অতীত~
আমের ভিলায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা সাতটা বাজল প্রিয়তার। বসার ঘরে আসতেই অনুভব করল কেউ আছে রান্নাঘরে। শপিং ব্যাগগুলো সোফায় রেখে সোজা রান্নাঘরেই গেল ও। গিয়ে দেখল পাকোড়ার জন্যে মিশ্রণ বানাচ্ছে জ্যোতি। কারো উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ তুলে তাকাল জ্যোতি। প্রিয়তাকে দেখে মুচকি হাসল। পুনরায় নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে বলল, 'দেরী হল যে?'
উত্তরে প্রিয়তাও চমৎকার এক হাসি দিয়ে বলল, 'কুহুর জন্যে একটা স্যালোয়ার স্যুট কিনলাম বুঝলে। কিছুতেই পছন্দ হচ্ছিলোনা। অনেক খুঁজে অবশেষে পেলাম। ওনাকে আবার বলোনা আমার দেরী হয়েছিল। পরে আবার ক্ষেপে যাবে।'
জ্যোতি হেসে ফেলল, ' আচ্ছা বলবোনা।'
' নীরব-কুহু চলে এসেছে?'
' হ্যাঁ কিছুক্ষণ আগেই এলো। ভাবলাম তোমারও আসার সময় হয়ে এসছে। তাই একটু স্ন্যাকস বানাই। সবাই মিলে একসঙ্গে খেতে পারব। পরে ধীরেসুস্থে রাতের রান্নাটা করা যাবে।'
ওড়নাটা কোণাকুণি করে কোমরে বেঁধে নিল প্রিয়তা। প্যানটা চুলায় বসিয়ে গ্যাস অন করতে করতে বলল, ' তোমার না মাথাব্যথা করছিল? সে নিয়ে এসব করতে এলে কেন? নার্গিস খালা নেই?'
জেনেশুনেই অতি চতুরতার সাথে প্রশ্নটা করল প্রিয়তা। জ্যোতি ঠোঁট উল্টে বলল, 'কী জানি! ঘুম থেকে উঠে আর দেখতে পেলাম নাতো।'
' ওমা! সন্ধ্যা সন্ধ্যা কোথায় গেছে?'
' কী জানি! দেখো কোথায় গিয়ে আড্ডা জুড়ে দিয়েছে! গসিপিংয়েতো ওস্তাদ ঐ মহিলা। কখনও এর কাছে ওর নামে নিন্দা, ওর কাছে এর নামে নিন্দা। অসহ্য!'
প্যানে তেল ঢালল প্রিয়তা। আঁচ বাড়িয়ে দিতে বলল, 'আর করবেনা!'
ভ্রু কুঁচকে ফেলল জ্যোতি। প্রিয়তার দিকে তাকিয়ে বলল, 'কী করবেনা?'
' ভরসন্ধ্যায় গসিপিং। আজ এলে কড়াভাবে নিষেধ করে দেব।'
ফোঁস করে শ্বাস ফেলে আবার কাজে মন দিল জ্যোতি। ফুটতে শুরু করা তেলের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে হাসল প্রিয়তা। জ্যোতি বলল, 'তুমি আবার রান্নাঘরে কেন এলে? যাও ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নাও।'
' দূর! ঘরে গিয়ে কী করব? এখানেই ঠিক আছি। তোমার মাথাব্যথা কমেছে?'
' হ্যাঁ ঘুমোনোর পরেই কমে গেছে।'
' ব্যাংকে একা গিয়ে কিন্তু ঠিক করোনি তুমি। এখন থেকে গেলে সঙ্গে সাথে লোক নিয়ে যাবে। ঐরকম মাথাব্যথা নিয়ে একা ফিরেছো!'
' একা ফিরিনিতো! আজাদ ভাই পৌঁছে দিয়ে গেছে।'
' আজাত ভাই? তোমার কলিগ? বলেছিলে যে?'
' হ্যাঁ উনিই।'
পাকোড়ার শেপ করে করে ট্রেতে রাখল জ্যোতি। সেগুলো একটা একটা গরম তেলে ছাড়ছে প্রিয়তা। হঠাৎ প্রিয়তা বলে উঠল, 'আজাদ ভাই সম্পর্কে যতটা শুনেছি তোমার কাছে; উনি কিন্তু খুবই ভালো মানুষ। এবার কিন্তু তুমি ভেবে দেখতেই পারো আপু।'
হাত থেমে গেল জ্যোতির। পাকোড়ার মিশ্রণের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, ' সবকিছু কী এভাবে হয়?'
' না হওয়ার কী আছে? এভাবে আর কতদিন?'
' এভাবেইতো ভালো আছি বলো।'
' সত্যিই ভালো আছো?'
' অন্যকে জীবনে জড়িয়ে তাকেসহ খারাপ থাকার চেয়ে একা একাই খারাপ থাকাটা ভালো নয় কী?'
উত্তর দিলোনা প্রিয়তা। আবার পাকোড়া ভাজায় মনোযোগ দিল। জ্যোতিও নিজের কাজে মনোযোগ দিল। পরিবেশটা কেমন গুমোট হয়ে উঠল। নিস্তব্ধ পরিবেশে শুধু তেলে ভাজার আওয়াজ। স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে জ্যোতি সামান্য কৌতুক করে বলল, ' কী ব্যপার বলোতো? আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্যে এতো উঠে পড়ে লেগেছো যে? বরকে নিয়ে ইনসিকিউর ফিল করছো? ভাবছো সঙ্গীহীনতায় তোমার বরকে দুবেলা গিলে খাই?'
হেসে ফেলল প্রিয়তা, ' হ্যাঁ সেই। অমন চকলেট কেকের মতো বর থাকলেতো একটু ইনসিকিওর ফিল হবেই বলো।'
জ্যোতিও সমানতালে হাসল। সেই হাসির আড়ালে চাপা পড়ে গেল গভীর দীর্ঘশ্বাস, নির্ঘুম একেকটা রাতের চাপা আর্তনাদ; জীবনের প্রথম অনুভূতি, প্রথম আবেগ, প্রথম ভালোবাসার নিষ্ঠুর ব্যর্থতা।
জ্যোতির দৃষ্টি সরতেই ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে গেল প্রিয়তার। চোখে ভেসে উঠল চাপা ক্রোধ। পাতলা কমলা রঙা ঠোঁটজোড়া কঠিন শক্ত হয়ে জোড়া লেগে রইল। ফুটতে থাকা গরম তেলের মধ্যে স্ট্রাচুলা নাড়তে লাগল উদ্দেশ্যহীনভাবে। রুদ্রর প্রতি জ্যোতির এমন গদগদ প্রেম কোনকালেই পছন্দ ছিলোনা প্রিয়তার। এই মেয়েটা ওর শ্যামপুরুষকে দেখে মুগ্ধ হয়, তাকে দেখলে ওর হৃদস্পন্দন থমকে যায়, আড়ালে আবডালে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে ওর প্রিয় পুরুষের চোখ, মুখ, ঠোঁট, চুল, শরীরের প্রতিটা চলন। ব্যপারটা সহ্য হয়না প্রিয়তার। কোনভাবেই সহ্য হয়না। যখনই জ্যোতির চোখে ও রুদ্রর জন্যে অপার ভালোবাসা দেখে; ইচ্ছে হয় চোখদুটো তুলে ফেলতে। যখন জ্যোতির কন্ঠে রুদ্রর প্রতি প্রেম ঝড়ে পড়ে; ইচ্ছে করে ওর গলাটা টি-পে দিতে। কতটা কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখে তা কেবল প্রিয়তাই জানে।
রুদ্র আমের শুধুই প্রিয়র। তাকে অমন প্রেম নিয়ে দেখার অধিকার শুধুমাত্র প্রিয়তারই আছে। তাকে ভালোবাসার অধিকারটাও কেবলই প্রিয়তার। সে অধিকারে একাংশও অন্যকাউকে দিতে রাজি নয় প্রিয়তা। একদমই না।
স্ট্রুচুলাটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল প্রিয়তা। দাঁতে দাঁত পিষল। ইচ্ছে হল এই গরম তেলেই জ্যোতিকে ঝলসে দিতে। কিন্তু সেটা ও করবে না। তারও বহু কারণ আছে। গত দুবছর যাবত নিজের ধৈর্য্যশক্তির সর্বোচ্চ পরীক্ষাটা বোধ হয় প্রিয়তা এক্ষেত্রেই দিয়েছে।
———
' আরও একজন ডোনার আজ মারা গেছে। এই নিয়ে তিনজন! সবাই বলছে হার্ট অ্যাটাক। আমারতো ভিন্ন কিছু মনে হচ্ছে গুরু!'
কথাটা বলে ঠোঁট কামড়ে ধরল উচ্ছ্বাস। ফাইল থেকে চোখ তুলে তাকাল জাফর। গম্ভীর কন্ঠে বলল, 'মনে হওয়ার কিছু নেই। ইটস্ কোল্ড ব্লডেট মার্ডার!'
উচ্ছ্বাস বলল, ' আবার সেই একই খেলা খেলা হচ্ছে। আমাদের ভেতরকার ইনফরমেশনগুলো লিক হচ্ছে। কিন্তু কীভাবে? এতো বেশি গোপন তথ্য কেউ কীভাবে_'
কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই থমকে গেল উচ্ছ্বাস। ঝট করে রুদ্রর দিকে তাকাল। হোলস্টারে মাইক্রোফোন রাখার তাৎপর্য আজ সম্পূর্ণ পরিষ্কার হল ওর চোখে। রুদ্রর প্রতি জমে থাকা অবশিষ্ট অভিমানটুকুও আর রইল না।
জাফরের কন্ঠে বিচলিত ভাব চলে এলো এবার। রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, 'ব্যপারটা ভয়ংকর রুদ্র। সময় বেশি নেই আমাদের হাতে। এখনো কয়েক কোটি টাকা জোগাড় করা বাকি! ওরা আর কল দেয়নি ঠিকই। কিন্তু ডেডলাইনের একদিনও বেশি সময় ওরা অপেক্ষা করবেনা। লোক পাঠিয়ে দেবে বাংলাদেশে। আমি আমাদের কথা ভাবছিনা। কিন্তু কুহু মা, প্রিয়তা মা, নীরব ওদের কথা ভাবতে হবে। ওদের জীবন বিপন্ন হবে এসবের মধ্যে।'
রুদ্র চেয়ারে হেলান দিয়ে পায়ে পা তুলে বসে আছে। গম্ভীর শূণ্য দৃষ্টি। সিগারেট টানছে ধীরগতিতে। ওদের কথা শুনছে কি শুনছে না বোঝা মুশকিল। টাকার হিসেবে চোখ বুলিয়ে নিয়ে উচ্ছ্বাস আবার বলল, 'দুটো দল বেশি চাপ দিচ্ছে। ওদের ডেডলাইনটাও খুব কাছে। আমার মাথা কাজ করছেনা!'
এরপর নীরবতা নেমে এলো আমের ফাউন্ডেশনের রাশেদ আমেরের ঘরটাতে। কারো মুখে কোন কথা নেই। ঘন একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে হঠাৎই রুদ্র বলে উঠল, 'আমের মিলস্ আর ছাপাখানাটাগুলো সেল করে দাও!'
নীরব ঘরটাতে যেন বজ্রপাত হল। একই সঙ্গে বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকাল উচ্ছ্বাস আর জাফর। কিছুক্ষণ একটা শব্দও বের হলোনা দুজনের কারো মুখ দিয়ে। অনেকটা কষ্টে জাফর বলল, ' তোর মাথা ঠিক আছে?'
' এছাড়া আর কোন উপায় দেখতে পাচ্ছো তুমি কাকা?'
জবাব দিতে পারল না জাফর। সত্যিই কোন পথ পাচ্ছেনা ওরা এখন। যাদেরকে চাঁদার জন্যে রেডমার্ক করেছে তাদের তিনজনের কেউ গায়েব হয়েছে, কেউ খুন হয়েছে। বাকিদের কাছ থেকে যা টাকা তুলতে পেরেছে তাতে টার্গেট ফিল আপ হচ্ছেনা কিছুতেই। ক্লাইন্টদের কাছ থেকেও আশা করা এখন নিরাশা। সমানে প্রেশার দিয়ে যাচ্ছে হুসাইন আলী। এদিকে ক্ষেপে উঠেছে বিদেশী পাওয়ানাদার তিনটে দলই। যাদের মধ্যে দু'দলের ডেডলাইন খুবই কাছে। সত্যিই আর উপায় নেই। জাফর বিষণ্ন গলায় বলল, 'ভাইজানের এতো যত্নে তিলতিল করে তৈরী করা মিলস্ আর ছাপাখানা বেঁচে দিতে হবে! স্বপ্নেও কোনদিন কল্পণা করিনি এমন কিছু ভাবতেও হবে! হে আল্লাহ্!'
রুদ্রর ধীরগতিতে একবার চাইল রাশেদ আমেরের শূণ্য চেয়ারটার দিকে। একমুহূর্তের জন্যে মনে হল ওখানেই বসে আছে বাবা। সিগারেটে দক্ষ টান দিয়ে গম্ভীরভাবে ভেবে চলেছে কিছু একটা। এক্ষুনি অসাধারণ কোন সমাধান বলে বসবে লোকটা। বুকের ভেতরটা কেমন খা খা করে উঠল রুদ্রর। অদ্ভুত যন্ত্রণায় সবকিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে গেল।
উচ্ছ্বাস এখনো বিশ্বাস করতে পারছেনা রুদ্রর মুখ থেকে এই কথা শুনলো ও। রুদ্রর মুখ থেকে? ও কন্ঠে রাজ্যের অবিশ্বাস ঢেলে বলল, ' তুই ভেবে বলছিস?'
রুদ্র আধখাওয়া সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে পিষতে পিষতে বলল, 'হটকারী কোন সিদ্ধান্ত নেইনা আমি।'
কথা সত্যি। কিন্তু তবুও মেনে নিতে পারছেনা উচ্ছ্বাস। এই দলটার জন্যে নিজের সর্বস্ব বিসর্জন দিয়েছে ছেলেটা। নিজের জীবন, ভালোবাসা সব। অস্থির গলায় বলল, 'আর কোন উপায় নেই? আমরাতো পরিকল্পনা করেছিলাম ডেলিভারির সময় ওদের অস্ত্র ছিনিয়ে নেব আমরা। ঠিক একইভাবে। তার কী হলো? সে নিয়ে ভাবলে হয়না? সেইসব অস্ত্র বেঁচেওতো_'
থামতে হলো উচ্ছ্বাসকে। বাক্য সম্পূর্ণ করার মতো শব্দ খুঁজে পেলোনা ও। জাফরও সম্মতি দিয়ে বলল, ' ঐ বিষয়ে কী ভাবলি।'
রুদ্র নির্বিকারভাবে বলল, ' সেটা অনেক সময় সাপেক্ষ ব্যপার। অতোটা সময় দেবেনা ওরা আমাদের। তাই আর কোন উপায় নেই। আমার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আর বিন্দুমাত্র রিস্ক নিতে পারব না আমি। যথেষ্ট হয়েছে।
রুদ্রর কথা যৌক্তিক। কিন্তু অস্থির বোধ করল ওরা। উচ্ছ্বাস বলল, ' কিন্তু রিস্কতো থেকেই যাচ্ছে। দুটো দলের টাকা পরিশোধ করে দিলেও; ব্রানধুইস দলের টাকা পরিশোধ করা কিন্তু বাকি থাকবে। ওরা তেমন চাপ দিচ্ছেনা ঠিকই। কিন্তু যখন দেবে শ্বাস নেওয়ার সময়টাও দেবেনা। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দল কিন্তু ওটাই।'
রুদ্র এবারও নির্বিঘ্ন জবাব দিল, ' সেটা নিয়ে ভেবে এখনই মাথা নষ্ট করতে চাইছিনা আমি। যখনকারটা তখন দেখা যাবে। আপাতত এই দুটো ঝামেলা মেটানো প্রয়োজন। তাছাড়াও! এসব মিটে গেলে সোলার সিস্টেমের অস্তিত্ব এমনিতেই বিলীন করে দেব আমি। ছেড়ে দেব এসব। তখন আ এসব লোক দেখনো মিলস্, ফ্যাক্টরির প্রয়োজন পড়বেনা। আর পরবর্তীতে যদি ব্রানধুইসকে সামলাতে না পারি তবে_'
' তবে?'
' ছেড়ে দেব আমের ভিলা। সমাধান পাওয়ার আগ অবধি গা ঢাকা দিয়ে থাকব। আর বাড়ির বাকিদের মালয়েশিয়া পাঠিয়ে দেব। কাকীর কাছে।'
রুদ্রর এধরণের কথাবার্তায় চমকাতেও ভুলে গেল উচ্ছ্বাস আর জাফর। এবার থমথমে গলায় বলল, ' আর ওদের? ছেড়ে দিবি?'
জবাব দিলোনা রুদ্র। চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে ফেলল। উচ্ছ্বাসের কন্ঠ আরও ভারী হলো, 'তোকে দেখে আমার রুদ্র আমের বলে মনে হচ্ছেনা। এতক্ষণ ধরে দেখে চলেছি। ইন্সপেক্টর আজিজের মতো আমিও আমার চেনা সেই রুদ্রকে দেখতে পাচ্ছিনা তোর মধ্যে।'
ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল উচ্ছ্বাস। জাফরের চোখেমুখেও স্পষ্ট হতাশার ছাপ। আরও একবার পিনপতন নীরবতা নেমে এলো ঘরটাতে। সময়চক্রের এমন অদ্ভুত পরিবর্তন কিছুতেই মেনে নিতে পারল না ওরা। একটা সময় ছিল, এই সোলার সিস্টেম নামটাই যথেষ্ট ছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডকে কাঁপিয়ে তোলার জন্যে। সেখানে রাশেদ আমের ছিলেন রাজা। আর রুদ্র আমের? সে ছিল ভয় আর আতঙ্কের অন্যনাম! কিন্তু আজ সেই সোলার সিস্টেম ধ্বংসের পথে। রাশেদ আমের আর নেই। চেনা সেই রুদ্র আমেরকেও বড্ড অচেনা লাগছে! বহু খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছেনা সেই তেজ! যেই ধূর্ত মস্তিষ্কের অসাধারণ সব চালে ধরাসাই হয়ে যেতো শত্রুদল। সেই রুদ্র আমের আজ পরাজিত সৈনিকের ন্যয় আচরণ করছে। দিয়ে দাও, সব দিয়ে দাও! কোনদিন যা হয়নি যেন সেটাই হয়েছে আজ। হার মেনে নিয়েছে রুদ্র আমের। আর কোন আশা অবশিষ্ট নেই। শেষ, সত্যিই সবকিছু শেষ।
———
চট্টগ্রাম এসেছে সম্রাট। পরবর্তী মাল ডেলিভারির ডেইট নিকটে। সেসব নিয়েই কিছু কাজ চলছে। ঢাকায় সকালের মিটিংটাতে আরও একটা বিষয় নির্ধারিত হয়েছে। হুসাইন আলীকে হাত করতে হবে এবার। যেহুতু সোলার সিস্টেম তার সঙ্গে করা চুক্তি ভঙ্গ করেছে। তাকে তাতিয়ে দিয়ে নিজেদের দলে টেনে নেওয়ার কাজটা সহজ হবে। এবং এই কাজটা করবে রাণী। মাইক্রোফোনের মাধ্যমে রাণী জানতে পেরেছে আগামীকাল সন্ধ্যায় হুসাইন আলীর কাছে যাবে রুদ্র। কিন্তু তার আগেই ওদের যেতে হবে। আর সেই কাজটাও নিজেই করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাণী। কাল সকালেই হুসাইন আলীর কাছে যাবে রাণী। সোলার সিস্টেমের ধ্বংসের কফিনে শেষ পেরেগটা মেরেই আসবে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। এই মেয়ে যতই তেরিংবেরিং করুক। কোন কাজ একবার করবে বললে সেটা যেকোন মূল্যে করেই।
হোটেলের ব্যালকনি দাঁড়িয়ে থাকায় তীব্র ঠান্ডা বাতাস লাগছে। খালি গায়ে শুধু ট্রাউজার পড়ে দাঁড়িয়ে আছে সম্রাট। ঠান্ডায় কেঁপে কেঁপে উঠছে শরীর। রাণীর কথা আরও গভীরভাবে ভাবছে। মেয়েটা মাথা খারাপ করে রেখে দিয়েছে ওর। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেনা। আগেও কখনও পারেনি। কিন্তু তখন ও জানতো রাণী শুধুই ওর। কিন্তু এখন সেই নিশ্চয়তা দিতে পারেনা ও। রাণী কী সত্যিই এখন ওর?
বিট্রেনে থাকাকালীন এক রাতের কথা মনে পড়ল সম্রাটের। নাইট ক্লাবের দীর্ঘ পার্টি নাচানাচি, আনন্দ ফুর্তির পর মাতাল হয়ে কাউচে পড়ে ছিল দুজন। সম্রাট নিজের এক বাহুতে আবদ্ধ করে রেখেছিল রাণীকে। মাতাল অবস্থাতেই টুকটাক কথাবার্তা চলছিল দুজনের মধ্যে। প্রেম শুরু হলেও তখনও খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা হয়নি ওদের মধ্যে। প্রথমবারের মতোই রাণীর ঠোঁটে চুমু খেতে যাচ্ছিল সম্রাট। কিন্তু বাঁধা দেয় রাণী। মাতাল কিন্তু স্পষ্ট আওয়াজে জানায়, 'নট নাও!'
বিস্মিত সম্রাট প্রশ্ন ছোড়ে, 'কেন? আই নিড দিস।'
বলে এগোতে নিলে আবারও বাঁধা দেয় রাণী। শক্ত কন্ঠে জানায়, 'নো মিনস্ নো সম্রাট।'
' কারণটা জানতে পারি?'
' এতো সহজেই আমাকে ছোঁয়ার অধিকার কাউকে দেইনা আমি। তার জন্যে আরও অনেক সাধনা করতে হবে তোমাকে।'
সেদিনের কথাটা ভেবে তাচ্ছিল্য করে হাসে সম্রাট। সাধনা! অথচ রুদ্রর কাছে কত সহজেই বিলিয়ে দিয়েছে নিজেকে! কথাটা চিন্তা করে তীব্র শীতেও গা গরম হয়ে উঠল সম্রাটের। র-ক্ত যেন ফুটে উঠল টগবগ করে। তিরতির করে রাগ বাড়ল। অসহ্য লাগল সবকিছু।
ঠিক সেসময় ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো এক অর্ধন-গ্ন রমনী। কিছুক্ষণ আগে হোটেলের রুমটাতে মেয়েটাকে নিয়ে মৌজমস্তি করছিল সম্রাট। মেয়েটা পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল সম্রাটকে। প্রলুব্ধ করা স্পর্শ দিতে শুরু করল ওকে। কিন্তু এখন আর এসবের রুচি পেলোনা সম্রাট। ধাক্কা দিয়ে ছাড়িয়ে নিল নিজেকে। তিক্ত কন্ঠে বলল, 'টি-টেবিলে তোর টাকা রাখা আছে। নিয়ে বিদায় হ।'
অপমানে কালো হয়ে উঠল রমনীর মুখ। ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে একবার চাইল সম্রাটের দিকে। ধপধপ করে পা ফেলে বিদায় নিল।
সেসব নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই সম্রাটের। মাথায় শুধু একটা নাম ঘুরছে। রাণী! রাণী! রাণী!
———
আজ বাড়ি ফিরতে খুব বেশি দেরী করলোনা রুদ্র। এগারোটার মধ্যে ফিরে এলো। রুদ্র যখন ঘরে ঢুকল প্রিয়তা তখন ওয়াশরুমে। বন্ধ ওয়াশরুমের দরজার দিকে একপলক তাকিয়ে থেকেই জ্যাকেটটা খুলল রুদ্র। তখনই বেরিয়ে এলো প্রিয়তা। রুদ্রকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল। রুদ্র জ্যাকেটা খাটের ওপর ছুড়ে রাখল। বিছানায় বসে মোজা খুলতে শুরু করল। কিন্তু কিছু বলল না। প্রিয়তা হাতের তোয়ালেটা পাশে রেখে দিয়ে বলল, ' কখন এলেন?'
' মাত্রই।' এককথায় জবাব দিল রুদ্র।
' খেয়ে এসেছেন?'
' হ্যাঁ। টেক্সট করেছিলাম। দেখোনি?'
' দেখেছি।'
' খেয়েছো?'
' হ্যাঁ। কফি আনব? খাবেন?'
' না, ক্লান্ত লাগছে আজ। শুয়ে পড়ব।'
প্রিয়তা রুদ্রর জ্যাকেট আর মোজা জায়গামতো তুলে রাখল। রুদ্রও উঠে গেল ড্রেসিংটেবিলের কাছে। হাতের ব্রেসলেটটা খুলে রাখল। প্রিয়তা একটা ট্রাউজার আর স্যান্ডো গ্যাঞ্জি এগিয়ে দিল রুদ্রর দিকে। সেগুলো নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল রুদ্র। কিছু বলল না।
বিছানায় বসল প্রিয়তা। দীর্ঘশ্বাস ফেলল একটা। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওয়াশরুমের দরজার দিকে।
পাঁচমিনিটের মধ্যেই বেরিয়ে এলো রুদ্র। গিয়ে বন্ধ করল বারান্দার দরজাটা। বিছানায় উঠে কম্ফোর্টার গায়ে নিতে নিতে বলল, ' রাত হয়েছে। শুয়ে পরো।'
ঘাড় ফিরিয়ে রুদ্রর দিকে তাকাল প্রিয়তা। কম্বোর্টারের বাকি অংশটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে শুয়ে পড়ল। হঠাৎই পিনপতন নীরবতা ঘিরে ধরল ঘরটাকে। রুদ্র-প্রিয়তা দুজনেই সোজা হয়ে শুয়ে আছে দৃষ্টি সিলিংয়ের দিকে স্থির। সময় কেটে যাচ্ছিল এভাবেই। একমিনিট, দুইমিনিট করে করে দশমিনিট কেটে গেল। ঘুরল প্রিয়তা। রুদ্রর দিকে বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়ে আলতো গলায় ডাকল, 'রুদ্র?'
' বলো?'
প্রিয়তা মাথা তুলে একপলক তাকাল রুদ্রর দিক। অতঃপর রুদ্রর বুকে মাথা এলিয়ে দিয়ে বলল, ' অনেকদিন হলো কাছে টানেন না আপনি আমাকে। ভালোও বাসেন না।'
রুদ্র এক হাতে প্রিয়তার চুলগুলো নেড়ে দিতে দিতে বলল, 'তোমারতো সেরকমই চাওয়া ছিল।'
' চাওয়া বদলের কথাতো আপনাকে অনেকবার, অনেকভাবে বুঝিয়েছি আমি।'
' ঘুমাও!'
কিন্তু প্রিয়তা ঘুমোনোর চেষ্টাও করল না। মাথা তুলে উঁচু হল। চুমু খেল রুদ্রর গালে। আলতো করে মাথায় হাত বুলাল। রুদ্র আবারও গম্ভীর বলল, 'ঘুমিয়ে পড়ো, রাত হয়েছে অনেক।'
রুদ্রর কথা কানে তুলল না প্রিয়তা। আলতো করে নাক ঘষতে শুরু করল রুদ্রর বুকে। প্রথমে কিছুক্ষণ কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না রুদ্র। কিন্তু প্রিয়তার বেসামাল স্পর্শ বেশিক্ষণ স্থির থাকতে দিলোনা ওকে। রুদ্র প্রিয়তার দু বাহু আকড়ে ধরল। উল্টো ঘুরিয়ে শুইয়ে দিলো ওকে। প্রিয়তার দুপাশে দুহাতের ভর দিয়ে ঝুঁকল। ঘন ঘন শ্বাস ফেলল প্রিয়তা। অস্থির চোখে তাকাল রুদ্রর চোখে। রুদ্রর তীক্ষ্ম চোখদুটোও প্রিয়তার চোখের দিকে স্থির। বেশ অনেকটা সময় ধরেই চলল এই দৃষ্টি বিনিময়। রুদ্র নিজের তামাটে, শুস্ক ঠোঁটজোড়া এগিয়ে আনলো প্রিয়তার ভেজা, কমলাটে ঠোঁটের দিকে। রুদ্র যখন প্রিয়তার অধরোষ্ঠ স্পর্শের খুব সন্নিকটে; চোখজোড়া ধীরগতিতে বন্ধ করে নিল প্রিয়তা। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই নিজেকে থামিয়ে ফেলল রুদ্র। গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল প্রিয়তার মুখের দিকে। কিছুক্ষণ পর আস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকাল প্রিয়তা। দুচোখে প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর দিলোনা রুদ্র। সরে আসতে নিল। দুহাতে ওর গেঞ্জিটা আকড়ে ধরল প্রিয়তা। বিস্মিত কন্ঠে বলল, ' কী হলো?'
' কিছুদিন আগেই তোমার মিসক্যারেজ হয়েছে। তাও খুব বাজেভাবে। ইউ নিড টাইম।'
' কিচ্ছু হবেনা। আমি ঠিক আছি।'
' সেটা তোমার মনে হচ্ছে। ঘুমাও।'
রুদ্র সরে আসতে চাইলে আরও শক্ত করে ওকে আকড়ে ধরল প্রিয়তা। আকুতিভরা কন্ঠে বলল, 'প্লিজ রুদ্র।'
' বাচ্চামো করোনা। ঘুমাও!'
' রুদ্র!'
এবার খানিকটা ধমকে উঠল রুদ্র, ' আমার কাছে তোমার জেদ সবক্ষেত্রে খাটেনা প্রিয়তা। এর প্রমাণ তুমি আগেও পেয়েছো। রাত হয়েছে। ঘুমাও!'
অনেকেটা জোর করেই প্রিয়তার হাত নিজের গেঞ্জি থেকে সরাল রুদ্র। উঠে বসল হাত বাড়িয়ে তুলে নিল ফুলহাতা একটা গেঞ্জি। হনহনে পায়ে বেরিয়ে গেল নিজের রুম থেকে।ও জানে প্রিয়তা এখন কাঁদবে। সেই কান্না দেখার ধৈর্য্য বা ইচ্ছা কোনটাই নেই রুদ্রর।
প্রিয়তা নড়ল না। ঠিক ওভাবেই শুয়ে রইল বিছানা চোখদিয়ে গড়িয়ে পড়ল দু ফোঁটা জল।
ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা সেই স্টোররুমটাতে এলো রুদ্র। অস্থিরভাবে পায়চারী করল ঘরজুড়ে। অসহ্য লাগছে সবকিছু। পারলে সবকিছু এক্ষুনি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে দিতো ও। ভেতর জমা তীব্র ক্ষোভ, যন্ত্রণা, হাহাকার যেন দাবানল হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আজ আবার মস্তিষ্কে তীক্ষ্ণভাবে আঘাত করছে সেই দুঃস্বপ্ন! সেই একটা মানুষ। সেই একটা নাম। তাজ! সেই সঙ্গ, সেই আর্তনাদ, সেই অভিশাপ। অভিশাপ!
প্রচন্ড রাগে পুরো টেবিলটাই ধাক্কা দিয়ে ফেলি দিল রুদ্র। তক্ষুনি নিচে পরল ছোট্ট দোলনাটা। পিতা হওয়ার সংবাদ পাওয়ার পর নিজের অনাগত সন্তানের জন্যে অনেক শখ করে কিনেছিল রুদ্র। এতো, বিষাদ এতো যন্ত্রণার মাঝেও ঐসময় এই দোলনাটাই অবর্ণণীয় এক সুখ দিতো ওকে। ওটার দিকে তাকালেই নিজের অংশের আগমনের শীতলতা শান্ত করতো ওর অশান্ত হৃদয়কে। কিন্তু সেই সুখ, সেই সন্তানের মৃত্যুর পর এটার জায়গা হয়েছে এই স্টোররুমের বড় টেবিলটাল ওপর। এটাকে দৃষ্টির সামনে রাখার সাহস হয়নি রুদ্র, প্রিয়তা কারোরই।
হাঁটু ভেঙ্গে বসল রুদ্র। দুহাতে সোজাকরে বসাল দোলনাটা। আলতো করে হাত বুলিয়ে তাকিয়ে রইল ওটার দিকে। ছলছল করে উঠল রুদ্রর চোখ। অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর হলো হৃদয়। ভেতরটা যেন ঝলসে গেল যেন। কম্পিত কন্ঠে বলে উঠল, 'তোমাকে বাঁচাতে পারিনি আমি। এই সুন্দর পৃথিবীটা তোমার বাবা তোমাকে দেখাতে পারেনি, বাবা। ক্ষমা করো না। তোমার এই ব্যর্থ বাবাকে কোনদিন ক্ষমা করো না।'
তাজ! কিছু নাম এবং কিছু ব্যক্তিত্ব থাকে, যারা জীবনে আসে আকস্মিক কোনো প্রলয়ের মতো। তীব্র এক ঝড়ো হাওয়া হয়ে। তারপর এক দিন হুট করেই মিলিয়ে যায়। কিন্তু সেই ক্ষণিকের উপস্থিতি যে গভীর আঁচড় কাটে, তার ছাপ স্থায়ী হয়ে বসে যায় মন-মস্তিষ্কে। জীবনের হাজারটা চড়াই-উতরাই আর জটিল সমীকরণ পেরিয়ে গেলেও, সেই একটি নাম মনস্তাত্ত্বিকের গোলকধাঁধায় কখনো ধুলো জমতে দেয় না।
তাজ হলো রুদ্র আমেরের জীবনের ঠিক সেরকমই এক নিরেট, অমোঘ নাম। নিয়তির প্রতিটি নির্মম ধাক্কায়, জীবনের প্রতিটা রক্তক্ষয়ী বাঁকে ওই একটা নামই রুদ্রর অবচেতন মনে তীব্র এক বিদ্যুতের মতো ঝলকানি দিয়ে ওঠে।
———
রুদ্র তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (BBA) ফাইনাল ইয়ারে ছিল। আইবিএ-র করিডোর ধরে রুদ্র যখন হেঁটে যেত, চারপাশের চেনা কোলাহলটা যেন এক নিমেষে থমকে দাঁড়াতো। ওর অবয়বে ছিল এক আদিম, অস্বাভাবিক পৌরুষ। গ্রিক ভাস্কর্যের মতো দৃঢ় চোয়াল আর সেই অদ্ভুত তীক্ষ্ম চোখ দুটোর দিকে তাকালে যে কেউ চোখের পলক ফেলতে ভুলে যেত। অথচ এই মোহময় রূপের আড়ালে ক্লাসরুমে ও ছিল এক ধরাছোঁয়ার বাইরের জিনিয়াস। জটিল সব কেস স্টাডি কিংবা ফাইন্যান্সের কঠিন হিসাবগুলো ও একপ্রকার তুড়ি মেরে মিলিয়ে দিত। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকতেন শিক্ষকেরাও। অথচ ওর এই অসম্ভব রূপ আর প্রখর মেধার পেছনে যে একটা জমাট বাঁধা একাকীত্ব আর অন্ধকার পৃথিবী লুকিয়ে ছিল, আইবিএ-র ঝলমলে আলোয় তা টের পাওয়ার সাধ্য কারও ছিল না।
ওর দিনগুলো আর পাঁচটা সাধারণ তরুণের মতো কাটানোর সুযোগ ছিল না। সকাল থেকে দুপুর অবধি আইবিএ-র ক্লাসরুমে করপোরেট স্ট্র্যাটেজি কিংবা ফাইন্যান্সিয়াল মডেলিংয়ের নিখুঁত লেকচারে চারপাশের চেনা জগৎটাকে বড্ড কৃত্রিম মনে হতো ওর। কেত্রিমতায় ঘেরা সে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে ও যখন গুলশান প্রবেশ করতো। তখনই যেন বাস্তবতা এসে প্রবলভাবে ধাক্কা দিতো ওকে। একজন ব্রিলিয়ান্ট আইবিএ স্টুডেন্ট থেকে তখন ও হয়ে উঠতো দ্য সোলার সিস্টেম এর এক নিষ্ঠুর, ক্ষমতাসম্পন্ন ঘাতক।
আঠারো বছর বয়সে খুলনা-সিলেটের সেই রক্তমাখা মিশনের পর থেকে বাইশের কোঠায় পা দেওয়া রুদ্রর মধ্যকার হিংস্রতা আর মগজের ধার দুটোই বাড়ছিল সমান হারে। তবে ঐ চারবছরে আরও এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটেছিল ওর মধ্যে। বিশ্বাস ঘাতকদের প্রতি সেই ভয়ংকর ঘৃণা প্রবলভাবে বাড়ছিল। রফিকের সেই বাণীগুলো, যা পাঁচবছরের রুদ্র না বুঝে শুনলেও বোঝার পর থেকেই তীব্রভাবে প্রভাব ফেলেছিল ওর মনে। রফিকের বাণী আর রুদ্রর ভেতরে থাকা স্বয়ংক্রিয় গুনে কেবল চোখ দেখেই শত্রু আর বিশ্বাসঘাতক চিনে ফেলার সেই অদ্ভুত গুন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়েছিল আরও নিঁখুত এবং ত্রুটিহীন।
অন্যদিকে সোলার সিস্টেমের ভেতরের সমীকরণটা তখন বেশ জটিল। জাফর আমের আর ইকবাল তখন রাশেদ আমেরের ডান আর বাম হাত। পুরো লজিস্টিক আর সাপ্লাই চেইনের মূল চাবিকাঠি জাফর-ইকবালের দখলে। অন্যদিকে ফ্রন্টলাইনের মাসল পাওয়ার সামলায় রুদ্র এবং উচ্ছ্বাস। ওদের তৈরী ঐ দুর্ভেদ্য দেওয়ালে ফাটল ধরানো কোনো বাইরের মানুষের পক্ষে অসম্ভব ছিল।
ঠিক এই সময়েই, আমের ভিলার সীমানায় পা রাখল এক রহস্যময় তরুণ। নাম তার তাজ। রাশেদ আমেরের দূর সম্পর্কের এক খলিফার রেফারেন্সে সোলার সিস্টেমের এক সাধারণ টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে প্রবেশ করে ছেলেটি। তাজের কাজ ছিল সোলার সিস্টেমের আন্ডারগ্রাউন্ড শুটিং রেঞ্জের অস্ত্রগুলোর মেইনটেইনেন্স করা এবং গুদামের পুরনো কম্পিউটারগুলোর ডেটা এন্ট্রি করা। দলের খুব সামান্য এক পদে থাকলেও, অদ্ভুত কিছু একটা ছিল সেই ছেলের মধ্যে। ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের ঐ যুবকের চোখের গভীরের স্থিরতা আর মেদহীন শরীরের নিখুঁত প্রতিফলন প্রথম দিন থেকেই আলাদা নজর কেড়েছিল। তবে ভালোভাবে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করার পর জানা গেছে, সে মিলিটারি একাডেমি থেকে কোর্টমার্শাল হওয়া এক এক্স-ক্যাডেট। সুতরাং অমন শরীর কিংবা ইন্টেলিজেন্স থাকা আশ্চর্যের কিছু ছিলোনা।
রুদ্র এসব বিষয়ে ছিল ভাবনার চেয়েও বেশি নির্বিকার। প্রয়োজন ছাড়া দলের পাতি কারো সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা থাকতোনা ওর। তবে তাজের সঙ্গে ওর প্রথম দেখাটাও হয়েছিল বেশ ইন্টারেস্টিংভাবে।
একদিন সোলার সিস্টেমের আন্ডারগ্রাউন্ড শুটিং রেঞ্জে রুদ্র আর উচ্ছ্বাস নতুন চালানের উইপন টেস্ট করছিল। এক কোণায় দাঁড়িয়ে একটা জং ধরা রিভলভার পরিষ্কার করছিল তাজ।
রুদ্র তখন শার্টের হাতা দুটো কনুই অবধি নিখুঁত ভাঁজে গুটিয়ে পি*স্ত*ল লোড করছিল। ওর চোখের সেই নিস্পৃহ, তীক্ষ্ম চাহনি দেখে সহজে বোঝার উপায় ছিল না, এই ছেলেই ক্লাসরুমের টপার। হঠাৎ উচ্ছ্বাস ওকে তিনটে মুভিং টার্গেট দিয়ে মজার ছলে বলল, 'দেখাও দেখি গুরু, হাত ঠিক আছে না-কি ঢাবির সুন্দরীদের দেখে দেখে জং ধরেছে?'
উচ্ছ্বাসের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল রুদ্র। মুভিং টার্গেটে ব্যাক টু ব্যাক তিনটা ফায়ার করল। দুটো টার্গেটের সেন্টার ভেদ করলেও একটা বুলেট সামান্য ডেভিয়েট করে গেল। রুদ্রর ক্ষেত্রে যা অস্বাভাবিক। উচ্ছ্বাস হেসে উঠে বলল, 'আইবিএ-র ম্যাথ করতে করতে হাত আলগা করে ফেলেছিস নাকি গুরু?'
ওখান থেকে তাজ নিজের কাজ করতে করতেই খুব শান্ত, অথচ স্পষ্ট গলায় বলল, 'হাত আলগা নয়। রিলিজ স্প্রিংটা এক মিলিমিটার আলগা। পি*স্ত*লের ব্যালেন্সিংয়ে প্রবলেম ছিল।'
উচ্ছ্বাস ঝট করে তাকাল তাজের দিকে। রুদ্র নিজের পি*স্ত*ল নামিয়ে খুব ধীরেসুস্থে তাকাল ওর দিকে। অথচ তাজের মুখে কোনো ভয় বা সমীহ ছিল না। যা রুদ্রর অহংকারে প্রথম ধাক্কা দিল। রুদ্র ধীরপায়ে এগিয়ে গেল তাজের দিকে। পিস্তলটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শীতল গলায় বলল, 'নিজস্ব জ্ঞানে বললে, নাকি শুধুই আন্দাজ? বাঘের খাঁচায় টিকে থাকতে হলে শুধু আন্দাজে কথা বললে চলে না। যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়।'
তাজ এক চুলও নড়ল না। ও খুব শান্তভাবে রুদ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে আলতো হাসল। পিস্তলটা হাতে নিয়ে কোন সংকোচ ছাড়াই এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে ওটার ব্যারেল আর স্প্রিংটা খুলে আবার লক করল। তারপর চোখের পলকে হাতটা তুলে কোনো রকম পজিশন না নিয়েই একটা মুভিং টার্গেটের ঠিক মাঝ বরাবর ফায়ার করল। ঘর কাঁপিয়ে আওয়াজ হর একটা। ঘরের ভ্যাপসা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল বারুদের তপ্ত গন্ধ। নিমিষেই চূর্ণ হয়ে গেছে টার্গেটটা।
তাজ পিস্টলটা নামিয়ে সোজা রুদ্রর চোখের দিকে তাকাল। স্থির গলায় বলল, 'তোমার থিওরিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজি শতভাগ নিখুঁত, ছোট সাহেব। কিন্তু প্র্যাক্টিক্যাল কমব্যাটে তোমার ডান কনুইটা সামান্য বেশি বাইরে থাকে। ক্লোজ কোয়ার্টারে ওটা শত্রুর জন্য ওপেন টার্গেট হতে পারে। বাঘের খাঁচায় বাঁচতে চাইলে ব্লাইন্ড স্পট রাখতে নেই।'
উচ্ছ্বাস স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু রুদ্রর চোখে খেলে গেল একঝলক প্রশংসা। লোকটা যে বলিস্টিকস আর কমব্যাট সাইকোলজি গুলে খেয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। রুদ্র মুগ্ধ না হয়ে পারলোনা।
উচ্ছ্বাস হেসে উঠে বলল, 'অসাধারণ তাজ ভাই। একদম ফ্যান করে দেবে দেখছি।'
তাজও চমৎকার হেসে বলল, ' গরম আছে বেশ। দু একটা পাংখা থাকলে মন্দ হয়না।'
কথাটা শেষ হতেই উচ্ছ্বাস আর তাজ ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল। রুদ্রও হাসল তাজের ঠিক চোখের দিকে তাকি। তবে তা সামান্য ঠোঁট বাঁকানো মৃদু হাসি।
*****
দুই মাস টানা কাজ করার পরেও তাজ সোলার সিস্টেমের কোনো বড় পদের জন্য লালায়িত ছিলো না। অথচ জাফর আর ইকবালের খুটিনাটি ভুলভ্রান্তি আর লুপহোলগুলো মেটাতে দারুণভাবে হেল্প করতো ছেলেটা। আগমন খুব অল্প সময়ের হলেও অদ্ভুত দক্ষ ছিল সে।
তবে ঘটনায় আসল মোড়টা এলো নারায়ণগঞ্জের একটা টেকনিক্যাল অপারেশনে। জাফর আর ইকবালের লীডে থাকা একটা বড় চালানের জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম হ্যাক করে বসল পুলিশের কাউন্টার-টেররিজম ইউনিট। এদিকে রুদ্র আর উচ্ছ্বাসও দেশের বাইরে গেছে, দলেরই এক কাজে। পুরো সোলার সিস্টেম তখন আতঙ্কে দিশেহারা। রাশেদ সিগারেট হাতে গম্ভীর হয়ে বসে উপায় খুঁজছেন বিষয়টা থেকে বের হওয়ার। ঐসময় সবাই চমকে তাজ নিজে এগিয়ে এলো। সে সোলার সিস্টেমের মূল ড্যাশবোর্ডে বসে মাত্র বিশ মিনিটে পুলিশের ওয়্যারলেস ফ্রিকোয়েন্সি ক্লোন করে পুরো রুটটা ডাইভার্ট করে দিল। সেদিন খাদের মুখ থেকে বেঁচে ফিরল সোলার সিস্টেমের কোটি টাকার চালান।
সেই ঘটনায় তাজের ওপর বেশ প্রসন্ন হয়েছিলেন রাশেদ আমের। উনি তাজকে সরাসরি কোনো বড় পদ দিলেন না। কিন্তু সোলার সিস্টেমের ডিজিটাল সিকিউরিটি আর ইন্টারনাল ট্র্যাকিংয়ের দায়িত্বটা নিঃশব্দে তাজের হাতে চলে এলো। কারণ এ বিষয়ে ও-ই নিজেকে সবচেয়ে দক্ষ এবং উপযুক্ত প্রমাণ করেছিল।
রুদ্র যখন ফিরে এসে সব শুনলো, বিন্দুমাত্র অবাক হতে দেখা গেলোনা ওকে। উল্টে সেই চিরচেনা মৃদু বক্র হাসি ছিল ওর ঠোঁটে।
———
রুদ্রর সাথে তাজের বন্ধনটা তখনও সাধারণ প্রফেশনাল পার্টনারশিপেরই। দুই ঠান্ডা মাথার শিকারীর নিঃশব্দ বোঝাপড়ার মতো। রুদ্র গ্লোবাল ইকোনমির মারপ্যাঁচে দক্ষ ছিল। তাজ ওর সেই দক্ষতাকে সোলার সিস্টেমের ব্ল্যাকমানি লন্ডারিংয়ের নিখুঁত চ্যানেল তৈরিতে কাজে লাগাতো। অন্যদিকে উচ্ছ্বাস আর তাজ দুজনেই ভীষণ হাস্যরসাত্মক মানুষ হওয়ায়, ওদের মধ্যে প্রাকৃতিক ভাবেই বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল।
অন্যদিকে রুদ্রও ইচ্ছা পোষণ করেছে, তাজের কাছে অস্ত্র সম্পর্কে আরও ডিটেইলড, আরও নিখুঁত জ্ঞান নেবে। শিখবে বলিস্টিক এবং কমব্যাট সাইকোলজি। তাজও রাজি হয়ে গেল। সেই শিক্ষা আদান-প্রদানের মধ্যে ধীরে ধীরে সাবলীল হচ্ছিলো দুজন।
ফলে, দিনের বেশিরভাগ সময়টাই তিনজনের একসঙ্গে বসে কাটানো হতো। তাজ আর উচ্ছ্বাস একেঅপরের কৌতুকে হো হো করে হেসে উঠতো। অন্যদিকে রুদ্র গম্ভীর মুখে পাশে বসে শেষ করতো একের পর এক সিগারেট। মাঝেমাঝে ঠোঁটে খেলে যেতো সেই চিরপরিচিত বক্র হাসি।
মাঝরাত অবধি আমের ফাউন্ডেশনের জটিলতায় ভরা কাজকর্ম শেষ করে প্রায়ই একা ছাদে এসে দাঁড়াতো রুদ্র। কালো লেদার জ্যাকেটের নিচে ওর পিঠের সেই পুরোনো লোহিত রেখাগুলো তখনো এক একটা জ্বলন্ত স্মৃতির মতো টনটন করতো। তটিনীর প্রস্থান আর রাশেদের অমানবিক ট্রেনিংয়ের সেই প্রভাব আর একাকীত্ব রুদ্রকে কতটা আহত করতে পারতো জানা নেই। কিন্তু উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো ও। উচ্ছ্বাস পাশে বসে নিজের মতো বকবক করে যেতো।
এমনই এক রাতের কথা। ঘড়িতে তখন রাত দুটো। তাজ নিজের কাজ শেষ করে ছাদে আসতেই দেখতে পেল রুদ্রকে। ছাদের রেলিংয়ে ধারে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। আজ একা। উচ্ছ্বাসকে ভিন্ন এক কাজে পাঠানো হয়েছে। রুদ্রর আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট, চোখ দুটো ভীষণ ক্লান্ত কিন্তু তীক্ষ্মতায় ভাটা পড়েনি তাতে।
তাজ থামল। ধীরে পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল রুদ্রর পাশে। উজ্জ্বল চাঁদের আলোয়, পাশাপাশি দাঁড়ানো দুই সুদর্শন যুবককে দেখতে ঠিক দেবদূতের মতোই লাগলো। রুদ্র টের পেয়েও তাকালোনা তাজের দিকে। অন্যদিকে তাজও সস্তা সৌজন্য প্রকাশ না করে সরাসরি একটা মেটাল ফ্লাস্ক রুদ্রর দিকে বাড়িয়ে দিল। বলল, 'ব্ল্যাক কফি উইথ আ... ড্রপ অফ রাম। মগজের হাইপার অ্যাক্টিভিটি কমাবে, কিন্তু ফোকাস নষ্ট করবে না।'
রুদ্র সরু চোখে তাকাল তাজের দিকে। কোন কথা না বলে নিলো ফ্লাস্কটা। এক চুমুক দিয়ে পুনরায় আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, 'বেইমান সম্পর্কে তোমার কী মনোভাব, তাজ ভাই?'
'এক বিষাক্ত রোগ।'
তাজ রেলিংয়ে ভর দিল। শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল, 'বেইমানি হলো এক ধরণের ভাইরাস।একবার রক্তে ঢুকলে পুরো শরীরটাকে বিষাক্তভাবে আক্রান্ত করে দেয়।'
রুদ্র তাজের মুখের দিকে তাকাল। চাঁদের আলোয় তাজের চোয়ালের হাড় শক্ত দেখাচ্ছিল। মৃদু হাসল রুদ্র। সোলার সিস্টেমের সবাই ওর আদেশের গোলাম। কেউ বা ওর বাবাকে ভয় পায়। আর কেউ বড় পদের লোভে অন্ধ। কিন্তু এই একটা মানুষ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে সমানে সমানে কথা বলতে পারে। যার কথায় কোনো কৃত্রিমতা নেই। ও তাজের মধ্যে নিজের অন্ধকারের এক নিখুঁত আয়না দেখতে পায় সবসময়।
রুদ্র ফ্লাস্কটা তাজের দিকে এগিয়ে দিয়ে আলতো হেসে বলল, 'তোমার আর আমার মধ্যে অদ্ভুত কিছু মিল আছে তাজ ভাই। যেকেউ অনায়াসে তোমাকে আমার বড় ভাই হিসেবে চালিয়ে দিতে পারবে।'
হেসে ফেলল তাজ, 'মেইবি ব্রাদার ফ্রম এনাদার মাদার?'
———
ওই রাতের পর থেকে রুদ্রর সঙ্গে তাজের সম্পর্কটা হয়ে উঠেছিল আরও বেশি সহজ, সাবলীল। প্রতিটি আন্তর্জাতিক শিপমেন্টের সিকিউরিটি কোড আর আমের ফাউন্ডেশনের আড়ালে থাকা ফাইলের জটিল হিসাবগুলো যখন রুদ্রর টেবিলে আসত, উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে তাজকেও ডাকতো রুদ্র। তাজও পূর্ব ডেডিকেশনের সঙ্গে শুনতো রুদ্রর কথা। সব কাজ করতো। কফি আর সিগারেটের আড্ডার সঙ্গে বেশ আনন্দের সঙ্গে সম্পন্ন হতো ওদের কাজ।
কাজ শেষ করে তিনজন একসঙ্গে বসতো ছাদের রেলিংয়ে। হাতে হুইস্কি আর জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতো গল্প, আড্ডায়। রুদ্র যদিও সে আড্ডার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতো। কিন্তু থাকতো।
সবাই স্পষ্ট টের পাচ্ছিলো রুদ্রর মতো একজন কোল্ডব্লাডেড অ্যাসাসিন নিজের অজান্তেই তাজকে ভরসা করছে। এবং উচ্ছ্বাসের পর তাকেই জীবনের সবচেয়ে কাছের জায়গাটা দিয়ে দিচ্ছে।
******
ছ'টা মাস কেটে যায় একই ছন্দে। রুদ্রর সঙ্গে তাজের ঘনিষ্ঠতা বেশ বেড়েছে সেই ছয়মাসে। এখপ উচ্ছ্বাসের মতোই প্রায় সবসময়ই তাজ থাকে রুদ্রর সঙ্গে। রুদ্রর জীপের সখ ছিল বেশ। আর তাজের জীপ সম্পর্কে জ্ঞান ছিল চমৎকার। রুদ্রর প্রিয় সেই কালচে সবুজ র্যাংলার-Sky on touch জীপটা তাজই ওর জন্যে পছন্দ করে দিয়েছিল।
কিন্তু রুদ্র আমেরের জীবনের কোন অংশ এতো সহজ স্বাভাবিক হতে পারে নাকি? কাহিনীর বিভৎসতা শুরু হল ঠিক তার পর-
এরমধ্যে একরাতে রুদ্র ওর ফাইনাল সেমিস্টারের স্ট্রাটেজিক ম্যানেজমেন্টের এক ভাইবার জন্যে প্রেপ করছিল। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হতেই ও আস্তেধীরে বেরিয়ে আসে নিজের রুম থেকে। বেড়ালের মতো নিঃশব্দে চলে যায় আমের ভিলার বৈঠক ঘরে। সেখানে গিয়ে বিন্দুমাত্র অপেক্ষা না করে নিজের পিসি অন করে বসে পড়ে রুদ্র। এনক্রিপ্টেড সেট করে রাখা ছিল। সেখানে একটা সিকিউরিটি পপআপ আসতেই রুদ্রর তীক্ষ্ম চোখজোড়া যেন জ্বলে উঠল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে শীতল, রহস্যময় হাসি।
আমের ফাউন্ডেশনের আড়ালে চলা অফ অ্যাকাউন্টগুলোর ট্র্যাকিং আইপি সিঙ্ক করা ছিল রুদ্রর এই ব্যক্তিগত ডেক্সটপে। নোটিফিকেশন বলছে, বিগত বাহাত্তর ঘণ্টায় হংকংয়ের শেল অ্যাকাউন্টের ডাটাবেস থেকে কিছু স্পেসিফিক এনক্রিপ্টেড কোড কপি করা হয়েছে। আইপি অ্যাড্রেসটা দেখাচ্ছে মিরপুর ডিওএইচএস এর একটা ভুয়ো প্রক্সি নেটওয়ার্ক।
সেই রাতেই রুদ্র নিজের জীপ স্টার্ট দিয়ে সোজা চলে গেল ধানমন্ডি ৪ নম্বরের একটা আন্ডারগ্রাউন্ড সাইবার ল্যাবে। যা ও নিজের পার্সোনাল ফান্ডের লোক দিয়ে মেইনটেইন করে। কনকনে শীতের প্রবল কোপকে উপেক্ষা করে রুদ্র। সেখানে পৌঁছে টানা চার ঘণ্টা ডাটা প্যাকেট অ্যানালাইসিস করার পর ওর সামনে যে সত্যটা এলো, তা কোনো সাধারণ মানুষের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
তথ্য পাচার ডিলিং রুমের কোনো কম্পিউটার থেকে হয়নি। করা হয়েছে আমের ফাউন্ডেশনে রাশেদ আমেরের স্টাডি রুমের মূল রাউটার থেকে, গভীর রাতে। আর যে টেকনিকটা ব্যবহার করা হয়েছে, তার নাম ডিজিটাল স্টেগানোগ্রাফি। অর্থাৎ, আমের ফাউন্ডেশনের এতিমখানার বাচ্চাদের কিছু নিরীহ ছবির ফাইলের ভেতরে কোড আকারে সোলার সিস্টেমের ড্রাগ রুটের ম্যাপ আর ব্যাংক ডিটেইলস লুকিয়ে বাইরে পাঠানো হয়েছে।
আর এই কাজটা ছিল তাজের। হ্যাঁ, তাজের। এবং তা বোঝার জন্য রুদ্রর কোনো সাইবার ল্যাবের দরকার ছিল না। এই সত্যটা রুদ্র আজ থেকে ঠিক ছয় মাস আগেই জানতো। যেদিন আন্ডারগ্রাউন্ড শুটিং রেঞ্জে তাজের সাথে ওর প্রথম দেখা হয়েছিল, সেদিন থেকেই।
জানার কারণটাও ছিল সেই রুদ্র আমেরের অদ্ভুত, নিঁখুত এক ক্ষমতা। ও মানুষের চোখের মণির সামান্যতম সংকোচন আর রেটিনার কম্পন দেখে ভেতরের শত্রুটাকে চিনে ফেলতে পারতো। রফিক আমেরের ঢালা বিষে বিষাক্ত সেই তীক্ষ্ম চোখ দুটো এই ব্যাপারে কোনোদিন ভুল করতো না।
প্রথম দিন যখন ও তাজের দিকে ব*ন্দুক দিয়েছিল। তাজের চোখে কোনো ভয় ছিল না। বরং সেখানে এক তীব্র, হিমশীতল শিকারীর চিল-চাহনি ছিল। যা কোনো সাধারণ কোর্টমার্শাল হওয়া ক্যাডেটের থাকার কথা নয়। ওই চোখ দুটো ছিল আইনের। কোনো এক হাই লেভেল ইনটেলিজেন্স এজেন্সির ধারালো চ্যাপ্টার। ও সেদিনই বুঝেছিল। হি ইজ আ ট্রেইটর।
কিন্তু রুদ্র চট করে কোন পদক্ষেপ নেয়নি। বরং ভিন্নভাবে এগিয়েছে। উইপন সম্পর্কে শেখা, জীপ কেনা, রাতের আড্ডা ইত্যাদি মাধ্যমে খুব ধীরে ধীরে একটু একটু করে ঘনিষ্ঠ হয়েছে তাজের সঙ্গে। ওর সাইকোলজি বুঝেছে, ফিজিক্স বুঝেছে। আর সেইসঙ্গে ওর পেছনে লোক লাগিয়ে খুবই সুক্ষ্মভাবে জোগাড় করেছে ওর আসল পরিচয়।
তাজের আসল নাম, ইশতিয়াক রহমান। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একজন দক্ষ অপারেটিভ। কভার আইডেন্টিটেটি নিয়ে সোলার সিস্টেমে ঢুকেছিল, আমের ফাউন্ডেশন ও সোলার সিস্টেমের ভেতরকার সব রহস্য উদ্ঘাটনে। পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে গোয়েন্দা বিভাগ,কাউন্টার টেররিজম; সবার কাছেই সোলার সিস্টেম এক রহস্যের নাম। দু যুগেরও বেশি সময় ধরে আন্ডারওয়ার্ল্ডে রাজত্ব্য করতে থাকা একটি দল। অথচ এর বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত কোন প্রমাণ কিংবা তথ্য আইনের হাতে আসেনি। কিংবা আসতে দেওয়া হয়নি। সুতরাং আমের ফাউন্ডেশনে কাউন্টার টেররিজম থেকে কোন অপারেটিভ পাঠানো মোটেও আশ্চর্যের কোন ঘটনা নেয়।
তাজ ওরফে ইশতিয়াকের আসলে বাড়ি মুন্সীগঞ্জ। বাড়িতে মা আর নব বিবাহিতা স্ত্রী আছে। বাবা ছিল, ছোট্ট বোনও ছিল একটা। কিন্তু তিন-চার বছর আগে কোন এক আন্ডারওয়ার্ল্ড দলের বিরুদ্ধে এক সাকসেসফুল অপারেশন করেছিল তাজ। তার কিছুদিন পর, প্রতিশোধ নিতে ওর বোনকে কলেজ থেকে ফেরার পথে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায় সেই দলের লোকেরা। তাজ উন্মাদের মতো সব তছনছ করে খুঁজেও কোন সন্ধান পায়নি ওর বোনের। পেয়েছিল পরের দিন সকালে। নগ্ন অবস্থায়, ধ*র্ষি*ত এক লাশ হিসেবে। দলবদ্ধভাবে ধ*র্ষ*ণ করে গলা কে*টে খুন করা হয়েছে মেয়েটাকে। তারচেয়েও বিভৎস বিষয় হচ্ছে সেইসব ভিডিও রেকর্ড করে, সেই ভিডিওই পাঠিয়ে দিয়েছিল তাজের কাছে। মোট কথা তাজকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল তারা। সেই ঘটনা মেনে নিতে পারেনি ওর বাবা। অপমান, লাঞ্ছনা, কষ্টে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে সে।
পরপর বোন আর বাবাকে হারিয়ে পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিল তাজ। মাকে সামলাবে না-কি নিজেকে বুঝে উঠতে পারছিল না। তবে সেই দলকে ছেড়ে দেয়নি ও। নিজের প্রতিষ্ঠানের সাহায্যে অপারেটিভদের টিম তৈরী করে প্রতিশোধ নিয়েছিল ও। কিন্তু তাতে ওর বোন কিংবা বাপতো আর ফিরে আসেনি।
বছরখানেক আগেই ওর কাঁধে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমের ফাউন্ডেশনের ভেতরে ঢুকে সোলার সিস্টেম সম্পর্কে সকল তথ্য যোগার করার। এদের বিরুদ্ধে সলিড প্রমাণ তৈরী করার। ওর এই তাজ নাম, এক্স ক্যাডারের মিথ্যা পরিচয় এবং সেই পরিচয় প্রমাণের সব কাগজপত্র কাউন্টার-টেররিজম থেকেই তৈরী করে দেওয়া হয়েছিল।
কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একজন ঝানু অপারেটিভের আসল পরিচয় বের করা মোটেও হাতের মোয়া নয়। তাজ নিজের পেছনে কোনো চাক্ষুষ প্রমাণ রাখেনি। সে ছিল একটা জলজ্যান্ত কুয়াশা। রুদ্রও কম ছিলোনা। বিগত ছয় মাস ধরে ও এক চুলও বুঝতে দেয়নি যে সে তাজের আসল পরিচয় ও জানে। ব্যাকগ্রাউন্ডে নিজের এক বিশ্বস্ত নেটওয়ার্ক দিয়ে তাজের প্রতিটি নড়াচড়া ট্র্যাক করা শুরু করে রুদ্র। রাশেদকে বলে তাজকে সোলার সিস্টেমের ডেটাবেসের অ্যাক্সেস ও নিজে ইচ্ছা করেই পাইয়ে দিয়েছিল। যাতে তাজ টোপটা গিলে এবং নিজের অজান্তেই আসল নেটওয়ার্কের সাথে যোগাযোগ করতে বাধ্য হয়।
কাউন্টার টেররিজমের আন্ডারকভার সেলে ফাটল ধরাতে রুদ্রকে নিজের তীক্ষ্ণ মগজ আর সোলার সিস্টেমের ডার্ক ওয়েবের পুরো শক্তি বাজি রাখতে হয়েছিল। অবশেষে সেই রাতে তাজের আসল আইডেন্টিটি ফাইলটা রুদ্রর চোখের সামনে ভেসে উঠল।
মনিটরের নীল আলোয় রুদ্রর অনিন্দ্য সুন্দর মুখটা তখন এক পাথুরে মূর্তির মতো দেখাচ্ছিল। যদিও শুরুর থেকেই ও সত্যিটা জানতো, তবুও ওর তীক্ষ্ম চোখ দুটোয় এক অদ্ভুত, সুক্ষ যন্ত্রণার রেখা ফুটে উঠেই তা মিলিয়ে গেল সেকেন্ডের মধ্যে। সেখানে এসে ভর করল তীব্র ঘৃণা আর ক্রোধ।
ল্যাপটপটা বন্ধ করল রুদ্র। ধীরপায়ে উঠে গিয়ে দাঁড়াল। যে সময়ের জন্যে অপেক্ষা করছিল রুদ্র আমের, সে সময় চলে এসেছে। তাজ তার চাল দিয়ে গেছে। এবার রুদ্রর পালা!
******
সোলার সিস্টেমে পাকাপোক্ত হওয়ার পর তাজকে দু কামড়ার একটা ফ্ল্যাট দিয়েছিল রাশেদ আমের। রাতের অন্তিম প্রহরে সেই ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নাড়ল রুদ্র আমের। দরজাটা খুলল বেশ খানিকক্ষণ পর। চোখ ডলতে ডলতে দরজা খুলল তাজ। একটা থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর গেঞ্জি পড়া। এলোমেলো চুল। ঘুমাচ্ছিল বোধহয়। এসময় রুদ্রকে দেখে তাজ চমকালো। ভ্রুকুটি করে বলল, 'এত রাতে এখানে? কোন ইমার্জেন্সি অপারেশন আছে নাকি?'
রুদ্র অদ্ভুতভাবে হাসল। ডান হাত দিয়ে নিজের ঘাড়টা ঘসে বলল, 'অপারেশন নয় তাজ ভাই, ইকুয়েশন। কিছু হিসাব মেলাতে এলাম।'
খুব ধীরপায়ে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল ও। অলস চোখে চারপাশে তাকাল। হলদেটে একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে ঘরে। তীব্র শীতের নিস্তব্ধতা যেন ঘিরে ধরেছে আবছা অন্ধকার রুমটাকে। রুদ্র বসল একটা কাঠের চেয়ার টেনে। নিজের কালো লেদার জ্যাকেটটা খুলে রাখল চেয়ারের হাতায়। যাতে তাজের মনে হয় রুদ্র সম্পূর্ণ রিল্যাক্সড। এবং এই মুহূর্তে ওর গায়ে কোনো দৃশ্যমান অস্ত্র নেই।
টেবিল ল্যাম্পের আলোছায়ায় রুদ্রর মুখটা এক মারাত্মক, নিখুঁত শিল্পের মতো দেখাচ্ছিল। তাজ হাসল। নিজেও ভেতরে এসে বিছানায় বসতে বসতে বলল, 'কীসের হিসাব?'
'ইনসাইডার থ্রেটের সেই কেস স্টাডিটার।'
রুদ্র পকেট থেকে দুটো সিগারেট বের করে লাইটার দিয়ে একবারেই ধরিয়ে ফেলল। একটা এগিয়ে দিল তাজের দিকে, 'সিটিইউ এর ব্ল্যাকবক্স অ্যালগরিদম ভাঙা যে কতটা কঠিন, সেটা আজ রাতে বুঝলাম। অপারেটিভ ইশতিয়াক রহমান।'
রুদ্রর মুখ দিয়ে 'ইশতিয়াক’ নামটা উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে ঘরের ভেতরের বাতাসটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য জমে বরফ হয়ে গেল। কলিজায় যেন কেউ বড়সর আঘাত করল তাজের। তবে চোখের মণি এক চুলও কাঁপল না। কিন্তু ওর ডান হাতের আঙুলগুলো বালিশের নিচে রাখা কাস্টমাইজড নাইন এমএম পি*স্ত*লের দিকে নিঃশব্দে ইঞ্চিখানেক এগিয়ে গেল। তাজ খুব শান্ত গলায় বলল, 'কবে জেনেছো?'
' যেদিন প্রথম তুমি আমার চোখে চোখ রেখেছো।'
' এতোদিন চুপ থাকার কারণ?'
' সঠিক সময়ের অপেক্ষা।'
হেসে ফেলল তাজ, 'বড্ড ধূর্ত তুমি রুদ্র আমের। কিন্তু এই সত্যটা জানার পরেও, এখানে একা, অস্ত্রহীন আসাটা তোমার থিওরির সাথে ঠিক মিলল না কিন্তু। তুমি খুব ভালো করেই জানো, এই দূরত্ব থেকে তোমাকে শেষ করতে আমার এক সেকেন্ডের কম সময় লাগবে।'
'জানি।'
তাজের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে থেকেই সিগারেটে টান দিল রুদ্র। তীক্ষ্ম চোখ দুটোয় এক অদ্ভুত মায়া আর নিষ্ঠুরতার মিশ্রণ, 'কিন্তু এইমুহূর্তে তুমি ট্রিগার চাপতে পারবে না, তাজ ভাই। কারণ, এই বিল্ডিংয়ে যে মূল জেনারেটরটা চলছে, ওটার ফুয়েল লাইনের সাথে আমি একটা ডার্কওয়েভ সিঙ্কড থার্মাল এক্সপ্লোসিভ কানেক্ট করে এসেছি। আমার একটা সিগানালে ঠিক কী ঘটবে সেটা তোমাকে বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখেনা। কাউন্টার টেররিজমের বেস্ট অফিসার নিশ্চয়ই মিশনের মাঝপথে এভাবে সুইসাইড করতে চাইবেন না? আর তাছাড়াও এতগুলো নিরীহ প্রাণ। আমি না হয় জানোয়ার। দল বাঁচাতে সবাইকে মেরে, নিজেও মরতে পারব। কিন্তু তুমি তো ভালো মানুষ।'
তাজের ঠোঁটের কোণে পেশাদার প্রশংসার হাসি ফুটে উঠল। বালিশের নিচ থেকে সরিয়ে নিলো হাতটা। সিগারেটে টান দিলো ঠিক রুদ্রর মতোই, 'অসাধারণ। রাশেদ আমেরের রক্ত বলে কথা। বৃথা যায়নি। তাহলে? এখন কী করবে? নেগোসিয়েশন?"
মাথা দোলালো রুদ্র, 'ন্যাহ। আমার ডিকশনারীতে বেইমানির কোনো নেগোসিয়েশন হয় না ইশতিয়াক ভাই। একবার তুমি বলেছিলে না, রোগ। রোগের সঙ্গে কোন নেগোসিয়েশন হয়না, গোড়া থেকে তুলে ফেলতে হয়।'
রুদ্র সিগারেটটা টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেতে টিপে নিভিয়ে দিল। এরপর উঠে দাঁড়াল ধীরেসুস্থে। নিজের জ্যাকেটটা খুলে ফেলল একপাশে। তাজের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'রিফ্লেক্স অ্যাকশন কমব্যাটের মাস্টার তুমি, রাইট? কিন্তু আমিও রুদ্র। রুদ্র আমের। আজকে কোনো সোলার সিস্টেমের ক্যাডার না। শুধু তুমি আর আমি থাকব। যদি তুমি জেতো, তবে সোলার সিস্টেমের ধ্বংস হাতে নিয়ে তুমি চলে যাবে। নিরাপদে। আর যদি আমি জিতি..."
তাজ আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। সে বুঝল, রুদ্র ওকে কোনোরকম কোন মানসিক স্পেস দেবে না। কিন্তু নিজের কাজ সম্পূর্ণ করতে হলে ওকে বেঁচে থাকতে হবে। ও এই পৃথিবীতে না থাকলে কেবল ওর মা আর বউ নিঃস্ব হবেনা।দেশেরও বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। যা আটকানোর ও প্রাণপণ চেষ্টা করবে।
তাজ টেবিলটা এক ঝটকায় রুদ্রর দিকে লাথি মেরে ঠেলে দিল। স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে উঠল বসা থেকে। টেবিলটা রুদ্রর গায়ে লাগার আগেই রুদ্র এক পাশে ডাইভ দিল। ইশতিয়াক চোখের পলকে রুদ্রর বুক বরাবর একটা হাইকিক ছুড়ল। কিন্তু রুদ্রর বডি রিফ্লেক্স ছিল অতিমানবীয়। ও নিচে ঝুঁকে তাজের পাটা লক করা দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু তাজ এক সেকেন্ডেরও কম সময় নিয়ে নিজের শরীরকে বাতাসে ঘুরিয়ে রুদ্রর চোয়ালে সজোরে একটা জ্যাব মারল। আঘাতে রুদ্রর ঠোঁটের কোণ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু ওর চোখ দুটোয় কোনো ব্যথার অনুভূতি দেখা গেল না। ও উল্টো ঘুরে তাজের বুকের মাঝবরাবর নিজের পুরো শক্তি দিয়ে কনুইয়ের আঘাত করল। ঠিক সেই ব্লাইন্ড স্পটে, যে ব্লাইন্ড স্পটের কথা তাজ প্রথম দিন শুটিং রেঞ্জে বলেছিল। অর্থাৎ তাজের কাছ থেকে শেখা স্কিলগুলোই ও তাজের বিরুদ্ধে এপ্লাই করছিল।
রুদ্রর আঘাতে তাজ তিন কদম পিছিয়ে গেল। ওর ফুসফুস থেকে বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার একটা ঘড়ঘড়ে শব্দ হলো। কিন্তু সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে ক্লোজ কোয়ার্টার কমব্যাটের টেকনিক ব্যবহার করে রুদ্রর ডান হাতটা লক করে পিঠের দিকে মুচড়ে ধরল। রুদ্রর পিঠের সেই পুরোনো লোহিত রেখাগুলো তীব্র যন্ত্রণায় টনটন করে উঠল। তাজ রুদ্রর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল, 'আ'ম প্রাউড! বন্ধু আমি ভালো না হলেও, গুরু হিসেবে অসাধারণ কিছু। তাইনা? কিন্তু গুরু গুরুই হয়।'
বিন্দুমাত্র বিচলিত হলোনা রুদ্র। বরং হাসল। এক ভয়ংকর, পৈশাচিক হাসি। ও নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা না করে, নিজের শরীরকে আরও পেছনে ঠেলে দিল। যার ফলে মুহূর্তেই তাজের নিজের শরীরের ব্যালেন্স নষ্ট হয়ে গেল এবং দুজনেই একসাথে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। মেঝেতে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে হাতের তালু দিয়ে তাজের ঘাড়ের এক বিশেষ অংশে সজোরে আঘাত করল রুদ্র। তাজ কোনকিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটে গেল ঘটনাটা। ফলে, মেঝেতে পড়ার সঙ্গে ষঙ্গে জ্ঞান হারাল তাজ।
———
চোখ খুলেই আশেপাশে সবকিছু ঝাপসা দেখল তাজ। প্রথমে চারপাশটা অন্ধকার লাগল। নড়তে গিয়ে বুঝল খুব শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে ওকে। ঘাড়ের পাশটা মারাত্মক ব্যথায় টনটন করে উঠল। আবছা অন্ধকারে চোখের সামনে প্রথমে দুটো পুরুষ অবয়ব দেখল, ঝাপসা। কিন্তু চোখ ঝাপটা দিতেই ধীরে ধীরে পরিস্কার হল দৃষ্টি। রুদ্র আর উচ্ছ্বাস! আবছা আলোয় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুজন। ওকে এক মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে খাটের পায়ার সঙ্গে। ঘাড়ের ব্যথাটা প্রাণঘাতি মনে হচ্ছে ওর। কিন্তু এই ব্যথার চেয়েও ভয়ংকর যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু অপেক্ষা করছে ওর জন্যে, সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছে তাজ। বিশ্বাসঘাতকদের রুদ্র ঠিক কতটা ঘৃণা করে তা জানে ও। সেই ঘৃণার সবটুকু যে আজ ওর ওপর উগলে দেবে যা বোঝার অপেক্ষা রাখেনা।
উচ্ছ্বাসের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আছে। চোখে বিষাদ। সেই চোখে একপলক দেখেই চোখ সরিয়ে নিল তাজ। এখন আর কিছু বলার বা করার নেই। এই মুহূর্তে জীবনের সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় আছে ও। তাজের পক্ষে যে আর বেঁচে ফেরা সম্ভব না তা তাজ নিজেও জানে। উচ্ছ্বাসও বলার মতো কিছু পেলোনা। তাজ তার কাজ করছিল। সুতরাং তাকে এই প্রশ্ন করা যায়না, কেন করল।
এদিকে রুদ্র ভীষণ নির্বিকার। চোখ মুখে এক নিরেট স্তব্ধতা। উচ্ছ্বাসকে এখানে আসার আগেই টেক্সট করে রেখেছিল রুদ্র। সেকারণেই এসেছে ও। রাশেদ আমের পুরোপুরি এ বিষয়ে কিছু জানেন না। কিন্তু রুদ্রর দ্বারা সংকেত তিনি অনেক আগেই পেয়েছিলেন। যেহুতু ব্যপারটা রুদ্র নিজে দেখছে তাই আর ব্যপারটা নিয়ে মাথা ঘামায়নি সে। সেই খুলনা ডেলিভারির মিশন থেকে শুরু করে প্রতিটা ফিল্ড মিশনে রুদ্রর একরোখা, হিংস্র কিন্তু সফল আক্রমণ এবং লীডারশীপ রুদ্রর প্রতি তার পরিপূর্ণ আস্থা এনে দিয়েছে এই চারবছরে। এসব বিষয়ে ছেলেকে চোখ বুজে বিশ্বাস করতে পারেন উনি।
না পেরে উচ্ছ্বাস অসহায় গলায় বলেই ফেলল, ' আর কোন দল পেলেনা, তাজ ভাই? শেষমেশ সোলার সিস্টেমের ট্রেইটর হতে হল?'
তাজ শীতল চোখে তাকাল উচ্ছ্বাসের দিকে। ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, ' জয়েন করার আগে ক্ষমতাধর ক্রিমিনালদের এড়িয়ে যাব কিংবা বাঁচিয়ে দেব, এমন কোন প্রতিজ্ঞা করিনি আমি। আই ওয়াজ ডুয়িং মাই ডিউটি, এন্ড আই ডোন্ট রিগ্রেট দিস এট অল।'
রুদ্র নড়ল এবার। উচ্ছ্বাসের হাত থেকে টুলবক্সটা নিয়ে ধীরে পায়ে এসে বসল তাজের ঠিক সামনে। চোখমুখ ভীষণ শান্ত, স্বাভাবিক। শরীর মৃদু উঠল উচ্ছ্বাসের। অস্থির হয়ে বলল, 'আ-আমি করি? মেরে ফেললেইতো হলো। মাথায় একটা শ্যুট করে_'
' বেশি দরদ লাগলে বাইরে চলে যা।' থমথমে গলায় আদেশ দিল রুদ্র।
উচ্ছ্বাস সামান্য অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল। ভেতরটা চিনচিন করে উঠল ওর। ছ'টা মাসে ভীষণ মায়া পড়ে গেছে ছেলেটার ওপর। কিছু বলতে নেবে তার আগেই রুদ্র ধমক দিয়ে বলল, 'যা!'
উচ্ছ্বাস শেষ একবার তাকাল তাজের দিকে। ব্যথায় ঘাড় বাঁকাল তাজ। উচ্ছ্বাসে দিকে তাকিয়ে আলতো শব্দে হেসে বলল, 'ওকে বললে ও শুনবেনা, তা আমি জানি। তাই যাওয়ার আগে তোকে বলে যাচ্ছি। ভালোয় ভালোয় এসব ছেড়ে চলে যা দূরে কোথাও। এই জগতে সোলার সিস্টেমের ধ্বংস খুব নিকটে, উচ্ছ্বাস। বাঁচতে পারবিনা। সব মিথ্যের মধ্যে একটা নিষ্ঠুর সত্যি হল, আমি তোদের দুজনেরই মায়া অনুভব করি।'
রুদ্র অপলক চোখে তাকিয়ে রইল তাজের দিকে। হাতে ছু*রিটা একই ছন্দে নাড়াচ্ছে। ওর মনোভাব কেবল ও ছাড়া আর কারো বোঝার উপায় নেই। চোখ নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল উচ্ছ্বাস। অতঃপর বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। কারণ এখন যা ঘটবে তা দেখার মতো মানসিক শক্তি ওর নেই।
———
উচ্ছ্বাস বের হতেই রুদ্রর দিকে শান্ত চোখে তাকাল তাজ। টুলবক্সটার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, 'টর্চার করে ইনফরমেশন নেবে? কোথায় তথ্য দিয়েছি, কতটা দিয়েছি, আর কেউ আছে কিনা সঙ্গে, এসব জানতে চাও? এন্ড ইউ থিংক আ'ল টেল দ্যাট? তারচেয়ে বেটার একেবারে মেরে ফেল। তোমার এনার্জি আর সময়, দুটোই বাঁচবে।'
রুদ্রও হাসল। ধীরেসুস্থে টুলবক্স থেকে একটা ধারালো সারজিক্যাল স্ক্যালপেল বের করল। ল্যাম্পের আলোয় চকচক করে উঠল স্টিলের ফলাটা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সেই ফলা পরীক্ষণ করতে করতে রুদ্র বলল, 'একবারে মেরে ফেললে তো ওটা প্রফেশনাল অ্যাসাসিনেশন হয়ে যায় তাজ ভাই। আর কিছু জিজ্ঞেস করলে সেটা কাইন্ড অব ডিল। আর তুমি কিছু বলবেও না, আই নো দ্যাট। কিন্তু আমার চোখে বেইমানির শাস্তি কোনো প্রফেশনাল ডিল হতে পারে না। সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি আমি বিশ্বাসঘাতকতাকে, আর বিশ্বাসঘাতকের জন্যে সহজ মৃত্যু নয়।'
তাজ স্থির চোখে তাকিয়ে আছে রুদ্রর দিকে। নিজের শক্ত দৃঢ় নার্ভের ফলেই নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে বসেও এতো শান্ত, স্থির আছে ও। রুদ্র খুব আলতো করে স্ক্যালপেলের ঠান্ডা ফলাটা তাজের গালের ওপর রাখল, 'তুমি এই ছয় মাস আমার বিশ্বাসের দেওয়ালে আঘাত করে গেছো। আমি সত্যিটা জানতাম ঠিকই, কিন্তু তুমিতো তা জানতেনা সেটা। যে হাত দিয়ে তুমি সোলার সিস্টেমের ডাটা কপি করতে, সেই হাতের সহ্য ক্ষমতা একটু পরখ করা যাক?'
রুদ্রর চেহারায় কোন ক্রোধের ছাপ ছিলোনা। ও অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় তাজের ডান হাতের তর্জনীটা ধরল। কেউ যেন কলিজা চিপে ধরল তাজের। চোখের সামনে ভেসে উঠল নিজের বৃদ্ধা মা আর প্রিয়তমা স্ত্রীর মুখটা। কিন্তু মুখে একটা শব্দও করল না। রুদ্র হঠাৎ স্ক্যালপেলের ফলাটা নখের গোড়ায় নিখুঁতভাবে ঢুকিয়ে এক টানে নখটা উপড়ে ফেলল।
'উহহহহ!' তাজ দাঁতে দাঁত চেপে একটা তীব্র গোঙানি দিল। যন্ত্রণায় কুঁচকে গেল সুদর্শন মুখটা। কিন্তু মুহুর্তে সামনে নিল নিজেকে। ওর নখের নিচ থেকে তাজা লাল রক্ত ফিনকি দিয়ে ছিটকে এসে লাগল রুদ্রর গালে। রুদ্র হাতটা মুছল না। ও নিস্পৃহ গলায় বলল, 'ইমপ্রেসিভ! সিটিইউ এর ট্রেনিংয়ে নিশ্চয়ই পেইন টলারেন্স শেখায়? তোমার লিমিট কতদূর?'
রুদ্র এবার স্ক্যালপেলটা সরিয়ে একটা ছোট কাটিং প্লাইয়ার্স নিল। ও তাজের সেই উপড়ে ফেলা নখের আঙুলের ডগাটা প্লাইয়ার্স দিয়ে চেপে ধরে হাড় সমেত পিষে দিতে লাগল। নিস্তব্ধতা ভেঙে হাড়ের গুঁড়ো হওয়ার একটা মচমচে শব্দ হলো। তাজ এবার আর নিজের চিৎকার ধরে রাখতে পারল না। রুমের বাতাসে তার আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হলো। কপালের রগগুলো ফুলে ফেঁটে যাওয়ার উপক্রম হলো ওর।
মুখ দিয়ে লালা আর রক্ত মিশে ঝরে পড়ছিল তাজের। ও রক্তিম চোখে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে হাঁপানো গলায় বলল, 'ডু ইউ নো, তুমি একটা সাহ- সাইকো? রাশেদ আমের যত্ন করে একটা সাইকো তৈরীহ্- তৈরী করেছেন?'
রুদ্র মনে মনে অবাক হল তাজের অসাধারণ নার্ভ দেখে। সেই সঙ্গে ওর কথায় রেগেও গেল ভীষণ। কিন্তু চেহারা রইল একদম নির্বিকার। শান্ত থেকেই ও একটানে ছিঁড়ে ফেলল তাজের গেঞ্জিটা। অতঃপর ওর সুগঠিত বুকের চামড়ার ওপর ও স্ক্যালপেল দিয়ে খুব ধীরগতিতে একটা একটা করে গভীর আঁচড় কাটতে লাগল। যন্ত্রণায় তাজ শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে নড়তে চাইল। কিন্তু শক্ত বন্ধনের ফলে পারল না ঠিকঠাকভাবে। প্রতিটা টানে চামড়া চিড়ে ভেতরের লাল মাংসপেশিগুলো উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছিল। রক্তে ভিজে যাচ্ছিল ফ্লোর।
অসহ্য যন্ত্রণায় চারপাশে অন্ধকার দেখল তাজ। ওর মনে পড়ল, ঠান্ডা লাগলে এই বুকে কী যত্ন করে গরম তেল মালিশ করে দিতো ওর মা। যাতে ব্যথা না পায় তার জন্যে কত মোলায়েমভাবে ধীরে চলতো তার হাত। ওর স্ত্রী পুষ্পিতা। ভীষণ পছন্দের ছিল তার এই বুকটা। মেয়েটা বড্ড ভালোবাসে ওর বুকে মাথা রেখে ঘুমোতে। ওরা আর কোনদিন পাবেনা এই বুকটা। মানুষ দুটোকে ও আর কোনদিন দেখতে পাবেনা। কেমন লাগবে ওদের যখন ওর এই ক্ষতবিক্ষত বুকটা তারা দেখবে? খুব বেশি কষ্ট পাবে কী? অভিভাবকহীন কীভাবে কাটাবে তারা তাদের বাকি জীবনটা?
তাজের ভাবনার মাঝেই রুদ্র ওর একটা গভীর ক্ষতের ওপর নিজের বুড়ো আঙুলের তীব্র চাপ দিয়ে বলল, 'আমার বাবা আমাকে অপ্রতিরোধ্য তৈরী করেছেন। আর তুমি ভেবেছিলে তোমার এই ঠুনকো আইন দিয়ে আমাকে শেষ করবে? পৃথিবীতে এমন কোন আইন কিংবা আইনের লোক জন্ম নেয়নি, যা রুদ্র আমেরকে শেষ করতে পারবে।'
তাজের চোখের আলো ধীরে ধীরে নিভে আসছিল। শক এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ও শরীর কাঁপছিল। ও বুঝতে পারছিল, রুদ্র ওকে মরতে দিচ্ছে না। আবার বাঁচতেও দিচ্ছে না। প্রতিটা সেকেন্ডে নরক যন্ত্রণা দিচ্ছে। দাঁতে দাঁত পিষে সেই যন্ত্রণা সয়ে তাজ বলল, ' ইহউ নেহ-ভার নো!'
' আই নো... আর কোনদিন তা হলেও, আমার ইচ্ছেতেই হবে।'
কথাটা বলে লম্বা শ্বাস ফেলল রুদ্র। শেষবারের মতো তাজের আধবোজা চোখ দুটোর দিকে তাকাল। সেই চোখে এখন আর কোনো যন্ত্রণার ছাপ নেই। আছে শুধু এক অন্তহীন শূন্যতা। রুদ্র গম্ভীর স্বরে বলল, 'কোন শেষ ইচ্ছা আছে, তাজ ভাই?'
আধবোজা চোখজোড়া সামান্য খুলল তাজ। কয়েক সেকেন্ড
অদ্ভুত চোখে চেয়ে রইল রুদ্রর দিকে। অতঃপর কোনমতে সুস্থ আঙুল তুলে দেখাল টেবিলে ড্রয়ারের দিকে। কোনমতে উচ্চারণ করল, ' চ-চিঠি আছে দু-ট, দুটো। আ-আমার মা আর স্-স্ত্রীর কাছে পৌ_ '
আর বলতে পারল না তাজ। জোরে জোরে হাপাঁতে লাগল। শ্বাস নিতে পারছেনা ও। ভয়ংকর যন্ত্রণা হচ্ছে গোটা শরীরে। দেখতে এমুহুর্তে একদলা র*ক্তা*ক্ত মাংসপিন্ডের মতো লাগছে ওকে। অতিরিক্ত র*ক্তক্ষরণ আর যন্ত্রণায় শরীর নড়ছেনা এখন আর।
রুদ্র বুঝে ফেলল তাজে শেষ ইচ্ছে। ও উঠে দাঁড়াল। তাজের বালিশের থেকে ওর সেই কাস্টমাইজড নাইন এমএম পি*স্ত*লটা হাতে নিল। ধীরপায়ে এগিয়ে হাঁটু ভেঙে বসল তাজের সামনে। ব্যারেলটা তাজের কপালের মাঝখানে ঠেকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, 'গুডবাই, তাজ ভাই। সি ইউ ইন হেল, ইফ দ্যট এক্সিস্ট।'
ধীর গতিতে চোখ বুজল তাজ। শেষবারের মতো স্মরণ করল মায়ের মুখটা, স্ত্রীয়ের সেই লাজুক হাসি, ছোট্ট বোনটার সেইসব দুষ্টুমি, বাবার ছায়া। যা আর কোনদিন ও দেখতে পাবেনা। অনুভব করতে পারবেনা। আঠাশ বছরের এই জীবনটা এখানেই শেষ। চোখের কার্নিশ বেয়ে অন্তিম একফোঁটা জল গড়িয়ে নামল ওর। রুদ্র মনোযোগ দিয়ে দেখল সেই জল। ওর চোখে কী খেলে গেল, বোঝা মুশকিল।
‘ফাত্’ করে একটা সাইলেন্সড ফায়ারের শব্দ হলো। চোখ দুটো বিস্ফোরিত হয়ে ঝাঁকি খেয়ে উঠল তাজের শরীর। ওর নিস্তেজ মাথাটা ঝুলে পড়ল একপাশে। পৃথিবী থেকে বিদায় নিল কাউন্টার টেররিজম এর তুখোড় অপারেটর। ইশতিয়াক রহমান।
রুদ্র মেঝেতে ফেলে দিল পি*স্ত*লটা। নিজের রক্তাক্ত হাত দুটোর দিকে তাকাল একবার। অতঃপর একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তাজের প্রাণহীন খোলা চোখদুটোর দিকে। কতক্ষণ তাকিয়ে ছিল জানেনা ও। কিন্তু এরপর মেসেজ করল উচ্ছ্বাসকে।
উচ্ছ্বাস অনেকটা হুরমুর করেই প্রবেশ করল ভেতরে। তাজের ক্ষতবিক্ষত লা*শটা দেখে চোখ বুঝে ফেলল। হাত মুঠো করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল একটা। উচ্ছ্বাসের পেছনে দলেথ আরও দুজন ঢুকেছে।
রুদ্র গিয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলল। দুটো খাম আছে। খামদুটো হাতে তুলে নিল ও। অতঃপর ওদের দিকে একপলক তাকিয়ে বেরিয়ে গেল ফ্লাটটা থেকে। উচ্ছ্বাস ঐ দুজনকে ওদের উপস্থিতির সব প্রমাণ মুছে দেওয়ার নির্দেশ দিল। কাজ শেষ করে শেষবারের মতো উচ্ছ্বাস তাকাল তাজের লা*শটার দিকে। অতঃপর বেরিয়ে এলো।
———
তাজের বুলেটবিদ্ধ, ক্ষতবিক্ষত লাশটি যখন সেই ফ্লাট থেকে উদ্ধার হয়, তখন বাইরের দুনিয়া ও পুলিশের নথিতে তা স্রেফ আমের ফাউন্ডেশনের এক সাধারণ আইটি কর্মীর খুন হিসেবেই ধামাচাপা পড়ে যায়। কাউন্টার-টেররিজম ইউনিটের যে দু-একজন শীর্ষ কর্মকর্তা তাজের আসল পরিচয় আর মিশন সম্পর্কে জানতেন, পর্যাপ্ত আইনি প্রমাণ না থাকায় এবং নিজেদের পুরো আন্ডারকভার অপারেশন ফাঁস হওয়ার ভয়ে তারা প্রকাশ্যে কিছুই বলতে পারেন না।বাকিটা রাশেদ তার নিজ কানেকশন এবং ক্ষমতাবলে সামলে নেন। যেটুকু ইনফরমেশন তাজ লিক করতে পেরেছিল তা সামলাতে বেশ কিছু টাকা খুয়োতে হয়েছে রাশেদকে। সেইসঙ্গে কিছু বড় বড় জায়গায় দিতে হয়েছে কিছু কমিটমেন্ট।
যদিও হত্যা প্রক্রিয়াটা পছন্দ হয়নি রাশেদের। তবে ব্যপারটা নিয়ে তেমন ঘাটায়নি সে রুদ্রকে। কেবল গম্ভীর স্বরে বলেছিলেন, ' নিজেদের সুরক্ষার জন্যে ওকে মারা দরকার ছিল। তা আমি জানি। কিন্তু এতো নৃশংসভাবে মেরে তুমি ঠিক করোনি। আমি তোমাকেও আগেও বহুবার বলেছি, খু*ন মাথায় একটা বু*লেট খরচ করেও করা যায়।'
বরাবরের মতোই কোন জবাব দেয়নি রুদ্র। চোখ নিচে রেখে শুনেছে কেবল।
****
পরিস্থিতি খানিকটা স্বাভাবিক হতেই রুদ্রর মনে পড়ল তাজের সেই শেষ ইচ্ছের কথা। চিঠিদুটো পৌঁছে দিতে হবে ওর মা আর স্ত্রীয়ের কাছে। তাই কাউকে কিছু না বলেই একদিন নিজে একা জিপ বেরিয়ে পড়ল মুন্সীগঞ্জের উদ্দেশ্যে। পথ যত কম ছিল ততই অদ্ভুত অনুভব করছিল। জীবনের তেইশটা বছরে এমন অনুভব সে কখনই করেনি।
আসল কথা চিঠি দুটো পড়েছিল রুদ্র। অমন বিভৎস যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর শেষপ্রান্তে এসেও এই চিঠিদুটো সে বাড়িতে পৌঁছতে বলেছে। কী এমন আছে তাতে, জানার কৌতূহল হয়েছিল ওর। প্রথম চিঠিটা ছিল ওর মায়ের উদ্দেশ্যে। যেখানে লেখা ছিল-
প্রিয় মা,
কেমন আছো? ছয়টা মাস হলো, তোমার ঐ মুখটা দেখিনা। ক্লান্ত হলে তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমোতে পারিনা। তোমার হাতে খেতে পারিনা। ভীষণ মনে পড়ছে সেসব। জানিনা, আর কোনদিন সেইসব আমার কপালে জুটবে কিনা। তুমিতো জানো আমার পেশায় প্রতি সেকেন্ডে মৃত্যু কাঁধে নিয়ে ঘুরতে হয়। আর এবার আমি যেখানে আছি, সেখান থেকে আমার বেঁচে ফেরাটা আলৌকিক কিছুই হবে। ইদানিং অদ্ভুত সব অনুভূতি হচ্ছে জানো? আজেবাজে সব স্বপ্ন দেখছি। মনে হচ্ছে বেশিদিন বোধহয় বাঁচব না। মাগো, তোমাকে একটাবার দেখতে ইচ্ছা করছে মা। শেষবার বেরিয়ে আসার সময় কেমন ভয় নিয়ে তাকিয়ে ছিলে আমার যাওয়ার দিকে। সেই দৃশ্য মনে পড়লেও বুকে চিনচিনে ব্যথা হয়।
আমি যদি আর জীবিত নাও ফিরি, কষ্ট পেওনা। জানবে, ন্যায়ের কাজে একজন সাহসী, সৎ মানুষের মতো প্রাণ দিয়েছে তোমার ছেলে।
আমার যা ছিল সবকিছুই তোমার আর পুষ্পির। হুইলটা রাখা আছে আলমারির প্রথম ড্রয়ারেই। পুষ্পিকে কোন বাঁধনে আটকে রেখোনা মা। উড়তে দিও। নিজের যত্ন নিও। ঠিকমতো খাবার আর ঔষধ খেও। আমি না থাকলেও তুমি থেকো মা। নয়তো আমারযে পৃথিবীতে আর কেউ থাকবেনা।
তোমার ইশু।
লেখাটা পড়ে কেমন অদ্ভুত লাগছিল রুদ্র। না দুঃখ, না আফসোস। তবুও কেমন যেন অনুভূতি। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল এক কোমল, হাস্যজ্বল রমনী। ও মা। আঙ্গুল দিয়ে ছুঁয়ে দিয়েছিল ঘাড়ের ইনফিনিট সাইনের ট্যাটুটাকে। গতবছরই করিয়েছিল এটা। সেই ইনফিটিনিট সাইনের লকেটটা ভেঙে ফেলার পর মায়ের আর কোন স্মৃতি নেই ওর কাছে। তাই এটাকেই স্মৃতি ধরে নিয়েছি। ওর ট্যাটুর ও ছাড়া পৃথিবীর আর কেউ জানেনা।
আরেকটা চিঠি লিখেছিল তাজ। তার স্ত্রী পুষ্পিতাকে। সেই চিঠিটাও দেখেছে রুদ্র। দেখা ছিল-
পুষ্পি,
সংসার জীবনে আমরা বোধহয় দুইমাসও ঠিকঠাক এক ছাদের নিচে কাটাইনি। যখন তুমি সারারাত দুশ্চিন্তায় জেগে থেকে রাতের আকাশ দেখতে। আমি হয়তো দূরের কোন এলাকায় জীবন-মরণের খেলা খেলতাম। আমি স্বীকার করি, স্বামী হিসেবে আমি কখনই তোমার প্রতি আমার সব দায়িত্ব পালন করিনি। সেইসঙ্গে আমার গর্বও হয়, তুমি কখনও সেসব নিয়ে কখনও অভিযোগ করোনি। বরং অহংকার করেছো। আমার দায়িত্ব বুঝেছো। নিজের সখ আল্হাদ বিসর্জন দিয়েও আমার পাশে থেকেছো। এবারের দূরত্বটা একটু বেশিই হল। কেঁদেছো বুঝি খুব? রাগ করেছো? আজ ছটা মাস হলো তোমার সঙ্গে নেই আমি। তোমার সেই হাসিমাখা মুখটা আমি দেখতে পাচ্ছিনা। তুমি কেমন আছো, আমি তা জানিনা। তবে এইটুকু জানি, ভীষণ মিস করি তোমাকে। কপালে কালো টিপ পরে যখন তুমি আমার দিকে তাকাতে, আমার মনে হতো পৃথিবীর সব অন্ধকার নিমেষেই উধাও হয়ে গেছে। তোমাকে একটা শান্ত, সাধারণ সংসার দেওয়ার, একটা ফুটফুটে সন্তান দেওয়ার যে ইচ্ছেটা আমার বুকে পাথর হয়ে জমে আছে, সেটা সত্যি করার জন্য হলেও আমি ফিরে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করব।
আর যদি কোনোদিন আর নাই ফিরি, তবে আমার ওপর রাগ করে থেকো না। জীবনটা অনেক সুন্দর, একে মাঝপথে থামিয়ে দিও না। আমায় ভুলে নতুন করে শুরু করো সবটা। উইল কোথায় আছে তুমি জানো। নিজের পাওনাটুকু বুঝে নিও। তবে হ্যাঁ, নতুন কারো সঙ্গে জীবন শুরু করলেও মাঝেমধ্যে মায়ের একটু খোঁজ নিও। মানুষটা ভীষণ অসহায়। আমরা ছাড়া ওনার আর কেউ নেই পৃথিবীতে।
ভালো থেকো, আমার অর্ধাঙ্গিনী। সম্ভব হলে এই অপারগ স্বামীকে ক্ষমা করো।
তোমার ইশতিয়াক।
রুদ্র প্রেম- ভালোবাসা বোঝেনা। ঐ চিঠির মর্মাথটাও ও বোঝেনি সেদিন। কেবল পড়েছে।
———
ইশতিয়াকের বাড়িতে গিয়ে নক করার খানিক পরে দরজা খুলে দেয় এক বৃদ্ধা মহিলা। রুদ্রকে দেখে অবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। কোনমতে বলে, 'আপনি?'
' এটা মৃত ইশতিয়াক রহমানের বাড়ি না?' শান্ত গলায় প্রশ্ন করে রুদ্র।
বৃদ্ধা কেমন নড়ে ওঠে। বেদনার ছাপ ছড়িয়ে পরে মুখে। সে মাথা নাড়িয়ে বলে, ' হ্যাঁ। আমি ওর মা, রুজিনা। আপনি?'
' ভেতরে এসে কথা বলি?'
রুজিনা অনুমতি দেন। তারসঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে রুদ্র। ভেতরে থেকে এক যুবতী মেয়ে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসে। মেয়েটা সাত-আট মাসের গর্ভবতী। তাকে দেখামাত্র থমকে যায় রুদ্র। মেয়টাও থমকে তাকায়। এটাই পুষ্পিতা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। সে গর্ভবতী! তাজ কী জানতো সেকথা। নিজেকে সামলে গলা ঝাড়ে। থমথমে গলায় জানায়, 'আমি রুদ্র। রুদ্র আমের। আমাদের ফাউন্ডেশনেই কাজ করতো ইশতিয়াক ভাই।'
পুষ্পিতা কথাটা শোনামাত্র স্থির চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রুদ্রর দিকে। অতঃপর বলল, 'বলুন?'
রুদ্র পকেট থেকে চিঠিদুটো বের করে যার যার চিঠি তার তার হাতে দিয়ে বলর, 'ওর টেবিলে পাওয়া গেছে।'
নিঃশব্দে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করল দুজন। একপর্যায়ে 'আমর মানিক' বলে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ফ্লোরে বসে পড়লেন রুজিনা। পুষ্পিতার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। পেটে হাত রেখে ফুঁপিয়ে উঠল ও।
রুদ্রর ভ্রুকুটি করল। লম্বা শ্বাস নিয়ে চলে যেতে নিলেই হুট করে পুষ্পিতা বলে উঠল, 'কেন মারলেন ওকে? আমার অনাগত বাচ্চাটাকে এভাবে অনাথ কেন করলেন? সেতো জানতেও পারল না, সে বাবা হচ্ছে।'
রুদ্র বিস্ময় নিয়ে তাকাল। ওতো জানতো এসব অফিসারদের পরিচয় তার পারিবারের কাছেও গোপন থাকে। এরা কী জানে? কতটা জানে? তবুও প্রশ্ন করল, 'মানে?'
'মানেটা ভালোভাবেই জানেন আপনি। আমি সব জানিনা ঠিক তবে কিছুটা জানি। কিছুটা ধারণা করতে পারি। মারার কারণ বুঝেছি। সে নিয়ে কিছু বলার নেই আমার। আপনি শাস্তি পাওয়ানোর মতো ক্ষমতাধর আমরা নই। আইনতো কিনে রাখেন আপনারা। কিন্তু... কিন্তু এমন জন্তুর মতো কেন মারলেন ওকে? কেন ওকে এতোটা কষ্ট দিয়ে মারলেন? ওর লা*শটা... লা*শটার দিকে তাকানো যাচ্ছিলোনা। কী বিভৎসভাবে_'
রুদ্র লম্বা শ্বাস নিল। গম্ভীর আওয়াজে বলল, 'বিশ্বাসঘাতকার শাস্তি দিয়েছি কেবল।'
তাচ্ছিল্য করে হাসল পুষ্পিতা। কান্নাভেজা গলায় বলল, 'শাস্তি? বিশ্বাসঘাতকতার জন্যে আপনি আমার ভালোবাসার মানুষকে এভাবে খু*ন করলেন? আমার বাচ্চাটাকে পিতাহারা করলেন? একবারও ভাবলেন না ওর কাছের লোকের কতটা কষ্ট হবে? যদি এই একই বিশ্বাসঘাতকতা আপনার ভালোবাসার মানুষ করে? পারবেন তাকে একইভাবে শাস্তি দিতে?'
রুদ্র ঠান্ডা দৃষ্টি দিল পুষ্পিতার দিকে। থমথমে গলায় বলল, 'আমার কোন ভালোবাসার মানুষ নেই। আর না কখনও হবে। যদি থাকতোও, তার শাস্তি ভিন্ন কিছু হতো না। বিশ্বাসঘাতকদের সহজ মৃত্যু দেইনা আমি। সে আমার যত কাছের লোকই হোক।'
কথাটা বলে পুনরায় যাওয়ার জন্যে পা বাড়াচ্ছিল রুদ্র। কিন্তু এবার আটকালো রুজিনা গলায় আওয়াজ। কান্নায় ভেঙ্গে পরে সে বলে উঠল, ' আর সন্তান? সন্তানের সখ নেই তোমার? নাড়ি ছেড়া ধন যখন র*ক্তা*ক্ত, নিষ্প্রাণ হয়ে সামনে পড়ে থাকে, তখন কেমন লাগে জানো তুমি? এই জগত কতটা যন্ত্রণার লাগে জানো? জানো না! না জানি কত মায়ের কোল এভাবে খালি করেছে তোমার ঐ পাপি হাত। পাপী! জানোয়ার একটা!'
রুদ্র কিছু বলল না আর। শার্ট থেকে সানগ্লাসটা বের করে চোখে পড়ে নিল। এরপর পা বাড়ালো বাইরের দিকে। বের হতে হতে শুনতে পেল রুজিনার হাহাকার ভরা আর্তনাদ, 'জানবে! একদিন না একদিন তুমি জানবে সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কেমন হয়। সেই হাহাকার, বিলাপ তুমি উপলব্ধি করবে। পাপ কখনও পিছু ছাড়েনা রুদ্র আমের! একদিন না একদিন তুমি তা জানবে। জানবেই! এক সন্তানহারা মায়ের হায়, অভিশাপ এটা। অভিশাপ।'
———
টুপ করে এক ফোঁটা জল পড়ল ছোট্ট দোলনাটার ওপর। রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুকে চেপে ধরল দোলনাটা। রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে তীক্ষ্ম চোখদুটো। অদ্ভুত যন্ত্রণার চাপে যেন বুকের পাজর ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাচ্ছে ওর। নিজের সেই অস্তিত্বের অংশটুকুর জন্যে ছটফট করছে ভেতরটা। যে আর নেই, ভ্রুণাবস্থাতেই বিদায় নিয়েছে।
রুদ্রর জীবনের অসংখ্য পাপের অধ্যায়ের মধ্যে এই অধ্যায়টা খুবই গোপন। হাতে গোণা চারপাঁচজনই জানে তা। তাজকে ভালোভাবে মনে থাকলেও, বেমালুম ভুলে গিয়েছিল সেই অভিশাপের কথা। কিন্তু প্রকৃতি ভোলেনি। সে ভোলেনা কিচ্ছু। সবকিছু কড়ায়-গন্ডায় ফিরিয়ে দেয়।
রুদ্র নিজের মুখটা চেপে ধরল দোলনার ওপর। চোখ বুজে ফিসফিসিয়ে বলল, 'ডোন্ট..ফরগিভ ইউর ড্যাড, মাই চ্যাম্প। নেভার, এভার!'
·
·
·
চলবে……………………………………………………