জাদুর শহরে নেমে এসেছে ধূসর সন্ধ্যা। ঘর ফেরত পাখিদের ডানায় কে যেন ল্যাপটে দিয়েছে সন্ধ্যা সন্ধ্যা বিষণ্ণতা। জাদুর শহরের জাদুর মেয়ের হৃদয়েও আজ একই সমান বিষাদ। সন্ধ্যার মতো গুমোট তার মুখ। বাস্তবতা থেকে অনেকদূর রূপকথার জগতে ছিল এই জাদুর মেয়ের বসবাস। কারো থেকে কক্ষনও বিশ্বাসঘাতকতা পায়নি বলেই বোধহয় বিশ্বাসঘাতকতার প্রতি তার এমন তীব্র অবিশ্বাস। তার আকুল হৃদয় দিশেহারা হয়ে জানতে চায়, বন্ধু হয়ে বন্ধুকে কী কখনও এমন করে ফাঁকি দেওয়া যায়? যদি যায়, তবে তাকে কী সত্যিই বন্ধু বলা সাজে? শাওন তার বন্ধু। প্রিয় বন্ধু। শাওনের সঙ্গে তার ঠিক কত বছরের বন্ধুত্ব, মনে করতে পারে না মৌনি। তবে মনে পড়ে, পরিচয়ের দিক থেকে আজ তাদের একুশ বছর। এই এতো বছরের পরিচয় মিথ্যা কী করে হতে পারে? সেই ছেলেবেলা থেকে যে ছেলেটি মৌনিকে সদ্য ফোঁটা ফুলের মতো আগলে আগলে রাখে, সেই ছেলেটি হঠাৎ কী করে ওমন বদলে যেতে পারে?
শাওনের জীবনে মৌনি ছাড়া কোনো মেয়েবন্ধু না থাকলেও প্রেমিকা এসেছিল দু'জন। মৌনি তাদের কথা জানে। সেই দুই প্রেমিকার কাউকেই নিজে থেকে ছাড়েনি শাওন। ওরাই স্ব-ইচ্ছায় ছেড়ে গিয়েছিল তাকে। শাওন তাদের ছেড়ে যেমন দেয়নি আটকানোর চেষ্টাও করেনি। খুব একটা কষ্ট পেয়েছিল বলেও মনে হয় না। শুধু নিয়মিত কথা বলার অভ্যাসটার জন্য কিছুদিন জ্বালাতন করেছে মৌনিকে। মৌনি এ-ও জানে মেয়েদের সঙ্গে প্রেমের ভান করায় সিদ্ধহস্ত শাওন। মৌনির কত কত বন্ধুর সঙ্গেই তো প্রেমে জল হয়ে গিয়েছে এমন ঢং করে কথা বলতো শাওন। এই নিয়ে দু’জনের মধ্যে হাসাহাসিও হতো বিস্তর। মিষ্টির সঙ্গেও তো কত মিথ্যে তামাশা করেছে সে। এসব মৌনির জানা। এই শাওন মৌনির পরিচিত। কিন্তু সৌমি নামের কারো অস্তিত্বের কথা কখনও মনের ভুলেও উচ্চারণ করেনি সে। সৌমিকে সে সরিয়ে রেখেছে আলাদা এক দুনিয়ার মতো বিচ্ছিন্ন করে। উঁহু, ভুল কথা। সৌমি তো বিচ্ছিন্ন নয়। কাব্য, নিতা সকলেই জানে সৌমির কথা। কেবল জানে না মৌনি। মৌনিকে জানানোর ন্যূনতম প্রয়োজনও বোধ করেনি শাওন। নিজেকে শাওনের জীবনে হঠাৎ করেই খুব গুরুত্বহীন মনে হলো মৌনির। শাওনের প্রেম তাকে দুঃখ দিতে পারল না। তার মন খারাপ হলো প্রিয় বন্ধু হারিয়ে ফেলার ব্যথায়। বন্ধুত্বে বিশ্বাসহীনতার ব্যথা কী তীব্র! কী ভীষণ দমবন্ধের মতো! মৌনির মাথায় ঝিমঝিম করে। বুঝে, তাদের বন্ধুত্ব বরাবরই ছিল একপাক্ষিক। শাওন কখনও তাকে বন্ধু ভাবেনি। শাওন তাকে ভেবেছে, গড়পড়তায় পেয়ে যাওয়া মেয়েগুলোর মতো। যাদের সঙ্গে হেসেখেলে প্রেমের অভিনয় করা যায়। নয়তো একটি সম্পর্কে আবদ্ধ থেকে কেন মৌনির সঙ্গে এমন অদ্ভুত মানসিক খেলা খেলল শাওন? মৌনি তার প্রতি দুর্বল হচ্ছে বুঝতে পেরেও কী করে পারল সমস্ত কথা গোপন রেখে মৌনির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করতে? যেখানে মৌনি তার জীবনটাকে খোলা বইয়ের মতো মেলে দিয়েছিল তার কাছে। তাহলে কী এসব শাওনের বদলা? মৌনি তার অনুভূতির দাম দেয়নি বলে মৌনিকে একই পরিস্থিতিতে এনে মন ভাঙা ছিল শাওনের উদ্দেশ্য? এমন অপমানজনক প্রতিশোধ শাওন তার থেকে নিতে পারে বলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় না মৌনির। বন্ধু শাওনকে লম্পট ভাবতে কষ্ট হয়। যাকে সারাজীবন চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করেছে তার পক্ষে একটা কথা শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে হৃদয়। একটা প্রশ্নের জবাবের জন্য সে দিশেহারার মতো প্রশ্ন করে,
‘ শাওন! আমাকে আগে জানাওনি কেন শাওন?’
মৌনি তৃষ্ণার্তের মতো অপেক্ষা করে, কখন শাওন নিজের পক্ষ টেনে একটা কথা বলবে। একটা যোগ্য কারণ সে তুলে ধরবে মৌনির সামনে। অথচ তাকে হতাশ করে বাক্যহারার মতো নিশ্চুপ থাকে শাওন। যেন কথারা সব ফুরিয়ে গিয়েছে। সব যুক্তি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। নিজের পক্ষে আর একটি কথাও বলবার নেই তার। মৌনি অস্থির হয়ে উঠল। অনেকটাক্ষণ জবাবের অপেক্ষা করে ব্যথায় নীল হয়ে গেল তার মুখ। হতাশ, বেদনার্ত কণ্ঠে বলল,
‘ কনগ্রাচুলেশনস্ শাওন। আই এ্যাম সো হ্যাপি ফর ইউ।’
—————
টেবিলের উপর ধোঁয়া উঠা চায়ের কাপ। নাহিদ একটা চেয়ারে বসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চায়ের কাপে মেঘের মতো উড়তে থাকা ধোঁয়ার রিঙগুলোর দিকে। মুখের ভাব গম্ভীর। পাশে বসে থাকা সৌধ থেকে থেকেই উশখুশ করে উঠছে। নাহিদের সঙ্গে কোথাও গিয়ে চুপ করে বসে থাকার নজির তার নেই। নাহিদ নিজে চঞ্চল। সর্বক্ষণ এরওর সঙ্গে দুষ্টুমি, ফাজলামো করা তার অভ্যাস। তার সহচর হয়ে কেউ নিশ্চুপ বসে থাকবে এমন ঘটনা ঘটানো অসম্ভব। কিন্তু আজ নাহিদ স্বয়ং গম্ভীর হয়ে বসে আছে। চেহারায় আগের সেই ছেলেমানুষি ভাব নেই। কোথাও যেন একটা ভারিক্কি ব্যক্তিত্বের ছটা। নাহিদ কিছুক্ষণ নীরব থেকে অন্যমনস্ক হাতে সিগারেট ধরাল। সিগারেটে আগুন ধরিয়ে সামনে তাকাতেই দেখল রিসেপশনের মেয়েটি আঁড়চোখে তাকেই দেখছে। নাহিদ চোখ সরাল না। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেয়েটির দিকে।
নারী মহলে নাহিদ রোমান্টিক কবিতার মতো জনপ্রিয়। যাকে মেয়েরা পড়তে চায়, একটুখানি ভালো লাগায় আন্দোলিত হয় কিন্তু দুনিয়া ভেঙে তার মধ্যে ডুবে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দেখায় না। এই কোমল রোমান্টিকতার দেওয়াল পেরিয়ে আরও গভীরে যাওয়ার প্রয়াস নাহিদও করেনি কখনও। অথচ এই শহরের অর্ধেক মানুষ বিশ্বাস করে, পরিচিত মহলের সকল নারীর সঙ্গেই তার গভীর প্রণয়। তার একেকটা ভোর কাটে একেক নারীর শয্যায়। তাদের এই ঈর্ষনীয় অভিযোগ অবশ্য শতভাগ মিথ্যা নয়। পরিচিত মহলের অধিকাংশ নারীর সঙ্গেই তার রোমান্টিক কবিতা আওড়ানোর সম্পর্ক। তাদের সঙ্গে নাহিদের চোখে-চোখে দুষ্টুমি, মনে মনে প্রেম এই সমস্ত কিছু অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ওই প্রেম রোমান্টিক কবিতা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। তাদের কাউকেই কখনও একান্তে পাওয়ার চেষ্টা করেনি নাহিদ। নারীরাও তার দিকে তাকিয়েছে কোমল প্রশ্রয় নিয়ে। সে দৃষ্টিতে কখনও কোনো অতৃপ্ত কামনা ফুটে উঠেনি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। নাহিদের কোমল চেহারা হারিয়ে গিয়েছে রুক্ষ পৌরুষের আড়ালে। চিবুকের কাছে ঝুলে থাকা দুষ্ট বালকের ছাপটাও মুছে গেছে কোনো এক দৈব বলে। কল্পনামেদুর চোখদুটো তুলে তাকালে এখন আর রোমান্টিক কবিতার কথা মনে পড়ে না। বরং বুক ধুকপুক করে অন্যরকম এক উত্তেজনায়। রুক্ষ, বেপরোয়া, ভয়হীন ওই চোখদুটোতে নারীরা বুঝি খুঁজে পায় প্রচ্ছন্ন এক কামুক সত্তা। সেজন্যই বোধ করি, নারী হৃদয়ে আগের মতো হানা দেওয়ার চেষ্টা না করেও, তাদের প্রতি এক রকম উদাসীন হয়ে থেকেও নাহিদ টের পায় মেয়েরা তাকে লক্ষ্য করছে। তার প্রেমে পড়ে সব হারানো দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছে। তাদের এই মতিভ্রমে মনে মনে আশ্চর্য হয় নাহিদ। বুঝে, নারীরা ঠান্ডা জলে স্নান করার থেকে যন্ত্রণার অনলে পুড়তে ভালোবাসে। নাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রিসিপশনের মেয়েটির নীরব আকুতি রক্ষার্থে তার দিকে দৃষ্টি রেখেই জ্বলন্ত সিগারেটটি ডুবিয়ে দিল চায়ের কাপে। প্রত্যুত্তরে মিষ্টি করে হাসল সেই রূপসী কন্যা। সৌধ এতক্ষণ বন্ধুর এই গোপন অভিসার খেয়াল না করলেও এবার লক্ষ্য করল। বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে বলল,
‘ শালা! সাধু সন্ন্যাসীর মতো ভং ধরেও চরিত্র ঠিক হয় না তোমার।’
বন্ধুর কথায় হেসে ফেলল নাহিদ। মেয়েটির থেকে চোখ সরিয়ে একটা বিদেশি ম্যাগাজিনের পাতা উল্টে বলল,
‘ শখ করে পটতে এলে আমার কী দোষ?’
সৌধ জবাবে কিছু বলার আগেই সেখানে এসে উপস্থিত হলেন আদিব হোসেন। তাদের দেখে একটু হেসে বললেন,
‘ তোমাদের অনেকক্ষণ অপেক্ষা করালাম, ইয়াংম্যান। সন্ধ্যার চা খাওয়া হয়নি। ভাবছি বাইরে কোথাও খাব। চলো কোনো রেস্টুরেন্টে বসে কথা বলি?’
নাহিদ-সৌধ বিনা বাক্যব্যয়ে উঠে দাঁড়াল। আদিব হোসেনের অফিস থেকে বেরিয়ে কাছাকাছি একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসল ওরা৷ তিনটা চায়ের অর্ডার দিয়ে সরাসরি কাজের কথায় এলেন আদিব। বললেন,
‘ তোমদের আগেই বলেছি, তোমরা যে জার্নালটা প্রকাশ করতে চাইছ তাতে আমি তোমাদের কোনোরকম সাহায্য করতে পারব না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকতে এই জার্নাল প্রকাশ করা হবে আত্মহত্যার নামান্তর। তবে এটা যে একেবারেই প্রকাশ করা যাবে না তা নয়। তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। সুযোগের অপেক্ষা। তবে তোমাদের জন্য আমার অন্যরকম একটা প্রস্তাব আছে। অনেক বছর ধরেই আমি একটা ম্যাগাজিন প্রকাশ করার পরিকল্পনা করছি। ভিন্নধর্মী ম্যাগাজিন। ম্যাগাজিনটাকে আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন আমার আছে। তাতে দেশ-বিদেশের দুর্ধর্ষ খবরগুলো তথ্য সমৃদ্ধ আকারে প্রকাশের চেষ্টা থাকবে আমাদের। অনেক নামীদামী জার্নালিস্টদের আমন্ত্রণ জানিয়েছি। কিন্তু তারা একেবারে নতুন, ফেইস ভ্যালুহীন ম্যাগাজিনে কাজ করতে রাজি নয়। একটা নতুন ম্যাগাজিনকে বিশ্ব দরবারে দাঁড় করানো চারটি খানি কথা না। গোছানো ক্যারিয়ার রেখে কেউ এতো পরিশ্রমের মধ্যে আসতে চাইবেও বা কেন? একেবারে একা, অদক্ষ কর্মী নিয়ে এই কাজে হাত দেওয়ার মতো আত্মবিশ্বাস পাচ্ছি না। টাকা আমার যথেষ্ট আছে। দরকার ডেডিকেটেড ইমপ্লয়। তোমাদের মধ্যে সেই ডেডিকেশনটা আছে। তোমরা আমার এই ম্যাগাজিনের স্বপ্নটাকে সুদূর প্রসারী করতে সাহায্য করতে পারো। ম্যাগাজিনের কন্টেন্ট, ইনফরমেশন, ডেকোরেশন ইত্যাদি সকল কিছুর দায়িত্ব থাকবে তোমাদের হাতে। মানুষের কাছে কীভাবে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো যায়। কীভাবে এর জনপ্রিয়তা বাড়ানো যায়। সর্বোপরি, ম্যাগাজিনটাকে টেনেহিঁচড়ে দাঁড় করানোর দায়িত্ব তোমাদের। তার পেছনে মূলধন যা লাগে সব আমার। ভেবে দেখো। এর জন্য মোটা অঙ্কের মাইনেও আমি তোমাদের দেব। কত মাইনে চাও তোমরা?’
নাহিদ মনোযোগ দিয়ে আদিব হোসেনের বক্তব্য শুনল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
‘ আমরা মাইনে চাই না, স্যার।’
আদিব হোসেন ও সৌধ উভয়ই অবাক হয়ে নাহিদের দিকে তাকাল। আদিব হোসেন শুধালেন,
‘ মাইনে চাও না! তবে কী চাও?’
‘ ম্যাগাজিনের মালিকানা।’
আদিব হোসেন বিস্ফারিত চোখে তাকালেন। এহেন আজগুবি কথায় হতভম্ব কণ্ঠে বললেন,
‘ মানে!’
নাহিদ তখনও নির্বিকার। ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
‘ আপনার ম্যাগাজিন দাঁড়াবে। বিশ্ব দরবারে সমাদৃতও হবে। কিন্তু তার পেছনে যে এফোর্ট আমরা দেব সেটা শুধু সেলারিতে পোষাবে না। ম্যাগাজিনের চল্লিশ পার্সেন্ট মালিকানা আমাদের দিতে হবে। এমন হলে আমরা ভেবে দেখতে পারি।’
আদিব হোসেন নাহিদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হেসে ফেললেন। সামনে বসে থাকা ছেলেটির ছেলেমানুষি বায়নায় কৌতুক বোধ করলেন। বললেন,
‘ ম্যাগাজিনের পেছনে সমস্ত খরচ ঢালব আমি। টাকা আমার, জনবল আমার। তোমাদের তার চল্লিশ পার্সেন্ট মালিকানা দেওয়ার মতো বোকামো আমি কেন করব?’
নাহিদ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
‘ করবেন। কারণ শুধু আপনার টাকা দিয়ে ম্যাগাজিন আপনি দাঁড় করাতে পারবেন না। তার পেছনে আমাদের শ্রম খরচ হবে আপনার টাকার থেকেও বেশি।’
আদিব হোসেনের দৃষ্টি কঠিন হলো এবার। গম্ভীর হয়ে বললেন,
‘ তুমি কী এই কাজের জন্য নিজেকে অপরিহার্য ভাবছ? তুমি বোধহয় জানো না, তোমার মতো জার্নালিস্ট এই দেশে অজস্র আছে। সেখানে তোমরা তো এখনও গ্রাজুয়েশনও কমপ্লিট করতে পারোনি। বাচ্চা ছেলে।’
নাহিদ মৃদু হেসে বলল,
‘ অপরিহার্য ভাবছি না। তবে নিজের ইন্টেলেকচুয়াল ক্ষমতার কদর করছি। আপনার কাছে আরও অপশন থাকলে ইউ ক্যান ক্যারি অন। এ্যাজ ইউ ছে, আমাদের এখনও গ্রাজুয়েশনও কমপ্লিট হয়নি। এমন অপরচুনিটি আসার সময়ও আমাদের অজস্র আছে।’
আদিব হোসেন শীতল চোখে নাহিদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। দু’জনের চোখেই তখন বিজলির আলো। এক সময় আদিব হোসেন হার মানলেন। শুষ্ক হেসে বললেন,
‘ মাইনে নিয়ে কাজ করলেই তোমাদের জন্য বেশি সুবিধা হতো না নাহিদ? ম্যাগাজিন না দাঁড়ালে লস আমি একাই খেতাম। মাইনে কিন্তু মাস শেষে তুমি ঠিকই পেতে।’
নাহিদ হেসে বলল,
‘ ম্যাগাজিন না দাঁড়ানোর মতো তো কোনো অপশন নেই, স্যার। আমি সবসময়ই একটা অপশনে বিশ্বাসী। ঠিক তেমনই ক্ষণস্থায়ী লাভের থেকে সুদূরপ্রসারী লাভে বেশি বিশ্বাস করি। আমি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, সব বিপদ মাথায় নিয়ে ম্যাগাজিন দাঁড় করাব। আপনি কোনো একদিন আমার হাতে মাইনে ধরিয়ে দিয়ে তার ফল ভোগ করবেন। সেটা আমি হতে দিতে পারছি না। কাজের ক্ষেত্রে আমি কাউকেই বিশ্বাস করি না। ডিল মঞ্জুর হলে জানাবেন। নয়তো এটাই আমাদের শেষ নেগোসিয়েশন।’
আদিব হোসেন নাহিদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অল্প বয়স্ক এই ছেলের চোখের বারুদ তাকে বাকরুদ্ধ করে দিল। বিমূঢ় কণ্ঠে শুধালেন,
‘ তুমি এতো শিওর কী করে হচ্ছ যে, ম্যাগাজিন দাঁড়াবেই?’
নাহিদ এবার একটা সিগারেট জ্বালাল। আদিব হোসেনের দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে বলল,
‘ কারণ আমি বাধ্য করব।’
নাহিদের চোখের তারায় ফুটে উঠা জ্বলজ্বলে আত্মবিশ্বাস। কঠিন চোয়ালে ঝুলে থাকা দম্ভ। কাউকে পরোয়া না করার বেপরোয়া ভঙ্গিমা দূরদর্শী আদিব হোসেনকে ভাবুক করে তুলল। এই ভয়হীন, নির্ভীক ছেলেটিকে এড়িয়ে যেতে পারলেন না। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এই ছেলে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। কোনো না কোনোদিন সে আপন শক্তিতে অগ্ন্যুপাত ঘটাবে। কারো পক্ষেই একে দমিয়ে রাখা সম্ভব না। তিনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে নিজেকেই অবাক করে দিয়ে বললেন,
‘ বেশ! আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তুমি তোমার চুক্তিপত্র পেয়ে যাবে।’
এই পর্যায়ে নীরব দর্শক হয়ে থাকা সৌধ বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেল। অবাক হয়ে সে তাকিয়ে রইল নির্বিকার মুখে বসে থাকা বন্ধুর দিকে। তার ঠোঁটে তখনও টিমটিম করে জ্বলছে সিগারেটের আগুন।
—————
শহরে রাত নেমেছে অনেকক্ষণ হলো। রাতের মতোই গুমোট এক আঁধার বুকে চেপে স্থির মূর্তির মতো বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে শাওন। ঝড়ের পূর্বাভাস স্বরূপ হু হু হাওয়া বইছে। উড়িয়ে নিতে চাইছে বারান্দার টবে লাগানো নয়নতারা গাছ। এই তীব্র হাওয়াও যেন স্পর্শ করতে পারছে না শাওনের অভ্যন্তর। অদ্ভুত এক অস্থিরতা গ্রাস করে ফেলেছে তার চেতনা।
‘ শাওন? এই শাওন? টেবিলে খাবার দিয়েছি। খাবি আয়।’
শোবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকছেন মা। এর আগেও চারবার ডেকে গিয়েছেন। শাওন জানিয়েছে, সে খাবে না। তারপরও ডাকছেন। শাওন জানে, টেবিলে গিয়ে বসার আগপর্যন্ত ডাকতেই থাকবেন। এটা মায়ের একটা সমস্যা। শাওনের আজ মাথার ঠিক নেই। সে আজ আর ধৈর্য রাখতে পারল না। বিরক্ত হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। প্রচন্ড এক ধমক দিয়ে বলল,
‘ তোমার সমস্যা কী বল তো? একটা রাত ভাত না খেলে মরে যাব আমি? নাকি তুমি চাইছোই আমি মরে যাই? যদি তাই চাও তাহলে সরাসরি বলো। এতো নাটক করবে না।’
এতো সাধারণ কথায় ছেলের এমন ক্রোধে অবাক হলেন শাওনের মা শিরিন হক। কয়েক সেকেন্ড ব্যথিত চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে অভিমানী ক্রোধ নিয়ে বললেন,
‘ নিজের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে ছোটবেলা থেকে একা হাতে বড় করেছি তোকে, এমন ব্যবহার পাওয়ার জন্য? নিজের সর্বস্ব উজার করেছি তোর পেছনে। তার পরিবর্তে আজ পর্যন্ত তুই কী দিতে পেরেছিস আমায়? তোর মতো অকৃতজ্ঞ ছেলে আর কারো না হোক।’
শাওন বিরক্ত চোখে মায়ের দিকে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘ কথায় কথায় এই একই কাসুন্দি না ঘেঁটে ছোটবেলা থেকে এখন পর্যন্ত আমার পেছনে কত টাকা খরচ করেছ তার একটা লিস্ট করে দিয়ে যেও। দরকার পড়লে নিজের দুই কিডনি বেঁচে তোমাকে উদ্ধার করে যাব। তাতে নিশ্চয় তোমার প্রাণ জুড়াবে? এখন প্লিজ আমার চোখের সামনে থেকে যাও। প্লিজ!’
শিরিন হক কিছুক্ষণ অবিশ্বাস্য চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে নীরবে বেরিয়ে গেলেন ছেলের ঘর থেকে। শাওন বারান্দা থেকে ঘরে ফিরে বিছানায় বসল। দুই হাতের মুঠোয় চুলগুলো আঁকড়ে ধরল তীব্র হতাশায়। এমনিতেই জীবনে এতো যন্ত্রণা! তার মধ্যে কী দরকার ছিল মায়ের সঙ্গে ওমন খারাপ ব্যবহার করা? কিছুক্ষণ দুই হাতে মুখ ঢেকে নিশ্চুপ বসে থেকে নিজেকে শান্ত করল শাওন। কাব্যকে ফোন করে নিজের ঘরে ডাকল। ভাইয়ের ফোন পেয়ে কাব্য তার ঘরে এলো তিন মিনিটের মাথায়। শাওনকে ওভাবে নীরব বসে থাকতে দেখে কাছে গিয়ে পিঠে হাত রাখতেই উঠে দাঁড়িয়ে তার নাক বরাবর একটা মুষ্ট্যাঘাত করে বসল শাওন। কলার চেপে ধরে বলল,
‘ মৌনিকে সৌমির কথা কেন বলেছিস তুই?’
কাব্য ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে গেল। এক হাতে নাক চেপে ধরে প্রচন্ড এক ধাক্কায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
‘ পাগল হয়ে গিয়েছ তুমি! আমি কেন বলব? মৌপুর সঙ্গে আমার কথায় তো হয় না অনেকদিন।’
কাব্যর কথা শাওনের বিশ্বাস হলো না। আবারও তেড়েফুঁড়ে গিয়ে কলার চেপে ধরল কাব্যর। চোখ গরম করে বলল,
‘ তুই বলিসনি! তুই ছাড়া আর কে বলতে পারে ওকে?’
কাব্য অবাক হয়ে বলল,
‘ আরে, সেটা আমি কী করে জানব? তোমার আর মৌপুর এক স্বভাব। কিছু হলেই শুধু আমাকে ধরে মারো।’
শাওন চোখে-মুখে তীব্র হতাশা নিয়ে কাব্যর কলার ছেড়ে দিয়ে বিছানায় গিয়ে বসল। দু'হাতে মুখ ঢেকে মূর্তির মতো বসে রইল দীর্ঘক্ষণ। কাব্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভাইয়ের ভাবগতি লক্ষ্য করে পাশে গিয়ে বসল। কাঁধে হাত রেখে বলল,
‘ কী হয়েছে ভাই? মৌপু সৌমি ভাবীর কথা জেনে গিয়েছে? জানলেই বা কী? মৌপু তো আর তোমাকে বিয়ে করবে না। আর কতদিন অপেক্ষা করবা? তাছাড়া, সৌমি ভাবি তোমাকে সত্যিই খুব পছন্দ করে..’
কাব্যর কথা শেষ না হতেই চোখ গরম করে তাকাল শাওন। ধমক দিয়ে বলল,
‘ ডোন্ট কল হার ভাবি।’
কাব্য বিরস কণ্ঠে বলল,
‘ তাহলে কাকে ভাবি বলব? মৌপুকে? ওরে বাপরে! মৌপু আমাকে জ্যান্ত কবর দিয়ে ফেলবে।’
শাওন জবাব না দিয়ে পা ঝুলিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়। বুকের ভেতর খা খা করে উঠল অদ্ভুত এক শূন্যতা। আজকের ঘটনার পর মৌনি আর তার হবার নয়। মৌনিকে বুঝানো সম্ভব নয়, তার আর সৌমির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। সৌমির সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক আছে ঠিক। কিন্তু সম্পর্ক থাকা আর ভালোবাসা তো এক কথা নয়। মৌনিকে ভালোবাসাটা তার জন্য খাওয়া-দাওয়া-ঘুমের মতো অপরিহার্য এক অভ্যাস। যখন থেকে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বুঝেছে তখন থেকেই মৌনিকে সে ভালোবাসে পাগলের মতো। শাওনের পরিচিত অর্ধ-পরিচিত কে না জানে মৌনির কথা? মৌনির প্রতি তার ভালোবাসার কথা? এমনকি মৌনির প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সৌমিও তো জানে শাওনের সেই পাগলপাড়া অনুভূতির কথা। ছেলেবেলা থেকে অনেকবার এই ভালোবাসা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে শাওন। নানান জনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে বন্ধ রেখেছে সমস্ত যোগাযোগ। এই যোগাযোগহীনতায় মৌনির কিচ্ছু হয়নি। কিন্তু আগের থেকে আরও দ্বিগুণ পাগল হয়ে মৌনির কাছে ছুটে গিয়েছে শাওন। মৌনির প্রতি ভালোবাসার কাছে মাঝে মাঝে নিজেকে বড় অসহায় লাগে তার। কেন সে এতো ভালোবাসে মৌনিকে? কেন তার বুক থেকে কেউ ভুলিয়ে দিতে পারে না তার নাম? কেন তার সব চিন্তা, সব পথ শেষ হয় মৌনির কাছেই! কেন! শাওনের কানের কাছে বেজে উঠে মৌনির কাতর প্রশ্ন,
‘ কেন তুমি আমাকে আগে জানাওনি শাওন?’
মৌনির প্রশ্ন বুকে নিয়ে নিশ্চুপ শুয়ে থাকে শাওন। এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই। কেন সে সৌমির কথা কখনও জানায়নি মৌনিকে, তা সে জানে না। বাকি সবারটাই তো জানিয়েছিল তবে সৌমির কথা কেন জানাল না? কী চেয়েছিল শাওন?
·
·
·
চলবে……………………………………………………