কামিনী - পর্ব ২৭ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          সন্তান হারানোর শোক একটি মায়ের জন্য নরকসম যন্ত্রণার। যাকে দশমাস নিজের দেহে ধারণ করে রাখেন একজন নারী, তার মৃত্যু স্বাভাবিক ভাবেই সেই মা মানতে পারেন না। অজ্ঞাত, মৃত বাচ্চাটির মায়ের ক্ষেত্রেও ভিন্ন হলো না। মহিলাটির বুক চাপড়ে কান্নার শব্দে ভারি হয়ে গেছে রাজপ্রাসাদের প্রাচীর। তার সাথে তো রানির প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও শাপ আছেই। 
বিশাল রাজকীয় লোহার কপাটের সামনে দেহরক্ষীরা শক্ত-পোক্ত ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সতর্ক দৃষ্টি তাদের। মহিলাটিকে যেমন উন্মাদ দেখাচ্ছে, কখন না কখন তেড়ে এসে রানির উপর আক্রমণ করে বসে কে জানে! 
 সেনাপতি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না আর। কারণ এই ক্ষোভ, এই শোক তো রানির প্রাপ্য নয়। যেখানে রানি নিজে একটি অপরিচিত বাচ্চাকে এভাবে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলো তার বিপরীতে কি-না এসব পাওনা? 
সেনাপতি এগিয়ে যেতে নিলেই থামিয়ে দিলেন রানি। সেনাপতির প্রতিটা পদক্ষেপের কারণ তার জানা। তাই আদেশ করলেন,
“থামো, হ্যাব্রো। উনাকে কিছু বলো না।”

হ্যাব্রো থেমে গেলে আদেশের সঙ্গে সঙ্গেই। কপাল কুঞ্চিত করে প্রশ্ন করল, “কেন বলবো না? আপনি কি এইসব অভিশাপ আদৌ প্রাপ্য? আপনি তো কিছু করেননি। তবে কেন ক্ষোভের স্বীকার হবেন?”

 রানি ক্ষীণ ভাবে বাঁকা হাসলেন। মাথা নাড়ালের বিজ্ঞ ভঙ্গিতে। 
“এই ক্ষোভ কি আজকের? আজকের নয় যে! এবং একটি ঘটনারও নয়। এই রাজ্যবাসীর মনে আমাকে নিয়ে ক্ষোভ জমেছে বহু বছর ধরে। উনিও ব্যতিক্রম নয়। তাই এক ঘটনায় বহু বছরের কথাই বেরিয়ে এসেছে।” 

 “সেই রাগ যা আছে তা তো অন্য কারণে। কিন্তু উপকারের প্রতিদানে সেই রাগ উগড়ে দেওয়া কি উচিত?”

“উচিত, অনুচিত মায়ের মন বুঝছে না। উনি সন্তান হারিয়েছেন, তাই উনি জানেন না উনি কী বলছেন, কেন বলছেন। ধৈর্য ধরো।”

যেহেতু রানি ধৈর্য ধরতে বলেছেন তাই সেই আদেশ অমান্য করার সাধ্য হ্যাব্রোর নেই। সে মাথা নাড়ালো। মাথা নাড়িয়ে সরে গেলো। 
মহিলা তখন দু-হাত তুলে চিৎকার করে অভিযোগ করছেন,
 “হে করুণাময়, তুমি এই হিংস্র নারীর বিচার করো। তুমি ওকে সন্তানহারা করো। তোমার দরবারে আমি অভিশাপ দিয়ে গেলাম। তুমি ওর সব কেঁড়ে নিও। ওকে নিঃস্ব করে দিও।”

বুঝাই যাচ্ছে নারীটি পুরো ভ্রান্ত ধারণাতে আছেন। তিনি হয়তো ভাবছেন তার ছোটো শিশুটির প্রাণ নিয়েছেন রানি। 
হ্যাব্রো চুপ করে থাকলেও হেমলক রানির আদেশ কিংবা উপদেশের আশায় থাকল না। এগিয়ে গেলো কপাটের কাছে। মহিলাটির একদম কাছটায়। সাদা, সুন্দর মুখটি ততক্ষণে লালচে আভায় ছেঁয়ে গিয়েছে। কান গুলোও কেমন লাল হয়েছে!
“কাকে অভিশাপ দিচ্ছেন আপনি? কেনই-বা দিচ্ছেন? রানি কামিনীকাঞ্চনকে? যে রানি আপনার মৃত শিশুটির দেহ জঙ্গল থেকে উদ্ধার করেছেন তাকে? যে রানি তার সন্তানের ন্যায় আপনার শিশুর অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেছে তাকে এসব অশোভনীয় কথা বলে কী প্রমাণ করছেন? জানি, মাতৃ মনের ব্যথা ভিন্ন কিন্তু তাই বলে স্থান, কাল, পাত্র ভুলে যাবেন না। কিংবা সব না জেনেই অভিযোগ আর অভিশাপ ছুঁড়ে মারবেন না।”

 হেমলকের কথা ক্রন্দনরত নারীটির মনে কোনো পার্থক্য জাগাতে পারেনি। তিনি আরও ক্ষুব্ধ হলেন। সর্বস্ব হারিয়ে ফেলা মানুষের মতন ভয়ঙ্কর উল্কার ন্যায় হয়ে উঠলেন। আক্রোশে ফেটে পড়ে বললেন,
“ঐ রানি কতটুকু সাধু তা আমরা জানি। পুরো রাজ্যবাসী জানে। হিংস্র উনি। বর্বর, প্রাণ খেঁকো উনি।”

হেমলক অবাক না-হয়ে পারলো না। কেবল সে নয় বাকি সবাই ই অবাক হচ্ছে। রানির মুখের উপর এমন করে কেউ, কখনো বলেনি। এত বাজে ভাবে তাও। তাছাড়া এবার তো রানি কিছু খারাপ করেননি! বরং ভালোই করেছিলেন। একটি অজ্ঞাত শিশুর মৃতদেহর সর্বস্ব যত্ন করেছিলেন। তারপরেও কেন শিশুর মা এমন করছেন কে জানে?
 হেমলক রানির দিকে তাকালেন, ভারি কণ্ঠে বললেন, “তোমার উচিত প্রাসাদে চলে যাওয়া। উনার মনে তো প্রতি কোনো ভালোবাসা নেই। বিন্দুমাত্র সম্মান নেই। শোকে মানুষ উন্মাদ হয়, তাই বলে এত হিংস্রতা!”

রানি চোখের ইশারায় চুপ থাকতে বললেন হ্যাব্রোকে। তার মনে খটকা লাগছে। সংশয়ের উদয় হয়েছে। নাহয় তিনি খারাপই, তাই বলে সদ্য সন্তানহারা একজন মা তো এতটা হিংস্র হতে পারে না! 
রানি এগিয়ে এলেন নিজেই। হেমলকের পাশাপাশি দাঁড়ালেন। তার চোখে-মুখে একটি কৌতূহল। শুধালেন,
“আমি খারাপ, আমি জানি। কিন্তু তার সাথে কি আপনার সন্তানের মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে? অভিশাপ আপনি দিতেই পারেন। তবে কারণটুকু জানান আগে।”

মহিলা আরও এগিয়ে এলো হিংস্র গতিতে। যেন এক্ষুণি প্রাণ নিয়ে নিবে রানির। দেহরক্ষীরা পথরোধ না করলে নিয়েই নিতো হয়তো! চিৎকার করে বলল, 
“আপনি, আপনি সেদিন মাঝ রাতে লোক পাঠিয়ে ছিলেন না? আমার সন্তানকে আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন না? আজ এসে কারণ জানতে চাচ্ছেন? নিষ্ঠুর রানি আপনি। ভয়ংকর, রাক্ষসী আপনি।”

নারীটির কথা যেন সকলের মাথার উপর দিয়ে গেলো। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেলেন রানি। তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে বললেন, 
“আমি লোক পাঠিয়েছি?”

মহিলা দ্বিগুণ চ্যাঁচামেচি করে বললেন, “হ্যাঁ আপনি। সেদিন মাঝ রাতে একজন বড়ো, গম্ভীর লোক এসে বললেন রানি আপনার শিশুটিকে চেয়েছেন। রাজ্যের কিছু সংখ্যক প্রজার শিশুদের রাজপ্রাসাদে আনা হবে। এবং সেই পরিবারকে দেওয়া হবে স্বর্ণ মুদ্রা।”

মহিলাটির কথা স্পষ্ট হলেও রানির কাছে অস্বচ্ছ। তিনি এমন কিছুই বলেননি। কাউকে না পাঠিয়েছেন। তাহলে তার নাম করে কেই-বা এমনটা করল! রানি দ্বিধান্বিত হলেন। কথার তাল কেটে গেলো। কিন্তু সেই তাল মুঠোয় নিলো হেমলক পিয়ার্স। সন্ধানী, তীক্ষ্ণ যুক্তিতে শুধালেন,
 “আপনারা তারপর নিজের শিশুকে দিয়ে দিলেন লোকটার কাছে?”

মহিলাটির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ আরেকটি মহিলা এতক্ষণে মুখ খুললেন, “হ্যাঁ। যেখানে স্বয়ং রানি আদেশ করেছেন সেখানে কীভাবে না দিই?”

 “রানি আদেশ করেছেন বলেই দিয়েছিলেন না স্বর্ণ মুদ্রার লোভ সংবরণ করতে পারেননি বলে দিয়ে ছিলেন? তাছাড়া আপনি কী হন উনার?”

হেমলকের কথাটি যুক্তিযুক্ত ছিলো তা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাওয়া মহিলা দ্বয়ের মুখ দেখেই বোঝা গেলো। বৃদ্ধ মহিলাটি আমতাআমতা করে বললেন, “আমি ওর মা।”

শিশুটির মায়ের কান্নায় কিছুটা কমতি দেখা দিলো। হেমলকের ঐরকম কথার পরই বোধহয় সেই কমতিটুকু এলো। হেমলক মাথা নাড়ালো কতক্ষণ। এরপর আবার ধীর পায়ে গেলো রানির কাছে। প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল,
“তোমার উচিত উনাদের কিছু স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে বিদায় করা। এতক্ষণে এই বিষয়টি একেবারেই স্পষ্ট যে উনাদের সন্তান হারানোর শোকের চেয়ে বেশি আগ্রহ অন্য দিকে। স্বর্ণ মুদ্রা দাও, দেখবে ঠিক সব চুপ হয়ে গিয়েছে।”

 রানি কামিনের তখনো ভাবুক। হেমলকের দিকে একবার চোখ উল্টে তাকালেনও। তার চোখে-মুখে একটি চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বললেন,
“কিন্তু আমি তো কোনো লোকই পাঠালাম না! উনারা বলছেন আমি নাকি লোক পাঠিয়েছি!”

হেমলক রানির এই দ্বিধা বুঝলেন। 
“দেখো, অনেক সময় অভাবের কাছে সব ছোটো হয়ে যায়। হতে পারে উনারাই নিজের সন্তানকে মেরে এভাবে সাজিয়েছেন বিষয়টা! আবার না-ও হতে পারে। তুমি স্বর্ণ মুদ্রা দাও, দেখবে সব আবার ঠিক হয়ে যাবে। স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে আশ্বস্ত করে দাও যে তুমি এর শেষটুকু খুঁজে বের করবে।”
হেমলকের বুদ্ধিতে সন্তুষ্ট হলেন রানি। রাজনীতি লোকটার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে তা এই বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলেই বুঝা যাচ্ছে বেশ। 

রানি মাথা নাড়ালেন, “শিল্পীর ভেতর কূটনীতি এত তীব্র হয় জানতাম না। শুনে ছিলাম যেকোনো শিল্পীই নাকি মাটির মানুষ হোন!”

 “সে আমি মাটির না পাথরের তা পরে না-হয় হিসেব নিকেশ হোক?” কথাটি বলেই মৃদু হাসলো হেমলক। তার নীল, ঘোলাটে চোখগুলো সেই হাসিতে আর জ্বলজ্বল করল। অতি চমৎকার লাগল। 

হেমলকের দেখিয়ে দেওয়া পথই অনুসরণ করলেন রানি। আরও এগিয়ে এলেন নারীটির দিকে। মুখটি বরাবরের মতন কঠিন করে বললেন, “আমি এমন কোনো নির্দেশ দিইনি। আমার নির্দেশ প্রকাশ্যে ঘোষিত হয়। রাত্রির অন্ধকারে রানি কামিনীকাঞ্চন কোনো কাজ করেন না। তবুও আপনাদের সাথে যা হয়েছে তা ভীষণ নিন্দনীয়। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু ব্যাখ্যা বের করবো এবং আপনার শিশু হত্যার সর্বস্ব বিচার করবো।” 
  একটু থেমে রানি হ্যাব্রোর দিকে তাকালেন। আদেশ করে বললেন, “সেনাপতি হ্যাব্রো, উনাদের পঞ্চাশটি স্বর্ণ মুদ্রা প্রদান করো। উনার সন্তান শোক আমি দূর করতে পারব না কিন্তু অর্থ অভাব দূর করতে পারবো। স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে উনাদের নিজেদের বাসগৃহে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।”

মায়ের শোক যেন নিমিষেই মিলিয়ে গেলো। রানি দেখলো কীভাবে মায়ের আহাজারি লোভের কাছে হেরে গেলো। 
ঠিক তখনই কোথা থেকে একটি তীর ছুটে এসে তীব্র ভাবে আঘাত করল রানির গায়ে। বিষে মাখা তীর চুইয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়লো রানির শরীর থেকে। তাজ্জব বনে তাকাতেই রানি দেখলো চেনা পুরুষালি দেহটি এগিয়ে আসছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp