আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ১১ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

আজ ওদের মন ভালো নেই
‘হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি,
জগৎ আসি সেথা করিছে কোলাকুলি।
প্রভাত হল যেই কী জানি হল একি, 
আকাশ পানে চাই কী জানি কারে দেখি।।’

চমৎকার একটা সকাল। ছেঁটে রাখা ঘাসে নগ্ন পায়ে হাঁটছে মৌনি। হাতে রবি ঠাকুরের ‘সঞ্চয়িতা’। এই রাঙা প্রভাতে প্রাণ খুলে আবৃত্তি করতে ইচ্ছে করছে । কিন্তু উপায় নেই । দাদাজানের শাস্তির মেয়াদ এখনও শেষ হয়নি । মৌনি খুব যুদ্ধ করে নিজেকে সংযত রেখেছে । কিন্তু কতক্ষণ রাখা যাবে ,বুঝা যাচ্ছে না । মৌনির ধারণা ,দাদাভাইয়ের তার শাস্তি নিয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে । তিনি মোটামুটি নিশ্চিত মৌনি শেষ পর্যন্ত হেরে যাবে। তারপর তিনি দেখাবেন আসল খেল । মৌনি কিছুতেই দাদাজানের খেল দেখতে চাচ্ছে না । দাদাজানের খেল কখনও-ই ভালো কিছু বয়ে আনে না । মৌনি খেল দেখতে আগ্রহী না হলেও ভাইবোনদের আগ্রহের শেষ নেই । বিশেষ করে নাহিদের আগ্রহ দেখবার মতো। এই বাড়ির ছেলেমেয়েরা কিছুটা নিষ্ঠুর প্রকৃতির । ভাইবোনদের বিপদ তাদের ব্যথা দেয় না। বরং ‘কী হয় ! কী হয় !’ এমন একটা উচ্ছ্বাস বয়ে যায়। দাদাভাইয়ের সহচর্যে তারা শিখে গিয়েছে ,বিপদ যার । দায় ও দুশ্চিন্তাও তার। মৌনির অবশ্য এসব নিয়ে অভিযোগ নেই । ওদের জায়গায় সে হলে তার মনোভাবও হতো একইরকম । এখানে আবেগের স্থান শূন্য । মৌনি মনে মনে আবৃত্তি করে গেল,

‘হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি 
জগৎ আসি সেথা করিছে কোলাকুলি …. ’ 

একটু দূরে চেয়ার পেতে বসে আছে ইশতিয়াক আর নাহিদ। বিয়ের চাঁদোয়া, ডেকোরেশনের চেয়ার সরানো হচ্ছে । নাহিদ তার বা’পাটা তুলে রেখেছে আরেকটি চেয়ারে । ইশতিয়াক গম্ভীর মুখে তার পা পরীক্ষা করছে । 

‘সারাদিন ইতরামি করতে থাকিস তারপরও ঘা খুব দ্রুত শুকাচ্ছে । দুটোদিন একটু লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থাকতে পারিস না?’ 

প্রত্যুত্তরে মৃদু হাসল নাহিদ । ইশতিয়াক এবার চোখ ফিরিয়ে মৌনির দিকে তাকাল । তার চোখ বলে, মৌনির প্রতি তার অন্যরকম দু্র্বলতা আছে। তাদের জেনারেশনে ইশতিয়াক সবার বয়োজ্যেষ্ঠ। তারপর এসেছে মিথি আর মৈয়ন। মিথির জন্মের পরপর তার মা মরে গেল । তার খালারা মিথিকে নিজেদের কাছে নেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে গেলেন। এই বাড়িতে থেকে গেলে মিথির বেড়ে উঠাতে কোনোরকম বিঘ্ন ঘটতো না। ছোটবেলায় যত্ন বলতে তারা যতটুকু পেয়েছে তা মিথিও পেতো ; তাতেও কোনো রকমফের হতো না। কিন্তু মিথির খালাদের ধারণা হলো ,এই একান্নবর্তী পরিবারে মা’হীন মিথির বড় অসুবিধা হবে । দাদাজান কঠিন মানুষ । তাকে টেক্কা দেওয়া সহজ ব্যাপার না । সেই কঠিন দাদাজান কেন যে এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন সেও এক রহস্য । তবে সেইদিন থেকে মিথির অন্যরকম একটা জীবন শুরু হলো । কিছুদিন এই খালার বাড়ি কিছুদিন সেই খালার বাড়ি; সে এক বোহেমিয়ান জীবন। তার অনেকবছর পর হঠাৎ একদিন দাদাজান মিথিকে বাড়ি আনলেন । ঘোষণা করলেন , আজ থেকে মিথি তার নিজের বাড়িতেই থাকবে। তার খালারা নিতে এলে দাদাজান কঠিন গলায় জানালেন, 

‘ তোমরা আমার নাতনীকে কত সুখে রেখেছ সে খবর আমি পেয়েছি । আমার বাড়ির মেয়ে এর-ওর বাড়িতে পড়ে থাকবে এমন শোচনীয় অবস্থা আমার না। তোমরা আসতে পার। এই বাড়িতে ওর মায়ের অভাব হবে না।’

এই বাড়িতে মিথির মায়ের অভাব হয়েছিল কিনা সে তথ্য অবশ্য জানা যায়নি। ততদিনে মিথি নিজের মধ্যে গুটিয়ে গিয়েছে । ভাইবোনদের সাথে সহজভাবে মেলামেশা করার ক্ষমতা তার লুপ্ত। মিথি আর মৈয়নের পর এলো আরিফ , সোহান, নাহিদ । তারপর মৌনি। মৌনির পর আবার একাধারে আরও কয়েকটি ভাই । এই এতো এতো ভাইদের মধ্যে মৌনি একা এক আদর বলেই হয়তো ইশতিয়াকের মৌনির প্রতি চাপা একটা স্নেহবোধ আছে। এভাবে বিশ্লেষণ করলে এই স্নেহ নিষ্পাপ বটে। কিন্তু নাহিদের কাছে ব্যাপারটা এতো সহজ মনে হয় না। কোথাও একটা কিন্তু আছে। নাহিদের যদিও এই সকল পারিবারিক বিষয়ে কিছুমাত্র আগ্রহ নেই তারপরও চারদিকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকানোর অভ্যাসবশত ব্যাপারটা অনেকটা নিজ থেকেই তার নজরে পড়ে গিয়েছে। তীক্ষ্ণ বুদ্ধির নাহিদ চোখের পলকে ধরে ফেলেছে, মৌনি তার সেজ মামা , রিটায়ারপ্রাপ্ত বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মইনুল করিমের কন্যা না। সে সম্ভবত বড়মামার সন্তান। ইশতিয়াক বোধকরি ব্যাপারটা সম্পর্কে অবগত। ইশতিয়াকের আরও তিনজন বড় ভাই আছে । চার ভাইয়ের পর এক বোনের জন্ম হলে দুর্বলতার আতিশয্য থাকা স্বাভাবিক। নাহিদেরও বোন আছে । সে জানে বোন কত আরাধ্য ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা থেকে ভাইবোনদের এমন বঞ্চিত করার কারণ তার বোধগম্য হলো না। সে নিয়ে আর কোনো ভাবনা ভাবার প্রয়োজনও বোধ করল না। ইশতিয়াক মৌনিকে ডাকল, 

‘ এই মৌনি ? এদিকে আয়। একদিন কথা না বলতে পেরে তোর প্রেশার বাড়ল না কমলো মেপে দেখি।’

মৌনি ঠোঁট উল্টে এমন এক ভঙ্গি করে এগিয়ে এলো যেন এই প্রেশার মাপাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার । শাস্তির প্রেশারে বিষয়টা তার মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল । কেউ একজন নিজ দায়িত্বে মনে করিয়ে দেওয়ায় সে কৃতার্থ। প্রেশার মাপার পর সূক্ষ্ম একটা চিন্তার ছাপ পড়ল ইশতিয়াকের কপালে। নাহিদকে তাকিয়ে থাকতে দেখে দুশ্চিন্তার ছাপ সরিয়ে হাসল। বলল,

‘ সর্বনাশ করেছে ! তোর প্রেশারের অবস্থা তো আসলেই ভয়াবহ। সিস্টোলিক ৭০ ,ডায়াস্টোলিক ৫০ এ নেমে এসেছে । তুই এখনও সুস্থ কী করে?’ 

প্রশ্ন করা হয়েছে । উত্তর দেওয়ার জন্য তড়বড় করে উঠল মৌনি। ইশতিয়াক আঁতকে উঠে তৎক্ষনাৎ তাকে থামিয়ে দিল। নাহিদ ব্যাপারটাতে খুব দুঃখ পেল। দুঃখী কণ্ঠে বলল,

‘ থামালে কেন ভাই? আমরা স্বাধীন দেশের মানুষ। আমাদের সকলের মতামত প্রকাশের অধিকার আছে। মৌনি? তুই কী বলতে চাইছিস বলে ফেল। থেমে গেলে চলবে না। স্পিক আউট মৌনি। স্পিক আউট।’ 

মৌনি চোখ গরম করে নাহিদের দিকে তাকাল। এই বাঁদরটার সামনে থাকলে যেকোনো সময় মুখ ফেঁটে ধমক বেরিয়ে আসবে এই ভয়ে ওদের সামনে থেকে সরে গেল। আঙুলের কড়া গুণে দেখল সবে তেরো ঘন্টা কেটেছে। আরও ঊনষাট ঘন্টা বাকি। মৌনির বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। হাহ্ বিধাতা! মৌনির মৃত্যু ঘটানোর আগে কী এই বুড়ো মরবে? 

দাদাজানের বিশাল বাড়ির বিরাট লনে কিছুক্ষণ অলস পায়ে হেঁটে বেড়াল মৌনি। কথা বলতে না পারায় পৃথিবীর অর্ধেক আনন্দ বৃথা মনে হচ্ছে তার। বই পড়তেও আরাম লাগছে না। মনে হচ্ছে, গলায় শব্দ তুলে পড়তে পারলে আরাম হতো। মৌনি কিছুটা সময় উদাস মনে আকাশের দিকে চেয়ে রইল। কল্পনায় নানান চরিত্র সাজিয়ে যখন সে বাড়ির সামনের দিকে চলে এলো তখন খেয়াল করল গেইট দিয়ে ঢুকছে একটা অপরিচিত যুবক। যুবকের গায়ের কাঠামো মাঝারি। পিঠে মোটাসোটা একটা ব্যাগ। পরনে মেটে রঙের শার্ট। চেহারায় একটা সাঁওতালি ভাব আছে। যদিও কখনও খুব কাছ থেকে সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীকে দেখার সুযোগ হয়নি মৌনির। তারপরও ছেলেটার চেহারা বর্ণনায় কেন যেন সাঁওতালদের উদাহরণটাই চলে আসছে। ছেলেটা গেইট দিয়ে ঢুকে মৌনিকে দেখেই থমকে দাঁড়াল। তারপর মৌনিকে বিস্মিত করে দিয়ে দুই হাত দুইদিকে উড়িয়ে দিয়ে একেবারে উড়ে এলো মৌনির দিকে। তার সাথে গগনবিদারী চিৎকার, 

‘ বন্ধুওওওও? আমি আইসা পড়ছি।’ 

মৌনি বিভ্রান্ত হয়ে গেল। ভুরু কুঁচকে আশেপাশে তাকাল। এ আবার কোন সার্কাস পার্টির চিরিয়া? তাদের বাড়িতে কী চিরিয়ার অভাব ছিল? ছেলেটা কাছাকাছি আসতেই চট করে নিচে বসে পড়ল মৌনি। আগুন্তকঃ তার উপর দিয়েই আরেকজনের সাথে আলিঙ্গনাবদ্ধ হলো। মৌনি তাকিয়ে দেখল, ‘নাহিইদ্দা!’ প্রাণের দোসর দুটো একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে তাকে ঘিরেই ঘুরছে। লাফাচ্ছে। এদিকে সে যে এক রমণী নিচে বসে আছে তার কোনো গুরুত্ব নেই? মৌনি উঠে দাঁড়াল। দু'জনকে দুইদিকে ধাক্কা দিয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে বলল, 

‘ ওহ! এ তাহলে তোর চিরিয়া?’ 

নাহিদ বলল,

‘ চিরিয়া কী রে? আমার বন্ধু। বেস্ট বাডি।’ 

মৌনি নাক-মুখ কুঁচকে সৌধর দিকে তাকাল। সন্দিহান কণ্ঠে বলল,

‘ আসলেই বন্ধু নাকি অন্যকিছু?’ 

সৌধ অবাক হয়ে বলল,

‘ অন্যকিছু মানে?’ 

‘ আজকাল যুগ খারাপ। এসেই যেভাবে জাপ্টাজাপ্টি করছেন!’ 

সৌধ হতবাক হয়ে মৌনির দিকে তাকিয়ে রইল। মৌনি ডিটেকটিভের মতো চোখ ছোট ছোট করে তাকাল। সন্দেহ করে বলল,

‘ বন্ধুকে ছাড়া একদিন থাকতে পারেন না? উড়ে উড়ে চলে এসেছেন। ঘটনা কী? আপনি নাহিদের বউয়ের দেবর কম সতীন বেশি হবেন মনে হচ্ছে।’ 

সৌধ কিছুক্ষণ হতভম্ব চোখে তাকিয়ে থেকে নাহিদের দিকে ফিরে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল,

‘ দোস্ত? তোর বোন কেমন ভয়ানক এলিগেশন লাগাচ্ছে দেখ। অতি অবশ্যই এর একটা কঠিন বিচার হওয়া দরকার।’ 

নাহিদ এতোক্ষণ ঠোঁট টিপে হাসছিল। এবারে চোখে-মুখে দুঃখ নিয়ে সমবেদনার গলায় বলল,

‘ কষ্ট পাস না দোস্ত। তোর ভাবির প্রাণের বান্ধবী এই রমণী। বান্ধবীর সংসার নিয়ে ওভার পজেসিভ। সুইট ভাবীর কথা ভেবে এই নগন্য রমণীকে মাফ করে দে। এমনিতেও তার হায়াৎ ফুরিয়ে এসেছে।’ 

সৌধ অবাক হয়ে শুধাল, 

‘ মানে?’ 

নাহিদ এবার মৌনির দিকে তাকাল। ভুরু নাচিয়ে মুখ ভরা হাসি নিয়ে বলল,

‘ কী মৌনি টৌনি? খুব তো মুখ ছুটল বল?’ 

তৎক্ষনাৎ আচমকা স্মৃতিশক্তি ফিরে আসার মতো চমকে উঠল মৌনি। মুখটা করুণ হয়ে গেল। নাহিদের দিকে তাকিয়ে তার থেকেও করুণ কণ্ঠে বলল,

‘ নাহিইইদ! ভাই আমার। তুই জানিস? আমি তোকে কত ভালোবাসি?’ 

 হো হো করে হেসে উঠল নাহিদ। মৌনি বলল,

‘ দাদাজানকে বলিস না। প্লিজ ভাই।’ 

নাহিদ বাড়ির দিকে পা বাড়িয়ে বলল,

‘ অবশ্যই বলব।’ 

মৌনি তার পিছু ছুটল। মৌনির পেছনে সৌধ। মৌনি চেঁচিয়ে বলল,

‘ আল্লাহ! নাহিদ! জান আমার! দেখ, তোকে কলিজা ডেকেছি। এতো ভালোবাসার এই প্রতিদান?’ 

নাহিদ গলায় শব্দ করে হাসল। মৌনির দিকে ফিরে পেছনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

‘ জান, কলিজা, ফুসফুস ডাকলেও কাজ হবে না।’ 

মৌনি বলল,

‘ এতোক্ষণ মিথ্যা বলেছি। তুই আসলে একটা কুত্তা।’ 

নাহিদের ভাবান্তর হলো না। সৌধ এগিয়ে গিয়ে বলল,

‘ এক্সকিউজ মি, আপনি কী সবসময় এমন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলেন?’ 

মৌনি গরম চোখে তাকাল,

‘ তাতে আপনার কী?’ 

এই প্রাণচঞ্চল তিন যুবক-যুবতীদের তর্কযুদ্ধ চলাকালীন বাড়ির গেইট এসে উপস্থিত হলো আরেকজন দীর্ঘদেহী পুরুষ। শ্যামকান্তি এই পুরুষকে দেখে থেমে গেল তাদের বাকযুদ্ধ। নাহিদ খানিক বিস্ময় নিয়ে বলল,

‘ আপনি!’ 

—————

সকালে ঘুম ভেঙে নিজের সাথে বেশকিছু হিসেব-নিকেশ করে মিথি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে এফডিসিতে যাবে। প্রথমে যদিও ভেবেছিল, মোখলেসুর আলমের নাম চিরতরে ডিকশিনারি থেকে মুছে ফেলবে। এই লোকের সাথে কাজ করা মানে আত্মসম্মানে পদাঘাত। কিন্তু পরবর্তীতে চিন্তা করে দেখল, এতে তার ক্ষতি বৈ লাভ কিছু হবে না। আজ সকালের এই পুরোনো মিথির কাছে ক্যারিয়ারের থেকে বড় কিছু পৃথিবীতে নেই। তার আকাশছোঁয়া স্বপ্ন পূরণ করতে এটুকু তো সইতেই হবে! এসব শিশুসুলভ ন্যাকামো তার সাথে মানায় না। মিথি তৈরি হয়ে এফডিসিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল। তাদের শুটিং ফ্লোরে পা দিয়েই কিছু পরিবর্তন টের পেল মিথি। প্রথম এবং বিস্ময়কর পরিবর্তন স্বয়ং মোখলেসুর আলম। তার ব্যবহার রাতারাতি নমনীয় হয়ে গিয়েছে। মিথিকে তিনি কিছুটা তোয়াজ করে চলছেন। মিথিকে দেখেই চমৎকার হাসি দিয়ে বললেন,

‘ আরে মিথি! চলে এসেছ? বসো। চা খাও। এই রবিন? মিথিকে একটা কড়া লিকারের চা দে।’ 

মোখলেসুর আলমের তেলতেলে ব্যবহারে মিথি আপ্লুত হল না। মুখ গম্ভীর করে বসে রইল। সে ভেবেছিল, দেরি হয়ে যাওয়ায় মোখলেসুর আলম তাকে অজস্র কথা শুনাবে। মিথিকে একশোটা কারণ দর্শাতে হবে। কিন্তু হঠাৎ এই চমৎকারের কারণ মিথি ধরতে পারল না। মোখলেসুর আলম খোশালু কণ্ঠে বললেন,

‘ বুঝলে মিথি? এই ধরনের ঘটনা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায়শ'ই হয়। একই পরিবারের মানুষের মধ্যে কী ঝগড়া, কথা কাটাকাটি হয় না? তোমার ভাবির সাথে তো আমার তিনশো পঁয়ষট্টি দিন মান-অভিমান। আমরা এখানে যারা কাজ করি, এটাও তো একটা পরিবার? আ লাভিং ফ্যামিলি। এখানেও টুকটাক ভুল বুঝাবুঝি হবে। এসব মান-অভিমান কোনো বিষয় না।’ 

মিথি প্রত্যুত্তরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রবিন চা দিয়ে গিয়েছে। মিথির চা খেতে ইচ্ছা করছে না। কাল রাতে পুরোনো মিথিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তে বদ্ধ পরিকর হলেও মিথি বুঝতে পারছে কোথাও একটা ফাঁপা রয়ে গিয়েছে। উপলব্ধি করতে পারছে, মানুষের বদলে যাওয়া সহজ হলেও; পুরোনো 'আমি'তে ফিরে যাওয়া কঠিন। ‘ফিরে যাওয়া’ শব্দটাই বোধহয় জটিল। মানুষ এগিয়ে যেতে পারে, থমকে যেতে পারে। কিন্তু চাইলেই ফিরে যেতে পারে না। মোখলেসুর আলম চায়ে লম্বা চুমুক দিয়ে বলল,

‘ মনে রাখবে, এভ্রি পাবলিসিটি ইজ আ গুড পাবলিসিটি। এখন পাবলিক গাল দিবে, খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসবে। নাটকটা হিট করলেই দেখবে মানুষের চিন্তা বদলে গিয়েছে। মানুষের সাইকোলজি খুবই অদ্ভুত। এদেরকে যেভাবে ভাবাবে তারা সেভাবেই ভাববে। কিন্তু তার জন্য বুদ্ধি থাকতে হবে। আর থাকতে হবে কনটেন্ট।’ 

মিথি কোনোরকম প্রত্যুত্তর না করে মোখলেসুর আলমের জ্ঞানবাণী শুনে গেল। এবং শুটিং সেটের দ্বিতীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করল। শুটিংয়ের ছেলেরা মিথির দিকে খুব আগ্রহ নিয়ে তাকাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে একটা ফিসফাসও হয়ত চলছে। মিথির কপাল কুঁচকে এলো। তৃতীয় পরিবর্তনটা মিথি লক্ষ্য করল শুট চলাকালীন সময়ে। মিথি খুব অবাক হয়ে খেয়াল করল, সাফাত তাকে দুই চোখে দেখতে পারছে না। সে সামনে গেলেই চোখ-মুখ অন্ধকার করে বসে থাকছে। এতো এতো আশ্চর্য ঘটনায় মিথি কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে গেল। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে তার একটা হিসেব-নিকেশ করা জরুরি। সবার আগে জানা জরুরি, সাফাত তার প্রতি বিরক্ত কী জন্যে? সে নিশ্চয় সাফাতকে এই ধরনের কোনো বিজ্ঞপ্তি দিতে বাধ্য করেনি? তবে? মিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লাঞ্চ টাইমে আজকের দিনের চতুর্থ বিস্ময়কর ঘটনাটা ঘটল। মৌনি তাকে টেলিফোন করল। মৌনির সাথে এর আগে তার কখনও ফোন কলে কথা হয়েছে কি-না মনে পড়ল না মিথির। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠল মৌনি, 

‘ মিথি আপা? তুমি কোথায়?’ 

মিথি সে কথার উত্তর না দিয়ে বলল,

‘ তুই কথা বলতে শুরু করলি কখন থেকে?’ 

মৌনির কথার ফুল ফুটল। তড়বড় করে বলল,

‘ কথা বলতে শুরু করেছি আরও তিন-চার ঘন্টা আগে। এখন দাদাভাই আমার জিহ্বা কেটে না দিলেই হয়। তোমার কী মনে হয় বল তো? আমার নেক্সট শাস্তি কী হতে পারে? বিয়ে টিয়ে করিয়ে দিবে? দিলে দিক। বিয়ে আমার জন্য কোনো ঘটনা না। বিয়ে দেওয়া মাত্র বরের কোলে উঠে দিবো এক ঘুম। আর কোনো নামানামি নাই।’ 

অন্যকেউ হলে মৌনির কথায় উচ্ছ্বাস দেখাত। হয়ত একটু হাসতো। মিথি সেসব কিছুই করল না। মৌনির কথা তার আবেগকে স্পর্শ করল না। মৌনি বলল,

‘ তোমাকে একটা ইম্পোর্টেন্ট কথা জানাতে ফোন করেছি।’ 

‘ কী কথা?’ 

‘ তুমি এক আনরোমান্টিক ভূত! দুলাভাই এসে বসে আছে আর তোমার খোঁজ নেই?’ 

মিথি একটু থমকাল। স্তব্ধ কণ্ঠে বলল,

‘ দুলাভাই?’ 

মৌনির কথার রেলগাড়ী চলল,

‘ আরে, সাব্বির ভাই এসেছেন। জানো? আমি তো প্রথমে চিনতেই পারিনি। ভেবেছিলাম, কে না কে! বাট হি ইজ কুয়াইট হ্যান্ডসাম ডুড! রাগ করো না, দেখতে সুন্দর বলে একটু তাকিয়েছিলাম। কিন্তু যখন জানলাম তোমার বর? তখন থেকে চোখের মধ্যে একেবারে সিলমোহর।’ 

মিথি কোনো উত্তর দিল না। সাব্বির এসেছে এই খবরে তার কোনো যায় আসে না। কিন্তু তার দেহ বোধহয় সে কথায় সঙ্গ দিল না। মিথি উপলব্ধি করল, অদ্ভুত এক উত্তেজনায় তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। মাথার ভেতর ঝিমঝিম করছে। মৌনি বলল,

‘ তুমি এমন বর রেখে কী করে এমন রোবটের মতো থাকো বল তো? আমি হলে, সবার প্রথমে বর নিয়ে তিন মাসের হানিমুনে চলে যেতাম। তবে, মিথি আপা? তোমার আর সাব্বির ভাইয়ের জুটি কিন্তু বেশ মানাবে। তোমরা দু'জনেই এক ধরনের রোবট। ওনি তোমার খুঁজে আমাদের রুমে এসেছিল বুঝলে? আমি তখন শুয়ে শুয়ে বই পড়ছি। তোমরা দুটো কী বল তো? তুমিও কী তোমার বর দেখলে চিনবে না? সাব্বির ভাই আমাকে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা। তিনি ধরতেই পারছেন না, আমিই তার বউ নাকি অন্যকেউ। আমিও মজা নেওয়ার লোভ সামলাতে পারিনি। চোখ-মুখ গম্ভীর করে জিজ্ঞাসা করেছি, কী ব্যাপার? কেমন আছেন আপনি? বিয়ে করার পর যে বউয়ের খোঁজ নিতে হয় এই মিনিমাম কার্টিসীটুকু জানেন না? বেচারার চেহারাটা যা হয়েছিল না?’ 

কথার মাঝেই হো হো করে হেসে উঠল মৌনি। মিথি একেবারেই নিরুত্তর। তবে ভেতরের একটা তাড়নায় সে বুঝতে পারছে সে ঠিক করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। মৌনির প্রশ্নটা মাথায় ঘুরছে। সত্যিই তো, মিথি কী অনেকের মধ্যে থেকে সাব্বিরকে চিনে ফেলতে পারবে? মিথি সাব্বিরের চেহারাটা মনে করার চেষ্টা করল। কই? মনে পড়ছে না তো। শুধু ওই চোখদুটোই স্মৃতিতে ভাসছে বারবার। শান্ত, টলটলে দিঘির মতো ঠান্ডা দুটো চোখ। মৌনি তখনও কথার ফুল ফোটাচ্ছে। তার কণ্ঠে প্রবল উত্তেজনার আভাস,

‘ সাব্বির ভাই কিছুক্ষণ বেক্কলের মতো তাকিয়ে থেকে আমতা আমতা করতে লাগল, না মানে। না মানে। আমি ধমক দিয়ে বললাম, কোনো মানে টানে চলবে না। দশ পাতার এক্সপ্লেনেশন আমার চাই। নয়তো আমি থানায় কেইস করব। বউয়ের দেখাশোনাই যদি না করতে চান তাহলে বিয়ে করলেন কেন? আমি যদি দুঃখে গলায় দড়ি দিতাম তাহলে?’ 

আবারও ঝরনার মতো কলকল করে হেসে উঠল মৌনি। 

‘ তারপর কী হলো শুনো। সাব্বির ভাই এতো ভয় পেলেন কী বলব! ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা। বলল, আপনাকে সেদিন রাতে অন্যরকম দেখেছিলাম মনে হচ্ছে। আমি মিলাতে পারছি না। কেমন বেকুব দেখো? তোমার বরকে বেকুব বলেছি বলে রাগ করো না। উত্তেজনায় বলে ফেলেছি।’ 

মিথি কিছু বলল না। মৌনি বলল,

‘ আমি খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন দেখেছিলেন সেদিন? আজকের থেকে সুন্দর নাকি অসুন্দর? কী একটা মারাত্মক প্রশ্ন করেছি বলো? একটা কট খেতোই খেতো। এর মধ্যে ঋতি এসে বাঁধাল এক বাগড়া। দরজার কাছে এসেই ডেকে উঠল, এই মৌপু? মিথি আপুকে ফোন করেছিলে? কেমন লাগে বল? তোমার বর তোমাকে না চিনলেও নাম ঠিকই চিনি। ঋতির কথা শুনেই যে রকম চোখ বড় বড় করে তাকাল!’ 

 মিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 

‘ তোর বলা শেষ? এখন ফোন রাখ। আমি ব্যস্ত আছি।’ 

মিথির ঠান্ডা স্বরে বিস্মিত হলো মৌনি। অবাক হয়ে বলল,

‘ সে কি! তুমি আসবে না? সাব্বির ভাই অপেক্ষা করছে যে!’ 

মিথি শক্ত কণ্ঠে বলল,

‘ করুক।’ 

মৌনিকে আরও একটু হতভম্ব করে দিয়ে ফোন কাটল মিথি। বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক ঝড় নিয়ে সে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল কালো হয়ে যাওয়া মোবাইল স্ক্রিনের দিকে। ফিরে গেলো, শুটের কাছে। মস্তিষ্ককে কঠোর শাসনে এনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিল, বাড়ি সে ফিরবে না। 

—————

এফডিসি থেকে সন্ধ্যায় বেরিয়ে দাদাজানের বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত্রের প্রায় বারোটা বেজে গেল মিথির। এতো রাতে গ্রামে আসার দরকার ছিল না। কিন্তু তারপরও হৃদয়ের অদ্ভুত দোলাচালে ঢাকায় টিকে থাকতে পারল না। কীসের এক অমোঘ আকর্ষণে এই কালো রাত্রি মাথায় নিয়ে সে রওনা দিল ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে। বাড়ি ফিরে দেখল, সারা বাড়ি নিঝুম ঘুমে তলিয়ে আছে। কেউ মিথির পথ চেয়ে বসে নেই। মিথি পায়ে পায়ে উঠে গেল তিন তলায়। তার ঘরে আলো জ্বলছে। মৌনি নাকের ডগায় চশমা ঝুলিয়ে মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছে। মিথিকে ঘরে ঢুকতে দেখেই বিশাল একটা হাসি দিয়ে বলল,

‘ তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, তুমি আজ আসবে।’ 

‘ তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম’ কথাটা খুব মিষ্টি শোনাল মিথির কানে। মৌনির দিকে গাঢ় চোখে তাকাল। আশ্চর্যের ব্যাপার, মৌনির চেহারাটা হঠাৎ কেমন বড়চাচীর মতো লাগছে। মিথি কোমল করে কথা বলতে পারে না। সে শুধাল,

‘ যদি না ফিরতাম?’ 

মৌনি হাসল। চশমা খুলে রেখে চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে বলল,

‘ তাহলে সারারাত জেগে থাকতাম। একটা রাত তোমার অপেক্ষায় কাটালে কিচ্ছু ক্ষতি হতো না।’ 

মিথি প্রত্ত্যুতরে কী বলা যেতে পারে বুঝে উঠতে পারল না। মৌনি চোখে হাসি নিয়ে বলল,

‘ তোমার বর তোমার জন্য একটা চিরকুট ছেড়ে গিয়েছেন। আমার দায়িত্ব সেটা তোমার পর্যন্ত সহি সালামত পৌঁছে দেওয়া। চিঠিটা পাহারা দিচ্ছিলাম। বেড টেবিলের পাশে রাখা আছে। তুমি চিঠি পড়ো। আমি আমাদের খাবার নিয়ে আসি। আমি তোমার জন্য না খেয়ে বসে আছি।’ 

মিথি এবারও কিছু বলল না। মনে হলো, মৌনি মেয়েটা অতোটাও অসহ্য নয়। একটু ঢঙী ঠিক তবে মিষ্টি। মৌনি বেরিয়ে যেতেই মিথি ঘাড় ফিরিয়ে বিছানার পাশের টেবিলে তাকাল। একটা ডায়েরির নিচে চাপা দেওয়া গোলাপি টুকরো পাতাটা ফ্যানের বাতাসে পতপত করে উড়ছে। মিথি ইচ্ছে করেই কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। বুকের ভেতরের উত্তেজনার ঢেউ শান্ত হতেই এগিয়ে গিয়ে খুব তাচ্ছিল্য নিয়ে কাগজটা তুলে নিল। অথচ তার অন্তর জানে এই উপর উপরের তাচ্ছিল্যের মধ্যে যে কী গা কাঁপানো ভয়! মিথি সচেতন চোখে কাগজটির দিকে তাকাল। সাব্বিরের হাতের লেখা প্যাঁচানো। সে প্যাঁচানো অক্ষরে প্রথমেই লিখেছে মিথির নাম, 

মিথি, 

এই পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যার কাছে আমার কোনো ঋণ থাকতে পারে। কেউ আমার থেকে ঋণ নিবে এতোটা যোগ্যও বোধহয় আমি ছিলাম না। আপনি বলেছেন, দেখা হলে ঋণ পরিশোধ করবেন। কিন্তু আমি চাই, এই ঋণটুকু থাকুক। আপাতত কেউ একজন আমার কাছে ঋণী, এই চিন্তা করতে আমার ভালো লাগবে। যদিও ওই বাড়ি বাড়ি খাবারগুলো খেতে বসে আমার মনে হয়েছিল, আমি আপনার কাছে ঋণী হয়ে যাচ্ছি। যদি ঋণী হয়ে থাকি, সেই ঋণটুকুও থাকুক। সব ঋণ শোধ করতে নেই। 

ভেবেছিলাম, কথাগুলো মুখোমুখি বলব। সুযোগ হলো না। চিরকুটের বদলে বোধহয় চিরকুট দেওয়াই নিয়ম। 

 সাব্বির  
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp