শুক্লপক্ষের পরিশেষে - পর্ব ৩৬ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

শুক্লপক্ষের পরিশেষে - নবনীতা শেখ
-“কী? ভালো নেই? ছাই আছেন?”

প্রিয়ও আওয়াজ উঁচুতে তুলে বলল,
-“না, আপনার মাথা আছি। ব্যাঙের ছাতা। ছাতার মাথা।”

প্রহর আর আয়াত ওদের দিকে অবুঝের মতো তাকিয়ে রইল। শরৎ প্রিয়র রাগকে আরও দু'ধাপ বাড়িয়ে দিতে গা কাঁপিয়ে হেসে উঠল তখন। প্রিয় চেতে উঠল,
-“আশ্চর্য! আপনি এত ত্যাড়ামি করছেন কেন, নীরজ ভাই?”

নীরজ দু'কাঁধ উঁচিয়ে শুধাল,
-“কই?”
-“উফফ!”

প্রিয় অতিষ্ঠ। আর কিছু বলল না। শরৎও আর ওকে জ্বালালো না। ওয়েটার এলে ওরা খাবার অর্ডার দিয়ে ফেলে। এর ফাঁকে প্রিয়র ফোনে ম্যাসেজ আসে। প্রিয় দেখতে পায়, ওটা শরতের ম্যাসেজ,
-“সাদা পরেছেন কেন, প্রিয়?”

প্রিয় চোখ তুলে শরৎকে বড়ো স্বাভাবিকভাবে বসে থাকতে দেখে দাঁত কিড়িমিড়ি করে লিখল,
-“আমার ইচ্ছে।”
-“আমিও হোয়াইট। ডোন্ট ইউ নোটিস দ্যাট কাপল লাগছে?”

প্রিয় খেয়াল করল। আসলেই লাগছে। প্রিয়র চুড়িদারটা সাদা রঙের, ওড়নাটা নেভিব্লু। ইশ! কী বাজে ব্যাপার। প্রিয় অপ্রস্তুত বোধ করতে লাগল। শরৎ ফের ম্যাসেজ করল,
-“মন্দ হলো না। বিষয়টা সুন্দর।”
-“কচু সুন্দর।”
-“লাঞ্চে কচু খাবেন, প্রিয়? অর্ডার দেবো?”
-“আপনার মাথা খেতে ইচ্ছুক আমি। প্লিজ অর্ডার করুন।”
-“ওটা তো সারাক্ষণই খাচ্ছেন, ম্যাডাম। ট্রাই সামথিং নিউ।”
-“ছাই।”
-“ছাই দিয়ে কচু খাবেন?”
-“না ছাই দিয়ে মাথা খাব।”
-“এত মাথা খেতে হয় না। আসেন, ভাত খাই।”
-“নাহ, মজ্জা নাই লাইফে।”
-“ইউ নিড?”
-“কী?”
-“মজ্জা।”

প্রিয় ভাবল না, লিখে ফেলল,
-“ব্যাডলি নিড।”
-“ওকে ম্যাডাম। আজকের দিনটা তবে আপনার।”

প্রিয় আর কিছু বলার আগেই, শরৎ “ওয়েট, আসছি” বলে ওখান থেকে সরে এলো। রেস্টুরেন্টের পাশের ফ্লোর থেকে সিলিং অবধি কাঁচের গ্লাস। শরৎ সে গ্লাস স্লাইড করে করিডরে চলে এলো। এখানটায় রেলিং দিয়ে ছোট ছোট টবে বিভিন্ন রঙিন ফুল ঝুলিয়ে রাখা। শরৎ পকেট থেকে ফোন বের করে দক্ষ হাতে একটা নম্বরে ম্যাসেজ পাঠাল।
-“মিস্টার তায়েফকে বলে দেবেন আজ সন্ধ্যের মিটিংটা ডিলে হবে। নেক্সট ডেইট জানিয়ে দেবো।”

তারপর মেইডকে কল দিয়ে দিলো। বলল,
-“খালা, আজ রাতে কিছু বানানো লাগবে না। আমার ফিরতে দেরি হবে।”

আর সবশেষে গিয়ে কল দিলো নাহারাকে। কল রিসিভ করতেই সালাম দিলো শরৎ। নাহারা সালামের জবাব দিয়ে বলল,
-“ভালো আছ, বাবা?”
-“হ্যাঁ, আন্টি। আপনি ভালো আছেন?”
-“আলহামদুলিল্লাহ।”
-“প্রিয় আর প্রহর আজকে আমার সাথে ঘুরতে এসেছে, জানেন?”
-“হ্যাঁ, প্রহর বলেছিল। তোমরা একসাথে না?”
-“জি, আন্টি।”
-“আচ্ছা। কল দিলে যে? কিছু বলার ছিল? মনে তো হচ্ছে কিছু বলতে চাইছ!”
-“জি।”
-“বলো।”
-“বিশেষ কিছু নয়৷ আসলে ওদের ফিরতে আজ একটু দেরি হবে। এটা জানাতেই কল দিলাম।”
-“ওরা বড়ো হয়েছে তো, বাবা। ঘুরতে গিয়েছে। এখনও কি আগের মতো বলতে পারি, সন্ধ্যের আগে বাড়ি ফিরতে?”

শরৎ হাসল,
-“আপনি ভীষণ সুইট, আন্টি।”
-“তুমিও শুরু করলে? ছেলে-মেয়ে দুইটা তো এই কথা ডেইলি উঠতে বসতে বলে।”
-“হ্যাঁ, সত্য কথা দিনে চোদ্দবার বলা যায়।”
-“পাগল ছেলে!”

শরৎ হেসে ফেলল। নাহারা বলল,
-“আচ্ছা, এনজয় দ্য ডে!”
-“থ্যাংক ইউ!”

কল কেটে নিশ্চিন্ত হয়ে শরৎ ব্যাক করল। প্রিয়র দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে নিজের ফোনের দিকে নজর দিলো। ম্যাসেজ টাইপ করল,
-“একত্রে অনুভূতি চেনার যাত্রায় সর্ব প্রথম আমি আপনাকে স্ট্রিট লাইটের ধারে চা খাইয়েছি, আজ বরঞ্চ অন্য কিছু করি। বি রেডি।”

প্রিয় ম্যাসেজটা পেতেই ভ্রু-কুটি করে ফেলল। শুধাল,
-“কী করতে চাইছেন, নীরজ ভাই?”
-“আপনাকে আমার।”
-“যদি আমাকে আপনার করতে না দিই?”
-“তবে নিজেকে আপনার করে দেবো।”

প্রিয় বলার মতো কিছু পেল না। কিছুক্ষণের মাঝে ওয়েটার এসে খাবার সার্ভ করলে তারা খাওয়ায় মন দেয়। শরৎ বারে বারে আঁড়চোখে প্রিয়কে লক্ষ করে যাচ্ছে। বিষয়টা ধরতে পেরে প্রিয়র খাওয়া বন্ধ। প্রিয় অপ্রস্তুত হয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। প্রহরকে দেখছে। প্রহর আপনমনে খেয়ে যাচ্ছে, ওদিকে খাওয়া ভুলে আয়াত সোজাসুজিভাবে প্রহরের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখতেই পেয়েই প্রিয় বিষম খেল। শরৎ পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিলো। প্রিয় পানি খেয়ে ওর দিকে তাকাল। শরৎ বাঁকাভাবে হেসে নিজের প্লেটে নজর দিলো। 

খাওয়ার পালা শেষ হতেই প্রহর বলল,
-“ভাইয়া, আয়াত বলছিল ওর সাথে একটু বেরোতে হবে। তুমি কি আপুর সাথে থাকবে? কিংবা বাসায় ড্রপ করে দিয়ে আসতে পারবে?”

প্রশস্ত হেসে শরৎ বলল,
-“শিওর!”

আয়াত তখনই বলে উঠল,
-“আমি কখন বেরোতে বললাম...”

আয়াতের কথা শেষ করতে দিলো না প্রহর,
-“চল, আমরা বের হই। ভাইয়া, আপু! থাকো তোমরা।”

শেষ বাক্যটা শরৎ ও প্রিয়কে উদ্দেশ্য করে বলল। প্রহর ওদিক দিয়ে আয়াতের হাত ধরে বের হওয়ার তাড়া দিলো। আয়াতও কিছু বলল না আর। বের হয়ে গেইটের সামনে গিয়ে বলল,
-“এই বলদা, কই রে? আমি কখন তোকে বললাম বাইরে যাব?”

প্রহর ঠোঁট চেপে কোঁচকানো কপালে এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর বলল,
-“এত প্রশ্ন করতে নেই। কোথাও ঘুরবি আমার সাথে?”
-“কেন প্রশ্ন করব না?”
-“তুই কি চাস না আমার সাথে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করতে?”

আয়াত থতমত খেয়ে গেল। আমতাআমতা করতে লাগল। প্রহর হেসে বলল,
-“চল।”
-“কোথায় যাবি?”
-“রবীন্দ্র সরোবরে।”

—————

প্রহর আর আয়াত চলে গেলেই প্রিয় কুঞ্চিত চোখে শরৎকে দেখে বলল,
-“এটা কী হলো, নীরজ ভাই?”

শরৎ বিল পে করে উঠে দাঁড়াল। সামান্য কেশে বলল,
-“ট্রিক্সস।”
-“বুঝিয়ে বলুন।”
-“কেন? আপনি কচি খুকি? বোঝেন না?”
-“এই নীরজ ভাই? এই! মুখ সামলান।”
-“না-হয় কী করবেন, প্রিয়?”
-“ছাই!”
-“ছাই দিয়ে মুখ খাবেন? ওয়াও! ঠু মাচ সুশীল!”
-“ধ্যাৎ!”

প্রিয় মুখ ফিরিয়ে নিল। শরৎ মিটিমিটি হেসে যাচ্ছে। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরোনোর পর প্রিয় দেখতে পেল আজ শরৎ বাইক আনেনি, কার এনেছে। শরৎ ফ্রন্ট সিটের ডোর খুলে ভেতরে প্রিয়কে উঠতে বসতে বলল। প্রিয় বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল,
-“বাইক আনেননি কেন?”

শরৎ উলটো দিকে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসতে বসতে বলে,
-“সন্ধ্যেয় একটা মিটিংয়ের জন্য গাজিপুর যাওয়ার কথা ছিল। তাই ভাবলাম, ড্রাইভারসহ বের হই। গাড়িতে কিছুক্ষণ রেস্ট নেওয়া যাবে।”

প্রিয় মিররে নিজেকে দেখে বলল,
-“ড্রাইভার কই?”
-“আপাতত তার ছুটি দিয়েছি। তবে আপনার জন্য ড্রাইভার-রূপে স্বয়ং আমি নিজেই আছি।”

শরৎ লুকিং গ্লাসটা ঠিক করল। এখন তার কাছ থেকে প্রিয়কে দেখা যাচ্ছে, আর প্রিয় তাকালেই দু'জনের চোখাচোখি হচ্ছে। প্রিয় কেশে উঠল। জিজ্ঞেস করল,
-“আমাকে বাসায় ড্রপ করে দেবেন।”
-“জি না।”
-“কেন না?”
-“রাত হবে।”
-“এহ না! মা টেনশন করবে।”
-“পারমিশন নেওয়া আছে।”

প্রিয় কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
-“কখন নিলেন?”
-“কোনো এক সময়।”
-“উফফ!”
-“হালকা ভলিউমে সফট গান ছাড়ুন, আরামসে বসুন।”

প্রিয় গান ছেড়ে গা এলিয়ে বসল। শরৎ ড্রাইভ করতে করতে বলল,
-“আপনাকে শুনতে ইচ্ছে করছে, কথা বলুন।”
-“কী বলব?”
-“যা ইচ্ছে।”

প্রিয় কিছু বলছে না। সে ভাবছে, ঠিক কী বলবে। প্রিয়র ভাবুক চেহারা দেখে শরৎ মজা উড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“কবিতা পারেন? হাট্টিমা টিম টিম, তারা মাঠে পাড়ে ডিম, তাদের খাড়া দুটো শিং। পারেন? এটাই শোনান।”
-“নীরজ ভাইইইই!”

প্রিয়র হুট করেই চিল্লিয়ে ওঠাতে শরৎ হেসে ফেলে বলল,
-“এভাবে তো আপনার মা আমাকে ছেলে, আপনার ভাই আমাকে বড়ো ভাই বানিয়ে ফেলেছে। এখন আপনিও কি কিছু-মিছু বানাতে চাইছেন?”

প্রিয় মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
-“নাহ। আমার আপনার মতো ভাইয়ের প্রয়োজন নেই।”
-“তো? আমার মতো কীসের প্রয়োজন? নিড বেটার হাফ?”
-“নিড নাত্থিং!”

প্রিয় গাল ফুলিয়ে বসল। শরৎ তখন হাতিরঝিলে চলে এসেছে। লো স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে। একহাত স্টেয়ারিংয়ে, অন্যহাতে ফোন আনলক করে নোটপ্যাড বের করে প্রিয়র হাতে তুলে বলল,
-“এই কবিতাটা আবৃত্তি করুন। আপনার ভয়েসে শুনতে ইচ্ছে করছে।”

প্রিয় নরম হলো। শরতের ফোনটা নিজের হাতে তুলে নিল। আকাশে শীতল সমীর। গোধুলির নরম আলোয় প্রিয় একবার রাস্তার বাইরে তাকাল। ফের ফোনের দিকে দৃষ্টি স্থির করে পড়তে শুরু করল,

“এই শহরের অলিতে-গলিতে অসংখ্য হাহাকারের গল্প আছে। সন্ধ্যা নামলেই, স্ট্রিট লাইটের সাথে তা জ্বেলে ওঠে।
    ওরা আকাশ দেখে,
    ওরা উল্লাস দেখে,
    ওরা সুখ দেখে,
    ওরা যন্ত্রণা দেখে,
    ওরা হেসে-খেলে রিকশায় ঘুরতে থাকা কপোত-কপোতীদের চোখে তৃপ্তি দেখে,
    ওরা পথের ধারে বসে এক যুবকের বিচ্ছেদের নীরব অভিযোগ দেখে,
    ওরা ও বাড়ির বারান্দায় গভীর রাত অবধি এক মেয়েকে ফোন কানে গুঁজে কখনও হাহা-হিহি করতে, তো কখনও লজ্জায় নুইয়ে পড়তেও দেখে,
    ওরা এক মেয়েকে নিশ্চুপতায় অশ্রু বাহাতে দেখে,
    ওরা বন্ধুদের মাঝে সবচেয়ে বেশি লাজুক, বাধ্য, পড়াকু ছেলেটার ঠোঁট হতে বের হওয়া নিকোটিনের ধোঁয়াও দেখে,
    ওরা অসম্ভব চঞ্চল ছেলেটিকে রাত করে চুপ হয়ে যেতে দেখে,
    ওরা বিশ্বাস ভাঙতে দেখে,
    ওরা সবসময় ভুল মানুষের প্রতি ভালোবাসা দেখে,
    আড়ালে নিঃসঙ্গতায় কাউকে গুমরে কাঁদতে দেখে,
    ওরা আরও অনেক কিছু দেখে। 
    এই শহরের স্ট্রিটলাইট অসংখ্য গল্প জানে.. 
    ওরা দীর্ঘশ্বাস জানে, ওরা সাক্ষী...”

অতঃপর হুট করেই প্রিয়র গলায় কাঠিন্য চলে এলো। হিম হয়ে এলো দৃষ্টি। চকিতে তাকাল শরতের দিকে। ওর আবৃত্তি শেষ হতেই অন্যদিকে তাকিয়ে শরৎ বলল,
-“ওরা আপনার গল্পটাও জানে।”

প্রিয় প্রশ্ন করে,
-“আর আপনার?”
-“আমার কী?”

শরৎ হাসে। প্রিয় সুক্ষ্ম নজরে ওকে দেখে শুধায়,
-“আপনি ভালো আছেন, নীরজ ভাই?”

শরৎ পালটা প্রশ্ন করে,
-“আপনি ভালো আছেন, প্রিয়?”

প্রিয় জবাব না দিয়ে জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে রইল, অতঃপর সামান্য হাসল। একইভাবে শরৎও হেসে বলল,
-“আমিও।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp