নিশুতি রাতে বন্য প্রাণীর ডাক ভেসে আসছে জঙ্গল থেকে। আশেপাশে তেমন ঘন জঙ্গল না থাকলেও হরেক রকমের ডাকের সমাহার ঠিক ঠিক কানে ভেসে এলো। রানি দাঁড়িয়ে আছেন প্রাসাদের সামনে। প্রাসাদের ছাঁদ থেকে নিচে আসতে আসতে ইথুনকে আর ধরতে পারলেন না তিনি। প্রাসাদের পেছনের দিকটাও ঘুরে এলেন। এত দ্রুত মানুষ চলাচল করতে পারে ভেবেই তিনি হয়রান হলেন।
ফিনফিনে বাতাসে তার মাথার ওড়নাটি দোল খেতে লাগলো। শীতল হাওয়ায় শরীরটা মুহূতেই হালকা হয়ে এলো। রানি ইথুনকে না পাওয়া গেলেও এই বাতাসের সান্নিধ্য তাকে বেশ আরাম প্রদান করল।
“সম্রাজ্ঞী, কি করছো এখানে?”
হেমলকের কণ্ঠ পেয়ে রানি কিছুটা চমকে ওঠলেন। এত রাতে তো এই মানুষটার জেগে থাকার কথা নয়! তবে?
রানি পেছনে ফিরলের তৎক্ষণাৎ। দেখলেন হেমলক দাঁড়িয়ে আছে কিছুটা নিকটেই। পরনে তার কালো পাঞ্জাবিটা ঢিমে আলোতে ঝলমলে সুন্দর লাগছে। মানুষটাও বা কম সুন্দর কী?
নীলাভ চোখ দুটির দিকে তাকালে কার না মায়া লাগবে? কার না জাগবে আকর্ষণ?
রানির উত্তর না পেয়ে এগিয়ে এলো হেমলক। তার ঠোঁট জুড়ে থাকা নিভু নিভু হাসিটা বিদ্যমান এখনো।
“কোন ধ্যানে পড়লো রানি যে আমায় দেখছো না?”
রানির এবার চোখের পলক পড়ল। চোখের মণি গুলো ঘুরিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বলল,
“আপনাকে দেখে বড়োজোর আর কী হবে?”
“কেন? প্রেমও তো হতে পারে তাই না?”
“আমাকে নিয়ে এত চিত্র এঁকেছেন, এতকিছু জেনেছেন আর একটুকু জানলেন না যে, রানি প্রেমকে বিশ্বাস করে না? রানি কেবল বিশ্বাস করে এই পৃথিবীতে পুরুষের ভেতর একমাত্র কাম-ই সত্য। আর বাকিসব তাদের অভিনয়।”
“গুটি কয়েক পুরুষের দোষ কি তুমি কলঙ্কিত করতে পারো গোটা পুরুষ জাতিকে?”
“কলঙ্কিত কোথায় করেছি? সত্যি কথা শুনতে হয়তো তেঁতো হয় তবে কলঙ্কিত করার অপবাদ বলা যায় না তা। আপনি বলুন তো হলফ করে যে, আপনার ভেতর কোনো কাম নেই। বলতে পারবেন কি?”
রানির এই কথার ঝাঁঝ, পুরুষ সমাজের উপর তোলা আঙ্গুল হেমলককে বিচলিত করতে পারল না। সে আরেক পা সামনে এসে এবার দাঁড়ালো একেবারে রানির মুখোমুখি। তার চোখের দৃষ্টি গিয়ে আটকেছে রানির চোখের দৃষ্টিতে। সে ফিসফিসিয়ে বলল,
“কাম কার নেই, রানি? এই পৃথিবীতে সবাইকেই তো কাম দিয়ে পাঠিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা। এখন যদি তোমায় কেউ ভালোবেসে কাছে আসে, হাত ধরে পেতে চায় তোমার কপালের মধ্যিখানে চুম্বন আঁকার অধিকার তুমি তাকে না করতে পারবে? তার মানে এটা নয় যে, তুমি কামের বশীভূত হয়ে না করতে ভুলে গিয়েছো। তার মানে এটাও হয় যে তুমি প্রেমের এই আলিঙ্গনকে, কামকে দুটো মানুষের ভেতরে সেতু হিসেবে নিয়েছো। কাম ততক্ষণ অব্দি খারাপ নয় যতক্ষণ অব্দি না সেটা কাউকে পাওয়ার বাসনায় অন্ধ হয়ে যায়।”
“তবে বলা যায় আপনার ভ্রাতা হ্যাভেনের আকাঙ্ক্ষা নেহাৎই কাম ছিলো? আপনি সেই কামকে প্রাধান্য দিয়ে আমাকে নিয়ে এসেছিলেন এই রাজ্যে এবং কেবল নিয়ে এসেই ক্ষান্ত হননি। আপনার ভাইয়ের কক্ষে ছুঁড়ে ফেলেছিলেন। মনে আছে কি সেসব?”
হেমলক রানির চোখ থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। চুপ করে গেলো যেন আচমকাই। উত্তর দিলো না কিছুই। নিজেকে নিষ্পাপ প্রমাণ করার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করল না।
রানি হেমলকের এই চোখ ঘুরিয়ে নেওয়া দেখে হাসল। বলল,
“চিত্রশিল্পী হেমলক পিয়ার্স বোধহয় রাজনীতিতে বড্ড কাঁচা তাই না?”
“তোমার সামনে আমি তো রাজনীতির প্রেক্ষিতে আসি না, সুধাকান্তা। তোমার নিকট আমি আছি বিনা দাবীতে, নিঃশর্তে।”
“পুরুষ কখনো আমার কাছে নিঃশর্তে আসেননি।”
“ তোমার মনে পুরুষ সম্বন্ধে যেই ধারণার জন্ম রয়েছে তা খণ্ডন করা এত সহজ নয় আমি জানি। তবে এতটুকু মনে রেখো, তোমায় আমি ছাড়ছি না। এই সমগ্র পৃথিবী ছাড়তে পারলেও তোমাকে আমি ছাড়বো না। কখনোই না।”
“এ সমস্ত কিছুই বলার জন্য বলা।”
রানির কথায় আর প্রতিত্তোর করল না হেমলক। কেবল হাসলো।
রানি আড়চোখে সেই হাসির দিকে তাকিয়ে রইল। হেমলককে তিনি কথার বাণে বিদ্ধ করতে পারছেন না। হেমলক তার কথার প্যাঁচেও জড়াচ্ছে না। হয় লোকটা বড্ড চতুর নয়তো যা বলছে তা সত্য। কারণ যে নিজে সত্য তাকে টলানোর সাধ্যি কারো নেই।
—————
ক্যামিলাস রাজ্যের প্রজাদের ভেতর নতুন রানির কর্মকাণ্ডে নিয়ে বেশ চর্চা শুরু হয়ে গেলো কিছুদিনেই। প্রথমে যখন প্রজাদের থেকে কর আদায় করা হচ্ছিলো জোর দিয়ে তখন অনেকেই রানির আসন নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলো কিন্তু যেই না ভিনদেশী বণিকদের আদেশনামা দেওয়া হলো রাজ্যের নারীদের উত্যক্ত না করতে সেই থেকে জয় জয়কার পড়ল রানির নামে।
আজকেও রাজপ্রাসাদে প্রজারা এসেছে বিচার নিয়ে। রানি ছিলেন তার কক্ষে। মন্ত্রী ত্রিপাদ কুমার দ্রুত সংবাদ দিতে উপস্থিত হলেন কক্ষ মাঝে। বিচলিত কণ্ঠে বললেন,
“রানি, কয়েকজন প্রজা এসেছেন। বৈঠকখানায় তারা উপস্থিত আছেন। এখুনিই আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।”
রানি বিশ্রামের আয়োজন করছিলেন সবে। ত্রিপাদ কুমারের এমন হন্তদন্ত হওয়া তার মনে সন্দেহ জাগালো। তিনি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“প্রজারা কী অভিযোগ নিয়ে এসেছেন? কী হয়েছে?”
ত্রিপাদ কুমারের মুখটি তখন কাচুমাচু। দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলল,
“আপনি বণিকদের উত্যক্ত করতে নিষেধ করেছিলেন। বণিকরা সেই আদেশ তো মানেইনি বরং এক প্রজার কন্যাকে না-কি একজন বণিক তুলে নিয়ে গিয়েছেন।”
ত্রিপাদ কুমার ভেবেছিলেন রানি হয়তো কিছুটা বিচলিত হবেন, ছুটবেন প্রজার নিকট। অথচ তা না করে রানি তৎক্ষণাৎ বললেন,
“চলুন মন্ত্রীমহোদয়, ঘটনাস্থলে চলুন। আমার ঘোড়া বের করুন এখুনি। প্রজাদের বলুন আসতে সাথে।”
ত্রিপাদ কুমার কথা শুনে বিস্মিত না হয়ে পারলেন না। হতবিহ্বল কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “আপনি যাবেন!”
“হ্যাঁ, আমি যাবো। আমার প্রজাদের জন্য সর্বপ্রথম আমি না গেলে যাবে কে? আমি ওদের অভিভাবক। আমাকেই তো আগে যেতে হবে তাই না?”
“সত্যিই আপনাকে দেখে অবাক হচ্ছি, রানি। এর আগে এই রাজ্যের কোনো রাজা এমন করে এগিয়ে যায়নি বিপদস্থলে। রাজা হ্যাভেন যে আদর্শ রাজা ছিলেন, তিনিও যাননি।”
“সবাই তার আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মায়, মন্ত্রীমহোদয়। আর কখনো তুলনা করবেন না। আমি নিজেকে অনন্য ভাবি তাই কারো সঙ্গেই আমার তুলনা সাজে না।”
রানির কথায় মাথা নামিয়ে নেয় ত্রিপাদ কুমার। বলে,
“সত্যিই আপনি অনন্য, রানি।”
—————
বিশাল ভীড়ের ভেতর ধূলো উড়ছে যাচ্ছেতাই ভাবে। জনগণের উপচে পড়ছে কৌতুহল। বিশাল একটি গাছের সাথে বেঁধে রাখা আছে চারজন মানুষকে। এরাই এ রাজ্যের ভিনদেশী বণিক।
রানি দাঁড়িয়ে আছে বিশাল জায়গাটিতে। তার সাথে মন্ত্রী, সেনাপতি, প্রহরী হতে সকলেই উপস্থিত। উপস্থিত রাজমাতা, মামাশ্রী, রানি ইথুনও, পিতামহ।
রানি বিশাল জনশক্তির সামনে দাঁড়িয়ে তার প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ বাচনভঙ্গিতে বললেন,
“আমি মানে স্বয়ং রানি ঘোষণা দিয়েছিল যে বা যারা রাজ্যের নারীর উপর হাত দেওয়ার ভুল করবে তার শাস্তি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতম হবে। এবং এই ঘোষণার পরেও এই ভিনদেশী বণিকের সাহস করেছে আমাদের রাজ্যের নারীকে নিয়ে দুঃসাহসিকতা করার। তারা আমার কথাকে খুবই হালকা ভাবে নিয়েছিলো বোধকরি। তাই সেই হালকা ভাবে নেওয়ার শাস্তি তাদের দেওয়া হবে দীর্ঘতম ভাবে।”
বিশাল বক্তব্য থামিয়ে রানি ডাকলেন মন্ত্রীমশাইকে, “মন্ত্রীমহোদয়, যেই কন্যাকে তারা তুলে নিয়ে গিয়েছিলো তাকে এখানে নিয়ে আসুন।”
রানির অনুমতি পেতেই ত্রিপাদ কুমার উপস্থিত করলো অল্প বয়স্ক একটি মেয়েকে। বয়স কতই বা হবে? এগারো কিংবা বারো! অনবরত কাঁপছে মেয়েটি। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে অগাধ জলধারা।
রানি মেয়েটির দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। বড্ড নিজের কথা মনে পড়ল তার। চোখ বন্ধ করে নিলেন নিমিষেই।
পাশ থেকে একটি বিশ্বস্ত কণ্ঠ বলে ওঠল, “রানি, আমার সাহসী নারী, তুমি ভীত হইও না, পা পিছিও না। আমি আছি তোমার পেছনে সর্বক্ষণ। তুমি নির্দ্বিধায় তোমার রানিত্ব ফলাও।”
রানি সেই ফিসফিস করা স্বরের দিকে তাকাতেই দেখলেন হেমলক দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দিয়ে দিচ্ছে ভরসা। রানি উন্মুখ প্রজাদের দিকে তাকালেন। স্পষ্ট, স্বচ্ছ স্বরে বললেন,
“রাজ্যনীতি অনুযায়ী, রাজ্যের নারীদের অবমাননা করার শাস্তু মৃত্যুদণ্ড। তবে, কেবল মৃত্যুদণ্ড সামান্যই বোধ করছি আমি। তাই সর্বপ্রথম শাস্তি হবে ওদেরকে উলঙ্গ করিয়ে একেকটি ঘোড়ার বাহনটির পেছনে বেঁধে দেওয়া হবে। এবং সেই বাহনটি এই চত্বরে ততক্ষণ ঘুরানো হবে যতক্ষণ না এই কন্যা ক্লান্ত না হয়। কারণ এই বাহনটি চালনা করবে কন্যাটি নিজে। এরপর তাদেরকে বেত্রাঘাত করা হবে। এবং সর্বশেষ তাদের মুণ্ডুপাত করে পাঠানো হবে তাদের রাজ্যে। এবং তাদের বাকি অঙ্গের টুকরো ফেলা হবে রাজ পুকুরে। যেখানে রয়েছে ভয়ঙ্কর মৎস ও জলজ প্রাণী। এই শাস্তি সকলের শিক্ষা হয়ে থাকবে। নারীকে অবমাননা করার শিক্ষা।”
রানির কথা শেষ হতেই জন সমাগম স্তব্ধ হয়ে গেলো। এতো করুণ আর পাষাণ হৃদয়ে কেউ কাউকে শাস্তি এই রাজ্যে দিয়েছে বলে মনে পড়ছে না।
রাজমাতা প্রাচী আগ বাড়িয়ে ঢিমে স্বরে বললেন, “কী বলছো তুমি, হেমলক বধূ! এত নির্মম শাস্তিতে তো সেই রাজ্যের সাথে আমাদের শত্রুতা হয়ে যাবে। তাছাড়া এতটা নির্মম হওয়া আদৌ উচিত কি?”
রানির মুখ আগের ন্যায় শান্ত রইল। শীতল কণ্ঠে তিনি বললেন,
“অপরাধীর হয়ে একটি বাক্য যে বলতে আসবে তার শাস্তি হবে আরও করুণ। আশা করবো রাজমাতা বুঝতে পেরেছেন আমি কী বুঝাতে চাইলাম?”
মামাশ্রী তার ভগ্নির হাত টেনে ধরলেন। রাজমাতা রানির শক্তরূপে আশ্চর্যের মতন তাকিয়ে রইলেন। তার রাজ্যে ঢুকে তাকে এমন ভাবে শাসানোর স্বর আগে কেউ কখনো পেয়েছিলো কি?
রানি ইথুন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো রানি কামিনীকাঞ্চনের দিকে। তার ভেতরের খটকা যেন এবার আরও পোক্ত হলো।
·
·
·
চলবে……………………………………………………