শুক্লপক্ষের পরিশেষে - পর্ব ৩৪ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

শুক্লপক্ষের পরিশেষে - নবনীতা শেখ
          রাতে নিজের রুমে ফেরার আগে প্রিয় একবার প্রহরের রুমের দিকে গেল। দরজা নক করলে কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে প্রহর দরজা খুলে দিলো। প্রিয়কে আসতে দেখে বলল,
-“কী খবর, আপু। হঠাৎ?”
-“এমনিই। ভেতরে আসতে দিবি না?”
-“হ্যাঁ, আয়।”

প্রিয় ভেতরে এলো। বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে বলল,
-“কুড়ি মিনিট দিলাম। তোর একূল-ওকূল সবকূলের ডিটেইলস ফটাফট বল।”

প্রহর ভ্রু-কুঁচকে বলল,
-“বুঝিয়ে বল।”
-“আয়াতের সাথে কী চলছে?”

মুখের সামনে হাত রেখে সামান্য কেশে উঠল প্রহর। এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর চুলগুলো সামান্য চুলকে নিয়ে বলল,
-“নাথিং স্পেশ্যাল।”

প্রিয় বাতাসে হাত নেড়ে বলল,
-“আ-রে বল! আমরা আমরাই তো।”

প্রহর ঠোঁট চেপে হাসল,
-“তাই না? আমরা-আমরাই?”

দু-পাটি দাঁত বের করে প্রিয় বলল,
-“ইয়েস!”

প্রহর হেসে ফেলল,
-“আচ্ছা, শোন।”
-“হুম হুম, বল বল।”
-“কলেজ লাইফ থেকেই আমার লাইফটা ভাজাভাজা করে আসছে ও। তারপর আস্তে-ধীরে কীভাবে যেন ফল করল। আমি তখন রিলেশনশীপ ব্যাপারটা পছন্দ করতাম না। তো সেভাবেই চলছে। কথা হচ্ছে। আমি আমার মতো থাকি, ও ওর মতো সারাক্ষণ বকবক করতে থাকে...”

প্রিয় ঠোঁট উলটে বলল,
-“যাহ! এটুকুই?”

প্রহর সেন্টার টেবিলটা টেনে প্রিয়র মুখোমুখি বসে পড়ে বলল,
-“আমাদের ঘটা করে প্রেম হয়নি, প্রেমের আনুষ্ঠানিকতাও হয়নি। শি ইজ ম্যাড অন মি, আর আমি চুপচাপ ওর ম্যাডনেস দেখে যাই। বিষয়টা চমৎকার।”

প্রিয় উদাস গলায় বলল,
-“ও তোকে ভালোবাসে?”
-“পাগলের মতো বাসে।”
-“আর তুই?”
-“তোর কী মনে হয়?”
-“মনে হচ্ছে পছন্দ করিস।”
-“তাহলে তাই।”

প্রিয় রাগ করল,
-“যাহ! তুই বল। ভালোবাসিস?”
-“নিঃসন্দেহে।”
-“ও প্রকাশ করেছে ওর অনুভূতিগুলো?”
-“মুখে বলেছে অনেকবার, আর ওর চাহনি সেগুলো বিশ্লেষণ করেছে অসংখ্যবার। ও যতবার তাকায়, ততবারই ওর চোখে বিষণ্ণ মুগ্ধতা ও এক আকাশ সমান ভালোবাসা দেখতে পাই।”
-“তুই তোর ফিলিংসগুলো মুখে বলিসনি?”
-“আমার নিশ্চুপ চাহনি ওকে সহস্রাধিক বছর ধরে সঙ্গ দেবে বলে অঙ্গীকার করেছে।”

প্রিয় মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে,
-“ইন্ট্রেস্টিং! শোন, এই উইকেন্ডে ফ্রি আছিস?”
-“হ্যাঁ। আছি।”
-“আর আয়াত?”
-“ও ২৪/৭ ফ্রি।”
-“আর তোর প্রিয় অভিবাবক? তিনি ফ্রি?”

প্রহর কপাল কুঁচকে বলল, 
-“আই গ্যেস তুই নীরজ ভাইয়ের কথা বলছিস!”

প্রিয় শয়তানি হাসে,
-“জি।”
-“জিজ্ঞেস করে দেখতে হবে ফ্রি আছে কি না।”
-“যদি ফ্রি থাকে, তবে বলে দিস এই উইকেন্ডে সবাই মিলে একটু লাঞ্চে যাব।”
-“আচ্ছা।”

প্রিয় নিজের রুমে চলে এলো। ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার শেষে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুম দিলো। ঘুম ভাঙল সাড়ে বারোটার পর। অভ্যেসবশত ফোন হাতে নিল। নিউজফিড ঘাটতে ঘাটতে বোর হয়ে এলে ম্যাসেঞ্জারে চলে এলো। সবার ওপর একটি অনাকাঙ্ক্ষিত অ্যাকাউন্ট থেকে আনরিড ম্যাসেজ জ্বলজ্বল করছে। পাশে দেখা গেল, ম্যাসেজটা এসেছে আরও ৩৫ মিনিট আগে। প্রিয় সিন করল নীরজ শিকদার নামের অ্যাকাউন্ট থেকে আসা ম্যাসেজটি।
কিছু পিকচার সেন্ড করেছে। প্রিয় ছবিগুলো ওপেন করল। একটাতে সে ব্রিজের ধারে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছে আর খোলা চুলগুলো অন্য হাত দিয়ে এলোমেলো করছে। আরেকটাতে আইস্ক্রিমের কোণ খেতে গিয়ে নাকে লেগেছে, আরেকটিতে প্রিয় সেই নাকে লাগা আইস্ক্রিমটা ট্যাড়া চোখে দেখছে। আরেকটাতে রোড সাইড বেঞ্চে বসে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া। এরকম অনেকগুলো ছবি।

প্রিয় দেখল, সবগুলাই লুকিয়ে তোলা। গোপনে হাসল। তারপর লিখল,
-“এত নজর দেওয়া ভালো না, মশাই।”

প্রিয় ভাবল, এখন শরৎ দেখতে পাবে না তা। প্রিয়কে অবাক করে দিয়ে তৎক্ষনাৎ সিন হলো। পাশের গোল বৃত্তটি প্রথমে নীল, এরপর শরতের প্রোফাইলে পূর্ণ হলো। সাথে যোগ হলো অন্যপাশের টাইপিং লেখাটি।

শরৎ রিপ্লাই দিলো,
-“কিছু স্পেশ্যাল জিনিসে নজর দেওয়া, কিছু স্পেশ্যাল মানুষের জন্য স্পেশ্যালি বাধ্যতামূলক।”
-“যাহ নীরজ ভাই, নিজেকে স্পেশ্যাল বললেন?”
-“আপনাকেও তো বললাম।”
-“স্পেশ্যাল?”
-“নাহ, আমার।”

প্রিয় ঠোঁট কামড়ে হাসে। শরৎ ম্যাসেজ করে,
-“ঘুম থেকে উঠলেন সবে?”
-“হুঁম।”
-“শান্তিকুঞ্জে থাকার সময় তো ঘুমাতেনই ৩টার পর! আজ এত আগে অর্ধেক ঘুম হয়ে গেল যে?”

টিজ করাটা প্রিয় ধরতে পারল না, রিপ্লাই দিলো,
-“ভার্সিটি, টিউশনি শেষে বাসায় ফিরতে ফিরতে টায়ার্ড হয়ে যাই। ঘুম আপনা-আপনি এসে পড়ে।”
-“এখন কী করছেন?”
-“এই তো, বসে। আপনি?”
-“আমিও।”

অনেকক্ষণ ম্যাসেজিংয়ের পর হুট করে শরৎ বাহানা দিলো,
-“আমার না হাতে ব্যথা হচ্ছে।”
-“হঠাৎ?”
-“হ্যাঁ, টাইপিং করতে পারছি না।”
-“আচ্ছা, তাহলে ঘুমিয়ে পড়েন। শুভ রাত্রি।”
-“এই না, কথা শেষ হয়নি তো।”
-“তাহলে কী করব?”

শরৎ শুধু একটা ইমোজি ম্যাসেজ দিলো,
-“☹️”

প্রিয় ব্যাপারটা ধরতে পেরে ফিক করে হেসে ফেলল। তারপর কল দিলো। শরৎ কল রিসিভ করল সাথে সাথেই। প্রিয় ফোন কানে চেপে ধরল, কিছু বলল না। ওপাশ থেকে শরৎও কিছু বলছে না। প্রিয় অনেকক্ষণ বাদে দু'বার বলল,
-“হ্যালো! হ্যালো!”

অতঃপর নিস্তব্ধতায় ঘেরা শরতের আওয়াজ এলো,
-“এটা বুঝতে এত সময় লাগালেন কেন, ফুল?”

প্রিয় চোখ বুঁজে ফেলল। এজন্যই শরৎকে তার এত বেশি পছন্দের। ওর কল্পপুরুষের সাথে একাধিক বৈশিষ্ট্যে মিলে যায় বলে। প্রিয় গায়ের কম্বলটা সরিয়ে বিছানা থেকে পা নামাল। রুম স্লিপারটা পরে নিয়ে আলতো পায়ে বারান্দায় চলে এলো। শরৎ জিজ্ঞেস করল,
-“ভালো আছেন, ম্যাডাম?”

প্রিয় রেলিংয়ে সামান্য ঝুঁকল। পরিচ্ছন্ন আকাশে শহুরে ঘ্রাণ। প্রিয় বড়ো করে একটা শ্বাস টেনে বলল, 
-“ভীষণ ভালো। আপনি?”
-“এতক্ষণ ভালো। আপনার ‘ভালোর’ পাশের ‘ভীষণ’ বিশেষণটা আমার ভালো থাকার পরিমাণটা বাড়িয়ে দিয়েছে।”

প্রিয় হাসে,
-“তাই?”
-“জি।”
-“এবার বলুন তো, এভাবে লুকিয়ে-চুরিয়ে ছবি তুললেন কেন?”
-“একটা দারুণ স্মৃতি ক্যাপচারের জন্য।”
-“আপনি কি জানেন নীরজ ভাই, আমি স্মৃতিবন্দী পছন্দ করি না?”
-“আপনি কি জানেন প্রিয়, আপনি দুঃখ ভুলতে সুখের স্মৃতি বারংবার মনে করতে পছন্দ করেন?”

প্রিয় থমকে যায়। তার পছন্দের এত সূক্ষ্ম জিনিসও শরতের নরজ এড়ায়নি বলে সামান্য অপ্রস্তুত হয়। শরৎ বলে ওঠে,
-“খাওয়া-দাওয়া হয়েছে রাতে?”
-“উম..আপনার?”
-“হ্যাঁ। এখন আবার ঘুমাবেন?”
-“উম.. পরে।”
-“কেন?”
-“কথা বলতে ভালো লাগছে নীরজ ভাই, আসেন দুটো সুখ-দুঃখের গল্প করি।”

ওপাশ থেকে শরতের কণ্ঠটা কেমন যেন শোনাল,
-“ঘুমান এখন। শুভ রাত্রি।”

প্রিয়কে কিছু বলতে না দিয়েই শরৎ কল কেটে দিলো। প্রিয় স্তব্ধ বনে দাঁড়িয়ে রইল। যাহ! এটা কী হলো? পরপরই শরতের ম্যাসেজ আসে,
-“এভাবে কখনও ঘুম থেকে উঠে আমায় কল দেবেন না, ঘুমভাঙা চোখমুখ নিয়ে আমার সামনে আসবেন না, প্রিয়।”

প্রিয় জিজ্ঞেস করল, 
-“কেন?”
-“আমি নিয়ন্ত্রণ হারাই। প্রথমত আপনি আমার প্রিয় নারী। দ্বিতীয়ত আপনি আমার শখের নারী।”

প্রিয় কিঞ্চিৎ লজ্জা পেলেও তা প্রকাশ করল না। বরঞ্চ পালটা প্রশ্ন করল নিজেকে ভীষণ স্বাভাবিক দেখিয়ে,
-“প্রিয় নারী আর শখের নারী—দুটো শব্দ আলাদাভাবে মেনশন করলেন কেন? একই না?”
-“না, ম্যাডাম। ভাবার্থ ভিন্ন। প্রিয় তো অনেকেই হয়, শখের সবাই হতে পারে না। বলতে গেলে শখের সবকিছুই আমাদের প্রিয় অথচ প্রিয় সব শখের নয়। আপনি দুটোই।”

প্রিয় পুনরায় কল দিলো। শরৎ রিসিভ করেই জিজ্ঞেস করলাম,
-“আমাকে জ্বালাতে খুব ভালো লাগে আপনার, তাই না?”

প্রিয় ঠোঁট চেপে হাসে। শরৎ আর কিছু বলল না। ছাদে শীতলপাটি বিছিয়ে বসে ছিল। এখন এক হাত মাথার নিচে রেখে টুপ করে শুয়ে পড়ল। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইল।
প্রিয় নিজেও আকাশের দিকে তাকাল। জ্যামজটবিহীন একটা রাস্তা। একে-অপরের বিপরীতে একটা নির্দিষ্ট সিরিয়াল মেইনটেইন করে একাধারে অসংখ্য ল্যাম্পপোস্ট। এদিকের ল্যাম্পপোস্ট তিনটা নষ্ট হয়েছে বোধহয়। জ্বলছে না। দূরের আলোয় আবছা অন্ধকার রাস্তাটির অন্ধকারত্ব পরিষ্কার, আর ঠিক উপরের দিকটায় একটা ভীষণ সুন্দর বাঁকা চাঁদ। থমথমে নিরবতায় প্রিয় শরতের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দগুলো উপলব্ধি করতে শুরু করল। চমকে উঠল তৎক্ষণাৎ। অস্থির ভঙ্গিমায় শরৎকে বলল,
-“শুভ রাত্রি।”

তারপর কল কাটল। আচমকা কল কাটায় শরৎ কান থেকে ফোন সরিয়ে একবার সামনে নিয়ে এলো। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। কল ব্যাক করল না। পরপর পাশে রেখে টানটান হয়ে শুয়ে হাসতে লাগল৷ 

তারপর প্রিয় আবারও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডি-অ্যাক্টিভেট করে ফেলল। নয়তো বেশি বেশি হতে হতে লাগবে শরতের সাথে। হুমায়ুন আহমেদ স্যার বলেছেন, ভালোবাসার মানুষের খুব বেশি কাছে যেতে নেই। 
শরৎ ওর ভালোবাসার নয়, তবে পছন্দের এবং অত্যাধিক প্রিয়ও বটে। প্রিয় ছাদে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে লাগল। অস্থির মন শান্ত হলে রুমে এসে শুয়ে পড়ল। ঘুমোনোর আগে আরেকবার যখন ফোন হাতে তুলল। হোয়াটসঅ্যাপে একটা ম্যাসেজ শো হলো,

“কার কাছ থেকে পালাচ্ছেন, ফুল? আমার অনুভূতিকে পছন্দের বেলিফুল ভেবে ডায়েরির পাতায় সযতনে ফেলে রাখতে আপনি পারেনই। তবে নিজেরটা? আপনার অনুভূতি আপনায়য় ক্ষণে ক্ষণে কিছু মিষ্টিক্ষত দেবে। আপনাকে জানাবে, আমাদের গল্পটা কোনো অপ্রেমের নয়। আমাদের দারুণ একটা প্রেমের গল্প হবে। আপনি প্রস্তুত?”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp