মহাখালির দক্ষিণপাড়ায় যে বাড়ির নিচতলায় ঊর্মিরা থাকে সেই বাড়ি ঊর্মির নানার ছিল। ছয়তলা বাড়ির দুই তলা ঊর্মির আম্মুর, আর চার তলা ঊর্মির মামার নামে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
ঊর্মির আব্বু স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার চারদিন পর ঊর্মির মামা একদিন এসে ঊর্মির আম্মুকে বললেন, “মোমেনা, স্ট্রোকের চিকিৎসা বিরাট খরচান্ত ব্যাপার। তুই তো বিপদে পড়ে যাবি। তার চেয়ে আমি বলি কী, ঊর্মির দাদাবাড়ীতে গিয়ে দেখ, ওরা কিছু দেয় টেয় কিনা।”
ঊর্মি তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে, উষা ক্লাস নাইনে। ঊর্মির দাদাবাড়ি থেকে তেমন কিছু পাওয়া গেল না।
আরো কিছুদিন পর ধানমণ্ডির ফ্ল্যাট ছেড়ে এই বাড়িতে এসে উঠতে হলো ওদের। আব্বুর শরীরের ডান পাশটা পুরোপুরি অকেজো হয়ে গিয়েছিল।
ফিজিওথেরাপি দিয়ে আব্বুর অবস্থার কিছু উন্নতি হয়েছে তবে সেটা খুব বেশি নয়। নিজের খাওয়া, বাথরুম, গোসল নিজে করতে পারার মতো যতটুকু দরকার, ঠিক ততটুকুই।
আর তারপর থেকেই হাসিখুশি আম্মুর মেজাজ পাকাপাকিভাবে খারাপ হয়ে গেছে।
ভাড়াটিয়াকে দোতলা ছেড়ে দিয়ে তারা এখন নিচতলায় থাকে। পুরনো আমলের বাড়ি।
অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। বর্ষাকালে অল্প বর্ষণেই উঠোনে পানি উঠে যায় চার ইঞ্চি।
বাথরুমে হেঁটে হেঁটে চলে আসে ছোটো বড়ো নানা আকারের শামুক। গা ঘিনঘিন করে ঊর্মির।
এই শ্যাওলা ওঠা বিবর্ণ রঙ চটা দেয়ালের, পারদ নষ্ট হয়ে যাওয়া ঝাপসা আয়নার বাথরুম থেকে অন্য কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। যেখানে বাথটাব থাকবে।
ঈষদুষ্ণ পানিতে গোসল সেরে বাথরোব পরে বের হবে ঊর্মি। টাওয়েল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে আড়চোখে উপভোগ করবে বরের সতৃষ্ণ দৃষ্টি।
বিশাল ক্লোজেট থাকবে। সেখানে ঝোলানো থাকবে সারি সারি শাড়ি।
গাদোয়াল জামদানি মনিপুরি বেনারসি তাঁত জর্জেট শিফন কাঞ্জিভরম…অফিসের প্রেজেন্টেশনের জন্য শাড়ি ধার করতে মামির কাছে হাত পাততে হবে না।
উঠোন দিয়ে হেঁটে আসতে আসতে ঊর্মির পা পড়ল বিচ্ছিরি ক্যাতক্যাতে পদার্থটার ওপর। ঘিনঘিন করে উঠল সারা শরীর।
কলিং বেল টিপে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরেও যখন কেউ এল না, মনে পড়ল কলিং বেল নষ্ট হয়ে গেছে। দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিলো ঊর্মি।
আম্মু এসে দরজা খুলে দেওয়ার পর রুক্ষ গলায় বলল, “বুয়া চলে যাওয়ার পর গেট আটকাওনি কেন? কুকুর এসে উঠান নষ্ট করে গেছে আবারও! এই কুকুরটাকে যদি আমি একদিন খুন না করেছি তো…”
আম্মু ক্লান্ত গলায় বলল, “বুয়া চলে যাওয়ার পর ঊষা এসেছিল তো…”
তাহলে কাজটা ঊষারই। ঊষা ভেতরে ঢুকে গেট আটকায়নি।
ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে ঊষার রুম পেরিয়ে যেতে হয়। ঊষার রুমের সামনে দিয়ে যেতে যেতে ওর দিকে সরোষে তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করল ঊর্মি।
ঊষা নিজের বিছানায় শুয়ে শুয়ে পা নাচাচ্ছিল। ঊর্মির তীব্র দৃষ্টির প্রত্যুত্তরে সে উঠে এসে দরজা বন্ধ করে দিলো সশব্দে।
ঊর্মি আম্মুর দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখলে? দেখলে কী পরিমাণ বেয়াদব হয়েছে তোমার মেয়ে?”
আম্মু ক্লান্ত গলায় বলল, “জানিসই তো ও এমন। বাদ দে না!”
“তোমার আহ্লাদেই ও এমন হয়েছে!”
সশব্দে বাথরুমের দরজা বন্ধ করল ঊর্মি। আম্মু বাইরে থেকে দরজা নক করে ব্যাকুল গলায় বলল, “ঊর্মি, আজকে পানি থাকবে না! ট্যাংকির সমস্যা! বালতিতে পানি রাখা আছে, সাবধানে খরচ করিস! শেষ হয়ে গেলে আর পাবি না কিন্তু!”
ঊর্মি ভেবেছিল সে শুধু হাত মুখ আর পা ধুয়ে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু আম্মুর কথা শুনে জেদ চেপে গেল তার।
ধরে রাখা পানি সবটা শেষ করে গোসল সেরে বেরিয়ে এলো। গোসল করার উদ্দেশ্যে ঢোকেনি বলে বাসার কাপড়, টাওয়েল কিছুই নিয়ে যায়নি ঊর্মি।
গোসল শেষ করে ওড়না দিয়ে চুল মুছে যে জামাটা পরা ছিল সেটা পরেই বেরিয়ে এলো। আম্মু বলল, “এইসব কী ঊর্মি? বললাম যে পানি সাবধানে খরচ করিস?”
উত্তর না দিয়ে হন হন করে হেঁটে ঘরে চলে গেল ঊর্মি। ওড়না দিয়ে চুল মোছা ঠিকমতো হয়নি।
টপ টপ করে পানি পড়ে গায়ের জামা ভিজে যাচ্ছে। ঠাণ্ডা না লাগলে হয়।
দরজা বন্ধ করে পড়ছিল ঊষা। রাত এগারোটা চল্লিশের দিকে দরজা খুলে স্বাভাবিকভাবেই বের হলো সে।
ওয়াশরুমে ঢুকে আবিষ্কার করল এক ফোঁটা পানিও নেই। বেরিয়ে এসে আম্মুকে বলল ঊষা, “পানি নেই যে বলনি কেন?”
আম্মু বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল, “বলে আর কী হবে? ঊর্মি সবটা পানি খরচ করে ফেলেছে, না করার পরেও!”
“বলে আর কী হবে মানে? বলে ব্যবস্থা হবে!”
“কী ব্যবস্থা হবে?”
ঊষা কোনো উত্তর না দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর তাকে দেখা গেল গায়ে ওড়না জড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
আম্মু শঙ্কিত গলায় বলল, “ঊষা, এই রাত বারোটায় কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
“পানি আনার ব্যবস্থা করতে!”
“মানে?”
কোনো জবাব না দিয়ে বেরিয়ে গেল ঊষা। আম্মু ক্লান্ত গলায় বলল, “আর পারি না! ঊর্মি, যা তো, গিয়ে দেখে আয় তো কোথায় যাচ্ছে!”
বিরক্ত লাগলেও বিরক্তি গিলে ফেলে গায়ে ওড়না জড়িয়ে ঊষার পিছু পিছু বের হলো ঊর্মি। দেখা গেল ঊষা অন্য কোথাও না, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে যাচ্ছে।
তাদের মামার করা নিয়ম অনুযায়ী রাত সাড়ে এগারোটায় বন্ধ করে দেওয়া হয় লিফট।
ঊর্মি আর গেল না ওর পিছু পিছু। বাসায় ফিরে এসে বলল, “মামার বাসায় যাচ্ছে আম্মু!”
“ও আচ্ছা!” স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল আম্মু।
কিছুক্ষণ পরই ফিরে এল ঊষা। কোনো পানির পাত্র নেই সাথে।
এ নিয়ে তাকে কোনো প্রশ্নও করল না কেউ। বিশ মিনিট পর দরজায় ধাক্কা দেওয়ার শব্দ হলো।
আম্মু অথবা ঊর্মি এগিয়ে যাওয়ার আগেই এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলল ঊষা। ওরা দুজন পিছু পিছু এসে অবাক হয়ে দেখল, ছয়তলার ভাড়াটিয়া সাব্বির দাঁড়িয়ে আছে।
হাতে একটা পানির গ্যালন। সাব্বির বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, “ঊষা বলেছিল পানি দিয়ে যেতে…”
আর কেউ কিছু বলার আগেই ঊষা বলল, “থ্যাংক ইউ সাব্বির ভাই! আসুন ভেতরে, এক কাপ চা খেয়ে যান?”
“না, থাক, আরেকদিন আসব! আজকে অনেক রাত হয়ে গেছে তো…”
“আচ্ছা!”
সাব্বির চলে গেলে দরজা বন্ধ করল ঊষা। ঊর্মি তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “সাব্বির তোকে পানি দিয়ে গেল কেন?”
“কারণ আমি ওকে দিয়ে যেতে বলেছি, তাই!”
“এটা কেমন কথা? তুই ওকে পানি দিয়ে যেতে বলবি কেন?”
“সেই জবাবদিহি তো আমি তোকে করব না! ভালো কথা, আপা, এই পানি কিন্তু আমি আমার টাকায় কিনে এনেছি! তুই এই পানি ব্যবহার করবি না! মনে থাকে যেন!”
স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল ঊর্মি। কিছুক্ষণ পর ধাক্কাটা সামলে নিয়ে বলল, “তোর টাকা মানে? খুব টাকার গরম হয়েছে না?”
“হ্যাঁ, হয়েছে! আমার টাকা মানে আমার টাকা! আমি চাকরিতে জয়েন করেছি।”
“দেখা যাবে কয়দিন করতে পারিস!”
‘সেই খবর দিয়ে কোনো দরকার নেই তোর!”
আব্বু ঘর থেকে গলা উঁচু করে বলল, “কী হয়েছে, এত গোলমাল কীসের?”
ঊষাও গলা উঁচু করে বলল, “কোনো গোলমাল নেই, সব ঠিক আছে! অল কোয়ায়েট অন দ্যা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট!”
ঊষা তার নিজের টাকা দিয়ে কিনে আনা পানির গ্যালন ঠেলে ঠেলে নিয়ে ঢুকে গেল বাথরুমে। ঊর্মির মনে হলো, যতই দিন যাচ্ছে ঊষা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে।
আর শুধু কি ঊষা? সে নিজেও কি দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে না?
জেদ করে সবটা পানি খরচ না করলেই হতো। কেন যে করল!
কী যে তার হয়েছিল তখন?
·
·
·
চলবে……………………………………………………