হ্যাভেনকে বেঁধে রেখেই বাহির থেকে আটকানো হলো তার কপাট। সকলে তখন স্তব্ধ, কৌতূহলী চক্ষু যুগল নিয়ে তাকিয়ে আছে রানির দিকে। তা নিয়ে বিশেষ ভাবাবেগ দেখা গেলো না রানির ভেতর।
অবশেষে রাজমাতা তার ওষ্ঠ জোড়া নাড়িয়ে কথা বললেন,
“হেমলক বধূ! তোমার এত বড়ো স্পর্ধা আমার পুত্রকে তুমি কক্ষ বন্দী করেছো? আমার ক্ষমতা তুমি মোটেও বুঝতে পারছো না।”
“আপনার ক্ষমতা বুঝে আমার বিশেষ কাজ নেই। তবে আমার মনে হয় আপনাদের প্রত্যেকের এখন থেকে আমার ক্ষমতা সম্পর্কে অবগত হওয়া উচিত। এই প্রাসাদ জুড়ে অনেক অনেক কল্পগল্প রচনা করা হয়ে গিয়েছে। আর নয়।”
“কল্পগল্প!” রাজমাতা প্রাচীর কণ্ঠে বিস্ময়। রাজকন্যা লিলি নিজের ভ্রাতার এই দশা সহ্য করতে পারল না। তীব্র স্বরে বলল,
“আপনি অন্যায় করছেন। আপনাকে রাজ্যের ভার তুলে দেওয়া মানে এই নয় আপনি আমাদের উপর নিজের কঠোরতা ফলাবেন।”
“কঠোরতা? কোথায় কঠোরতা করলাম? একজন উন্মাদ মানুষ অন্যকে আঘাত করতে তেড়ে আসছেন। যখন তখন যে কারো ক্ষতি করে দিতে পারেন। তাকে আটকে রাখা কি কঠোরতা হলো?” রানির যুক্তিতে দমে এলো সকলে। কিন্তু মামাশ্রীর কুটিলতা… সে-যে কমবার নয়। তিনি বুক ফুলিয়ে বললেন,
“উন্মাদ পুত্রটি যেই মাতার তাকে তো অন্তত জিজ্ঞেস করা উচিত ছিলো যে, তার পুত্রের সাথে কী করা উচিত। আপনি তো সেটাও করেননি।”
রানি ঘোমটার আড়ালে চোখ বাঁকিয়ে তাকালেন মামাশ্রীর দিকে। মামাশ্রীর মুখে থাকা সেই বাঁকা হাসি তার ভেতরের রাগটিকে বাড়িয়ে তুলল। বললেন,
“আপনাকে কিছু বলতে বলা হয়নি তো। আপনাকে বলা হয়েছিলো নিজের বাসস্থানে ফিরে যেতে। আপনি বরং সে আদেশে মনোনিবেশ করুন। প্রহরী দিয়ে আপনাকে ধাক্কা মেরে বের করতে আমার ভীষণ ভাবে কষ্ট হবে। যতই হোক আমার আত্মাটি যে ভীষণ উদার।”
অপমানে বাক্যহারা হলো মামাশ্রী। নিজের ভগিনীর দিকে তাকালো। একটি নারী তাদের নাকের উপর দিয়ে এমন করে ছুটবে তা কি তারা আদতেও সহ্য করতে পারবে?
“খবরদার! তুমি ঠিক করবে প্রাসাদে কে থাকবে, না থাকবে? তোমাকে রাজপদ আমি দিয়েছি। এবং তা ছিনিয়ে নিতে দু’ বার ভাববো না।”
“তাই? ছিনিয়ে নিয়ে কাকে দিবেন? আপনার উন্মাদ, ভারসাম্যহীন পুত্রকে? কিন্তু শুনেছি তো রাজপদ উন্মাদ লোক পায় না। তাছাড়া রাজ্যের ভার তো জ্যেষ্ঠ পুত্রের পাওয়ার কথা। আপনার বেলা কি সকল নিয়ম উল্টে যায়?”
থতমত খেয়ে গেলেন রাজমাতা। রানি তখনও ঠাঁই দাঁড়ানো। হেমলক বুকে হাত নিয়ে উপভোগ করছে রানির এই মোক্ষম কৌশল।
ইথুন হতভম্ব স্বরে বলল, “জ্যেষ্ঠ পুত্র তো হ্যাভেনই! তুমি ঠিক কী বলছো বুঝে উঠতে পারছি না।”
ইথুনের আগ বাড়িয়ে করা প্রশ্নে রানি হাসলেন। ওষ্ঠগুলো উন্মুক্ত থাকায় তার সেই বাঁকা হাসি সকলেই দেখতে পেলো। হাসি বজায় রেখেই তিনি ঠাট্টা করে রাজমাতাকে শুধালেন,
“বিশ্লেষণটা কি আমি দেবো, রাজমাতা প্রাচীইইইই…”
শেষে নামটা দীর্ঘ উচ্চারণ করল। যা কাঁপালো রাজমাতাকে। তিনি প্রসঙ্গ কাটাতে ইথুনকে খানিক রাগান্বিত স্বরে বললেন, “এখান থেকে সকলে যাও। ওর সাথে কোনো কথোপকথনেরই প্রয়োজন নেই। ও আসনের লোভে অন্ধ হয়ে গিয়েছে।”
“কতটা অন্ধ? আপনার মতন কি?”
রানির প্রশ্নের শেষ অব্দি উত্তর না দিয়ে রাজমাতা হনহনিয়ে চলে গেলেন। আর এক মুহূর্ত দাঁড়ানোর ক্ষমতা বোধহয় তার ভেতর ছিলো না। বুকটা ভয়ে ধুকপুক করছিলো। রানি কীভাবে এতকিছু রহস্য করে বলছেন তা ভেবে ভেবে তিনি হয়রান হচ্ছেন।
হেমলক তো মুখে কুলুপ এঁটে রাখা ছেলেটি। তার উপর এমন করেই তার মুখটা আটকে রেখেছেন তিনি যে, চাইলেও হেমলক কিছু বলতে পারবে না। তবে রানির কাছে এত তথ্য কীভাবে গেলো? কোনো ভাবে না গেলে তো তার এভাবে হেঁয়ালি করে কথা বলার কথা নয়!
মামাশ্রী যেতে যেতে রানির সারা অঙ্গে একটিবার চোখ বুলিয়ে গেলেন। রানির মসৃণ, কোমল, নরম দেহটি তার চোখ ভার করল। তবে রানির তীক্ষ্ণ কথা তখন তার মস্তিষ্ক জুড়ে বিচরণ করতে ব্যস্ত। তিনি মনে মনে ঠিক করলেন এর একটি বিহিত করবেন। যে বিহিতে সমাধান হবে তার উভয় দিক।
রাজমাতা ও মামাশ্রী যাওয়ার সাথে সাথে চলে গেলো ইথুনও। রাজকন্যা লিলি গেলো রাজবৈদ্যর সাথে। তার হাতে আজ আবার জড়িবুটি লেপন করার কথা। ভ্রাতার দুশ্চিন্তায় ভুলেই বসেছিলো প্রায়। মনে করিয়ে দিল রাজবৈদ্য নিজে। যেন লিলির উন্মনা মনের ভার সে গ্রহণ করেছে নীরবেই।
সেখানে অবশিষ্ট রইল তিনজন- রানি কামিনী, হেমলক ও পিতৃব্য।
হেমলক এতক্ষণ কথা না বললেও এখন বলল। প্রশ্ন করল সর্বপ্রথম, “তুমি রাজমাতাকে ইঙ্গিত করে যা বুঝাতে চাইলে তা সম্পর্কে তোমায় কে জানিয়েছে?”
রানির কণ্ঠ আগের মতনই নির্ভার, “আমার কাছে লুকিয়ে রাখার মতন রহস্য পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়নি।”
“তবুও জানতে চাই।”
“বলার আগ্রহ বোধ করছি না।” মুখের উপর এই ছলচাতুরী বিহীন প্রত্যাখানে দমে এলো হেমলক। তবুও মনটা খচখচ করছে তার। তাই শেষমেশ অনুরোধ করল,
“প্রশ্ন নয়, অনুরোধ। তুমি কী জানো?”
“আপনি যা লুকিয়েছেন তা সবটাই জানি। তবে আমি এই ভেবে অবাক হচ্ছি, আপনি নিজের অধিকার ছেড়ে দিয়ে কেন এমন বৈরাগ্য বেছে নিয়েছিলেন? ঐ রাজ আসনটিতো আপনার ছিলো!”
হেমলক চুপ করে তাকায় রানির দিকে। কিছুক্ষণ নীরব সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সে অকপটে বলে,
“আমার ছিলো বলেই হয়তো আজ তোমার হয়েছে। হয়তো দেরিতে হয়েছে কিন্তু সঠিক মানুষেরই তো হয়েছে তাই না?”
রানি তপ্ত শ্বাস ফেলেন। চুপ করে তাকিয়ে রইলেন হেমলকের দিকে। হেমলক ঠিক কী চায়, কী বলে সে চাইলেও মাঝে মাঝে বুঝে উঠতে পারে না। হ্যাভেনও ঠিক একই রকম। এরা সকলেই একটি দ্বৈত সত্তা ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু কেন?
পিতৃব্য ওদের একান্ত কথা বলার জায়গা করে দিয়ে নীরবেই প্রস্থান নিলেন।
রানির চুপ করে তাকিয়ে থাকা দেখে হেমলক কথার বিষয়বস্তু পাল্টালো,
“তা হ্যাভেনকে বাঁধার কারণ কী?”
“কী অদ্ভুত! বার বার একটি উন্মাদকে বাঁধার কারণ কেন জিজ্ঞেস করছেন আপনারা?” রানির কণ্ঠ এবার একটু রূঢ় শোনালো।
অথচ হেমলক হেসে দিলো সেই কণ্ঠে। রানির আঁচলটা গুছিয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে নাড়তে নাড়তে বলল,
“সবার জিজ্ঞেস করা আর আমার জিজ্ঞেস করা যে এক নয়। আমি জিজ্ঞেস করেছি এজন্য যে, ও তো একসময় তোমার প্রিয় পাত্র ছিলো। সেকথা আর কেউ না জানলেও আমি তো জানি। আমার রানির মনের খোঁজ আমি জানবো না?”
হেমলকের হাস্যরসে ভরা এহেন কথায় রানি থমথমে মুখে তাকিয়ে রইলেন। সত্যিই কি প্রিয় পাত্রটি ছিলো এই হ্যাভেন?
—————
হেমলক আজ প্রাসাদে নেই। গতকাল সন্ধ্যেতে গিয়ে ছিলো একটি রাজ্যের আমন্ত্রণে। চিত্রশিল্পী হিসেবে তার তো নাম-খ্যাতি কম নেই। রাজ্যটি হলো জৈতুন রাজ্য। রাজকন্যা মৃন্ময়ীর বিশেষ আমন্ত্রণ ছিলো। হেমলক সেই আমন্ত্রণ রক্ষা করতে নারাজ হলেও রানি কামিনী জোর করেই পাঠালেন সেই রাজ্যে। তিনি চাচ্ছেন বিভিন্ন বড়ো বড়ো রাজ্যের সাথে সুসম্পর্ক গড়তে। মৃন্ময়ীর কারণে জৈতুন রাজ্যের সাথে যদি সখ্যতা বৃদ্ধি পায় তবে সেটাও বা কী?
আজকে সারাটি দিন কেটেছে রানির ব্যস্ততায়। রাজ্যের বিভিন্ন হালচাল জানতে ও সমস্যা সমাধানে। সন্ধ্যে নামতেই তার বড্ড ঘুম পেলো। চোখ ভেঙে এলো সেই নিদ্রায়। অসময়ে তার সচারাচর নিদ্রা পায় না। তবে আজ কীসের এত নিদ্রা পেলো কে জানে?
—————
তখন প্রায় মধ্যরাত। হেমলকের মন টিকেনি জৈতুন রাজ্যে। তাই প্রায় সন্ধ্যে হতেই রওনা হয়েছিলো নিজ রাজ্যের উদ্দেশ্যে। আজকাল রানিকে ছাড়া তার বিশেষ মন টেকে না কোথাও।
রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করতেই বুঝলো সকলে নিদ্রায় ডুবে গিয়েছে। রাত তো আর কম হয়নি! হেমলক আনন্দ মনে রানির কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো। রানির জন্য সে একটি বিশেষ উপহার এনেছে। খোপার কাঁটা। সূর্যের মতন দেখতে কাটাটি পুরোটাই স্বর্ণের তৈরি। জ্বলজ্বল করছে। রানি দেখলে নিশ্চয় ভীষণ খুশি হবেন। কারণ হেমলক খেয়াল করেছিলো রানি একেক সময় একেক কাঁটা ব্যবহার করেন খোপায়। এ বিষয়ে ভীষণ শৌখিন।
রানির কক্ষের সামনে আসতেই ভ্রু কুঁচকে গেলো হেমলকের। প্রহরীরা তাকে কক্ষে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তার রাজ্যে, তার রানির কক্ষে তাকে প্রবেশ করতে না দেওয়ার কারণ তার বোধগম্য হলো না। অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল,
“আমার কক্ষে আমি কেন প্রবেশ করব না? আমাকে অবমাননা করার সাহস পেলে কোথায়?”
প্রহরীদের তখন মাথা নামানো। ধীর স্বরে বলল, “রানির আদেশ।”
হেমলকের ভ্রু আরও কুঞ্চিত হলো। রানি তাকে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছে? কিন্তু কেন?
প্রহরীদের বাঁধা মানলো না হেমলক। জোর করেই কপাট ধাক্কা দিতেই খুলে গেলো কপাটটি। রানির কক্ষটি বেশ অন্ধকার। বাহিরের আলো কিছুটা কক্ষে যেতেই হেমলক খেয়াল করলো পালঙ্কে দু'টি নর-নারীর অবয়ব। তার পৃথিবী ঘুরে গেলো। তার রানির পালঙ্কে অন্য কোনো নর? অন্য কোনো পুরুষ? তা-ও এত ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………