শুক্লপক্ষের পরিশেষে - পর্ব ৩৭ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

শুক্লপক্ষের পরিশেষে - নবনীতা শেখ
প্রিয় জবাব না দিয়ে জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে রইল, অতঃপর সামান্য হাসল। একইভাবে শরৎও হেসে বলল,
-“আমিও।”

প্রিয় কপাল কুঁচকে ফেলল হাসতে হাসতে। এক আকাশ সমান অনিশ্চয়তার সাথে শুধাল,
-“আপনারও কোনো এক্সমেক্স কিংবা টক্সিক মোমেন্টাম ছিল নাকি?”
-“আপনার ছিল।”
-“আমারটা তো ছিলই, এখনও পিছে দৌড়াচ্ছে। এজন্য আমি উঠতে-বসতে সেন্টি খাই। বাট হুয়াই ইউ?”
-“কারণ আমার মানুষটার কষ্ট আমি তার থেকেও বেশি উপলব্ধি করতে গিয়ে হাড়কাঁপানো কষ্টে দুমড়ে যাই।”

ভেতর থেকে প্রিয় কেঁপে উঠল। শরৎ কিছু বলল না। সোজা তাকিয়ে ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ দিলো। অনেকটা সময় নিস্তব্ধতার নামে লিখে দেওয়ার পর প্রিয় কেশে উঠল,
-“উহুম উহুম!”

শরৎ আড়ালে হাসে,
-“বলুন কী বলবেন। নার্ভাস হচ্ছেন কেন? আমরা-আমরাই তো।”

প্রিয় নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
-“আপনি সব কিছুতে মাত্রাতিরিক্ত করা শুরু করছেন, নীরজ ভাই। আমাদের মধ্যে একটা ভালো বন্ডিং আছে। এর বেশি কিছু আই গ্যেস পসিবল না। আপনার এসব কথায়, এসব ব্যবহারে আমি ভীষণ অপ্রস্তুত হই। আমার খারাপ লাগে।”

শরৎ গাড়িটা একটা ফুচকার স্টলের সামনে পার্ক করল। তারপর নিজের সিটবেল্ট খুলে প্রিয়র দিকে ঘুরে শান্ত হয়ে বসে বলল,
-“ফার্স্ট অব্ অল, আমাদের মধ্যে কী আছে—আমার চেয়ে বেশি আপনি ভালো জানেন। আমাদের মধ্যে একটা ভালো বন্ডিং আছে। আর এর চেয়েও ওপরে কিছু একটা আছে। প্রিয়, সেটা না বোঝার মতো অবুঝ আপনি নন। অ্যান্ড সেকেন্ডলি, আপনি মানুন বা না মানুন, আমি মানি আপনি আমার মানুষ। আর...”

প্রিয় শুধাল,
-“আর?”

শরৎ প্রিয়র চোখে চোখ স্থির রেখে বলল,
-“আর নিজের মানুষকে স্পেশ্যাল ফিল করানোর জন্য আই ক্যান ডু দ্য ওয়োর্স্ট ক্রাইম এভার। ট্রাস্ট মি! প্রসঙ্গ যখন আপনার মুখের এক চিলতে হাসির, আমি মানুষ খুন করতেও রাজি।”

প্রিয় অকপটে বলে ফেলল,
-“শ্রেয়ানকে খুন করতে পারবেন?”

ফিক করে হেসে ফেলল শরৎ,
-“এতদিনে অবশ্যই করে ফেলতাম। যদি না ওর মৃত্যু আপনার মনে বিন্দুমাত্র মন-কেমনের উৎস তৈরি করত। প্রিয়, আপনি অস্বীকার করতে পারেন না—আপনার হোল লাইফকে নরকে ঠেলে আপনি সেই একটি মানুষকে এক জন্মের সব ভালোবাসা একযোগে দিয়ে গিয়েছিলেন।”

প্রিয় অস্বীকার করার সামর্থ রাখে না। লম্বা করে একটা শ্বাস টেনে সেই কথার রেশ ধরেই বলে,
-“আপনার কথাটা লক্ষ করুন। সেই একটি মানুষকে এক জন্মের সব ভালোবাসা একযোগে দিয়ে গিয়েছি! আপনাকে দেওয়ার মতো আর কিছুই বাকি নেই, নীরজ ভাই।”

প্রিয়র আওয়াজ অত্যন্ত মলীন। শরৎ মুচকি হেসে বলল,
-“চেয়েছি আমি?”
-“কী?”
-“ভালোবাসা!”

প্রিয়র স্থিরতায় শরৎ বলে ওঠে,
-“আমার ধারণা—আমার একার অনুভূতি দু'জনের জন্য এনাফ। আপনি যেভাবে আমার থেকে দূরত্ব বাড়াতে পারেননি, সেভাবে আমি কাছে আসাতেও একচুল নড়বেন না। আমি এগোচ্ছি, আমাকে এগোতে দিন। আপনি পেছাতে পারছেন না, স্থির দাঁড়িয়ে থাকুন।”

শরৎ প্রিয়র থেকে আর কিছু না শুনেই উঠে পড়ল। এ পাশের ডোর খুলে প্রিয়কে বেরোতে বলে জানাল,
-“ফুচকা খাবেন, প্রিয়? শুনেছি—মেয়েরা পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শন প্রেমিক পুরুষকে রিজেক্ট করতে পারলেও, ফুচকাকে পারে না।”

প্রিয় মুচকি হাসল। ফুচকাতে তার মাত্রাতিরিক্ত লোভ। সে বিকেলে তারা পুরো ঢাকার প্রায় সব ফেমাস প্লেসগুলোর স্ট্রিটফুড ট্রাই করল। সন্ধ্যের শহরে রিকশা নিয়ে ঘুরল। রাত করে ফুটপাত ধরে স্ট্রিটলাইটের আলোয় অনেকটা পথ হাঁটল। প্রিয় আজ বাঁধা দেয়নি। উলটো নিজেও মন খুলে ঘুরে-ফিরে কাটিয়েছে। 
ফেরার পথে শরৎ অনেকটা সময় প্রিয়র হাসিমুখটার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার কাছে মনে হয়েছে, সে অনন্য কিছু দেখছে। পৃথিবীটা কতটা সুন্দর! 
প্রিয়কে বাড়ি পৌঁছে একবার বলেছিল,
-“পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফুল, শুনুন! দিন কেমন কাটল?”

প্রিয় হেসে ফেলে বলেছিল,
-“অসম্ভব সুন্দর।”

শরৎ বিমুগ্ধ চোখে প্রিয়র গালের টোল আর থুতনির ভাঁজ দেখে যায়। সুহাসিনী সে! শরৎ মুগ্ধতা দুচোখে স্থির রেখে বলল,
-“আমাকে একবেলা পেয়েই দিনটা অসম্ভব সুন্দর, একজনমের জন্য পেলে কী হবে ভেবেছেন?”

প্রিয়কে অপ্রস্তুত করে দিয়ে শরৎ গা দুলিয়ে হেসে ফেলে। রাস্তার মাঝে শরতের হাসি যান্ত্রিক কোলাহলের জন্য ফিকে হয়ে পড়েনি। বরঞ্চ আরও আকর্ষণীয় ঠেকছিল। নিষিদ্ধ ও আকর্ষণীয় যেন পরস্পর সমানুপাতিক সম্পর্কে আবদ্ধ। প্রিয় আর পিছে না ঘুরে সোজা বাসায় ঢুকে পড়ে। ফরসা গাল দুটো লাল টকটকে হয়ে আছে। শরৎ চালাক খুব! অনেক কিছু ধরে ফেলবে।

এভাবে শরতের অসম্ভব ভালোবাসার কাশফুল হয়ে কয়েকটা মাস কেটে গেল। প্রিয় আর শরতের মাঝের সম্পর্ক সেই আগের মতোই ঝুলন্ত আছে। প্রিয় এগোয়নি আর। নিজের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। শরৎ কদম কদম এগাতে এগোতে প্রিয়র খুব কাছে এখন। প্রিয় মুখ ফেরাতে পারে না। ওদের প্রতিদিন দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। নিয়ম করে রোজ কথা হয় না। এই তো, প্রিয়র অবসরে কল্পপুরুষ দেখা না দিলে সে টুপ করে শরৎকে একটা ম্যাসেজ পাঠিয়ে বসে,
-“নীরজ ভাই? অনলাইনে আছেন? আসেন একটু কথা বলি। সিরিয়াস কথা কিন্তু।”

এই বলে শুরু করে দুনিয়ার যত আজাইরা কথা বলা যায়, প্রিয় ঘণ্টা-খানেক ভরে বলে যায়। শরৎ তখন ভীষণ চমৎকার রকমের শ্রোতা হয়ে সব শোনে। প্রিয়র কথা শেষ হলে মিষ্টি হেসে বলে,
-“এভাবে হুটহাট আমার দিনগুলোকে সুন্দর বানানোর জন্য আপনাকে শতকোটি ফুলের ভালোবাসা।”

প্রিয় কল কেটে দেয় ঠিক তখনই। শরৎ আর কল ব্যাক করে না। নিজ থেকে ম্যাসেজও দেয় না। দুইদিন, তিনদিন, সাতদিন, পনেরো দিন পর হলেও প্রিয় নিজ থেকে আবার আরেকটা ম্যাসেজ করবে, কল দেবে, ঘন্টাখানেক বকবক করবে। এটা নিয়ম। শরৎ নিয়ম মেনে চলে, প্রিয় নিয়ম পালনের জন্য উৎসুক থাকে।

—————

আজ সন্ধ্যেয় প্রিয় যখন একটা নন-একাডেমিক বই পড়ছিল, তখন হুট করেই মনে পড়ল শ্রেয়ানকে দেওয়া ছয়টি মাসের মধ্যে আজই শেষ দিন। সে তড়িঘড়ি করে ক্যালেন্ডার দেখল দিলো। ওই তো! মার্ক করা! হ্যাঁ, আজই!
খুশিতে প্রিয়র ভেতরটা হালকা হয়ে এলো। শ্রেয়ানের সাথে দূরত্ব খুব বেড়েছে। ও কথা বলতে চাইলেও প্রিয় আগ্রহ পায় না। তার চেয়েও বেশি অনাগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে ক'দিন আগে শ্রেয়ানকে পানশীতে আরেকটা মেয়ের সাথে বসে থাকতে দেখে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ফোন হাতে তুলল। সুইচ অফ করে রেখেছিল। সুইচ অন করতেই শ্রেয়ানের অগণিত কলের নোটিফিকেশন আসতে লাগল। ম্যাসেজ আসছে, কল আসছে। প্রিয় ধীরে-স্থিরে কল ব্যাক করল। ওপাশে যেন শ্রেয়ান ফোন হাতেই বসে ছিল। সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করে বলল,
-“ফোন অফ কেন, বেবি? ডোন্ট ইউ নো, কতটা মিস করি তোমায়?”

প্রিয় ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বসে বলল,
-“হ্যাঁ, বলো।”
-“কী করছ?”
-“বিশেষ কিছু নয়।”
-“প্রিয়শ্রী, মিট করবে?”
-“নাহ।”
-“কেন?”
-“এমনি।”
-“সবসময় এরকম করো কেন? দেখা করতে বলেছি, ইউ শ্যুড লিসেন। তা না করে যা ইচ্ছে করছ!”

প্রিয় কিছু বলল না। শ্রেয়ান একাধারে অনেককিছু বলতে লাগল। প্রিয় হুট করেই জিজ্ঞেস করল,
-“লাস্ট কোনো মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিলে কবে?”

শ্রেয়ান অবাক হয়ে থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
-“বছর দুয়েক আগে। এরপর কথা হয়েছে অনেকের সাথেই, সেভাবে জড়াতে পারিনি।”
-“এই ইনটেনশনে লাস্ট কবে কোনো মেয়ের সাথে কথা বলেছ?”

অকপটে শ্রেয়ান বলে ফেলল,
-“দের বছর আগে।”
-“অ্যান্ড আই হেইট লায়ার্স।”

কথাটি বলে প্রিয় হাসল। শ্রেয়ান টের পেল, প্রিয় তার মিথ্যে ধরে ফেলেছে। প্রিয় তো ক'দিন আগেই একটা ক্যাফেতে শ্রেয়ানকে অন্য এক মেয়ের হাত ধরে বসে থাকতে দেখেছিল। বোকা প্রিয়! সে কি না সুযোগ দিতে চেয়েছিল। নিজের বোকামোতে আরও একচোট হাসল। খানিকটা ভড়কে শ্রেয়ান বলল,
-“ভুল বোঝো না, লেট মি এক্সপ্লেইন।”

ফটাফট প্রিয় বলে ফেলল,
-“তোমার ছয়মাস শেষ। আই রিয়ালাইজড, আই হ্যাভ ফিল নাথিং ফর ইউ।”
-“প্রিয়শ্রী, লিসেন..”
-“অ্যান্ড, ইট'স্ আপ!”

কল কেটে দিলো প্রিয়। অতঃপর সবখান থেকে ব্লক। শ্রেয়ান আবার জ্বালাতে আসবে এই বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত প্রিয়। কিন্তু এবার ভুল করবে না। এবার আর সুযোগ দেবে না। অযথা কাজ! সুযোগ দিয়েই বা কী লাভ?

ঠিক তার ঘন্টাখানেক পর প্রিয়র বাসার সামনে শ্রেয়ান এলো। নিচে দাঁড়িয়ে প্রিয়র নাম ধরে খুব জোরে ডাকাডাকি শুরু করলে প্রিয় আর রুমে বসে থাকতে পারে না। এগিয়ে যায় বারান্দায়। দেখতে পায়, আশে-পাশের বাড়ির মানুষেরা কেমন কৌতুহল নিয়ে জানালা-বারান্দায় মুখ উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে। প্রিয় ফট করে বারান্দার গ্লাস লাগিয়ে দেয়, এরপর পর্দা টেনে দেয়। আওয়াজ শুনে নাহারা আর প্রহর দৌড়ে প্রিয়র রুমে আসে। 

নাহারা অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে, 
-“এসব কী হচ্ছে প্রিয়, ও এখানে কী করে?”

প্রিয় নাহারার দিকে নরম চোখে তাকায়। পরপর দৃষ্টি শক্ত করে প্রহরের দিকে তাকিয়ে বলে,
-“এক্ষুনি পুলিশে কল দে।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp