শুক্লপক্ষের পরিশেষে - পর্ব ৪০ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

শুক্লপক্ষের পরিশেষে - নবনীতা শেখ
ঘরোয়াভাবে বিয়ে পড়ানো হলো প্রিয়র। প্রিয় পুরোটা সময়ই চুপ ছিল, অনুত্তেজিত ছিল। শরৎ লক্ষ করেছে সবটা। বিয়ে পড়ানো শেষে এক ফাঁকে এসে বলল,
-“লিখিতভাবে আপনার সুখ-দুঃখের ভাগ নিলাম, প্রিয়।”

প্রিয় তাকাল না শরতের দিকে। শরৎ হেসে ফেলল,
-“রাগ?”

প্রিয় ছোট্ট করে জবাব নিল,
-“উঁহু।”
-“তবে?”
-“মনে হচ্ছে, লাইফটা হুট করেই পালটে যাচ্ছে।”
-“অস্বাভাবিক নয়।”
-“ভালো লাগছে না।”
-“মন খারাপ?”
-“সম্ভবত।”
-“আচ্ছা।”
-“কী?”
-“আমি তো মন ভালো করার দায়িত্বটাও নিয়েছি।”

প্রিয় চকিতে তাকাল শরতের দিকে। শরৎ ফোনে কাকে যেন ম্যাসেজ করল। তারপর বলল,
-“এগোতে থাকুন, ফুল। চলতি পথটার কাটা সরিয়ে দিয়ে ফুল বিছানোর জন্য আমি ২৪/৭ আপনার একান্ত মানুষ হয়ে আছি।”

প্রিয় উদ্বেগপূর্ণ গলায় শুধাল,
-“কী করতে চাইছেন, নীরজ ভাই?”

শরৎ হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল। সেকেন্ডের কাটা ঘুরছে, ঘুরতে ঘুরতে একই স্থানে ফিরে আসছে। পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়াটিতে নজর স্থির রেখে সে প্রিয়কে বলল,
-“হারানো সবকিছু ফিরিয়ে দিতে চাই। যা হারিয়েছ, তার চেয়েও দারুণ কিছু এনে দিতে চাই। শুরুটা আজ হোক। শেষটা আমার মৃত্যুক্ষণ হোক।”

এর ঠিক ঘন্টাখানেক পর শরৎ একটু কাজের বাহানায় বাড়ি থেকে বেরোল, সঙ্গে প্রহরও এলো। অপজিটের রোডে দুইজনে দাঁড়াতেই বাইকে করে একটা ছেলে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। হেলমেট খুলে সামনে শরৎকে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলল, প্রহরকে দেখে কোঁচকানো ভ্রু শিথিল হলো। হেসে জড়িয়ে ধরল প্রহরকে। জিজ্ঞেয করল,
-“কী-রে ব্যাটা! এত ইমার্জেন্সি ডাকলি? কলে তেমন কিছু জানাসওনি।”

প্রহর পরিচয় করিয়ে দিলো,
-“ভাইয়া, আসলে নীরজ ভাইয়া বলেছিল তোমাদেরকে কল দিতে।”
-“আমাদেরকে? আর নীরজ ভাই মানে?”

প্রহর কিছু বলার আগেই শরৎ এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেকের উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-“আমি নীরজ। প্রিয়র সদ্য বিয়ে করা বর।”

চমকে উঠল শাওন,
-“ও না অন্য কারো সাথে সম্পর্কে ছিল? যার জন্য আমাদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করল!”

শরৎ হেসে বলল,
-“একটা টক্সিক রিলেশনের স্থায়িত্ব খুব একটা বেশিদিন থাকে না। তুমি কি খুশি নও?”

শাওন হাত এগিয়ে শরতের সাথে হ্যান্ডশেক করে লম্বা একটা হাসি ফেলে বলল,
-“খুশি না মানে? ব্রেকাপ কবে হইছে, দুলাভাই?”
-“সম্পর্ক খারাপ হয়েছে বছর ২-৩ আগে থেকেই। অফিশ্যিয়ালি ব্রেকাপ হলো একমাস আগে।”

শাওন হাতটা বুকে ছুঁইয়ে বলল,
-“কী যে খুশির একটা খবর দিলেন না, দুলাভাই? শান্তিতে কাউকে ধরে দুইটা চুম্মা খাইতে ইচ্ছা করতেছে। বাট আ'ম স্টিল সিংগেল নাও। এই প্রহইর‍্যা! একটু এদিকে আয় তো, চুম্মা দিই।”

প্রহর দু'কদম পিছিয়ে বলল,
-“উঁহু ব্রো, আই হ্যাভ মাই গার্লফ্রেন্ড! সে আবার ফ্রেশ জিনিস পছন্দ করে।”

শাওন এগিয়ে গিয়ে প্রহরের কাঁধ জড়িয়ে বলল,
-“আরেহ শালা, প্রেম করে ফেলছিস? বড়ো ভাইদের আগে ক্যামনে করলি? কলিজা কাঁপল না? দেখি তো তোর কলিজাটা! কয় হাতের বানাইছোস।”

কেশে উঠল শরৎ,
-“শাওন, শোনো!”

সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল শাওন,
-“জি দুলাভাই, বলেন।”

ইতস্তত করতে করতে শরৎ বলল,
-“প্রহরকে শালা বোলো না। ওর একমাত্র বোনের সাথে একটু আগেই আমার বিয়ে হয়েছে।”

শাওন খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠল,
-“স্যরি দুলাভাই! গালতি সে মিস্টেক!”

নতমুখী হয়ে হাসল শরৎ। কিছুক্ষণের মধ্যে তমা আর দিশাও চলে এলো। দিশা কোচিংয়ে ক্লাস নিচ্ছিল, সেখান থেকে দৌড়ে চলে এসেছে। আর তমা ঘুমাচ্ছিল। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। কেবল জামাটাই চেঞ্জ করে চলে এসেছে। ওদের এই অবস্থা দেখে শাওন সবার আগে দশ মিনিট হেসে নিল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসল। চোখ বন্ধ করে এক হাত পেটে অন্য হাতের তর্জনী ওদের দিকে তুলে হো হো করে হাসল। আবার ফুটপাথের উঁচু জায়গাটায় বসে পড়ে হাসল। ওর হাসি চলতে থাকা অবস্থায় শরৎ আর প্রহর মিলে তমা আর দিশাকে পুরো ঘটনাটা এক্সপ্লেইন করল। শেষে এ-ও বলল, প্রিয় প্রতিমুহূর্তে নিজের ভুলের জন্য আফসোস করে, সবচেয়ে বেশি মিস করে তার বন্ধুমহলটা!

তখন সবার একটাই প্রশ্ন। যদি এতই মিস করেছে, তাহলে একটা ম্যাসেজ অবধি দিয়ে কেন জানায়নি? দূরত্ব তো শ্রেয়ানের জন্যই মাঝে দেয়াল করেছিল, তবে শ্রেয়ান যাওয়ার পর কেন এমুখো একবার হয়নি?

জবাবে নিশ্চল আওয়াজে শরৎ বলল,
-“ওই যে? সংকোচের দেয়াল তৈরি হয়ে গিয়েছিল।”

বিপরীতে সবাই চুপ। শরৎ সবাইকে সবটা ভালোমতো বোঝাল। সেই সাথে জানাল, শ্রেয়ান বিষয়ক কোনো প্রশ্ন যাতে না করা হয়। সবাই তাতে রাজি। 

—————

গেস্ট রুমে মনোহরার সাথে প্রিয় বসে বসে কথা বলছিল। প্রিয়র পরনে নাহারার একটি গাঢ় নীল রঙের বেনারসি কাতান। সে শাড়ির আঁচল সামলাচ্ছে। আজ নাহারা পরিয়ে দিয়েছিল। তাই কেমন যেন হয়ে আছে। ঠিক করতে করতে খেয়াল করল কেমন আওয়াজ আসছে। চেনা আওয়াজ, পরিচিত আওয়াজ। ভীষণ রকমের!

প্রিয় উঠে দাঁড়ায়, ধীরে পায়ে দরজার সামনে দাঁড়াতেই তমা, দিশা ও শাওনসহ প্রহর ও শরৎও এসে ওখানে দাঁড়ায়। প্রিয়র পা জমে যায়। মুখটা হা হয়ে যায় প্রিয় তিন বন্ধুদের একসাথে দেখে। অন্যমনস্ক ভঙ্গিমায় এক হাত দিয়ে অন্য হাতের পিঠে চিমটি কেটে এর সত্যতা প্রমাণ করল। 

প্রিয়কে এভাবে দেখেই তমা এগিয়ে আসে,
-“কী রে, বন্ধু? দিশার সাথে দেখি তুমিও বিয়ে করে ফেললে? সিঙ্গেল কি আমি আর শাওন্যাই রইলাম?”

শাওনও এগিয়ে এলো,
-“মামা, দাওয়াত দিলা না? এই তুমি বন্ধুশিপ করছিলা আমাদের সাথে? দোস্ত যেমন-তেমন। দুলাভাইটা মনের মতন। কাচ্চির দাওয়াত বঞ্চিত করা থেকে রক্ষে করল। এই খুশিতে তোর জন্য এক্সট্রা দোয়া। ডজনে ডজনে বাবুর আম্মু হ।”

দিশা এগিয়ে এসে একপাশে জড়িয়ে ধরল প্রিয়কে। জড়ানো আওয়াজে বলল,
-“আই মিস ইউ, প্রিয়।”

তমা আর শাওনও নরম হলো। একত্রে বলল,
-“উই মিস ইউ মোর, আওয়ার হার্ট!”

প্রিয়র চোখ জলে ছলছল করছে। কিঞ্চিৎ হা হয়ে থাকা মুখটা এখনও সেভাবেই। বিশ্বাস হচ্ছে এখনও। চরম অবিশ্বাস নিয়ে যখন শরতের দিকে তাকাল, দেখতে পেল ওপাশের দেয়ালে দেলান দিয়ে দু-হাত বুকে গুঁজে শরৎ দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাদা শার্ট, চোখে মাইনাস পাওয়ারের মোটা ফ্রেমের গ্লাস, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, সামান্য বড়ো চুল কপালে উঠে আছে। প্রিয়কে নিজের দিকে তাকাতে দেখে শরৎ হাসল, চোখের পলক ঝাপটিয়ে আশ্বাস দিলো,
-“আপনার সুখের দিন আসছে, প্রিয়। এখন আর দুঃখ আপনায় ছুঁতে পারবে না। ছুঁবে কেবল সুখ আর আমি।”

—————

চলে যাওয়ার আগমুহূর্তে প্রিয় আলাদা ডেকে নিয়ে শরতের সামনে কিছু কন্ডিশন রাখে। তন্মধ্যে সবচেয়ে ওপরে ছিল,
-“নীরজ ভাই, আগামী ছ'মাস আপনি আমার সাথে কোনো ধরনের কন্ট্যাক্ট রাখবেন না।”

নির্বিকার ভঙ্গিমায় শরৎ তাকিয়ে রইল। নরমভাবে শুধাল,
-“আপনি বলবেন আর আমি তা মেনে নেব? আমাকে আমার বউয়ের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করতে বলার মতো আপনি কোন মনিষী?”

প্রিয় থতমত খেয়ে গেল। একটু আগেই তো, বিয়ের আগেই শরৎ প্রিয়র সব শর্ত মেনে নিল। এখন আবার পল্টি খাচ্ছে কেন? প্রিয়র অমন চাহনি দেখে শরৎ সরু চোখে তাকিয়ে বলল,
-“দেখা-সাক্ষাৎ, আহ্লাদ, এসব করব না ঠিক আছে। বাট নিয়ম করে রাতে অফিস থেকে ফিরে কল দেবো। পিক করতে এক মিনিট দেরি হলে, সোজা তুলে নিয়ে বাসায় চলে আসব।”

প্রিয় মুখ কুঁচকে ফেলল, রেগে গিয়ে বলল,
-“এই! আপনি কথা ঘোরাচ্ছেন কেন? এটা তো কথা ছিল না!”

বাঁকা হেসে শরৎ বলল,
-“বউয়ের খোঁজ রাখার একটা দায়িত্ব আছে না?”
-“লাগবে না এত খোঁজ।”
-“সেটা আমি বুঝে নেব।”
-“নীরজ ভাই!”
-“বিয়ে করা বর আমি, ভাই ডাকো কোন সুখে?”

প্রিয় দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
-“ভালো হবেন না আপনি?”
-“ইহজন্মে না। আর আপনিও আমার সব কথা মেনে চলবেন, বুঝেছেন?”

হাপিত্যেশ করে প্রিয় বলল, 
-“এইজন্য বিয়ে করতে চাইনি। বিয়ের পর সবার বিহেভিয়ার ঠিক এভাবেই চেঞ্জ হয়ে যায়। এভাবেই! আপনিও বদলে গেলেন, নীরজ ভাই। এমন তো ছিলেন না।”

শরৎ দু-কদম এগিয়ে প্রিয়র দু-বাহু ধরে সোজা করে ওকে দাঁড় করায়। প্রিয়র ফরসা মুখটিতে আতঙ্কের গাঢ় লাল প্রলেপ। শরৎ প্রিয়র গাঢ় বাদামী জ্বলজ্বলে চোখটিতে দৃষ্টি স্থির করে বলল,
-“আমি আপনার, প্রিয়। ইউ ক্যান ইউজ মি এভরি সিঙ্গেল ওয়ে, ইউ লাইক। একবার ট্রাই করেই দেখুন। আপনার অধিকার আদায় করে নিতে জানতে হবে। আর রইল ভালোবাসা? আমাদের মাঝে তা কোনো অংশেই কম নেই।”

প্রিয় থমকানো নজরে তাকায়। শরৎ মাঝের দূরত্ব আরও খানিকটা ঘুচিয়ে ফেলে। প্রিয়র এলোমেলো চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে, কপালে লম্বা করে একটা চুমু খায়। ঠোঁট কপালে ঠেকিয়ে প্রলম্বিত একটি শ্বাস টানে। পরপর মুচকি হেসে বলে,
-“আজ আসি, বিবিজান? আমাদের পরের দেখাটাও শীঘ্রই হবে। অপেক্ষা করুন।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp