আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ৪৩ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

আজ ওদের মন ভালো নেই
          ঈশান কোণে মেঘ জমেছে। দিনের প্রথম ভাগের শুটিং শেষ। ধূসর মেঘের ছায়ায় বিষণ্ণ হয়ে আছে গোধূলি। মিথির পুরো শুটিং ক্রু মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঝিলের ধারে। আসন্ন কালবৈশাখীর হাওয়ায় উড়ছে জামার আস্তিন। মাথার চুল। টেলিফিল্মের প্রধান চরিত্রে যে মেয়েটি? উড়ছে তার আটপৌরে, কোমল শাড়ির আঁচল। বাঙালিয়ানা হাতে নকল কেশ সামলাতে সামলাতে ইউনিটের বাকিদের সঙ্গে সে-ও বারবার চোখ তুলে তাকাচ্ছে আকাশের দিকে। প্রত্যেকের চোখে প্রতীক্ষা। সকাল থেকে আকাশ কালো করে মেঘ জমেছে অথচ বৃষ্টির দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। ক্যামেরা-লাইট- ক্রেন সব তৈরি। এবার কেবল বর্ষা নামার পালা।  

সেদিন এই নাট্যদৃশ্যটুকু ক্যামেরা বন্দী করবার আগেই থেমে গিয়েছিল আষাঢ়িয়া কান্না। কৃত্রিম বৃষ্টির সৌন্দর্য বড় যান্ত্রিক বলেই টেলিফিল্মের এই দৃশ্যটুকু ক্যামেরা বন্দী করতে সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে মিথিকে। এ পর্যন্ত গল্পের প্রতিটি চরিত্র, দৃশ্য ক্যামেরায় তুলে এনেছে সে বড়ো দরদী হাতে। অমানুষিক পরিশ্রম করেছে। খরচার চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম করেছে। তবু জীবনের প্রথম টেলিফিল্মটা তৈরি করতে চায় সে নিখুঁত করে। টেলিভিশনের পর্দায় চরিত্রদের দেখতে দেখতে দর্শকরা যেন আচমকাই খুঁজে পায় নিজেকে। মস্ত একটা গার্ডেন ছাতার নিচে বসে উদ্বিগ্ন মুখে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল মিথি। কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে আকাশের দিকে তাকাল বার দুয়েক। এমন সময় কোথা থেকে ছুটে আসে হৃদয়। তটস্থ কন্ঠে বলে,

' সকাল থেকে অপেক্ষা করছি আপু। কিন্তু বৃষ্টির তো কোনো লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে না। শুধু হাওয়া দিচ্ছে; ঝড়-টড় হবে বলে তো মনে হয় না। নায়িকা খুব ঝামেলা করছে। তার নাকি আজকে আরেক জায়গায় শিডিউল আছে। আর বেশিক্ষণ সময় দিতে পারবে না। আপু, তাহলে কী কৃত্রিম বৃষ্টির ব্যবস্থা করব? নাকি আজকেও প্যাকআপ করা হবে?’ 

মিথি বিরক্ত চোখে তাকাল। হৃদয় মাথা নুইয়ে মুখ ভার করে তার বক্তব্য শেষ করল,

‘ সাফাত স্যারও বোধহয় বেশিক্ষণ থাকতে পারবে না আপু। তার এসিস্ট্যান্ট কখন থেকে গজগজ করছে।’ 

মিথি উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। আজকে শট নিতে না পারলে সাফাত আর রিদিমার পরের শিডিউল পেতে পেতে নাটকের কাজটা আরও কতটা পিছিয়ে যাবে মনে মনে তার ছক কষে। তারপর গম্ভীর স্বরে বলে,

‘ আর এক ঘন্টা অপেক্ষা করব আমরা। এক ঘন্টার মধ্যে বৃষ্টি না নামলে প্যাকআপ।’ 

হৃদয় মাথা নেড়ে সরে যায় মিথির সামনে থেকে। কিছুক্ষণ পরই চারদিক সচকিত করে সারা অঙ্গে কিশোরী উচ্ছ্বাস নিয়ে ধরণীতে নেমে আসে বৃষ্টি কন্যারা। শুটিং ইউনিটের সকলের মধ্যে এবার ছুটোছুটি পড়ে যায়। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার আগেই শট নেওয়া শেষ করতে হবে। যেকোনো সময় থেমে যাবে বৃষ্টি; অভিমানী বৃষ্টিকে ভরসা করার উপায় নেই। 

সাত দিনের অপেক্ষাকে মধুর করে শটগুলো খুব মনঃ পুত হলো মিথির। শুটিং ক্রুকে সব গুছিয়ে ফেলতে বলে সে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে ছিল দূরে। সাফাত তখন ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিজের গাড়িতে উঠতে গিয়েও দূরে মিথিকে আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ক্ষনকালের জন্য থামল। এই মেয়েটা বড় আশ্চর্য! এই অল্প বয়সে কাজের প্রতি তার আত্মোৎসর্গ, বুদ্ধিমত্তা ক্ষণে ক্ষণে বিমোহিত করে তাকে। তার এই একত্রিশ বছরের জীবনে রূপবতী মেয়ে সে অজস্র দেখেছে। কিন্তু রূপকে ছাপিয়ে গিয়ে মেয়েদের আরও একটা রূপ যে সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করে উঠতে পারে। আরাধ্য হয়ে উঠতে পারে, সে কথা কখনও ভেবে দেখেনি সাফাত। নারীর স্বাতন্ত্র্য, সৃষ্টিশীলতা সম্পর্কে সবসময় মুক্তমনা থাকলেও কোথাও না কোথাও সাফাতের বিশ্বাস ছিল নারীর আসল হাতিয়ার তার সৌন্দর্য। কিন্তু মিথি যেদিন ওই ল্যাপটানো কাজলের শোভা আর শাড়ির মাধুরীকে ছাপিয়ে গিয়েও অন্যন্যা হয়ে ধরা দিল তার চোখে। সেদিন সাফাত বুঝল, নারীর ভেতরও নারী হয়। একটা ছাইচাপা আগুন কোমল নারীসত্তাকে ছাপিয়ে গিয়ে এনে দিতে পারে দেবীরূপ। সাফাত গাড়ির দরজা বন্ধ করে এগিয়ে যায় মিথির দিকে। কনে দেখা আলোয় মিথির উদাসীন চেহারাখানা যেন বিখ্যাত কোনো চিত্রকরের আঁকা চমৎকার কোনো স্থিরচিত্র। 

‘ এতো কী ভাবছেন?’ 

মিথি ফিরে তাকায়। সাফাতকে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিষ্টি করে হেসে ছদ্ম বিস্ময় নিয়ে বলে,

‘ আপনি এখনও এখানে! আমি ভেবেছিলাম, ফিরে গিয়েছেন।’ 

‘ এইতো যাব। আপনি নিশ্চয় বাড়ি ফিরবেন? চলুন পৌঁছে দেই।’ 

মিথি আদবের সঙ্গে প্রস্তাবটা ফিরিয়ে দেয়। হেসে বলে, 

‘ থেংকিউ। কিন্তু আপনাকে শুধু শুধু ঝামেলায় পড়তে হবে না। আমি বাস ধরে চলে যাব।’ 

সাফাত মিথির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। অনিন্দ্য সুন্দরী সে নয়। পরিশ্রম, ক্লান্তির রেখা চোখের কোণে। তারপরও আশ্চর্য এক ব্যক্তিত্বের আলোয় উদ্ভাসিত তার মুখ। তার বুদ্ধিদীপ্ত কথা, ধৈর্য, সংযম চৌম্বকের মতো আকর্ষণ করে রাখতে চায়। সাফাত ফিচেল কণ্ঠে উত্তর দেয়,

‘ আহা, চলুন না। ধানমন্ডি থেকে কলাবাগান তো খুব একটা দূরে নয়। আমার কোনো ঝামেলা হবে না। তাছাড়া নবোদিত ডিরেক্টরকে তুষ্ট রাখা আমার ক্যারিয়ারের জন্যও জরুরি। আপনি স্বীকার না করলেও, আমি তো বুঝতে পারছি কী দূর্দান্ত কাজ হচ্ছে! এই টেলিফিল্মটা মুক্তি পেলে মিডিয়া পাড়ায় একটা ঝড় উঠে যাবে মিথি। আপনাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। তখন যদি আমার মতো ছোটখাটো আর্টিস্টকে আর পাত্তা না দেন। তাই এখন থেকেই একটু পটিয়ে রাখার চেষ্টা।’ 

সাফাতের কথায় হাসে মিথি। এই টেলিফিল্মের আশু সফলতার কথা সেও ভেবেছে। সাফাতের মতো শৈল্পিক গুণের দিক থেকে ভাববার আগে ভেবেছে ব্যবসায়ী বুদ্ধি দিয়ে। টেলিফিল্মের গল্পটা চমৎকার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের পরিচিত মুখ মৌনির থেকে একটা লাভজনক দর্শক সে পাবে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সাফাতের যে ক্রেজ! শুধুমাত্র সাফাত অভিনয় করছে বলেই টেলিফিল্ম দেখবে অনেক দর্শক। তাছাড়া রিদিমাও বেশ শক্তিশালী অভিনেত্রী। এসব ব্যতিরেকে শিল্পগুণের ক্ষেত্রেও কোনো কসুর রাখেনি মিথি। প্রতিটি ছোট থেকে ছোট ডিটেইলে মনোযোগ দিয়েছে সে। গল্পে কোনো প্লটহোল নেই। শুধু জনপ্রিয়তার জন্য নয়, একটি সাধারণ পুরুষের ভেতর থেকে একটি অসাধারণ পুরুষ সত্তাকে টেনে বের করে আনার ক্ষমতা সাফাতের আছে বলেই এই চরিত্রটির জন্য তাকে কাস্ট করেছে মিথি। প্রতিটি চরিত্র যার যার জায়গায় তৃপ্ত, বাস্তব। একবার কেউ দেখতে বসলে মুগ্ধ না হয়ে ফেরা কিঞ্চিৎ অসম্ভব। মৌনি, সাফাত, রিদিমার ভক্ত হয়ে নাটক দেখতে বসলেও নাটক শেষে পরিচালকের কাজে মুগ্ধ করে নিজের প্রতি আগ্রহ ঘুরিয়ে নেবার মতো ক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস মিথির আছে। মিথি ঠোঁটে হাসি ধরে রেখেই উত্তর দেয়,

‘ টেলিফিল্মটা সফল হলে আপনাদের জন্যই হবে। কী চমৎকার অভিনয় করেছেন! সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত উপহার বোধহয় একেই বলে। কনগ্রাচুলেশস্ ভাইয়া।’ 

সাফাত হাসে। গাড়ির দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

‘ তো, আমি ধরে নিচ্ছি আপনি আমার সঙ্গে যাচ্ছেন। প্লিজ?’ 

সাফাতের সঙ্গে যাবার কোনো আগ্রহ মিথির নেই। এইসব ল্যামলাইটে থাকা ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে স্বাভাবিক দূরত্ব বজায় রাখতেই তার ভালো লাগে। কিন্তু সাফাতের এতো উৎসাহের সামনে বারবার প্রত্যাখ্যান করাও মুশকিল। সে অনাগ্রহের সঙ্গে রাজি হয়। ইউনিটের সকল সারঞ্জাম গোছানো হয়েছে কি-না ; সারাদিনের কাজের পূঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব তাকে মেইল করে দিতে বলে সাফাতের সঙ্গে গাড়িতে উঠে বসে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে বেরিয়ে সেক্রেটারিয়েট রোডে আসতেই অকস্মাৎ তার মনে পড়ে যায় সাব্বিরের কথা। সামনেই বাংলা একাডেমি। মিথির বাবার অফিস। সেদিন রাতে বাবাকে নিয়ে কথা বলছিল সাব্বির। মিথি নিশ্চিত, মিথির বাবার আড়ালে নিজের বাবার কথাই সে জানাচ্ছিল তাকে। কিন্তু মিথি যখন জিজ্ঞাসা করল তখন এড়িয়ে গেল গোটা আলোচনা। সাব্বিরের এই শিশুসুলভ লুকোচুরিতে যদিও মিথি বিরক্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তারপরও স্বামীর ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো কঠিন কথা বলবার আগ্রহ হয়নি। মিথির মাঝে মাঝে মনে হয়, সে বোধহয় সাব্বিরের প্রতিও আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে দিন দিন। এতো কাজের চাপ মাথায় নিয়ে এমন জটিল একটা সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার মতো কৌতুকী সে নয়। কী দরকার এতো জোরজবরদস্তি করে একটা সংসার টিকিয়ে রাখার? ভালোবাসা আছে, থাকুক। ভালোবাসলেই যে একসঙ্গে থাকতে হবে এই রকম কোনো ব্যাপার তো নেই। আর সাব্বির নিজেও যখন চায় না তখন…

‘ গাড়িটা থামান তো ড্রাইভার সাহেব।’ 

কাজী নজরুল ইসলাম এভেনিউয়ের দিকে গাড়ি এগুতেই অন্যমনস্ক কণ্ঠে আদেশ করল মিথি। হাতের ইশারায় গাড়ি থামাতে বলে অবাক হয়ে মিথির মুখের দিকে তাকায় সাফাত। কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে শুধায়,

‘ কোনো সমস্যা মিথি? গাড়ি থামাতে বললেন যে?’ 

মিথি কেন গাড়ি থামাতে বলেছে, এক মুহূর্তের জন্য নিজেও ঠিক করে সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠতে পারে না। সাব্বিরের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, সাব্বিরকে তার মতো ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেও সেই সাব্বিরের কথাই কানে বাজছে,

 ‘আপনার বাবা যদি একজন ভালো মানুষ হয়ে থাকেন তাহলে আপনি তাকে একজন বাবা হিসেবে নয় একজন মানুষ হিসেবে একদিন জড়িয়ে ধরবেন, মিথি।’, ‘আপনি একজন মানুষের সন্তান। সবার এই স্বস্তিটুকু থাকে না।’ 

সেই বিষণ্ণ দরাজ কণ্ঠ এড়িয়ে যেতে পারে না মিথি। দু'ভুরুর মধ্য ভাঁজ ফেলে কয়েক পল চিন্তা করে। কী মনে করে বলে,

‘ বাংলা একাডেমিতে আমার কিছু ব্যক্তিগত কাজ আছে। শুটিংয়ের ব্যস্ততায় ভুলে বসেছিলাম। আমি এখানেই নেমে যাব। এতটুকু এগিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ ভাইয়া।’ 

বাংলা একাডেমিতে মিথির কী কাজ জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে হলেও নিজের কৌতূহল দমন করল সাফাত। মিথির ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলবার মতো অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তার সঙ্গে সাফাতের নেই। সপ্রতিভ হেসে মিথিকে বিদায় দিয়ে বলল,

‘ বেশ! যান তবে। নেক্সট শিডিউলে দেখা হবে।’ 

মিথি মৃদু হেসে সাফাতকে বিদায় দিয়ে অপ্রস্তুত মুখে দাঁড়িয়ে রইল রাস্তার ধারে। ঝোঁকের মাথায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে এখন নিজের কাছেই কেমন বিব্রত লাগছে। ভেতরে যাবে কি যাবে না। গেলেও কী বলবে, বাবা অফিসে আছেন কি-না নানান প্রশ্ন জাগতে লাগল মনে। বেশ কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সিদ্ধান্ত নিলো, যাবে না৷ এসব কৈশোরকালীন নাটক করার বয়স আর তার নেই। অযথা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।  

—————

ঘরের টেম্পারেচার কমিয়ে ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে শাওন। মা দুইবার ডেকে গেছেন নাস্তার জন্য। শাওন বালিশ থেকে মুখ তুলে একবার ঘড়ি দেখল, নাস্তার সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গিয়েছে। এখন মধ্যাহ্নভোজের সময়। পেটের ভেতর নারকীয় ক্ষুধা জাগ্রত হওয়ায় তাকে উঠে বসতে হলো। অভ্যাসবশত ফোনটা হাতে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে মৌনিকে ম্যাসেজ পাঠাতে গিয়েও হঠাৎ থমকাল। কোথাও যেন একটা অস্বস্তির কাঁটা বিঁধে আছে। সেই কাঁটাকে উপরে ফেলে ম্যাসেজ পাঠানোর সাহস হলো না শাওনের। হোয়াটসঅ্যাপ থেকে বেরিয়ে এসে কল লগে গিয়ে দেখল, সৌমির কয়েকটা মিসড কল। শাওন দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে কল ব্যাক করল। সৌমি ফোন তুলল সেকেন্ডের ব্যবধানে,

‘ কোথায় ছিলে তুমি? ফোন তুলোনি কেন?’ 

শাওন দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলে,

‘ ঘুমোচ্ছিলাম।’ 

‘ ঘুমাচ্ছিলে! দুপুর আড়াউটা বাজে। আড়াইটা পর্যন্ত তুমি ঘুমাচ্ছ! রাতে কী করেছ? আমাকে তো এগারোটাতেই শুভ রাত্রি জানিয়ে দিয়েছিলে।’ 

শাওন বিরক্ত হয়। কড়া কিছু কথা বলতে নিয়েও শান্ত কণ্ঠে বলে,

‘ গেইম খেলছিলাম।’ 

‘ তোমার কাছে আমার থেকে গেইম বেশি গুরুত্বপূর্ণ শাওন? ট্রেনিংয়ের গোটা সময়টাতে একটাবারের জন্যও আমাকে কল করোনি তুমি। কিন্তু বাড়িতে আন্টির কাছে তো ঠিকই কল করেছ।’ 

ঝাঁজ নিয়ে কথা শুরু হলেও ধীরে ধীরে মলিন হয়ে আসে সৌমির কণ্ঠ। শাওন তিক্ত কণ্ঠে বলে,

‘ তুমি তো মা নও। তুমি মা হলে তোমাকেও কল করতাম।’ 

‘ তুমি এভাবে কথা বলছ কেন শাওন?’ 

‘ কীভাবে কথা বলছি? ট্রেনিং-এ নিশ্চয় ফোনে কথা বলার জন্য আমাকে অজস্র সময় দেওয়া হতো না। আর যতটুকু সময় পেতাম আম্মুর সঙ্গে কথা বলতে হতো। আমি ছাড়া আম্মুর আর কে আছে? আমাকে ছেড়ে এর আগে কখনও দূরে থাকেনি আম্মু। এই সিম্পল ব্যাপারটা তোমার বুঝা উচিত৷’ 

সৌমি রাগ করে বলে,

‘ তাই বলে একটা দিন, একটা মিনিটের জন্যও আমার কথা মনে পড়েনি তোমার?’ 

শাওন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সত্যিই মনে পড়েনি তার সৌমির কথা। সেখানে তার সমস্তটা জুড়ে ছিল মৌনি। এর আগে মৌনির সঙ্গে স্বইচ্ছায় এক-দুই মাসের জন্য যোগাযোগ বন্ধ করলেও এমন বাধ্য হয়ে দূরত্ব বাড়াতে হয়নি কখনও। কথা না বললেও মনে হয়েছে, মৌনি আশেপাশেই আছে। শাওন চাইলেই মৌনির সঙ্গে কথা বলতে পারে। আর সারাদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় মৌনির আপডেট, হৈ-চৈ এ ইনবক্সের দূরত্বটুকু কখনও সেভাবে অনুভবই হয়নি। কিন্তু ট্রেনিং একাডেমিতে গিয়ে এই প্রথমবারের মতো মৌনি সম্পর্কিত সমস্ত কিছু থেকে দূরে গিয়ে হাসফাস লাগছিল শাওনের। সর্বক্ষণ মাথার মধ্যে মৌনির কথাই ঘুরছিল। সারা শরীরব্যাপী অদ্ভুত এক যন্ত্রণায় পাগল পাগল লাগতো। ওই দমবন্ধকর সময়ের কথা মনে পড়লে এখনও বুক কাঁপে শাওনের। ওখানে থেকেই সে বুঝেছে, মৌনিকে ছাড়া সে মরে যাবে। তার বেঁচে থাকার জন্য শুধু মৌনিকেই দরকার। আর কিছুর প্রয়োজন নেই৷ তখন, ওই সময়ে দাঁড়িয়ে সৌমি যে কোনো ইস্যু হতে পারে সে কথা মনেই হয়নি শাওনের। শাওনকে চুপ থাকতে দেখে জ্বলে উঠে সৌমি,

‘ কী হলো? কথা বলছ না কেন?’ 

শাওন ক্লান্ত কণ্ঠে জবাব দেয়,

‘ কী বলব?’ 

‘ ওখানে একবারও তোমার আমার কথা মনে পড়েনি শাওন?’

শাওন প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে জবাব দেয়,

‘ আমি তখন খুব ডিপ্রেশড ছিলাম সৌমি। কতটা ডিপ্রেশড থাকলে আমি সেখান থেকে চলে আসতে পারি, তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছ?’ 

সৌমি এবার নরম হয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

‘ তখন নাহয় ডিপ্রেশড ছিলে এখন তো আমাকে একটু সময় দিতে পারো।’ 

শাওনকে অধৈর্য শোনায়,

‘ সময় তো দিচ্ছিই। আর কীভাবে সময় দিতে বলো তুমি সৌমি?’ 

‘ এটাকে সময় দেওয়া বলে শাওন? আমার সঙ্গে কথা বলার, দেখা করার কোনো আগ্রহই তোমার মধ্যে দেখি না। আমি বললে তারপর তুমি দেখা করতে আসো। নিজে থেকে তোমার মধ্যে কোনো উৎসাহই নেই।’

শাওন এবার কঠিন হয়। শীতল কণ্ঠে বলে,

‘ সৌমি শুনো, তুমি এখন কচি খুকি নও। আর আমিও বাচ্চা ছেলেটি নেই। তাই নিব্বা-নিব্বিদের মতো প্রেম দয়া করে আমার থেকে এক্সপেক্ট করবে না। তাছাড়া, আমি এই মুহূর্তে খুবই ডিপ্রেশড সময় কাটাচ্ছি। অতো প্রেম আমার মধ্যে আগেও ছিল না। এখন যে আরও থাকবে না এটাই স্বাভাবিক।’ 

প্রত্যুত্তরে ফুঁসে উঠে সৌমি,

‘ ডিপ্রেশন! সবসময় শুধু তোমার ডিপ্রেশন! তোমার সমস্যা! তোমার ধারণা, আমি খুব আনন্দে আছি? বাসা থেকে বিয়ের চাপ দিচ্ছে। অথচ ক্যারিয়ারের প্রতি তোমার কোনো সিরিয়াসনেসই নেই। তোমার কোনো ধারণা আছে, আমার দিন কেমন কাটছে? কত কষ্ট করে সামলাতে হচ্ছে সব?’ 

শাওন ক্লান্ত কণ্ঠে বলে,

‘ওহ সৌমি, প্লিজ! নাটক করো না। তুমি তেমন কোনো ফ্যামিলি থেকে বিলং করো না যারা তোমাকে এখনই বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগবে। তোমার হাতে যথেষ্ট সময় আছে। শুধু শুধু আমাকে প্রেশার দেওয়ার চেষ্টা করবে না।’ 

সৌমি ক্রোধে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে এবার। প্রায় চিৎকার করে বলে,

‘ আমি নাটক করছি! তোমার মনে হচ্ছে আমি নাটক করছি তাই না? তুমি কেন সবাইকে নিজের মতো মনে করো শাওন? আমার বাবার এক বন্ধুর ছেলে সদ্য এমবিবিএস পাশ করে দেশের বাইরে যাচ্ছেন। বাবা তার সঙ্গে আমার বিয়ের জন্য খুব শক্ত অবস্থানে আছেন। তারা চাইছেন এখন বিয়ে হয়ে থাকুক। আমার বিডিএস শেষ হলে আমিও চলে যাব সেখানে। আমি এখানে একা পুরো পরিবারের সঙ্গে যুদ্ধ করছি। তারা তো আর জানে না, যুদ্ধ নয় আমি আসলে তোমার মতো একটা লাইফলেসের জন্য অপেক্ষা করছি।’  

শাওন হেসে ফেলে। কৌতুকী কণ্ঠে বলে,

‘ কেন অপেক্ষা করছ? লাইফলেস ভালো না লাগলে এভারগ্রীন ধরো। বিলেতি ডাক্তার সাহেবকে বিয়ে করে ফেলো। আমি তো তোমাকে ধরে রাখিনি সৌমি।’

এই পর্যায়ে রণচণ্ডী রূপ নেয় সৌমি। এমনিতে রূপবতী, মিষ্টিভাষী হলেও রেগে গেলে মুখের আগল খুলে যায় তার। নানান কটুকথা, অকথ্য গালিগালাজে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি সে করে সেটা আর যাই হোক দৃষ্টিনন্দন অবস্থায় থাকে না। শাওন যে তাকে খুব ছাড় দেয় বিষয়টা সেরকমও নয়। কিন্তু আজ চুপ করে রইল। চুপচাপ সৌমির অকথ্য গালিগালাজ শুনল। রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে সৌমি বলল,

‘ তোর সঙ্গে সম্পর্কে যাওয়াটা আমার জীবনের সবথেকে বড় ভুল ছিল। কী মনে করিস তুই নিজেকে? তোকে দুই টাকার দাম দেই আমি? সেই যোগ্যতা আছে তোর? আমি কালকেই বিয়ের পিঁড়িতে বসব। তোর চোখের সামনে দিয়ে বর নিয়ে ঘুরব। তখন তুই বুঝবি সৌমি কী জিনিস!’ 

শাওনের কোনো ভাবাবেশ হলো না। ঠোঁট নাড়িয়ে,

‘ ফাক অফ।’ 

শব্দদুটো সৌমির উদ্দেশ্যে ছু্ড়ে দিয়েই কল কেটে ফোনটা ছুড়ে ফেলল বিছানায়। কিছুক্ষণ বিছানায় স্থির মূর্তির মতো বসে থেকে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে উঠে গেল খাবারের খোঁজে। খাবার টেবিলে এসে মাকে ডাকতেই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। টেবিলে ঢাকা দিয়ে রাখা খাবার শাওনের প্লেটে তুলে দিয়ে সাবধানে বললেন, 

‘ তুই ট্রেনিংয়ে থাকতে সৌমি নামের একটা মেয়ে ফোন করেছিল আমাকে। ও আমাকে বলেছে, তোরা ভালো বন্ধু।’ 

কথাটা বলে একনজর ছেলের দিকে তাকিয়ে তার মনোভাব বুঝার চেষ্টা করলেন শাওনের মা। আগে তিনি যদিও মনে করতেন মৌনিকেই পছন্দ তার ছেলের। সব জায়গা থেকে তো এরকম কানাঘুষাই শুনে আসছেন এতোবছর ধরে। কিন্তু সেদিন মেয়েটি ফোন করার পর ভাই-বোনদের শলাপরামর্শে তারও মনে হয় এই মেয়েটির জন্যই ট্রেনিং ছেড়ে এসেছে শাওন। এই মেয়ের ভীতিটা কাটাতে পারলে হয়তো ছেলে আবারও ফিরবে। সময় তো এখনও হাতে আছে। তাছাড়া, মেয়েটিও খারাপ না। শুনেছেন, ডাক্তারি পড়ছে। যদিও দাঁতের ডাক্তার। তা হোক, ছেলের যে মৌনির প্রতি মোহভঙ্গ ঘটেছে এই সংবাদেই তিনি খুশি। বোন-জি হিসেবে স্নেহ করলেও ছেলের বউ হিসেবে মৌনিকে একেবারেই পছন্দ ছিল না তার। আহ্লাদী, উশৃঙ্খল মেয়ে। দুপুর বারোটা পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমায়। তিনি ছেলেকে খুশি করতে বললেন,

‘ মেয়েটা খুব মিষ্টি। এতো মিশুক! আমার খুব ভালো লেগেছে।’ 

শাওন শীতল চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখে বুঝা না গেলেও মেজাজটা তার ধীরে ধীরে চটে যাচ্ছে। কোথা থেকে কী হচ্ছে, কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। সৌমি তাকে না জানিয়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলেছে। তারমানে দুনিয়ার সকলেই ইতোমধ্যে জেনে গিয়েছে সৌমির কথা। অথচ, সৌমিকে বিয়ে করার মতো চিন্তা শাওনের আদৌ ছিল কি-না সে বিষয়ে নিজেও সন্দিহান সে। শাওনকে এভাবে স্থবির হয়ে বসে থাকতে দেখে একটু ভীত হলেন মা। মনে হলো, এইতো সেদিনই দু’বছরের ছোট্ট পুতুলের মতো ছেলেটাকে রেখে মারা গেল তার বাবা। তারপর ধীরে ধীরে কত সময় পেরিয়ে গেল। যে ছেলে মাকে দুই মিনিট চোখে না দেখতে পেলেই কেঁদেকেটে অস্থির হয়ে যেতো সেই ছেলে এখন কত বড় হয়ে গিয়েছে! তার শীতল চাহনি দেখে মায়ের বুকেও খেলে যায় ভয়। মা খাবার দিয়ে ছেলের সামনে থেকে সরে গেলেন। শাওন আগের মতোই স্থির বসে রইল। তারপর শান্ত মুখেই আচমকা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল সামনে থাকা কাঁচের গ্লাস। লাথি মেরে ফেলে দিল চেয়ার। অবশিষ্ট খাবার ফেলে রেখে উঠে গেল ঘরে। আবার কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে নির্লিপ্ত মুখে ছেড়ে যাওয়া প্লেটটা টেনে নিল নিজের কাছে। মা ছেলের এই মেজাজের কারণ ধরতে পারলেন না। হঠাৎ করে কী হলো তার ওমন লক্ষ্মীমন্ত ছেলের? সেই জবাব কী ছেলের কাছে আছে? ছেলে নিজেও কী তা বুঝতে পারছে? 

খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে ফিরে দুই হাতে মুখ ঢেকে মূর্তির মতো বসে রইল শাওন। বুকের ভেতর গাঢ় একটা বিষণ্ণতা টের পেলেও গুছিয়ে কিছু ভাবতে পারছে না। কিছু ভাবতে ইচ্ছেও করছে না। তবে এতটুকু বুঝতে পারছে, কোনোকিছুর বিনিময়েই মৌনি আর তাকে কখনও ভালোবাসার কথা চিন্তা করবে না। মৌনি তাকে ভালোবাসবে না – এই চিন্তা বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি করছে। মৌনিকে বুঝাতে ইচ্ছে করছে, সে ভালো না বাসলেও শাওনের পৃথিবী থমকে যাবে না। শাওন ভালো থাকবে। সুখে থাকবে। কিন্তু আসলেই কী সুখে থাকবে শাওন? কেমন হতাশ, বিষণ্ণ দেখায় শাওনের মুখ। সেই বিষণ্ণ নীরবতা কাটিয়ে ক্রমাগত বাজতে থাকে শাওনের মুঠোফোন। একবার, দুইবার করে পাঁচবারের বেলায় বাধ্য হয়েই ফোন তুলে সে। সঙ্গে সঙ্গেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে সৌমির কণ্ঠস্বর। সৌমি কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসছে তার। শাওন শান্ত কণ্ঠে শুধায়,

‘ কাঁদছ কেন?’ 

 সৌমির কান্না বাড়ে। সে রুদ্ধ কণ্ঠে বলে,

‘ আই এ্যাম সরি শাওন। তুমি তো জানো, রেগে গেলে আমার মাথা ঠিক থাকে না। আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল, তুমি আমাকে আর ভালোবাসো না। আমি ব্যাপারটা একদম নিতে পারছিলাম না। তুমি তো জানো, আমি সবসময় তোমাকে নিয়ে কত ইনসিকিউরড ফিল করি। সেজন্য ওমন বাজেভাবে রিয়েক্ট করে ফেলেছি। আই এ্যাম সরি শাওন। প্লিজ, সরি!’  

শাওন কিছুক্ষণ নীরব থেকে কোমল কণ্ঠে বলে,

‘ ওকে, কান্না থামাও। ইট'স ওকে, সৌমি।’ 

সৌমি অবুঝের মতো বলে,

‘ তুমি রাগ করে আছো তাই না? তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে, শাওন?’ 

বলতে বলতে আবারও ফুঁপিয়ে উঠে সৌমি। শাওন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই অদ্ভুত মানসিক দ্বন্দ্বে সে ক্লান্ত। ম্লান কণ্ঠে উত্তর দেয়,

‘ দূর বোকা! কাঁদছ কেন? এইতো আমি। তোমাকে ছেড়ে আর কোথায় যাব?’ 

বলতে বলতে নিজের চোখদুটোও টলমল করে উঠে শাওনের। বুকের ভেতর হু হু করে উঠে শূন্যতা। মনে পড়ে মৌনির বিষণ্ণ মুখ। সেই মুখ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ঘন কুয়াশার আড়ালে। শাওন জড়িয়ে যাচ্ছে অদ্ভুত এক দ্বিধার জালে। এমন গভীর জালে, এতো গভীরভাবে কখনও জড়াতে চায়নি শাওন। শাওনের হাসফাস লাগে। কীভাবে বেরিয়ে আসবে সে এখান থেকে? ওপাশ থেকে ভেসে আসে সৌমির ভেজা কণ্ঠ,

‘ আমি তোমাকে ছাড়া মরে যাব, শাওন।’ 

শাওনের বাম চিবুকে নেমে আসে এক ফোঁটা গরম জল। কাঁদতে তো তারও ইচ্ছে হচ্ছে। অদ্ভুত নীল ব্যথায় বুকের ভেতরটা ফেঁটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। সৌমি কত সহজে কাঁদতে পারছে, হাউমাউ করে কেঁদেকেটে বলে চলেছে নিজের মনের একান্ত কথা কিন্তু সে তো পারে না৷ তার কান্নারা থম ধরে থাকে কালবৈশাখীর মেঘের মতো। শাওন ম্লান কণ্ঠে বলে,

‘ এভাবে বলতে নেই সোনা।’ 

আদরের ডাকে কান্নার বেগ কমে সৌমির। ফুঁপানো কণ্ঠে বলে,

‘ আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসি ঢাকায়?’ 

শাওন আনমনা হয়ে বলে,

‘ তোমার আসার দরকার নেই। আমি আসব।’ 

সৌমি খুশি হয়,

‘ সত্যি?’

শাওনের বুকে জমে থাকা কান্নারা জল টলটলে দিঘির মতো জমা হতে থাকে চোখের কোণে। উত্তর দেয়,

‘ হু।’ 

‘ আই লাভ ইউ, শাওন। আই লাভ ইউ।’ 

শাওনের চোখ থেকে নেমে আসে বাঁধ ভাঙা অশ্রু। এর আগে বহুবার এই কথাটা সে বলেছে সৌমিকে। কিন্তু আজ প্রথমবারের মতো তার মনে হলো, এই একটি বাক্য দিয়ে মৌনিকে সে ঠেলে দিচ্ছে নিজের থেকে অনেকদূরে। নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছে এমন এক জালে যেখান থেকে চাইলেও আর বেরুতে পারব না শাওন। কোনোদিন না। সে রুদ্ধ, কম্পিত কণ্ঠে বলল,

‘ লাভ ইউ টু, সৌমি।’ 

তারপর ঝরঝর করে ঝরতে লাগল তার চোখের জল। কার জন্য কাঁদছে শাওন? মৌনির জন্য? সৌমির জন্য? শাওন বুঝল, কারো জন্য নয়। এই প্রথম সে কাঁদছে নিজের জন্য। আহা, জীবন! এই জীবন তারপর আর কোথায় নিয়ে যাবে শাওনকে?

—————

খোলা জানালায় গোধূলির আলো। 
অফিসের সেক্রেটারিয়েট টেবিলের উপর ঝুঁকে বই পড়ছেন একজন প্রৌঢ়। বেলাল নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকে চায়ের কাপটা টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে বলল,

‘ আপনার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছেন, স্যার।’

প্রৌঢ়র চোখে পাওয়ারের চশমা। তিনি মুখ তুলে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে বেলালের দিকে তাকিয়ে রইলেন৷ বেলাল ধীর কণ্ঠে বাকি তথ্য দিল, 

‘ মিথিলাতুন্নেসা নামের এক ভদ্রমহিলা, স্যার।’ 

প্রৌঢ় চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিয়ে তখনও তাকিয়ে আছে বেলালের দিকে। এবার ভ্রু'জোড়া কিছু কুঁচকানো। কোনো ভদ্রমহিলা তার সঙ্গে কেন দেখা করতে আসবেন বিষয়টা ধরতে পারছেন না তিনি। শুধালেন,

‘ কী দরকার?’ 

বেলাল এবার কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। আমতা আমতা করে বলল,

‘ জ্বী স্যার, ভদ্রমহিলা বলছিলেন তিনি আপনার কন্যা।’ 

মাজহারুল ইসলাম অবাক হলেন। তার কন্যা! কয়েকসেকেন্ড বেলালের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকার পর তার মনে পড়ল, মিথির কথা। মিথি! তার কন্যা। কিন্তু, মেয়েটা একা একা এতোদূর তার অফিসে চলে এলো কী করে? তিনি বেলালকে শুধালেন,

‘ একা এসেছে?’ 

‘ জ্বী স্যার। একা।’ 

মাজহারুল সাহেবের কপালে উদ্বেগের ভাঁজ পড়ল। ছোট্ট একটা মেয়ে একলা এতোদূর চলে এলো কেউ খেয়াল করল না? তিনি বেলালকে দিয়ে মিথিকে ডেকে পাঠাতেই মনে প্রশ্ন জাগলো, কোন ক্লাসে পড়ে যেন মেয়েটা? প্রশ্নের উত্তর স্বয়ং এসে দাঁড়াল অফিস-রুমের দরজায়। মাজহারুল সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। একটা গোলাপি জলছাপের শাড়ি, চুলে বিনুনি আর কাঁধে একটা ঝুলানো ব্যাগ নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মিথির মা। কিন্তু বেলাল যে বলল, মিথি এসেছে! মিথির মা এগিয়ে এসে বলল,

‘ কেমন আছ, বাবা?’ 

মাজহারুল সাহেবের সম্বিত ফিরল। অবাক হয়ে তিনি মেয়েকে দেখলেন। মায়ের শাড়িতে কত বড় লাগছে তাকে। মেয়েকে বসতে বলে ব্যস্ত কণ্ঠে বললেন,

‘ আমি ভালো আছি, মা। বসো। তুমি কেমন আছ? তুমি দেখতে অনেকটা তোমার মায়ের মতো হয়েছ।’ 

মিথি হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে বসল। বাবার মুখে ছোটবেলা থেকে হাতেগুণা যতবার কথা হয়েছে তিনি প্রত্যেকবারই অবাক হয়ে বলেছেন, ‘ তুমি দেখতে অনেকটা তোমার মায়ের মতো হয়েছ।’ মাজহারুল সাহেব মিথিকে জিজ্ঞাসা করলেন,

‘ তুমি যেন কোন ক্লাসে পড়ো?’ 

মিথি হেসে ফেলে বলল,

‘ আমার পড়াশোনা অনেক আগেই শেষ বাবা। আমি এখন নাটক-সিনেমা পরিচালনার কাজ করি। এদিকে আমার একটা টেলিফিল্মের শুটিং চলছিল ভাবলাম তোমার সঙ্গে দেখা করে যাই।’ 

খুব অপ্রস্তুত কণ্ঠে কথাটা শেষ করল মিথি। বহুদিন পর কথা হওয়ায় বাবাকে সে আপনি নাকি তুমি সম্বোধন করতো মনে করতে পারছে না। সামনে বসে থাকা প্রৌঢ় লোকটিকে তুমি তুমি করতে বলতে কেমন অদ্ভুত লাগছে। মাজহারুল সাহেব বিস্ময় নিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে পড়ল, কিছুদিন আগে বাবা মিথির বিয়ের কথা বলেছিলেন তাকে। তারপর একদিন তিনি হাসপাতালে কাকে যেন দেখতে গেলেন। তিনি কিঞ্চিৎ বিভ্রান্ত হয়ে শুধালেন,

‘ তোমার স্বামী কেমন আছে?’ 

 মিথি মুখ তুলে তাকাল। এতোগুলো বছরে বাবা তাকে নতুন কোনো প্রশ্ন করেছে দেখে আশ্চর্য হলো। বলল,

‘ সে ভালো আছে বাবা।’ 

মাজহারুল সাহেব মাথা নাড়লেন। কিছুক্ষণ উদাসমুখে বসে থেকে বললেন,

‘ তুমি অনেকটা তোমার মায়ের মতো হয়েছ।’ 

মিথি অনেকদিন বাদে গাঢ় চোখে বাবার দিকে তাকাল। বাবা আনমনে জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন। গোধূলি আলো এসে পড়ছে তার মুখের একপাশে। ধূসর হয়ে আসা চুলগুলো মৃদু মৃদু কাঁপছে। সেদিকে তাকিয়ে থেকে মিথির মনে হলো, বাবার বয়স হয়ে গিয়েছে। মাতৃত্বের বয়স বলেই কি-না কে জানে জন্মদাতা পিতার মুখের দিকে তাকিয়ে জীবনের প্রথম মিথির মনে বাবার জন্য আশ্চর্য এক স্নেহ জমাট বাঁধা মেঘের মতো স্তব্ধ হয়ে রইল। ভাবল, সে-ও তো বাবার পাশে এসে দু'দন্ড বসতে চায়নি কোনোদিন। আদর পায়নি। আদর দিয়ে বাবার মাথায় একটু হাত বুলিয়েও তো দেয়নি। বাবার সারাটা জীবন কেটে গেল একা, নিঃসঙ্গ। এখন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন কমলা রঙের অপরাহ্ণে। তারপর একদিন হারিয়ে যাবেন রাতের আঁধারে। মিথির বাবা বলে কেউ থাকবে না আর। অন্যান্য সময় এই ভাবনা খুব সামান্য হলেও আত্মভোলা বাবার সামনে বসে এই কথা চিন্তা করে বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল মিথির। চোখে জল এলো৷ একটা হাত বাড়িয়ে সংকোচিত মনে বাবার হাতের উপর একটা হাত রেখে শুধাল,

‘ তুমি দুপুরে খেয়েছ, বাবা?’ 

মাজহারুল সাহেব মেয়ের প্রশ্নে অন্যমনস্ক চোখে তাকিয়ে রইলেন। দুপুরে তিনি খেয়েছেন কিনা মনে করতে পারছেন না। বাবার ভেঙে যাওয়া শরীর, অন্যমনস্ক দৃষ্টি দেখে কী নিদারুণ হাহাকারে দু'ফোঁটা অশ্রু গড়াল তার গালে। মেয়েকে মুখ নিচু করে কাঁদতে দেখে হতভম্ব হয়ে গেলেন মাজহারুল সাহেব। কী করবেন ভেবে না পেয়ে উঠে দাঁড়ালেন। মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে তার মাথায় হাত রেখে কোমল কণ্ঠে বললেন,

‘ কাঁদছ কেন মা? মায়ের কথা মনে পড়ছে?’ 

জীবনের প্রথম পাওয়া এই পিতৃস্নেহে মিথির হৃদয়ের কঠিন আগল খুলে গেল। একহাতে মুখ চেপে ধরে সে কেঁদে উঠল হুহু করে। মাজহারুল সাহেব ব্যথিত চোখে ক্রন্দনরত মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, 

‘ ছি! মা। কাঁদে না। মানুষ কী সারাজীবন থাকে?’ 

মিথির কান্না বাড়ল। আবেগের তাড়নায় একটু হেলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাবার গায়ে মাথা এলিয়ে দিল। বাবা গায়ে কেমন আপন আপন সৌরভ। মাজহারুল সাহেব কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন তারপরও ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিলেন মেয়ের চুলে। বিড়বিড় করে বললেন,

‘ কাঁদে না মা। ছি! কাঁদে না।’ 

কান্নায় ততক্ষণে কন্ঠরুদ্ধ হয়ে এসেছে মিথির। মিথি রুদ্ধ কণ্ঠে শুধাল, 

‘ তুমি দুপুরে খেয়েছ, বাবা?’ 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp