পশ্চিমাকাশে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ। চারদিকে নিশুতি রাতের প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা। পাশের কোনো বুনো ঝোপ থেকে একটানা ভেসে আসছে রাত পোকার ঝিম ধরা রব। সাব্বিরের বসার ঘরের আবহাওয়া থমথমে। হাওয়াও যেন টের পেয়েছে দুই নর-নারীর মানসিক টানাপোড়েনের কথা। সহসায় তারা হতবাক মূর্তির মতো থমকে গিয়েছে। ভারী, অস্বস্তিকর এই হাওয়াকে চঞ্চল করে দিয়ে প্রথম কথা বলল সাব্বির। মিথিকে খবরের কাগজের স্তুপের মধ্যে বসে থাকতে দেখে নিঁখুত বিস্ময় নিয়ে শুধাল,
‘ কী করছেন মিথি?’
সাব্বিরের বিস্ময় ভাবে বোধহয় কিছুটা কমতি ছিল। বিস্ময়ের পরিবর্তে তার চেহারায় খেলে গেল মৃদু বিরক্তির ছায়া। মিথিকে উত্তর না দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিছুটা এগিয়ে এলো সে। পুনরায় শুধাল,
‘ মিথি? শুনতে পাচ্ছেন? এতো রাতে এখানে কী করছেন আপনি?’
মিথি যেন সম্বিত ফিরে পেল। ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে বলল,
‘ খবরের কাগজ পড়ছিলাম।’
‘ খবরের কাগজ! এতো রাতে!’ অবাক শুনালো সাব্বিরের কণ্ঠস্বর।
‘ সেদিন অবসর পেয়ে খবরের কাগজ পড়তে গিয়ে আশ্চর্য একটা ব্যাপার আবিষ্কার করেছি সাব্বির। এখানের প্রায় প্রত্যেকটা খবরের কাগজ থেকেই কোনো না কোনো অংশ কেটে নেওয়া হয়েছে। কে কেটেছে?’
সাব্বির এগিয়ে এলো। আগ্রহ নিয়ে বলল,
‘ তাই নাকি! দেখি।’
মিথি কাগজগুলো সাব্বিরের দিকে এগিয়ে দিয়ে একবার সাব্বিরের মুখের দিকে তাকাল। সাব্বিরকে আজ অন্যরকম লাগছে। কোথায় যেন কী একটা পরিবর্তন, টের পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু স্পষ্ট করে ধরে ফেলা যাচ্ছে না। সাব্বির কাগজগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল। তারপর বইয়ের তাকের এক ধারে ভারী বইয়ের আড়ালে রাখা কাগজের টুকরোগুলো বের করে এনে বলল,
‘ এইতো এগুলো। আপনি খুঁজছিলেন?’
মিথি অবাক হলো। সন্দিহান চোখে একবার কাগজ তো একবার সাব্বিরের মুখের দিকে তাকাল। টুকরো কাগজগুলো হাতে নিয়ে একবার করে চোখ বুলিয়ে শুধাল,
‘ এগুলো আপনি সংগ্রহ করছেন কেন?’
সাব্বির মিথির সামনে এসে বসল। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
‘সেরকম কোনো কারণ নেই৷ আমি আসলে এই ধরনের অপরাধীদের সাইকোলজিটা বুঝার চেষ্টা করছিলাম।’
‘ এখানে তো খুব ডিটেইল কিছু নেই। এখান থেকে কী সাইকোলজি বুঝবেন আপনি?’
‘ এখান থেকে সব বুঝব এমন নয়। তবে এলিমেন্ট পাওয়া যেতে পারে। অপরাধীর বয়স, ঠিকানা ইত্যাদি। সেই তথ্য মোতাবেক তাদের খুঁজে বের করে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ।’
‘ সাক্ষাৎ! আপনি এই অপরাধীদের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেন নাকি?’ বিস্মিত হলো মিথি।
সাব্বির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ এখনও করিনি। হয়তো কোনো একদিন সেই সাহস করে ফেলতে পারব।’
মিথি যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। বিভ্রান্ত হয়ে বলে,
‘ কিন্তু হঠাৎ আপনি তাদের সাইকোলজি নিয়ে এতো আগ্রহী হচ্ছেন কেন? আপনি একজন শিশু বিশেষজ্ঞ। কোনো ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্ট তো নন।’
সাব্বির হাসল,
‘ তা ঠিক। তবে ডাক্তার হওয়ার আগে আমার ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্ট হওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল।’
‘ কেন?’
‘ অপরাধীদের সাইকোলজি জানতে ইচ্ছে হয় তাই।’
মিথি প্রত্যুত্তর না করে সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে রইল। সাব্বির তার উত্তরটাকে আরও একটু স্পষ্ট করার চেষ্টা করে বলল,
‘আপনি যেহেতু নিজে নারী আপনি নিশ্চয় জানেন, আমাদের দেশে বর্তমানে সেক্সুয়ালি এসল্ট হওয়াটা নারীদের জন্য নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। আপনার হাতের কাগজগুলোর মধ্যে দেখুন, সম্ভবত ৩ সেপ্টেম্বরের একটা প্রতিবেদন, স্কুল-কলেজে পড়ুয়া মেয়েদের মধ্যে উচ্চবিত্ত পরিবারের আশি শতাংশ; মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সত্তর শতাংশ ভুক্তভোগীরা নির্যাতনের পরও পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করে না অসম্মানের ভয়ে। এতো বিশাল অংশ অভিযোগ দায়ের না করার পরও এই বছরের জুন পর্যন্ত দেশের নিরানব্বইটি নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইবুনালে মোট এক লক্ষ একষট্টি হাজার দুইশো আঠারোটি মামলা বিচারাধীন আছে। তারমধ্যে কমপক্ষে বায়ান্ন শতাংশ ধর্ষণ মামলা। তাহলে বুঝতেই পারছেন আমাদের দেশের আইনের অবস্থা! এইযে এতো মেয়ে পাশবিক নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে, অপমানিত হচ্ছে, ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আত্মহত্যা করছে অথচ এই অপরাধীদের ছিয়ানব্বই শতাংশই গায়ে হাওয়া লাগিয়ে একটা সম্মানজনক জীবন-যাপন করে বেড়াচ্ছে। কোনো অপরাধবোধ নেই। কোনো সাফারিংস্ নেই। আইন দুর্বল হলেই যদি আমাদের দানব রূপ বেরিয়ে আসে তাহলে বলতেই হয় আমরা জাতিগতভাবে খুবই মনুষ্যত্বহীন জাতি। আইনের ভয় উবে গেলে আমরা জাত-পাত-ধর্ম-সম্পর্ক কোনো কিছুই পরোয়া করি না। সেজন্যই, আমাদের মেয়েদের সবথেকে বেশি লাঞ্ছিত হতে হয় নিজের পরিবারে। আপনি জানেন কি-না জানি না, তবে বর্তমানে পরিবারের সদস্যদের কাছে ধর্ষিত হওয়ার সংখ্যা খুব দ্রুত হারে বাড়ছে। অন্যের কাছে লাঞ্ছিত হওয়া তবুও সয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু নিজের ঘরের কারো কাছে লাঞ্ছিত হওয়া খুব অসহনীয় হওয়ার কথা।’
মিথি সাব্বিরের বক্তব্যের মূল বিষয় ধরতে না পেরে কিছুটা বিভ্রান্তি নিয়ে তাকিয়ে রইল। সাব্বির তার বক্তব্যের ইতি টেনে বলল,
‘ আমার আগ্রহটা ঠিক এখানেই মিথি। যারা নিজের আপনজনের সঙ্গে এমন হিংস্র হয়ে উঠে তাদের সাইকোলজিক্যাল থিংকিংটা আমার জানতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে, তাদের মধ্যে কী পাপবোধ নেই? সৃষ্টিকর্তার ভয় নেই? কী ভেবে, কীভাবে পারে তারা আপনজনের দিকে এমন বিকৃত ক্ষুধা নিয়ে তাকাতে? ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের চিন্তা কেমন থাকে? সম্পর্ক, বিশ্বাস, মায়া, মনুষ্যত্ব এসব কী তারা ভুলে যায়? যাকে একসময় অতি আদরে বড় করেছে তার দিকে এমন দৃষ্টি কী স্বাভাবিক? যারা এমন হয় তারা কী জীবনের সূচনালগ্ন থেকে এমনই হয়? নাকি কোনো কারণে তাদের এই মানসিকতা বদলে যায়?’
মিথি খবরের কাগজের রহস্যের পেছনে অন্যরকম কিছু আশা করেছিল বলেই হয়তো কিছুটা হতাশ হলো। ছোট্ট একটা ব্যাপারকে এতো গভীরে নিয়ে গিয়েছিল ভেবে নিজের প্রতিই কিছুটা বিরক্ত হলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ কোনো মেয়ের সঙ্গে এরকম হলে ব্যাপারটা সত্যিই খুব প্যাথেটিক।’
সাব্বিরও দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই বসুন্ধরার প্রতিটি নির্যাতিত নারীর মুখ কল্পনা করেই বোধকরি কয়েক সেকেন্ড মলিন হয়ে রইল তার মুখ। তারপর একটু সময় নিয়ে বলল,
‘ মিথি! আপনাকে এর থেকেও প্যাথেটিক একটা গল্প শোনাই ,মিথি। গল্পের সময়টা সম্ভবত ১৯৯৩ কিংবা ৯৪ হবে। খবরের কাগজে একটা অদ্ভুত, লজ্জাজনক, কুরুচিপূর্ণ সংবাদ বেরুলো। ঢাকা শহরের একটা বস্তির ভাড়া বাসা থেকে পনেরো-ষোল বছরের এক অপ্রকৃতস্থ মেয়েকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে যখন উদ্ধার করা হয় তখন সে অসংলগ্ন আচরণ করছিল। শরীরের নানান জায়গায় আঘাতের চিহ্ন। হাতের কব্জিতে দিনের পর দিন রসিতে বেঁধে রাখার স্থায়ী ছাপ। সবথেকে বিস্ময়কর ঘটনা কী জানেন?’
মিথি কৌতুহলী চোখে তাকাল। সাব্বির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ মেয়েটা ছিল ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।’
মিথি যেন এবার একটু চমকাল। কপালে ভাঁজ ফেলে নিজস্ব ধারণা থেকে বলল,
‘ মেয়েটা কী…! ’
বাক্যটা শেষ না করে উত্তরের আশায় সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে রইল মিথি। সাব্বির একটু থেমে বলল,
‘ হ্যাঁ। শী ওয়াজ সেক্সুয়ালি এসল্টেট।’
মিথি মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল। এই পৃথিবীর নিষ্ঠুরতায় ভার হয়ে এলো মন। আফসোসের স্বরে বলল,
‘ এতো ছোট একটা মেয়ের সঙ্গে এমন একটা ঘটনা সত্যিই খুব দুঃখজনক। ছয় মাসের অন্তঃসত্তা যেহেতু তাহলে ঘটনাটা নিশ্চয় দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে? ওর পরিবারের কেউ খেয়াল করেনি?’
সাব্বির একটু হাসার চেষ্টা করে বলল,
‘ পরিবার! দুর্ভাগ্যবশত খেয়াল করার মতো পরিবার তার ছিল না। মেয়েটা ওই ভাড়া বাসায় থাকতো তার বাবার সঙ্গে। এই বাসায় আসার প্রায় বছর দশেক আগে দুটো ছেলে-মেয়ে রেখে তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। মা অন্যত্র বিয়ে করার পর ছেলেকে বোর্ডিং স্কুলে দিয়ে মেয়েটিকে তার নানির কাছে রেখে যায়। পর্যায়ক্রমে নানির মৃত্যুর পর তার দায়িত্ব আসে মামার ওপর। এসব ঘটনার প্রায় দশ বছর পর মেয়েটির বাবা তাকে নিজের কাছে রাখার জন্য নিয়ে আসেন। স্ত্রীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পর তিনি আবার বিয়ে করেছিলেন কিনা সে খবর জানা যায়নি। পনেরো বছরের কিশোরী কন্যাকে নিয়ে তিনি বাসা নেন ঢাকার বাড্ডায়। এলাকার মানুষ প্রথম কয়েক মাস মেয়েটিকে ঘর থেকে বেরুতে দেখলেও ধীরে ধীরে মেয়েটি যেন প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেল। মেয়ের বাবার সন্দেহজনক চলাচল, মেয়েটির এমন হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, মাঝেমধ্যে বাসার ভেতর থেকে অদ্ভুত সব আওয়াজ এসব কেন্দ্র করে প্রায় সাত আট মাস পর এলাকাবাসী উদ্যোগী হয়ে থানায় খবর পাঠায়। পুলিশ এসে ঘর তল্লাশি করে উদ্ধার করে মেয়েটিকে। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা, মানসিকভাবে অসুস্থ, কঙ্কালসার একটি মেয়েকে উদ্ধার করে তারা। মেয়েটি ততদিনে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কেবল।’
সাব্বির থামে। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে চোখ তুলে তাকায়। মিথি যেন দমবন্ধ করে বসে ছিল। স্তব্ধ কণ্ঠে শুধায়,
‘ তারপর?’
‘ তারপর! তারপর আর কী? যেমনটা হয় আরকি আমাদের দেশে। লোকটিকে গ্রেফতার করা হয়। তবে খুব বেশিদিন জেল-হাজতে থাকতে হয়নি তাকে। মানসিকভাবে অসুস্থ এবং ইত্যাদি ইত্যাদি নানান প্যাঁচ ঘুরিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই তাকে মুক্ত করে নেন তার ভাইয়েরা।’
মিথি অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে থাকে। এই পৃথিবী, এই মনুষ্য জাতির প্রতি তীব্র এক অভিমানে ভার হয়ে আসে মন। অচেনা সেই মেয়েটির জন্য নয় কেবল, নিজের জন্য, পৃথিবীর প্রতিটি মেয়ের জন্য কী ভীষণ অসহায় লাগে। রুদ্ধ কণ্ঠে শুধায়,
‘ আর ওই মেয়েটা?’
সাব্বির মিথির দিকে তাকিয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ। তারপর অন্যমনস্ক কণ্ঠে বলে,
‘ মেয়েটা! মেয়েটা দুই মাস হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর আট মাসে একটা অভিশপ্ত অথচ দুর্বল পুত্রসন্তান প্রসব করে পৃথিবীর প্রতি একবুক অভিযোগ নিয়ে বিদায় নেন পৃথিবী থেকে। এই নিষ্ঠুর, কদার্য পৃথিবী থেকে তার বিদায় নেওয়াটাই বোধহয় ঠিক হয়েছে তাই না, মিথি?’
শেষ প্রশ্নটা কেমন অশ্রুসিক্ত শোনায় মিথির কানে। তাকিয়ে দেখে সাব্বিরের চোখ ভরে এসেছে। টলমলে চোখে সে তাকিয়ে আছে মিথির দিকে। মিথির জগত হঠাৎ দোলে উঠে। বজ্রাহতের মতো স্তব্ধ হয়ে সে শুধায়,
‘ আপনি…!’
সাব্বিরের অভিমানী চোখদুটো থেকে জল গড়াতে চায় এবার। সে রুদ্ধ কণ্ঠে প্রায় ফিসফিস করে বলে,
‘মিথি! মিথি আপনি এবার বুঝতে পারছেন? সবাই ভালো হয় না। সব বাবা বাবা হয় না। কিছু রক্ষক ভক্ষক হয়ে যায় মিথি। ওরা মানুষ হতে পারে না, ওরা পশু হতে পারে না। পশুরাও স্বজাতি বুঝে, সন্তান বুঝে। ওরা সন্তান বুঝে না।’
মিথির চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল। সাব্বির এবার কেঁদে উঠল শিশুর মতো। এতো বেদনা, এতো ক্লেশ, এতো অসহায়ত্ব সেই কান্নায়!
‘ আমি ঘুমাতে পারি না মিথি। একটা কঙ্কালসার, ক্লান্ত, অসহায় কিশোরীর মুখ আমাকে ঘুমাতে দেয় না। যার তাকে রক্ষা করার কথা সেই যখন হয়ে যায় শিকারী তখন কেমন লাগে মিথি? কতটা অসহায় হয়ে পড়ে তখন মানুষ? কতটা কষ্ট হয়? অপমান, লজ্জায়, অসহায়ত্বে বেঁচে থাকতেও কত সহস্রবার মরে যেতে ইচ্ছে হয়? ওসব ভাবলে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে। তাকে বুকে জড়িয়ে পৃথিবীর সমস্ত হিংস্রতা থেকে আড়াল করে রাখতে ইচ্ছে করে। মিথি! মিথি কত অপদার্থ আমি দেখো! কত ঘৃণ্য! কত জঘন্য আমার রক্ত। ছিঃ!’
স্বামীর দুঃখে আবারও ভরে আসে মিথির চোখ। এগিয়ে গিয়ে সাব্বিরের হাত ধরার চেষ্টা করে অসহায় কণ্ঠে বলে,
‘ ইউ আর নট গিল্টি সাব্বির। ইউ আর নট।’
সাব্বির শান্ত হয় না। এতো বছরের জমিয়ে রাখা ক্ষোভ, দুঃখ, হতাশা বেরিয়ে আসার একটা রাস্তা পেয়ে যেন উন্মাদ হয়ে উঠে। নিজেকে সে কী করবে বুঝে পায় না। মিথির হাতটা সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলে,
‘ আমাকে ছুঁবেন না প্লিজ। আপনি আমাকে ছুঁলে অপবিত্রতার লজ্জায় আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে মিথি। প্লিজ ডোন্ট টাচ মি, প্লিজ!’
—————
সকালের সোনালি রোদ্দুর এসে পড়ছে খোলা জানালার পাটাতনে। একটু আগেই অভিমানী কিশোরীর মতোন মুখ ভার করে ছিল আকাশ। ভার মুখে মুহূর্তেই দস্যি মেয়ের মতোন উদ্ভাসিত হাসি দেখে নাহিদের হঠাৎ করে রিফার কথা মনে পড়ে গেল। দিনের পর দিন একটা অসুস্থ পরিবারে বেড়ে উঠেও মেয়েটা বড় সুন্দর করে হাসে। নাহিদ বাড়ি ফিরলে সর্বক্ষণ ‘ভাইয়া!’ ‘ভাইয়া!’ করে নেচে-কুঁদে বেড়ায়। অথচ ভাইয়া তার জন্য কখনও কিছু করতেই পারল না! প্রচ্ছন্ন এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে নাহিদের বুক চিড়ে। মা-বাবা তত্ত্বে নাহিদের বিশ্বাস নেই। সন্তান জন্ম নেয় প্রকৃতির প্রয়োজনে। বাবা-মার তাতে বিশেষ কোনো অবদান নেই। কিন্তু বোনের প্রতি আশ্চর্য টান থেকে এ-ও বুঝে রক্তের সম্পর্ক চাইলেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
‘ চা নিচ্ছ না কেন নাহিদ?’
আদিব হোসেনের কথায় সম্বিত ফিরল নাহিদের। অফিসের জানালা থেকে সচেতন চোখে টেবিলের দিকে তাকাল। নাহিদ, সৌধ ছাড়াও আদিব হোসেনের কয়েকজন দক্ষ কর্মচারী আর বেছে বেছে নেওয়া কিছু স্টাফ নিয়ে একটা ম্যানেজমেন্ট টিম তৈরি করা হয়েছে তাদের। ম্যাগাজিনের বিষয়বস্তু নিয়ে ঘাটাঘাটির পাশাপাশি, ম্যাগাজিনের নীল নকশাও করা হচ্ছে রোজ। রোজই কিছু যোগবিয়োগ হচ্ছে। আজ সকালে তাদের আলোচনা বসেছে আদিব হোসেনের সংবাদ পত্রের অফিসে। আলাপচারিতার মধ্যেই সকালের নাস্তা এলো। পরোটা আর কড়া লিকারের চা। নাহিদ চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে বলল,
‘ স্যার আপনাকে তো বলেছি, আমাদের ম্যাগাজিনে শুধু অপরাধ বিষয়ক জার্নাল থাকবে না। অপরাধের ইতিহাস, তদন্ত, এই অপরাধ সম্পর্কে আদালতের কার্যক্রম কেমন তার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ সকল কিছুই ধারাবাহিকভাবে থাকবে। ফিচারও লেখা হবে নান্দনিক উপায়ে। শুধু গৎবাঁধা তথ্যবহুল লেখা নয়। এমন লেখা হতে হবে যা পাঠকদের চৌম্বকের মতো টেনে ধরে রাখবে। সেজন্য আমাদের দরকার গল্প বলতে পারার মতো কর্মী৷ যে নিরবিচ্ছিন্ন গল্প বলে যেতে পারে। গল্পের আবহ তৈয়ার করে অপরাধ, অপরাধী, শিকারের জীবনবোধের দিকে মনোযোগ দিয়ে ধীরে ধীরে লেখার বিস্তার ঘটাবে। ক্রিমিনাল সাইকোলজি, ক্রাইম এন্ড এডমিনিস্ট্রেশন, ক্রাইম সলভিং, অপরাধ ও তদন্তের নতুন নতুন পদ্ধতি এবং তার প্রতিকার সমস্ত কিছু নিয়েই গঠনমূলক এবং গবেষণামূলক লেখা আমরা রাখব। সেজন্য সবার আগে আমাদের দক্ষ জনশক্তি লাগবে। প্রবীণ, বিখ্যাত কেউ এই মুহূর্তে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখাবে না। আমরা টার্গেট করব, নবাগতদের। বর্তমানে দেশের বাইরের ইউনিভার্সিটিগুলোতে আমাদের দেশের কে কে ক্রিমিনাল সাইকোলজি অথবা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি নিয়ে ভালো রিসার্চ করছে, কার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে ভালো জ্ঞান, কে ফরেনসিকে ভালো করছে এসব তথ্য আমরা খুঁজে বের করব। তাদের প্রকাশনা, রিসার্চ, ব্যক্তিজীবন পূঙ্খানুপুঙ্খ খোঁজ নিয়ে তাদের লোভনীয় একটা প্রস্তাব দিব। চেষ্টা করব তারা যেন আমাদের প্রস্তাবে রাজি হয়৷ এক্ষেত্রে আমরা রিটায়ার্ড আর্মি অফিসারদের মধ্যে থেকেও দক্ষ কাউকে এপ্রোচ করার চেষ্টা করতে পারি। সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন, আইনি তদন্ত, নিরাপত্তা কৌশল সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা ভালো।’
সকলেই নীরবে নাহিদের কথা শুনছিল। আদিব হোসেন মৃদু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। ধীরে ধীরে নাহিদ ছেলেটিকে তার খুবই পছন্দ হচ্ছে। ছেলেটার আত্মবিশ্বাস ভালো। কাজের সময় বাচনভঙ্গিতে যে চৌম্বকীয় গাম্ভীর্য আনে তা শ্রোতাকে তার দিকে চৌম্বকের মতোই টেনে ধরে রাখে। আদিব হোসেন মনে মনে নাহিদকে নিয়ে গভীর একটা পরিকল্পনা কষে রেখেছেন। তার আগে আর কয়েকটা দিন তাকে পর্যবেক্ষণ করা যাক। বাদ বাকি আলোচনা শেষে নাহিদ বলল,
‘ এই খোঁজখবর চালানোর জন্য আমরা কয়েকটা দলে ভাগ হয়ে দায়িত্বগুলো ভাগ করে নিবো। কার কী কাজ তার ফাইল আমি সবাইকে সেন্ড করে দিব আজ রাতে। চৌকস রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার খুঁজে বের করে এপ্রোচ করার দায়িত্ব আমি আর সৌধ আলাদাভাবে নিচ্ছি। আমার এক মামা রিটায়ার্ড বিগ্রেডিয়ার জেনারেল, তিনি এই বিষয়ে আমাদের ভালো সাহায্য করতে পারবেন।’
আদিব হোসেন বললেন,
‘ তারপর, তোমাদের অন্য কাজ কেমন চলছে।’
নাহিদ হাসল,
‘ চলছে বেশ। কয়েকদিন টহল দিয়ে সাবজেক্টগুলো পয়েন্টআউট করে ফেলেছি। এবার শুধু গহীনে ঢুকার অপেক্ষা।’
তারপর পাশে ফিরে একজনের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ তানভীর ভাই, আপনাকে ফাইলটা সেন্ড করেছি না? প্রথম চক্রটার একটু খোঁজ করেন। কোনোভাবে ভেতরে ঢোকা যায় কি-না দেখুন। তাদের সঙ্গে মিশেন, খান, বসেন। দরকার পড়লে শুয়ে পড়েন। যত এগোবেন নিউজ পাবেন তত কড়া!’
কথাটা বলে চোখ টিপল নাহিদ। দুষ্টুমি করে বলল,
‘ আমি শুনেছি ওইদিকে আপনার রাতের পরী আছে। আপনিই যান। রাতের পরীরা আমাদের পাত্তা দেয় না।’
প্রত্যুত্তরে হাসল তানভীর। বলল,
‘ চলো একদিন আমার সঙ্গে। দেখি পাত্তা দেয় কি-না!’
নাহিদ হাসল। কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে অফিস থেকে বেরিয়ে এসেই মনে পড়ল, মামার নাম্বার সম্ভবত তার কাছে নেই। কোনো মামার সঙ্গেই তার সেরকম ভালো সম্পর্ক নেই। ভালো সম্পর্ক নেই বলতে তাদের সঙ্গে নাহিদের খারাপের থেকেও খারাপ সম্পর্ক। কেউই তাকে খুব একটা সহ্য করতে পারে বলে মনে হয় না। নাহিদ কিছুক্ষণ ভাবার পর অবশেষে মৌনির কথা মাথায় এলো। ইনবক্সে ঢুকে ওকে ম্যাসেজ পাঠাতে গিয়ে দেখল, বেয়াদবটা তার লাস্ট ম্যাসেজই এখনও সীন করেনি। নাহিদের লাস্ট ম্যাসেজ ছিল ২০২২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। আর এখন ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস। নাহিদ প্রলম্বিত শ্বাস ফেলল। এই মেয়ে ২০২২ সালের ম্যাসেজ সীন করতে এক বছর লাগাচ্ছে। না জানি এই বছরের ম্যাসেজ সে কোন বছরে গিয়ে দেখবে!
—————
‘ ছেলেটা কে? কী করে? কোথায় থাকে? হোয়াট’স হিজ নেইম?’
মৌনি চুপ করে তাকিয়ে আছে শাওনের মুখের দিকে। শাওনকে কখনও এতো অস্থির হতে দেখেনি সে। মৌনির পরিচিত শাওন সবসময়ই টলটলে দিঘির মতো শান্ত। রাগ যে সে করতে পারে, এমন কোনো দৃশ্য কখনও কল্পনাও করতে পারে না মৌনি। আজ সেই পরিচিত শাওনের এই অস্থির রূপ দেখে কিছুটা বিস্মিত হলো সে। কাল সন্ধ্যায় নিজের ব্যক্তিগত কারো অস্তিত্বের কথা বলার পর এখন পর্যন্ত পয়ষট্টিবার কল, একশোর উপর ম্যাসেজ করেছে শাওন। মৌনি কোনো কল বা ম্যাসেজেরই উত্তর দেয়নি। বলতে দোষ নেই, শাওনের অকস্মাৎ এমন আক্রমণাত্মক ব্যবহারে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিল সে। মৌনি সবসময় নিজেকে সমস্ত ঝামেলা থেকে পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করে। কোনো আরোপিত মিথ্যা সে কখনও নিজের গায়ে মাখে না। যা সে করেনি তা সে স্বীকার করবে এই রকম নজির তার জীবনে নেই। জীবনের প্রথম শাওনের শিশুসুলভ আচরণের জন্য এই পথ মাড়াতে হচ্ছে তাকে৷ এখন শাওনের এই অস্থিরতায় একইসঙ্গে অদ্ভুত একটা বিরক্তি যেমন খেলে যাচ্ছে ঠিক তেমনই অসংখ্য চিন্তা খেলা করছে মাথায়। মনে হচ্ছে, শাওন একটা চক্রের মধ্যে ঘুরছে। কোথাও সে স্থির হতে পারছে না। তার স্থির হওয়াটা খুব দরকার। মৌনি উত্তর দিল,
‘ তার নামটা এই মুহূর্তে তোমাকে বলতে পারছি না শাওন।’
শাওন তৎক্ষনাৎ শুধাল,
‘ কেন?’
‘ কারণ এইসব সম্পর্ক নিয়ে আমার ইনসিকিউরিটি আছে। যদি আমাদের শেষ পর্যন্ত বিয়ে না হয়? দাদাজানকে তো জানো? হুট করে একটা বিবাহ ঘটিয়ে দেওয়ায় উনার জুড়ি মেলা ভার। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার নাম, ছবি, পরিচয় কিছুই প্রকাশ করব না। যদি আমরা এক হতে পারি তাহলে বিয়ের দিন একেবারে দেখাব।’
শাওন মানতে পারল না। বলল,
‘ তুমি মিথ্যা বলছ। তোমার এমন কেউ নেই।’
মৌনি হাসল। খুশি হয়ে বলল,
‘ আসলেই মিথ্যা বলছি। আমার কেউ নেই। আমাকে দেখে মনে হয় আমার পক্ষে এসব প্রেম-ভালোবাসা সম্ভব?’
শাওন মৌনির এই কথাও বিশ্বাস করতে পারল না। অস্থির কণ্ঠে শুধাল,
‘ তোমার যদি কেউ না থাকে তাহলে তোমার প্রোফাইলে ওসব ভার্চুয়াল চিঠিপত্র তুমি কার জন্য লেখো? কেউ না থাকলে এতো বাস্তব অনুভূতি দিয়ে লেখা সম্ভব! সে কী দেশের বাইরে থাকে? ফর গড সেক আমাকে স্পষ্ট করে বলো।’
মৌনি হেসে ফেলল,
‘ কী আশ্চর্য! এপার-ওপার কিছুই দেখি তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না। কী বললে বিশ্বাস করবে বলো তো?’
‘ সত্য বললে বিশ্বাস করবো।’
‘ সত্যিই তো বললাম।’
‘ কী সত্য?’
‘ এইযে আমার কেউ নেই।’
‘ মিথ্যা।’
‘ তাহলে আছে।’
শাওন অধৈর্য হয়ে উঠল। ধমক দিয়ে বলল,
‘ উফ মৌনি! হেঁয়ালি করবে না।’
মৌনির হাসি গায়েব হয়েছে এবার। মুখ গম্ভীর করে বলল,
‘ হেঁয়ালি কোথায় করলাম?’
‘ তুমি আমাকে এক্ষুনি তোমাদের কাপল পিক দেখাবে।’
মৌনি সরাসরি নাকচ করে বলল,
‘ আমি তোমাকে কোনো ছবিই দেখাবো না শাওন।’
শাওন জেদ ধরা কণ্ঠে বলল,
‘ অবশ্যই দেখাবে। তুমি দেখাতে বাধ্য।’
মৌনি গম্ভীর মুখ করে শাওনের দিকে তাকাল। শীতল কণ্ঠে বলল,
‘ তুমি এখন আমাকে জোর করবে শাওন?’
শাওন হঠাৎ যেমন জ্বলে উঠেছিল ঠিক একইভাবে নিভে গেল। দুর্বল কণ্ঠে বলল,
‘ সরি!’
মৌনি উত্তর দিলো না। শাওন ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে রইল মৌনির দিকে। তীব্র হতাশা নিয়ে শুধাল,
‘ মন! তুমি আমাকে আগে কেন বলোনি মন!’
মৌনি ব্যথিত চোখে তাদের দু'জনকে বন্ধুত্বের একই অনুভূতিতে এসে দাঁড়াতে দেখল। যদিও মিথ্যা কষ্ট পাচ্ছে শাওন তারপরও তার মনে হলো এবার দাঁড়িপাল্লা সমান হলো। একই রাস্তার মোড়ে একই প্রশ্ন চোখে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে তারা। এইবার সম্ভবত তাদের গল্পের সমাপ্তি হওয়ার পালা!
·
·
·
চলবে……………………………………………………