চন্দনের মোহমায়া মাখানো ঘ্রাণের সাথে মিশে একাকার একটি সুগন্ধি ফুলের ঘ্রাণ। যেকোনো মানুষের মনে ঘোর লেগে যাবে। নেশায় বুঁদ হয়ে যাবে এই সুঘ্রাণে।
যামিনীর স্নানাগারে এমন সুঘ্রাণ ঘুরে-ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘ্রাণটা মোটেও অপরিচিত নয়। রানি কামিনীকাঞ্চন সবসময় এই সুগন্ধিই মাখতেন। দূরের কোনো এক পাহাড় থেকে কী এক নাম না জানা ফুল আনাতেন অধিক অর্থ ব্যয় করে। সেই ফুল থেকেই বানানো হতো এই অপরিচিত, ঘোর লাগানো সুগন্ধিটা। যামিনী রানির সেই একান্ত সুগন্ধিটাও দখল করতে ভুল করেনি মোটেও।
জলের ভেতর বসে প্রাচীরে হেলান দিয়ে মনের সুখে হুঁকা টানছে যামিনী। শশী তার শরীরে আবারও কত প্রলেপ মাখিয়ে দিচ্ছে। তখনই বাহির থেকে হ্যাব্রোর কণ্ঠ পাওয়া গেলো। যামিনীর সমস্ত ঘোর, তন্দ্রা ভাব ছুটে গেলো নিমিষেই। আকুলতা এসে ধরা দিল তার বদন জুড়ে। আগ্রহী স্বরে শশীকে শুধাল,
“সেনাপতির কণ্ঠস্বর না? গিয়ে দেখো তো। কোনো প্রয়োজন কিনা। ভেতরে আসতে বলো।”
যামিনীর ব্যকুলতা স্পষ্টই দেখলো শশী। হাসলো মুচকি মুচকি। আড় চোখে তাকিয়ে বলল,
“সোজা স্নানাগারে আসতে বলবো?”
“অবশ্যই বলবো। ওর জন্য সমস্ত দ্বার খোলা।”
“আচ্ছা বেশ, বেশ, যাচ্ছি।” কথাটি শেষ করেই শশী চঞ্চল পায়ে বেরিয়ে গেলো। যামিনী দরজার দিকে তাকিয়ে রইল চাতক পাখির ন্যায়। এই বুঝি হ্যাব্রো এলো, এই বুঝি একটু মুগ্ধ হয়ে দেখলো তাকে!
কিন্তু যামিনীর অতি আকাঙ্ক্ষা ধূলোয় মিশিয়ে হ্যাব্রো এলো না বরং বাহির থেকে শোনা গেলো হ্যাব্রোর রুক্ষ কণ্ঠ,
“স্নানাগার থেকে বের হলে জানাবেন আমাকে। রাজ্যের বিষয়ে সংবাদ আছে।”
হ্যাব্রোর কথার পরিবর্তে শশী বলল,
“আপনাকে স্নানাগারে প্রবেশ করার অনুমতি দিয়েছেন তো রানি।”
হ্যাব্রো দ্বিগুণ অবজ্ঞা করে বলল, “সকল জায়গায় অনুমতি থাকলেও প্রবেশ করার ধর্ম আমার নেই জানিয়ে দিবেন তাকে। আমি অপেক্ষা করছি রাজ বৈঠকখানায়।”
কথা শেষ হতেই হ্যাব্রোর জুতোর শব্দ পাওয়া গেলো। কী ব্যস্ত ভঙ্গিতেই প্রস্থান নিলো সে!
স্নানাগারে বসে সবটাই স্পষ্ট শুনল যামিনী। অথবা বলা যায় হ্যাব্রো শোনানোর জন্যই বলল সবটা।
যামিনী তপ্ত শ্বাস ফেলল। অভিমানে ভারি হলো বুক। কই রানি কামিনীকাঞ্চনের বেলা তো এতটা দম্ভ ভরা কথা ছিলো না লোকটার! তখন তো দিব্যি চলে আসতো স্নানাগারে। কত সময় ব্যয় করে আলোচনা চলতো এখানে। অথচ তার বেলাতেই সকল মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আয়োজন? সে কি এতই ফেলনা?
নিজের সমস্ত সত্তা টেনে ছিঁড়ে ফেলে রানি কামিনী হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেও মানুষটার একটু দৃষ্টি পাচ্ছে না? কী এমন কমতি আছে তার? কোথায় কমতি?
ভেতর ভেতর ঈর্ষায় সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল তার।
হুঁকাতে বাড়িয়ে দিলো ওষ্ঠের গতি। বুঁদ হতে চাইলো নেশায়। হ্যাব্রোকে তার পেতেই হবে। যেভাবেই হোক।
—————
হেমলকের কক্ষ জুড়ে আয়োজন হরেক রকমের ফুলের। পালঙ্ক হতে শুরু করে মেঝে ছেয়ে আছে ফুলে ফুলে। রাজপুত্র বধূর আগমনের জন্যই এই আয়োজন কক্ষটিতে।
হেমলক প্রথমে কক্ষে প্রবেশ করল। কক্ষের বাহিরে প্রহরীরা মাথা নামিয়ে দাঁড়ানো। কক্ষের কপাটে এসে থেমে গেলো রাজবধূর পা। কোনো এক দ্বিধা কিংবা সংশয়ে তার পা আর এগুতে পারল না।
হেমলক নিজের স্ত্রীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজেই হাত বাড়িয়ে দিলো। সাদরে যেন গ্রহণ করার সমস্ত চেষ্টাটুকু সে করছে। নিজের সমস্তটা দিয়ে নারীটিকে প্রাধান্য দেওয়ার কার্যে সে নিবেদিত।
হেমলকের খোলা হাতের মুঠো ঝকঝক করছে শূন্যতায়। কোনো একটি হাতের মুঠোতেই পরিপূর্ণতা পাবে সেই খোলা হাত। সে অপেক্ষাতেই বুক উঁচিয়ে আছে সেই হাতটি।
হেমলকের বধূ বহুক্ষণ ডুবে রইলেন ভাবনা চিন্তায়। ঘোমটার আড়ালে মুখটি বলে বুঝাও দায় যে, তিনি ভাবছেন নাকি দ্বিধা করছেন!
হেমলক আগ বাড়িয়ে বিনীত গলায় বলল,
“আসো, এই কক্ষ তোমারই। কোনো সংশয় নেই। আজ থেকে এই কক্ষে তোমার আধিপত্য। আসো, আমি তোমায় আমন্ত্রণ করছি।”
দ্বিধাদ্বন্দে ভোগা নারীটি এবার ঘোমটার আড়ালে মুখ তুলে হেমলকের দিকে তাকালেন বোধহয়। এরপরই হাত বাড়িয়ে দিলেন হাতে।
হেমলক আলতো ভাবে ছুঁলো যেন ব্যথা পাবে মোমের দেহটি।
নারীটি কক্ষে প্রবেশ করতেই হেমলক দুয়ার আটকে দিলো। আর কারো আসার অপেক্ষা করল না কিংবা কারো কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করল না। যেখানে কক্ষের বাহিরেই দাঁড়ানো ছিলেন রাজমাতা।
কক্ষে এসেই ধীর পায়ে পালঙ্কে বসালো সে তার নব্য বধূকে। আলগোছে খুলে দিলো মুখের ঘোমটাখানা।
তিরতির করে কাঁপছে নারীটির ওষ্ঠ। চোখে দেখা দিয়েছে জোর করে আটকে রাখা অশ্রুগুলোর কিঞ্চিৎ ঝিলিক। ভগ্ন কণ্ঠে নারীটি বললেন,
“আমাকে একটি আরশি দাও। আমি আমার মুখটি দেখতে চাই।”
কণ্ঠে নেই আগের চতুরতা। নেই সেই দম্ভ।
হেমলক আরশি দিতে একটু অস্বস্তিবোধ করল। কথা ঘুরানোর ছলে বলল,
“তুমি পোশাক পাল্টে নাও। আহারে কী চাও বলো? আমি সব হাজির করাচ্ছি।”
নারীটির দেহে আগের চঞ্চলতা না থাকলেও বুদ্ধির চতুরতায় কোনো খামতি নেই। তিনি কণ্ঠ শক্ত করলেন,
“আমি আরশি চেয়েছি। আরশি দাও।”
হেমলক আর কথা বাড়ালো না। সাদা পর্দায় ঢেকে রাখা বিশাল আরশিটির দিকে ইশারা করল। নারীটি ধীরে ধীরে সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো। তার হাত কাঁপছে ভীষণ। সেই কম্পনরত হাতেই শুভ্র রঙের কাপড়টি ধীরে ধীরে সরালো। বাহিরের ঝলমলে আলোয় নিজের মুখের প্রতিবিম্বটি আরশিতে জ্বলজ্বল করতে দেখেই আঁতকে উঠলেন নারীটি। দু’পা পিছিয়েও গেলেন। আরেকটু হলে অসাবধানতাবশত পড়েই যেতেন। কিন্তু তার আগেই হেমলকের চওড়া বুক তাকে জায়গা দিলো। ঠাঁই দিলো। পড়তে দিলো না মোটেও।
নারীটি কাঁপলেন। মূর্ছা গেলেন চরম আঘাতে। তার শরীর কাঁপতে লাগল অনবরত। অস্ফুটস্বরে বললেন,
“আমি… এটা! আমি? আমি না। আমি এমন নই। আমি ভয় পাচ্ছি আমাকে। ঘৃণা হচ্ছে। ঢেকে দাও আরশি। আমার সহ্য হচ্ছে না। ঢাকো।”
শেষের শব্দটি বেশ জোরে বললেন। উত্তেজিত হয়ে গিয়েছেন ততক্ষণে।
হেমলকের চওড়া বুক আশ্রয় দিলো তখন। দু'টো হাত আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল তাকে। মাথায় আলগোছে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। শান্ত করার নিবিড় চেষ্টা করতে করতে স্থির স্বরে বলল,
“ভয় পাচ্ছো কেন? তুমি ভুলে যেও না তুমি রানি কামিনীকাঞ্চন। ঐ আরশিতে যা দেখেছো তা চাঁদের গায়ের সামান্য কলঙ্ক কেবল। কলঙ্কের দাগ আছে বলেই তো চাঁদ সুন্দর, তাই না? নিজের দাগকে কীসের ভয় তোমার? কীসের ঘৃণা? এই দাগ, এই কলঙ্ক যে কেবল বাহ্যিক। পৃথিবীর সবাই জানে, সবাই মানে- রানি কামিনীকাঞ্চন আগুনের ফুলকি। চাঁদ। চাঁদের গায়ে দুই একটা দাগ থাকবে না?”
রানি কণ্ঠ দ্বিগুণ হলো,
“না, না, না, এই দাগ আমি দেখতে পারছি না। এই কুৎসিত রূপ আমার নয়। আমি দেখতে পারছি না আমাকে। তুমি আরশিটা ঢেকে দাও। আমি আমার রূপের দম্ভ এমন ভাবে গুড়িয়ে যেতে দিতে পারি না। এই রূপ আমার অহংকার ছিলো। সেই অহংকার চূর্ণ হতে দেখতে পারছি না আমি।”
রানির উত্তেজিত কণ্ঠের বিপরীতে হেমলকের কণ্ঠ আরও শিথিল হলো। সে জোর করে রানিকে আরশির দিকে ফেরালো। রানি শক্ত হয়ে ছিলেন। চোখ জোর করে বন্ধ করে রাখলেন। নিজেকে নিজে দেখবেন না বলে কত আয়োজন করলেন। কিন্তু হেমলকের কাছে সেই আয়োজন বৃথা। হেমলক জোর করে চোখ খুলালো। তাকাতে বাধ্য করল রানিকে আরশির দিকে।
সেখানে তাকাতেই দেখলেন রানি নিজের বিভৎস মুখটি। গালের আশেপাশে কালো কালো কত দাগ। কপালের মাঝামাঝিতেও দাগ। থুতনিতে দাগ। শরীরের দাগ তো অসংখ্য। কিন্তু এতদিন আরশির অভাবে তিনি নিজের মুখটি দেখতে পারেননি তাই আজ দুঃস্বপ্নের মতন ধাক্কা খেলেন।
ভেঙে গুড়িয়ে গেলেন। দু'হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। ক্রন্দনরত স্বরে বললেন,
“রানির সকল দম্ভ সৃষ্টিকর্তা কেড়ে নিয়েছেন। দেখো দেখো, রানির সমস্ত রূপ নিষ্ঠুর বিধাতা ছিনিয়ে নিয়েছেন। ক্ষমতা, আসন, সম্মান, প্রাচুর্য… আজ কিছুই আমার নেই। আমি কী? আমি কে? আমার পরিচয় কী? আমার কিচ্ছুটি নেই। আমি আর কেউ নই!”
হেমলক এই ভঙ্গুর রানির দিকে তাকিয়ে রইল। তার কিচ্ছুটি বলতে ইচ্ছে করছে না। বরং মনে হচ্ছে রানির একটু কান্না করা উচিত। বুকের ভেতর বহু বছর যাবত তিনি এই কান্না জমিয়ে রেখেছেন। কান্না বের করতে না পেরে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। আজ কাঁদুক তিনি। পাথর গলুক। তিনিও জানুক, তিনি মানুষ। আর মানুষের জীবনে কিছুই স্থায়ী নয়। আজ আসবে কাল যাবে এমনই নীতি। এই নীতিতেই চলতে হয়। হারানোর শোক, পাওয়ার সুখ অনুভব করতে হয়। নয়তো ভেতরে আত্মা কঠিন হতে হতে মরে যায়। আর মৃত আত্মা সব পারলেও নতুন করে উঠে দাঁড়াতে পারে না।
—————
ক্যামিলাস রাজ্যের বিলাসিতা দেখে বিস্মিত না-হয়ে পারবে না কেউ। আহারের স্থানের আয়োজন দেখলেই মানুষ অবাক হয়ে যাবে। বিশাল জায়গাজুড়ে আহারের স্থান। সকল থালা-বাসন রূপোর কারুকার্য করা। আহারের জায়গাজুড়ে কত কত খাবার তার হিসেব-নিকেশ করতে গেলে হাঁপিয়ে যাবে যে কেউ। রাজপ্রাসাদ জুড়ে যেমন মানুষ তেমনই আয়োজন। কোনো ত্রুটি নেই। যেন মনে হয় আনন্দের বাজার।
চোখ অব্দি ঢাকা ঘোমটা নিয়ে সেই আহারের কক্ষে প্রবেশ হলো রাজ্যের নতুন বধূর। কী বুক উঁচিয়ে হাঁটাচলা বধূটির!
তার পেছন পেছন এলো হেমলক। যেন বধূর একমাত্র রক্ষাকবচ সে।
সকলেই ততক্ষণে যার যার স্থানে বসে পড়েছে। রাজবধূ বসার আগেই হেমলক আগে আগে গিয়ে বসার কেদারাটা আলগা করে দিলো। সাদরে নিজের স্ত্রী’কে বসালো আসনে।
রাজমাতা তীক্ষ্ণ নজরদারিতে নিজের পুত্রের এই তামাশা দেখলেন তাকিয়ে। রানি ইথুন শাশুড়িকে চোখের ইশারায় শান্ত থাকার অনুরোধ করলো আলগোছে।
রাজমাতা প্রাচী সেই ইশারা ভাষা বুঝে মাথা নাড়ালেন। উচ্চবাচ্য করলেন না। বরং ধীর স্বরে বললেন,
“হেমলক, তুমি তোমার পত্নীকে সকলের সাথে আলাপ করিয়ে দাও। রাজপ্রাসাদে কে তার কী হয় সেটা তো জানাতে হবে, তাই না?”
হেমলক নিজের আসনে বসতে বসতে বলল,
“খাবারের স্থান তো পরিচয় করার জায়গা নয়। পরিচয় অবশ্যই করবে তবে সেটা সঠিক স্থানে। এটা কি সঠিক স্থান?”
নিজের ছোটো পুত্রের এহেন বাঁকা উত্তরে রাজমাতা অতিষ্ঠ প্রায়। তবুও নিজের মাথা ঠান্ডা রেখে বললেন,
“তা অবশ্যই ঠিক। তবে ওর নামটিও তো জানা হলো না। সম্বোধন করবো কী বলে সকলে?”
এবার রানি ঘোমটার আড়ালে হেমলকের দিকে তাকালো। কীই-বা পরিচয় দিবে এবার? পরিচয় লুকানোর জন্যই তো এত আনুষ্ঠানিকতা।
হেমলক রানির দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে স্মিত হাসলো,
“ওর পরিচয় ও হেমলক বধূ। ক্যামিলাস রাজ্যের রাজবধূ। ওর সম্বোধনে আমার নামটি রাখলেই হবে।”
নিজের পুত্রের এমন নির্লজ্জ প্রস্তাবে তাজ্জব বনে গেলেন রাজমাতা।
তিনি চোখ ঘুরিয়ে উপস্থিত সকলের দিকে তাকালেন। সবারই এক ই অবস্থা। হেমলক একরোখা ছিলো তা সকলে জানতো কিন্তু এতটা নির্লজ্জ কিংবা বউ পাগল কীভাবে হলো?
রাজমাতার কণ্ঠ শক্ত হয়ে এলো,
“কীসব বলছো? এখানে তোমার সকল বড়োরা উপস্থিত আছে। লজ্জা করো।”
হেমলক সেই শক্ত কণ্ঠের মোটেও পরোয়া করল না। বরং বুক উঁচিয়ে বলল,
“নিজের বধূকে নিজের বধূ বলতে লজ্জা করতে হবে অতটাও কাপুরুষ আমি নই।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………