ভীষণ শীতল এক সন্ধ্যেতে শরৎ অফিস থেকে ফিরে প্রিয়কে কল দিলো। বরাবরের মতো শুধাল,
-“কী করছেন, প্রিয়? আমি লেট আজ, তাই না?”
প্রিয় বারান্দায় বসে ছিল, আকাশ দেখছিল। পরনে একটা নীল পাড়ের লাল শাড়ি। নীল ফুল স্লিভসের ব্লাউজ। হাতে স্বর্ণের দুটো চিকন চুড়ি। নাকে ছোট একটা স্বর্ণদানা জ্বলজ্বল করছে। সকালে কিছু কেনাকাটা করার সময় কী মনে করে যেন প্রিয় গোল্ডের দোকানে ঢুকে পড়েছিল। চোখ গিয়ে আটকেছিল এই দুটো জিনিসে। নিজেকে তখনই তাতে কল্পনা করে নেয়, আর তারপর কিনে নেয়। সেই থেকেই পরে আছে সেসব। বাড়ি এসে সেই যে শাওয়ার নিয়ে শাড়ি পরে নিজেকে বউ সাজিয়ে নিয়েছে, এখনও ওভাবেই রয়েছে। তার ভেতর কেমন গিন্নিপনা দেখা যাচ্ছে! কণ্ঠটাও অত্যাধিক কোমল। চোখদুটোতে একরাশ স্নিগ্ধতা ছেয়ে আছে। এই তো সেদিন যখন দীর্ঘক্ষণ দু'জনের চোখাচোখির সন্ধিকাল ছিল, মুগ্ধতায় আবেশিত হয়ে শরৎ ছোট-ছোট অক্ষরে বলে বসেছিল,
-“পদ্ম, পদ্ম, পদ্মলোচনা আমার!”
আড়ষ্টতায় তখন প্রিয় কিংকর্তব্যবিমুঢ় বনে গেলেও আপাতদৃষ্টিতে এখন সে কিঞ্চিৎ হেসে ফেলল। কেন হাসল? ‘আজ’-কে চুপচাপ বসিয়ে রেখে ‘গতদিন’-এর গল্প ভেবে হাসল? পাগল মেয়ে!
শরৎ প্রিয়র নিশ্চুপতায় শুধাল,
-“ম্যাডাম, হাসছেন কেন?”
শব্দ হচ্ছিল না হাসির, দেখাদেখি হওয়ার সম্ভাবনাটাও তলানিতে। প্রিয়র হাসি থেমে গেল, পদ্মলোচনে চমক ফুটে উঠল। ম্লান হয়ে আসা সূর্যের আলো তখন প্রিয়র অবাক দৃষ্টিতে মিলন ঘটাল। নাকফুলটা মুখটার সৌন্দর্য কয়েক শতগুণ বাড়িয়ে তুলল। প্রিয়! গোধূলি কন্যা!
নিজস্বতায় চমক লুকিয়ে, থেমে থেমে প্রিয় শুধাল,
-“বুঝলেন কেন?”
হো হো করে শরৎ হেসে ফেলে বলল,
-“সেই পুরুষ কোনো পুরুষই নয়, যে নিজের নারীকে মুখস্ত না রাখে। প্রিয়, আপনি আমার ভীষণ শখের, আপনাকে আমি গোটাটা জানি।”
প্রিয় গা এলিয়ে দিলো দোলনায়। ভাঁজ করে কাঁধে তুলে রাখা শাড়ির আঁচলটা গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। বড়ো অবমূল্যায়ন করে বলল,
-“আপনি তো আমাকে পেয়েছেনই নীরজ, এখনও কীসের এত উপরি কথা-বার্তা?”
যেন কৌতুল শুনল শরৎ,
-“উপরি কথা? ম্যাডাম, আমি প্রেমিক নই, প্রেমিক হওয়ার বয়সটা আমার নেই। সো ওসব উপরি কথা বলাটা আমার সাথে যায় না।”
কথাটা বলে থামল সে, এই পর্যায়ে সামান্য দাম্ভিকতার সাথে বলল,
-“তবে একজন আদর্শবান ও ভীষণ দায়িত্বশীল স্বামী আমি। যার সর্বোপরি দায়িত্ব হলো স্ত্রীকে সন্তুষ্ট রাখা। স্ত্রী যদি দুটো রসিকতায়ও খুশি হয়, তবে তাই করা। বেশি বেশি তার প্রশংসা করা। আমি আপনার প্রশংসায় কোনো ত্রুটি রাখব না, আমি আপনাকে কখনও অসন্তোষে রাখব না।”
কথাটায় কিছু না কিছু ছিল, প্রিয়র কথাখানা চাপা পড়ল। আমতা-আমতা করতে লাগল। শরৎ গলার টাইটা ঢিলে করে সোফায় কাউচে এলিয়ে বসে পড়ল। ক্লান্ত আওয়াজে বলল,
-“কী করছেন? কী, প্রিয়?”
জবাবে প্রিয় প্রসঙ্গক্রমে নিজের মতামত দিলো,
-“নীরজ, চলুন সোশ্যাল ম্যারেজ করি। কার্ড ছাপাতে বলুন। আজ ৯ তারিখ। আগামী শুক্রবার, ২০ তারিখ আমরা বিয়ে করব।”
বোধহয় ক্লান্তি মাথায় চড়ে গেছে তার। ভাবখানা এমন করে চোখ দু-খান বুঁজে ফেলল। পরক্ষণেই বড়ো বড়ো করে তাকাল সে। আওয়াজ যথেষ্ট স্বাভাবিক তার। নিশ্চিত হতে শুধাল,
-“আবার বলেন।”
ঘাবড়ে গেল প্রিয়,
-“মানে.. বলছিলাম.. এভাবে বিবাহিত ব্যাচেলর থাকাটা কেমন একটা না?”
শরতের দু-চোখের মুগ্ধতা ভরপুর। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। স্পষ্ট দু-চোখে ফুটে উঠেছে তার প্রিয়তমা স্ত্রীর লাজুক মুখখানা। ক্ষণিকের মুগ্ধতা ও আবেশে দু-চোখ জুড়িয়ে এলো, বুঁজে নিল, ফের বলল,
-“আবার শুনতে চাইছি, ফুল।”
প্রিয় থমকে যায় সহসা। দোল খেতে থাকা দোলনাটাও মেঝে ও পায়ের ঘর্ষণে থামিয়ে দেয়। সময় নেয়। নিজেকে অত্যাধিক কোমল করে তোলে। অপরিমেয় নমনীয়তার সাথে বলে,
-“বিয়ে করতে চাই।”
হাসল শরৎ,
-“উঁহু, এভাবে না।”
-“সোশ্যালিজম মেইনটেইন করি, চলুন।”
-“পারব না।”
-“আমাকে জ্বালাচ্ছেন, নীরজ?”
-“উঁহু। সঠিকভাবে বলেন।”
-“উফফ! আর কী?”
-“ম্যাচিউরিটি সাইডে রাখেন।”
-“কীভাবে?”
-“যেভাবে চাইছি আপনাকে, ঠিক ওভাবে।”
অতঃপর প্রিয় না ভেবে বড়ো করে একটা শ্বাস টেনে বলল,
-“আমার ভীষণ ম্যাচিউর জীবনে এক মুঠো পাগলামি হিসেবে আপনাকে চাই। যখন-তখন দুজন পাগল হব, রাত-বিরেতে ছাদে বসে থাকব, রাস্তা দিয়ে হাঁটব, বৃষ্টিতে কাঁদায় মাখামাখি করব, অকারণে হাসব, দীর্ঘশ্বাস ফেলতে যাওয়ার আগ মুহূর্তে চাওয়া-পাওয়ার হিসেবে বসব, প্রাপ্তির আকাশটিতে আমার এখন একজন মানুষ আছে। তা ভেবে আবারও হেসে উঠব। আমি বুঝতে পেরেছি, একা থাকাটা ভীষণ টাফ। আই গ্যেস.. আই গ্যেস আই নিড ইউ..”
এক চিলতে সুখ শরতের আওয়াজে,
-“অ্যান্ড দ্যাটস হাউ, আই ওয়ান্টেড ইউ!”
প্রিয় ত্বরিতে কল কেটে দিলো। তারপর সেই যে বিছানায় গা এলালো, আর উঠল না। উবু হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকাকালীন হুট করেই আজ বহুদিন পর প্রিয়র কল্পপুরুষের আগমন ঘটল, আচমকা! তার মুখটা কেমন উদাসীন। সে সোজা হয়ে পাশে শুয়ে পড়ল। প্রিয় তা লক্ষ করে বলল,
-“বহুদিন বাদে এলে! কেমন আছ?”
কল্পনায় উত্তরগুলো প্রসঙ্গ কাটল,
-“খুব খুশি তুমি?”
প্রিয় ভাবল। সে কি আদৌও খুশি? ভেবে ভেবে উত্তর পেল না। তবে টের পেল, দুঃখে থাকার মতো তো কিছু হয়নি। কাত্ হয়ে শুয়ে থাকায় চুলগুলো মুখে বিছিয়ে পড়েছে, লাস্যময়ী চোখগুলোয় কত গল্প! প্রিয় কল্পপুরুষকে বলল,
-“খুব।”
-“শুভ কামনা নতুন জীবনের জন্য।”
প্রিয় হেসে ফেলল,
-“রেগেছ, প্রাণ?”
-“নাহ।”
-“তোমার চেহারার অভিব্যক্তি আমি আজ ধরতে পারছি না।”
-“পারার কথাও নয়।”
প্রিয় জড়িয়ে আসা আওয়াজে বলল,
-“কেন বলো তো?”
সে চুপ থাকল। প্রিয়র চোখে চোখ রাখল। চোখ ছোঁয়াতে লাগল কপালে, সিঁথিতে, ভ্রু-তে, গালে, নাকে এসে থেমে গেল। মিষ্টি হেসে বলল,
-“তোমার বরের মতো করে বলতে গেলে—বিবিজান লাগছে।”
প্রিয় আহ্লাদী হয়ে বলল,
-“তুমি ইদানিং দেখা দাও না কেন, প্রাণ?”
-“কারণ আমি দুঃখ।”
-“তবে বলছ, আমি সুখে আছি?”
-“বলছি।”
-“তাহলে তুমি আর আসবে না?”
-“আসব।”
-“কবে আসবে?”
-“যখন যখন তুমি যন্ত্রণায় কাতরাবে!”
-“বদদোয়া করছ?”
-“না।”
-“তবে?”
-“সত্য বলছি।”
-“কীভাবে।”
-“যেভাবে একটা মানুষ গোটা জনমভর সুখে থাকতে পারে না।”
প্রিয় প্রলম্বিত শ্বাস টেনে সোজা হয়ে শুয়ে রইল। সিলিংয়ে দৃষ্টি স্থির তার,
-“তোমাকে আমি ছাড়তে চাই না। পৃথিবীতে নিজের বলতে একমাত্র তুমিই আমার আছ।”
-“আমাকে তুমি হারাবেও না কখনও।”
প্রিয় ছলছলে চোখে তাকালে সে হেসে বলে,
-“ভেবে দেখো। আমি তোমার প্রিয় পুরুষ, বাস্তবে যার অস্থিত্ব নেই। বাস্তবে যে আছে, খুব শীঘ্রই সে আমার থেকেও অধিক প্রিয় হয়ে যাবে তোমার কাছে। তখন আমি আর তোমার মানুষটা অভিন্ন হব। মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে একজন হব।”
প্রিয় কিছুক্ষণ ভেবে জিজ্ঞেস করল,
-“তবে তোমার আওয়াজ আজ এত অভিমানী কেন?”
-“কারণ খুব শীঘ্রই এই আমিটা বিলীন হব।”
প্রিয় আঁতকে উঠে পাশে তাকায়, হালকা আসমানী রঙা বিছানার চাদরের ওপর তার সুতির শাড়ির নীলচে প্রান্তদেশ বাদে কিচ্ছুটি নেই।
—————
তুশি আজ বেশ সেজেছে। গায়ে কাঞ্জিভরম শাড়ি, হাতে বেশ মোটাসোটা বালা, গলায় জড়োয়ার হার৷ মিষ্টি মুখটিতে খুশি জ্বলজ্বল করছে। আজ শ্রেয়ানের মা-বাবার ম্যারেজ অ্যানিভার্সেরি উপলক্ষে বাড়িতে ছোটখাটো একটা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শ্রেয়ান অফিসে যায়নি আজ, বাসা থেকেই কাজ করছে। বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে, কোলে ল্যাপটপ, হাতের আঙুলগুলো বিক্ষিপ্তভাবে কী-বোর্ডে। মুখভঙ্গি সিরিয়াস।
তুশি বেশ মজা পেল। একবার আয়নায় নিজেকে দেখছে, নিজের গায়ের গয়না ঠিক করছে। আবার আঁড়চোখে স্বকীয় স্বামীকে দেখছে।
ধরা পড়ল ঠিক তখন, শ্রেয়ান সামনে দৃষ্টি স্থির রেখে বলল,
-“কী ব্যাপার? কিছু চাই?”
জিভে কামড় দিলো তুশি। আয়নার দিকে নিজেকে দেখতে লাগল। তারপর আবার সোজা হয়ে শ্রেয়ানের দিকে দু'কদম এগোল। সামান্য কেশে উঠল তুশি। শ্রেয়ান বলল,
-“হুঁ, বলো।”
-“বলছি, কেমন লাগছে আমায়?”
শ্রেয়ান তাকাল একবার। লাজুক মুখটিতে উপচে পড়া খুশি মেয়েটার। তা দেখে কিঞ্চিৎ হাসল, বলল,
-“সুন্দর দেখাচ্ছে।”
আহ্লাদিত হয়ে তুশি বলল,
-“আপনাকেও।”
-“তাই না?”
-“জি।”
শ্রেয়ান হো হো করে হেসে বলল,
-“থ্যাংক ইউ!”
অমন মনোমুগ্ধকর হাসি দেখে তুশির মুহূর্তেই মনে হলো, ‘আচ্ছা! তার স্বামী কি এভাবেই অন্যকারোর প্রশংসা করেছে? এভাবেই হেসেছে অন্যের জন্য?’
বুক ভার হয়ে উঠল তার। মুহূর্তেই তৈরি মলিনতা চেহারায় স্পষ্ট ফুটে উঠল। শ্রেয়ান তুশির ডানহাতের কবজি ধরে পাশে বসালো। নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
-“কী হয়েছে? মন খারাপ হলো কেন?”
সহসা স্বীকারোক্তি দিলো তুশি,
-“আপনি কি এভাবেই অন্য কাউকে সুন্দর বলতেন? অন্য কাউকে নিজের মেনে ভালোবাসতেন?”
ভালোবাসতো, নিজের মানতো, সর্বোচ্চতে প্রশংসা করতো! মেয়েটি ছিল প্রিয়। ছিল? এখন নেই? শ্রেয়ান নিজের ভেতর থেকে উত্তর পায় না। জবাবে কিছু বলতে পারে না। শ্রেয়ানের থেকে সান্ত্বনামূলক কধা শুনতে না পেয়ে তুশির মনটা কেঁদে ওঠে। তার স্বামীর দু-চোখ অন্য কারো জন্য মুগ্ধতা ছিল? সে কীভাবে মেনে নেবে এসব? চোখ ভিজে এসেছে। জল গড়িয়ে পড়বে। এমতাবস্থায় শ্রেয়ান বলে উঠল,
-“দুনিয়াতে সকল অনুভূতিই নশ্বর। অবিনশ্বর যদি কিছু থেকে থাকে, ওটা হলো—আমি তোমার স্বামী।”
তুশি আমোদিত হলো। বোকাবাবু শ্রেয়ান টের পেল না—“অনুভূতি সব অমর, তাদের মৃত্যু নেই, তারা ছাঁই হয়ে উড়ে যায়, মিশে যায় মাটিতে। প্রিয় তার অপ্রিয় অনুভূতি। যাকে সে নিজ দায়ে ভস্ম করেছে।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………