে সরে গিয়ে শরৎের মুখোমুখি দাঁড়াল। বুকে দু-হাত গুঁজে শরৎের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“বাহ রে নীরজ ভাই, আপনি ওমন গাল ফোলাচ্ছেন কেন?”

শরৎ তাকাল ওর দিকে, পকেটে হাত গুঁজে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
-“বুঝবেন? বুঝবেন না।”
-“বোঝালেই বুঝব, বোঝান।”

শরৎ কিছু বোঝায় না। প্রগাঢ় দৃষ্টিতে প্রিয়র চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রিয় ভড়কে যায়। এদিক-ওদিক তাকিয়ে সরে আসে। শরৎ তখন বলে,
-“জানেন প্রিয়, এই আপনিটা আমার বড়ো পছন্দের।”
-“জানি।”

ঠান্ডা পরিবেশে অনেকক্ষণ বাদে শরৎ আচমকা বলে ওঠে,
-“প্রহরের সাথে আমার অনেক আগে থেকেই যোগাযোগ আছে, জানেন?”

প্রিয় বলল,
-“জানতাম না।”
-“কাজিনগ্রুপে রিধিমা আপনার আর ওর একাউন্ট অ্যাড করে। ও কখনও কথা বলেনি, আমিও বলতাম না সেভাবে। আপনাকে আগে থেকে চিনলেও, তখন সেভাবে নোটিস করিনি। সম্ভবত ৪-৫ বছর আগে কলেজের রিইউনিয়নে ওর সাথে আমার দেখা হয়। আমি প্রথম দেখায় ঠিক চিনতে পারিনি, তবে ফেইসটা চেনা লেগেছিল। অনেকক্ষণ ভাবার পর চিনতে পারি। ওকে ডেকে, কথা বলে শিউর হই। তখন ও একদমই কথা বলত না। কেমন যেন ভীরু ছিল। তবে আমার ভালো লেগেছিল। তারপর মাঝে মাঝেই ওর সাথে কথা হয়। ও আমার সাথে স্বাভাবিক হতে থাকে। আমার কাছে সবকিছু শেয়ার করতে থাকে।”

প্রিয় এটুকু শুনে বলল,
-“ও আমাকে এসব জানায়নি! আমি অবাক হচ্ছি।”

শরৎ বাঁকা হেসে বলল,
-“তখন আপনি দিন-দুনিয়া ভুলে এক শয়তানের বাচ্চার ওপর ডুবে মরছিলেন। ওর জন্য সময় ছিল না আপনার।”

প্রিয় আর কিছু বলল না। অপরাধবোধে ভুগতে লাগল। শরৎ দম ফেলে বলল,
-“ও কারো সাথে মিশতে জানত না। ওর সব কথা কেবল আপনাকে বলত। অথচ ও ধীরে ধীরে আপনাকেও হারিয়ে ফেলে। প্রচণ্ড বিষণ্ণতায় ঘিরে থাকতে লাগে সারাটাদিন। তারপর আমি ওকে বিভিন্নভাবে মোটিভেট করতে থাকি। ওর আর আয়াতের গল্পটাও শুরু থেকেই জানা আমার। তারপর একদিন আপনার কথা জানায়। আপনাকে তখন আমি সেই ছোটবেলার অসম্ভব দুষ্ট মেয়ে হিসেবেই জানতাম। আমি বুঝতে পারছিলাম না, যেই মেয়েটাকে পুরো এলাকাকে নাকানিচুবানি খাইয়ে বেড়াতো, সেই মেয়েটাকে একটা ছেলে কীভানে নাকে দড়ি বেঁধে ঘোরায়? খুব অবাক হয়ে যাই। বয়স তো কম হয়নি। অনেকের গল্প শুনেছি। ফ্রেন্ড সার্কেলের অনেক মেয়েকে অল্প বয়সে এমন টক্সিক রিলেশনে জড়াতে দেখেছি, তাদের সেই বয়সেই ঝরে পড়তে দেখেছি। অনেক ফ্রেন্ডকে সুইসাইড করতেও দেখেছি। একপ্রকার ভয় জন্মালো। আপনার বিষয়টা খতিয়ে দেখব ভাবলাম। তখন প্রহর নিজ থেকেই আমাকে বলে, শ্রেয়ানের বিষয়টা একটু দেখতে। ওর পুরো ডিটেইলস বের করতে আমার সময় লেগেছিল একমাস। লাভ হয়েছিল ওর ফোন হ্যাক করে। শালার এত জায়গায় এত স্ক্যান্ডেলের সাথে জড়িত, আমি কালেক্ট করতে হিমশিম খাচ্ছিলাম।”

শরৎ তাকাল প্রিয়র দিকে। সে নিশ্চল দৃষ্টিতে রাস্তায় চলমান গাড়িগুলো দেখে যাচ্ছে। শরৎকে থামতে শুনে শুধাল,
-“তারপর?”
-“আশফিক রহমান শ্রেয়ান। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। বাবা সবসময় টাকা পয়সার পিছে ছুটতে ছুটতে ছেলেকে সময় দেয়নি সামান্যও। তার বাবার থেকে সময় পায়নি তার মা নিজেও। তাই মায়ের পরকীয়াও দেখেছে বেড়ে উঠতে উঠতে। বাড়িতে ওকে সামলানোর মতো তেমন কেউ ছিল না। নিজের মতো বড়ো হতে লাগল। পাগলামি বাড়তে লাগল। স্কুলে অসৎ সঙ্গ পেয়ে বিভিন্ন নেশা-টেশা করতে লাগল। কলেজে উঠে বাবার থেকেও সব রকমের ছাড় পেতে থাকল। পাবলিকলি নেশা করত। তখন থেকেই মেয়েজনিত বিভিন্ন কাণ্ডে নিজেকে জড়াতে লাগল। রাতে বাড়ি ফিরত না। প্রতিরাতেই নতুন নতুন টেস্ট করত। মেয়ে, নেশাদ্রব্য ও ক্যাসিনো। এই নিয়েই ওর লাইফ। এরপর ভার্সিটিতে উঠেই আলাদা থাকার জন্য বাড়িতে আবদার করল। বর্তমান অ্যাপার্টমেন্টটা ওর বাবা ওকে তার সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই গিফট করল। এখানে এসে উঠল। মেয়েদেরকে নিজ থেকে ওর প্রতি আকর্ষিত করার মধ্যে অন্যরকমের মজা পেত ও। ও কখনও কোনো মেয়েকে জোর করেনি রিলেশনের জন্য। মেয়েদের কেবল হালকা ইঙ্গিত দিত। আর তারা নিজে থেকেই সায় দিত। তারপর বেডে আসতেও দ্বিধা করত না। প্রতিটি মেয়ের সাথে বেড টাইমের ভিডিয়ো রেকর্ড করে রাখত। ব্রেকাপের সময় কোনো মেয়ে ঝামেলা করলে ওগুলো দেখিয়ে বেঁচে যেত। তোমার সাথেও একইভাবে এগোতে চেয়েছিল। তুমিও পা বাড়ালে। ও মেয়েদের ব্যাপারে এতটাই অভিজ্ঞ হয়ে গিয়েছিল যে, তোমার মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছিল তুমি জলদি জলদি এগোনোর মানুষ না। ও আস্তে আস্তে এগোতে লাগল। প্রথমে ফ্রেন্ডশিপ আর তারপর একটা টক্সিক রিলেশনশিপের সূচনা। তুমি খুব দারুণভাবে এগোচ্ছিলে। ও তোমার পিছে অযথা এত সময় অপচয় করতে চাইছিল না। তোমাকে একপাশে রেখে নিজের লাইফটা নিজের মতো লিড করে যাচ্ছিল।”

শরৎ থামল। বড়ো করে একটা শ্বাস টেনে আবার বলল,
-“বোকাফুল, তুমি টের পাওনি। ও তারপর মায়ায় জড়াতে থাকে। তোমার সরলতার মায়ায়। তোমাকে রেখে দেওয়ার মতলব আঁটে। ওর কোনো গার্লফ্রেন্ড এমন ছিল না। ওর কোনো গার্লফ্রেন্ড ৬ মাস টেকেনি, যেটা মাসখানেক টিকেছিল সেটাও নাকি টের পেয়ে গেছিল ওর বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ডুব মারার আসল কাহিনি। কিন্তু তুমি কিচ্ছুটি বোঝোনি। ও তাই ভাবল, এরকম একটা পার্মানেন্ট মানুষ থাকলে ক্ষতি নেই। তোমাকে ও চেয়েছিল, এটা ধ্রুব সত্য। ঠিক যেমনটা তুমি বোকাফুল।”

প্রিয় মলিন আওয়াজে বলল,
-“আমি সত্যিই বোকাফুল। আমি ওর বিভিন্ন গার্লফ্রেন্ডের গল্পটা জানা সত্ত্বেও চুপ থাকি, বোকা সেজে থাকি৷ আমি চেয়েছিলাম ও দেখুক আমার ভালোবাসার গভীরতা। ও তা উপলব্ধি করে এক নারীতে আসক্ত হোক।”

শরৎ হাসল,
-“কুকুরের লেজ সোজা হয় না, প্রিয়।”
-“হুঁ।”
-“আপনি শুধু শুধু নিজের লাইফের এতটা সময় নষ্ট করেছেন।”
-“আমার এই আফসোস যাবে না।”
-“আফসোস করবেন না। ভুল থেকে শিক্ষা নিন। আপনি কি জানেন, এই ভুল আপনাকে বড়ো করে তুলেছে? আপনাকে ম্যাচিউর করে তুলেছে?”
-“হুঁ।”

শরৎ ইচ্ছাকৃত কুহকের বিষয়টা এড়িয়ে গেল। এই নিয়ে তার আলাদাই পরিকল্পনা আছে। প্রিয় বলল,
-“আপনি আমাকে পছন্দ করেন কখন থেকে, নীরজ ভাই?”

প্রিয়র প্রসঙ্গ এড়ানোর ধরন দেখে শরৎ না চাইতেও অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলল। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp