নবোঢ়া - পর্ব ১৭ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

নবোঢ়া - ইলমা বেহরোজ
          কিছুদূর যেতে না যেতেই জাওয়াদের মনে অস্বস্তি দানা বাঁধতে শুরু করে। মেয়েটাকে এভাবে নির্জন পথে একা ফেলে আসা কি ঠিক হলো? যদি কিছু হয়ে যায়! একা একটা মেয়ে, সন্ধ্যার আঁধারে কীভাবে বাড়ি ফিরবে? 

মনে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। একদিকে নিজের রাগ, অন্যদিকে গুলনূরের নিরাপত্তার চিন্তা। শেষ পর্যন্ত বিবেকের জয় হয়। সে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে নির্জন এক জায়গায় গিয়ে থামে। সেখান থেকে জমিদার বাড়ি পর্যন্ত লম্বা পথটা চোখে পড়ে। ততক্ষণে চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। আকাশে তারাদের মিটমিট। জমিনে জোনাকিদের নাচ।

গুলনূর ধীরে ধীরে এগোচ্ছে জমিদার বাড়ির দিকে। একদিকে উঁচু পাহাড়ের কালো ছায়া, অন্যদিকে গাছপালা। হঠাৎ একটি চামচিকা ডানা ঝাপটে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায়। ভয়ে গুলনূরের চোখ দুটি বন্ধ হয়ে আসে। শরীর কাঁপতে থাকে পাতার মতো।

দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে জাওয়াদের বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠে বুকের খাঁচা ভেঙে। সে প্রায় গাড়ি থেকে নেমেই যাচ্ছিল, ছুটে যাবে গুলনূরের কাছে। শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নেয়। গুলনূর আবার হাঁটা শুরু করেছে। জাওয়াদ নিঃশ্বাস রোধ করে দেখতে থাকে। 

যখন গুলনূর জমিদার বাড়ির বিশাল লোহার গেটের কাছে পৌঁছায়, জাওয়াদের চোখে তাকে একটি ছোট্ট পিঁপড়ার মতো দেখায়। এতটাই দূরে ছিল সেই প্রাসাদোপম অট্টালিকা। জাওয়াদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। বুকের ওপর থেকে যেন একটা বিশাল পাথর নেমে গেছে। আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে সে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ঘুরে। মনির আর সিদ্দিককে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে জানতে পারে , গুলনূর বোবা! সেই মুহূর্ত থেকে একটা তীব্র অনুশোচনা তাকে গ্রাস করে রেখেছে। শেষ রাতে সে সবার অগোচরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়৷ 

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই গ্রামের মানুষজন জড়ো হতে শুরু করে জমিদার বাড়ির সামনে। সুফিয়ানের নির্দেশে মনির রাতারাতি খবর পৌঁছে দিয়েছে গ্রামের প্রতিটি ঘরে। 

ভোরবেলা। চোখেমুখে গর্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সুফিয়ান। শব্দর আজ একটা বড় দায়িত্ব নিয়ে সফরে যাচ্ছে। সরিষার ব্যবসায়িক চুক্তি। এমন একটা চুক্তি শুধু জমিদার পরিবারের নয়, পুরো গ্রামের সমৃদ্ধির চাবিকাঠি হতে পারে। 

শব্দর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। পরনে সাদা পাঞ্জাবি আর পায়জামা। হাতের ছোট্ট অ্যাটাচি কেসটা গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রে ঠাসা। 

সুফিয়ান এগিয়ে এসে শব্দরের কাঁধে হাত রাখেন। বলেন, ‘নিজের খেয়াল রেখো। আর মাথায় রেখো, আমাদের চাষীদের স্বপ্ন, তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ, সবই তোমার উপর নির্ভর করছে। ’

শব্দর বলে, ‘ভাইজান, আজই যেতে হবে? আপনার শরীরটা ভালো না, একটু সুস্থ হয়ে নিলে তারপর যেতাম…’

সুফিয়ান তাকে থামিয়ে দিলেন, ‘না, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো। আমার জন্য চিন্তা করো না। আমি মনিরকে সঙ্গে নিয়ে কবিরাজের কাছে যাব। তুমি নিশ্চিন্তে যাও।’

শব্দর সুফিয়ানের পায়ের কাছে ঝুঁকে সালাম করে। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, বাড়ির দাসীরা কৌতূহলী চোখে উঁকি দিচ্ছে। ললিতা আর জুলফা দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে। শব্দর ললিতার থেকে বিদায় নিয়ে জুলফার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ফিসফিসিয়ে বলে, ‘আমার জন্য কিন্তু রোজ দোয়া করবে। আর নিজের যত্ন নেবে।’

জুলফার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি দোলা দেয়। রাতে জেগে ওঠা তীক্ষ্ণ, সূক্ষ্ম ব্যথাটা আবার ফিরে আসে। বোধহয় শব্দরের জন্য তার মনে কোনো অজানা টানের উদয় হয়েছে। হয়তো সেটা শুধুই সহানুভূতি! এই মানুষকে সে কখনো ভালোবাসতে পারে না। 

সে মাথা নাড়িয়ে বলে, ‘আপনিও সাবধানে থাকবেন। দ্রুত ফিরে আসবেন।’

শব্দরের চোখে একটু আর্দ্রতা ফুটে ওঠে। সে আর কিছু না বলে, ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় গেইটের কাছে। গ্রামবাসীদের থেকে বিদায় নিয়ে ঘোড়া গাড়িতে উঠে বসে। চারপাশে তাকিয়ে কাউকে খুঁজে। জাওয়াদকে সকাল থেকে দেখা যাচ্ছে না। বোধহয় ইচ্ছে করেই কোথাও লুকিয়েছে, যাতে তার সঙ্গে দেখা না হয়। 

“কী যে হয়েছে ওর!” ভাবতে ভাবতে শব্দরের কপাল কুঁচকে যায়। গাড়ি চলতে শুরু করে সামনের দিকে। গ্রামবাসীরা দূর থেকে হাত নেড়ে বিদায় জানায়। 

পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম রশ্মি ছড়িয়ে পড়তেই সেখানে নাভেদের আবির্ভাব ঘটে। সে আলো ফোটার আগেই দৌড়াতে বের হয়েছিল। এখন ছুটে আসছে বাড়ির দিকে, তার শরীর থেকে দরদর করে ঘাম ঝরছে। শ্বাস-প্রশ্বাস হাপরের মতো। জুলফার চোখ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাভেদের দিকে আকর্ষিত হয়। তার দৃষ্টিতে এতক্ষণ ধরে যে উদ্বেগ ছিল শব্দরের জন্য, তা যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ নাভেদের দিকে তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ সচেতন হয়ে উঠে চারপাশের লোকজনের উপস্থিতি সম্পর্কে। লজ্জা আর সংকোচে মুখ লাল হয়ে যায়।

দুইদিন পর। আকাশের গায়ে সূর্যের হেলে পড়া রাঙা আভা ছড়িয়ে পড়েছে জমিদার বাড়ির প্রাঙ্গণে। বিকেলের নরম আলোয় সোনালি হয়ে উঠেছে চারপাশ। এমন মায়াবী মুহূর্তে হাতে সাদা রুমাল, আর পাশে সাজানো রঙিন সুতোর নানান গোছা নিয়ে জুলফার আঙুলগুলো চলছে অসাধারণ নৈপুণ্যে। ধীরে ধীরে রুমালের বুকে এঁকে যাচ্ছে বেহালার আকৃতি। নাভেদের প্রিয় বাদ্যযন্ত্র। কাজ শেষে জুলফা রুমালটি তুলে ধরে আলোর দিকে। চমৎকার হয়েছে। এবার নাভেদের হাতে তুলে দিতে হবে। সময় আর বেশি নেই। মাত্র পাঁচ দিন। তারপর লোকটা চলে যাবে, হয়তো চিরতরে। জুলফার চোখ ছলছল করে ওঠে।

সে চারপাশে তাকায়। বাড়িতে থমথমে নীরবতা। দুপুরের গরমে সবাই নিজ নিজ ঘরে বিশ্রাম করছে। জাওয়াদ দুইদিন ধরে নিখোঁজ, তার চিন্তায় অস্থির ললিতা। সুফিয়ান গিয়েছেন কবিরাজের কাছে। রাইহার অবস্থা শোচনীয়। ললিতা বারবার জেরা করছে তাকে, সে টু শব্দও করছে না। এই সুযোগ! জুলফা নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে অতিথি ভবনের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। চোখ চঞ্চল হয়ে ওঠে। চারপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়, কেউ তাকে দেখছে কি না। বুকের ভেতরটায় তখন ঢাকের মতো বাজছে। ঠোঁট কামড়ে ভাবে, ‘এখন কী করব? কীভাবে দেব এটা? কী ভাববেন উনি?’

পরক্ষণেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, “যা ইচ্ছে ভাবুক। কয়দিন পর সব শেষ। তারপর তো আর কখনোই দেখা হবে না।”

সাহস সঞ্চয় করে সে দরজায় মৃদু আঘাত করে। প্রথমে কোনো সাড়া আসে না। আবার টোকা দিতে যাবে, এমন সময় ভেতর থেকে নাভেদের গলা ভেসে আসে, ‘কে?’

লজ্জায় জুলফার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হচ্ছে। একই সঙ্গে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। নাভেদ কি রুমালটা পছন্দ করবে? নাকি ভীষণ অবহেলায় কোথাও ফেলে রাখবে? 

এমন সময় সপাং করে দরজা খুলে যায়। নাভেদ বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকায় জুলফার দিকে। 

‘এই সময়ে আপনি?’

জুলফা লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে ফেলে। তার কণ্ঠ কাঁপতে শুরু করে, ‘জি... আসলে... আমি…’কথা আটকে যায় গলায়।
নাভেদ জুলফার অস্বস্তি বুঝতে পেরে বিনয়ের সঙ্গে বলে, ‘আসুন, ভেতরে আসুন।’ 

সে পাশে সরে দাঁড়ায়।

জুলফা ধীর পায়ে ঘরে ঢুকে। নাভেদ একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘বসুন।’
জুলফা চেয়ারে বসে বটে, কিন্তু তার ডান পা অনবরত নড়ছে। সে কোনোমতে কাঁপা হাতে রুমালটি সামনে ধরে বলে, ‘এটা আপনার জন্য।’

নাভেদ অবাক হয়ে তাকায় রুমালের দিকে। সেটা হাতে নিয়ে বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আমার জন্য?’
জুলফা গলা পরিষ্কার করে বলে, ‘শুনেছি আপনি চলে যাচ্ছেন। তাই ভাবলাম... একটা ছোট্ট স্মৃতি…’
নাভেদ রুমালটি হাতে নিয়ে আলোর দিকে তুলে ধরে। চোখেমুখে একইসাথে বিস্ময় ও মুগ্ধতা ফুটে ওঠে। ধীরে ধীরে আঙুল বুলিয়ে সেলাইয়ের সূক্ষ্ম কারুকাজ অনুভব করার চেষ্টা করে। তারপর জুলফার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘কী চমৎকার! অবিশ্বাস্য সুন্দর! বেহালাটা জীবন্ত লাগছে! কীভাবে এমন অসাধারণ কাজ করলেন?’

জুলফার মুখ লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে ওঠে। সে চোখ নামিয়ে নেয়। ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা দেখা দেয়। সাহস সঞ্চয় করে তাকায় নাভেদের দিকে, ‘আসলে... আপনার তোলা সুর আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তাই…’ 

একটু থেমে, জুলফা আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কি দিনের বেলা বেহালা বাজাতে পারেন না?’

নাভেদ জুলফার দিকে জহুরি চোখে তাকায়। চার চোখ এক হয়ে যায়। জুলফার চোখে এমন আকুলতা আর আগ্রহ দেখে সে, যা সে আর কারও মধ্যে দেখেনি। তার নিজের পরিবারও কখনো তার বেহালা বাজানোকে এতটা গুরুত্ব দেয়নি। এই প্রথম কেউ তার সুরের জন্য এত আগ্রহী হলো। 

নাভেদ বলে, ‘বাজাব। আপনার জন্য বাজাব৷ আমি ছাড়া আর কেউ এই বেহালার জন্য এতটা আগ্রহ দেখায়নি।’ 

সে হাত বাড়িয়ে বেহালাটা স্পর্শ করে। তারপর জুলফার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে, ‘যদি চান... এখনই বাজাতে পারি।’

জুলফা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, ‘সত্যি? এখনই ?’

নাভেদ হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। সে উঠে গিয়ে বেহালাটা হাতে তুলে নেয়। জুলফার দিকে ফিরে একটু হেসে বলে, ‘আপনার জন্য, শুধু আপনার জন্য একটা বিশেষ সুর তুলব। যেই সুরটা আমি কখনো কাউকে শোনাইনি।"

জুলফার বুক আনন্দে ভরে ওঠে। নাভেদ তার পছন্দকে শুধু প্রশ্রয় দিচ্ছে না, তার জন্য একটা বিশেষ সুরও বাজাবে! এই মুহূর্তটা চিরকালের জন্য থেমে যাক।

নাভেদ বেহালাটা কাঁধে তুলে নেয়। তারপর চোখ বন্ধ করে একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বাজাতে শুরু করে। প্রথমে একটা করুণ সুর উঠে আসে, ছলছল করে তোলে জুলফার চোখ। তারপর ধীরে ধীরে সেই সুর বদলে রূপ বেয় মিলনের সুরে। জুলফা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে। তার চোখ দিয়ে অজান্তে জল গড়িয়ে পড়ে। 

বেহালার শেষ সুরটি বাতাসে মিলিয়ে যেতে যেতেই চিৎকার ভেসে আসে, ‘নাভেদ! নাভেদ!’

নাভেদ চমকে উঠে। হাত থেকে ছিটকে পড়তে চাইল বেহালাটা, শেষ মুহূর্তে সামলে নেয়। 

জুলফার দিকে একবার তাকিয়ে সে তাড়াতাড়ি বেহালাটা নামিয়ে রাখে পালঙ্কে। 
পায়ের শব্দ ক্রমশ এগিয়ে আসছে। নাভেদ দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। সেই মুহূর্তে দরজা খুলে যায় ঝড়ের বেগে। 
রাইহা ছুটে আসে ঘরের মধ্যে। তার চুল এলোমেলো, চোখে জল। সে একেবারে সোজা এসে জড়িয়ে ধরে নাভেদকে। নাভেদ হকচকিয়ে যায়। ধীরে ধীরে হাত রাখে রাইহার পিঠে। প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে রাই? কাঁদছো কেন?’

জুলফা যেন বাজ পড়ার শব্দে জেগে উঠেছে স্বপ্নের জগৎ থেকে। সে উঠে দাঁড়ায় চেয়ার থেকে। তার দু'চোখ বিস্ফারিত, অবিশ্বাসে ভরা।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp