সময়টা ফাল্গুনের শেষের দিকের। চারদিকে বসন্ত উদযাপন আপাতত কমে এলেও প্রেমবসন্তটা দারুণভাবেই উপভোগ করছে প্রেমীরা। কারো কারো প্রেম বছর ছাড়িয়েছে, কারো কারো শুরু হয়েছে সবে, আবার কেউ তো গতমাসের ১৪ তারিখে প্রপোজ করে এখন অবধি ঝুলে আছে। একদল আবার এদের মধ্যে আছে, তারা নিরপেক্ষ, তারা কোনো কিছুতেই অংশগ্রহণ করে না। এরা সাধারণত দর্শক সারীর। বাকিরা খেলা দেখায়, এরা খেলা দেখে টাইপের জনগণের মধ্যে অবস্থান নিয়ে রাখে।
মাসটাকে মানুষভেদে কতভাগেই না ভাগ করা গেল! তবে আরেকটা দল আছে, এদেরকে এসবের মধ্যে ধরা যায় না; এরা সবকিছুর বাইরে। এরা পেয়েছে, পেয়ে হারিয়েছে। সম্পর্কে যে নেই, তা নয়। ছেলেরা সিগারেটের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে, মেয়েরা আপোষে এসেছে অন্য কারো সাথে। ব্যাপারটা কেমন একটা শোনাচ্ছে, তাই না? কেমন জটিল জটিল! আসলে ব্যাপারটা যেমন শোনাচ্ছে, তার চেয়েও সহস্রগুণ বেশি জটিল। সেসবে গিয়ে লাভ নেই। আপাতত ঘরের ছেলে রাত বারোটা পেরোনোর পরও ঘরে ফিরছে না, এই যেন মূখ্য বিষয়।
নাহারা কতবার যে কল দিয়েছেন নির্দিষ্ট নম্বরটিতে, তার ইয়ত্তা নেই; অথচ প্রতিবারই সেই একই নারীকণ্ঠে সংযোগ বিচ্ছিন্নতার খবর আসছে। নাহারা আয়াতকেও কল লাগিয়েছেন। আশ্চর্যজনকভাবে ওটাও বন্ধ। বন্ধু বলতে প্রহরের তেমন কেউই নেই, তাই কারো থেকে খোঁজ নিতে পারছেন না। সবশেষে হার মেনে এই মধ্য রাত্রিতে সে মেয়েকে কল লাগালেন।
প্রিয়র ঘুম পাতলা। সে উঠে মায়ের ফোন দেখে চিন্তিত হলো। একহাতে চোখ ডলে ফোন রিসিভ করল। বেডে হেলে বসল সে, বেশ দুশ্চিন্তা নিয়ে বলল,
-“কী হয়েছে, আম্মু? কোনো সমস্যা?”
নাহারা কেঁদে ফেললেন তৎক্ষনাৎ। প্রিয় ঘাবড়ে গেল। বিয়ের পর মেয়েদের এই রাতের সময়টায় বাপের বাড়ির ওদিক থেকে কল আসাটা এক ধরনের আতঙ্ক, বুক কাঁপেই। শক্ত কারণ ছাড়া তো আর কল আসে না! তার ওপর নাহারা এভাবে কাঁদছেন! প্রিয়র বুকের অবস্থা এখন কেমন, তা বলা দায়!
প্রিয়র কণ্ঠ কাঁপতে লাগল,
-“কী হয়েছে? কাঁদছ কেন, আম্মু? সব ঠিকঠাক? বলো!”
নাহারা ভেজা গলায় বললেন,
-“প্রহর বাড়ি ফেরেনি।”
-“ফেরেনি মানে? এজন্য কাঁদছ? কোথায় ও? কল দিয়েছিলে?”
-“ফোন বন্ধ।”
শরৎ উঠেছে ততক্ষণে। প্রিয়র মুখের অস্বাভাবিক অভিব্যক্তি দেখে শরৎও বিচলিত হলো। প্রিয় শরতের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“প্রহরকে পাওয়া যাচ্ছে না।”
শরৎ কপাল কুঁচকে ফেলল,
-“পাওয়া যাচ্ছে না মানে? ও বাচ্চা ছেলে নাকি যে হারিয়ে যাবে?”
-“বুঝতে পারছি না কিছু।”
প্রিয় ফোন স্পিকারে রাখল। ওপাশ থেকে নাহারার আহাজারি শুনতে পেয়ে শরৎ বলল,
-“মা, আপনি কাঁদবেন না। আমি দেখছি।”
নাহারা কল কাটতেই শরৎ প্রিয়কে বলল,
-“আয়াতকে কল দাও।”
-“দিচ্ছি।”
আয়াতের দুটো সিমই বন্ধ পেল। প্রিয় শরতের দিকে তাকাল,
-“কিছু করুন না!”
শরৎ প্রিয়কে একহাতে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
-“শান্ত হন, আমি দেখছি।”
ঠিক তিন মিনিট পর একটা আননোওন নম্বর থেকে প্রিয়র ফোনে কল এলো। প্রিয় রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে পুরুষালি গম্ভীর স্বর শুনতে পেল,
-“হ্যালো, আপু? শুনতে পাচ্ছিস?”
-“হ্যালো, হ্যালো, প্রহর?”
-“হ্যাঁ, আপু।”
প্রিয় শরৎকে কাছে ডাকল, ফোন স্পিকারে দিয়ে বলল,
-“তুই কই আছিস, ভাই? চিন্তায় মরে যাচ্ছি সবাই।”
প্রহর হেসে বলল,
-“খুব সমস্যায় ফেলে দিয়েছি না তোদের?”
-“মারব তোকে। তুই কই এখন এটা বল। দাঁড়া, আম্মুকেও কলে অ্যাড করি। আম্মু মরা কান্না কাঁদছে তোর জন্য।”
-“ঠিক আছে।”
নাহারা কলে জয়েন হতেই বলল,
-“হ্যালো? ওর খোঁজ পাইছিস?”
প্রিয় বলল,
-“হুঁ।”
-“কোথায় আছে?”
-“কলে অ্যাড আছে, কথা বলো।”
-“কলে আছে মানে? হ্যালো? প্রহর?”
-“হু আম্মু!”
-“বাপ, তুই কই?”
নাহারার বুকে যেন জান এলো সবে। বড়ো করে একটা শ্বাস ফেলে প্রহর বলল,
-“আমি কক্সবাজারে। একটা ট্যুরে এসেছি। মাঝরাস্তায় ফোন বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানাতে পারিনি।”
নাহারা স্তম্ভিত হয়ে রইল কিয়ৎক্ষণ। পরপর চিল্লিয়ে উঠল,
-“এটা কোন ধরনের কাজ, প্রহর? বাড়িতে না জানিয়ে তুমি ঘুরতে গেছো? এদিকে তোমার বাবার চিন্তা করতে করতে শরীর খারাপ হয়ে গেছে! এত লা-পরোয়া তুমি কীভাবে হও? আমি ভাবতেই পারছি না।”
নাহারা উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। প্রিয় তাকে সামলিয়ে বলল,
-“আম্মু, থামো। অনেক রাত হয়েছে, ঘুমাও তোমরা।”
-“তাই বলে ও এরকম যাচ্ছে তাই করে বেড়াবে? এই শিক্ষা দিয়েছি তোমাদের?”
প্রিয় শক্ত গলায় বলল,
-“মা! ঘুমাতে বলেছি। বাকি কথা কাল সকালে বলব।”
মেয়ের আওয়াজের এমন দৃঢ়তায় নাহারা নড়েচড়ে উঠলেন সামান্য। কিছু একটা হয়েছে বা হচ্ছে, তার আন্দাজটা করলেন তিনি। কল কেটে দিলেন। প্রিয় প্রহরকে তখন বলল,
-“কার ফোন এটা?”
-“জানি না, পাশের সিটে এক ভাইয়া ছিলেন, তার থেকে নিয়ে কল দিলাম।”
-“কবে ফিরবি?”
-“সপ্তাহ খানেক।”
-“ঠিক আছে, আমি তোর অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
-“লাগবে না, আপু।”
-“লাগতে পারে।”
প্রহর আর কিছু বলল না। প্রিয় কোমল গলায় বলল,
-“কিছু একটা ঘটেছে, তার প্রমাণ তোর আওয়াজ ও কাণ্ডজ্ঞানহীনতা। সুন্দর একটা সময় কাটা। তোর বলার অপেক্ষায় থাকব।”
-“আপু, ভালোবাসি।”
-“আপু লাভস ইউ ঠু, ভাই। সাবধানে থাকিস।”
কল কেটে দিলো প্রিয়। শরৎ বলল,
-“আপনি কী ভাবছেন?”
-“কিছু ভাবতে চাইছি না আমি। ভাবাভাবির কাজটা অনেক কঠিন। আপাতত যা হচ্ছে, তা হবেই, হতে থাকুক।”
-“আচ্ছা।”
-“নীরজ?”
-“হুম?”
-“কাল অফিস আছে, আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিন। ঘুম প্রয়োজন আমার।”
প্রিয় শুয়ে পড়ল চোখ বুঁজে। শরতের হাতের আঙ্গুলগুলো গোছালোভাবে তার চুলের গোড়ায় ছুঁয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রিয় ঘুমিয়ে গেল। শরৎ তাকিয়ে রইল এই ক্লান্ত মুখখানিতে। তার মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে, মেয়েটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী ফুল বানাতে। অথচ সে পারে না। এতটা ব্যর্থ লাগে নিজেকে, সে নিশ্চুপ হয়ে যায়৷ এই যে এই মেয়েটা! সে কি এত যন্ত্রণা পাওয়ার যোগ্য? পৃথিবীর কি মায়া হয় না?
আচ্ছা, যে ফুলের অকালপ্রয়াত ঘটল, সে ফুল কি নিজেকে আরেকটি সুযোগ দিতে পারে না? আরেকবার, অন্য গাছের ফুল হয়ে জন্মাতে পারে না? যদিও বা জন্মায়, তবে সে জনমে কেন পূর্বজনমের স্মৃতি থাকবে? সে ফুলে কেন অন্য গাছের ব্যথা থাকবে?
শরৎ ঝুঁকে গেল সামান্য। ঘুমন্ত প্রিয়র কপালে শুষ্ক চুমু খেয়ে মনে মনে শুধাল,
-“আপনি কি জানেন, আপনি কারো শখের ফুল?”
—————
পৃথিবীতে সুখ ও দুঃখ যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ ব্যাপার। যে সুখ পাচ্ছে, একাধারে সে দুঃখও পাচ্ছে। কোনোটাই স্থায়ী নয় অবশ্য। একটাকে বেছে নেওয়ার সুযোগও নেই। নিলে দুটোকেই নিতে হয়, আর দুটোই উপভোগ করতে হয়। আমরা প্রায়শই বলে থাকি, “গল্পটা ভিন্ন হলেও হতো!”
ব্যাপারটা কি আদতেই তাই? ভিন্ন হলে কেমন হতো? একটা সুখের গল্পের শুরু থেকে শেষ অবধি কেবল সুখ তো থাকে না, কিংবা একটা দুঃখের গল্পেও আদ্যোপান্ত কেবল দুঃখ থাকে না। নমুনায় এলে দেখানো যায় শরৎ-প্রিয়, শ্রেয়ান তুশিকে। তাদের গল্পটা এখন সুখের, শুরুতে কি এমন ছিল?
আর আয়াত-প্রহর? ওদেরটা?
ওদিকে আছে নীহিনের গল্প! বেচারির মনে দুঃখ নেই। সে জীবনের আসল মানেটা খুব ভালোভাবেই জানে। সে অতিসুখে আত্মহারা হয় না, দুঃখে মূর্ছাও যায় না। সে তাল মিলিয়ে চলে। সুখে সুখবিলাস, দুঃখে দুঃখবিলাস! এজন্য জীবন তাকে খুব একটা নড়বড়ে করে উঠতে পারে না। এক্ষেত্রে পাষণ্ড জীবন এসে হাঁপিয়ে যায়, জিতে যাওয়ার খুশিতে প্রাণখোলা হাসিতে মেতে ওঠে সুন্দর মেয়ে নীহিন। জীবন উপভোগ করতে তো সে-ই জানে, যে চাওয়া-পাওয়ার হিসেবে না বসে প্রতিটি মুহূর্তকে রঙিন বানাতে সক্ষম। নীহিনকে এক্ষেত্রে সেরা বলতে দ্বিধা করা উচিত নয়।
শরৎ-প্রিয়র জীবনটা বেশ চলছে, ওদিকে শ্রেয়ানের দায়িত্বপূর্ণ আচরণ তুশির মনকে আপ্লুত করছে প্রতিটি ক্ষণে। তুশি আগে যতখানি চাপা স্বভাবের ছিল, এখন যেন তার বেশ বিপরীতে এসেছে। এই তো, গত পরশু হুট করেই দুলতে দুলতে শ্রেয়ানের কাছে এসে বলল,
-“শোনেন না! আম্মু বাড়িতে বেড়াতে আসতে বলছিল খুব। চলেন, সামনের সপ্তাহে ঘুরে আসি ঢাকা থেকে।”
কতটা জোর দিয়ে বলল, ‘চলেন, ঘুরে আসি’! কথাটা শুনে শ্রেয়ান হেসে দু-দিকে মাথা নাড়ে তখন। তারপর থেকে এখন অবধি বিভিন্ন গোছগাছ করছে তুশি। এই তো, রাতে শ্রেয়ান অফিস থেকে ফিরলেই ওরা বেরোবে।
—————
এখন সন্ধ্যে নামার সময়। সূর্যটা সাগরের ওপর ফেলে পড়েছে, প্রতিবিম্বটা জলের সাথে মিশে ক্ষণে ক্ষণে কাঁপছে। সূর্যের হলদেটে আলো এখন রক্তিমাভায় পরিণত হয়েছে। চারপাশে কী মুগ্ধতা! প্রহর বুকে হাত গুঁজে বালির ওপর দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে ঢেউ দেখে যাচ্ছে। এমন তরঙ্গোচ্ছ্বাস তো তার বুকে থাকার কথা! অথচ বুকের ভেতরটা কী অদ্ভুত শান্ত! কেমন যেন খালি খালি। কিছুই নেই টাইপের অনুভূতি প্রহরকে চুপ করিয়ে রাখছে।
যেভাবে আস্তে-ধীরে গোধূলিটা নীলচে সন্ধ্যেতে মিশে গেল, ঠিক সেভাবেই নীলাভ আকাশটায় রাত নেমে এলো। প্রহর যেমনি ছিল, তেমনিটাই দাঁড়িয়ে ঠান্ডা বাতাস উপভোগ করতে লাগল। হোটেলে ফিরবে ঢের রাতে। আপাতত এছাড়া আর কী-ই বা কাজ?
দেখতে দেখতে চোখ ক্লান্ত হয়ে এলে সে দু-চোখের পাতা বন্ধ করে ফেলল। মস্তিষ্ক কথার বাণ ছুঁড়তে লাগল,
-“অপ্রিয়, বিয়ের দু-দিন পেরোল তো!”
অদৃশ্য কোনো মানবী জল হয়ে তার পা ছুঁয়ে গেল, অশ্রবণীয় আওয়াজে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“পেরোল তো!”
প্রহর আনমনে হাসল,
-“সাত বছরের প্রেম কি বিয়ের দু-দিনে ভুলতে পেরেছ?”
-“পেরেছি।”
-“নিজস্বতা আমার, তুমি ভালো আছো?”
এ প্রশ্নের জবাব এলো না। প্রহরের হাসি ছড়িয়ে পড়ল অধর জুড়ে,
-“সরি সরি, নিজস্বতা ডাকটা পছন্দ হলো না, তাই তো? বেশ! তোমায় আমি তবে ডাকব বিরহিণী।”
প্রহর থামল। চোখ খুলল নরমভাবে। সোজা দৃষ্টি স্থির রাখল সমুদ্রজলে। সে জল বিরহ সেজে ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে, দহন ঘটছে দেহে! প্রহরের অন্তরটা যেন জানাচ্ছে,
-“ওহে বিরহিণী, তোমার বিরহে পুড়ে হলাম ছাঁই।”
প্রহর আবার শুধাল,
-“এবার বলো, ভালো আছো তো?”
ওপাশ থেকে নিশ্চুপ আওয়াজেরা জলতরঙ্গের সাথে তার পা ছুঁয়ে বলতে লাগল,
-“ভালো থাকা? তুমি ছাড়া অসম্ভব!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………