রাতটা থানায় কাটানোর পর, পরদিনই বেরোনোর ব্যবস্থা হয়ে যায় শ্রেয়ানের। ভোর করে পুলিশ স্টেশনে আসেন আনোয়ার রহমান। ছেলেকে ছাড়ানোর সব কাজ সম্পন্ন করে একবার শ্রেয়ানের দিকে তাকান। শ্রেয়ান ভীষণ সাদা-মাটাভাবে বসে বসে এদিক-ওদিক দেখছিল, যেন কিছুই হয়নি, দিনটা অন্যান্য দিনের মতোই। বাবাকে আসতে দেখেও স্বাভাবিক রইল। মুচকি হেসে বলল,
-“ভালো আছেন, বাবা?”
ছেলের এমন অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে জিভের সাথে তালুর ক্ষণ-সন্ধির দরুন, ‘চ্যাহ’ উচ্চারণে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এমন বেয়াদব, অসভ্য একটা ছেলে তার! ভাবতেই লজ্জা পান নিজের ওপর। টুকিটাকি কাজ সেড়ে নিতে লাগেন। শ্রেয়ান জানত তিনি আসবেন, আর এই ভোরেই চলে আসবেন। ফর্মালিটির শেষ দিয়ে আনোয়ার সাহেব আর পিছে তাকালেন না। দাম্ভিক পায়ে হেঁটে স্টেশনের বাইরে পার্ক করা গাড়িতে গিয়ে বসে পড়লেন।
শ্রেয়ান খুবই শান্ত ভঙ্গিমায় এক-পা দু-পা করে বেরোতে লাগল। সময় নিয়ে গাড়ির কাছে এলো। এরপর ব্যাকসিটে বাবার পাশে বসে পড়ল। ড্রাইভার নাহিদ গাড়ি স্টার্ট দিলো। মিনিটের মধ্যে এরিয়াটা ছেড়ে এলে আনোয়ার সাহেব সোজা শ্রেয়ানকে শুধালেন,
-“মেয়ের নাম?”
শ্রেয়ান হামি তুলে মাথা চুলকালো। এক গাল হেসে বলল,
-“প্রিয়শ্রী।”
-“পরিচয়?”
-“ভার্সিটিতে, আমার জুনিয়র ছিল ও।”
-“কয় বছরের সম্পর্ক?”
-“গতমাসে ছয় বছর হলো।”
-“কীসে পড়ে এখন?”
-“মাস্টার্সের এক্সাম দিলো গতমাসে।”
-“কম্পলেইন এসেছে তুমি নেশা করে তার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছ।”
-“করেছি।”
-“কম্পলেইন তার ফ্যামিলি মেম্বার করেছে?”
-“না।”
-“মেয়ে নিজেই?”
-“হ্যাঁ।”
-“কেন?”
-“কারণ কাল ব্রেকআপ হয়ে গেছে।”
বড়ো একটা শ্বাস টেনে আনোয়ার সাহেব শ্রেয়ানকে বললেন,
-“ব্রেকআপের কারণ?”
-“বোকা মেয়ে চালাক হয়ে উঠেছে, বাবা। এর চেয়ে বড়ো কারণ খুঁজে পেলাম না।”
-“তুমি নির্দোষ?”
-“আমার চোখে সবসময় আমি নির্দোষ।”
-“সেই মেয়েটির চোখে?”
-“আমি দোষ করতে করতে সীমা অতিক্রম করেছি। আমি নারীকে অপশনে রেখেছি। আমি একাধিকের সাথে মন বিনিময় করেছি।”
এ-সব তাঁর অজানা নয়। তবে ছেলেটা যে ছয় বছর একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে ছিল—এ যেন অষ্টম আশ্চর্য! ধাঁধায় পড়ে গেছিলেন তিনি। সেই ধাঁধা মিলল, শ্রেয়ানের ‘বোকা মেয়ের চালাক হয়ে উঠেছে’ বলায়। মেয়েটার জন্য ভীষণ মায়া লাগল আনোয়ার সাহেবের। ছেলেকে তিনি ছোটবেলা থেকেই আদরে রাখতে পারেননি। বড়ো হয়েও তাই শাসনের অধিকার আর রাখেন না। তবুও অসংখ্যবার শ্রেয়ানকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন এসব থেকে দূরে আসতে। শ্রেয়ান বরাবরই মুচকি হাসি দিয়ে সরে যেত।
তারপর আর না পেরে শ্রেয়ানের ওপর নজরদারি করার লোক রেখে দেন। প্রতিটি গার্লফ্রেন্ডের ব্যাপারে জেনে, তিনি শ্রেয়ানের সেই গার্লফ্রেন্ডদের সাবধান করতেন। তাদেরকে শ্রেয়ান সম্বন্ধে জানাতেন সবটা। তারপর তারা নিজ থেকেই সরে যেত। এভাবেই চলছিল। অথচ ছয় বছরের এই সম্পর্কটা কীভাবে চাপা পড়ে থাকতে পারল, তার মাথায় আসে না।
তার প্রশ্ন করার আগেই শ্রেয়ান হেসে উঠল,
-“আমার রিসেন্ট ২-৪টা টাইমপাস করা গার্লফ্রেন্ড বাদে বাকিদের কারো খবরই আপনার কাছে যায়নি, বাবা। আমি আপনার টাকা দিয়েই আপনার লোককে কিনেছি।”
সরু চোখে তাকালেন আনোয়ার সাহেব। থেমে থেমে বললেন,
-“কেন? তুমি সিরিয়াস এর ওপর?”
-“নিঃসন্দেহে।”
-“তবে বাকি মেয়েরা?”
-“ডিফরেন্ট টেস্ট করতে থাকি, যাতে একজনে বিরক্ত হয়ে না যাই।”
-“তোমার কি মনে হয় না, তুমি মেয়েটার সাথে ভুল করছ?”
-“আমার দিক থেকে আমি ঠিক। যদি তোমার কিংবা অন্য কারো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা লাগে, তবে হয়তো আমি সর্বোচ্চ ভুল।”
আনোয়ার সাহেবের রাগ লাগতে লাগল। কীভাবে কীভাবে যে নিজেকে সামলে আছেন, তার চেয়ে ভালো আর কেউ জানেন না। শ্রেয়ান এ-পর্যায়ে ঠোঁটের ভাঁজে তর্জনী ও মধ্যমার স্পর্শ রেখে হাসি চাপতে লাগল। শব্দটা কিঞ্চিৎ আনোয়ার সাহেবের কানে পৌঁছাতেই তিনি প্রলম্বিত শ্বাস ছেড়ে ছেলেকে শুধালেন,
-“মেয়ে তোমাকে চায়?”
-“ওর নাম প্রিয়শ্রী বাবা, আপনি প্রিয় ডাকবেন। ‘মেয়ে’ সম্বোধনটা কেমন কটু শোনায়। আর ও আমাকে চায় না।”
-“তবে ওর পিছে আছ কেন?”
-“কারণ আমি ওকে চাই।”
-“তাহলে বাকি মেয়েদের ছাড়ছ না কেন?”
-“আমার নজর একেকসময় একেকদিকে ঘুরলেও, অবসরে ওর দিকেই স্থির হয়। আমি কী করব? আমার দোষ?”
আনোয়ার সাহেব অত্যন্ত নরম গলায় বললেন,
-“তুমি চাইছ কী, আশফিক?”
শ্রেয়ান মলিন চাহনিতে তাকায় তাঁর দিকে, বলে,
-“প্রিয়শ্রীকে চাই। জানেন, বাবা? বোকারা ভালোবাসতে জানে। প্রিয়শ্রী বোকা ছিল। ভালোবেসেছিল। যার কিঞ্চিৎ ভালোবাসা আমার বাকি গার্লফ্রেন্ডদের কারো মাঝে পেলে, আমি হয়তো আর ওর দ্বারে যেতাম না।”
-“ও তোমাকে চায় না।”
-“আমি চাই, এটাই কি শক্ত কারণ হতে পারে না ওকে পাওয়ার?”
-“পারে না। দূরত্ব বাড়াও।”
-“নয়তো?”
-“আমি কঠোর হব।”
শ্রেয়ান আনোয়ার সাহেবের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল।
—————
প্রিয় গতরাতে ভাই কিংবা মা, কাউকেই কিচ্ছুটি জানায়নি। রুমে এসে মেডিসিন নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সকালে প্রিয় যখন নাশতা করতে এলো, তখন দেখল পরিস্থিতি ঠান্ডা বেশ। বাবা অফিসে চলে গেছেন। বাড়িতে প্রহর, নাহারা, আর মেড আছেন।
প্রিয় দেখল, প্রহর ডাইনিংয়ে বসে খাবার খাচ্ছে। প্রিয় চেয়ার টেনে পাশে বসে পড়ল। কোমল গলায় জানাল,
-“শুভ সকাল, প্রহর।”
প্রহর খেতে খেতে বলল,
-“শুভ সকাল।”
নাহারা রান্নাঘর থেকে বাইরে এসে প্রিয়র সামনে দাঁড়ালেন। খাবার বেড়ে দিতে লাগলেন। প্রিয় বলল,
-“সব এত স্বাভাবিক কেন?”
প্রহর বলল,
-“ঝামেলা করার মতো কিছু হয়নি।”
-“আমাকে কেউ এই নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবে না?”
-“তোর ইচ্ছে হলে তুই নিজ থেকেই বলবি। এখন তোর ইচ্ছে নেই, আমরাও জানতে চাইব না।”
মায়ের চুপ থাকাটাও যে ভায়েরই কাজ, সেটা প্রিয় ধরতে পারল। ধাতস্থ হয়ে শ্বাস ছেড়ে নাহারাকে বলল,
-“বাবাকে কীভাবে সামলালে?”
-“কিছু একটা বলেছি।”
-“মা, রেগে আছ?”
-“না। তবে চিন্তা হয়।”
-“চিন্তা কোরো না। সব ঠিক হয়ে গেছে।”
-“যায়নি। ছেলেটা শীঘ্রই আবারও আসবে।”
প্রিয় তা জানে, তাই চুপ থাকে। নাহারা ওর পাশে চেয়ার টেনে বসে পড়ল। উৎসুক নয়নে তাকিয়ে রইল কিয়ৎক্ষণ। তারপর বলল,
-“একটা বিয়ে করবি?”
প্রিয় হেসে ফেলল তৎক্ষণাৎ। বলে উঠল,
-“তুমি এভাবে বললে যেন, এখন একটা বিয়ে করি, পরে আবার ইচ্ছে আবার একটা করব।”
-“পরে ইচ্ছা হলে করিস। এখন একটা কর।”
প্রিয় হাসতে হাসতে খেতে লাগল। নাহারা জোর দিলো,
-“কী? কর না, মা! আমি নইলে শান্তি পাব না।”
প্রিয় খেতে খেতেই বলল,
-“আচ্ছা ঠিকাছে। কিন্তু এটাই শেষ। এরপর আর বিয়ে করতে বলবে না।”
এবার প্রহর হেসে ফেলল৷ নাহারা ওদের দুষ্টমিতে তাল মেলালেন,
-“ঠিকাছে, আর বলব না। এটা পছন্দ হবে শিওর।”
-“আচ্ছা।”
-“আমি তবে সব ব্যবস্থা করি?”
-“করতে থাকো। বাট আমার কিছু কন্ডিশন আছে।”
-“কী?”
-“সেগুলো আমি সোজা আমার জন্য চ্যুজ করা লোকটাকেই বলব।”
-“মাথায় কোনো দুষ্ট বুদ্ধি নেই তো?”
-“না, নেই।”
-“আমার তোকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না।”
-“বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। অন্যথায় বিয়ে ক্যান্সেল।”
ঘাবড়ে গেলেন নাহারা। তখনই কলিং বেলের আওয়াজ এলো। নাহারা গিয়ে দরজা খুলে শরৎকে দেখতে পেলেন। ওমনিই ক্লান্তি সব উবে গেল তাঁর। ঠোঁটের কোণায় এক টূকরো হাসি ঝুলিয়ে বলল,
-“বাবা, এসেছ? আসো ভেতরে।”
শরৎ সালাম দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। নাহারা সালামের জবাব দিয়ে দরজা আটকে ফেলে ওকে বললেন,
-“এত দেরি করলে কেন? সকালে আসার কথা ছিল তোমার।”
-“আন্টি, একটু অফিশিয়াল কাজ সেরে আসতে হয়েছে। তাই দেরি হয়ে গেল।”
-“আচ্ছা, ফ্রেশ হয়ে ডাইনিংয়ে বসো।”
-“না না, আন্টি খেয়েছি।”
-“এ-বাবা! কেন? তোমাকে সকালে আসতে বলেছি বলে কত কিছু রান্না করলাম।”
-“ব্যাপার না, আন্টি৷ পরে খাওয়া যাবে।”
প্রহর এগিয়ে এসে শরৎকে জড়িয়ে ধরল। কিছু ফর্মালিটিস পূরণ হতেই শরৎ আঁড়চোখে প্রিয়র দিকে তাকাল। তারপর নাহারাকে বলল,
-“আন্টি, শুনুন।”
-“বলো, বাবা।”
-“ডাইনিংয়ের চেয়ারের ওপর দশ বছরের অভুক্ত বাচ্চার মতো ছটিয়ে ছিটিয়ে খাবার খেতে থাকা মেয়েটার চোখে কি আমি ইনভিজিবল? একবার এসে সালামটাও দিলো না। কী অভদ্র!”
শরতের গলায় নাহারা রসিকতার আভাস পেলেন। ঠোঁট চেপে হেসে প্রস্থান ঘটালেন। প্রিয় তবুও এদিকে তাকাল না। খেতে খেতে বিরবির করল,
-“বেয়াদ্দব ব্যাটালোক!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………