চমৎকার পূর্নিমা। দুধ সাদা জ্যোৎস্না নামছে পৃথিবীতে। দূর থেকে কেউ মিহি গলায় গাইছে,
‘ এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়।
এমন দিনে মন খোলা যায় –’
সাব্বিরের কোনো কথা বলবার নেই। এই পৃথিবীতে ওই একটি কথা কাউকে জানাতে চায় না সে। তারপরও কে গাইছে এমন? কে আকুল কণ্ঠে বলছে, এমন দিনে মন খোলা যায়?
এই অলীক, স্বপ্নময় পৃথিবীতে কার সঙ্গে মনের কথা বলবে সে? সাব্বির বহুদূরে অস্পষ্ট এক মানবছায়া দেখতে পায়। মেয়েটি সফেদ শাড়ি পরে উদাস মনে আকাশ দেখছে। দুধ জ্যোৎস্নায় ভিজে যাচ্ছে তার মলিন মুখ, ক্লান্ত চোখ। জ্যোৎস্না কখনও গা ভেজায় না, মন ভেজায়। অথচ জ্যোৎস্নার আলোয় কী আশ্চর্য উপায়ে ভিজে যাচ্ছে ওই রহস্যময়ীর গা। পরিস্ফুট হয়ে উঠছে তার সমস্ত রমণীয় বাঁক। সাব্বির চিনতে পারে, মেয়েটা মিথি। তার হাতের সঙ্গে অনিবার্য ভবিতব্যের মতোন জড়িয়ে আছে মিথির সফেদ শাড়ির পলকা এক সুতো। ধীরে ধীরে সুতোর সংখ্যা বাড়ছে। সাব্বিরের বলিষ্ঠ হাত সফেদ সুতোয় ভরে যাচ্ছে। আহা! মেয়েটার শখের শাড়ির সব সুতোই যে খুলে পড়ছে! সাব্বির কী এগিয়ে যাবে? মিথিকে ফিরিয়ে দিবে সব সুতো? সাব্বির দ্বিধান্বিত হয়। অনেক ভেবে এগিয়ে যায় কয়েক পা। সুতোগুলো ধীরে ধীরে শক্ত দড়ির মতো আঁকড়ে ধরে তার হাত। এই দড়ি, এই বন্ধন খুলে বেরিয়ে আসা বড় কঠিন! সাব্বির ক্লান্ত হয়ে মিথিকে ডাকে। আকাশ থেকে চোখ সরিয়ে তার দিকে ফিরে তাকায় মিথি। মিথির চোখে এখন আর উদাসভাব নেই। চোখ ভর্তি খুশি আর লজ্জা নিয়ে সে বলে,
‘ সাব্বির! সাব্বির দেখুন কী হচ্ছে আমার!’
চারদিকে অজস্র প্রজাপতি। এতো ফুল। এতো সুগন্ধ। এ কী কোনো স্বর্গ? হাজারও ফুলের ভীড়ে ফুলের মতো ফোটে থাকা মিথির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকায় সে। অবাক হয়ে দেখে মিথির ফুলেফেঁপে থাকা উদর। সেখানে জ্বলজ্বল করছে একটি শিশুর আগমনী বার্তা। পৃথিবী তার আগমনে খুশি। সহস্র প্রজাপতি এলোমেলো খেলা করছে তাকে ঘিরে। সাব্বির হাত বাড়াল। সঙ্গে সঙ্গেই বদলে গেল দৃশ্যপট। প্রজাপতি, ফুল, আকাশ, মিথি সমস্ত কিছুই যেন নীল হয়ে গেল বেদনায়। মিথির মুখে হাসি নেই। তার কোলে খেলা করছে এবার একটি শিশু। মিথি কাঁদছে, শিশু কাঁদছে। শিশুটির গা থেকে ভেসে আসছে উৎকট গন্ধ। মিথি তাকে সাব্বিরের সামনেই ছুঁড়ে ফেলল মাটিতে। তীব্র ঘৃণা নিয়ে সে তাকাল সাব্বিরের দিকে। চিৎকার করে বলল,
‘ আপনি আমাকে ঠকিয়েছেন! এমন সন্তান আমি কোনোদিন জন্ম দিতে চাইনি। আমি আপনাকে কক্ষনও ক্ষমা করব না। কক্ষনও না।’
সাব্বিরের ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে দেখল, আঁধারে ডুবে আছে ঘর। চারদিকে নিঝুম নীরবতা। জানালার বাইরে সফেদ চাদরের মতো গাঢ় জ্যোৎস্না। চাঁদের আলোয় চকচক করছে বৃষ্টি ভেজা বৃক্ষপল্লব। সাব্বির উঠে বসল। অনুভব করল, তার সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছে। কম্পিত হাতে পানির গ্লাসের সন্ধান করে কিছুক্ষণ থম ধরে বসে রইল। মৌনির সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার পর ঘরে ফিরে একটু শুয়েছিল। তারপর কী করে যে এতো রাত হয়ে গেল! সাব্বির অনুভব করল, তার বুক কাঁপছে। অদ্ভুত এক অসহায়ত্ব তাকে গ্রাস করে ফেলছে ধীরে ধীরে। অন্ধকারে দমবন্ধ লাগছে আবার আলো জ্বালাতেও ভয় করছে। নিজের এই চেহারা, এই শরীর নতুন করে আর দেখতে চায় না সে। কেন এলো মিথি তার জীবনে? একলা জীবনে তো বেশ ছিল সাব্বির। আনন্দে ছিল। সুখে ছিল। পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য দু’চোখে পুরে আনন্দের সঙ্গে অপেক্ষা করছিল স্বাভাবিক একটি মৃত্যুর জন্য। মিথি এসে নিজের সঙ্গে সঙ্গে তাকেও কেমন অসহায় করে দিয়ে গেল। ওকে দেখলে সাব্বিরের মরে যেতে ইচ্ছে করে। সবকিছু ধ্বংস করে ফেলতে ইচ্ছে করে। নিজের প্রতি ঘৃণাটাও আবার নতুন করে জেগে উঠে। সাব্বির আক্ষেপের দহনে দুই হাতে মুখ ঢেকে ধীরে ধীরে খামচে ধরল নিজের চুল। বিরক্তি, হতাশায় জ্ঞানশূন্য হয়ে লাথি মারল বেড সাইড টেবিলে। কাচের জারটা পড়ে গিয়ে ঝনঝন শব্দ তোলে ভেঙে গেল তৎক্ষনাৎ। তার কয়েক সেকেন্ড পরেই দরজায় মৃদু করাঘাত পড়ল। ওপাশ থেকে ভেসে এলো মিথির উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর,
‘ সাব্বির? ইজ এভ্রিথিং অলরাইট? আপনি ঠিক আছেন?’
মিথির গলার স্বরে সম্বিত ফিরে পেল সাব্বির। নিজের এই নতুন আচরণে আশ্চর্য হয়ে গেল। তড়িৎ হাতে আলো জ্বালিয়ে একটু সময় নিয়ে জবাব দিল,
‘ আমি ঠিক আছি মিথি৷ পানির জারটা হাত থেকে পড়ে গিয়েছে। আপনি শুয়ে পড়ুন।’
মিথি কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে শান্ত স্বরে জানাল,
‘ আপনার খাবারটা টেবিলে ঢাকা দেওয়া আছে। রাতে ক্ষুধা পেলে খেতে পারেন৷’
সাব্বির দরজার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কোমল স্বরে বলল,
‘ থেংকিউ মিথি। সো নাইস অফ ইউ।’
মিথি প্রত্যুত্তর করল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে একবার তাকাল বন্ধ দরজার দিকে। সে ভেবেছিল, সাব্বির হয়তো-বা দরজা খুলবে। মিথির সঙ্গে দুটো কথা বলবে। পানির জার ভাঙার সঙ্গে সাব্বিরের অস্ফুট আর্তচিৎকারও স্পষ্ট শুনেছিল মিথি। ওর মনে হচ্ছিল, সাব্বিরের হয়তো ওকে প্রয়োজন। হয়তো সে ভয় পাচ্ছে। কিন্তু… না চাইতেই আবারও দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক চিড়ে। কেন যে সম্পর্কের সীমারেখাটা বারবার ভুলে যায় মিথি! ভুলে যায় কিছু সম্পর্ক লৌকিকতাতেই ভালো মানায়। মিথি উদ্বিগ্ন চোখে একবার দরজার দিকে তাকাল। এই দীর্ঘ জীবনে কখনও কারো খারাপ চায়নি সে। খারাপ চায়নি বলে যে খুব ভালো চেয়েছে সেরকমও না। নিজস্ব কর্মব্যস্ততায় ডুবে থেকে নিজের বাইরে অন্য কারো কথা ভাববার অবসরই হয়নি তার। ভাবা যে দরকার এরকম কথা মনেও হয়নি কখনও। কোনো প্রিয় মানুষ তার ছিল না, প্রিয় মানুষের প্রতি দুশ্চিন্তা কেমন হয় সেটাও সে জানে না। তবে আজ হঠাৎ কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হলো। নিজের লেনদেনের বাইরে একেবারে অপ্রয়োজনে দরজার ওপাশের মানুষটির জন্য দুশ্চিন্তা হলো। নিজের ঘরে ফিরে যাওয়ার আগে দরজায় হাত রেখে মন খারাপ করা কণ্ঠে স্বগোতক্তি করল,
‘ বি সেইফ সাব্বির। বি সেইফ। ’
—————
পুবাকাশে গাঢ় নীল রঙের একটা রেখা। এটাকে ঠিক নীল রঙ বলা যায় না। এর নাম প্রুশিয়ান ব্লু। কোমল আকাশী রঙের উপর প্রুশিয়ান ব্লুয়ের এবড়োখেবড়ো আঁচড়েও সকালের স্নিগ্ধতা নষ্ট হয়ে যায়নি। বরং বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আরাম দিচ্ছে।
‘ মামা আপনের চা।’
মৌনি শাড়ির আঁচলটা ভাঁজ করে পেছন ফিরে তাকাল। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে সামনের গাছটা লক্ষ্য করে শুধাল,
‘ মামা? ওইটা কী গাছ?’
সদ্য ভোর হয়েছে। নির্জীব শহুরে মানুষগুলো ধীরে ধীরে আড়মোড়া ভাঙছে। পথে নামতে শুরু করেছে স্বাস্থ্য সচেতন প্রৌঢ়রা। স্কুল ড্রেস পরা ছোট্ট ছোট্ট শিশুর হাত ধরে ব্যস্ত অভিভাবক, অলস গলায় হেঁকে চলা সবজির মামা, সকলেই ধীরে ধীরে নেমে আসছে পথে। একটা দীর্ঘদেহী যুবকও কানে হেডফোন, গায়ে জগিং স্যুট পরে দৌঁড়ে গেল। যাবার সময় আঁড়চোখে একবার তাকাল মৌনির দিকে৷ এত সকালে এমন রমণীয় সাজে আগে কখনও কাউকে একলা দাঁড়িয়ে চা খেতে দেখেনি বলেই হয়ত এই বিস্ময়। মৌনির অবশ্য সেদিকে খেয়াল নেই। সে উদাস চোখে তাকিয়ে আছে রাস্তার ওপাশের গাছটির দিকে। সময় নিয়ে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে চায়ের কাপে। গতকাল রাতে এক মিনিটের জন্যও ঘুমায়নি সে। মিথির থেকে গল্প বাছাই করে এনে সারা রাতে এডিটের কাজটা শেষ করে চূড়ান্ত সংস্করণটা পাঠাতে হয়েছে। মিথি যদিও সপ্তাহখানেক সময় দিয়েছিল, মৌনি সঙ্গত কারণেই সময় নেয়নি। মিথির সঙ্গে আপাতত কোনো যোগাযোগ রাখার ইচ্ছে তার নেই। সুতরাং যত তাড়াতাড়ি গা ঝাড়া দেওয়া যায় ততই মঙ্গল। আজ সকালে তার একটা প্রেজেন্টেশন আছে। রাত ভোর করে মিথিকে মেইলটা পাঠিয়ে দিয়েই তাকে তৈরি হয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। এখন এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে প্রেজেন্টেশন গুছানোর পালা। প্রেজেন্টেশন শেষে তাকে যেতে হবে একটা সাহিত্য সভায়। সেখান থেকে যেতে হবে প্রয়োজনীয় কিছু রঙ আর ক্যানভাস কিনতে। এই ফাঁকে দুটো বইও তুলে নেওয়া দরকার নীলক্ষেত থেকে। রাস্তার ওপাশের অপরিচিত গাছটির দিকে নজর রেখে মনে মনে সারাদিনের রুটিনটা আওড়ে নিলো মৌনি৷ সামনেই একটা সবজির ভ্যান দেখে মনে পড়ল, ঘরে বাজার নেই। ফেরার সময় কিছু সবজিও কিনে নিতে হবে। মৌনি চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে সবজি ওয়ালার সঙ্গে আলাপ জমানোর চেষ্টা করল। কৌতূহল বশত শুধাল,
‘ মামা, আলু কত?’
‘ সত্তর টাকা মামা।’
মৌনি অবাক হয়ে বলল,
‘ কী বলেন, মামা। কয়দিন আগে না পঞ্চাশ দিয়ে নিলাম? গাজর কত?’
‘ তিনশো ষাট টাকা কিলো মামা।’
‘ তিনশো ষাট টাকা! তোমরা তো দেখি দিনে দুপুরে পাবলিকের গলা কেটে ফেলবা!’
‘ আমরাও তো এই দাম দিয়েই কিনতেছি মামা। বাজারে দাম বাড়তেছে, আমাগো কী দোষ?’
মৌনি ভাবুক হয়ে মাথা নাড়ল। চায়ের দাম মিটিয়ে দিয়ে বলল,
‘ বুঝলা মামা? তোমরা যা শুরু করেছ! ভাবতেছি পড়াশোনা বাদ দিয়া সবজির ব্যবসা করব। শহরের মধ্যে একটা সুপারশপ খুললে রমরমা চলবে না?’
মামা হেসে ফেললেন,
‘ শুরু কইরা দেন। ভালোই চলব মামা।’
সবজিওয়ালার সাথে ঠাট্টা করলেও বুদ্ধিটা খুব পছন্দ হলো মৌনির। গন্তব্যের পথে হাঁটতে হাঁটতে সময়জ্ঞান ভুলে তৎক্ষনাৎ বাবা মঈনুলকে ফোন করল। বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মঈনুল আহসান স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ। দীর্ঘ, ব্যয়ামচর্চিত শরীর। জীবনের অধিকাংশ সময় সেনা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকায় ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ছুটে যাওয়া তাঁর চিরদিনের অভ্যাস। তবে সেই ভোরে দুপুর করে ঘুম থেকে উঠা মৌনির ফোনকল পাওয়া তাঁর অভ্যাসে নেই। অতএব, মেয়ের ফোন পেয়ে তিনি যথারীতি আশ্চর্য হলেন। কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়েই ফোন উঠালেন। সঙ্গে সঙ্গেই ফোনের ওপাশ থেকে পাহাড়ি নদীর মতো কলকল করে উঠল মৌনি। মেয়ের চঞ্চলতায় হাসলেন মঈনুল। প্রগাঢ় স্নেহ নিয়ে বললেন,
‘ গুড মর্নিং আম্মু।’
মৌনি বলল,
‘ মর্নিং বাবা। আমি তোমার সঙ্গে একটা ব্যবসায়ী আলাপ করতে ফোন দিয়েছি। ইউ শ্যুড টেক মি সিরিয়াসলি।’
মঈনুল তাঁর হাসি ধরে রেখে কোমল কণ্ঠে বললেন,
‘ আই অলওয়েজ টেক ইউ সিরিয়াসলি।’
মৌনি আনন্দে ঝুমঝুম করতে করতে নিজের ভাবনা জানাল। বুদ্ধিদীপ্ত কণ্ঠে বলল,
‘ যদিও তোমার ব্যবসা এই সেক্টরে না। কিন্তু এই সেক্টরেও কিন্তু তুমি দারুণ কিছু করে ফেলতে পারো বাবা৷ শহরে কাঁচা সবজির যা দাম! তারওপর ফ্রেশ সবজি পাওয়া মুশকিল। অন্যদিকে গ্রামে দাদাজানের নিজস্ব জমিতেই চাষ হয় প্রায় বিশ ধরনের ইনগ্রিডিয়েন্টস্। তুমি সেখান থেকে খুব সহজেই পাইকারি মূল্যে সবজি কিনতে পারো। ট্রান্সপোর্ট নিয়ে তোমার কোনো ঝামেলা নেই। মধ্যরাতে তেমন জ্যামও থাকে না। দাদাজানের বিশ্বস্ত কর্মচারীরা নিজ তদারকিতে প্রতিদিন মাঝরাতে সবজি লোড করে দিলে সেগুলো খুব ভোরে পৌঁছে যাবে ঢাকায়। প্রান্তিক কৃষকদের থেকে পাঁচ গুণ বেশি দামে সবজি বিক্রি হয় শহরে। তুমি যদি দামটা চলতি বাজার দামের থেকে একটু কমিয়ে রাখো তাহলে খদ্দেরও বাড়বে হুহু করে। আর আমার রিচ আছে। আমি তোমার এই মহৎ প্রচেষ্টাকে ফ্রীতে প্রমোট করে দিতে পারি। এতোটুকু মানবিক আমি হতেই পারি৷ উফ, বাবা! ভাবতে পারছ? তারপর শুধু টাকাই টাকা!’
মেয়ের ছেলেমানুষি উত্তেজনায় হাসলেন মঈনুল। মৌনি বাবার হাসিকে পরোয়া না করে গম্ভীর মুখে বলল,
‘ তুমি ব্যবসাটা শুরু করলে লাভের দশ পার্সেন্ট কিন্তু আমার বাবা। সেটা তুমি আমাকে কাগজে কলমে লিখে দিবে। আর যায় হোক, মূল আইডিয়াটা আমি দিচ্ছি। আমার আইডিয়ায় ব্যবসা করে লালে লাল হয়ে যাবে আর আমাকে লাভ দিবে না? তা তো হতে পারে না।’
মঈনুল হাসলেন। বললেন,
‘ ওয়েল! যদিও আমার সমস্ত ব্যবসার একচ্ছত্র অধিপতি তুমিই। কিন্তু এটা যদি একটা বিজনেস ডিল হয় তাহলে আমি রাজি নই। একটা সামান্য আইডিয়ার পেছনে আমি আমার লাভের দশ পার্সেন্ট খরচ করতে পারি না।’
মৌনি প্রায় আর্তনাদ করে উঠল,
‘ সামান্য! আমার আইডিয়া সামান্য? এতো বড় অপমান!’
মঈনুল বললেন,
‘ অবশ্যই সামান্য। এমন বিজনেস এখন অনেকেই করছে। ইউনিক কিছু নয়। এটা আমার মাথাতেও আসতে পারত। যেহেতু আসেনি সেজন্য তোমাকে বড়জোর দুই পার্সেন্ট লাভ দিতে পারি। ওইটুকু পুশ বাদে শ্রম, মূলধন, ব্যবসায়ী বুদ্ধি সবকিছু আমাকেই করতে হবে। শুধু শুধু তোমাকে আমি দশ পার্সেন্ট লাভ কেন দেব?’
‘ বাবা তুমি কিন্তু ইন্টেলেকচুয়াল পাওয়ারকে খুব বেশি অবজ্ঞা করে ফেলছ। একটা ব্যবসা করতে গেলে ইন্টেলিজেন্স খুবই দরকার।’
‘ সেটা দরকার। তবে তার থেকেও বেশি দরকার, মূলধন এবং ব্যবসা করতে পারার দক্ষতা। সেটা আমার আছে কিন্তু তোমার নেই। শুধু আইডিয়া দিয়ে কিছু হয় না। তাহলে দেশে এতো বেকার থাকতো না। আমাদের দেশের অধিকাংশ তরুণ আইডিয়া আইডিয়া করেই ঝরে যায়।’
মৌনি যুক্তিতে না পেরে আহ্লাদ করে বলল,
‘ বাবা! ইউ নো, হাও মাচ আই লাভ ইউ!’
মঈনুল হেসে ফেললেন,
‘ আই লাভ ইউ টু প্রিন্সেস। বাট আই এ্যাম নট কনভিন্সড৷’
মৌনি মুখ ভার করে বলল,
‘ দেন আই হেইট ইউ।’
মঈনুল হো হো করে হেসে উঠে বললেন,
‘ স্টিল আই এ্যাম নট কনভিন্সড মামণি।’
মৌনি হেসে ফেলল। আহ্লাদ করে বলল,
‘ সব ডিফেন্স অফিসাররাই কী তোমার মতো এতো সুন্দর করে কথা বলে বাবা? নাকি তুমি একাই? এমন হলে কিন্তু আমার আর বিয়েশাদি করা হবে না। আমার এক্সপেকটেশন তরতর করে বাড়ছে। আমার মাঝামাঝেই ঠিক তোমার মতো কাউকে বিয়ে করতে ইচ্ছে করে। মা নিশ্চয় সবার আগে তোমার কথার প্রেমে পড়েছিল বাবা?’
মঈনুল শেষ প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বললেন,
‘ এজ ইউর উইশ, মা৷ তুমি চাইলে, তোমার জন্য ডিফেন্সের সবথেকে বেস্ট নওজোয়ানকে খুঁজে আনব আমি। মাই ডটার ডিজার্ভস্ দ্য বেস্ট।’
মৌনি ম্লান হাসল,
‘ আমি চাইলেই?’
মঈনুল দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
‘ ইয়েস। তুমি চাইলেই।’
বাবার এই প্রশ্রয়েও ধীরে ধীরে কেমন নিভে এলো মৌনির হাসি। নিষ্প্রভ কণ্ঠে বলল,
‘ কিন্তু বাবা? আমার সবসময় মনে হয়, তুমি আমাকে পুরো পৃথিবী দিতে পারলেও আমি যা চাইব ঠিক সেই জিনিসটা এনে দিতে পারবে না। আমি ভেঙে যাব। নিঃশেষ হয়ে যাব। আমার খুব ভয় করে বাবা। বারবার মনে হয়, চারপাশের সমস্ত সুখ মুঠো করে বুক পকেটে রেখে দেই। ওই সুখ পুঁজি করে আমাকে হাঁটতে হবে অনেকদূর। আমি হেঁটে চলব একা, একলা।’
মঈনুল প্রত্যুত্তরে কিছু বলবার আগেই মৌনি আনমনা হয়ে বলল,
‘ আমার সবসময় মনে হয় আমার আশেপাশে অনেক কিছু ঘটছে। চারদিকে অনেক ফিসফাস। আমি শক্ত করে কান বন্ধ করে রাখি। সেই ফিসফাস শুনতে আমি ভয় পাই। মনে হয়, একবার যদি শুনে ফেলি, বুঝে ফেলি তাহলেই…। আমি কিচ্ছু বুঝতে চাই না বাবা। তুমি আমার কাছে আসো। দুই হাতে আমার কান বন্ধ করে আমাকে একটু জড়িয়ে ধরে বসে থাকো। তুমি আমার মাথায় হাত রাখলেই আমি আর কিচ্ছু শুনব না। কিচ্ছু দেখব না। মৌনি ট্রাস্টস্ অনলি বাবা।’
মেয়ের কথায় মঈনুল কোনোরূপ প্রত্যুত্তর না করে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। বাজপাখির মতোন তীক্ষ্ণ চোখে ফুটে উঠল অদ্ভুত এক কাঠিন্য।
বাবার সঙ্গে কথা শেষে কিছুক্ষণ ফুটপাতেই বসে রইল মৌনি। চওড়া পাড়ের খুঁতের শাড়ি, চোখের কোলে গাঢ় কাজল, শুকনো ঠোঁট আর কপালে ছোট্ট কালো টিপে তাকে দেখাল বিষণ্ণ প্রতিমার মতো। সেই প্রতিমা ধীরে ধীরে অসন্তোষ্ট হয়ে উঠল একটা ফোনকলের যাতনায়৷ বেশ কয়েকবার এড়িয়ে যাওয়ার পরও নির্লজ্জের মতো বাজতে থাকায় বিরক্ত হয়ে একসময় ফোন তুলল মৌনি। কণ্ঠের বিরক্তি ঢেকে শুধাল,
‘ কে বলছেন?’
মৌনিকে অবাক করে দিয়ে ওপাশ থেকে ভেসে এলো শাহিনূরের কণ্ঠ। মৌনি যেন প্রথমে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে সে ছোট ফুপির কুশলাদি জিজ্ঞাসা করল। বাড়ির বড়দের সঙ্গে মৌনির যোজন যোজন দূরত্ব। তাদের কেউই তাকে খুব একটা টেলিফোন করে না। সেখানে হঠাৎ ছোট ফুপি! কৌতুহল বোধ করল মৌনি। ফোন করবার কোনো বিশেষ কারণ আছে কি-না শুধাতেই পয়েন্টে এলেন শাহিনূর। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধালেন,
‘ নাহিদ কোথায় জানিস, মৌনি?’
দ্বিতীয়বারের মতো অবাক হলো মৌনি। নাহিদ কোথায় সেটা সে কী করে জানবে? নাহিদের বৃত্তান্ত তো তার জানার কথা না। মৌনি কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েই বলল,
‘ নাহিদের খবর তো আমি জানি না ছোটফুপি। ওর সঙ্গে তো আমার তেমন যোগাযোগ নেই।’
শাহিনূর জানালেন, নাহিদ কিছুদিন আগে বাড়ি থেকে হুট করে উধাও হয়ে গিয়েছে। এখন কারো ফোন তুলছে না। ভাই-বোনদের মধ্যে যাদের সঙ্গে নাহিদের মোটামুটি ভালো সম্পর্ক কারো কাছেই সে নেই। তার বন্ধুদেরও রিচ করা যাচ্ছে না। মৌনি যেন কোনোভাবে একটা খবর জোগাড় করে দেয়। মৌনি এবার তৃতীয়বারের মতো অবাক হলো। নাহিদের চলাফেরা, বন্ধুমহল কোনোকিছুর সঙ্গেই পরিচিত নয় মৌনি। একই শহরে এতোবছর ধরে থাকছে কিন্তু নাহিদের বাসাটা ঠিক কোথায় এই ছোট্ট প্রশ্নও কখনও মাথায় আসেনি মৌনির। জিজ্ঞাসাও করা হয়নি। এখন হঠাৎ কোথা থেকে খবর জোগাড় করবে সে? মৌনি কিছুক্ষণ আকাশ-পাতাল ভেবে নাহিদের নাম্বারে কল করার চিন্তা করল। নাহিদের নাম্বারটা তার কাছে আছে কি-না সেও অবশ্য এক চিন্তার বিষয়। বহু কিন্তু-পরন্তুর পর নাহিদের একটা নাম্বার খুঁজে পেল মৌনি। কিন্তু দেখা গেল, নাম্বারটা বন্ধ। এদিকে ছোট ফুপি একের পর এক কল করে যাচ্ছেন৷ মৌনি বুঝে পেল না, সকাল সকাল মাথা খাওয়ার জন্য তার মৌনির কথাই মনে পড়ল কেন! দীর্ঘশ্বাস ফেলল মৌনি। বাধ্য হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নাহিদের একাউন্ট ভিজিট করে তার বন্ধু সৌধর আইডি খুঁজে বের করল। ঘড়িতে একবার সময় দেখে নিয়ে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্টের সাথে সাথে একটা ম্যাসেজও পাঠিয়ে রাখল। মৌনির দৃঢ় বিশ্বাস, মৌনিকে সে এড়িয়ে যেতে পারবে না।
—————
আকাশের মেদুর ছায়া নিজের সঙ্গে সঙ্গে মেদুর করে রেখেছে কলাবাগানের ছোট্ট ফ্ল্যাটটিকে। ঘরের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে আশ্চর্য এক গাম্ভীর্য। সেই গাম্ভীর্যের অঘোষিত রাজা হয়ে খাবার টেবিলে অধিষ্ঠিত হয়েছে সাব্বির। এতোগুলো মাসে এই প্রথম তাকে দেখে কেমন অস্বস্তি হচ্ছে মিথির। একদম অপরিচিত, দূরের মানুষ বলে বোধ হচ্ছে। অথচ মিথি খাবার টেবিলে আসতেই বরাবরের মতোই তাকে মৃদু হেসে সম্ভাষণ জানিয়েছে সে। তারপরও অস্বস্তিতে কাবু হয়ে আসে মিথির মন। টের পায় কোথাও কিছু পরিবর্তন না হয়েও ভারী কোনো ছন্দপতন। দু’জন মানব-মানবীর এই নীরব থাকার যুদ্ধে প্রথম ইস্তেফা টানল মিথিই। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
‘ ইজ এভ্রিথিং অলরাইট, সাব্বির?’
সাব্বির মিথির দিকে না তাকিয়ে খেতে খেতেই সোজাসাপ্টা উত্তর দিল,
‘ ইয়েস।’
সাব্বিরের থেকে এমন তাৎক্ষণিক উত্তর আশা করেনি বলেই বোধহয় হতাশ হলো মিথি। সাব্বিরের সঙ্গে সহজ হওয়ার একপাক্ষিক চেষ্টায় ক্লান্ত হয়ে বলল,
‘ আমি রিসেন্টলি একটা প্যাকেজ নাটকের শুটিং শুরু করছি। আমার জীবনের প্রথম বৃহৎ প্রজেক্ট। গল্প সিলেক্ট করা হয়ে গিয়েছে, কাস্টিং চলছে। মাস ছয়েকের মধ্যে বোধহয় কমপ্লিট করে ফেলতে পারব। এই নাটকের কাজটা শেষ হলেই আমি নিজের মতো করে শিফট হয়ে যেতে পারব।’
সাব্বির খুব ক্যাজুয়ালি উত্তর দিল,
‘ ও-কে! অল দ্য বেস্ট মিথি।’
সাব্বিরের এই নিস্পৃহ কণ্ঠস্বরে আরও হতাশ হলো মিথি। অপমানের উষ্ণ হাওয়াও বয়ে গেল বুকের ভেতর। নিজেকে সাব্বিরের কাছে কেমন অবজ্ঞা, অবহেলার পাত্রী বলে মনে হলো। যে জোর করে ঘাড়ে চেপে বসে আছে, কিছুতেই যাকে ঝেরে ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। খাওয়া ফেলে কেমন মূর্তির মতো বসে রইল মিথি। ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে এলো তার মুখাবয়ব। সাব্বির মিথির সেই পরিবর্তন যেন লক্ষ্যই করল না। নীরবে নাস্তা সেড়ে মিথিকে হাসিমুখে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে গেল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। সাব্বির বেরিয়ে যেতেই ধীরে ধীরে খাবার টেবিলের উপর এলিয়ে পড়ল মিথি। টেবিলের উপর নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা হাতের উপর কপাল ঠেকিয়ে নীরবে বসে রইল দীর্ঘক্ষণ। সাব্বিরের ঘন ঘন মুড সুয়িং এ বড় ক্লান্ত লাগছে তার। বুকের ভেতর পুষে রাখা অচেনা এক অনুভূতির জন্য ক্লান্তির সঙ্গে এসে ভর করেছে সুতীব্র অসহায়ত্ব। কেন করছে সাব্বির তার সঙ্গে এমন? যদি ছেড়ে দিতেই হয় তাহলে একেবারে ছেড়ে দিলেই হয়। কেন বারবার মিথিকে নতুন করে ভাবতে দিয়ে আবার নিমেষেই বেরঙ করে দিচ্ছে সব ভাবনা৷ এই মানসিক টানাপোড়েনে যে কত কষ্ট! কত বিষাদ তা কী সাব্বির জানবে কখনও? মিথির চোখ ফেঁটে জল বেরিয়ে আসতে চায়। জানে না কতদিন পর, নাকি জীবনের প্রথম বারের মতো আচমকা ফুপিয়ে কেঁদে উঠল মিথি। কেন এতো একলা, এতো অসহ্য, এতো অবহেলার তার জীবন? কেন!
আপন দুঃখে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা বধূ টের পেল না তার দুঃখে তার থেকেও বেশী দুঃখ বুকে চেপে দরজার পাশে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার চির বিষণ্ণ শ্যাম। গভীর, শিশুসুলভ চোখদুটোতে তার গাঢ় বিষাদ। হাতে সুতার কাজ করা নান্দনিক একটি চুড়ি। তাতে চমৎকার নকশা তুলে লেখা মিথির নাম। চুড়িটা কাল দুপুরে উপহার দিয়েছিল মৌনি। সাব্বির প্রথমে খেয়াল না করলেও পরবর্তীতে বুঝেছে এই উপহার সাব্বিরকে দেওয়ার জন্যই সাথে এনেছিল মৌনি। বোন আর ভগ্নিপতির মধ্যকার সম্পর্ককে সহজ করার সামান্য প্রচেষ্টা। কিন্তু মৌনি জানে না, এই উপহার মিথিকে দেওয়ার ক্ষমতা সাব্বিরের নেই। আগে হলে হয়তো-বা সাময়িক সুখের জন্য কোনোকিছুই তোয়াক্কা করতো না সাব্বির। মিথির ভাবনায় নিজের ভেতরে একটা বেপরোয়া অস্তিত্ব তো আজকাল সে-ও টের পায় খুব। সেই বেপরোয়া সাব্বির কী তীব্রভাবেই না ছুটে যেতে চায় মিথির দিকে! বোকা সাব্বিরও তো তাকে ছাড় দিচ্ছিল ধীরে ধীরে। ভাগ্যিস কাল রাতে বাস্তবতাটা চোখের সামনে আবারও জ্বলজ্বল করে উঠল দুঃস্বপ্নের মতো। প্রকৃতি তাকে জানিয়ে দিলো কত ভুল, কত বিবেকবর্জিত কার্য সম্পাদনে ছুটেছে সে! কিন্তু মিথি! মিথি কেন এতো দুঃখ পাবে? কেন সে সাব্বিরকেই ভালোবাসলো? নিজের দুঃখ সহ্য করাই যেখানে এতো কঠিন সেখানে মিথির দুঃখের ভার বইবার মতো অতো শক্তি কোথায় পাবে সাব্বির? টেবিলে মাথা রেখে কান্নার ভারে থেকে থেকে কেঁপে উঠা প্রেয়সীর দিকে স্থির তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে দিগভ্রান্তের মতো অস্থির হয়ে উঠে সাব্বির। টলমল করে উঠে দু'চোখ। আহারে, ভুল জীবনে ভুল মানুষকে ভালোবাসার শাস্তি বুঝি হয় এতোটাই অবর্ণনীয়?
—————
বর্ষার আকাশে আজ মেঘ নেই। চারদিকে শীতের ওমের মতোন মিষ্টি রোদ্দুর। মৌনি প্রেজেন্টেশন শেষ করে ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে আনমনে একবার ফোন চেইক করতেই পেল সৌধর উত্তর। সৌধ মৌনির ম্যাসেজের উত্তরে খুব বিস্ময় নিয়ে লিখেছে,
‘ আপনি! আপনি আমাকে নক করেছেন? ওয়েট, আপনার একাউন্ট হ্যাক হয়ে যায়নি তো?’
প্রেজেন্টেশন আর নানান কাজের চাপে সকালের ঘটনাটা ভুলে বসেছিল মৌনি। সৌধর ম্যাসেজ দেখে মনে পড়ল, নাহিদের খোঁজ নেওয়ার কথা। সৌধর নাটকীয় আলাপ পাশ কাটিয়ে মৌনি সরাসরি জিজ্ঞাসা করল,
‘ নাহিদ কোথায়?’
প্রায় সাথে সাথেই ম্যাসেজ দেখল সৌধ। হতাশ হয়ে লিখল,
‘ ওহ! তাহলে ভাইয়ের খোঁজ নেওয়ার জন্য এই অদমের শরণাপন্ন হতে হলো! আমি ভেবেছিলাম আমার জন্য।’
সৌধর কথাবার্তার ঢঙে মেজাজ চটে গেল মৌনির। ছেলেটা ইচ্ছে ইচ্ছে করে ওর সঙ্গে একটা ঝামেলা পাকাতে চাইছে। মৌনি সেই ঝামেলাকে পাশ কাটিয়ে বলল,
‘ নাহিদ আপনার সঙ্গে থাকলে ওর গাল বরাবার দুটো থাপ্পড় দিন৷ ইমিডিয়েটলি দিবেন, আই ইনসিস্ট। ওর ফোন বন্ধ কেন?’
‘ ও আমার সঙ্গে নেই। থাকলেও থাপ্পড় দেওয়া যেত না। বেচারার শরীর খারাপ।’
মৌনি ভ্রু উঁচিয়ে শুধাল,
‘ কী হয়েছে?’
‘ জ্বর।’
‘ জ্বর! জ্বর কোনো অসুখ হলো? জ্বর হলেই ফোন বন্ধ করে পড়ে থাকতে হবে? ওকে বলুন, ফোন অন করে বাড়িতে ফোন দিয়ে কথা বলতে।’
‘ আমি বললেও বোধহয় শুনবে না। ওর আপাতত বাড়িতে কথা বলার ইচ্ছে নেই৷ একটু একা থাকতে দিন।’
মৌনি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শাহিনূরের নাম্বারটা সৌধকে পাঠিয়ে দিয়ে বলল,
‘ এটা নাহিদের মায়ের নাম্বার। নাহিদের ইচ্ছে না থাকলেও আপনি কাইন্ডলি একটু ফুপিকে ফোন করে উনাকে চিন্তামুক্ত করুন৷ প্লিজ! উনি আমাকে সকাল থেকে জ্বালাচ্ছেন।’
শেষ ম্যাসেজটা পাঠিয়েই ফোনটা ব্যাগে পুরে রাখল মৌনি। রাত জাগা আর অনাহারের ক্লান্তি মিলেমিশে বিধ্বস্ত হয়ে আছে শরীর। মৌনি সব চিন্তা একপাশে ফেলে রেখে আগে ক্যান্টিনের দিকে গেল। উদরপূর্তি করে খাওয়া দাওয়া সেড়ে তার মনে হলো এখন একটা চমৎকার ঘুম দিতে পারলেই জীবনটা হয়ে যাবে স্বর্গ৷ মৌনি নিজেকে আরাম দিতে তৎক্ষনাৎ আজকের দিনের সকল শিডিউল ক্যান্সেল করে দিল। ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে সোজা রিকশা নিয়ে চলে এলো বাসায়। বাইরের কাপড় পরনেই হাত-পা ছড়িয়ে পড়বে সিদ্ধান্ত নিতেই আবারও বাজতে লাগল বাজখাঁই মোবাইল ফোন। স্ক্রিনে ছোট ফুপির নাম্বার দেখে এক মুহূর্তের জন্য বিরক্ততে জ্বলে উঠল মৌনির মন। মনের বিরক্তি লুকিয়ে ক্লান্ত কণ্ঠে ফুপিকে সালাম জানাল। ফুপি সালামের পরিবর্তে তাকে দিল ভয়ংকর এক বার্তা। তার সকল শান্তিকে বিনষ্ট করে দিয়ে বললেন,
‘ মৌনি? মা রে? নাহিদের নাকি খুব জ্বর। তুই একটু ওর বাসায় গিয়ে দেখে আসবি আসলেই কতটা জ্বর আছে এখন? সৌধর সঙ্গে কথা হয়েছে। ও তো ছেলে মানুষ। এসব কিছু বুঝবে না। তুই একটু যা না মা। ছেলেটা আমার একদম অসুখ-বিসুখ সহ্য করতে পারে না। আমিও তো এই অবস্থায় যেতে পারছি না। তোর ফুপা ছেলের নাম সহ্যই করতে পারছে না। তারওপর যদি শুনে আমি ওখানে গেছি..। তাছাড়া রিফার কোচিং…’
মৌনি ছোট ফুপির বিশাল ভাষণে সাময়িক বাধা দিয়ে ক্লান্ত, অপ্রসন্ন কণ্ঠে বলল,
‘ আমি তো নাহিদের বাসা চিনি না ফুপি।’
‘ সৌধকে বললেই ও চিনিয়ে দিবে। আমি সৌধকে বলে দিচ্ছি তোকে চিনিয়ে দিতে। একটুখানি যা মা। একটু দেখে আয় ছেলেটার জ্বর ছাড়ল কি-না।’
ফুপির নাটকীয় কথাবার্তায় বিরক্ততে পিত্তি জ্বলে গেল মৌনির। দামড়া একটা ছেলে, সামান্য জ্বর হয়েছে কী হয়নি তার জন্য মৌনিকে তার জীবন দিয়ে দিতে হবে। বাহ! দারুণ! চমৎকার! এই ভর দুপুরে একা একটা মেয়ে কী করে ব্যাচেলর ছেলের বাসায় গিয়ে তার ছেলের জ্বর দেখে আসতে পারে, বিষয়টা মেয়েটির জন্য সেইফ হবে কি-না এসব কথা একবারও উনার মাথায় উদয় হলো না৷ মৌনি মনে মনে ভয়ংকর বিরক্ত হলো৷ বিরক্তি নিয়েই সে আবার সৌধকে নক করল। মৌনির জীবনে প্যারার অভাব নেই৷ এই ছেলে হলো আরেকটা প্যারা৷
—————
ছাদ সংলগ্ন ঘরের বিছানায় জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে নাহিদ। গায়ে দুটো কম্বল চাপানো। তারপরও আশ্চর্য শীতে কাঁপছে তার শরীর। কপাল আর চোখ দুটোতে যেন আগুন জ্বলছে। চেতন-অচেতনের মধ্যে অদ্ভুত তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব। এই তন্দ্রা তন্দ্রা চোখে মাথার কাছে স্পষ্ট বাবুনকে বসে থাকতে দেখল নাহিদ। তার ছোট্ট, শান্ত মুখখানিতে রাজ্যের গাম্ভীর্য। নাহিদ বাবুনের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল। খুশালু কণ্ঠে শুধাল,
‘ কী খবর? আবার এসেছিস তুই? সেদিন না বললি আর কোনোদিন আসবি না?’
বাবুনের গম্ভীর মুখে এবার নামল গাঢ় বেদনার ছায়া। অভিমানী কণ্ঠে বলল,
‘ তোমাকে দেখতে এসেছি। মা বলেছে, কারো জ্বর হলে দেখতে যেতে হয়।’
নাহিদ হাসল,
‘ তোর সব কথা তোর মা বলে দেয়?’
বাবুন উত্তর দিল না৷ নাহিদ শুধাল,
‘ আর কী বলে তোর মা?’
বাবুন এবারও উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শুধাল,
‘ তোমার কী খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা?’
‘ না। খুব কষ্ট হচ্ছে না। একটু একটু হচ্ছে।’
বাবুন বিশ্বাস করল না। মুখ ভার করে বলল,
‘ মিথ্যে কথা। আমি জানি তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তোমার পাশে তো মা নেই। আমার যখন জ্বর হয় তখন মা আমার মাথার কাছে বসে থাকে। কপালে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। মা হাত বুলিয়ে দিলে আর কষ্ট হয় না।’
নাহিদ হাসল,
‘ তোর আবার জ্বরও হয় নাকি?’
বাবুন মাথা নাড়ল। নাহিদের মুখের উপর ঝুঁকে নাহিদকে দেখল। বলল,
‘ তোমার তো খুব জ্বর! তুমিও তোমার মাকে ডাকো। আমার মা আছে। তোমার মা নেই কেন? তোমার মাকে বলোনি, জ্বর হলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে হয়। মাথার কাছে বসে থাকতে হয়।’
নাহিদ হেসে বলল,
‘ বলেছিলাম। মা সম্ভবত ভুলে গিয়েছে।’
বাবুন নিজের শার্টের বোতামের সঙ্গে খেলা করতে করতে বলল,
‘ আমার মা কক্ষনও ভুলে যায় না।’
‘ তোর মা তো গুড গার্ল।’
বাবুন খুশি হলো। নাহিদ বলল,
‘ তোর মা শুধু তোর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়? এইযে আমার এতো জ্বর আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে না?’
বাবুন গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল। নাহিদ শুধাল,
‘ কেন?’
‘ আমি মাকে ভালোবাসি। তুমি তো ভালোবাসো না।’
নাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জ্বরের উত্তাপে জ্বালা করছে তার সমস্ত দেহ। সবথেকে জ্বলছে দুটো চোখ। নাহিদ চোখ বোজে বিড়বিড় করে বলল,
‘ তোর মাকে একটু আমার পাশে এসে বসতে বল বাবুন। একটু হাত বুলিয়ে দিতে বল মাথায়। এই অসহ্য যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছে না।’
বাবুন কোনো উত্তর দিলো না। হঠাৎ করেই ঘরের ভেতর নেমে এলো আশ্চর্য নীরবতা। নাহিদ চোখ খুল তাকাতে পারছে না যন্ত্রণায়। এই বিশ্রী নীরবতাও কেমন অসহ্য ঠেকছে। নাহিদ অতিষ্ঠ হয়ে ডাকল,
‘ বাবুন! বাবুন!’
বাবুন জবাব দিল না। অনেকক্ষণ পর কোথা থেকে ভেসে এলো বাবুনের সতর্ক কণ্ঠস্বর,
‘ কেউ আসছে বাবা।’
‘ কেউ আসছে! কে আসছে?’
বাবুন উত্তর দিল না। নাহিদ আবারও কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই একটা শীতল হাত এসে স্থির হলো তার কপালে। হাজার বছরের তৃষ্ণার পর এক গণ্ডূষ জল পাওয়ার মতো আরাম বোধ করল নাহিদ। অনুভব করল ঘরের ভেতরটা ভরে যাচ্ছে সুতীব্র নারীসুলভ সুগন্ধে। সেই সুগন্ধি কিছুক্ষণ মায়ের মতো উষ্ণতা নিয়ে নিশ্চুপ বসে রইল নাহিদের মাথার কাছে। তারপর চঞ্চল পায়ে ঘুরে বেড়াল সারা ঘরজুড়ে। নাহিদের কপালে, চোখে, গলায় জলসেক দিল অনেকক্ষণ ধরে। তারপর কোথায় যেন হারিয়ে যেতে চাইল নাহিদকে একলা ফেলে। নাহিদ তৎক্ষনাৎ তার হাত চেপে ধরল। অস্থির কণ্ঠে বলল,
' প্লিজ! প্লিজ যেও না।'
·
·
·
চলবে……………………………………………………