কামিনী - পর্ব ৬১ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          অন্ধকার জঙ্গলটির চারপাশে মশাল জ্বলছে ধিক্ ধিক্ আলোয়। পশুপাখির গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। রানি কামিনীকাঞ্চন গিয়ে গিয়ে প্রতিটি আহত সৈন্যদের দেখছেন। ঠিকঠাক চিকিৎসা হচ্ছে কি-না তা খেয়াল করছেন। কার কী প্রয়োজন তা মনযোগ সহকারে শুনছেন। এরপর চেষ্টা করছেন সবটা পালন করতে।

 রাত বাড়ল। সৈন্যদল ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছে। চারপাশটা অত্যাধিক নিরিবিলি। রানি বসে আছেন নিজের তাবুর সামনে। চারপাশে জ্বলছে মশাল। সেই হলদেটে আলোয় তার মুখ চকচক করছে। তিনি বসে কিছু একটা ভাবছিলেন। এরই মাঝে শুকনো পাতায় মড়মড় শব্দ হলো। রানির ভাবুক মন সাবধানী হয়ে উঠল। চোখ গুলো শিকারীর চোখের মতন চারপাশে ঘুরল। তলোয়ারের উপর হাতটা চেপে ধরল শক্ত করে। 
 যামিনী যেই বিশ্বাসঘাতকতা তার সঙ্গে করেছে এরপর আর কাউকে বিশ্বাস করার কথা তিনি ভাবতেও পারেন না। এই যু দ্ধে জয়লাভের আশায় মেয়েটা আবারও কিছু করতে পারে। 

  রানির আশঙ্কা ভুল প্রমাণ করে এগিয়ে এলো রাজবৈদ্য। পাতলা শরীর তার। হাতে একটি মশাল ধরে রাখা। সে রানিকে এভাবে বসে থাকতে দেখেই এখানে এসেছে। 
“আপনি বিশ্রাম নিবেন না, রানি? নিশি তো ফুরিয়ে আসবে আর কিছু সময় বাদেই। বিশ্রাম না নিলে যুদ্ধক্ষেত্রে কীভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন? তখন দেহ ক্লান্ত লাগবে।”

নিজের চেয়েও বয়সে অধিক ছোটো রাজবৈদ্যটির কথায় রানি শ্বাস ফেলল ছোটো। বয়স তত পরিপক্ব না হলেও ছেলেটি বেশ যত্নশীল ও বুদ্ধিমান।
 রানি তার দিকে না তাকিয়েই বললেন, 
“আপনিও তো বিশ্রাম নেননি! আপনারও কালকে শক্তি থাকা প্রয়োজন। আপনিই তো সকলের ব্যথা সারবেন।”

 “আমার তো গুরুদায়িত্ব আপনাকে পাহারা দেওয়া আপনি ঠিক আছেন কি-না নিশ্চিত করা। তাই দেখতে এসেছিলাম।”

“গুরুদায়িত্ব?” বলেই রানি ভ্রু খানিক কুঞ্চিত করলেন।

রাজবৈদ্য লাজুক হাসলো। মাথা নাড়িয়ে বলল, “হ্যাঁ। রাজ্য থেকে আসার সময় রাজা হেমলক পিয়ার্স এই দায়িত্ব আমাকে দিয়ে ছিলেন। তা পালন না করার সাধ্যি কি আমার আছে?”

 হেমলকের নামটা শুনে রানির হৃদয় খানিক ধুকপুকানিটার বোধহয় পরিবর্তন হলো। বাড়লো হৃদপিণ্ডের গতিটা তিল পরিমাণ। তবে বাহির তিনি রইলেন শান্ত, স্থির। কথাটাকে খুবই সামান্য গন্য করে বললেন,
“আমার খেয়াল আমি রাখতে পারি, রাজবৈদ্য। আপনি বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন আমি কে। আমি একজন রানি। পুরো একটি সাম্রাজ্য ও অসংখ্য প্রজার দায়িত্ব আমি কাঁধে বয়ে বেড়াই আর নিজের খেয়াল রাখতে পারব না? হাস্যকর!”

 “সে আপনি আমাদের সবার জন্য রানি কিন্তু রাজার জন্য তো তার কোমল স্ত্রী তাই না! সেজন্য বোধহয় বিশেষ খেয়াল।”
 রানি চোখ ঘুরিয়ে তাকালেন রাজবৈদ্যর দিকে। ছেলেটা মিটিমিটি হাসছে। কথাটা বলে বেশ মজা পেয়েছে বোধহয়। 
রানি গলা ঝাড়লেন সাবধান করতে। এরপর কাঠ কাঠ স্বরে বললেন,
“এখুনি গিয়ে বিশ্রাম নিন। আর এক মুহূর্তও এখানে দাঁড়ানো নয়। যান।”

  রাজবৈদ্য সম্মতি প্রদান করে, কুর্নিশ করে চলে গেলো। রানি বসে রইলেন এক ধারে। শত্রুর চারপাশে থেকে নিশ্চিন্তে ঘুমানো যাবে না। এতে বিপদ হবে। তাছাড়া এখানের যতজন সৈন্য, লোক, রাজ ঘোড়া, হাতি আছে সেই সমস্তর দায়িত্ব তো তারই! যদি ঘুমিয়ে যাওয়ার পরে এদের কোনো ক্ষতি হয়ে যায়?
 না, না, তিনি এদের ক্ষতি হতে দিতে পারেন না।

সারাটা রাত রানি এভাবেই বসে রইলেন কান খাঁড়া করে। কোথাও কোনো শব্দ হলেই সতর্ক হয়ে উঠতেন। এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করেননি। রানি হওয়া কি আর চাট্টিখানি কথা? 

—————

  সূর্য যথারীতি উদীয়মান অবস্থাতে আসতেই রণক্ষেত্রে পৌঁছালেন রানি তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে। নতুন দিনের নতুন উদ্যম নিয়ে। ভেবেছিলেন এ্যাজেলিয়া রাজ্যের সৈন্য সংখ্যা গতকালের তুলনায় কমই দেখবেন। কিন্তু ময়দানে উপস্থিত হয়েই উনার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেলো। এ কী দেখছেন তিনি! এ-ও কি সম্ভব? সৈন্য কমার বদলে দ্বিগুণ হয়েছে! আরও বাহারি রকমের অস্ত্র, তলো য়ার নিয়ে। কীভাবেই বা সম্ভব? এ্যাজেলিয়া রাজ্য যেহেতু তার তাই তিনি জানেন সেই রাজ্যের সৈন্য সংখ্যা ঠিক কতটা। রাতারাতি এত সৈন্য বাড়ার তো কথা না।

 সৈন্য সংখ্যা কেবল রানি না রানির সঙ্গে বাকিরাও খেয়াল করল। ক্যামিলাস রাজ্য থেকে আসা সৈন্যরা তো একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে আরম্ভ করল রীতিমতো। 
 সেনাপতির কপালে ভাঁজ দেখা দিলো। কণ্ঠে দেখা দিলো সংশয়
“এত সৈন্য! এত সৈন্য কীভাবে? কাল না কত জন আহত ও নিহত হলো? আজ কমার বদলে সৈন্য বাড়ল কীভাবে?”

 রানি তীর্যক ভঙ্গিতে তার বিপরীতে দাঁড়ানো প্রতিটা সৈন্যর দিকে তাকালেন। তার চোখ কুঁচকে এলো। সৈন্যদের পোশাকেও রয়েছে খুব সুক্ষ্ম পার্থক্য। অপরিচিত মুখ, দাঁড়ানোর ভঙ্গি। যেহেতু এ্যাজেলিয়া রাজ্যের সৈন্যদের প্রশিক্ষণ তার সামনে হয়েছে বা তিনিও দিয়েছেন তাই তিনি সেই সৈন্যদের ভালো করেই চেনেন পা থেকে মাথা অব্দি। অথচ উপস্থিত বহু সৈন্যদের দেখা যাচ্ছে নতুন মুখ।
 রানি সেই মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এরা সব এ্যাজেলিয়া রাজ্যের সৈন্য নয়। অন্য কোনো রাজ্য বোধহয় এই রাজ্যকে সাহায্য করতে এসেছে।”

“অন্য কোনো রাজ্য? কিন্তু কোন রাজ্য? কেনইবা সাহায্য করতে এসেছে?”

 “তা যদি আমি জানতাম তাহলে তো হতোই। তবে অন্য কোনো রাজ্য যদি সাহায্যের জন্য আসেও তবে এইখানে সেই রাজ্যের রাজা, মন্ত্রী বা সেনাপতি কেউ নিশ্চয় উপস্থিত হবেন। আমরা সেই উপস্থিতির জন্য সাময়িক অপেক্ষা করি না-হয়।” 
রানির কথা যুক্তিযুক্ত ছিলো বিধায় সেনাপতি মাথা নাড়ালেন। সবাই উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে থেকে বুঝতে চাইল শেষ অব্দি কোন রাজ্যের রাজা আসে।

 কিছু মুহূর্ত অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর রথের শব্দ তুলে প্রবেশ করলো আকাঙ্ক্ষিত সেই মানুষটি। যাকে দেখে রানি না চমকে পারলেন না। মুখ থেকে অস্ফুটস্বরে তার বের হলো দু'টি শব্দ, 
“রানি ইথুন!”

 ইথুন দাঁড়ানো যুদ্ধ রথেই। তার ঠোঁটে টানা হাসি। বুকে অদম্য সাহস। রানির চোখে চোখ পড়তেই সে নিজের হাসি আরও প্রশস্ত করল। রানি সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। ভেতর ভেতর নিজের প্রতি নিজে ক্রোধে ভেঙে পড়লেন। তিনি কীভাবে এই ভুলটা করলেন! রানি ইথুনকে সামান্য ভাবার ভুলটা কীভাবে করলেন! রানি ইথুনের চোখে মামাশ্রীর বিয়োগ ব্যথা স্পষ্ট ছিলো, স্পষ্ট ছিলো স্বামীর রাজাসন হারানোর ক্ষো ভ… এই এতকিছুর পরেও তিনি কীভাবে শত্রুকে সামান্য ভেবে ভুল করলেন!

 সামনের এই অসংখ্য সৈন্যদের দেখে ক্যামিলাস রাজ্যের কিছু কিছু সৈন্যদের ভেতর দ্বিধা দেখা গেলো। দু একজন বললও,
“আমরা টিকবো আদৌ আজ! আমাদের দ্বিগুণ সৈন্য বিপক্ষীয় রাজ্যে দাঁড় করানো।”
 ঠিক তখনই অন্য দু একজন আবার এদের থামিয়ে দিলো। অসম্ভব সাহসের সঙ্গে বলল,
“হার হোক কিংবা জয়, যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে কাপুরুষ তো আর হওয়া যায় না। তাছাড়া আমাদের রানি নিজে স্বয়ং এখানে উপস্থিত, আমাদের আর কী প্রয়োজন?”
সেই সাহসী কথায় যারা সংশয়ে নুইয়ে পড়ছিলো তারা আবারও বল পেলো। সম্মতি জানালো। বুঝালো তারা প্রস্তুত।

 যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল তখুনি। আবারও শঙ্খ বাজল, ঢাক বাজল। মহা আড়ম্বরপূর্ণ ভাবে শুরু হয়ে গেলো যুদ্ধ।

গতকালকের মতনই আজও ক্যামিলাস রাজ্য প্রথমে তীর বর্ষণ করল কিন্তু এদিকেই বাঁধল বিপত্তি। আজকের বিপক্ষীয় দল দ্বিগুণ কৌশলী হয়ে যেন ফিরে এসেছিলো। 
যেহেতু তাদের লোক সংখ্যা বেশি ছিলো তাই কেবল ঢাল তুলে তারা বাঁচতে পারতো না জেনেই তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। দূরে দূরে সরে গেলো দ্বিতীয় সারির সৈন্যরা যেহেতু তীর প্রথম সারি কাটিয়ে দ্বিতীয় সারিকেই নির্দিষ্ট করে ছোঁড়া হয়েছিলো।
 ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার ফলে তীর ছোঁড়া প্রায় ব্যর্থ হলো বলেই ধরা যায়।

ওদিকে দ্বিতীয় সারির সৈন্যরা ছিটকে যেতে যেতে প্রথম সারির সৈন্যরা আচমকাই বর্শা, ত লো য়ার, কুঠার নিয়ে ছুটতে আরম্ভ করল ক্যামিলাস রাজ্যের সৈন্যদের দিকে। 
 যেহেতু তীর ছোঁড়া সৈন্যদের গায়ে তুলনামূলক হালকা বর্ম ছিলো এবং তারা সারির প্রথমে ছিলো তাই বিপক্ষীয় সৈন্যদের আঘাত তাদের গায়েই লাগে প্রথমে। সঙ্গে সঙ্গে বেশ কয়েকজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আহত নয় সরাসরি নিহতই বলা যায়। কয়েকজন ছটফটাতে থাকে।
 রানি হত-বিহবল হয়ে যান। তার রাজ ঘোড়াতে থেকেই তিনি চারপাশটা বুঝার চেষ্টা করেন। রানি ইথুন এভাবে সবটা ঘুরিয়ে দিবেন তা তিনি ভাবতেই পারছেন না! তিনি তার সৈন্যদের দিকে তাকালেন। কাল যেই সৈন্যদের কিছু হয়নি বলে গর্ব করেছিলেন আজ তাদেরই কিছু অংশ মাটিতে লুটিয়ে আছে। কী নির্মম! কী নিষ্ঠুর ভাবে!

 রানি ইথুন তার রথে বসেই হাসতে লাগলেন। আনন্দের হাসি। এতদিনে তার মনের মতন পাল্টা জবাব দিতে পেরে আনন্দ যেন ধরছে না। 

  রানি নিজের আঘাতপ্রাপ্ত সৈন্যদের খেয়াল করতে করতেই দেখলেন বিপক্ষীয় সৈন্যরা অগ্নিতীর ছুঁড়তে প্রস্তুত হচ্ছে। রানি আর আগপাছ না ভেবে দ্রুত চিৎকার করে উঠলেন। সৈন্যদের নির্দেশনা দিলেন,
“তোমরা সকলে একত্রিত হয়ে ঢাল তুলে প্রাচীর করো। শীগ্রই একত্রিত হও।”
 বলতে বলতে যথারীতি তিনি নিজের রাজঘোড়া থেকে নেমেও গিয়েছেন। 

সেনাপতি তা দেখে আঁতকে উঠল,
“নামছেন কেন, রানি! আপনি যুদ্ধের প্রাণ। আপনার কিছু হয়ে যেতে পারে। আমরা যতক্ষণ এই রণক্ষেত্রে জীবিত আছি ততক্ষণ আপনাকে রক্ষা করার কর্তব্য আমাদের।”

 রানি তার তলো য়ার নিয়ে সামনে বিপক্ষীয় যেই সৈন্যদের পেলো তাদেরই আঘাত করতে করতে ভয়ঙ্কর গর্জন করে বললেন,
“তোমরা আমার প্রজা। তোমাদের প্রাণ বাঁচানোও আমার কর্তব্য। আমি আমার সৈন্যদের এমন অবস্থা দেখেও নিজের প্রাণনাশের কথা ভেবে বসে থাকতে পারব না। অসম্ভব তা।”

 রানি যেখানে যু দ্ধে নেমে গিয়েছে সেখানে সেনাপতি কিংবা অন্য রাজ সদস্য কি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? গতদিন তারা কোনো ভূমিকা না রাখলেও আজ সমানতালে তলো য়ার চালানো শুরু করল। 
 রানির নির্দেশনার জেরেই অগ্নিতীর তার সৈন্যদের তেমন ক্ষতি করতে পারল না। 

 রানি ইথুন রাজরথে বসে হাসি প্রবল করল, “কী রানি, আজ তোমার নামতে হলো শেষমেষ? কেমন বোধ করছো? আমার পদতলে দাঁড়িয়ে?”

যুদ্ধের এই ধ্বংসলীলাতেও ইথুনের বাক্যগুলো ঠিক কর্ণগোচর হলো রানির কিন্তু তিনি কিচ্ছুটি বললেন না। এখন কথা বলার সময় যে নেই! শ ত্রু দল শক্তিশালী হয়ে উঠছে ক্রমশই।

 রানি তার অশ্বারোহী সৈন্যদের চোখের ইশারা দিলেন। তলোয়ার চালিয়ে এগুতে এগুতে সেনাপতিকে ধীরে বললেন,
“আপনি অশ্বারোহীদের নিয়ে আক্রমণ করুন সামনের দিকে। ঘোড়ার পদতলে পড়েও অনেক পিষ্ট হবে এবং তাদের সৈন্যরা আলাদা হয়ে যাবে। তারা যখন সব একসাথে থাকবে তখন অনেক শক্তি থাকবে। তাই প্রথমে তাদের আলাদা করতে হবে।”

 সেনাপতি রানির কথা বুঝল। তৎক্ষণাৎ সে নিজের ঘোড়ায় আরোহণ করে সৈন্যদের ইশারা করেই, হাত সামনে তাঁক করে, “আক্রমণ…” বলেই বিপক্ষীয় সৈন্য সারির ভেতর ঢুকে গেলো। যেহেতু অশ্বে থাকা সৈন্যদের শক্তি বেশি থাকে এবং তারা চলন্ত অবস্থায় থাকে বিধায় তাদের থামানো মুশকিল তাই এবার এ্যাজেলিয়া রাজ্যের কিছু সৈন্য আহত হলো। নিহত হলো কি-না ঠিক বুঝা গেলো না। 

 
  যুদ্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হলো। মাথার উপর সূর্যটি দপদপানি দিয়ে রৌদ্রে তেজ যেন বাড়িয়েই যাচ্ছিলো। পাহাড়টিতে দাঁড়িয়ে সমস্তই দেখছিলো যামিনী। যুদ্ধক্ষেত্রের সকল দৃশ্য তার কাছে সুস্পষ্ট। এবার তার চিন্তিত মুখটিতে একটি স্বস্তির রেখা বেশ দেখা যাচ্ছে। মনের ভেতর আশার আলো ফুটে উঠেছে। 
 তার সঙ্গে থাকা শশী তার দিকে তাকিয়ে আনন্দিত কণ্ঠে বলল,
“তবে কি এবার আমাদের জয় হবে?”

 “তা-ই তো দেখছি! রানি ইথুন তো সবটাই ঘুরিয়ে দিয়েছেন।”

“কিন্তু উনি আপনাকে সাহায্য কেন করতে এলো, রানি যামিনী? উনার কী লাভ এতে?”

 শশীর কথায় যামিনীও ভাবুক হলো, “সে আমিও ভাবছি, শশীপূর্ণা। কোন লাভে সে আমার সহায়তা করছে?”

“লাভটা উনার স্বার্থের হয়তো। আপনার মতনই স্বার্থপর উনি তাই আপনাকে সহায়তা করতে এসেছে। জহরীই তো জানে রত্নের খোঁজ তাই এক বিশ্বাসঘাতক চিনেছে অপরকে।”
 দূরে বসে থাকা হ্যাব্রো বলল কথাগুলো। তাকে এখন শেকল নয় মোটা রশি দিয়ে বাঁধা। যেহেতু যামিনীদের কথোপকথন সে শুনছিলো তাই উত্তর দিতে বেশ সুবিধাই হলো।
 
অপরাহ্ণের প্রথম প্রহর তখন..
 রানি কামিনীকাঞ্চন অশ্বারোহীদের দিয়ে আক্রমণ করানোর পর নিজের ভেতর একটু জেদ ফিরে পেলেও তা স্থায়ী হলো না বেশিক্ষণ। তিনি দেখলেন বন জঙ্গল থেকে আরও অধিক বিপক্ষীয় সৈন্য তাদের ঘিরে ফেলেছে। কেবল তাই নয়, তারা রীতিমতো সমস্ত কিছু চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে আরম্ভ করেছে।

 রানি দেখলেন তার অসংখ্য সৈন্য কেবল মৌমাছির মতন উল্টে উল্টে পড়তে লাগলো। যু দ্ধের ভূমি পরিণত হতে লাগলো মৃত্যুপুরীতে। তিনি একদিক দিয়ে নির্দেশ করতে করতে অন্য দিকে আক্রমণ চালিয়েও ফেলতে লাগল বিপক্ষের সৈন্যরা। রানির কানে কেবল ভেসে আসতে লাগলো সেই বেদনাময় চিৎকার, আহাজারি। কিন্তু তিনি থামলেন না। অনবরত অ স্ত্র চালাতে লাগলেন আর সৈন্যদের সাহস ও নির্দেশনা দিতে লাগলেন,
“এগিয়ে যাও, আমি আছি। এগোও। ঢাল তুলো, বর্শা ছুঁড়ে দাও, তীর ছুঁড়ো।”

 একপর্যায়ে দেখলেন তার রাজ্যের সেনাপতিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে ইথুনের সেনাপতি। রানি সেনাপতির আটকে থাকা পা-টা ঘোড়ার দঁড়ি থেকে ছাড়াতে গেলেই একটি তীর এসে আঘাত করে তার ডান হাতে। ছিটকে পড়েন তিনি দূরে। তীরটা বিঁধে যায় ভয়ংকর ভাবে। মুখ দিয়ে আসা চিৎকারটাকে তিনি গিলে ফেলেন। তীব্র ব্যথায় চোখ বন্ধ করে ফেলেন তবুও মুখ দিয়ে টু শব্দও করেন না। পাছে যদি তার চিৎকারে তার সৈন্যরা দুর্বল হয়ে পড়ে! তার কণ্ঠই তো এই সৈন্যদের জোর।
  এবং তিনি বুঝতে পারে এটিও বিপক্ষীয় দলের একটি কৌশল ছিলো। সেনাপতিকে ছাড়াতে গিয়ে তিনি লক্ষ্য ভ্রষ্ট হবেন এবং এই সুযোগেই তার উপর আক্রমণ করা হবে। রানি চোখ বন্ধ করে ফেললেন পুনরায়। চারপাশের সেই চিৎকার তাকে যেন কোনো মৃত্যুপুরীর চিত্র দেখাচ্ছিলো।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp