শুক্লপক্ষের পরিশেষে - পর্ব ৪৫ - নবনীতা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

শুক্লপক্ষের পরিশেষে - নবনীতা শেখ
          প্রিয়-শরতের বিয়ের চতুর্থ দিনই তারা ঢাকায় শরতের ফ্ল্যাটে ফিরল। শরৎ আসার পথে বাইরে থেকে দুপুরের খাবারটা নিয়ে এসেছে। প্রিয় পুরোটা রাস্তা বেশ চুপচাপ ছিল। তার জার্নি করতে ভালো লাগে না। মাথাটা ভার হয়ে আছে। শরৎ একহাতে প্রিয়র হাত ধরে আছে, অন্যহাতে দরজা খুলল। খুলতে খুলতে একবার প্রিয়কে শুধাল,
-“ঠিক আছেন?”

মাথা নাড়ল সামান্য,
-“হুঁ।”
-“ওকে।”

দু'জনে ভেতরে প্রবেশ করল। যখন শরৎ এখান থেকে শান্তিকুঞ্জে গিয়েছিল, তখন এক প্রকার ব্যাচেলর ছিল বলেই ধরা যায়। তাই প্রিয়র ধারণা ছিল, বাসাটা বেশ অগোছালো, অপরিপাটি, অপরিচ্ছন্নসহ বিভিন্ন অ-উপসর্গযুক্ত শব্দ। তারপর তার ধারণাটা ১৮০ ডিগ্রী এঙ্গেলে উলটে গেল ভীষণ রকমের সুরুচিসম্পন্ন ফ্ল্যাটটা দেখে। হালকা রঙের আসবাবগুলো, লাইট পার্পেল ও ল্যাভেন্ডার রঙের মিশেলে দেয়াল, সাদা পর্দাসহ পুরো বাসা এক পলকেই প্রিয়র কেন যেন খুব মনে ধরে গেল। শরৎ বলল,
-“আমার ছোট্ট ঘরটা আজ আমাদের ঘর হলো। প্রথম কদমে আপনাকে একটা কথা জানাব, যদি আমার হয়ে থাকেন তবে সে-কথার হেরফের আপনি করবেন না।”

প্রিয় তার দিকে তাকিয়ে শুধাল,
-“বলুন।”
-“আমার সামনে আপনি দ্বিধা রাখবেন না। যে-কোনো কথা, যে-কোনো বিষয়ে আমাকে জানাতে সংকোচ করবেন না। আমার কোনো কাজে আপনার খারাপ লাগলে, ব্যাপারটা চেপে যাবেন না। সরাসরি আমাকে বলবেন। মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং বিষয়টা বড়ো খারাপ। আমাদের মধ্যে এরকম কোনো সিচুয়েশন তৈরি হলে, আমরা আলোচনায় আসব। একটা মুখোমুখি বৈঠক ম্যাক্সিমাম সমস্যার সমাধা করতে পারে। বুঝেছেন?
চাপা স্বভাবটা ভালো নয়। আমার ওপর রাগ হলে, প্রকাশ করবেন। রাগের বহিঃপ্রকাশ আমরা সবার ওপর করতে পারি না। যার ওপর করি, নিঃসন্দেহে সে আপন। আমাকে নিজের মনে করবেন সবসময়। নিজের আধিপত্য দেখাবেন আমার ওপর। বিশ্বাস করুন, আপনার প্রতি এতে অভিযোগ না, কেবল ভালোবাসা আসবে আমার। প্রিয়! আমি আপনার। শুধু এটুকু মনে রাখবেন। শুধু এটুকু যদি মেনে চলেন, আল্লাহ চাইলে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত অবধি আমি আপনার হয়েই থাকব।”

প্রিয় মুচকি হেসে বলল,
-“নীরজ! আপনি মানুষটা বেশ জ্ঞানী।”
-“আর আপনি সাহসী।”
-“তাই নাকি?”
-“অবশ্যই। আপনি যেই সিচুয়েশনে ছিলেন, অন্য কোনো মেয়ে থাকলে সম্ভবত এখনও শ্বাস নিত না।”
-“আমিও ভীষণ যুদ্ধ করেছি, নীরজ। হসপিটালের বেড বেশিদিন ছেড়ে থাকতে পারিনি। গায়ে অনেক দাগ আছে। এখন ক্লান্ত। এত যন্ত্রণাও যখন আমি শ্বাস নিচ্ছি, বুঝে গেছি মৃত্যু সহজ নয়। সে কারণেই বেঁচে আছি। নীরজ, ভালো আছি আমি। তিন সত্যি।”

একহাতে আলতো করে বুকে জড়িয়ে নিল শরৎ প্রিয়কে। প্রিয় চোখ বুঁজে ফেলে বুক ভরে শ্বাস টানল। নাকে ভেসে এলো শরতের ম্যানলি পারফিউমের স্মেল। কী নেশালো! শরৎ সময় নিয়ে উষ্ণ চুমু আঁকল প্রিয়র সিঁথিতে। অনেকটা সময় পর বলল,
-“আমার রাজত্বে স্বাগত আপনাকে, রানীসাহেবা।”

গাল ভরে হেসে ফেলল প্রিয়।

—————

-“ভাই রে, এই প্রহইর‍্যা! এই ছোকরা এই! বাঁচা আমাকে।”

আয়াতের কথা শুনে প্রহর ভ্রুকুটি করে ফেলল। আয়াত কল দিলো, প্রহর কল রিসিভ করল। আর সঙ্গে সঙ্গে আয়াতের থেকে এরূপ কথা? অবশ্য অবাক হওয়ার মতোও নয়। আয়াত মানেই তো উদ্ভট সব কাজ-কর্ম। প্রহর মোটেও বিচলিত হলো না। খেতে খেতে বলল,
-“মরে গেছিস?”

আয়াত জবাবে বলল,
-“হু।”
-“কীভাবে?”
-“কীভাবে মানে?”
-“মানে সুইসাইডাল কেইস নাকি মার্ডার নাকি এক্সিডেন্ট?”
-“ভাই, মনে তো হচ্ছে তিনটাই। লেট মি এক্সপ্লেইন। বাপজানের বন্ধু আমার বাপের কাছে আমার হাত চাইছে, সো ইট'স অ্যান এক্সিডেন্ট। বাপজান রাজি হয়ে আমার কাছে প্রস্তাব দিছে, তো আই থিংক ইট ওয়াজ এটেম্পট টু মার্ডার। আর ফাইনালি আমি সময় চাইছি। এখন তুই যদি সলিউশন না দিস, ভাই আই সোয়্যার, রমনাতে গিয়ে তোকে খুন করব, তারপর নিজে সুইসাইড এটেম্পট করব। পেপারে পেপারে ছাপাবে—বিশিষ্ট শিল্পপতির মেয়ে মেহেরিন আয়াত সাওদাহ্ একজন ফিলিংসলেস, ম্যানারলেস, লাভলেস পুরুষকে হত্যা করে নিজে মৃত্যুকে বুকে টেনে নিয়েছে; একবিংশ শতাব্দীর ভালোবাসা মানেই আয়াত-প্রহর। আমাদের প্রেমের পরিণতি না-হোক, অমর হবে। ওসবের প্ল্যান পরে। আপাতত তোকে নিয়ে হানিমুনে উগাণ্ডা যাইতে চাইছি। সলিউশন দে রে ব্যাটা।”

বলতে বলতে হাঁপিয়ে গেল আয়াত। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তাদের বাসার হেল্পিং হ্যান্ড রুমু। বয়স ১৭ এর কাছাকাছি। দেখতে মিষ্টি ও আয়াতের ভীষণ রকমের বিশ্বস্ত। আয়াত তাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-“রুমু রে, পানি দে।”

রুমু পানি দিলো। আয়াত গ্লাসে চুমুক দিতেই প্রহর বলে উঠল,
-“রিল্যাক্স। হাইপার হওয়ার কিছু নেই।”

মেজাজের চোদ্দটা বেজে গেল আয়াতের, সঙ্গে সঙ্গে রুমুকে বলল,
-“এই রুমু! আমারে মাটি দে।”

রুমু এদিক-ওদিক খুঁজল৷ সাধারণত আয়াত যা কিছু চাইতে পারে, ধারণা করে সবই হাতের কাছেই সে রেখে দেয়। খুঁজে দু-সেকেন্ডে যখন না পেল, তৎক্ষণাৎ মস্তিষ্কে ক্যাচ করল—মাটি কই পাবে? খুব অসহায় চোখে তাকাল আয়াতের দিকে। আয়াত রেগে আছে। রুমু তৎক্ষনাৎ পাশ থেকে হাত পাখা নিয়ে বাতাস করতে লাগল। শীতের সিজন চলছে, ভালোই শীত পড়েছে। এমন সময় এভাবে বাতাস করতে দেখে আয়াতের রাগ আরও বাড়ল। রুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আমারে তোর মানুষ লাগে না? হাওয়া লাগানো বন্ধ কর, নইলে সোজা কিক দিয়ে মঙ্গলে পাঠায় দিব। তারপর মঙ্গল মঙ্গল কীর্তন করিস।”

রুমু দু-দিকে মাথা নেড়ে বাতাস করা বন্ধ করল। প্রহর আয়াতকে বলল,
-“আঙ্কেলকে জানিয়ে দাও আমার কথা। আমার প্রিভিয়াস মান্থে একটা জব হয়েছে। তোমার প্রয়োজন মেটানোর মতো সামর্থ্যটা আমার আছে। চিন্তা কোরো না।”

আয়াত বড়ো করে হাঁপ ছেড়ে রুমুকে বলল,
-“ফ্রিজ থেকে মিষ্টি নিয়ে আয়।”

রুমু দৌড় দিলো। আয়াত হুট করেই বলল,
-“প্রহর! ট্রাস্ট মি, আই ক্যান নট লিভ অ্যা সিঙ্গেল মোমেন্ট উইদাউট ইউ।”
-“বুঝলাম।”

আয়াত পুনরায় ক্ষেপে উঠল,
-“বুঝলাম কী রে? এই? প্রহরের বাচ্চারে! তুই শ্যাষ! কালিমা পড়তে থাক, আমি আসতেছি। আজ তুই প্রেমিকার হাতে শহীদ হবি।”

—————

শরৎ শাওয়ার নিয়ে বের হওয়ার পর প্রিয়কে রুমে দেখতে পেল না। রুম থেকে বেরিয়ে প্রিয়র খোঁজ মিলল কিচেনে। শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে রেখেছে, চুলগুলো হাতখোঁপা করে বেঁধেছে, সামনে দিয়ে ছোট চুলগুলো মুখে এসে পড়ছে। একহাতে খুন্তি, অন্যহাত কোমরে রাখা। সম্পূর্ণ মনোযোগ কড়াইয়ে ভাঁজতে থাকা ডিমের মধ্যে। যেন বিশ্বযুদ্ধে নেমেছে সে।

শরৎ কিছু বলল না, একটা আপেল নিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। প্রিয়র দিকেই তাকিয়ে আছে সে। প্রিয় তখন বলল,
-“আমি বাইরের খাবার খেতে পারি না। আমার পেটে সয় না। ওগুলো আপনিই গিলেন। আমি ডিমভাজি খাব।”

প্রিয় নিজের কম্ফোর্টজোনটা শরতের সামনে প্রকাশ করছে আস্তে-ধীরে, ব্যাপারটা শরতের বেশ মনে ধরল। সে ওভাবেই তাকিয়ে রইল। প্রিয় ডিম উলটে বলল,
-“প্রাণনাথ, শোনেন!”

ফিক করে হেসে ফেলে শরৎ বলল,
-“ইয়েস প্রাণনাশিনী, বলেন!”
-“ঘেমে গেছি দেখেন, একটু বউসেবাও তো করতে পারেন।”

শরৎ প্রিয়র গাল টিপে দিয়ে বলল,
-“আমার ঢঙ্গী বউ।”

প্রিয় হেহে করে হাসল। শরৎ পাশ থেকে একটা ন্যাপকিন নিয়ে প্রিয়র কপালের ঘাম মুছে দিলো, এরপর নাকের, চিবুকের, শেষে গলার। প্রিয়র মনোযোগ সরে যায় ডিম থেকে। শরৎ তৎক্ষনাৎ সরে দাঁড়ায়, তারপর উচ্চ আওয়াজে হো হো করে হেসে বলল, 
-“ম্যাডাম, যুদ্ধে হেরে গেছেন। ফ্রিজ থেকে আরেকটা ডিম বের করেন।”

প্রিয় গ্যাসের সুইচ অফ করল। ডিমের একটা পাশে কালো আস্তরণ পড়ে গেছে! ইশ! কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে,
-“এরপর থেকে আমি কিচেনে এলে আপনি আসবেন না। আমার সব মনোযোগ অন্যদিকে চলে যায়।”

শরৎ গা দুলিয়ে হাসতে লাগল। প্রিয় এর মধ্যে শরৎকে তিনবার গাল ফুলিয়ে নিজের প্রিয় শব্দগুলো বলল, “খারাপ খারাপ খারাপ!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp