মোমবাতির মোলায়েম আলো কোমল হয়ে ছড়িয়ে আছে চারপাশে। খাবার টেবিলে মুখোমুখি বসে থাকা নরনারী দু’জন রাতের আঁধারের মতোন নিশ্চুপ। উষ্ণ বৈশাখের রাতে এক টুকরো পৌষ নেমে আসার মতোন শীতল পরিবেশ। মিথি ঘরের পরিবেশ সহজ করতে মৃদু গলা খাঁকারি দিল। প্লেট থেকে ফরসা, সরু আঙুলগুলো গুটিয়ে নিয়ে প্রলম্বিত শ্বাস ফেলল। শুধাল,
‘ আমি কী কোনোভাবে আপনাকে হার্ট করে ফেললাম সাব্বির সাহেব?’
সাব্বিরের কঠিন পেশি এবার কিছুটা শিথিল হলো। ধ্যানভঙ্গ হওয়ার মতো চমকে তাকাল মিথির মুখের দিকে। কণ্ঠটাকে যথাসম্ভব সহজ করার চেষ্টা করে বলল,
‘ না না। তেমন কোনো ব্যাপার নেই। আপনি অহেতুক ভাবছেন মিথি।’
মিথি খাওয়া থামিয়ে সাব্বিরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। দীর্ঘক্ষণ একভাবে তাকিয়ে থাকার পর শুধাল,
‘ আপনি কী কোনো এতিমখানায় বড় হয়েছেন সাব্বির সাহেব?’
সাব্বির এতক্ষণ নত মুখে খাবার নাড়াচাড়া করছিল। মিথির প্রশ্নে মাথা তুলে তাকাল। মিথি তার জিজ্ঞাসাকে আরও স্পষ্ট করতে কোমল স্বরে বলল,
‘ এতিমখানার বাচ্চাদের প্রতি আপনার মমতা দেখেই হঠাৎ প্রশ্নটা মাথায় এলো। ওদেরকে ওদের মতো করে ভালোবাসতে পারে ওদেরই একজন। ’
সাব্বির প্রত্যুত্তরে ফ্যাকাশে হাসল। ম্লান কণ্ঠে বলল,
‘ হ্যাঁ। এতিমখানার সাথে আমার সম্পর্কটা অন্যরকম৷’
মিথি হাসল। নরম স্বরে বলল,
‘ তারা নিশ্চয়ই খুব ভাগ্যবান যে আপনি তাদের একজন।’
সাব্বির প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না। মিথির দিকে তাকিয়ে সৌজন্যতার হাসি হাসল। সাব্বিরের মাপা মাপা হাসিতে যেন গাঢ় বিষাদের ছায়া দেখল মিথি। সে বুঝে পেল না, কী নিয়ে এতো বিষণ্ণ সাব্বির? তার বাবা-মা নেই বলে? সে তো অনেকেরই থাকে না। মিথিরও তো নেই। তাতে কী হয়েছে? এই পৃথিবীতে বাবা-মা থাকা না-থাকাই তো শেষ কথা নয়। মিথির হঠাৎ মন খারাপ হয়ে গেল। এই চব্বিশ বছরের জীবনে নিজের দুঃখ নিয়ে সে এতো মত্ত ছিল যে পৃথিবীর আর কারো মন খারাপের কথা ভাববার অবসর তার হয়নি। ইচ্ছেও হয়নি। কোনো তাড়নাও বোধ করেনি। আজ প্রথমবারের মতো সাব্বিরের মন খারাপ তাকে বিষণ্ণ করে তুলল। যদি সাব্বিরের সাথে তার স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকত, তাদের গল্পে বৃষ্টি বলে কারোও অস্তিত্ব না থাকত তাহলে হয়ত-বা মিথি….। আর ভাবতে পারল না সে। সবকিছু ঠিক থাকলেও কারো মন খারাপ কী করে ভালো করা যায় তা জানে না মিথি। সেখানে অন্য একটি মেয়ের প্রেমিককে কী করে সান্ত্বনা দেওয়া যায় সে সম্পর্কে ধারণা থাকা বিলাসিতা বৈকি! সাব্বির নিশ্চয় তার থেকে কোনো সান্ত্বনা চাইছে না? আর চাইলেও, সেই সান্ত্বনা নিশ্চয় সে মিথির থেকে আশা করে না? মানুষের মন খারাপ হলে তারা প্রিয় মানুষের বুক পকেটে খুচরো পয়সার মতো উষ্ণতা পেতে চায়। গুরুত্ব পেতে চায়। মিথি তো সাব্বিরের কোনো প্রিয় মানুষ নয়। তারপরও… তারপরও সাব্বিরের এই বিষাদ মুখ এড়িয়ে যেতে পারল না মিথি। মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে সহজ গলায় বলল,
‘ হোয়াট আ কো-ইন্সিডেন্স, সাব্বির সাহেব! আমার আর আপনার সিচুয়েশন তো দেখি খুব কাছাকাছি। আপনি কী জানেন, আমারও মা নেই। আমাকে জন্ম দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে মারা যান। বাবাও না থাকার মতোই। আর দাদাজানের বাড়িটাও তো ওয়ান কাইন্ড অব এতিমখানাই।’
কথাটা বলে হাসল মিথি। তাকে সঙ্গ দিতে ম্লান হাসল সাব্বির। কিন্তু সেই হাসিতে যেন কত বছরের কর! কত বছরের দেনা! ওই হাসিই যেন নীরবে মিথিকে বলে গেল, আপনার দুঃখ আর আমার দুঃখ এক নয় মিথি। আমাদের দুঃখের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। মিথি দুই ভ্রুয়ের মাঝে ভাঁজ ফেলে কয়েক সেকেন্ড সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে রইল। সাব্বির তখন মাথা নুইয়ে নিঃশব্দে খাচ্ছে। খাওয়া-দাওয়া শেষে টেবিল ছেড়ে উঠে যাওয়ার আগমুহূর্তে মিথি আনমনে তাকে ডাকল,
‘ সাব্বির?’
সাব্বির চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। মিথির মুখে নিজের নাম শুনে একটু থমকাল। সরল চোখদুটো, যে চোখে এখন মেঘ মেদুর ছায়া৷ সেই চোখদুটো তুলে মিথির মুখের দিকে নীরব জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকিয়ে রইল। মিথি একটু অপ্রস্তুত, একটু আনমনা কণ্ঠে শুধাল,
‘ আপনি…’
সাব্বির কোন প্রশ্ন না করে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করল। মিথি দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় শুধাল,
‘ আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, আপনি কোনো বিষয় নিয়ে খুব বিষণ্ণ। এই বিষণ্ণতা কী আপনার বাবা-মা নেই বলে?’
সাব্বির উত্তর না দিয়ে মিথির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সাব্বিরের শ্যামলা মুখের ওই বড় বড় চোখ, ওই চোখের আশ্চর্য চাহনি ধীরে ধীরে অবশ করে দিল মিথির দেহ। উপলব্ধি করল, সাব্বিরের থেকে সুদর্শন পুরুষ সে আগে কখনও দেখেনি। চলচ্চিত্র জগতের সবথেকে সুপুরুষ সাফাত, তাদের বাড়ির সুদর্শন জেন্টেলম্যান ইশতিয়াক অথবা গ্রীক দেবতাদের মতো সুগঠিত, সুন্দর নাহিদ কারোরই রূপেগুণে এই সাধারণ পুরুষটিকে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা নেই। মিথির বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক তারল্য সর্বনাশা ঢেউয়ের মতো বাজতে লাগল ছলছল ছলছল। হৃদয়ের ওই ঢেউই যেন চোখ ফেঁটে বেরিয়ে আসতে চাইল। জীবনের প্রথম মিথি কারো সঙ্গে কথা বলার সময় চোখ নামিয়ে নিল। খিচুড়ির থালায় নিজের উদ্বেলিত হৃদয় সামলে আচমকা শুধাল,
‘ আপনি কী আপনার বাবা-মায়ের পরিচয় জানেন না, সাব্বির? এই অপরিচয়ের দ্বন্দ্বের জন্যই কী…’
বাকি কথাটুকু হাওয়ায় ভাসিয়ে রেখে চোখ তুলে সাব্বির সৌম্যকান্তি মুখের দিকে তাকাল। সাব্বির এতক্ষণ মিথির মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিল। এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের এঁটো প্লেটটা হাতে তুলে নিয়ে ফ্যাকাশে হেসে বলল,
‘ চা খাবেন তো মিথি? আপনি খাওয়া শেষ করুন। আমি চা বসাচ্ছি।’
মিথি প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না। সাব্বির বোধকরি মিথির থেকে কোনো উত্তর প্রত্যাশাও করেনি। প্রশ্নটা করেই ধীরপায়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। খাবার টেবিলে বিষণ্ণ রাজকুমারীর মতো একদম একলা বসে রইল মিথি। মোমের কমলা আলোয় তার এই বিষণ্ণমূর্তিকে দেখাল মায়েদের মতো করুণ। আর মুখখানা যেন পৃথিবী সর্বাদৃত কোনো ফুল৷
সাব্বির এঁটো প্লেটটা ডিশওয়াশারে রেখে চুলোয় চায়ের পানি বসিয়ে সিংকে ঠেস দিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। রান্নাঘরের খোলা জানালা দিয়ে ভেসে আসছে কুনোব্যাঙের ডাক। তার সঙ্গে মধ্যরাতের অদ্ভুত ঝিম ধরা রব। সাব্বির আনমনা হয়ে জানালার বাইরে মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর কোথাও সূক্ষ্ম এক ব্যথা হচ্ছে। আশ্চর্য এক অসহায়ত্ব হাসফাস করছে বুকের ভেতর। সাব্বিরের জীবনে কখনও প্রেম না এলেও মিথির ওই দৃষ্টি না বোঝবার মতো নির্বোধ সে নয়। সাব্বির জানে, মিথির তার প্রতি দুর্বলতা আছে। হয়তো সে সাব্বিরকে…। সাব্বির আর চিন্তা করতে পারল না। মিথি! মিথির মতো চমৎকার একটা মেয়ে কেন তার প্রতি দুর্বল হবে? পছন্দ করার মতো কী আছে সাব্বিরের? কিছুই তো নেই! মিথি কেন বিষয়টাকে আরও জটিল করে দিচ্ছে? দাদাজান কেন মিথির জীবনটাকে তার মতো একজনের সঙ্গে বেঁধে দিলেন? এই কয়েক মাসে সাব্বির খুব ভালো করে বুঝে গিয়েছে, দাদাজান খুব বুদ্ধিমান একজন মানুষ। তার দৃঢ় বিশ্বাস, দাদাজান তার সম্পর্কে সব খবরাখবর জানেন। সাব্বিরের সকল সত্য সম্পর্কে জেনেশুনে ইচ্ছে করেই নিজের নাতনিকে জড়িয়ে দিয়েছেন তার জীবনের সঙ্গে। যাকে সাব্বির এতো বুদ্ধিমান মনে করে তিনি মিথির ব্যাপারে এমন নির্বোধের মতো কাজ কী করে করলেন? তিনি কী জানেন না, সাব্বিরের পক্ষে একটা স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন কাটানো কখনও সম্ভব না। সাব্বিরও তো এটা হতে দিতে পারে না। তারপরও…সাব্বির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ক্লান্ত কণ্ঠে স্বগোতক্তি করল,
‘ মিথি! আমার মিথি! তোমার সকল ভাবনা-চিন্তার বাইরে আমার দুঃখ। তোমার কল্পনাতীত আমার পাপ। তুমি প্লিজ আমার কাছে এসো না। আমাকে ভালোবেসো না। প্লিজ! প্লিজ মিথি। কসম খোদার, তোমার দুঃখ আমার সহ্য হবে না।’
—————
ছাদের লাগোয়া ঘরটির দরজা ঠা করে খোলা। একটা ফুল তোলা সাদা পর্দা মৃদু মৃদু উড়ছে। মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে দুপুরের রোদ। নিঝুম চারিদিক। ব্যস্ত গৃহকর্ত্রীরা সম্ভবত বিছানায় শরীর এলিয়ে সেড়ে নিচ্ছেন দুপুরের ভাতঘুম। এই নিঃসঙ্গ দুপুরে নাহিদের ঘরের এক কোণায় একাধারে বেজে চলেছে ‘ ঢপ! ঢপ! ঢপ!’। নাহিদের তন্দ্রাভাব কেটে গেল। আরামের ঘুমে ব্যাঘাত পড়ায় কপালে ভাঁজ ফেলে বালিশ থেকে মুখ তুলে তাকাল। ঘরের এক কোণায় রাবারের বল দিয়ে খেলছে বাবুন। চোখ-মুখ থমথমে। বলটা প্রতিবার মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলার সময় বিড়বিড় করে কিছু একটা বলছে। নাহিদ মুখ গম্ভীর করে বাবুনকে ডাকল। ধমক দিয়ে বলল,
‘ এই তুই এখানে কী করছিস?’
গাঢ় নীল শার্টের সঙ্গে সফেদ হাফপ্যান্ট। পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল। পায়ে প্যাম্প সু পরে ফুল বাবুটি সেজে থাকা বাবুন বড় বড় ছলছল চোখদুটো তুলে তাকাল। মৃদু কণ্ঠে বলল,
‘ হাতি আকাশে উড়ে বাবা।’
নাহিদ যার পর নাই বিরক্ত হলো। ধমক দিয়ে বলল,
‘ একটা থাপ্পড় দিয়ে তোর দাঁত ফেলে দেব। হাতি আবার আকাশে উড়ে কী করে? জ্বালাতন না করে চোখের সামনে থেকে দূর হ তো। সারাজীবন তোর মা জ্বালিয়েছে। এখন তুই জ্বালা। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খেয়ে ফেল। বেয়াদব!’
বাবুনের কচি মুখে আঁধার নামল। ছলছলে চোখদুটোতে টইটম্বুর অভিমান নিয়ে সে তাকিয়ে রইল নাহিদের দিকে। যেন এক্ষুণি উপচে পড়বে চোখের বাঁধ। নাহিদ ভেবেছিল, শুধু ধমকে থামবে না। ইচ্ছেমতো কান মলে দিবে। যেন আর কখনও নাহিদকে জ্বালানোর সাহস না হয়। কিন্তু ওই অভিমানী চোখজোড়া দেখে সে থমকাল। বুকের ভেতর নাগরদোলায় দোল খাওয়ার মতো হুহু করে উঠল। ওই ছলছলে চোখ নাহিদের বড় পরিচিত। ঠিক এভাবে তাকিয়েই কেউ একজন সহস্রবার নাহিদের সঙ্গে অভিমান করেছে। অভিমানের কত ছলাকলা তার! কে সেই ছলনাময়ী, নাহিদ জানে না। মনে করতে পারে না। কিন্তু এটা জানে, নাহিদ বড় আদর করে প্রতিবার তার মান ভাঙিয়েছে। দীর্ঘ উষ্ণ চুমু খেয়েছে তার ঠোঁটে। নাহিদের অস্থির লাগল। বাবুনকে কাছে টেনে আদর করে দিতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু তার আগেই বাবুন গম্ভীর গলায় বলল,
‘ আমি তোমাকে কামড়ে দিব।’
নাহিদের চোখ কপালে উঠল এবার। স্প্রিংয়ের মতো উঠে বসে বলল,
‘ তুই আমাকে কামড় মারবি! আমাকে! তোর মা এই শিখিয়েছে তোকে? নাহিদকে কামড় মারতে শিখিয়েছে! তোর সঙ্গে সঙ্গে তোর মায়েরও দাঁত ভেঙে দিবো, দাঁড়া।’
বাবুনের ঠোঁট ফুলে উঠল এবার। মায়ের দাঁত ভেঙে ফেলার ঘটনায় সে রুষ্ট। রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
‘ আমি তোমাকে একশোবার কামড়ে দিব।’
ছেলের প্রতি প্রবল মায়া অনুভব করলেও তৎক্ষনাৎ জ্বলে উঠল নাহিদ। ধমক দিয়ে বলল,
‘ মামার বাড়ির আবদার! তোর কান ছিঁড়ে ফেলব না আমি?’
বাবুন এবার কেঁদে ফেলল। নাহিদ আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করল বাবুন তার কচি ঠোঁটদুটো চেপে ধরে কান্না রোধ করার চেষ্টা করছে। জল থৈথৈ চোখে চেয়ে সে বলল,
‘ তোমাকে আমি দুইশোবার কামড়ে দিব। তুমি সবসময় মাকে মারো।’
নাহিদ কিছু বলতে গিয়েও বাবুনের শেষ কথায় থমকে গেল। মারে! নাহিদ মারে? নাহিদের পক্ষে নিজের স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা সম্ভব? নাহিদও কী তবে তার বাবারই মতো? নাহিদ স্বগতোক্তির মতো করে শুধাল,
‘ মারি! আমি তোর মাকে মারি?’
বাবুন তখন ফুলে ফুলে কাঁদছে। একাধারে বলে চলেছে,
‘ আমি তোমাকে তিনশোবার কামড়ে দিব। এক লক্ষবার কামড়ে দিব।’
নাহিদ বেদনার্ত চোখে বাবুনের দিকে তাকিয়ে রইল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, বাচ্চাটা বাবুন না। নাহিদ নিজে। যাকে নাহিদের মতো করে তার বাবা কখনও বলেনি। কিন্তু নাহিদ বলতে চাইল,
‘ বাবুন! বাবা আমার। বিশ্বাস কর, তোর মাকে আমার থেকে বেশি কেউ ভালোবাসতে পারবে না।সেই ক্ষমতা বিধাতা আর কাউকে দেননি। কাউকে না।’
কিন্তু বলা হয়ে উঠল না। তার আগেই বাবুন আচমকা কুমির হয়ে কামড়ে দিতে এলো তাকে। নাহিদ আঁতকে উঠে নিজেকে বাঁচাতে চাইল। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে বিশাল পাহাড়চূড়া থেকে পা পিছলে গেল তার। নাহিদ চিৎকার করে উঠে বসতেই নিজেকে আবিষ্কার করল ঘরের মেঝেতে। সৌধ ভ্রু কুঁচকে তার মুখের উপর ঝুঁকে আছে। নাহিদকে উঠে বসতে দেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল। নাহিদ মেঝেতে কয়েক সেকেন্ড পা ছড়িয়ে বসে থেকে হাত বাড়িয়ে বালিশের পাশ থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা নিল। একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে নির্বিকার কণ্ঠে শুধাল,
‘ কখন এলি?’
সৌধ বিছানায় বসে তীক্ষ্ণ চোখে নাহিদের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
‘ যখন তুই বিছানায় শুয়ে হাপুসনয়নে কাঁদছিলি তখন। ডাকলাম শুনলি না। তাই একটা লাথি দিলাম। একটা লাথি দিতেই কান্নাকাটি স্টপ।’
নাহিদ অবাক চোখে তাকাল। অবিশ্বাস নিয়ে বলল,
‘ আমি কাঁদছিলাম? আমি? ছি!’
সৌধ উত্তরে কিছু বলল না। নাহিদ কিছুক্ষণ নীরবে সিগারেট ফুঁকে বলল,
‘ কাঁদছিল তো ওই বাচ্চাটা।’
‘ বাচ্চা! কোন বাচ্চা?’
কপাল কুঁচকাল সৌধ। নাহিদ কৌতুকী কণ্ঠে বলল,
‘ আরে, ওইযে তোর স্বপ্নে পাওয়া ভাতিজা, বাবুন। ব্যাটা আজকাল খুব জ্বালাচ্ছে। একটু শান্তিতে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলেই এসে হাজির। এই সকল স্বপ্নের অর্থ কী হতে পারে, বল তো?’
সৌধ মুখ গম্ভীর করে বলল,
‘ একটু ঘুমানোর প্রস্তুতি? তুই কী জানিস? তুই এখন চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আঠারো ঘন্টাই ঘুমিয়ে কাটাস?’
নাহিদ প্রত্যুত্তরে মৃদু হাসল। আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বলল,
‘ কাজকাম নাই, তাই ঘুমাই।’
সৌধ উত্তেজিত হয়ে বলল,
‘ কাজকাম নাই?’
নাহিদ উত্তর না দিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগল। সৌধ রাগে ক্ষোভে প্রায় চিৎকার করে বলল,
‘ খবরদার হাসবি না। কাজকাম নেই তোর, না? কতকিছু প্ল্যান ছিল আমাদের এই কয়েক মাসে। ভুলে গেছিস তুই? নিজেদের ক্রাইম জার্নালিস্টের টপে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন কোথায় গেল নাহিদ? অতো কষ্ট করে জোগাড় করা এভিডেন্স, এতো সম্ভাবনা সব টেবিলের ড্রয়ারে মূল্যহীন হয়ে পড়ে আছে। আদিব হোসেন আমাদের প্রতি আগ্রহী, দারুণ একটা অফার আমাদের দিতো সে বিষয়ে নিশ্চিত তো তুই ছিলি? তারপরও চার/পাঁচ মাস ধরে তার সঙ্গে মিটিং এড়িয়ে চলছিস। এমনিতেই অতগুলো ব্যাকলগ তারওপর এই সেমিস্টার গ্যাপ দিলি। ফ্রিলেন্সিং এ নিজেকে কতদূর নিয়ে গিয়েছিলি অথচ সব ছেড়ে বসে আছিস। চা খাওয়ার পয়সা এখন তোর পকেটে নাই। আমার থেকে টাকা নিয়ে খাচ্ছিস। তোর হাতের সিগারেটটাও আমার টাকায় কেনা।’
নাহিদ চকিতে তাকাল। হালকা বাদামি চোখদুটো ধ্বক করে জ্বলে উঠল মুহূর্তের জন্য,
‘ টাকার খোঁটা দিচ্ছিস!’
সৌধ দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
‘ না। টাকার খোঁটা দিচ্ছি না। শুধু জিজ্ঞেস করছি,
শখ করে কেন নিজের ক্যারিয়ারের বারোটা বাজাচ্ছিস? ওই বারো*তারি মেয়েটার জন্য?’
ক্ষোভ ঝরে পড়ল সৌধর কণ্ঠ থেকে। রাগ করে বলল,
‘ ওকে চায় তো তোর? আমি ওরে এনে দেব তোর কাছে। দরকার পড়লে তুলে আনব। শালীর…’
ভদ্র সমাজে প্রকাশের অযোগ্য কিছু গালি বেরিয়ে এলো সৌধর কণ্ঠ থেকে। উত্তেজিত হয়ে শুধাল,
‘ তাহলে এসব ভং ছেড়ে দিবি তো তুই?’
নাহিদ সৌধর দিকে তাকিয়ে ছিল। এর আগে ফাজলামো করলেও এইবার গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
‘ মিষ্টি কোনো বিষয় না সৌধ। মিষ্টি খুবই লক্ষ্মী একটা মেয়ে। ও যদি অন্য কারো সাথে খুশি থাকে তাহলে আমি তার জন্য খুশি। আমার সমস্যাটা আমি নিজে। আমি নিজেকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। কোনো কিছু করার তাড়না, আগ্রহ কিছু নেই আমার মধ্যে। কোনো লক্ষ্য নেই। স্বপ্ন নেই। প্রশ্ন নেই। উত্তর খুঁজার ইচ্ছে নেই। পৃথিবীটা হুট করে শূন্য হয়ে গিয়েছে আমার জন্য। মনে হচ্ছে, বিস্তৃত মহাকাশে একলা ভেসে বেড়াচ্ছি আমি। সমস্ত জীববৈচিত্র্য আমাকে রেখে ছুটে চলেছে ভবিতব্যের দিকে। অথচ আমার কোনো বিকার নেই। এই বিকার না থাকাটাও আমার জন্য কোনো সমস্যা মনে হচ্ছে না। অথচ সমস্যা মনে হওয়া উচিত ছিল।’
কথাটা বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল নাহিদ। আধপোড়া সিগারেটটা নিভিয়ে ফেলে আবার সৌধর দিকে তাকাল। বলল,
‘ মিষ্টিকে এই ধরনের টার্ম ইউজ করে গালিগালাজ করিস না সৌধ। সে একসময় আমার সঙ্গে সম্পর্কে ছিল। আই রেস্পেক্ট হার। এখন সম্পর্কে নেই, আই শ্যুড রেস্পেক্ট হার মোর। এন্ড সো ইউ শ্যুড।’
সৌধ প্রত্যুত্তরে মুখ গোমড়া করে বসে রইল। নাহিদের প্রস্তাব তার পছন্দ হয়নি। সেদিন পার্কে নিজ চোখে মিষ্টিকে ঈশানের সঙ্গে মাখামাখি করতে দেখেছে সে। বন্ধু কষ্ট পাবে বলেই না দেখার অভিনয় করে তাকিয়ে ছিল অন্যদিকে। ওই মেয়েকে পারলে খুন করবে সৌধ, তাকে আবার রেসপেক্ট? অসম্ভব! ভেতর ভেতর ফুৃঁসে উঠে সৌধ। এই ধরনের মেয়েদের সঙ্গে আরও খারাপ কিছু করা উচিত। ওর ভাগ্য ভালো ও নাহিদের মতো চমৎকার এক ছেলের সঙ্গে সম্পর্কে ছিল। কিছুক্ষণ মুখ গোমড়া করে বসে থেকে নিজেকে শান্ত করল সৌধ। হাতঘড়িতে সময় দেখে নাহিদকে তাড়া দিয়ে বলল,
‘ দুপুরও গড়াল প্রায়। নিচে চল, নাস্তা করে আসি।’
নাহিদ হাসল। বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে বসে বলল,
‘ না রে! ক্ষুধা নেই। তুই খেয়ে আয়।’
সৌধ চমকে তাকাল। বলল,
‘ ক্ষুধা নেই মানে কী! কাল রাতে বিরিয়ানি খেয়েছিস। এখন বাজে দুপুর দুটো।’
নাহিদ প্রত্যুত্তরে মৃদু হাসল,
‘ ঘুমিয়েই তো ছিলাম। ঘুমিয়ে থাকলে আর ক্ষুধা লাগে নাকি!’
সৌধ থমকে গেল। নাহিদের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
‘ বিলটা আমি দিবো বলেই কী তুই খাবি না নাহিদ? কথাটা আমি কিন্তু সেভাবে বলিনি। তুই আমাকে চিনিস না? তোর আমার মধ্যে কী তোর আমার বলে কিছু আছে?’
নাহিদ হাসল। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
‘ দূর ব্যাটা! ওসব আমি মনে রাখি নাকি? আসলেই ক্ষুধা নেই। ভাবছি বাড়ি চলে যাব৷ তুই গিয়ে ঝটপট খেয়ে আয়। আমার সঙ্গে মহাখালী পর্যন্ত যাবি।’
বন্ধুর মনোভাব বুঝতে পেরেই বুকের ভেতর তীব্র এক ব্যথা অনুভব করল নাহিদ। নাহিদের বলা ‘ওসব আমি মনে রাখি নাকি’ কথাটা যে কত বড় মিথ্যা তা সৌধকে ব্যাখ্যা করে বুঝানোর প্রয়োজন হলো না। নাহিদ সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে। দেশের বাড়িতে এখনও তাদের প্রতাপ প্রতিপত্তি দেখবার মতো। বংশানুক্রমে ধনবান হওয়ার কারণেই বোধহয় নাহিদের চেহেরায় একটা রাজকীয় ছাপ আছে। তার চালচলনও অনেকটা সেরকমই। ব্রান্ডের পোশাক, দামী খাবার, বিলাসবহুল জীবন। নিজের উপার্জনে নিজেকে সবসময় সে রেখেছে দুধে-ভাতে। নিউমার্কেট অথবা ফুটপাত থেকে কখনও তাকে কিছু কিনতে দেখেনি সৌধ। আত্মসম্মান তার নাকের ডগায়। এই তীব্র আত্মসম্মান সচেতন নাহিদ হাসতে হাসতে অনেক কিছুই ছেড়ে দিতে পারে। কিন্তু একবার কোনো কথা মনে নিয়ে নিলে সেই ভাবনাকে বদলানো অসম্ভব। সৌধর কেন যেন মনে হলো নাহিদের সঙ্গে তার সম্পর্কটা আর টিকবে না। তার বন্ধু নাহিদ হারিয়ে যাবে। হাসতে হাসতেই সৌধকে সে এড়িয়ে যাবে, ভুলে যাবে। এতো বছরের বন্ধুত্ব ভুলে যাওয়া এতো সহজ? সৌধ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। সবাই বলে প্রেমের ব্যথায় নাকি খুব কষ্ট। তারা কী জানে? প্রিয় বন্ধুকে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা অবর্ণনীয়?
নাহিদ ব্যাগ গোছাতে গোছাতে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা সৌধর দিকে তাকাল। সহজ গলায় বলল,
‘ কী রে? এখনও গেলি না? খেয়ে আসতে বললাম যে? বেরুব আমি।’
শেষ বাক্যে এসে একটু অধৈর্য দেখাল নাহিদকে। সৌধ বেরিয়ে গেলে মাকে টেলিফোন করতে হবে। এই মুহূর্তে বাড়ি ফেরার মতো পয়সা নাহিদের কাছে নেই। মা টাকা পাঠালে তবে নাহিদের ফেরা হবে। মা টাকা ঠিকই পাঠাবে নাহিদকে কিন্তু বাড়িতে এর জন্য আবার একটা ঝামেলা হবে। মা নাহিদকে টাকা পাঠিয়েছে শুনলেই! ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল নাহিদ। একটা সিগারেট ধরানোর চিন্তায় টাওজারের পকেটে হাত দিয়ে প্যাকেটটা বের করে কী মনে করে আবার থেমে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্যাকেটটাকে অবহেলায় ফেলে রাখল বিছানার ওপর৷ চোখের তারায় তখন তার আশ্চর্য এক তাচ্ছিল্য। কে জানে, তার এত তাচ্ছিল্য, এত অবজ্ঞা ঠিক কার প্রতি? নিজের প্রতি? জীবনের প্রতি নাকি পৃথিবীর প্রতি? অথবা...
·
·
·
চলবে……………………………………………………