বিশাল কক্ষজুড়ে পিনপতন নীরবতা। রানি কামিনী দাঁড়িয়ে আছেন বাতায়নের কোল ঘেঁষে। এই কক্ষের এই জায়গাটি তার ভীষণ প্রিয়। তাকালেই বাহিরের সবকিছু দেখা যায়। সুন্দর চাঁদের জোছনা লুটিয়ে পড়ছে কেমন মাটিতে! তবে স্বচ্ছ নয় সে জোছনা। শীত আসবে বলে সামান্য কুয়াশার আমেজ এই রাতের বুকে।
হেমলক সেই নীরবতা ভেদ করে প্রবেশ করল কক্ষে।
হাতে সাদা রঙের ফুল তার। কী সুন্দর সুঘ্রাণ ছড়াচ্ছে সেই ফুলগুলো? হেমলকের উপস্থিতির চেয়েও সে ফুলগুলোর উপস্থিতি বেশিই নাড়া দিলো রানির অন্তরে। রানি ভীষণ বিস্মিত হয়ে তাকাতেই তার দিকে হেমলক এগিয়ে দিলো সাদা ফুলগুলো। রানি অকপটেই হাত বাড়িয়ে নিলেন সেই ফুলগুলো। আশ্চর্য হয়ে বললেন,
“আপনি এই ফুল কোথায় পেলেন? এই ফুলতো পূর্বের দূর পর্বতে পাওয়া যায়। আনা সহজ নয়। ভীষণ মূল্যবান।”
হেমলক ফুলগুলো দিয়ে হাসিমুখে বলল,
“তোমার চেয়ে বোধহয় কম মূল্যবান।”
হেমলকের এই কথাগুলো রানিকে বাধ্য করে গলে যেতে। কিন্তু তিনি যে শেষ অব্দি ভরসা করে উঠতে পারেন না পুরুষদের।
রানি আর কথা না বাড়িয়ে ফুলগুলো থেকে টেনে নিলেন সুন্দর ঘ্রাণ টুকু। রাতটা যেন আরও সুন্দর হয়ে উঠল তার।
হেমলক বলল, “তোমার সুগন্ধি উৎপাদন করতে দেওয়া হয়েছে। খুব শীগ্রই নিজের পছন্দের সুগন্ধি পেয়ে যাবে।”
“আপনি কীভাবে জানলেন আমার পছন্দের সুগন্ধির কথা?”
“জানবো না-ই বা কেন? তোমার রাজ্যে অনেকদিন তো থেকে এলাম।”
রানির মনে হলো এটাই মোক্ষম সময় নৃত্যের শব্দ নিয়ে কথা বলার। এবং সে ভাবনা অনুযায়ীই তিনি বললেন,
“আচ্ছা, প্রতি সন্ধ্যেতে আপনাদের প্রাসাদ থেকে নৃত্যের শব্দ শুনতে পাই। এটি কি কোনো নারীর?”
“সম্ভবত নয়। শুনেছিলাম কোনো বাইজির অশরীরী আত্মার।”
“শুনেছিলেন? দেখেননি কখনো?”
“প্রয়োজন বোধ করিনি। এই প্রাসাদের কিছুতেই আমার আগ্রহ নেই বিশেষ।”
“অথচ এই রহস্য ভেদ করতে গিয়েই নাকি প্রাণ গিয়েছিলো আপনার পিতার? তাহলে একটিবার দেখা কি উচিত ছিলো না?”
হেমলক এবার তার ঘন পাপড়ি বিশিষ্ট, নীলাভ মণি যুক্ত চোখগুলো নিয়ে তাকালো রানির দিকে। চোখের ভাষায় কৌতূহল তার।
“তোমাকে এত কথা কে বলেছে?”
“কিছু জানতে চাইলে আমি তা জেনেই থাকি। কে বলেছে তার চেয়ে বেশি জরুরী আপনারা কেন এ বিষয়ে কখনো কিছু করেননি!”
“রাজমাতার নিষেধ।”
“নিজের মাতৃ আজ্ঞা পালন করতে গিয়ে পিতার মৃত্যু রহস্য নিয়ে ভাবলেন না?”
হেমলক হাসলো। হেলায় জড়ানো স্বরে বলল,
“মাতৃ আজ্ঞা? মাতা! কে আমার মাতা! উনি রাজমাতা প্রাচী। আমার মাতা নন।”
হেমলকের হেঁয়ালিপূর্ণ কথা রানির ভেতরে উদগ্রীব বাড়ালো। তিনি চাইলেন এমন কথার অর্থ জানতে কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো যদি হেমলক না বলে? তাছাড়া এই ক্যামিলাস রাজ্যে তো তিনি স্থায়ী হতে আসেননি। তাহলে কেন সেই রাজ্য নিয়ে এত আগ্রহ দেখাবেন?
রানি ও হেমলকের কথোপকথনের ভেতরই বাহির থেকে শোনা গেলো হৈচৈ। কণ্ঠ পাওয়া গেলো হ্যাভেনের। চিৎকার করছে সে পশুর মতন।
চমকে গেলেন রানি ও হেমলা উভয়ই।
হেমলক দ্রুত কণ্ঠে বলল, “মুখ ঢাকো, সুধাকান্তা। মন বলছে বিপদ আসন্ন।”
রানি কোনোরকমে মুখটুকু ঢাকার সাথে সাথেই হ্যাভেন ছুটে এলো কাদের কক্ষে। পেছন পেছন পুরো প্রাসাদের সদস্যগণ। প্রহরীরা তাকে ধরেও রাখতে পারছেন না। আচমকা যেন দানবীয় শক্তি প্রবল হয়ে উঠেছে তার ভেতর।
রানি ঘোমটায় ঢাকা চোখ দিয়ে তাকালেন হ্যাভেনের দিকে। হ্যাভেনের রক্তচক্ষু তখন জ্বলজ্বল করছে। উন্মাদ না দা ন ব দাঁড়িয়ে আছে সামনে তা কেউ বুঝবে না।
রাজমাতা প্রাচী তার পুত্রকে আটকানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। হেমলক এগিয়ে গিয়ে বলল,
“কী হচ্ছে এখানে? ও এমন করছে কেন?”
কথা শেষ করার আগেই হ্যাভেন ছুটে এসে তীব্র ধাক্কায় ফেলে দিলো রানিকে। আচমকাই ঘটল এটা।
রানি এই হঠাৎ আক্রমণ সামলাতে না পেরে মুখ থুবড়ে গিয়ে পড়লেন কেদারার সামনে। তীব্র ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকে ফেললেন তিনি। তবুও সে দিকে তেমন খেয়াল না করে ঘোমটাটুকু টেনে নিলেন জোরেশোরে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। হ্যাভেন ফুঁসছে জন্তুর মতন। হাতে তার তলোয়ার। ধরে রেখেছে শক্ত মুঠোয়।
হেমলক ছুটে এসে তুললো রানিকে। এখানে কী হচ্ছে তা বুঝতে পারলো না সে বিন্দুমাত্র। তবে ক্রোধে ফেটে পড়ল মুহূর্তেই।
হুঙ্কার ছেড়ে বলল,
“রাজমাতা, আপনার পুত্রকে এখুনি এখান থেকে নিয়ে যান। ওর এত বড়ো স্পর্ধা আমার রানির গায়ে হাত দেয়? আমি ওর হাত দু'টো এখুনিই শরীর থেকে সরিয়ে ফেলবো। নিয়ে যান এখান থেকে।”
হেমলকের এই তীব্র হুঙ্কারে কেঁপে ওঠল সকলে। সে দু'হাতে আগলে রেখেছে রানিকে। রাগে তার শরীর কাঁপছে থরথর করে।
রাজমাতা থতমত খেলেন। ভারি অবাক সুরে বললেন,
“কী বলছো তুমি? বোধবুদ্ধি লোপ পেয়েছে তোমার? হ্যাভেনের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক নেই। ও কী করেছে বুঝে করেনি। ওর মামা আমার সাথে রাজ্য বিষয়কে কথা বলছিলো এবং ও শুনতে পায় রাজ্যের রানি হেমলক বধূ। তখনই ও রেগে যায়। আমরা বাধা দিলেও ও শুনতে নারাজ হয়।”
“শুনতে নারাজ হলো বলেই আমার কক্ষে এসে আমার বধূর শরীরে হাত দিবে? এতটা পথ অব্দি এলো ওকে আটকানোর মতন কাউকে পাননি আপনি?”
“চেষ্টা তো করেছে। ও তো সবাইকে ছুঁড়ে ফেলে দৌঁড়ে এলো।”
হেমলকের শরীর গরম হয়ে গিয়েছে। ফর্সা মুখটা ততক্ষণে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। রানি হেমলকের সেই উষ্ণতা ঠিক উপলব্ধি করতে পারছেন। এবং ভেতর ভেতর তিনি বিস্ময়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেছেন। রং-তুলি নিয়ে ব্যস্ত থাকা শৌখিন হেমলকের ভেতর এত এত উত্তপ্ততা তিনি কখনো টের পাননি। তার গায়ে হাত দেওয়ার কারণে নিজের ভাইয়ের উপর এতটাই ক্ষিপ্ত হওয়ার মতন মানুষ হেমলক? তার বিশ্বাস হচ্ছে না।
হেমলকের ক্রোধ দেখে দমে গেলো রাজমাতা। মামাশ্রী থামিয়ে দিলেন নিজের ভগ্নিকে। ইথুন প্রহরীদের নির্দেশ দিলো হ্যাভেনকে আটকানোর জন্য। এতে যেন হ্যাভেন আরও ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল। তলোয়ার উঠিয়ে তাঁক করল রানির দিকে। বারংবার বলতে লাগল,
“আমার রাজ্য, আমি কাউকে দেবো না। কাউকে না। আমার রাজ্য।”
বলতে বলতে সে একদম কাছাকাছি এসে আঘাত করতে প্রস্তুত হতেই তীব্র পদাঘাতে ছিটকে গিয়ে পড়ল বেশ খানিকটা দূরত্বে। কাঁচের ফুলদানিটা তার ধাক্কায় ঝনঝননিয়ে ভেঙে গেলো। তীব্র আর্তনাদ করে উঠল হ্যাভেন।
রাজমাতা প্রাচী, ইথুন, মামাশ্রী, পিতামহ সকলেই ছুটে গেলো হ্যাভেনের দিকে।
হেমলকে রানিকে জাপটে ধরে রেখেছে আগের মতন।
রাজমাতা নিজের পুত্রের মাথা দিয়ে রক্ত ঝরতে দেকেই হা-হুতাশ করে ওঠলেন,
“আমার পুত্র, কী হলো তোমার। আমার পুত্র, আমার চাঁদ। হেমলক কী করলে তুমি! তোমার এত বড়ো স্পর্ধা যে…”
রাজামাতাকে আর কথা সমাপ্ত করতে দিলো না হেমলক। চোখ-মুখ শক্ত করে কঠোর নির্দেশের ভঙ্গিতে বলল,
“হয় এই মুহূর্তে আপনি আপনার পুত্রকে নিয়ে বিনা বাক্যে এই কক্ষ ত্যাগ করবেন। নয়তো রানির গায়ে হাত তোলার অভিযোগে আপনার পুত্রকে পাঠানো হবে কারাগারে। সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে। বের হোন সকলে।”
শেষের ‘বের হোন’ শব্দগুলো এত জোরে উচ্চারণ করল হেমলক যে আর কেউ কিছু বলার সাহস করতে পারল না। বরং তড়িঘড়ি করে সকলে বেরিয়ে গেলো।
ওরা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হেমলক গিয়ে আটকে দিলো দোর সশব্দে। ওদের মুখের উপর। মামাশ্রী ফিসফিসিয়ে রাজমাতাকে বললেন,
“বধূ কোন মন্ত্র শোনালো তোমার পুত্রকে, ভগ্নি? সে যে পুরো বদলে গিয়েছে!”
রাজমাদা প্রতিত্তোরে কিছু বলার মতন খুঁজে পেলেন না।
ইথুন যেতে যেতে দেখলো কীভাবে তার প্রাসাদ জুড়ে আরেকজনের দাপট দখলদারিত্ব শুরু করেছে।
—————
আবার পিনপতন নীরবতায় আবদ্ধ হলো কক্ষ।
রানি হাতে জড়িবুটি লাগিয়ে দিচ্ছে হেমলক। এতটাই যত্নে যেন শখের পাখির বিন্দুমাত্র ব্যথা না হয়।
ফর্সা মানুষটার কপালে হালকা সোনালী রঙের চুলগুলো লেপ্টে আছে। ঘন পাপড়ি গুলো কী সুন্দর দেখা যাচ্ছে!
রানি আনমনে বললেন,
“একটা ক্ষিপ্ত হওয়া আপনার উচিত হয়নি। আমার জন্য আমি যথেষ্ট ছিলাম।”
“এখন আমি আছি। আমার মৃত্যুর আগ অব্দি আমি তোমার হয়ে বলবো। আটকিও না, অনুরোধ রইল। এই হেমলক বেঁচে থাকতে আর কেউ তোমার কাছ অব্দি আসার সাহস করবে না।"
“নিজের মাতার সঙ্গে কেন বাক-বিতন্ডারতে জড়ালেন? তাছাড়া নিজের ভ্রাতাকে আঘাত করে সকলের শত্রু হলেন। আমার জন্য কেউ ভাবুক আমি চাই না।”
হেমলক শান্ত স্বরে বলল, “না উনি আমার মাতা,আর না হ্যাভেন আমার ভ্রাতা। বারংবার বলেছি। তুমি চতুর। এতটা খোলামেলা বলার পরও বুঝতে পারছো না দেখে ক্লান্ত হচ্ছি।”
“এ সকল তো রাগের কথা তাই না।”
“রাগের নয়। এটাই সত্যি।”
নীরব কক্ষে এই সত্যিটা যেন দমকা হাওয়ার মতন ঝড় তুললো।
রানি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেলেন। তবে কি এজন্যই এত উদাসীনতা এই হেমলকের ভেতরে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………