যামিনীর কক্ষটিতে ভেজানো কপাট। দেহরক্ষী মূর্তির মতন স্থির দাঁড়ানো। শুষ্ক বাতাসে বারংবার উড়ে যাচ্ছে কপাটের সামনের পর্দাটি।
হ্যাব্রো এলো কিছুটা উৎকণ্ঠা নিয়ে ছুটেই। অনুমতি নেওয়ার সময়টুকু যেন তার নেই। হনহনিয়ে প্রবেশ করল যামিনীর কক্ষে।
কক্ষে যামিনী শুয়ে আছে বিছানায়। গত কয়েকদিন ও কেবল আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করছে। কীভাবে রানি কামিনীকাঞ্চনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে জয় ছিনিয়ে আনতে পারবে তা-ই ভাবছে। কিন্তু আজ অসময়ে কেন বিশ্রাম নেওয়ার ঝোঁক?
“কারগার থেকে পালিয়েছে একজন বন্দী থাকা লোক। আপনি কি তা অবগত?”
হ্যাব্রোর কণ্ঠে পূর্বের সেই তেজ। রানি কামিনী থাকাকালীন ঠিক যেমন করে কথা বলতো সে তেমন তেজ। কণ্ঠে নেই কোনো বাঁধাধরা নিয়মের আভাসটুকু।
যামিনী নিজের বন্ধ চোখের পাতা খুলবার প্রয়াস করল না। পূর্বের ন্যায় থেকেই প্রতিত্তোরে বলল, “আমাকে প্রশ্ন করছো? ভুলে যাচ্ছো আমি কে।”
হ্যাব্রো আরও খানিক ক্ষুব্ধ হলো। সে আজ নিজেকে দমাতে পারছে না। এত বছর ধরে রানি কামিনী যাকে কারাগারে বন্দী করে রাখলো তাকে কীভাবে যামিনী যেতে দিলো? কেনই বা দিলো? এতটা সাহস তার কী করেই বা হলো?
“আপনি কে তা বোধকরি অবুঝ শিশুও ভুলতে পারবে না। এমন বিশ্বাসঘাতক সখী কারই বা হয়? ক’জনই বা এমন অমানবিক হতে পারে?”
যামিনী স্তব্ধ হলো। যেই কথাগুলো এতদিন পিঠ পিছে আলোচনা চলতো এবং যা বলার জন্য শাস্তি হলো মন্ত্রীমশাইয়ের, সেই কথাগুলো হ্যাব্রো কি-না তার সামনে অকপটেই বলছে? এতদিন না হ্যাব্রো তার সাথে কোমল আচরণ করল? তাহলে সেসব কি নেহাৎই ভুল ছিলো?
“মুখ সামলাও, সেনাপতি। নয়তো বিপদ হতে পারে।”
“কী বিপদ হবে? কী করতে পারেন আপনি? যে সত্যি বলে তার মুখের বুলিটুকু কেঁড়ে নেওয়া ছাড়া আর কিছুই কি পারেন?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ পারি। আমাকে উত্তেজিত করলে যা কিছু করে ফেলবো।”
“কী করবেন? কী করতে পারেন আপনি? আপনার মতন স্বার্থপর নারীকে ধিক্কার আমার।”
যামিনী আহত হলো। চোখগুলো তার ছলছল করে উঠল। গোটা পৃথিবীর সাথে হিং স্র হতে পারলেও এই এক জায়গায় সে নিজেকে অসহায় অনুভব করে। কেন সে এতটা ভালোবাসলো এই সেনাপতিকে? যে লোকটা তাকে সামান্য পরিমাণ মায়া অব্দি করল না!
“নিজেকে সংযত করো। কারাগার থেকে যে পালিয়ে গিয়েছে তাকে খোঁজা শুরু করতে বলো।”
“কেউ আদৌ পালিয়েছে নাকি আপনি পালাতে সাহায্য করেছেন?” বাঁকা চোখে তাকিয়ে আছে হ্যাব্রো। তার কণ্ঠে অবিশ্বাসের ছোঁয়া। যামিনী চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালো। পরক্ষণেই সন্তর্পণে সামলে নিলো নিজেকে,
“আমাকে কঠোর হতে বাধ্য করো না।”
“আমি তো আগেও বলেছি, এখনও বলছি, আমি যা করছি তা করবো। আপনি কী করার করুন।”
যামিনী আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করল শেষমেশ। তীব্র কণ্ঠে ডাকল খাস প্রহরীকে। কিছু মুহূর্ত যাওয়ার আগেই সেই প্রহরী এলো হন্তদন্ত হয়ে। পেছন পেছন শশীও এলো।
যামিনী শোয়া থেকে উঠে বসে প্রহরীকে নির্দেশ করে বলল, “সেনাপতি হ্যাব্রোকে কারাগারে নিক্ষেপ করো। এখুনি।”
অবাক হয়ে গেলো শশী। প্রহরীরাও তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যাল করে। যামিনীর হ্যাব্রোর প্রতি ভালোবাসার কথা জানে না এমন কেউ নেই। এই প্রাসাদের প্রতিটি স্তম্ভ জানে কতটুকু প্রেম যামিনীর অন্তরে পুষে রাখা হ্যাব্রোর জন্য। অথচ আজ কী এমন হলো যে, এ হ্যাব্রোকে শাস্তি দিতে প্রস্তুত তিনি!
হ্যাব্রো এক দলা থুতু নিক্ষেপ করল পরম তাচ্ছিল্যে,
“আপনি কেবল সত্য আটকাতে পারবেন সাময়িক সময়ের জন্য কিন্তু আপনার ভবিতব্য কতটা ভয়ংকর হবে তা বুঝতেই পারছেন না। বনের শূয়র হওয়া ভালো অকৃতজ্ঞ মানব হওয়ার চেয়ে। ধিক্কার জানাই আপনাকে।”
যামিনী নিজের মনের সবটুকু নরম সত্তাকে শক্ত করে তুলল। বিকট শব্দে প্রহরীদের বলল,
“এখুনি ওকে আমার সামনে থেকে সরিয়ে নাও। আমার সহ্য হচ্ছে না ওকে। সরিয়ে নাও।”
প্রহরীরা সেই চিৎকারে আঁতকে উঠল। দ্রুত দু'জন দু'দিক থেকে আটকে ধরল হ্যাব্রোকে। টানতে টানতে নিয়ে যেতে আরম্ভ করল। হ্যাব্রো আগুন গরম চোখ নিয়ে তাকিয়ে রইল এক দৃষ্টিতে যামিনীর দিকে। তার ঠোঁটের চাপা বাঁকা হাসিটা যামিনী খেয়াল না করলেও, হ্যাব্রো ঠিক দেখলো যামিনীর চোখের এক ফোঁটা অশ্রুকে। নিজের কাজ ভাবনা অনুযায়ী সফল করতে পেরে হ্যাব্রোর আনন্দ হলো। ভীষণ আনন্দ। যামিনীকে মানসিক ভাবে এই মুহূর্তে দুর্বল না করতে পারলে রানি কামিনীর পথ সহজ হবে না। আর এই রাজ্যের সকল খবর, সকল কিছু হ্যাব্রোই জানে। তাকে বন্দী করা হলে, সেই সবকিছুর খোঁজ যামিনী কখনোই পাবে না। কী হবে এরপর?
—————
রাত্তিরের তখন মধ্যম প্রহর। একটি হাস্যোজ্জ্বল চাঁদ গগনে মাঝে বিচরণ করলেও তাকে তেমন দেখা যাচ্ছে না। মনুষ্য চোখে দেখা মিলছে কেবল কুয়াশার। কুয়াশায় ঘিরে আছে চারপাশটা। হিমশীতল আবহাওয়ায় চারপাশে।
রানি কামিনীকাঞ্চনের চোখে নিদ্রা নেই। খুব সাদামাটা শরীর তার। নিদ্রাযাপনের আগে তার শরীর যখন সকল জৌলুশ ভরা কাপড়, গহনা ছেড়ে ফেলে তখন রানিকে লাগে ভুবনমোহিনী সুন্দর। খুব সাধারণ যখন দৃষ্টি আকর্ষণীয় হয় তখন বোধহয় সাধারণকেও আর সাধারণ বলে বিবেচনা করা যায় না। অলংকার বিহীনও রানির শরীর এতই ঝলমল করে, দেখে যেন মনে হয় গহনার লজ্জা এখানেই যে- সে ব্যতীতও কোনো শরীর নিখুঁত সুন্দর হয়ে উঠে।
রানির গায়ে সাদা শাড়ি লাল পাড়। চুলগুলো ঢেউ খেলানো। হাঁটায় আজ কোনো শব্দ নেই। নিশ্চুপ, নীরবতায় আচ্ছাদিত করে রাখছে তার বিচরণকে। পুরো প্রাসাদ নিদ্রামগ্ন। ঝিমুচ্ছে প্রহরীরাও।
রানি ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে হ্যাভেনের কক্ষের সামনে দাঁড়িয়েছেন তার খেয়াল নেই। কোন ভাবনায় মগ্ন ছিলে কে জানে!
তার ধ্যান ভাঙলো প্রহরীর কথায়, “কিছু লাগবে আপনার, রানিমা?”
রানি চমকে উঠলের। রানিমা সম্বোধনে তাকে ডাকতেন এ্যাজেলিয়া রাজ্যের রাজ পুরোহিত। এছাড়া এই সম্বোধন তিনি আর কারো মুখে পছন্দ করতেন না। আজ বহুদিন পর এই সম্বোধন তাকে বিস্মিত করল,
“তুমি! তুমি আমায় রানিমা বলেছো?”
প্রহরীর বয়স নেহাৎই অল্প। সে মাথা নামিয়ে আছে। দৃষ্টিও তার নত। হ্যাঁ বোধক সম্মতি দিয়ে বলল, “বলেছি।”
“কিন্তু কেন? এই সম্বোধনে কেউ ডাকে না আমায়।”
“আপনার অমন সাহস দেখে আমার কেবল আপনাকে রানি বলতে কণ্ঠে বাঁধছিলো। আপনি মায়ের মতনই মমতাময়ী, রানির মতন ক্রোধ আপনার। তাই দুই মিলেই রানিমা হয়ে উঠেছেন।”
রানি কামিনী নিশ্চুপ চোখে প্রহরী ছেলেটিকে পরখ করল। তার জীবনে সে খুব কম মানুষের কথায় প্রভাবিত হয়েছে। মানুষের কথা, আবেগ কখনো তা নড়াতে পারে না। কিন্তু এই ছেলেটির কথায় কিছু একটা ছিলো যা তাকে বড়ো উপলব্ধি করিয়েছে। ছেলেটির বয়স হয়তো ষোল-সতেরো হবে! তার ভ্রুণটি বেঁচে থাকলে এমন বয়সই কি হতো?
ভাবনাকে তিনি আর প্রশ্রয় দিলেন না। একটি নির্দিষ্ট সীমানায় বন্দী করে দিলেন। যে সময় চলে গিয়েছে কোনো এক দুঃস্বপ্নের রাতের মতন, সেই সময়ের স্মৃতি আজ কেবল ব্যথাই বাড়াবে এছাড়া আর কোনো ক্ষমতা নেই তার। আর যা রানির ব্যথার কারণ তাকে রানি মনে রাখেন না। কখনোই না।
রানি সেখানে আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে সরে গেলেন। সরে গিয়ে দাঁড়ালেন প্রাসাদের উত্তর দিকটার প্রসস্থ খোলামেলা জায়গাটিতে। যেখান থেকে দেখা যায় পেছনের ভরা বাগান, এর পেছনের ঝিল এবং তার চেয়েও দূরে দাঁড়ানো পাহাড়টিকে। প্রাসাদটি যিনি তৈরি করেছিলেন, নিঃসন্দেহে তিনি উত্তম রুচির অধিকারী ছিলেন। শৌখিনতা তার কম ছিলো না বোধহয়। নয়তো এত সুন্দর স্থান বাছাই করাটাও তো একটি কঠিন কর্ম।
“নিদ্রা যাপন করোনি কেন, সুধাকান্তা? তোমার এখন নিদ্রা প্রয়োজন।”
রানির গভীর ভাবনা ভঙ্গ হলো। কণ্ঠ শুনেই আর তাকানোর প্রয়োজন মনে করলেন না। পূর্বের মতন চোখ এক দিকে আবদ্ধ রেখেই বললেন,
“আপনিও তো নিদ্রাযাপন করেননি!”
“আমার রানির নিদ্রাহীন রাত্তিরে আমার কি ঘুম নামবে চোখে? আমি যে পত্নী ভক্ত ভীষণ।” কথা বলতে বলতে রানির পাশে এসেই দাঁড়ালো হেমলক। তাকালো বরাবর রানির মুখের দিকেই। রানি তা বুঝতেও পারলেন বেশ কিন্তু তিনি মুখ ঘুরানো কিংবা চোখ ফেরানোর আবশ্যকতা দেখালেন না ঠিক। বললেন,
“আমার সাথে আপনার নিদ্রার কোনো সম্পর্ক নেই বলেই আমি মনে করি।”
“সম্পর্ক নেই?”
“না। আমি আর কিছু দিনই আছি এই রাজ্যে। এরপর আপনি জানবেন না আমি নিদ্রায় ডুবেছি নাকি নিদ্রাহীনতায় কাটাচ্ছি জীবন। তাহলে কেন এই অকারণ দুশ্চিন্তা?”
রানির কাঠ কাঠ কণ্ঠস্বর। হেমলক ব্যথিত চোখে তাকিয়ে রইল। সেই ব্যথিত চোখে রানি তাকানোর ভরসা পেলেন না। কোনো মায়ায় যে আটকাতে চান না!
ঠিক তখনই উপস্থিত হলো মৃন্ময়ী। সৌন্দর্যতার দিক দিয়ে তাকেও দমানো দায়। এসেই সে দাঁড়ালো তাদের মধ্যিখানে। অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। বলল, “আপনারা এখানে? বিশেষ সময় কাটাচ্ছিলেন বুঝি?”
হেমলক চোখ ফিরিয়ে নিলো মৃন্ময়ীর থেকে। রানি কামিনীকাঞ্চন নিলেন না। গভীর ভাবে হেমলকের প্রতি মৃন্ময়ীর টানটুকু বুঝতে চেষ্টা করলেন।
“তেমন কিছু নয়। আমার কিছু কাজ আছে। তোমরা এখানে আলাপ করো। আমি আসছি।”
দু'জনকে একান্ত সময় কাটাতে দিয়ে হনহনিয়ে সরে গেলেন রানি। হেমলক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। তার মন ভাঙলো নিঃশব্দে। একজন স্ত্রী যখন স্বামীকে অকপটে অন্য একটি নারীর সঙ্গে এই গভীর রাতে কথা বলতে ছেড়ে যায় তখন তো অনায়াসেই ধরা যায়, সেই স্ত্রীর মনে স্বামীর প্রতি কোনো আকর্ষণ নেই।
হেমলকের ব্যথাতুর মুখটি মৃন্ময়ীর কাছে অগোচর হয়নি। সে পরিস্থিতিকে শীতল করতে হাসি মুখে বলল,
“কখনো কখনো ভালোবাসা অর্জন করার বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। মন খারাপ করছেন কেন? চেষ্টা করলে অর্জন বোধহয় করতেই পারবেন একদিন।”
মৃন্ময়ীর ইঙ্গিত বুঝল হেমলক। তাকাল মৃন্ময়ীর দিকে। চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করল। যেন রানির মন পাওয়ার যু দ্ধে হেমলকের বিশ্বস্ত সৈনিকটি হবে সে।
—————
হেমলকদের কাছ থেকে রানি যখন নিজের কক্ষের দিকে এগিয়ে আসছিলেন তখন তার চোখ চলে গেলো রানি ইথুনের কক্ষের দিকে। প্রহরী নেই সেই কক্ষের বাহিরে।
এহেন দৃশ্যে কিছুটা অবাক হলেন রানি। নিজের কক্ষে প্রবেশ না করে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ইথুনের কক্ষে যাওয়ার
এবং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি যখন ইথুনের কক্ষে অগ্রসর হলেন থমকে গেলেন কান্নার শব্দে। তৎক্ষণাৎ তিনি প্রবেশ করলেন ইথুনের কক্ষে।
অথচ কক্ষ আঁধার। ভেতরে নেই কেউ। অথচ কান্নার শব্দটি গুরুতর মিহি হয়ে শোনাচ্ছে। ইথুনকে না পেয়ে রানি যখন ফিরে যেতে নিলেন খোঁজ করতে তখনই তার চোখ গেলো জানালার দিকে। খোলা জানালা দিয়ে তিনি উঁকি দিতেই দেখলেন ঠিক নিচে বাগানের এই পাশটায় বসে আছে রানি ইথুন। কেবল বসেই নেই, কাঁদছে সে। তার হাতের তৈলচিত্রে একটি মুখ উঁকি দিচ্ছে। জোছনা কুয়াশায় মলিন হওয়ায় সেই মুখটি স্পষ্ট যদিও রানি ঠিকঠাক দেখতে পেলেন না তবুও অবয়ব দেখে আন্দাজ করে ফেললেন চট করে মুখটি কার। এরপর তার মস্তিষ্কে ভেসে উঠল বেশ কিছু দিন আগের একদিন রাতের সেই দৃশ্যটি। যেদিন রানি ইথুন বাগান থেকে ছুটে আসছিল এবং দেখা গিয়েছিল একটি পুরুষকে। যে হ্যাভেন ছিলো না। ছিলো অন্য কেউ। আজকের তৈলচিত্রের অবয়ব দেখে রানি বুঝে গেলেন কে ছিলো সেই মানুষটা।
তাই তো মামাশ্রীর মৃত্যুর পর থেকে ইথুনকে ভাসতে দেখা গিয়েছে অকূল পাথারে। শোকসাগরে নিমজ্জিত সে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………