রানির ঘোলাটে চোখ, তীব্র বেদনা তখন অবশতায় থিতিয়ে এসেছে। শরীরে আচমকা যেই যন্ত্রণা অনুভব করে ছিলেন রানি তা ধীরে ধীরে গায়েব হতে আরম্ভ করল।
তার কানে ভেসে এলো সেই পুরোনো স্বপ্ন। গভীর জঙ্গলে ছুটে বেড়াচ্ছে একটি শিশু। বাঁশির সুর বাজছে কানে। জঙ্গলের সীমানা খুঁজে পাচ্ছে না শিশুটি।
স্বপ্নের ভেতরই রানি হেমলকের কণ্ঠ শুনতে পেলো। খুব দূর থেকে যেন হেমলক ডাকছে তাকে। কী আকুতি! কী মিনতি ভরা সেই ডাক।
এরপর আর কিচ্ছুটি কানে এলো না তার।
রানির নিথর দেহটি পড়ে থাকতে দেখলো এক দাসী। কোনো সাড়াশব্দ নেই রানির। দাসীটি হৈচৈ জুড়ে দিলো নিমিষেই। আতঙ্কে সারা প্রাসাদ ছুটে বেড়ালো। তাদের এত প্রিয় নতুন রানির কী হয়ে গেলো! হেমলক ছিলো তার অঙ্কিত চিত্রে মগ্ন। কানে সুঁচালো হয়ে ঢুকলো দাসীর চিৎকার— আমাদের রানির কী হয়েছে যেন! কে কোথায় আছো…
প্রথম অবস্থায় হেমলক ভাবলো রানি ইথুন বোধহীন কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো রানি ইথুনের কিছু হবে না। ওর সাথে প্রাসাদের কারো বাকবিতন্ডা নেই। তবে কী?
রানি কামিনীর কথা মাথায় আসতেই সে সর্বপ্রথম কক্ষ ছেড়ে বের হলো। দেখলো সকলে ছুটে যাচ্ছে প্রাসাদের ঐ আটকানো দিকটায়। হেমলকের আর বুঝতে বাকি রইল না কিছু।
ক’দিন আগে রানি কামিনীই তো সেই দিকের কথা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন কী এমন আছে। হেমলক ভীত বর্ণনা দিয়েছিলো যদিও কিন্তু রানি কামিনীকে আর ভয় পাওয়ানো যাবে সে বর্ণনায়? উনি ব্যতীত দুঃসাহসিকতা দেখারো সাধ্য আর কারই বা আছে?
সকলের সঙ্গে হেমলকও বন্ধ দরজার ওদিকটায় ছুটে গেলো। মনেপ্রাণে চাইলো তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হোক। সে যেন এদিকটায় এসে দেখে তার রানির কিচ্ছুটি হয়নি।
কিন্তু হেমলকের এত প্রার্থনা সৃষ্টিকর্তা শুনতে নারাজ হন। হেমলক এসে দেখে তার রানি পড়ে আছে নিচে। ঘোমটায় ঢাকা চোখ দু'টো, ওষ্ঠটুকু উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছে। ঝড়ে যাওয়া গোলাপের পাপড়ির ন্যায় দেখচ্ছে ওষ্ঠটা।
হেমলক দ্রুত গিয়ে জড়িয়ে ধরে মাথাটি তুলে রানির। কোনো হুঁশ নেই তার। শ্বাস চলছে না বললেই চলে এতটা গতি ধীর।
রাজমাতা, মামাশ্রী একে একে ছুটে আসে। রানির নিস্তেজ শরীর দেখে এক মুহূর্ত তারা বিস্মিত হয়ে যায়৷ পরক্ষণেই মামাশ্রীর মুখে ফুটে উঠে হাসি। নিজের ভগিনীকে ফিসফিসিয়ে বলে, “শত্রুপক্ষ বিনা যুদ্ধে মিশে যাওয়ার আনন্দ কেমন অনুভব করছো, ভগিনী?”
রাজমাতা প্রাচী চুপ করেই তাকিয়ে থাকেন রানির দিকে। তার মনে আশঙ্কা হয় কীসের যেন। এই রাজ্যের রাজা তো এভাবেই মারা গিয়েছিলেন একদিন। তখন থেকে এই জায়গাটির প্রতি ভয় সৃষ্টি হয়ে সকলের। এখন এই রানির ঘটনা সেই ভয়কে আরও বৃদ্ধি করবে না জায়গাটির সম্পর্কে কৌতূহলী করবে তা ভেবে ভেবেই তিনি দ্বিধান্বিত বোধ করেন।
—————
এ্যাজেলিয়ার বর্তমান রানি যামিনী নিজের বিলাসবহুল জীবনকে উদযাপন করছের পুরোদস্তুর। এত সুখ তার জীবন জুড়ে যে সে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যায়।
যামিনীর সেই সুখকে বাড়িয়ে দিতে তার খাসদাসী কত মন্ত্রণা দেয়! তবে কিছুদিন যাবত যামিনীর শরীরটা বিশেষ ভালো নেই। জ্বরে তেঁতো হয়ে থাকে মুখ। আহার-নিদ্রায় কোনো রুচি নেই।
এই বেলা বাড়া দুপুরেও তিনি শুয়ে আছেন বিছানায়। শরীরটা বিশেষ ভালো ঠেকছে না। শশী দাঁড়ানো তার পালঙ্কের কাছটাতেই। বারংবার সে খাবারের জন্য অনুরোধ করছে। কিন্তু যামিনী প্রত্যাখ্যান করছে সেই অনুরোধ। এক পর্যায়ে সে বিরক্ত হয়ে বলল,
“খাবো না বলেছি তো আমি, শশী। যাও এখান থেকে। আমার খিদে তৃষ্ণা নেই।”
তাদের এই কথোপকথনের ভেতর কক্ষে প্রবেশ করলো হ্যাব্রো। প্রতিবারের মতন নয়। এবারের তার প্রবেশে ছিলো ভিন্নতা।
প্রতিবার সে কক্ষে আসার আগে অনুমতি চায়। যামিনী বহুবার তাকে বলেছে অনুমতি ছাড়াই কক্ষে আসতে, তার জন্য এই কক্ষ সবসময় খোলা। কিন্তু সে আগে কখনো তা শোনেনি। তাকে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করতে দেখে যামিনী তো তাজ্জব হলোই সাথে বিস্মিত হলো শশীও।
হ্যাব্রো বেশ স্বাভাবিক ভাবেই প্রবেশ করতে করতে বলল, “আপনার জন্য বিশেষ ব্যঞ্জন রান্না করা হয়েছে আমার নির্দেশে। আপনি আহার করতে আসুন।”
যামিনীর মুখে তখন বিস্ময়ের হাওয়া! তার জন্য হ্যাব্রো ব্যঞ্জন রান্না করতে বলেছে? তার জন্য? তার নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস হলো না। তাই আবারও নিজের মনকে আশ্বস্ত করতে জিজ্ঞেস করল, “কী বললে?”
“বললাম আপনার জন্য বিশেষ রান্না করা হয়েছে। যেহেতু আপনি অসুস্থ, সকল খাবার রুচিতে আসবে না। তাই যা খেতে পারবেন তা রান্না করিয়েছি।”
যামিনী শশীর দিকে তাকালো। চোখগুলো তার বিস্ময়ে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। শশীও অবাক হয়েই তাকিয়ে রইল হ্যাব্রোর দিকে। কেবল অবাক নয় অবশ্য, কিছুটা সন্দেহপ্রবনও হলো। বলল,
“আপনি রানির জন্য রান্না করিয়েছেন? আপনি?”
হ্যাব্রোর চোখ-মুখ শশীর প্রশ্নে কঠিন হলো। তার মুখের এই পরিবর্তন সহজেই ধরতে পারবে কেউ। কোনো গোপনীয়তা নেই অভিব্যক্তি বদলানোর ভেতর। শক্ত কণ্ঠে বলল, “এখানে রানি ও আমার কথা হচ্ছে। কোনো দাসীর অধিকার নেই সেই কথোপকথনের মাঝে নিজের নাক গলানোর।”
হ্যাব্রোর এই রুক্ষ স্বর সপাটে চ ড় বসালো যেন শশীর গালে। রেগে ফুঁসে উঠল ভেতরটা। বিচারের আশায় তাকালো যামিনীর পানে।
অথচ যামিনী বিচার করল না। বরং অবলীলায় বলল, “আহা শশী! কথা বলছো কেন? চুপ করো। আচ্ছা চুপ নয় বরং তুমি আপাতত কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যাও। আমি খবর পাঠালে এসো।”
শশীর ভাষাহারা হয়ে পড়ল যামিনীর কথায়। কিন্তু তার যেহেতু ক্ষমতা সামান্যই তাই যামিনীর আজ্ঞা মেনেই বেরিয়ে গেলো হনহনিয়ে।
অথচ যামিনীর সেসব দেখার সময় নেই। তার কেবল ভেতর ভেতর আনন্দ বাড়ছে। হ্যাব্রো তার জন্য রান্না করিয়েছে তা কি সে ফেরাতে পারে?
“কী ব্যঞ্জন রান্না করিয়েছো? দাসীদের বলো নিয়ে আসতে। আমি এখনই আহার করবো।”
যামিনীর এমন আনন্দে হ্যাব্রো সামান্য হাসলো। মাথা নাড়িয়ে বলল, “ঘরের ভেতর আহার করবেন? শোবার ঘরে খাবার আনা উচিত নয়। এতে রাজকীয়তার হীনমন্যতা প্রকাশ পায়।”
যামিনী আদৌ না রাজকীয়তা বুঝল না হীনমন্যতা বুঝল। কেবল হ্যাব্রোর কথায় তাল মিলিয়ে বলল,
“ঠিক আছে আমি আহারের কক্ষেই আসছি। তুমি যাও।”
“আপনি তৈরি হোন, আমি বাহিরেই দাঁড়াচ্ছি।” বলেই বেরিয়ে গেলো হ্যাব্রো। যেমন বিনা অনুমতিতে এসেছিলো তেমন বিনা অনুমতিতেই বেরিয়ে গেলো।
যামিনীর অসুস্থ শরীর যেন নিমিষেই ঝরঝরে সুস্থ হয়ে গেলো। দুর্বলতা মিলিয়ে গেলো হাওয়ায়।
শশী প্রাসাদের বিশাল বৈঠক খানায় বসে রাগে কিড়মিড় করছিলো। রাগ হবেই বা না কেন? সে যামিনীর এত আগেপিছে থাকলো, এত সাহায্য করল অথচ সামান্য সেনাপতির একটু যত্নে যামিনী কি-না তাকে বেরিয়ে যেতে বলেছে? এই প্রতিদান দিলো তার সাহায্যের?
শশীর ভাবনার মাঝেই যামিনীকে আসতে দেখা গেলো। বেশ উৎফুল্ল ভাবে হেসে হেসে সে আহার কক্ষে প্রবেশ করছে। অথচ শশী কতবার বলেছিলো আহার করতে শুনেনি। হ্যাব্রোর বেলা সব শুনে নিলো?
—————
রাজবৈদ্য রানিকে পর্যবেক্ষণ করছেন সুক্ষ্ম ভাবে। কপালে তার ভাঁজ গাঢ় হচ্ছে সেই পর্যবেক্ষণে। হেমলক দাঁড়ানো কিঞ্চিৎ দূরে। এছাড়া কক্ষে নেই কেউ।
রাজবৈদ্য অনেকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করার পর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“রানির শরীরে বিষক্রিয়া হচ্ছে, রাজপুত্র হেমলক। উনার জন্য কিছু পত্র ও পুষ্প থেকে আমার পথ্য বের করতে হবে।”
বিষক্রিয়ার কথার শুনে হেমলকের মুখশ্রী আরও অধিক গম্ভীর হয়ে গেলো। শুধালো, “আপনার ঠিক কতটুকু সময় লাগবে রাজবৈদ্য?”
“বেশি সময় নয়। আমি শীগ্রই ফিরে আসবো। রানির পুরো শরীরে সেই বিষ ছড়ানোর আগেই আসবো।”
“এই বিষক্রিয়া কী থেকে হচ্ছে বলতে পারবেন?”
রাজবৈদ্যর মুখটি আরও খানিক ভাবুক হলো, “ঠিক বলতে পারছি না তবে এটি কোনো প্রাকৃতিক বিষ।”
“আচ্ছা আগে ওকে সারানোর ব্যবস্থা করুন। বাকিটা পরে দেখা যাবে।”
রাজবৈদ্য মাথা নাড়িয়ে বাহিরে যেতে উদ্যোত হতেই হেমলক আবারও পিছু ডাকলো, “শুনুন, আমি আপনাকে বিশ্বাস করি। বিশ্বাস করি বলেই রানি কামিনীর আসল রূপ সম্পর্কে আপনি জেনেছেন কেবল। আমি কী বলতে চাচ্ছি বুঝেছেন নিশ্চয়?”
রাজবৈদ্য হলেন বুদ্ধিমান ব্যক্তি। হেমলকের ইশারা ঠিকই বুঝলেন। মৃদু হেসে মাথা নাড়িয়ে বললেন, “আমি পথ্য কারো হাতে পাঠাবো না। নিজেই নিয়ে আসবো। রানির কোনোরকম কোনো ক্ষতি হবে না।”
কক্ষ নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেলো। রাজবৈদ্য বের হতেই আবারও কপাট আটকে দিলো হেমলক। তার বহুদিন ধরেই মনে হচ্ছিলো বাবার মৃত্যু মোটেও কাকতালীয় কিছু ছিলো না। আজ সেই ধারণা আরও পাকা হলো।
সে গিয়ে দাঁড়ালো বিরাট বাতায়নের পাশটায়। তাকালো সেই কক্ষটির দিকে যেই কক্ষ নিয়ে এত রহস্য। দিনের আলোয় স্পষ্ট লাগলো কেউ হাঁটছে সেখানে। আধ্যাকিছু নিশ্চয় এমন করে চলে না অবলীলায়?
·
·
·
চলবে……………………………………………………