কামিনী - পর্ব ২৯ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          দূর বনে ডাহুক ডাকছে। অজানা কত পশুপাখির ডাক নিস্তব্ধ রাতকে আরও বেশি শিহরণ জাগানোর মতন ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। 
রানির মাথার কাছটায় বৈদ্য, রাজ পুরোহিত, মন্ত্রী, সেনাপতি, হেমলক, সখী, ফ্রেয়া দাঁড়িয়ে আছে। সবার মুখ থমথমে। জ্ঞান নেই রানির। অবচেতন অবস্থায় পড়ে আছে বিছানায়। সেই বুক খর্ব করা জৌলুশ, আত্মঅহংকার সবই থিতিয়ে গিয়েছে। খুব ক্ষীণ চলছে শ্বাস-প্রশ্বাস। মনে হচ্ছে যেন বাঁচবেনই না। 
 রাজ বৈদ্য জানালেন কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবেন। রানির কী হয়েছে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। 
হেমলকের সাথে আসা তাদের রাজ বৈদ্যও একই কথা বললেন। 
চিন্তায় এখানের কয়েক জনের মুখই শুকিয়ে গিয়েছে। গত কিছু মাসে যেন সবটা কেমন এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। তাদের রানি তো এতটা ভঙ্গুর, অসহায় কখনো ছিলেন না! তবে? কী এমন হলো যা রানিকে ধীরে ধীরে এতটা নিস্তেজ করে দিলো? 

হেমলক রানির মুখের দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে থেকে বেরিয়ে গেলেন। থমথমে পরিবেশ তার সহ্য হয় না। কেমন ভীত লাগে। মনে হয় কী যেন হারিয়ে যাওয়ার সময় হলে এমন থমথমে হয়ে যায় চারপাশ। 
বেরিয়ে কিছুটা এগুতেই দাসদাসীদের একটি কক্ষের সামনে এসে তার পা থেমে যায়। কক্ষের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত না হয়ে পারেন না। 
 ওদিকে পুরো রাজ্যের ভার যার উপর, রাজ্যের মাথা যিনি, তিনি বিছানায় লেপ্টে আছের অথচ তারই রাজপ্রাসাদের দাসীরা হাস্য ঠাট্টায় মগ্ন। 

এই দুর্দিনে কী এমন হাসির ঘটনা ঘটলো যে প্রতিটা মানুষ এভাবে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে? 
 হেমলকের কৌতূহল হলো। কৌতূহলবশত কক্ষের বাহিরে কান পাততেই শুনতে পেলো নিষ্ঠুরতম কিছু কথা। সেখানে উপস্থিত দাস-দাসীর ভেতর একজন বলল,
“এত পাপ করেছেন, রানি। এর ফল তো অবশ্যই ভোগ করতে হবে তাই না? কম মানুষকে তো মারেননি। কম অত্যাচার করেননি। এখন ভুগছেন।”

 সেই কথাটিকে সহমত প্রদান করে আরেকজন বলল, 
“তাছাড়া নোংরামো কম করেছেন কি? স্নানাগারে অব্দি পুরুষমানুষ ঢুকিয়েছেন। বাইজির নৃত্যশালা পুরুষদের সঙ্গে বসে মদ্যপানে কত রাত কাটিয়েছেন! এসব অনাচারে পাপ কি তার লাগেনি মোটেও?”

 এই কথাটিকে সম্মতি দিলো উপস্থিত সকলে। বলল,
“পাপে রানি ধ্বংস হবেন এখন। দেখো কেবল। এই বোধহয় মরবেন।”

 “মরলে পঞ্চ ভোজ খাওয়াবো আমি। তোমার মুখে ফুল-চন্দন।”
তারপর চাপা কণ্ঠে আবার সবাই হাসল।

হেমলক কেবল দেখলো কীভাবে একজন মানুষের মৃত্যু কামনা এমন অবলীলায় করা যায়। অবাক না হয়ে পারলো না সে। রানি কামিনীকাঞ্চনের নাম শুনলে অনেকের আজও গায়ে কাঁটা দেয়। হয়তো রানি শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকটা পাষাণ কিন্তু কখনো নির্দোষের শাস্তি তো দেননি। সবসময় তার রাজ্যকে রাখতে চেয়েছিলেন অন্যায়মুক্ত তাই তাকে হতে হয়েছিলো হিংস্র। কিন্তু শেষমেশ কী হলো? 
 তারই সাজানো রাজ্য আজ তার মৃত্যু কামনা করছে। 

হেমলক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রানির সাথে তার আত্মিক সম্পর্ক না থাকা সত্বেও বড়ো মায়া হলো রানির জন্য। স্তব্ধ হয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“তুমি বড়ো অভাগিনী রানি। তোমাকে সবাই দেখলো কিন্তু চিনতে পারলো কি কেউ? কার জন্য করলে সব? কাদের জন্য করলে? আজ তোমার খারাপ সময়ে তারাই তোমার মৃত্যু কামনা করছে। তোমার রাজ্য ব্যর্থ, রূপজ্যোতি। ব্যর্থ।”

হেমলকের দীর্ঘশ্বাস না-কি নিজের এমন ব্যর্থ রাজ্যের ধ্বনি রানি অব্দি পৌঁছালো ঠিক বুঝে উঠে গেলো না। তবে রানির চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু ঠিক গড়িয়ে পড়তে দেখা গেলো। নীরবে, নিভৃতে। 

—————

ফুরফুর করে সময় কেটে গেলো। কাছের পাতায় সবুজ রঙ ফিকে হলো। ফুল ঝরে গেলো গোপনেই। এ্যাজেলিয়া রাজ্য ছেড়ে শান্তির দূত পালিয়েছে অচীরেই। হা-হুতাশ, রোগ-শোকে রাজ্যে দেখা দিতে আরম্ভ করল দুর্ভোগ।

অপরদিকে,
 রানির সুস্থতার খোঁজ নেই। শরীর ভেঙে পড়েছে ভীষণ। যার দাপটে প্রাসাদের দালানগুলো কাঁপতো তার কণ্ঠে ক্রমশ বাসা বাঁধতে শুরু করলো অসুখ। 

রানি অসুস্থ শরীর নিয়েই বসে আছেন আরামকেদারায়। তার কক্ষে তিনি আজকাল কাউকে প্রবেশ করতে দেন না। সেদিন রাতের অসুস্থ হওয়ার পর থেকে প্রায় কক্ষ ছেড়ে বেরই হোন না বলা চলে। বৈদ্যরা নানান উপায়, জড়িবুটি প্রতি বেলায় বদলে বদলে দিচ্ছেন অথচ একটু পরিবর্তন নেই।
 বাহিরে পাওয়া গেলো হ্যাব্রোর কণ্ঠস্বর। আগে যদিও তার তেমন অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিলো না কিন্তু রানি এবার সেটা যুক্ত করলেন। তাই সেই আদেশ পালন করতেই সে অনুমতি নিলো কপাটে দাঁড়িয়ে, 
“জরুরি সংবাদ আছে। আমি কি প্রবেশ করবো?”

 রানি ঝিমুচ্ছিলের বৃদ্ধ শালিকের মতন। হ্যাব্রোর কণ্ঠে ঝিমুনি ছেড়ে গা ঝাড়া দিয়ে বসলেন। নিঃসাড় স্বরে অনুমতি দিলেন, 
“এসো, হ্যাব্রো।”

হ্যাব্রো এলো। তার হাতে দেখা গেলো একটি পত্র। পত্রের সাজসজ্জা দেখে সহজেই আঁচ করা যাচ্ছে কোনো রাজ্য থেকে এসেছে। রানি পত্রটি সরাসরি হ্যাব্রোর হাত থেকে নিলেন না। হ্যাব্রোকে একটু দূরের উঁচু চারপেয়ে কাঠের কেদারার সামনে দাঁড়িয়ে পত্রটি পড়তে বললেন।
 রানির কয়েকদিনের আচরণে হ্যাব্রো আশ্চর্য হচ্ছে। কেন রানি সবার থেকে দূরত্ব তৈরি করছেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না। তবুও প্রশ্ন করার অধিকারের ঘাটতিতে আর প্রশ্ন করেনি এখনো। 

রানির আদেশ অনুযায়ী সে পত্রটি খুলল। মনোযোগ সহকারে পত্রটি পড়ল চোখ ঘুরিয়ে। পত্র পড়তে পড়তে তার মুখের পরিবর্তন হলো যা রানি দেখতে পেলেন বেশ। খেয়াল করলেন পরিবর্তনটি।
শুধালেন,
 “আমি খুব ভুল না করলে পত্রটি ইনান ণেকিতানের রাজ্য থেকে এসেছে। তাই তো?”

হ্যাব্রো চমকে গেলো। মানুষটা অসুস্থ হলেও সেই চতুরতা এখনো কমেনি। এখনো বুদ্ধিতে সবার উপরে যেন। 

“কী হলো? পত্রটি রাজা ইনান ণেকিতানের রাজ্য থেকে এসেছে তো তাই না?”

হ্যাব্রো মাথা নাড়ালো, “হ্যাঁ। উনারা বলেছেন উনাদের রাজাকে বন্দী করার সংবাদ উনাদের নিকট পৌঁছে গিয়েছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব রাজা ইনান ণেকিতানের মুক্তি প্রদান করার আদেশ দিয়েছেন। নয়তো ফল ভালো হবে না।”

হ্যাব্রোর কথা থামতেই রানি বাঁকা হাসলেন। দুর্বল শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। অসুস্থ কণ্ঠেও তুমুল জোর দিয়ে বললেন, 
“রানি কামিনীকাঞ্চনকে আদেশ কেউ করার অধিকার রাখে না তা ওদের জানিয়ে দিও, হ্যাব্রো। আর উনাদের পক্ষ থেকে যা সম্ভব ব্যবস্থা নিতে বলো।”

এই প্রথম হ্যাব্রোর মনে হলো রানির সিদ্ধান্ত ভুল। রাজ্যের এই করুণ অবস্থায় কোনো প্রকারের যুদ্ধে জড়ালে তারা আদৌ জয়ী হতে পারবে কি? পারবে না। তাহলে কেন আগ বাড়িয়ে এই যুদ্ধের আরম্ভ করছেন রানি!

হ্যাব্রোকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হ্যাব্রোর মনের কথা ঠিক বুঝে নিলেন রানি। দু-হাত বুকে গুঁজে আত্ম অহং বোধ নিয়ে বললেন,
 “আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে তোমার কি দ্বিধা আছে, হ্যাব্রো?”

হ্যাব্রো থতমত খেলো। আমতাআমতা করে বলল, “না, তেমনটা নয়। কিন্তু আপনি তো অসুস্থ। এ সময় এতটা ঝুঁকি…”

হ্যাব্রোর কথা সমাপ্ত হতে দিলেন না রানি। নিজের খোলা বাতায়নের কাছে গিয়ে কিছুটা আনমনা হয়ে বলল,
“শেষ নিঃশ্বাস অব্দি চেষ্টা করবো বুক ফুলিয়ে বাঁচার, হ্যাব্রো। বাঁচতে হয় বাঘের মতন। মাথা নত করা আমি শিখিনি।”

“আমি আপনার সুস্থতা কামনা করি, রানি।”

রানি গভাক্ষ থেকে মুখ ঘুরিয়ে সরাসরি হ্যাব্রোর দিকে তাকিয়ে খানিক হাসলেন। তপ্ত শ্বাস ফেলে বললেন,
“আমার এই অসুখ আর সারবে না, হ্যাব্রো। আমি ঠিক বুঝতে পারছি। যমদূত হাঁকছে আমাকে।”

হ্যাব্রো হেঁয়ালিপূর্ণ কথায় আঁতকে উঠল,
 “কীসব বলছেন!”

“ঠিকই বলছি। তাই বলি দূরে থাকো। তোমরা অন্তত বেঁচে থাকো। তুমি, সখী.. তোমাদের উপর রাজ্য ভার দিয়ে যেতে চাই।”

 “এসব কেন বলছেন, রানি?”

রানি আবারও হাসলেন। এত মোলায়েম হাসি মানুষটা সচারাচর হাসেন না। 
 বললেন, “রাজ বৈদ্য যতই না বুঝুক কিংবা লুকিয়ে রাখুক, আমি জানি, প্রজাদের সেই মরণব্যাধি ছোঁয়াচে রোগটিই আমাকে ধরেছে। মরণের দূত আমার দরজায়, হ্যাব্রো। চির ছুটির সময় হলো বলে। আমার রাজ্যটা দেখে রাখবে তো?”

হ্যাব্রোর মতন কঠিন, শক্ত সৈনিকের কণ্ঠ কাঁপছে। শরীর কাঁপছে মৃদু। সে কখনো রানি কামিনীকাঞ্চন ব্যতীত এই রাজ্য কল্পনা করেনি। তবে কীভাবে বুঝবে পারবে কি-না রাজ্যের ভার রাখতে? 
রানি কিছুটা এগিয়ে আসতে নিয়েও থেমে গেলেন। তার চোখ জ্বলজ্বল করছে। ভঙ্গুর কণ্ঠে বললেন,
“অনেককিছুই আর জানা হলো না, হ্যাব্রো। যার জন্য এত সংগ্রাম কলে বেঁচে থাকলাম তা জানার সৌভাগ্য হলো না। এমা, তুমি অমন কাঁপছো কেন, হ্যাব্রো? সবাইকেই যেতে হবে এ জীবনে। কেবল পথে রেখে যেতে হবে তোমার মতন বড়ো আপনার চেয়ে আপন মানুষগুলোকে। আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। আমি দু'হাত মেলে তা আলিঙ্গন করতে সদা প্রস্তুত। তবে…”

বাকি কথা রানি বলার আগেই হ্যাব্রো বেরিয়ে গেলো। রানির এই অসুখে জড়ানো কণ্ঠ, ছলছল চোখ তার বুকে তীর ভাঙন ধরিয়েছে। সে আর শুনতে পারছিলো না যে!
 রানি সে যাওয়ার পানে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,
“তবে, মা'কে আর পাওয়া হলো না, হ্যাব্রো। জানা হলো না আমার পিতার কাছে সন্তানের চেয়ে কোন লালসা বড়ো হলো। জানা হলো না আমার স্বামীর ছোঁয়ায় আমার দেহে এত ক্ষত কেন হলো। কত কিছুই আর জানা হলো না, হ্যাব্রো…”
Page 2
          নিস্তব্ধতায় মোড়া রাজপ্রাসাদে কোনো হম্বিতম্বি নেই। নেই কোনো আড়ম্বরপূর্ণতা। ঝিমিয়ে গিয়েছে যেন সকল সাজসজ্জার বেলা। 
থালায় খাবার সাজিয়ে ফ্রেয়ার হাতে দিয়ে যামিনী হাঁটছে সামনে। রানির জন্য সে নিজ হাতে খাবার রেঁধেছে। রানি সখীর হাতের খাবার ভীষণ ভালোবাসে কি-না! 
যামিনী গায়ের অলংকারের শব্দ প্রাসাদের সমস্তটা জুড়ে শব্দ তুলছে। তবুও শব্দ শুনেই বেশ আঁচ করা যায় এটি রানির হাঁটার ধ্বনি নয়। রানির গায়ের গুঞ্জন নয়। রানির সমস্ত চালচলনের ভঙ্গিই যেন ছিল অন্যরকম। সেই সমস্ত কিছুই রানিকে সবার থেকে আলাদা, অনন্য ও বিশেষ করে তুলেছে। 

 যামিনী প্রায় রানির কক্ষের সামনে আসতেই তাকে পিছু ডাকল হ্যাব্রো। গুরু-গম্ভীর কণ্ঠস্বর, 
“আপনি কি রানির কক্ষে যাচ্ছেন?”

যামিনী থামলো। সে ফেরত আসার পর হ্যাব্রো তার সাথে যৎসামান্যই কথা বলেছে। সে-ও যে বিশেষ কথা বলার আগ্রহ দেখিয়েছে ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও তেমন নয়। সে-ও অভিমানে থেকেছে দূরে দূরে। 
 “হ্যাঁ, যাচ্ছি। খাবার এনেছিলাম সখীর জন্য। আজকাল কিছুই তো মুখে তুলছে না সে।”

হ্যাব্রো দু'কদম এগিয়ে এলো। ফ্রেয়ার হাতের স্বর্ণের কারুকাজ সম্পন্ন থালাটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী কী রেঁধেছেন?”

“আজকাল তো সখী আমিষ খাচ্ছে না। তাই সকলই নিরামিষ পদ। পঞ্চ ব্যঞ্জন হতে শুরু করে ছানার পোলাও.. সকলই আছে।”

 “এসব খাবার না দিয়ে চিঁড়ে, খই, দই দিলে বোধহয় ভালো হবে। উনি খাবার তো খেতে পারছেন না।”

যামিনী একটু চোখ উল্টে তাকালো। হ্যাব্রো আজকাল প্রাসাদের কাউকে বিশ্বাস করছে না। রানির কাছাকাছি ঘেঁষতে দিচ্ছে না। হয়তো কোনো কারণ আছে। কিন্তু তার আনা খাবার গুলোও কি সেই অবিশ্বাসের ঘরে ফেলল?
 যামিনী হেয় করে শুধালো, 
“কেন? এটা খেলে কী সমস্যা? আমি কিছু মিশিয়ে আনিনি।”

যামিনীর হেয় করা কথাটা ঠিক বুদ্ধিমান হ্যাব্রো ধরতে পারল। সে-ও বেশ গা-ছাড়া ভাবে বলল,
“মিশিয়ে এনেছেন কী আনেননি তা জিজ্ঞেস করিনি। কেবল বললাম রানি এগুলো খেতে পারবেন না। তার শক্ত খাবার গিলতে তো কষ্ট হচ্ছে তাই।”

 “সব খোঁজ রাখছেন! বেশ ভালো, বেশ ভালো।”

হ্যাব্রো যামিনীর কথায় মুখ ঘুরিয়ে নিলো। তাকালো ফ্রেয়ার দিকে। ওর মাথাটা নতই। হ্যাব্রো মাঝে মাঝে ভেবে অবাক হয় যামিনী হুটহাট এমন কথা বলে কীভাবে? রানিকে এসব কথা বলাটা অসম্মানের তা কি বুঝতে পারে না সে? তার নির্বোধ আচরণের জন্য রানি এবং সে নিজেও তো ছোটো হয়!

হ্যাব্রো যামিনীর সঙ্গে আর কথা বাড়ালো না। ফ্রেয়ার দিকে তাকিয়েই নির্দেশ করল,
“রানির জন্য দই, চিড়ে, খই আর কিছু খেজুর আনো। সাথে কেশর দুধ। রানি সেটাই খাবে। আমি দাঁড়িয়ে থাকবো পাকশালাতে।”

ফ্রেয়া নত মস্তকই নাড়াল। যামিনীর দিকে একবারও না তাকিয়ে হাঁটতে আরম্ভ করল। যামিনীকে কী অনায়াসেই যেন বুঝিয়ে দিল তার যোগ্যতাটা কতটুকু। সে কতটুকু নিম্নস্তরে আছে! 
 ফ্রেয়ার পেছনে পেছনে চলে গেলো হ্যাব্রোও। যামিনীর অনুভূতি বুঝার নূন্যতম চেষ্টা তার ভেতর দেখা গেলো না। 
রাগে-দুঃখে যামিনীর চোখ টলমল করল। কিন্তু কার উপরে সেই রাগ দেখাবে? কাকেই বা বলবে অভিমানের কথা?

হ্যাব্রো ও ফ্রেয়াকে সরে যেতে দেখেই দূর থেকে ছুটে এলো যামিনীর খাসদাসী। ইনিয়েবিনিয়ে বলল,
“রানি কিন্তু চাইলেই আপনাকে এই মহলের একটা দাপুটে জায়গা দিতে পারতেন। কিন্তু দেননি। আপনাকে সবসময় পায়ের নিচে রাখতে চেয়েছেন কি-না!”

 যামিনী কোমল চোখে তাকিয়ে বলল, “আমি তো পায়ের নিচেরই মানুষ, শশীপর্ণা।”

শশীপর্ণা নামের মেয়েটির চোখ চকচক করে উঠল। আশকারা পেতেই আরও আগ্রহ নিয়ে বলল,
“আপনি সবসময় নিজের অবস্থানকে মেনে নিয়েছেন বলেই আপনার এই পরিণতি। মুখ ফুটে তো চাইতে হবে। আর নয়তো…”

থামল শশীপর্ণা। সম্পূর্ণ কথাটি বলল না। 
যামিনী কৌতূহলী কণ্ঠে বলল,
 “নয়তো?”

শশীপূর্ণা সাবধানী চোখ চারপাশে বুলিয়ে নিয়ে কিছুটা ফিসফিসিয়ে বলল, 
“নয়তো ছিনিয়ে নিতে হবে।”
 যামিনী কিছু বলল না বিপরীতে। থমথমে ভাবে তাকিয়ে রইল শশীপর্ণার দিকে। 

—————

রানি তৈরি হয়েছে বেশ দুর্বল হাতে। তিনি নিজে নিজে কখনো তৈরি হোন না। সবসময় দাসদাসী ও তার সখী মিলে তাকে তৈরি করে দেয়। 
তবে আজকাল যেহেতু তিনি দূরে থাকছেন তাই কাউকেই কাছাকাছি ভিড়তে দিচ্ছেন না। এবং নিজের সবটুকু নিজে একাই করছেন। 
 রানির তৈরি হওয়া প্রায় শেষদিকেই হ্যাব্রো এলো। অনুমতি নিয়েই প্রবেশ করল। তবে বেশি কাছাকাছি কিংবা কক্ষের বেশি ভেতরে আসতে পারল না। কপাট থেকে একটু ভেতরে এসে দাঁড়াতে হলো। 

রানির যেহেতু হাত-পায়ে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছোটো ছোটো ফুসকুড়ির মতন উঠছে তাই হাত-পা তেমন নাড়াতে পারেন না। তীব্র কষ্ট হয়। অত্যাধিক শুভ্র শরীরটায় লালচে লালচে রঙগুলো স্পষ্টই। 
তাই হাত-পায়ের ব্যাথা নিয়ে একটু অসুবিধা হচ্ছেই। সেই অসুবিধা হ্যাব্রো ঠিক খেয়াল করল। ব্যস্ত স্বরে বলল, 
“আপনার সখী কিংবা দাসীদের ডেকে দিই রানি? আপনার সুবিধে হবে কিছুটা।”

রানি তখন তার বিশাল চুল গুলো গুছিয়ে নিচ্ছেন। আলতো করে তাকিয়ে, মাথা নাড়ালেন, 
“প্রয়োজন নেই। আমার কাছে কেউ-ই ঘেঁষতে পারবে না হ্যাব্রো, তোমাকে তো বলেছিই।”

 “আপনি যেমনটা ভাবছেন, তেমনটা না-ও তো হতে পারে তাই না?”

“না হলে আমার পরম সৌভাগ্য। তবুও সাবধানতার মার নেই। আমার জন্য সখীর কিংবা কারো ক্ষতি হোক চাচ্ছি না।”

 “আপনার সখী নাহয় না এলো। অন্য কোনো দাসীকে…”

হ্যাব্রোর কথা শেষ হওয়ার আগেই রানি সরাসরি দৃষ্টি রেখে বললেন,
“অন্য কোনো দাসী কি আমার আপন নয়, হ্যাব্রো? কেবল সখীই আপন? এই রাজ্যের সকল প্রজা আমার কাছে একই রকম। আমার কাছের। আমি ভেদাভেদ কখনো কি করেছি?”

হ্যাব্রো মাথা নত করে ফেলল। যদিও সে তেমন করে বলেনি। 

রানি বেশ কষ্টে তৈরি হয়ে গেলেন। হ্যাব্রোকে আবার জিজ্ঞেস করলেন, 
“আমি যেভাবে বলেছি সেভাবে প্রহরীদের দূরত্ব বজায় রেখে পথে দাঁড়াতে বলেছে তো?”

হ্যাব্রো সম্মতি দিলো, “হ্যাঁ। এখান থেকে দাতব্য চিকিৎসালয় অব্দি প্রহরী দাঁড় করানো। যেন কেউ আপনাকে ছুঁতে না পারে। এবং আপনার নিরাপত্তার জন্য এটি করা হয়েছে বলেই সকলকে অবগত করা হয়েছে। অসুস্থতার কথা আপনার কথামতো গোপনেই রাখলাম।”

রানি হাসলেন। চোখের পলক ফেলে নিজের স্বস্তিবোধ করার প্রতিক্রিয়া জানালেন। 

“তোমাকে এজন্য এতটা ভরসা করি। মন্ত্রীমহোদয়ও আজ অব্দি সেই স্থানটি নিতে পারলেন না।”

হ্যাব্রো প্রতিত্তোরে বুকে হাত দিয়ে মাথা খানিক ঝুঁকিয়ে সম্মান প্রদর্শন করল।

রানি যখন প্রাসাদে ঝংকার তুলে নামলেন তখন সবাই তাকিয়ে রইল আকর্ষণ নিয়ে। অসুস্থ দেহ ঠিকরে পড়ছে লাবণ্যতা। ফ্যাকাশে হয়ে গেছে মুখটা কিন্তু সৌন্দর্যতায় খামতি টানতে পারেনি সেই অসুখ। 
 আজ রানিকে পূর্বের সাজসজ্জায় আগের মতনই লাবণ্যময়ী লাগল। তিনি যেই দাতব্য চিকিৎসালয় তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তার বন্দোবস্ত হয়ে গিয়েছে। কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে। এগিয়ে গিয়েছে অনেকটা। বাহিরের রাজ্যের শ্রমিক আনিয়েছেন ভারি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। আজ মৃত্তিকা পূজো আছে। রাজ্যের রানি তিনি। তিনিই যদি না উপস্থিত হন তাহলে প্রজারা বুঝবেও বা কীভাবে তাদের জন্য রানির টান কতটুকু! তাই সেই উদ্দেশ্যেই রওনা হওয়া। 

বিশাল রাজপ্রাসাদ হাঁটতে হাঁটতে যেতে লাগলেন রানি। তার বেশ দূরে অবস্থান করে হাঁটছে হ্যাব্রো। রানি হাঁটতে হাঁটতেই জিজ্ঞেস করলেন, 
“ক্যামিলাস রাজ্যের রাজার ভ্রাতা হেমলক পিয়ার্স রাজ্যে গিয়েছেন বেশ কিছুদিন হয়েছে, তাই না? কোনো জরুরি প্রয়োজনে কি গিয়েছেন? কিছু জানো?”

 হ্যাব্রোও হাঁটতে হাঁটতে উত্তর দিল, “না, বিশেষ কিছু বলেননি। তবে বলেছিলেন শীগ্রই ফিরবেন। হয়তো আজকালের ভেতর চলে আসবেন!”

রানি আর কিছু বললেন না। তবে ঠিক প্রাসাদ থেকে বের হওয়ার সময়ই পিছু ডাকল যামিনী। বেশ অনেকটা পেছন থেকে জোরে বলল,
“সখী, আমাকে নিবে না আজ?”

রানি দাঁড়িয়ে গেলেন। যাত্রা কালে কেউ পিছু ডাকুক রানি তা মোটেও পছন্দ করেন না। কঠিন কণ্ঠে তিনি বললেন,
“পিছু ডাকলে কেন, সখী? এটা আমার অপছন্দের, জানো না?”

যামিনীর মুখটা কালো হয়ে গেলো। মাথা নামিয়ে ফেলল সঙ্গে সঙ্গে। 
 অপরাধী স্বরে, “দুঃখীত” বলেই হনহনিয়ে চলে গেলো ভেতরে। 

কামিনী তা দেখে তপ্ত শ্বাস ফেললেন। সখীকে আজকাল তার বড়ো অপরিচিত লাগে। যেই সখী প্রাসাদ ছেড়ে গিয়েছিলো এবং যে ফিরে এসেছে তাদের ভেতর বিস্তর পার্থক্য। বিশাল অমিল। 
কে জানে? কেবল তারই এমনটা লাগছে কিনা! 

—————

 গভীর নিশুতি রাত। পুরো রাজ্য তখন ঘুমে মগ্ন। ঘন জঙ্গল দিয়ে কারো হাঁটার শব্দ স্পষ্ট। বেশ ব্যস্ত পায়ে হেঁটে আসছে। তীব্র থেকে সেই শব্দ তীব্রতর হলো। জঙ্গলের গাঢ় অন্ধকার ভেদ করে আসতে দেখা গেলো চাদরে মোড়ানো কাউকে। হাতে তার মশাল। মশালের মাথায় আগুনের ফুলকি বাতাসের তালে তালে দোল খাচ্ছে। 

জঙ্গলের মাঝামাঝি আসতেই পায়ের শব্দটি থেমে গেলো। তখন একজন মানুষের পায়ের শব্দের বদলে শোনা গেলো বহু মানুষের পদধ্বনি ও ঘোড়ার শব্দ। সেই মশাল হাতে রাখা মানুষটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে বেশ অনেকগুলো মানুষ। তাদেরও মুখ ঢাকা। হাতে মশাল। 

সেই হাতে মশাল থাকা বিশাল আকৃতির লোকগুলোর ভেতর একজন এগিয়ে এসেই টেনে খুলে ফেললো তাদের মধ্যিখানের মানুষটির মুখের সামনের কাপড়টুকু। 
 মশালের আলোয় তখন হলদেটে, মাখনরঙা একটি চেহারা ভেসে উঠল তাদের চোখে। চোখগুলো ভাসা, ভাসা তেজস্বী। টানা কাজল সেই তেজকে দ্বিগুণ ভাবে প্রকাশ করছে যেন। 

দানবীয় আকৃতির লোকগুলো যেন কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে পেয়ে গেলো। হাসি দেখা দিলো প্রত্যেকের মুখে। বুক ফুলিয়ে বলল,
“এবার রানি, আপনার যে বন্দী হওয়ার পালা। মুক্ত পৃথিবী দেখার দিন শেষ হলো আপনার।”

রানি কামিনী স্তব্ধ হয়ে গেলে। অপরিচিত পুরুষগণের দিকে তাজ্জব ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন। এই মাঝরাতে তিনি কাউকে না জানিয়ে বের হতে বাধ্য হয়েছিলেন কেবল আর কেবলমাত্র নিষিদ্ধ কুটিরের থেকে তার বহু বছরের কাঙ্ক্ষিত মানুষটির খোঁজ আসার পত্র পেয়ে। দাতব্য চিকিৎসালয় থেকে ফিরেই গোপনে আসা পত্রটি পেয়ে আর কাউকে জানাননি। কাকপক্ষীও যেন টের না পায় তেমন ভাবে বের হয়েছেন। 
অথচ এই দস্যুর দল কীভাবে জানলো সে এখানে? কেই-বা খোঁজ দিলো? রাজপ্রাসাদের কেউ?

 রানির ভাবনার ভেতরই তার মাথায় তীব্র আঘাত করা হলো। চারপাশ অন্ধকার হয়ে এলো চোখের সামনে। একে অসুস্থ শরীর, দেহে জর্জরিত ব্যথা, তার উপর মাথার আকস্মিক আঘাতে আর দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেলেন না। তবুও হেরে যাওয়ার ধর্ম তার নেই বলেই পিঠ থেকে নিজের তলোয়ার বের করার চেষ্টা করলেন। এর আগেই দ্বিতীয় আঘাতটি করা হলো তার হাতে। রানি হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন। মাথা ঘুরাচ্ছে তার। তবে এভাবে প্রাণ নাশ হবে ভাবতেও পারছেন না। এভাবে তাকে হারিয়ে যেতে হবে তা তার কাছে অকল্পনীয়। কিন্তু এমন বিশ্বাসঘাতকতাটা শেষমেশ কে করল তার উত্তর জানার জন্য প্রাণ টুকু তীব্র আগ্রহ বোধ করতে লাগল। 

তিনি অস্ফুটস্বরে বললেন, “হে কাপুরুষ, অস্ত্রহীন নারীর শরীরে আঘাত করে পুরুষত্ব হারিও না। আমাকে অস্ত্র ধরার সময় দাও। সমগ্র পুরুষজাতির উপর কালি লেপন করো না। রানি কামিনীকাঞ্চনকে একবার অস্ত্র ধারণ করতে দাও।”

কিন্তু তাকে সেই সুযোগ দেওয়া হলো না। 
 কারণ সমগ্র বিশ্ব জানে, রানি কামিনী অস্ত্র বিদ্যায় কতটা তুখোড়। তাকে অস্ত্র ধারণ করতে দিলেই সকল শক্তি নিমিষেই তার পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়বে। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp