আধো আলো ছায়াতে - পর্ব ০২ - মৌলী আখন্দ - ধারাবাহিক গল্প

          ভদ্র পরিবারের মেয়ে হলেও ঊর্মির গালির ভাণ্ডার যথেষ্ট সমৃদ্ধ। কারো দিকে রাগ উঠলে সে মনে মনে কুৎসিত সব গালি দিয়ে মেজাজ ঠাণ্ডা করে।
আজকে তার এই পদ্ধতি কাজ করছে না। কঠিনতম সব গালিগালাজ মনে মনে দিয়েও মেজাজ ঠাণ্ডা হচ্ছে না তার।
তুহিনের আজকে আসার কথা। কী নাকি জরুরি কথা আছে তার।
সাধারণত অফিসের সব কাজ শেষ করে গুছিয়ে নামতে নামতে পাঁচটা বিশ বেজে যায় ঊর্মির। অফিসের বাস ধরতে পারে না কোনো দিনই।
আর আজকেই তার সব কাজ শেষ হয়ে গেছে চারটা পঞ্চান্নতে। আজকে খুব সহজেই অফিসের বাসটা ধরা যেত।
মনে হয় সেটা ভালোও হতো তার জন্য। শরীরটা ভালো লাগছে না, কেমন যেন জ্বর জ্বর লাগছে।
নিঃশ্বাসে আগুনের হলকা। বাসা পর্যন্ত সিএনজি নিলে অনেকগুলো টাকা বেরিয়ে যাবে।
এমনিতেই এটা মাসের শেষ সপ্তাহ। দুটো রিকশায় ভেঙে ভেঙে বাসায় যায় ঊর্মি।
মাঝখানে হাঁটতে হয় খানিকটা। আজকে হাঁটতে ইচ্ছা করছে না।
ডেস্কটপ শাট ডাউন দিয়ে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে ঊর্মি তুহিনকে কল করল। তুহিন কল রিসিভ করেই ব্যস্তভাবে বলল, “জান, আমি কাছাকাছি চলে এসেছি!”
“ও আচ্ছা, তাই নাকি!” এরপর আর তুহিনকে আসতে নিষেধ করা যায় না।
“হ্যাঁ, আর অল্প একটু বাকি!”
“কতক্ষণ লাগবে?”
“আর ছয় সাত মিনিট!”
“আচ্ছা!”
বিরক্ত মুখে আবার ডেস্কটপ অন করল ঊর্মি। একটা কাজ কাল সকালে ফার্স্ট আওয়ারে এসে করবে বলে ভেবে রেখেছিল, সেটা এগিয়ে রাখা যাক।
একটা দুটো ডাটা এন্ট্রি দিতেই আবার তুহিনের কল, “জান, আমি চলে এসেছি!”
ঊর্মি ক্লান্ত গলায় বলল, “নামব?”
“হ্যাঁ, নামো!”
অগত্যা আবারও ডেস্কটপ শাট ডাউন দিয়ে নিচে নামল ঊর্মি। নামিরায় নাস্তা করার কথা তাদের।
সেই থেকে ব্যাগ হাতে নামিরার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ঊর্মি। সাত মিনিটের জায়গায় চব্বিশ মিনিট হয়ে গেছে, এখনো পর্যন্ত দেখা নেই তুহিনের।
মনটা চাচ্ছে নিজেরই পশ্চাতদেশে কষিয়ে লাথি বসাতে। এর চেয়ে অফিসের বাসে উঠে পড়লে এতক্ষণে বাসায় চলে যেতে পারত ঊর্মি।
ঊর্মির অনেক সহকর্মীই অফিস ছুটির পর নামিরায় নাস্তা করতে যায়, তারা এসে ঊর্মিকে দেখে হাসি বিনিময় করে যাচ্ছে। মিষ্টি হাসি হেসে তাদেরকে এড়িয়ে যাচ্ছে ঊর্মি, আর মনে মনে গালিগালাজ করছে তুহিনকে।
ওই তো দেখা যাচ্ছে তুহিনকে, ছুটতে ছুটতে আসছে। ঊর্মি মনে মনে বলল, “হারামজাদা!”
তুহিন এসেই হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “জান স্যরি, বাস নষ্ট হয়ে গিয়েছিল!”
ঊর্মি মনে মনে বলল, “তোর আরো অনেক কিছুই হবে, হারামি!”
মুখে বলল, “চলো, ভেতরে গিয়ে বসি, দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না!”
“হ্যাঁ, চলো!”
ভেতরে ঢুকে বসে খাবারের অর্ডার দিয়ে বলল ঊর্মি, “কী জরুরি কথা বলতে চেয়েছিলে?”
তুহিন সামান্য ইতস্তত করে বলল, “আপুর বিয়েটা মনে হয় ভেঙে যাবে!”
ঊর্মি আঁতকে উঠে বলল, “মানে?”
“মানে, আপুর মনে হয় অন্য জায়গায় এফেয়ার ছিল।”
“তো সেটা আগে বলতে পারেনি?”
“আরে, সেখানেই তো টুইস্ট! আপু মনে হয় মুভ অন করতে চেয়েছিল, কিন্তু তার বয়ফ্রেন্ড রাজি ছিল না। সে তাদের রুম ডেটের ছবি আপুর উড বি দেবরকে হোয়াটস এপে পাঠিয়ে দিয়েছে!”
“তোমার আপু রুম ডেট করত? দেখে তো সেরকম মনে হয়নি!”
‘আমরাও সবাই অনেক সারপ্রাইজড! বাসায় পরিস্থিতি ভীষণ খারাপ!”
“হওয়ারই কথা! অবশ্য আমারও বোঝা উচিত ছিল, বোন তো ভাইয়ের মতোই হবে!”
“মানে?” রাগে টকটকে লাল হয়ে গেল তুহিনের মুখ।
“মানে কিছু না!”
“দেখো, তোমার সাথে শেয়ার করার মানে এই না যে তুমি আমাকে অপমান করবে!”
“অপমান করলাম কোথায়?”
“বাকিও তো রাখলে না কিছু!”
খাবার চলে এসেছে। ঊর্মির প্রিয় পাপড়ি চাট আর কফি। গরম কফির কাপ নিজের দিকে টেনে নিয়ে প্রথম চুমুক দিলো ঊর্মি।
“এখন কী করবে?”
শ্রাগ করল তুহিন। “জানি না। আসলে কেউই জানে না। ওই পক্ষ তো বিয়ে ভেঙে দিয়েছে।”
“সেটাই স্বাভাবিক!”
“আমি তো অফিস থেকে সরাসরি এখানে এলাম। দেখি বাসায় গিয়ে, কী অবস্থা!”
“জানিও। বেশ একটা ভালো ঝামেলাই হয়ে গেল!”
“হ্যাঁ। ভেবেছিলাম আপুর বিয়েটা সেরে বাসায় তোমার কথা বলব। আপু যে এমন একটা ঝামেলা বাধিয়ে রেখেছে তা কে জানত!”
নিজের বাসার কথা ভেবে বিরক্তিতে ছেয়ে গেল ঊর্মির মনটা। ঊষার যার সাথে এফেয়ার, তাদের বাসা থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে।
তাতে ঊর্মির কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু ঊর্মির আগে ঊষার বিয়ে দিতে চাইছে না আম্মু আব্বু।
ঊর্মির আগে ঊষার বিয়ে হলে বিয়েতে আসা আত্মীয় স্বজন অবশ্যই কথা তুলবে এটা নিয়ে। আর এদিকে তুহিনের বাসায় এই ঝামেলা।
আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ পাপড়ি চাট আর বাকি কফিটুকু খাওয়া শেষ করল ঊর্মি। নিঃশব্দে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল রাস্তার পাশে।
শরীরটা এত খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে হাঁটু ভেঙে রাস্তাতেই পড়ে যাবে ঊর্মি।
একটা সিএনজিও যেতে রাজি হচ্ছে না। তুহিন বলল, “চলো আমি তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি কিছু দূর পর্যন্ত।”
ঠিক সেই সময় পাশ দিয়ে যাওয়া একটা বাস থেকে হেল্পার ইশারা করে বলল, “সিট আছে!”
দ্বিধা না করে তুহিনকে পাশ কাটিয়ে বাসে উঠে পড়ল ঊর্মি। সত্যি সত্যিই ফাঁকা ছিল লেডিস সিট।
দেরি না করে বসে পড়ল ঊর্মি। ব্যাগ থেকে ফোন বের করে মেসেজ পাঠাল তুহিনকে, “স্যরি, আমি আসলে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না।”
ছোট্ট একটা স্মাইলি ইমোজি পাঠিয়ে লিখল তুহিন, “ঠিক আছে। ইটস অলরাইট।”
বাস ছুটে চলেছে গন্তব্যের দিকে। অফিস শেষ করে বের হওয়া ঘরমুখী মানুষের ঢল চারপাশে।
কিছু দূর এগিয়েই জ্যামে আটকা পড়ল বাস। দুজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ উঠে টাকা চাইতে শুরু করল সবার কাছে।
এসব পরিস্থিতিতে সাধারণত কোনো রকম ঝামেলা করে না ঊর্মি। চাওয়ার সাথে সাথেই ব্যাগ থেকে ভাঙতি টাকা বের করে দিয়ে দেয়।
আজকেও তাই করার প্রস্তুতি নিয়ে ভাঙতি বিশ টাকা বের করে বসেই ছিল ঊর্মি, কিন্তু তাদের একজন এসে যখন হাত পেতে অঙ্গভঙ্গি করে বলল, “সুন্দরী আপু কিছু দিবেন নাকি?”
অকারণেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল ঊর্মির। ইচ্ছে হলো না দিয়ে বিদায় করে দেয়।
কিন্তু আবার অকথা কুকথা বলে বসে কিনা, সেই ভয়ে দিয়েও দিলো। টাকাটা হাতে নিয়ে তাকে হাত তুলে আশীর্বাদ করল মানুষটা, “অনেক ভালো একটা বিয়ে হবে তোমার, সুন্দরী আপু!”
রাগ করতে গিয়ে অদ্ভুত একটা বিষণ্ণতা ছড়িয়ে যেতে লাগল ঊর্মির মনে। ভালো বিয়ে বলতে কী বোঝায়?
এই তুহিনের সাথে তার সাড়ে চার বছর ধরে সম্পর্ক, অথচ এখন প্রায়ই বলার মতো কোনো কথা থাকে না তেমন। দেখা হলে শুধু ঝগড়াই হয়।
গত সাড়ে চার মাস ধরে পাত্র দেখা হচ্ছে তনিমা আপুর জন্য। ব্যাটে বলে মিলছে না।
এবার যাও বা মিলেছিল, সেটাও তো ফাঁসতে চলল আপুর এক্স বয়ফ্রেন্ডের চক্করে পড়ে। মাঝখানে বিপদে পড়ে গেছে ঊর্মি।
বাসায় ঊষা এখন তার দিকে এমন চোখে তাকায়, যেন সে তার বোন নয় শত্রু। অথচ সদ্য গ্র্যাজুয়েশন করেছে।
ঊর্মি একবার বলেছিল মাস্টার্সের কথা চিন্তা করতে, অথবা কোথাও চাকরির জন্য চেষ্টা করতে। দু এক জায়গায় চেষ্টা করেই হাল ছেড়ে দিয়েছে ঊষা।
অনেক কম বেতন অফার করে নাকি। এত কম বেতনে এত খাটুনি করে তার পোষাবে না।
অথচ এটা ঊর্মির চার নাম্বার চাকরি। তারও প্রথম চাকরির বেতন অনেক কমই ছিল।
ভাবতে ভাবতে বাসার কাছাকাছি চলে এসেছে বাসটা। সাবধানে নামল ঊর্মি।
চতুর্দিকে মানুষ আর গাড়ির ভিড়। সবাই শুধু ছুটছে আর ছুটছে।
একদণ্ড অবসর নেই কারো। এই ভীষণ ব্যস্ত শহরে সবাই কি দারুণ নিঃসঙ্গ!
কি ভীষণ একা!
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp