আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ২১ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

আজ ওদের মন ভালো নেই
          হাসপাতালের করিডোরে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি গায়ে যে সৌম্যকান্তি প্রৌঢ় বসে আছেন তিনি গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ, ইশতিয়াকের দাদাজান। গিয়াসউদ্দিনের হাতে রূপোর কাজ করা একটা ওয়াকিং হ্যান্ড স্টিক। তিনি হ্যান্ড স্টিক হাতে গম্ভীর হয়ে বসে আছেন৷ তার পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইশতিয়াক। সুদূর ময়মনসিংহ থেকে মহাখালীর এই হাসপাতালে পৌঁছেই তিনি ইশতিয়াকের দিকে কঠিন চোখে তাকিয়েছেন। কাছে ডেকে মেঘস্বরে জিজ্ঞাসা করেছেন, 

‘ এই ছাগল, এদিকে আয়। আমাকে বল, ডাক্তার কে? আমি নাকি তুই?’ 

ইশতিয়াক প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণ ভ্যাবার মতো তাকিয়ে থেকেছে। দাদাজানের পাশে এসে দাঁড়ালেই স্নায়বিক দুর্বলতায় ক্লান্ত হয়ে আসে দেহ। মস্তিষ্ক কাজ করে ধীরে। দুনিয়াবি কোনো তথ্যই আর মনে করা যায় না। ইশতিয়াক বুকের ভেতর তীব্র পিপাসা নিয়ে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করল। উত্তরে কী বলা যায় বুঝে উঠতে পারছে না। আশেপাশের পাঁচ গ্রামের প্রসিদ্ধ ব্যক্তি দাদাজান। গ্রামে তার বিশাল দুটো এতিমখানা, একটা হাসপাতাল আছে। দাদাজানের পেশা সম্পর্কে তেমন ধারণা না থাকলেও ইশতিয়াক এতটুকু জানে যৌবনে তিনি হোমপ্যাথি বিদ্যা শিখেছিলেন। কয়েকবছর প্রেকটিসও করেছেন। এই আধুনিক চিকিৎসার যুগে এসেও দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে মানুষ আসে দাদাজানের সেই পানি পানি ঔষধ নিতে। ঔষধ বোধহয় কাজে লাগে। তার ডাক্তারি বিদ্যা নিয়ে গ্রামে নানারকম উপকথাও চালু আছে। ইশতিয়াকের হোমপ্যাথিতে বিশ্বাস না থাকলেও বহু মানুষের কাছে তিনি ডাক্তার বটে! কিন্তু এই অধুনাতন হাসপাতালে তাঁর বিদ্যার থেকে ইশতিয়াকের বিদ্যার জোর বেশি। সে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল,

‘ আমি।’ 

দাদাজান গম্ভীর স্বরে বললেন,

‘ তাহলে আমাকে ফোন করে ম্যা ম্যা করার কারণ কী? ডাক্তার হয়ে রোগী মরে যাওয়ার ভয়ে আমাকে ফোন করে ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদিস, তোর লজ্জা করে না?’ 

ইশতিয়াক উত্তর দিতে পারেনি। দাদাজান কণ্ঠস্বর আরও গম্ভীর করে বলেছেন,

‘ তোকে যে বেকুব ডাক্তারি পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে তার নাম, বৃত্তান্ত মিস্টার জহিরুল্লাহকে লিখে দিবি। আমি হাসপাতালে থাকব তিন ঘন্টা। এই তিন ঘন্টার মধ্যেই দিবি। না লিখে দিতে পারলে তোর ডাক্তারি আমি গুচিয়ে দিব৷’ 

এরপর থেকে দুশ্চিন্তায় ইশতিয়াকের ঘাম ছুটে যাওয়ার মতো অবস্থা। এডমিশন টেস্টের প্রক্রিয়া বিস্তৃত। সেখানে কে তার মেডিকেল পড়ার মূল হোতা সেটা সে জানবে কী করে? তাছাড়া তার মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার রেকর্ডও তো আজকালের নয়। প্রায় দশ এগারো বছর আগেকার গল্প। এতদিন আগে কে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্বে ছিলেন কে জানে? গুগল করলে পাওয়া যাবে কি-না সেটাও একটা প্রশ্ন। ইশতিয়াক সাব্বিরের মায়া ভুলে তটস্থ হয়ে এই তথ্য খুঁজতে ছুটল। দাদাজান হাসপাতালে পা রাখার পর থেকে সাব্বিরের জন্য তেমন কোনো দুশ্চিন্তা তার হচ্ছেও না। মত কিঞ্চিৎ বদলেছে। এখন মনে হচ্ছে, সাব্বির বোধহয় এ যাত্রায় বেঁচে যাবে। এটা অবশ্য ইশতিয়াকের মনের কথা। ডাক্তারি মত ভিন্ন। 

দাদাজান হাসপাতালে একা এলেও পেছন পেছন এসেছেন তাঁর দলবল। বড় চাচা থেকে শুরু করে ছোটচাচা সকলেই উপস্থিত। বাড়ির জামাইয়ের আসন্ন মৃত্যুতে তারা শোকাহত। দাদাজান তার শোকাহত পুত্রদের যতবার দেখছেন ততবারই ক্ষেপে যাচ্ছেন। এই বেকুবদের খবর দিয়েছে মিষ্টার জহিরুল্লাহ। বড়দের জন্য টেলিফোন। তরুণ প্রজন্মের জন্য গ্রুপে লোকেশন শেয়ার করে ক্যাপশনে লিখেছে, ‘তটস্থ’। এই বাড়িতে কিছু কোড ওয়ার্ড আছে। ‘তটস্থ’ অর্থ হলো মৃত্যু। বেকুবের বেকুব জলজ্ব্যান্ত এক মানুষের নামে তটস্থ ঝুলিয়ে বসে আছে। ঢাকায় এবং ঢাকার আশেপাশের সকল ছাগল সে খবর দেখে আবার ম্যা-ম্যা করতে করতে ভিড় করেছে হাসপাতালে, বিরক্ত হলেন দাদাজান। তিনি ডাক্তারের চেম্বারের সামনে বসে ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। মিস্টার জহিরুল্লাহকে কাছে ডেকে বিরক্ত কণ্ঠে বললেন,

‘ তুমি যে একটা অতি মাত্রায় গর্দভ তা কী তুমি জানো?’ 

মিস্টার জহিরুল্লাহ মন খারাপ করে তাকিয়ে রইলেন। এতোদিন তিনি নিজেকে অতিশয় বুদ্ধিমান প্রাণী বলে অভিমান করেছেন। স্যারের মুখে সত্যটা শুনে তিনি মর্মাহত। বিষণ্ণ কণ্ঠে বললেন,

‘ জি না, স্যার। জানতাম না। আপনি বললেন, এখন জানলাম।’ 

দাদাজান বললেন,

‘ ভালো করেছ। এই তথ্যটা মনে রাখা তোমার জন্য জরুরি। আজ থেকে তুমি দিনে দুইবার কবিতা আবৃত্তির মত করে রিভাইজ করবে, তুমি জহিরুল্লাহ একটা গর্দভ। একবার সুবহে সাদেকর সময়। আরেকবার ঘুমুতে যাওয়ার আগে। মনে থাকবে?’ 

মিস্টার জহিরুল্লাহ খুব দুঃখ নিয়ে মাথা নাড়লেন। দাদাজান আরেকবার নিজের বিষণ্ণ পুত্রদের দিকে তাকিয়ে মুখ বিকৃত করে ফেললেন। তারপর গেলেন ডাক্তারের সাথে কথা বলতে। মধ্যবয়স্ক ডাক্তার তেমন কোনো সুখের খবর শোনালেন না। সমবেদনার স্বরে বললেন, 

‘ হাতে আর খুব বেশি সময় নেই। রোগীর শরীরে কোনো চিকিৎসা কাজ করছে না। আমরা এখন শুধু অপেক্ষাই করতে পারি।’ 

দাদাজান মুখ গম্ভীর করে ডাক্তারের কথা শোনলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

‘ ঠিক আছে। কোনো আশা যদি না'ই থাকে তাহলে আমাদের রোগীকে ছুটি দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। বাইরে আমার এসিস্ট্যান্ট দাঁড়িয়ে আছে। আপনাদের হাসপাতালের যাবতীয় হিসাবপত্র তাকে বুঝিয়ে দিন। সে বকেয়া পরিশোধ করে দিবে। অপেক্ষাই যদি করতে হয় তাহলে ওই বন্ধ ঘরে শুয়ে অপেক্ষা করার কোনো দরকার নাই। বন্ধ ঘরের থেকে আলো-বাতাস ভরা জায়গা মৃত্যুর জন্য ভালো।’ 

ডাক্তার দাদাজানের দিকে তাকিয়ে থেকে শুধালেন,

‘ আপনি শিওর?’ 

‘ জি। একটা খুপরি ঘরে তটস্থ হয়ে মরে যাওয়া কোনো কাজের কথা না। মরার পর কবরে এমনিতেও একাকী থাকতে হবে। মরার আগে আশেপাশে আত্মীয়-স্বজনের কথা-টথা শুনুক। কান্নাকাটি দেখুক। আকাশ দেখুক। মৃত্যুর পর কেবল যন্ত্রণা। তখন আর আকাশ দেখার ব্যবস্থা নাই।’ 

ডাক্তার ছুটির অনুমতি দিয়ে হেসে ফেলে বললেন, 

‘ আকাশ দেখার ব্যাপারটা ঠিক, চাচা। তবে আপনাদের আত্মীয়-স্বজন এখনও আসা কিছু বাকি আছে বলে তো মনে হয় না। সকালে যার একটি আত্মীয়ও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বিকেলেই তার আত্মীয় স্বজনে হাসপাতালে টেকা যাচ্ছে না। নিচের লাউঞ্জে দেখলাম কিছু ছেলেপেলে খুব আনন্দ নিয়ে টেলিভিশনে ক্রিকেট খেলা দেখছে। আমি ভুল না হলে তারাও নিশ্চয় আপনাদেরই লোক?’ 

দাদাজান বিরক্ত হলেন। এই ছাগলের পাল নিয়ে তাঁর যন্ত্রণার শেষ নেই। জ্ঞান বুদ্ধি সব হাঁটুর নিচে। ‘তটস্থ’ দেখেই লাফিয়ে লাফিয়ে হাসপাতালে চলে এসেছে মরা দেখতে। মরা দেখতে এসেছিস মরা দেখবি। দোয়া ধরে মৃত্যু পথযাত্রীর জন্য কান্নাকাটি করবি। তা না টেলিভিশন নিয়ে হৈচৈ! টেলিভিশনের মধ্যে কী রোগীর জীবন আটকে আছে? বেকুব! ঘন্টাখানেকের মধ্যে সাব্বিরের ছুটির ব্যবস্থা হয়ে গেল। আইসিইউ থাকা অবস্থায় দাদাজান একবার সাব্বিরের পাশে গিয়ে বসেছিলেন। স্ট্রেচারে করে বের করার সময় দ্বিতীয়বার দেখলেন। নিথর হয়ে পড়ে থাকা সাব্বিরের বাম হাতটা ধরে কিছুক্ষণ নীরব দাঁড়িয়ে থেকে কানের কাছে মুখ নামিয়ে মৃদুস্বরে ডাকলেন,

‘ নাতজামাই?’ 

সাব্বিরের বোজে রাখা চোখ সামান্য কাঁপল। দাদাজান ক্ষীণ গলায় বললেন,

‘ জীবন একটা যুদ্ধের নাম। এই যুদ্ধ জেতার জন্য দরকার গায়ের জোর আর মনের বল। তোমার একটা পরীক্ষা হচ্ছে। পরীক্ষাটা খুবই কঠিন। এই পরীক্ষায় জিতে গেলে জীবন, হেরে গেলে মৃত্যু। আমি তোমাকে বাঁচতে সাহায্য করব। যুদ্ধ করার মতো মনের বল আছে না নাতজামাই? মনে বল রাখো, আধ মরাকে বাঁচিয়ে তোলার রেকর্ড আমার আছে।’ 

সাব্বির চোখ মেলে তাকাল না। দাদাজান কয়েক সেকেন্ড সাব্বিরের মুখের দিকে জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করে বললেন,

‘ মিথি তোমাকে দেখতে এসে এক্সিডেন্ট করে পা ভেঙে পড়ে আছে। খুবই যন্ত্রণা পাচ্ছে। আমি তাকে বলেছি, তুমি সুস্থ হয়ে গিয়েছ৷ অস্থির হওয়ার কিছু নাই। বাধ্য হয়ে সামান্য মিথ্যা বলতে হয়েছে। বেকুব মেয়েটা বিছানায় শুয়ে এই যন্ত্রণা নিয়েই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। তোমার ওকে দেখতে যাওয়া উচিত না?’ 

সাব্বির এবার সর্বোচ্চ প্রতিক্রিয়া দেখাল। দাদাজানের ধরে রাখা হাতে নিজের সম্পূর্ণ শক্তি জড়ো করে আলতো চাপ দেওয়ার চেষ্টা করল। তবে চেষ্টা সফল হলো না৷ হাতটা একটু কেঁপে উঠল মাত্র, নাড়ানো গেল না। দাদাজান নির্বিকার মুখে ওয়ার্ড বয়দের স্ট্রেচার এগিয়ে নিতে বললেন। সাব্বিরকে সামান্য মিথ্যা কথা বলতে হয়েছে বলে মনে মনে তওবা পড়লেন। যদিও এখানে মিথ্যার পরিমাণ একেবারেই কম। পুরোপুরি মিথ্যা বললেও সমস্যা ছিল না। ভালো কাজে মিথ্যা বললে তেমন কোনো ক্ষতি হয় না।

সাব্বিরকে স্ট্রেচারে করে বের করে নেওয়ার পর দাদাজানও বেরোনোর প্রস্তুতি নিলেন। নিচে নেমে লাউঞ্জে এসে দেখলেন ঘটনা সত্য। তার বাড়ির ছাগলগুলোই হা করে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখমুখ উত্তেজনায় চিকচিক করছে। দাদাজানকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে মিস্টার জহিরুল্লাহ সতর্কতার কাশি কাশলেন। সাথে সাথেই এটেনশনের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল দাদাজানের সকল গর্বিত পৌত্র। চুপিচুপি টেলিভিশনের রিমোটটা একজন আরেকজনের হাতে দিয়ে নির্দোষ হওয়ার চেষ্টা চালাল কিছুক্ষণ। দাদাজানের রক্তচক্ষুতে তটস্থ হয়ে কী করবে বুঝে না পেয়ে আচমকা সব কটা মোনাজাতের ভঙ্গিতে হাত তুলল। দিব্য রিমোটটা বগলের নিচে চাপা দিয়ে চোখ বোজে উঁচু গলায় প্রার্থনা করল,

‘ হে আল্লাহ! হে পরাক্রমশালী সৃষ্টিকর্তা, তুমি আমাদের সাব্বির ব্রো-র সকল পাপ মাফ করে দাও।’ 

পেছন থেকে আরিফ তার মাথায় চাটি মেরে চাপাস্বরে বলল,

‘ ব্রো কী রে? দুলাভাই বল। দুলাভাই।’ 

দিব্য তৎক্ষনাৎ দোয়া সংশোধন করে বলল, 

‘ হ্যাঁ হ্যাঁ দুলাভাই। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের দুলাভাই সাব্বিরকে থুক্কু সাব্বির দুলাভাইকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করো। তার কবরকে জান্নাতের বাগিচা বানিয়ে দাও।’  

সোহান চাপা ধমক দিয়ে বলল,

‘ কী দোয়া করিস বাল! মরে নাই এখনও।’ 

দিব্য দোয়া ধরেই পরামর্শ চাইল,

‘ তাহলে কোন লাইনটা বলব?’ 

মৈয়ন দোয়া ধরেই পরামর্শ দিল,

‘ ডেঙ্গু হয়েছে না? জ্বর কমে যাওয়ার ব্যাপারটা বল।’ 

আরিফ প্রতিবাদ করল, 

‘ খালি জ্বর কমলে চলবে নাকি? ডেঙ্গু কঠিন রোগ। ভেতরের আরও অনেক কলকব্জা নাড়িয়ে দিয়েছে। আগে কলকব্জা ঠিক হওয়া দরকার।’ 

দিব্য শুধাল, 

‘ তাহলে কলকব্জা ঠিক করে দিতে বলব?’ 

নাহিদ আড়চোখে একবার টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল, 

‘ তিন বলে শূন্য রানে আউট। এই হারামির পুতগুলার ডেঙ্গু হতে পারে না? এদের ডেঙ্গু হওয়ার দোয়া কর৷ শালারা ডেঙ্গুর কামড় খেয়ে চিৎ হয়ে পড়ে থাক। আমিন।’ 

সবাই একযোগে বলল,

‘ আমিন।’ 

দাদাজান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিস্টার জহিরুল্লাহর দিকে তাকালেন। বললেন,

‘ এই ছাগলগুলোকে এক সপ্তাহ পর বাড়ি আসার নোটিশ দাও। এদের কাজ হবে বাড়ি ফিরেই কাঁঠাল পাতা খাওয়া। গাছে পর্যাপ্ত কাঁঠাল পাতা আছে কি-না খোঁজ নাও।’ 

জহিরুল্লাহ আনন্দিত মনে মাথা নাড়লেন। এরা শাস্তি পাবে সেজন্য নয়। এরা আবারও বাড়ির সংস্পর্শে আসবে সেই খবরে তিনি পুলকিত। দাদাজান হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেলে ওরা মোনাজাত ছাড়ল। দিব্য বিষণ্ণ কণ্ঠে শুধাল, 

‘ মিস্টার জহিরুল্লাহ, কাঁঠাল পাতা কী এমনিই খেতে হবে? সাথে একটু গুঁড় দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায় না?’ 

সোহান চেঁচিয়ে উঠে বলল,

‘ আরেকটা আউট! যা শালা! আউটের উপর আউট হচ্ছে। সাব্বির ভাই বোধহয় বেশিক্ষণ বাঁচবে না।’ 

মিস্টার জহিরুল্লাহ এই চূড়ান্ত অদ্ভুত এবং উদ্ভট ছেলের দলটির দিকে কিছুক্ষণ কোমল চোখে তাকিয়ে রইলেন। তার এই দীর্ঘ জীবনে স্যারের মতো মহান মানুষ তিনি খুব অল্প দেখেছেন। তার তৈরি করা ছেলেগুলোও হয়েছে তারই মহৎপ্রাণের নিদর্শন। প্রত্যেকের ভেতরেই একে-অপরের জন্য টইটম্বুর মায়া। দাদাজানের ভয় নিছক, তারা কেবল ছুটে এসেছে বোনের ভাগ্যটা যেন সদয় হয় সেই সুমধুর প্রার্থনায়। অথচ সেই মায়ার দিঘি প্রকাশ করতে কতই না অপরাগ তারা! নাহিদ একটা চেয়ার ডিঙিয়ে এক লাফে মিস্টার জহিরুল্লাহর সামনে এসে দাঁড়াল। তার কাঁধে হাত রেখে তাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,

‘ চারপাশে কেমন সুন্দর সুন্দর রমণী দেখেছেন? চলুন, দাদাজানের সাথে আলাপ করি। এই বয়সেও বিবাহ করেননি। আপনার একটা বিবাহ করানো যায় কিনা দেখি৷’ 

এই পাজি ছেলেদের দলকে মনে মনে স্নেহ করলেও যথেষ্ট ভয় করেন জহিরুল্লাহ। ইতরামিতে এরা দাদার যোগ্য উত্তরসূরী। মস্তিষ্কের নিউরনে নিউরনে এদের পাজি বুদ্ধি। তিনি তটস্থ কণ্ঠে বললেন,

‘ আমি বিবাহ করব না।’ 

নাহিদ আশ্চর্য হয়ে বললেন, 

‘ বিবাহ করবেন না কেন? বিবাহ করা ফরজ জানেন না? এই সুন্দরীদের হাঁটে বসেও বিবাহ করতে ইচ্ছে না করলে তো আপনি পুরুষ জাতির জন্য হানিকর।’ 

তারপর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,

‘ আমার কাছে কিছু দুষ্ট ভিডিও আছে। গভীর রাতে আপনাকে পাঠাব। দেখবেন তরতর করে বিবাহের প্রতি আগ্রহ ফিরে আসছে।’ 

মিস্টার জহিরুল্লাহর মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি সর্বদা গিয়াসউদ্দিনের আশেপাশে থাকেন। জহিরুল্লাহর মাঝে মাঝে মনে হয় স্যারের সুপ্ত কোনো নেত্র আছে। সেই দৃষ্টি মেলে তাকালেই তিনি গায়েবি বিষয় আশয় ধরে ফেলেন। জহিরুল্লাহর মোবাইলে এই ধরনের ভিডিও সত্যিই এলে…। জহিরুল্লাহর কণ্ঠ শুকিয়ে আসে। ততক্ষণে বাকিরাও এসে জড়ো হয়েছে কাছে। নাহিদ বলল,

‘ এক সপ্তাহ পর তো আসছি। আমরা বসে কাঁঠালপাতা খাব। আপনি আমাদের পাহারা দিবেন আর বিবাহের আগ্রহ বাড়াবেন, ঠিক আছে?’ 

জহিরুল্লাহ ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল,

‘ কী দরকার আপনাদের কাঁঠালপাতা খাওয়ার?’ 

নাহিদ হেসে বলল,

‘ নেই বলছেন? ঠিক আছে, আমাদের বদলে নাহয় আপনি খেয়ে দিলেন কাঁঠালপাতা। আর আপনার বদলে বিবাহ করে নিলাম আমরা। কোন মেয়েটাকে পছন্দ হয় বলুন তো? আমার তো সবাইকেই ভালো লাগে। হাদিসে কোনো ফাঁকফোকর নেই? কোনোভাবেই কী একসাথে দশ বারোটা বিবাহ করা যায় না জহিরুল সাহেব?’ 

মিস্টার জহিরুল্লাহ এই পাজি ছেলের কথার উত্তর দিলেন না। মুখ ভার করে নাহিদের পাশে পাশে হাঁটতে লাগলেন। নাহিদের ইশারা তিনি ঠিকই ধরতে পেরেছেন। এই কাঁঠালপাতা শাস্তির ফাঁকফোকর ওনাকেই ভেবে বের করতে হবে। নয়তো এই দুষ্ট ছেলের দল তাদের সিংহপুরুষ দাদার সাথে না পেরে তার থেকেই নিবে যাবতীয় প্রতিশোধ। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp