আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ৪২ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

আজ ওদের মন ভালো নেই
          আকাশে আজ ঝকঝকে রোদ উঠেছে। রাস্তার ধারে পুরোনো বইয়ের সারি। বাতাসে ভাসছে বই বই সুবাস। শাওন সমস্ত বইগুলোকে পাশ কাটিয়ে পরিচিত এক দোকানের সামনে দাঁড়ায়। দোকানের ছেলেটা শাওনকে দেখেই এক গাল হেসে বলে,

‘ কেমন আছেন ভাইয়া? অনেকদিন পর এলেন।’ 

শাওন হাসে। তার হাতে কিছু পুরোনো বইয়ের সংগ্রহ। বইগুলো ছেলেটির দিকে এগিয়ে দিয়ে শুধায়, 

‘ আপু আসে না?’ 

ছেলেটা বইগুলো হাতে নিয়ে বলে,

‘ আপু প্রায়ই আসে। কিন্তু আপনি এতোদিন কোথায় ছিলেন? অনেকদিন এদিকে আসেন না।’ 

‘ শহরের বাইরে ছিলাম। আপু এলে বইগুলো সামনে রেখো।’ 

ছেলেটা বইগুলো দেখতে দেখতে বিস্মিত চোখে তাকায়,

‘ অনেক পুরোনো বই। কোথা থেকে যে সংগ্রহ করেন এগুলো!’  

শাওন স্মিত হাসে, 

‘ এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে অনেক বইয়ের মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গিয়েছে। ওদের থেকেই খোঁজ পাই।’ 

ছেলেটার বিস্ময় বাড়তে থাকে,

‘ একদম প্রথম সংস্করণ! খুব সহজে ছাড়ার কথা না। কত করে নিলেন?’ 

সে কথার জবাব দেয় না শাওন৷ ছেলেটা হতাশ কণ্ঠে বলে,

‘ এভাবে চুপিচুপি বই সংগ্রহ করে দিয়ে কী লাভ হয় ভাইয়া? এতোদিন ধরে এতো পরিশ্রম করছেন অথচ আপু জানে না। না জানলে ইম্প্রেস হবে কী করে?’ 

তার হতাশায় হেসে ফেলে শাওন। হাসিমুখে বলে, 

‘ দূর পাগলা! ইমপ্রেস করার জন্য করছি নাকি!’ 

‘ তাহলে কেন করছেন?’ 

থমকায় শাওন। এক মুহূর্ত ভেবে হাসার চেষ্টা করে বলে,

‘ জানি না কেন করি। হয়তো বই পেয়ে তোমার আপু খুশি হয় তাই করি।’ 

ছেলেটা অসন্তুষ্ট হয়,

‘ দূর! আপুর এমন খুশিতে আপনার কী লাভ?’ 

হাসে শাওন,

‘ দুনিয়ার সব কাজ কী আমরা লাভের জন্য করি শুদ্ধ? আর যদি লাভের জন্যই করে থাকি তাহলে বোধহয় আমারও লাভ আছে। তাকে খুশি হতে দেখতে আমার ভালো লাগে। এটাও কী কম লাভ?’ 

শুদ্ধ উত্তর না দিয়ে ব্যথিত চোখে তাকিয়ে থাকে। শাওন বলে, 

‘ শুনো শুদ্ধ, তোমার আপু যেন কোনোভাবেই আমার কথা না জানে। যদি জানে এসব আমার কাজ! তাহলে আমার খবর খারাপ করে দিবে। খবরদার! বলে দিও না, শুদ্ধ।’ 

শুদ্ধ মাথা দোলায়। মুখ বেজার করে বলে,

‘ আপনার কাজ কারবার বুঝা কঠিন ভাইয়া।’ 

তারপর আন্তরিক কণ্ঠে চায়ের নিমন্ত্রণ জানায়,

‘ অনেকদিন পর এলেন, এক কাপ চা খান ভাইয়া। চা আনানোর ব্যবস্থা করি?’ 

শাওন প্রত্যুত্তর করার আগেই একটা রিকশা এসে থামে দোকানের সামনে। রিকশা থেকে নেমে হাওয়ার বেগে দোকানে ঢুকে তাড়াহুড়ো কণ্ঠে শুধায় মৌনি,

‘ এই শুদ্ধ? সেদিন যে বইয়ের কথা বলেছিলাম, সেটা সংগ্রহ করতে পেরেছ?’ 

শুদ্ধ হেসে বলে, 

‘ না আপু। ওই বই তো খুঁজে পাইনি।’ 

মৌনি হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে পাশে তাকাতেই অবাক হয়। শাওনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিস্মিত কণ্ঠে বলে,

‘ আরে, শাওন! তুমি এখানে?’ 

শাওন আর শুদ্ধর এক পলকের জন্য দৃষ্টি বিনিময় হয়। শাওন হেসে বলে,

‘ এই একটু দরকারে এসেছিলাম এদিকে।’ 

‘ ওহ!’ 

আর কথা বাড়ায় না মৌনি। শুদ্ধর হাতে বই খেয়াল করে বলে, 

‘ ওগুলো কী বই? দেখি। নতুন এলো?’ 

শুদ্ধ বইগুলো এগিয়ে দিয়ে মাথা নাড়ে। বই দেখতে দেখতে আগ্রহে চকচক করে উঠে মৌনির চোখ। খুশিতে ঝুমঝুম করে বলে,

‘ কী দারুণ! একদম প্রথম সংস্করণ। লেখকের অটোগ্রাফ আছে দেখো! এমন দারুণ বইগুলো কোন গাধা বিক্রি করে বলো তো?’ 

শুদ্ধ উত্তরে অল্প হাসে। মৌনি শুধায়, 

‘ কত রাখবে?’ 

‘ সব মিলিয়ে বারো'শ টাকা আপু।’ 

মৌনি চোখ বড় বড় করে তাকায়,

‘ তিনটা বই বারো'শ! নতুন এডিশনও তো এর থেকে কমে পাওয়া যাবে।’ 

‘ নতুন এডিশনে তো লেখকের অটোগ্রাফ নেই।’ 

‘ রেগুলার কাস্টমার হলো ঘরের লক্ষ্মী। যাও পাঁচশো দিব।’ 

‘ পাঁচশো! খুব কম হয়ে যায় আপু। আপনার কাছে এমনিতেই অনেক কম চেয়েছি।’

‘ একদম চালাকি করবে না শুদ্ধ। তুমি যে এর থেকে পাঁচগুণ কম দিয়ে কিনেছ তা কিন্তু আমি খুব ভালো করে জানি। তোমার এই নাটকের জন্য দুইশো টাকা কাট। তিনশো দিব।’ 

শাওন আড়চোখে মৌনির আনন্দে তৃপ্ত মুখখানা দেখছিল। এবার মুখ ফিরিয়ে শুদ্ধের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় রাজি হয়ে যেতে বলে। শুদ্ধকে শাওনের দিকে তাকাতে দেখে মৌনিও চোখ ফিরিয়ে তাকায়। কিছু সমস্যা আছে বুঝতে পেরে শুধায়,

‘ তুমিও কী এই বই নিবে বলে ঠিক করেছিলে নাকি? এমন হলে তুমি নিতে পারো।’ 

শাওন হেসে বলে,

‘ আরে না! আমি কী তোমার মতো অতো বইটই পড়ি নাকি? বইটা ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছিল তাই দাম করছিলাম। তোমার কাছেই ওটা বেশি যত্নে থাকবে। তুমি বরং বইটা পড়ে আমাকে কাহিনি সংক্ষেপটা বলো?’ 

মৌনি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে। দু'জনেই কোনো এক অদৃশ্য উপায়ে বুঝে যায়, কোথাও একটা সুর কেটে গিয়েছে। সুরের মূর্ছনা হারিয়ে যাওয়ার সুযোগে তাদের সম্পর্কে কোথা থেকে ঢুকে গিয়েছে এক আঁজল লৌকিকতা। দোকানে ঢুকে শাওনের দর্শনে মৌনির চোখে ফুটে উঠেনি আগের সেই উচ্ছ্বাস। আবদার করে ডাকেনি, ‘শাওওওন! শাওন! শাওন!’। শাওন তার আবদারের নাম। মৌনি আবদার করতে ভুলে গিয়েছে। স্বল্প পরিচিতের মতো বলতে শিখে গিয়েছে, ‘এমন হলে তুমি নিতে পারো।’ অথচ সপ্তাহখানেক আগে হলেও মৌনির প্রতিক্রিয়া হতো অন্যরকম। রঙিন প্রজাপতির মতো শাওনের চোখের সামনে উড়তে উড়তে বলতো, ‘ এই তুমি বই নিয়ে কী করবে? পড়ো তুমি বই? সেই তো শেষমেষ আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবে, মন তুমি পড়ে আমাকে সারাংশটা জানিয়ে তো!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাওন। সম্পর্কের সুতোগুলো ধীরে ধীরে কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। শাওন নিজের হাতেই এলোমেলো করে ফেলছে সব। কী হয়েছে তার বুঝে উঠতে পারছে না। সৌমির বিষয়টা না জানানো তার ভুল ছিল। মনের মধ্যে বোধহয় কোথাও অন্যায়ও ছিল। কিন্তু সব ঠিক করার পরিবর্তে সে কী করল? আরও ঘোলাটে করে ফেলল সব। মানুষ মাত্রই প্রিয় মানুষের চোখে নিজের জন্য অস্থিরতা দেখতে ভালোবাসে। এই এক সপ্তাহ মৌনির ভেতরে নিজের জন্য অদ্ভুত অস্থিরতা দেখেছে সে। মৌনি বারবার শাওনের কাছে ছুটে এসে নানান প্রশ্ন করেছে। শাওন জবাব দিতে দিতেও বুঝেছে মৌনির অস্থিরতা বাড়ছে। কোনো উত্তরই তার মন মতো হচ্ছে না। সে আরও শুনতে চায়, অন্যরকম কিছু শুনতে চায়। কী শুনতে চায় মৌনি? তার প্রতি শাওনের ভালোবাসার কথা? মৌনি কী সৌমির উপস্থিতিতে অনুভব করতে পারছে তার ভালোবাসার শূন্যতা? মৌনিকে সে ভালোবাসে। প্রচন্ড ভালোবাসে। তারপরও মৌনির এই উপলব্ধি কী কোথাও না কোথাও একটু প্রতিশোধপরায়ণ করে তুলেছে তাকে? নয়তো কেন সে সৌমি আর তার ছবি পাঠাল মৌনিকে? এক মুহূর্তের জন্য ওর চোখে নিজের জন্য প্রগাঢ় বেদনা দেখার লোভ কী শাওনের হয়নি? সেই লোভ শাওনকে ঠিক কোথায় নিয়ে যাচ্ছে শাওন জানে না। কেবল জানে আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে সব। অনেকগুলো প্রশ্ন জমে যাচ্ছে। এই সকল প্রশ্নের উত্তর তো তার নিজেরও অজানা। মৌনি বইয়ের দাম মিটিয়ে শাওনের দিকে তাকায়। বইগুলো ব্যাগে পুরে শুধায়,

‘ তুমি নীলক্ষেত কী দরকারে এসেছ?’ 

‘ সৌমির জন্মদিন সামনে। ওর জন্য কোনো সারপ্রাইজ প্ল্যান করার চিন্তা করছিলাম। কী করা যায় বলো তো?’ 

মৌনির হাত থামে না। ধীরেসুস্থে বইগুলো ব্যাগে পুরে চোখ তুলে শাওনের দিকে তাকায়। শাওন সেই চোখে নতুন কিছু খুঁজে? নতুন কিছুটা কী? নিজের জন্য বিষাদ? সেই বিষাদ খুঁজতে গিয়ে শাওন বুঝে না ঠিক কোথায়, কত গভীর আঘাত করে ফেলছে সে। মৌনি শীতল কণ্ঠে বলে,

‘ এইসব ব্যাপারে তো আমার তেমন কোনো ধারণা নেই শাওন। আমি কাউকে কখনও সারপ্রাইজ দেইনি।’ 

ওরা দু’জন দোকান থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তার পাশে দাঁড়ায়। শাওন বলে,

‘ তুমি ক্রিয়েটিভ মানুষ। তুমি কাউকে সারপ্রাইজ না দিলেও তুমি চেষ্টা করলেই ইউনিক কোনো আইডিয়া বের করে ফেলতে পারবে।’ 

মৌনি শাওনের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে থাকে। কঠিন কণ্ঠে বলে,

‘ আমার মাথায় এই মুহূর্তে কোনো ইউনিক আইডিয়া নেই। তাছাড়া হাতে সময়ও খুব কম। তুমি তো জানোই সব নিয়ে কত ব্যস্ত থাকি আমি। অন্য কিছু নিয়ে ভাবব এই সময়টুকু নেই। তুমি নিজেই বরং কিছু চিন্তা করে বের করো। প্রিয় মানুষদের জন্য এইটুকু এফোর্ড দিতে হয়।’ 

শেষ কথাটা বলে ম্লান হাসে মৌনি। ঘড়িতে একবার চোখ বুলিয়ে বলে,

‘ ইশ! দেরি হয়ে গেল। তোমার সঙ্গে পরে কথা হবে শাওন। এখন যেতে হচ্ছে। আর সৌমিকে অবশ্যই অবশ্যই আমার পক্ষ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাবে, কেমন?’ 

শাওন উত্তরে কিছু বলে না। এই প্রথম তারা দুইজন একেবারে উল্টো দুটো পথে হাঁটে। পথ চলতে চলতে শাওনের কানে ভেসে আসে খুব মিহি এক কণ্ঠস্বর। কণ্ঠটা সে কী বিষাদ নিয়ে গাইছে, 

‘ সখী, ভাবনা কাহারে বলে? 
সখী, যাতনা কাহারে বলে? 
তোমরা যে বলো দিবস-রজনী 
‘ভালোবাসা’ ‘ভালোবাসা’ 
সখী, ভালোবাসা কারে কয়! 
সে কী কেবলই যাতনাময়?’ 

শুনতে শুনতে শাওনের পা ভার হয়ে আসে। বুকের ভেতর হু হু করে উঠে। মন একবার বলে আবার ফিরে যায়। কিন্তু কোথায় ফিরবে? একবার এগিয়ে গেলে কী আর ফিরে যাওয়া যায়? 

—————

গত দুইদিন বৃষ্টি হয়ে আজ প্রকৃতিতে বেশ গ্রীষ্ম গ্রীষ্ম আবহ। অভিমানিনী কিশোরী দু'দিন নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে তৃতীয় দিবসে আচমকা রণচণ্ডী হয়ে গেলে যেমন উত্তপ্ত হয়ে থাকে পরিবেশ। প্রকৃতির রূপও আজ সেরকম। ভ্যাপসা গরমে টিকে থাকা ভার। 

নাহিদ সৌধ এই গরমে ত্যক্ত হয়েই বসে আছে কাওরান বাজারের একটা চায়ের দোকানে। একটু আগে আদিব হোসেনের সঙ্গে দেখা করে নিজেদের আইডিয়ার খসড়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে ওরা। আদিব হোসেন আইডিয়া দেখেশুনে গম্ভীর হয়ে থাকলেও তার চোখের বিস্ময় পড়তে ভুল হয়নি নাহিদের। তিনি খুব জলদি এই ম্যাগাজিনের জন্য আলাদা একটা অফিস ঘর আর কিছু প্রয়োজনীয় স্টাফ নিয়োগ দিবে বলে জানিয়েছেন। নাহিদের প্রতি আদিব হোসেনের আস্থাটা যে তরতর করে বাড়ছে তা টের পাচ্ছে নাহিদ। আদিব হোসেনের আস্থা নিয়ে ভয় নেই নাহিদের। তার আসল ভয়টা হলো নিজেকে নিয়ে। নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস তার প্রগাঢ়। কিন্তু বুকের এক কোণায় একটা দুরুদুরু ভয়ও কী খেলা করছে না সেই সঙ্গে? নিজেকে হারিয়ে ফেলার একটা ভয় তো কবে থেকেই কাবু করে রেখেছে তাকে। যদি একদিন হুট করে মনে হয়, কেন এসব করছি? কার জন্য করছি? এসবে কী লাভ? যদি হঠাৎ আবার সবকিছু মিথ্যে মনে হয়? নিজের প্রতি নিজের এই ভয়কে খুব সূক্ষ্মভাবে কাবু করে রেখেছে নাহিদ। বাইরে থেকে কারোর বুঝার উপায় নেই। কিন্তু সেই ঘুমন্ত সত্তা যদি সকল শৃঙ্খল ভেঙে উঠে দাঁড়াতে চায়? 

‘ ওই ব্যাটা! আবার কী ভাবছিস বল তো? হঠাৎ হঠাৎ মুনিঋষির মতো এমন ধ্যানমগ্ন হয়ে যাস কেন ভাই?’ 

নাহিদ সচেতন চোখে তাকায়। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে,

‘ কাজের কথা ভাবছিলাম।’ 

কাজের কথা! সৌধ শান্ত চোখে তাকিয়ে থাকে। নাহিদের মিথ্যাটা ধরতে পেরেও পাল্টা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় না। নাহিদ বন্ধুকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে দুষ্ট হেসে বলে,

‘ মুনিঋষি হতে পারলেও খারাপ হতো না বল? আমার ধ্যানভাঙাতে পৃথিবীতে নেমে আসতো ঊর্বশী, মেনকা, রম্ভা, তিলোত্তমা। এই সুযোগে সিঙ্গেল লাইফ তো ঘুচতো ভাই! প্রেম করার প্যারা থাকতো না। কেবল ইঞ্জয়!’ 

কথা শেষে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে নাহিদ। সৌধ হাসে। একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাড়া দিয়ে বলে,

‘ আজকে ডিপার্টমেন্টে প্রোগ্রাম আছে। চল একবার ঘুরে আসি৷ ফাও চাঁদা দিলাম।’ 

নাহিদ আনন্দের সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। একঘেঁয়ে ক্লাস, পড়াশোনা তার ভালো না লাগলেও ডিপার্টমেন্টের সকল প্রোগ্রামে তার উপস্থিতি অনিবার্য। ভালো ক্যামেরা আর ছবি তোলার হাত চমৎকার বলে প্রোগ্রামগুলোতে তার খাতিরও কম না। বান্ধবীরা প্রোগ্রামের আগের দিন থেকে ন্যাকা স্বরে চব্বিশ বার মনে করিয়ে দেয়, ‘নাহিইইইদ তুই প্রোগ্রামে না এলে কিন্তু…!’ নাহিদ রূপবতী বান্ধবীদের হতাশ করে না। সকল প্রোগ্রামেই সে উপস্থিত হয়। সে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় মহল। ঠাট্টা, মশকরা, দুষ্টুমি, লাফালাফি করে একটা উৎসব উৎসব আমেজ তৈরি করে ফেলে চারপাশে। নাহিদ এখন ঠিক আগের মতো না থাকলেও। নিজের মধ্যে একটা ছন্দপতন টের পেলেও পাত্তা দেয় না সেই অসুখ। বাইক স্টার্ট দিতে দিতে মৃদু শিষ বাজায়, 

‘ বালিকা তোমার প্রেমের পদ্ম 
দিওনা এমন জনকে 
যে ফুলে ফুলে উড়ে মধু পান করে 
অবশেষে ভাঙে মনকে। 
বালিকা —’ 

ক্যাম্পাসে পৌঁছে বাইকটা পার্ক করে ডিপার্টমেন্টের দিকে এগোনোর আগে একটা সিগারেট ধরায় নাহিদ। সৌধ ততক্ষণে এগিয়ে গিয়েছে। বাইকের চাবিটা আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে সামনের দিকে এগুতেই ডিপার্টমেন্টের নিচে বান্ধবীদের গ্রুপের সামনে পড়তে হয় তাকে। সকলেই শাড়ি-টাড়ি পরে একাকার। ছেলেরাও পাঞ্জাবি পরে ফিটফাট। কেবল নাহিদ আর সৌধর গায়ে আটপৌরে শার্ট। নাহিদ মেয়েদের দিকে এক নজর তাকিয়ে সেদিকে এগিয়ে যেতেই বান্ধবীদের দৃষ্টি পড়ে তার ওপর। মুহূর্তেই একটা হৈ-হৈ রৈ রৈ রব পড়ে যায়। গানের মেয়ে দীপ্তি উচ্চস্বরে গান ধরে, 

‘ রং চটা জিন্সের প্যান্ট পরা,
জলন্ত সিগারেট ঠোঁটে ধরা,
কালো শার্ট গায়ে তার বুক খোলা,
সানগ্লাস কপালে আছে তোলা, 
রাখ না কেন ঢেকে ঐ দুটি চোখ?’ 

বাকিরা এক সঙ্গে চেঁচায়, 

‘হেইইই যুবক!’ 

বান্ধবীদের এতো গানের বাহারে হেসে ফেলে নাহিদ। সিগারেটটা ফেলে দিয়ে ঋজু হয়ে দাঁড়ায়। সানগ্লাসের আড়াল থেকে সবাইকে একে একে দেখে বলে, 

‘ এই তোরা এতো সেজেছিস কেন? কী বিশ্রী লাগছে! আমি তো মনে হচ্ছে তোদের সবার প্রেমে পড়ে যাব।’ 

নাহিদের কথায় রূপবতী রমণীগণ কিছুক্ষণের জন্য হাসির ফোয়ারায় ভেসে যায়। তাদের খিলখিল হাসিতে আকাশ-পাতালও যেন নেচে উঠে এক মুহূর্তের জন্য। তারপর শুরু হয় তাদের বায়না, 

‘ নাহিদ ছবি তুলে দে। এভাবে, ওভাবে, কতভাবে!’ 

ছবি তোলায় তাদের বাহারি চাহিদার মধ্যে নাহিদ হাত তোলে থামিয়ে দেয় তাদের। মুখ গম্ভীর করে ঘোষণা দেয়,

‘ শুনো হে রমণীগণ, ফ্রীতে কিছু হবে না। প্রতিটি ছবির জন্য পঞ্চাশ টাকা ফিক্সড। তবে তোরা চাইলে, প্রতি ছবির জন্য আমাকে একটা করে চুমুও দিতে পারিস। আই ওন্ড মাইন্ড।’ 

চুমুর বদলে রমণীদের কোমল হাতে ডজনখানেক মুষ্ট্যাঘাত পায় নাহিদ। কিছুক্ষণ ব্যথা পাওয়ার নিঁখুত অভিনয় করে বলে,

‘ ছি! রাক্ষসী রমণী সব! খামচে মাংস ছিঁড়ে ফেলেছিস। তোদের চুমু আমার লাগবে না যা। ফ্রীতেই তোলে দিবো।’ 

রমণীমহল এবার কিছুটা সন্তুষ্ট হয়। নাহিদের এসকল দুষ্টুমিতে তারা অভ্যস্ত। দীপ্তি শুধায়, 

‘ এই নাহিদ? তোর নাকি ব্রেকাপ হয়ে গিয়েছে শুনলাম? সত্যিই? কেন হলো?’ 

নাহিদ দিপ্তীর দিকে তাকায়। ডিপার্টমেন্টের এমন কোনো কন্যা নেই যার কাছে এই কয়েকটা বছরে মিষ্টির প্রসঙ্গ তুলেনি সে। ডিপার্টমেন্টের কোনো স্যার তার ব্রেকাপ বৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করে বসলেও অবাক হবে না নাহিদ। সে চোখে-মুখে একটা ব্যথাভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বলে,

‘ মিষ্টি বুঝে গিয়েছিল যে আমি তোর প্রেমে পড়েছি।’ 

দিপ্তী গরম চোখে তাকায়। রাগ করে বলে,

‘ তুই সবটা সময় এমন করিস! বাল! তোর সঙ্গে কোনো কথা বলেই আরাম নেই।’ 

নাহিদ বেদনায় গলে গিয়ে বলে,

‘ বিশ্বাস না করতে চাইলে করবি না। গালি দিচ্ছিস কেন? ভালোবাসার মানুষের মুখে গালি শোনা কত ব্যথার জানিস?’ 

দিপ্তী এবার অতিষ্ঠ হয়ে তাকাল। পায়ের একটা জুতো খুলে বলল, 

‘ তুই শুধু দাঁড়া।’

নাহিদ রূপবতীদের সকল কথা শুনলেও এই কথা শুনল না। দ্রুত পায়ে জায়গাটা থেকে সরে গেল। বাপরে বাপ! মেয়ে তো নয় যেন কুস্তিগির। কথায় কথায় খালি মারামারি! 

কিছুক্ষণ সকলের সঙ্গে খুব হৈচৈ করল নাহিদ। গান-নাচ-নাটিকা এতোকিছুর ভীড়ে সৌধ একবার তাকে মৃদু খোঁচা দিয়ে ফিসফিস করে জানাল,

‘ দেখ! দেখ! মাধুরী এসেছে। বিয়ের পর আরও সুন্দর হয়েছে মনে হচ্ছে।’ 

নাহিদ চোখ ফিরিয়ে তাকায়। নাহিদকে তার দিকে তাকাতে দেখেই তার কাছে এগিয়ে আসে মাধুরী। বড়লোক বাড়ির বধূর পরিচয় যেন তার সারা অঙ্গে জড়ানো। রূপ, লাবণ্য, আভিজাত্য! নাহিদের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে সে শুধায়,

‘ এই, সবার ছবি তুলে দিচ্ছিস। আমার ছবি তুলে দিবি কখন?’ 

নাহিদ ব্যথিত চোখে তাকিয়ে বলে,

‘ তুই আর ছবি তুলে কী করবি? বিয়েশাদি করে হুলস্থুল কান্ড ঘটিয়ে বসে আছিস।’ 

মাধুরী হেসে ফেলে,

‘ ইশ! বিয়ে করা বুঝি খুব অন্যায় হয়েছে? বিয়ে করলে ছবি তোলা যায় না?’ 

‘ যায়। কিন্তু আমি বিবাহিতদের ছবি তুলি না।’ 

মাধুরী গভীর চোখে নাহিদের দিকে তাকিয়ে থেকে শুধায়,

‘ কেমন আছিস?’ 

নাহিদ দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে হতাশ কণ্ঠে বলে, 

‘ কেমন আর থাকব? তুই এভাবে আমাকে রেখে বিয়ে করে ফেলতে পারলি মাধু? এখনও ভাবলে দুঃখে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে। তোকে আমি কত ভালোবাসতাম!’ 

মাধুরী হাসে। নাহিদ যে সকলকেই ভালোবাসার কথা বলে, সকলের সঙ্গেই একইরকম দুষ্টুমি করে সে কথা জানে মাধুরী। তারপরও গভীর চোখে তাকিয়ে থাকে নাহিদের দিকে। বলে,

‘ তুই অনেক বদলে গিয়েছিস। আগের সেই বালক বালক ব্যাপারটা নেই। কেমন ম্যানলি দেখাচ্ছে।’ 

প্রত্যুত্তরে মাদক হাসে নাহিদ। ঠোঁটে দুষ্টুমি ঝুলিয়ে উত্তর দেয়,

‘ সবই তোর বিরহে বইন। বিয়েটা করে কী যে বিপদে ফেললি আমাকে!’ 

মাধুরী হাসে। প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার কিছু আগে নাহিদকে ডেকে ছবি তুলে দেওয়ার আবদার করে। নাহিদ এবার আর দুষ্টুমি করে না। স্বাভাবিক স্বরেই বলে,

‘ আয়, দাঁড়া তাহলে।’ 

মাধুরী জানায়,

‘ এখানে না।’ 

‘ এখানে না! তাহলে কোথায়?’ 

অবাক হয় নাহিদ। মাধুরী বলে, 

‘ ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের দিকে যাই চল। ওদের ডিপার্টমেন্টের সামনের খোলা ছাদটা সুন্দর। নিরিবিলিও আছে।’ 

নাহিদের আপত্তি নেই। সে মাথা দুলিয়ে বলে,

‘ বেশ তো! চল।’ 

আজ রোদের তাপ বেশি। খোলা ছাদে কিছুক্ষণ ছবি তুলে ছবিগুলো আরাম করে দেখতে একটা ফাঁকা ক্লাসরুমে গিয়ে দাঁড়ায় ওরা। নাহিদ ফ্যানের সুইচটা টিপে দিয়ে একমনে ছবি দেখায় মনোযোগ দেয়। মাধুরীও একটা ডেস্কে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ক্যামেরার ওপর ঝুঁকে আসে। নাহিদের এতো কাছে দাঁড়িয়ে যেন ধীরে ধীরে চিত্ত বিলীন হয়ে যায় তার। ছবির থেকে বেশি সে দেখে নাহিদকে। কাটা কাটা চেহারার দীর্ঘদেহী নাহিদ। মাথার শুষ্ক চুল, ঘন ভ্রুবিলাস, চোয়ালের আবরণ হয়ে থাকা রুক্ষ চাপদাড়ি, কালচে ঠোঁট সর্বত্র যেন ছড়িয়ে আছে নিষিদ্ধ এক আদিম আহ্বান। বুকের কাছে শার্টের দুটো বোতাম বেপরোয়াভাবে খোলা। গা থেকে ভেসে আসছে পাগল করা সুবাস৷ মাধুরী নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। উন্মত্ত যামিনীর মতো আচমকা হাত বাড়িয়ে শক্ত করে টেনে ধরে নাহিদের শার্টের কলার। এই বিষণ্ণ, নিঝুম দুপুরে আকস্মিক এই আক্রমণে তাল সামলাতে পারে না নাহিদ। কিছুটা আশ্চর্য হয়েই সে ঝুঁকে আসে মাধুরীর খুব কাছে। পেছনের ডেস্কে এক হাত রেখে অবাক বিস্ময় নিয়ে সে তাকায় মাধুরীর মুখের দিকে। মাধুরী প্রত্যুত্তরে গভীর দৃষ্টি উপহার দেয়। সুকোমল বাহু দুটি দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে নাহিদের গলা। সুসজ্জিত দেহে প্রগাঢ় আবেদন নিয়ে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ধরা দেয় নাহিদের কাছে। মাধুরির ওই আবেদনময়ী চোখে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বিস্ময় ভুলে যায় নাহিদ। প্রথমবারের মতো অন্যরকম নজরে তাকায় মাধুরীর দিকে। মাধুরী লাস্যময়ী তরুণী। প্রতিমার মতো অপরূপ তার দৈহিক গড়ন। যৌবনের সমস্ত ফুল সর্বক্ষণ একসঙ্গে ফুুটে থাকে তার সর্বাঙ্গে। নাহিদ খুব কাছ থেকে তার উঁচুনিচু রমণীয় রহস্য দেখে মুগ্ধ হয়। নিজের অজান্তেই একটা চাপা কামনা ফুটে উঠে তার চোখে। শরীরের ভেতরের ঘুমন্ত চাহিদারাও বোধকরি আড়মোড়া ভাঙে ধীরে ধীরে। উষ্ণ নিঃশ্বাসে নাহিদের বুকের কাছটা পুড়িয়ে দিয়ে, আপন সুগন্ধিতে তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে আরও কাছে আসার আহ্বান জানায় মাধুরি। তার অস্থির, অধৈর্য কামনাকে শান্ত করতে মোহাচ্ছন্নের মতো এগিয়ে যায় নাহিদ। তাকায় তার শৈল্পিক ওষ্ঠদ্বয়ের দিকে। লাল রঙে সজ্জিত রসালো ঠোঁটগুলো নাহিদের কাছে মনে হয় কোনো মরণ ফাঁদ। এতো নিঁখুত, এতো সুন্দর ঠোঁট আগে কখনও দেখেছিল নাহিদ? অধৈর্য মাধুরি ততক্ষণে নাহিদকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে এই অপেক্ষা অবসানের চেষ্টা করছে। নাহিদ তার অপেক্ষা ফুরায়। নিজের সিগারেটে পোড়া ওষ্ঠদুটো এগিয়ে নিয়ে ওই পাঁপড়ির ন্যায় কোমল ঠোঁটজোড়া পিষ্ট করার উদযোগ করতেই আচমকা মনের দুয়ারে চোখ মেলে তাকায় দুটো চোখ। ছলছলে অভিমানী চোখে সে তাকিয়ে আছে নাহিদের দিকে। সেই অভিমানে বিজলিবাতির মতো চমকে চমকে উঠছে ক্রোধ। মাধুরির ঠোঁট ছুঁইছুঁই হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেও ওই অভিমান ভরা চোখদুটো দেখে হেসে ফেলে নাহিদ। শরীরের সমস্ত কামনা মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। খুব স্বাভাবিকভাবে মাধুরির সামনে থেকে সরে গিয়ে একটা সচেতন দূরত্বে গিয়ে দাঁড়ায়। মাধুরির বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে তার মাথায় একটা চাটি মেরে সহজ কণ্ঠে বলে,

‘ মাথা পাগল হয়ে গিয়েছে। জামাইয়ের কাছে যা, ছেমরি।’ 

মাধুরি রূপবতী শ্রেষ্ঠা। তার এতোটুকু জীবনে এতো কাছে এসে তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য হয়নি কোনো পুরুষের। এতোটা ধৈর্য কোনো পুরুষের মধ্যে থাকতে পারে এমন বিশ্বাস হতো না মাধুরির। আজ বিশ্বাস হলো। নাহিদের অকস্মাৎ এই মন বদলে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে নাহিদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। নাহিদ কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে পেছন ফিরে তাকাল। যেন কিচ্ছু হয়নি এমন স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

‘ কী রে? প্রোগ্রাম শেষ হলো বলে। গ্রুপ ছবি তুলবি না? আয়।’ 

—————

আকাশে ভরা পূর্ণিমা। কংক্রিটের শহর, পিচঢালা পথ, সাব্বিরের কলাবাগানের বাসার ঘাসে ঢাকা লন সমস্তটা ভিজে যাচ্ছে জ্যোৎস্নার অদ্ভুত আলোয়। বসার ঘরের প্রশস্ত জানালাটা খোলে একটা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় নীরবে বই পড়ছে সাব্বির। দুই এক পাতা পড়ে চোখ তুলে তাকাচ্ছে বাইরের ওই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের দিকে। চারদিকে ঝিম ধরা নীরবতা। ক'টা বাজে এখন ঘড়িতে? মধ্যরাত পেরিয়ে গেল কী? সাব্বির ঘাড় ফিরিয়ে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়। মধ্যরাত পেরোয়নি। মাত্র এগারোটা বাজে। আজকাল সাব্বিরের মধ্যে এই নতুন সমস্যাটা উদয় হয়েছে। সন্ধ্যায় হাসপাতাল থেকে ফিরে বাকি রাতটুকু কাটানো প্রায়ই খুব দুষ্কর ঠেকে। বসার ঘরের জানালার পাশে বসে বই পড়তে পড়তে সে বারবার মুখ তুলে বাহিরে তাকায়। ওই মরচে পড়া গেইট খোলে কেউ ভেতরে আসবে এই অপেক্ষা যেন তার প্রাণজুড়ে। অথচ জীবনের দীর্ঘ ঊনত্রিশটা বছর তার কেটে গেল চোখের পলকে। কঠিন দিন, দীর্ঘ রাত সবই কেমন অবলীলায় কাটিয়ে এসেছে সাব্বির। কখনও মনে হয়নি, জীবনটা এতো দীর্ঘ কেন? সন্ধ্যাটা এতো বিষণ্ণ কেন? তবে কী অপেক্ষা বাড়িয়ে দিতে পারে সময়ের ব্যাপ্তি? সাব্বির দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরও একবার বাইরের দিকে তাকায়। মিথির আজকাল বাড়ি ফিরতে খুব রাত হয়। প্রতিদিন যে ফিরে এমনও না। মাঝেমাঝেই শুটিংয়ের কাজে দুই-একদিনের জন্য উধাও হয়ে যায় সে। কোথায় আছে, কখন ফিরবে, আদৌ ফিরবে কি-না কিছুই জানে না সাব্বির। তারপরও রোজ অদ্ভুত এক অপেক্ষা নিয়ে বসে থাকে জানালার পাশে। অপেক্ষা করতে যে তার খুব খারাপ লাগে তেমনও না। সাব্বিরের মাঝে মাঝেই মনে হয়, খুব শীঘ্রই এই অপেক্ষা হয়ে উঠবে তার জীবনের সুন্দরতম অবসর। সাব্বির বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই রাতের নিস্তব্ধতা চিঁড়ে দিয়ে একটা গাড়ি এসে থামে রাস্তার ধারে, ল্যাম্পপোস্টের ঠিক নিচে। দরজা খুলে বেরিয়ে আসে মিথি। তার সঙ্গে বেরোয় সুদর্শন এক যুবক। যুবকটিকে সাব্বির চিনে। শহরের বড় বড় বিলবোর্ডগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় তার হাস্যোজ্জ্বল মুখ। সন্ধ্যার জ্যামে বসে থেকে না চাইতেও সহস্রবার দেখতে হয় এই চেহারা । মনের ভুলে একটা হাস্যকর তুলনাও চলে আসে নিজের সঙ্গে৷ এই অপমানজনক তুলনায় গম্ভীর হয় সাব্বিরের মুখ। মনে মনে একটা অভিমানও জাগে, ‘কেন মিথিকে তার সঙ্গেই ফিরতে হবে?’ চিন্তাটার সঙ্গে একটা দুশ্চিন্তাও এসে জড়ো হয় চোখে। মিথি একজন স্বাধীন, স্বাবলম্বী নারী সে কথা জানে সাব্বির। তারপরও রাত-বিরেতে এই যে এতো জায়গায় ছোটাছুটি করছে। সর্বক্ষণ পুরুষ মানুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছে। যদি কখনও কোনো দুর্ঘটনা ঘটে? যদি কখনও অসহায় হয়ে পড়ে মিথি? কে আছে মিথির পাশে এসে দাঁড়ানোর মতো? অনেক ভেবেও দাদাজান ছাড়া কারো কথা মনে করতে পারে না সাব্বির। এই প্রথম টের পায় মিথির ভেতরকার তীব্র এক নিঃসঙ্গতা। অন্যান্য দিন মিথিকে গেইট খুলে ঢুকতে দেখে নীরবে নিজের ঘরে ফিরে যায় সাব্বির। কিন্তু আজ একইভাবে বসে রইল চেয়ারে। ক্লান্ত মিথি দরজায় চাবি দিয়ে ভেতরে ঢুকে সাব্বিরকে বসে থাকতে দেখে অবাক হলো। সাব্বিরের সঙ্গে শেষ কবে দেখা হয়েছিল, মনে করার চেষ্টা করল। মনে পড়ল না। নানান কাজের চিন্তায় সাব্বিরের কথা ভাববার ফুরসত পায় না সে বহুদিন। খুব যে ইচ্ছে করে তেমনও না। সাব্বিরকে ভাবতে ভাবতে, এই দূরত্ব মেটানোর চেষ্টা করতে করতে মিথি এখন ক্লান্ত। এই দূরত্ব মিটিয়ে সাব্বিরের সঙ্গে তার একটা সুস্থ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে এই প্রত্যাশা তার আর নেই। নাটকের শুটিংটা শেষ করে ব্যস্ততাটা কিছু কমলেই সম্ভবত ডিভোর্সের জন্য আবেদন করবে মিথি। তারপর তারা হয়ে যাবে অনেকদূরের মানুষ। মিথি সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে শ্রান্ত হাসি হেসে শুধায়,

‘ কেমন আছেন সাব্বির সাহেব? আজ এখনও জেগে আছেন যে!’ 

সাব্বির হাতের বইটা টেবিলে নামিয়ে রেখে উত্তর দেয়, 

‘ ঘুম আসছিল না। আপনি কী রাতের খাবার খেয়ে ফিরেছেন মিথি? আজ আমার একা খেতে ইচ্ছে করছে না। আপনি কী একটু বসবেন আমার পাশে?’ 

বড় সরল আবদার। এই সরল আবদারেই ভেতর ভেতর চমকে ওঠে মিথি। সারাদিনের ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসতে চাইলেও সাব্বিরের পাশে কিছুক্ষণ বসতে আপত্তি নেই তার। কিন্তু সাব্বিরের এই কাছে-দূরের আশ্চর্য মুড সুয়িংয়ে বড় ক্লান্ত সে। সব ঠিক হয়ে যেতে যেতে হঠাৎ থমকে যাওয়ার এই শিশুসুলভ খেলায় সে বিরক্ত। তারা কেউই বাচ্চা নয়। এই বয়সে এসে বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে এতো নাটক কী তাদের মানায়? মিথির একবার ইচ্ছে হলো, কঠিন গলায় প্রত্যাখ্যান করে নিজের ঘরে দোর দিবে। কিন্তু, চাইলেই কী পারা যায়? সব সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলার ছক কষে ফেললেও এই সরল, সুন্দর মানুষটির দিকে তাকালে কোমল হয়ে আসে মিথির হৃদয়। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে হাসার চেষ্টা করে বলে,

‘ নিশ্চয়ই। আপনি বসুন। আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি। আমারও রাতের খাবার খাওয়া বাকি।’ 

মিথি ঠান্ডা জলে ক্লান্তি ধুয়ে পোশাক বদলে খাবার টেবিলে আসতে আসতে টেবিলে খাবার সাজিয়ে ফেলেছে সাব্বির। মিথিকে দেখে একটা চেয়ার টেনে দিয়ে আন্তরিক কণ্ঠে বলে,

‘ প্লিজ, বসুন।’ 

মিথি একটু হেসে চেয়ারে বসে। সাব্বির তার মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসে খুব যত্ন করে খাবার তুলে দেয় মিথির প্লেটে। কিছুক্ষণ নীরবে খেয়ে এই মৌনতা ভাঙার চেষ্টা করে সাব্বির। শুধায়,

‘ আপনার শুটিং কেমন চলছে?’ 

সাব্বিরের নিজ থেকে কথা শুরুর এই প্রচেষ্টায় কিছুটা অবাক হয় মিথি। কয়েক সেকেন্ড সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে থেকে উত্তর দেয়,

‘ বেশ, ভালো।’ 

তারপর আবারও নীরবতায় ঢেকে যায় চারদিক। নিগূঢ় অন্ধকারে পথ খোঁজার মতো কিছুক্ষণ হিমশিম খেয়ে আবারও মুখ খুলে সাব্বির। শুধায়,

‘ আপনার কোনো বন্ধু নেই মিথি?’ 

মিথি চোখ তোলে তাকায়। মিথিকে তাকাতে দেখে নিজের জিজ্ঞাসাকে আরও একটু বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করে সাব্বির,

‘ আমার নিজেরও তেমন কোনো বন্ধু নেই। আমি একটু অন্যরকমভাবে বড় হয়েছি। কিন্তু আপনি…’ 

কীভাবে প্রশ্নটা শেষ করবে বুঝে উঠতে পারে না সাব্বির। অপ্রস্তুত কণ্ঠে বলে,

‘ আপনার মুখে কখনও কোনো বন্ধুর নাম শুনিনি।’ 

মিথি ম্লান হেসে বলে,

‘ নিজেদের কথা বলার মতো আলোচনা কী আমাদের মধ্যে কখনও হয়েছে সাব্বির?’ 

সাব্বির কোনো উত্তর দিতে পারে না। মিথি একটু চুপ থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,

‘ আমার কোনো বন্ধু নেই। হয়ত কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করার মতো প্রতিভাই আমার মধ্যে নেই। কেউ কখনও এগিয়ে এসে আমার বন্ধু হতে চায়নি। আমিও কখনও চেষ্টা করিনি।’ 

‘ আমি চেয়েছিলাম। আপনি আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন।’

সাব্বিরের এই অভিমানী উত্তরে থমকায় মিথি। কয়েক সেকেন্ড সাব্বিরের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত কণ্ঠে বলে,

‘ আমি আপনার স্ত্রী হতে চেয়েছিলাম। আপনিও আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন।’ 

প্রত্যুত্তরে দুই জোড়া চোখ নীরবে তাকিয়ে থাকে একে অপরের চোখে। এক সময় দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে চোখ ফিরিয়ে নেয় সাব্বির। বাকি খাবারটুকু তারা শেষ করে নিঃশব্দে। খাওয়া শেষে মিথি তার ঘরে ফিরে যাওয়ার উদযোগ করতেই আবারও ইতস্তত কণ্ঠে প্রস্তাব রাখে সাব্বির,

‘ আপনি কী খুব ক্লান্ত মিথি? আজ পূর্ণিমা। পৃথিবীটা জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে। আপনি খুব ক্লান্ত না হলে আমার সঙ্গে ছাদে যাবেন? এই বাড়িতে আমি প্রায় চার বছর ধরে আছি। কিন্তু কখনও ছাদে যেতে ইচ্ছে হয়নি। কিন্তু আজ যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। আপনার সঙ্গে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। তবে আপনি যদি খুব বেশি ক্লান্ত হোন তাহলে…’ 

মিথি একদৃষ্টিতে তার শ্যামসুন্দর স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকে। এই লোকটিকে প্রত্যাখ্যান না করতে পারার অসহায়ত্বে নিজের প্রতি হতাশ হয়। নিরাশ কণ্ঠে বলে,

‘ চা লাগবে সাথে?’ 

এই পর্যায়ে সাব্বিরের ঠোঁটে ফোটে বিশ্ব জয়ের হাসি। সেই হাসির দিকে তাকিয়ে হতাশা বাড়ে মিথির। বুঝে, এই এক হাসির জন্য ভবিষ্যতে আরও লক্ষকোটিবার নিজের হৃদয়টিকে টুকরো হতে তুলে দিবে সে এই পাষণ্ড পুরুষের হাতে। 

—————

বাস্তবিকই দুধ সাদা জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিভে গিয়েছে বেশিরভাগ বৈদ্যুতিক আলো। চাঁদের আলোর কাছে ম্লান হয়ে টিমটিম করে জ্বলছে কেবল রাস্তার ধারের ওই হলদে ল্যাম্পপোস্ট। একটা মিহি, ঝিরঝিরে বাতাস ছাদজুড়ে। সেই হাওয়ায় ভর করে সুগন্ধি ছড়াচ্ছে লনের একধারে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকা জুঁইফুল। এই জ্যোৎস্না সুন্দর রাতে পাশের পুরুষটির উষ্ণ পরশে নিজেকে বিলীন করার একটা সুপ্ত ইচ্ছে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেও হৃদয়কে পাথরের মতো কঠিন করে রাখে মিথি। ছাদের রেলিঙে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে চুমুক দেয় চায়ের কাপে। ভোর হলেই আবার সাব্বির ফিরে যাবে তার আগের সত্তায়, আবারও সেই অবহেলা, সেই নির্লিপ্ততা। সব জেনে-বুঝে কী দরকার ভাঙা হৃদয়ের সঙ্গে আরেক প্রস্থ ভাঙচোর করার? দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিথি। সাব্বির কিছুক্ষণ বিমুগ্ধ নীরবতায় আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে শুধায়,

‘ মিথি, সেদিন আপনি আপনার মায়ের কথা বলছিলেন। আপনার মা নেই। কিন্তু বাবা! বাবার কথা তো কিছু বললেন না!’ 

মিথি একনজর সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে আকাশের দিকে তাকায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

‘ বাবা বেঁচে আছেন। এই তথ্যটুকু ছাড়া বাবা সম্পর্কে আর কী বলা যেতে পারে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।’ 

সাব্বির একটু বিস্ময় নিয়ে তাকায়। শুধায়,

‘ কোথায় থাকেন আপনার বাবা? বাবার সঙ্গে আপনার কথা হয় না?’ 

সাব্বিরের হঠাৎ মিথির সম্পর্কে এতো আগ্রহে কিছুটা অবাক হয় মিথি। মনে হয়, সাব্বির আজ বড় অন্যরকম, বড় অস্থির। পরমুহূর্তেই চিন্তাটা ঘুরে আসে বাবার কাছে। বাবা! বাবার সঙ্গে ঠিক কবে, কত বছর আগে কথা বলেছিল মিথি? কী কথা হয়েছিল তাদের? মিথির মনে হয়, বাবার সঙ্গে জন্মের পর থেকে এতোগুলো বছরে কখনও বলার মতো কোনো কথা হয়নি তার। ‘বাবা’ শব্দটাই আজ কত বছর পর উচ্চারণ করল সে? মিথি চোখ বন্ধ করে বাবার চেহারাটা কল্পনা করতে গিয়ে দেখল, বাবার চেহারার স্মৃতিটাও হারিয়ে গিয়েছে মস্তিষ্ক থেকে। চোখের পর্দায় কেবল ভাসছে দাদাজানের চেহারা। মিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

‘ আমার বাবা একটু অন্যরকম। সবসময় বইপত্র নিয়ে পড়ে থাকেন। উদাসীন। তার সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। আমাদের শেষ কবে কথা হয়েছিল আমি জানি না। আমার ধারণা, তাঁর যে একটা মেয়ে আছে সে কথা তাঁর নিজেরও খুব একটা মনে থাকে না। আমি তাঁর সামনে দাঁড়ালে খুব সম্ভবত তিনি আমাকে চিনতে পারবেন না।’ 

কথা শেষ করে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে মিথি। সাব্বির কিছুক্ষণ মিথির দিকে কোমল চোখে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আকাশের দিকে মুখ ফিরিয়ে একদম অন্যরকম স্বরে বলে,

‘ হুমায়ুন আহমেদ তার এক বইয়ে লিখেছিলেন, পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ মানুষ থাকলেও কোনো খারাপ বাবা নেই । আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা মিথি। তবে, তাঁর এই কথাটা পৃথিবীর সবথেকে বড় ভুল কথা। এই পৃথিবীর সব বাবা ভালো হয় না। ভালো বাবা হওয়ার আগে ভালো মানুষ হতে হয় । আপনার বাবা যদি একজন ভালো মানুষ হয়ে থাকেন তাহলে আপনি তাকে একজন বাবা হিসেবে নয় একজন মানুষ হিসেবে একদিন জড়িয়ে ধরবেন। এবং তাকে ধন্যবাদ দিবেন শুধুমাত্র একজন মানুষ হওয়ার জন্য। একজন মানুষ হতে পারা অনেক বড় ব্যাপার মিথি ; সবাই পারে না।’
 
সাব্বিরের গলার স্বরের এই পরিবর্তন টের পায় মিথি। তাকে কখনও এই জাতীয় ভারী কথা বলতে শুনেনি বলেই বোধ করি আশ্চর্য হয়ে তাকায়। সাব্বির তার ফ্যাকাশে মুখে জোরপূর্বক এক চিলতে আলো আনার চেষ্টা করে বলে ,

‘ ভালো বাবা হওয়া আমাদের জীবনের জন্য অপরিহার্য না মিথি। এটা একটা দায়িত্ব। আমরা আমাদের জীবনের সব দায়িত্ব পালনে একই রকম পটু হব এমন তো কোনো কথা নেই। একটা ক্লাসে একটা ছাত্র গণিতে দশ পেয়ে বাংলায় আটানব্বই পেয়ে যেতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে ছাত্র হিসেবে সে অপদার্থ। এর অর্থ হলো, ম্যাথে তার আগ্রহ নেই অথবা বিষয়টা সে ক্লিক করতে পারছে না। অথবা কোথাও একটা আটকে পড়েছে। তার সাহায্যের প্রয়োজন। আমাদের জীবনটাও মোটামুটি একইরকম। এই জীবনটা যাপন করতে গিয়ে আমাদের একসঙ্গে অনেকগুলো দায়িত্ব প্রসেস করতে হয় । শিখতে হয়। তার মধ্যে একটা দুটো দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে এটা আমাদের কমতি। অপরাধ নয়। এই কমতিগুলো আমরা চাইলে দায়িত্ব নিয়ে সারিয়ে তুলতে পারি। চাইলে এড়িয়ে যেতে পারি। কিন্তু একজন স্বচ্ছ হৃদয়ের অধিকারী হওয়ায় তাকে এপ্রিশিয়েট করাটা এড়িয়ে যেতে পারি না। এই মনুষ্যত্বহীন দুনিয়ায় মানুষ হয়ে টিকে থাকাটা তো চারটিখানি কথা না।’

কথা শেষে চোখ ফিরিয়ে মিথির দিকে তাকায় সাব্বির। মিথিকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হেসে বলে,

‘ আমি বোধহয় খুব বেশি ভারী কথা বলে ফেললাম। সরি মিথি।’

মিথি উত্তর দেয় না। যাকে সে এতোদিন বোকাসোকা , সরল বালকের মতো ভেবে এসেছে সে যে আদতে এতো গভীরভাবে চিন্তা করে। এতো গুছিয়ে কথা বলতে পারে তা ভেবেই কেমন বিস্ময়ে তন্ময় হয়ে রইলো সে। সাব্বির মিথিকে এমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল,

‘ আপনার বাবা পিতা হিসেবে ব্যর্থ হলেও আপনার এই ভেবে আনন্দিত হওয়া উচিত যে আপনি এমন এক ব্যক্তির ঔরসজাত সন্তান যে শুধু দেখতে মানুষের মতো নয় । সে ভেতর থেকেও একজন মানুষ। আপনি একজন মানুষের সন্তান । আপনাকে এই স্বস্তিটুকু দেওয়ার জন্যও তাকে কোনো একদিন অবশ্যই একটা ধন্যবাদ দিবেন মিথি। ব্যপারটা আদতে সাধারণ হলেও এই সাধারণ স্বস্তিটুকু অনেকেরই থাকে না।’

কথা শেষ করে হাসল সাব্বির। মিথি তার হাসিতে সঙ্গ দিতে পারল না। তার মাথায় তখন ঘুরছে অন্যরকম চিন্তা। সে বুঝতে পারছে না, সাব্বির হঠাৎ এই ধরনের কথা কেন বলছে? এগুলো কী বাবার সঙ্গে মিথির সম্পর্কটা ভালো করার জন্য নিছক উপদেশমালা? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গল্প আছে? সাব্বিরের বেড়ে ওঠা একটা এতিমখানায়। শিশুকাল থেকে বাবা-মা ছাড়া বড় হওয়া একটা ছেলের ভাবনায় বাবাদের নিয়ে এতো গভীর চিন্তা কেন থাকবে? এটা কী নিছক কোনো কাকতালীয়তা? নাকি সে মিথিকে কিছু জানাতে চাইছে? অন্যমনস্ক হয় মিথি। সাব্বির ফাঁকা কাপ হাতে ঘরে ফিরে যাওয়ার উদযোগ করতেই আচমকা তার হাত চেপে ধরে মিথি। অন্যমনস্ক হয়ে প্রশ্ন করে,

‘ আপনার বাবা… আপনি আপনার বাবার পরিচয় জানেন তাই না, সাব্বির? ইউ নো হিম ভেরি ওয়েল!’
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp