ক্যামিলাস রাজ্য এর আগে কখনো ইতিহাস লিখতে পারেনি। চোখ মেলে দেখেনি নারীর তেজ কতটা হয়। কখনো বুঝেনি কতটুকু এগোনোর পর সমস্ত পুরুষকেই থামতে হয়। আজ তারা তা দেখলো বিস্ময় নিয়ে। বুক ভরা অসম্ভব কৌতূহল নিয়ে। তারা ভেবেছিলো সত্যি সত্যি কি পাথর নিক্ষেপ করার মতন বিচার হবে? সত্যি সত্যিই কি রাজ্যের নারীরা উপস্থিত হবে এই বিচারকার্যে?
তাদের এই বিরাট হাহাকার করা প্রশ্নটার উত্তর মিললো সূর্য মাথার উপর যাওয়ার আগেই। হুড়মুড়িয়ে যেন নারীদের ঝাঁকে ভরে গেলো বিরাট আঙিনা। মানুষ দাঁড়ানোর জায়গা হয় না। কমার বদলে মানুষ বাড়লো দ্বিগুণ, তিনগুণ, দশগুণ হারে। সে কী এক উপচে পড়া ভিড়! এক মুহূর্ত শ্বাস নেওয়ার উপক্রম নেই। টান টান উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপতে থাকলো সবার চোখের মনি। পলক ফেলবার জোঁ নেই। যেন পলক ফেললেই কতকিছু ঘটে যাবে যা দেখা হবে না।
রানি বসা একটি আরামকেদারায়। তার কথামতো এখনো মাথার উপর সূর্যটি পুরোপুরি এসে স্থিরও হয়নি তার আগেই তার রাজ আঙিনা ভরে গিয়েছে নারীদের দিয়ে। এত দ্রুত নারীরা আসবে কেই-বা ভাবতে পেরেছিলো?
মন্ত্রী ত্রিপাদ কুমার কৌতূহল দমাতে পারছিলো না কোনো মতেই। শেষমেশ তার উসকোখুসকো মুখটি নিয়ে আগ বাড়িয়েই প্রশ্ন করল,
“কীভাবে জানলেন রানি, নারীরা এখানে উপস্থিত হবেন? তা-ও এত সংখ্যক নারী? আমাদের রাজ্যের নারী অথচ আমাদেরই বিশ্বাস ছিলো না এমন ঘটনা ঘটবে!”
ত্রিপাদ কুমারের প্রশ্নে রানির ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটে উঠে। চোখের পলক ফেলেন খুবই স্থির গতিতে। তার সুন্দর মুখটি জ্বলজ্বল করছে সূর্যের আলোয়। এত শোভা, এত সৌন্দর্যতা! যেন পরম মমতায় খোদাই করেছেন সৃষ্টিকর্তা।
“আজ নারীরা না এলে এটা তাদেরই যে দুর্ভোগ হতো! পুরুষরা জানতো নারীদের উপর সমস্ত অ ত্যা চা র করা যায়। তারা প্রতিবাদ করতে পারবে না। তাই নারীরা পুরুষদের সেই ভাবনাকে ঠিক হতে দেয়নি। ভুলে যেও না, নারীদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় তার চরিত্র। সেই চরিত্র রক্ষার্থে তারা পৃথিবীর ধ্বংসের কারণ হতে পারে।”
ত্রিপাদ কুমার অবাক হয়ে শুনল রানির কথা। সে যতই এই মানুষটিকে দেখছে ততই অবাক হচ্ছে। তার মাঝে মাঝে মনে হয় এই নারীটি বোধহয় উল্কাপিণ্ড। নয়তো এমন করে সব জ্বালিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন কী করে?
মামাশ্রীকে উলটো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে গাছের মগডালে। ঝুলছে সে। আর চিৎকার করছে অনবরত। মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করতে পেরে তার গলা শুকিয়ে আসছে। রানি ইশারা করলেন কার্যক্রম শুরু করার। রানির ইশারা পেতেই মামীশ্রীকে উপস্থিত করা হলো সকল নারীর সম্মুখে।
সে নির্ভেজাল মানুষ। সবসময় থেকেছে নিপাট সোজা। একটি অক্ষরও বলেনি স্বামীর অনুমতি ব্যতীত। সে মানুষটা কি আর পাথর মারতে পারবে স্বামীর গায়ে?
রানি বসা থেকে আদেশ করলেন, “মামীশ্রী, প্রথম পাথরটি আপনি ছুঁড়বেন। এরপর ছুঁড়বে বাকি নারীরা। শুরু করুন।”
জনসমুদ্রের উৎকণ্ঠা ভরা দৃষ্টি মামীশ্রীর দিকে। মামাশ্রী সেই মগডাল থেকেই চিৎকার করে বলছে, “প্রিয় পত্নী আমার, আমার জন্য প্রানভিক্ষা চাও রানির কাছে। আমাকে বাঁচাও প্রিয়, শ্যামা।”
মামিশ্রীকাঁপতে লাগল একই সাথে কাঁদতে লাগল। রানি আসনেই বসে রইলেন কঠোর চাহুনি নিয়ে।
“কী হলো? আমার মাথার উপর সূর্য আসার আগে এই শাস্তি শুরু হবে বলেছি। এত অপেক্ষা কীসের তাহলে? একজন কাপুরুষ স্বামীর জন্য হাত কাঁপছে আপনার? যিনি আপনাকে কখনো স্ত্রীর মর্যাদা দেননি, তার জন্য কাঁদছেন? যিনি অন্য একটি নারীকে অপমান করার দুঃসাহস দেখালো তার জন্য এখনো মায়া হয় আপনার?”
মামিশ্রীনিশ্চুপ। নীরবে বিসর্জন দিচ্ছে চোখের অশ্রু।
এক পর্যায়ে হেমলক হালকা নুয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “থাক নাহয়! মামিশ্রীবোধহয় পারবেন না। তাকে ছেড়ে দাও।”
“ছেড়ে দাওয়ার হিসেব আমার কাছে নেই। আমি চাই মামাশ্রী মৃত্যুর আগে মানসিক ভাবে এই আঘাতটুকু পেয়ে যান যে, তার স্ত্রীও তার দিকে পাথর ছুঁড়তে পারে। তার অপরাধ কতটা ঘৃণিত হলে স্ত্রী'র পাথর ছোঁড়ার ক্ষমতা হয় তা মামাশ্রী বুঝুক। শারীরিক আঘাতের চেয়ে মানসিক আঘাত ভয়ঙ্কর।”
হেমলক চূড়ান্ত পর্যায়ের হতবিহ্বল হয়ে তাকালো রানির দিকে। রানির চিন্তাভাবনা কত দূর অব্দি তা ভেবে ভেবে সে তাজ্জব হলো কেবল। এই নারীকে বোঝার সাধ্যি তার কস্মিনকালেও বোধহয় সম্ভব নয়।
বন্দীনি রাজমাতা নিজের প্রাণপ্রিয় ভ্রাতার প্রাণ ভিক্ষা চাইতে লাগলেন নানান আকুতি মিনতি মিশিয়ে। তার কান্নার চিৎকারে চারপাশটা শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে গিয়েছে রীতিমতো।
রানি এবার উঠে দাঁড়ালেন তার রাজকীয় ভঙ্গিমায়। কণ্ঠের প্রখরতা তীব্রতর করে আদেশ ছুঁড়লেন,
“মামীশ্রী, আজ যদি আপনি পাথর না ছুঁড়েন তবে এমন চরিত্রহীন, ল ম্প ট পুরুষদের কাছে পরাজয় ঘটবে নারীদের সম্মানের। এনারা ধরে নেবেন যে এবং নোংরা অন্যায় করেও ছাড় পাওয়া যায়। আমি জানি, আপনি তা হতে দিতে পারেন না। আপনার ভেতরেও একটি সাহসী কামিনী বাস করছে যে পরিবেশ কিংবা পরিস্থিতির অভাবে ডানা ঝাপটাতে পারেনি। আজ আমি সেই সুযোগ আপনাকে দিয়েছি। আপনার ভেতরের সেই তেজস্বিনীকে বের করুন। দেখুন, আপনি একা নন। আমরা সকলে আপনার সাথে আছি।”
রানির এই আশ্বস্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা দেখে হেসে কুটিকুটি হলো মামাশ্রী। সেই মগডালে থেকেও সে খুব গর্বের সঙ্গে বলল, “আমার পত্নী আমায় আঘাত কখনোই করবে না, রানি। তুমি হেরে যাবে। আমার পত্নীর প্রেমের কাছে তুমি হেরে যাবে।”
“তাই? ঠিক আছে। আজ যদি আপনার পত্নী আপনাকে আঘাত না করে তবে আমি আপনাকে মুক্ত করে দিবো। যান কথা রইল। আমি এখান থেকে আমার আসনে বসার সময়টুকুতে তিনি আপনাকে পাথর নিক্ষেপ না করলে আপনি বেঁচে যাবেন।”
উপস্থিত জনমানসের ভিড়ের ভেতর থেকে চাপা গুঞ্জন ভেসে এলো। রানি কী করছেন এসব? এ কেমন রূপ তার? কখনো তীব্র অগ্নি তো কখনো নীলাভ সমুদ্র! এতক্ষণ যে মানুষটিকে মে রে ফেলতে তিনি কঠোর ভাবে মগ্ন ছিলেন এখন সেই মানুষটিকেই বাঁচার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন? অন্যায় করেও বেঁচে যাবে মানুষটি তা রানি নিজে বলছেন? রানির মনে আদতে চলছেটা কি?
সবাইকে তীব্রতর ভাবে উৎকণ্ঠিত করে দিয়ে রানি আসনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। মগডালে তখন হাসছে মামাশ্রী,
“তোমার হারের জন্য প্রস্তুত হও, রানি। তুমি হারবে।”
সেদিক পানে তাকিয়ে রানি বাঁকা হাসলেন। এতটাই তীক্ষ্ণ ছিলো সেই হাসি যে মামাশ্রীর জয়ী মুখটি থেমে গেলো। রানি হাসি বজায় রেখে আসনে বসার প্রস্তুতি নিতেই একটি শব্দ হলো। পরপর চিৎকার করে উঠল মামিশ্রী। সকলে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে দেখলো মামিশ্রী তার হাতের পাথরটি ছুঁড়ে মেরেছে। মামাশ্রী চিৎকার করে পরমুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার চোখ-মুখে একদিকে ধরা দিলো বিস্ময় অন্য দিকে মৃত্যু ভয়।
“আমার স্বামীকে আমি ভালোবাসি। তবে আজকের আঘাতটি আমি করেছি একজন চরিত্রহীন পুরুষকে। আমার স্বামীকে না।”
মামিশ্রীর রুদ্ধস্বরের কথা থামতেই পর পর, অনবরত, অবিরত পাথরের বর্ষণ হলো যেন মামাশ্রীর দেহে। থে ত লে গেলো তার মুখটি, থে ত লে গেলো দেহ। র ক্ত ছুটলো ফিনকি দিয়ে। কতক্ষণ ছটফট করল গলা কা টা প্রানীর ন্যায়। একটা সময় তার শরীরের সেই ছটফটানি থেমে গেলো। কিছু কিছু জায়গার মাংসতো প্রায় খুলে খুলে ঝুলে গেলো। কী এক বিভৎস দৃশ্য! পুরুষদের ভেতর অনেকেই তা সহ্য করতে পারল না। কিন্তু দেখলো নারীগুলো তাকিয়ে আছে সেই দেহটির দিকে নির্ভয়ে। অগ্নি ঝরা দৃষ্টি নিয়ে। ঘৃণা উপচে পড়ছে তাদের চোখে। সাধারণ ঘরের সংসারী নারীদের ভেতর এমন জ্বলন্ত আগুন ক্যামিলাস রাজ্যের নতুন ইতিহাস গড়ল। যেই ইতিহাসের প্রতীক হলো রানির ঠোঁটের গৌরবের হাসিটি।
—————
রাজকন্যা লিলি জ্ঞান হারিয়েছে বহুক্ষণ। তার কক্ষতে বিচরণ করছে রাজবৈদ্য। নানান রকমের পথ্য দিতে ভুল করছে না মোটেও। সন্ধ্যে নেমেছে পৃথিবী জুড়ে। নির্মল বাতাসে প্রাসাদের প্রাচীর নির্ভার হয়ে আছে। একটি কক্ষ থেকে অনবরত ভেসে আসছে কান্নার শব্দ। কক্ষটি মামিশ্রীর। আরেকটি ভিন্ন কক্ষ সম্পূর্ণ নীরব। সেটি রাজমাতার। যেহেতু উনি ভ্রাতার এই কার্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না তাই তার কোনো শাস্তি হয়নি। কিন্তু নিজের চোখের সামনে ভ্রাতার এমন দশাই বোধহয় ছিলো সবচেয়ে বড়ো শাস্তিটি। যা তার ভাষা, বাক্য কেঁড়ে নিয়েছে।
প্রাসাদ জুড়ে নেমে এসেছে থমথমে ভাব। এমন একটি ঘটনা সকলের হৃদয়ে প্রবল ধাক্কার ন্যায় ছিলো।
রানি স্নানাগার থেকে ফিরেছেন কিছুক্ষণ আগেই। তার চুলে দেওয়া হচ্ছে ধুনোর ধোঁয়া। তিনি চোখ বন্ধ করে, পা দু’টি মেলে আধশোয়া হয়ে পালঙ্কের সাথে হেলান দিয়ে আছেন। দু'টি দাসী নীরবে তাদের কার্য করে যাচ্ছে।
সেই মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করল হেমলক। চোখমুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে তার ক্লান্তি। এসেই দাসীদের বাহিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলো। কক্ষে পড়ে রইল ওরা দু'জন।
রানির চোখের পাতা বন্ধ অথচ কথা ভেসে এলো, “কীসের ক্ষোভ ছিলো মামাশ্রীর প্রতি আপনার? কেবল আমাকে কলঙ্ক লেপন করতে চেয়েছেন উনি সেই ক্ষোভ নয়, আরও কিছু ক্ষোভ বোধহয় যুক্ত আছে এখানটায়। কীসের ক্ষোভ তা?”
হেমলক রানির পায়ের কাছটার দিকে এসে বসলো। তবে পালঙ্কে নয়, নিচে। মাথা রাখলো রানির কোমল, নরম পা দুটিতে। হাঁটুগুলো ভাঁজ করে দু'হাতে আষ্টেপৃষ্টে নিলো। বলল,
“সেসব আজ নয়। থাকুক।”
“থাকবে? কেন?”
“আজ ক্লান্ত ভীষণ। অনেকদিন পর বোধহয় আমার ভালো নিদ্রা হবে।”
“আমি আপনাকে বিবাহ করেছি একটি উদ্দেশ্যে। তা হলো আমার রাজ্য ফিরে পাওয়া। এ কথাটি আপনি বেশ ভালো করেই জানেন আর আমি তা বলিও। এবং আপনি এটাও জানেন, আপনিও আমাকে বিবাহ করেছেন কিছু উদ্দেশ্যে। কিন্তু আপনি সে কথাটি বলেননি, স্বীকার করেননি। আমাকে কেবল ভালোবেসে আপনি বিবাহ করেননি, আমি তা বেশ জানি।”
হেমলকের নিদ্রায় ভারি চোখ। এক পলক রানির দিকে তাকিয়ে চাপা হেসে সম্মতি দিয়ে বলল, “ কেবল ভালোবেসে বিয়ে করিনি তা হয়তো ঠিক। এর সঙ্গে এটাও ঠিক যে, বিয়ের পর এই এত দিনে বাকি সব ফিকে হয়ে আমার হৃদয়ে স্থায়ী হয়েছে কেবল ভালোবাসাটিই। কী করবে বলো? প্রাণ নিবে? সঁপে দিয়েছি আমি নিজেকে এইতো তোমার পদতলে। আমার কাছে এখন একটি মাত্র কারণ অবশিষ্ট আছে। তা হলো— কেবল ভালোবাসা, ভালোবাসা আর ভালোবাসা।”
রানি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন হেমলকের দিকে। মনে মনে তার সাজানো হলো আরও আরও গুটি। এই রাজ্য ছাড়ার সময় হয়ে গিয়েছে যে তার! ছাড়ার আগে আরও কিছু কাজ গুছিয়ে যেতে হবে।
সন্ধ্যা আরতির ঢাক বেজে উঠলো। ভেসে এলো তার সাথে ঘুঙুরের শব্দ। অদৃশ্য সেই নৃত্যের দৃশ্য কল্পনাতে রানির চোখে ভেসে উঠল। বন্ধ কক্ষটি থেকে আসা সেই শব্দ আরও একটি গল্প লিখছে নিরবে, নিভৃতে।
রানি সেদিকটায় কান খাঁড়া করে উন্মনা মনে শুধালো,
“আপনার মাতাকেও এমন কলঙ্কেই মাত দেওয়া হয়েছিলো তা-ই না? সেই ক্ষোভেই আজ আপনার দেহ জুড়ে বেরিয়ে এসেছে। আমি নির্বোধ নই। আমি যেখানে থাকি সেখানের ইতিহাস আমি সবটা অবগত হয়েই থাকি। আপনার মাতার প্রতিশোধের জন্য আপনি আমায় বেছে নিয়েছেন। তাই নয় কি?”
·
·
·
চলবে……………………………………………………