শুক্লপক্ষের পরিশেষে - পর্ব ৩৩ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

শুক্লপক্ষের পরিশেষে - নবনীতা শেখ
-“আপনি আমাকে পছন্দ করেন কখন থেকে, নীরজ ভাই?”

প্রিয়র প্রসঙ্গ এড়ানোর ধরন দেখে শরৎ না চাইতেও অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলল। তারপর প্রিয়কে বলল,
-“ভেঙে গুড়িয়ে যাওয়া মেয়েকে যখন কোমরে গামছা বেঁধে ঝগড়া করতে দেখলাম, ঠিক তখন। আমি এতটা পরিবর্তন অন্য কোথাও দেখিনি, অন্য কারো মধ্যে দেখিনি। মানুষ ভিন্নতায় আটকায়। আমি মনুষ্যজাতির বাইরের নই। তাই একটা ঝগড়ুটে মেয়েতে পিছলে গেলাম।”

প্রিয় পিটপিট করে তাকাল। শরৎ ওর দিকে তাকায়। ওকে প্রলুব্ধ করতে বলে ওঠে, 
-“কিন্তু তুমি যে আরও দুইধাপ এগিয়ে, তা জানা ছিল না। আমাকে পছন্দ করতে কতক্ষণ সময় নিয়েছিলে?”

প্রিয় গাল ফোলাল,
-“আপনাকে আমি পছন্দ করি বাচ্চাকাল থেকেই। যখন আমি কিছু বুঝতামই না, ঠিক তখন থেকেই আপনাকে অনুকরণ করে এসেছি।”
-“এই পছন্দ না রে, পাগলি। বড়োদের পছন্দ করার কথা বলছি। কবে তুমি আমাকে বড়োদের মতো পছন্দ করা শুরু করলে?”

প্রিয় আমতাআমতা করে বলল,
-“আমার খেয়াল নেই। আপনি অপছন্দ করার মতো মানুষ নন। তাই শুরু থেকেই বোধহয়।”

শরৎ আবারও ঠোঁট চেপে হাসল। প্রিয় শুধাল,
-“আপনি আমাকে শুরুতে আপনি, এরপর তুমি, এখন আবার আপনি করে কথা বলেন কেন?”

শরৎ এর একটা দারুণ জবাব দিলো,
-“বড়ো হওয়ার পর প্রথম দেখা। তুমি করে ডাকাটা সমীচীন নয়। তাই আপনি করে ডেকেছি। এরপর তুমিতে এলাম। এসে দেখলাম, আপনিটাই বেশি ভালো লাগছিল। বেশি সুইট, একটু বেশিই কেয়ারিং শোনাচ্ছিল। তাই আর কী। আর আপনি?”

প্রিয় সামনের সব ক'টা দাঁত বের করে হেসে বলল,
-“সেম!”

—————

ফিরতে ফিরতে রাত নয়টা। শরৎ প্রিয়কে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। প্রিয় একবার ভেতরে আসতে বলতে চেয়েছিল। কিন্তু এতরাতে শরৎকে সাথে নিয়ে বাড়িতে ঢুকলে নাহারা পারবে না আজই শরৎকে মেয়ের জামাই হিসেবে কবুল করে নেবে! প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে বিদায় জানাল প্রিয়। বিদায়সূচক শব্দ হিসেবে প্রিয় বলেছিল,
-“আপনি একজন দারুণ মানুষ, নীরজ ভাই। একদম মনের মতো। সব ঠিক থাকলে দারুণ মানুষটাকে নিজের মানুষ বলতে পারতাম। অথচ ভাগ্য সহায় হলো না।”

শরৎ তা শুনে মিহি হাসে। যেই হাসিটা আঁধারিয়ায় বড়ো করুণ সুরে প্রিয়কে জানিয়েছিল, 
-“প্রিয়! এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফুল। আপনি কি জানেন? আপনি চাইলেই আপনি আমার আর না চাইলেও আমি আপনার...”

প্রিয় বাড়ি ফেরার পর নাহারার চিন্তারত মুখ দেখতে পেল। আসার সময় একবার জানিয়েছিল অবশ্য যে ফিরতে দেরি হবে। তবুও মা তো! প্রিয় এসে সবার আগে নাহারাকে জড়িয়ে ধরল। নাহারাও মেয়েকে আগলে নিলেন। হেসে ফেলে বললেন,
-“হঠাৎ এত আহ্লাদ?”
-“মাঝে মাঝে এরকম আহ্লাদী হতে মন চায়, আম্মু।”
-“ওরে আমার আহ্লাদী রে!”

প্রিয় হাসে,
-“হয়!”
-“দিন কেমন কাটল, মা? সব ভালো?”

প্রিয় নাহারাকে জড়িয়ে ধরেই সোফায় বসে পড়ল। দুইহাতে নাহারার ডান হাতটি জড়িয়ে নিয়ে কাঁধে মাথা রেখে বলল,
-“ভীষণ ভালো।”

নাহারা বাঁ হাতটি প্রিয়র গালের এপাশে রেখে বলল,
-“ভালো আছ, মা?”
-“আলহামদুলিল্লাহ আম্মু, ভালো আছি।”
-“সত্যি ভালো আছ?”
-“সত্যি সত্যি ভালো আছি।”
-“যাক, আলহামদুলিল্লাহ।”

প্রিয় হেসে আরও খানিকটা আহ্লাদ করে বলল,
-“এই তুমিটাকে যদি শুরুতে পেতাম! তাহলে আমি কোনো ভুল করতাম না। প্রতিটি মায়ের উচিত নিজের মেয়ের বন্ধু হওয়া। আমি তোমাকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছি, তবে দেরি করে। আচ্ছা আম্মু, এই দেরিটা হওয়া কি খুব জরুরি ছিল?”

নাহারা ব্যথিত হলো প্রিয়র মলিন আওয়াজ শুনে। আসলেই প্রিয়কে সে ছাড় দিয়েছিল, কিন্তু বন্ধুত্বটা করেনি। এই আফসোস তার নিজেরও। নাহারার নিশ্চুপতায় প্রিয় বলে উঠল,
-“যদি আমার কখনও মেয়ে হয়, আমি আমার মেয়ের বন্ধু হব। আমি তাকে কোনো কিছু করতে বারণ করব না। আমি তাকে সব করতে দেবো। তাই সে আমার থেকে কিছুই লুকোবে না। বাচ্চাদের একটা ধ্রুব স্বভাব কী জানো? তাদের যা করতে নিষেধ করা হবে, তারা তা-ই করবে, করবেই! আমি আমার মেয়েকে কোনো কিছু করতে নিষেধ করব না। ওকে করতে দেবো। সেই সাথে সবকিছুর পরিণাম সম্পর্কে অবগত করব।”

নাহারা প্রিয়র মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। প্রিয় টুপ করে নাহারার কোলে শুয়ে পড়ল। সোফায় টান টান হয়ে শুয়ে নাহারার দিকে তাকিয়ে বলল,
-“ধরো ও আমাকে এসে বলল, ওর ফ্রেন্ডস সবার কাছে ফোন আছে। আমি ওকে ফোন দেবো তখনই। ফোন হাতে দিয়ে তারপর ওকে এর সব ক্ষতিকর দিকগুলো জানিয়ে দেবো বিস্তারিতভাবে। এটা থেকে কী কী হতে পারে, সব। ফোন ওর জন্য নিষিদ্ধ না, এজন্য ও অ্যাডিক্টেড হবে না।
আবার ধরো, ওকে কোনো ছেলে প্রপোজ করল। ও আমাকে এসে অবশ্যই বলবে যদি আমি ওর বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে থাকি। আমি তখন ছেলের ব্যাপারে বিস্তারিত জানব। ওকে সতর্ক করব কোন ধরনের ছেলেরা কেমন হয়ে থাকে। ওকে নিষেধ করব না, শুধু সতর্ক করব।
আম্মু, জানো? আমি আমার বাচ্চাদের সবসময় পজিটিভ থিংকিং শেখাব। ধরো, এখনকার গার্জিয়ানরা কী বলে? বলে যে, এক্সামে ফেইল করলে এই হবে, সেই হবে। আমি আমার বাচ্চাদের জানাব, এক্সামে হাই স্কোর করলে কী কী হবে। 
ওরা ওদের সন্তানদের মন বোঝে না। অথচ আমি হব বেস্ট ফ্রেন্ড।”

প্রিয়র চোখে আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো জ্বলজ্বল করছে। নাহারা বিস্মিত হলো। সে-ও তো পারতো নিজের মেয়ের বন্ধু হতে। পারতো! পারল না কেন? প্রিয়র ভাগ্যে এরকম একটা ধাক্কা ছিল বলেই পারেনি। নাহারা এসব ভাবতে ভাবতেই প্রিয় বলে উঠল,
-“আম্মু, শ্রেয়ান আমাকে আবারও স্টক করছে।”

নাহারা চমকে উঠল। জিজ্ঞেস করল,
-“কবে থেকে?”
-“আগে থেকেই।”
-“আমাকে বলোনি কেন?”
-“প্রয়োজন পড়েনি।”
-“আজ বললে?”
-“হয়তো আমি ভেবে নিয়েছিলাম, আমি বড়ো হয়ে গেছি। নিজেরটা নিজে বুঝে নিতে পারব। নিজে থেকে নিজের সমস্যাগুলো হ্যান্ডেল করতে পারব। কিন্তু এই মুহূর্তে তোমার কোলে শুয়ে আমি উপলব্ধি করলাম, আমি একটুও বড়ো হইনি। আমি এখনও তোমার আদরের জন্য হুটহাট আবদার করি। আমি এখনও তোমাকে চোখের আড়ালে রেখে খুব বেশি সময় থাকতে পারি না। ছোটবেলায় যেমন তোমার ওড়না ধরে ধরে ঘুরতাম না? তুমি রান্নাঘরে গেলে ওড়নার কোণা ধরে আমিও যেতাম, তুমি রুমে গেলে পিছু পিছু আমিও। কিছু সময়ের জন্য চোখের আড়াল হলে চিল্লিয়ে বাড়ি মাথায় তুলতাম না? আমি এখনও তোমাকে খুব বেশিক্ষণ না দেখতে পেলে ছটফট করি। তোমার কাছে এলে কী যে শান্তি! একটা বড়ো মানুষ কখনই কারো কোলে এসে টুপ করে শুয়ে পড়ে না। আমি পড়ি। কারণ আমি এখনও ছোট। তোমার কাছে ইহজনমে বড়ো হওয়ার ইচ্ছে নেই। আম্মু, জানো? তোমার কাছে খুব শান্তি, খুব সুখ। আমার সব দুঃখ মিটে যায়।”

নাহারার চোখ থেকে টুপ করে এক ফোটা জল গড়াল। প্রিয় তা দেখল না। প্রিয় চোখ বুঁজে কথা বলে যাচ্ছে,
-“আম্মু, তোমার মেয়ে ভীষণ শক্ত। তোমার মেয়ে না? শক্ত না হয়ে পারবে নাকি? একদম না। ওই ছেলেটাকে নিয়ে টেনশন কোরো না। আমি ওর কাছে ফিরব না। ও জ্বালাতে জ্বালাতে হাঁপিয়ে যাক, মরে যাক।”

নাহারা নিজেকে সামলে নিল। প্রিয়র চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,
-“তবুও ও এসেছে, বিষয়টা কেমন যেন!”
-“হ্যাঁ, কেমন যেন আমিও জানি। তুমি চিন্তা কোরো না। হ্যাঁ, এভাবেই বিলি কেটে দাও চুলে। ভালো লাগছে। আম্মু, নীরজ ভাইকে চেন না?”

প্রিয় থেমে থেমে কথাগুলো বলল। শেষ প্রশ্নের বিপরীতে নাহারা বলল,
-“হ্যাঁ, চিনব না কেন? কী হয়েছে? কোনো সমস্যা?”
-“না না, সমস্যা নয়। তবে শ্রেয়ানের ব্যাপারটা প্রহর আর নীরজ ভাই মিলে ধরতে পেরেছিল।”
-“প্রহর নীরজকে এসব জানিয়েছে?”
-“হ্যাঁ। তুমি অবাক হচ্ছ না?”
-“না। অবাক হওয়ার কী আছে? ওদের মধ্যে ভালো একটা বন্ডিং আছে, তা কি অজানা নাকি?”
-“আশ্চর্য আম্মু, আমি বাদে সবাই জানে!”
-“কী?”
-“এই যে, নীরজ ভাইয়ের সাথে প্রহরের যোগাযোগ।”
-“নীরজের সাথে শুধু প্রহরের না, আমাদের সবারই যোগাযোগ আছে। প্রহরের মাধ্যমে জানতে পারি ও এই শহরেই থাকে। খুব একটা দূরেও তো না। তারপর থেকে প্রায়ই দেখা-শোনা হতো। এই বাসাতেও তো এসেছে অনেকবার।”

প্রিয় লাফিয়ে উঠল,
-“আমি কই মরেছিলাম, আশ্চর্য! আমার বাড়িতে এসে নীরজ মশাই নৃত্য করে যায়, আমি জানি না!”

নাহারা প্রিয়র মাথায় একটা চাটি মেরে বলল,
-“তুই তো ওই শয়তানের বাচ্চার মধ্যে মরেছিলি, জানবি কীভাবে? সারাদিন রুমের ভেতর পড়ে ছিলি। এদিকে নীরজ এই বাড়িতে আসত, গল্প করত, খাওয়া-দাওয়া করে তারপর যেত। প্রহরকে একদম আপন ভাইয়ের মতো ট্রিট করে। আমার আরেক ছেলে ও।”

প্রিয়র ফেইসটা সেন্টি ইমোজির মতো, এক্সপ্রেশন ছাড়া একটা হাসি ঠোঁটে ঝুলছে। সে হজম করতে না পেরে বলে উঠল,
-“এটা কী শুনাইলা, আম্মা? ওই ব্যাটা নীরইজ্জ্যা আমার বাড়িত আইসা খায়-দায় যাইত, আমার মায়রে মা আর আমার ভাইরে ভাই বানাইলো। এখন আমারে শুধু বইন বানানোই বাকি আছে। ওরে কল দেও। এক্ষুনি কও শুভ কামডা করি ফেলতে।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp