হৃদিকে কিছুটা উদ্বিগ্ন লাগছে। বিচলিত ভাবে আড়ে-আড়ে তাকাতে চাইছে বাইরের দিকটায়। সম্ভবত অনেক মানুষের উপস্তিতি অনুভব করে ভড়কে গিয়েছে বাচ্চাটা। স্বাভাবিক! ও তো অনেক মানুষের মধ্যে থাকেনি। থাকতে দেয়নি আদিল। সর্বদা কড়া পাহারায় রেখেছে। এইজন্যই পরিচিতদের বাইরের কাউকে দেখলে মেয়েটা মিইয়ে যায়। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। অপছন্দ করে। আদিল বুঝে নেয় মুহূর্তে। দু পায়ের তালুর ওপর ভর ছেড়ে বসে মেয়ের সামনে। আলতো ভাবে ধরে ওর নরম-সরম বড্ড ছোটো হাত দুটো। সামান্য হাসার চেষ্টা করে প্রশ্ন করে -
‘ইজ মাই প্রিন্সেস ফিলিং নার্ভাস? হুম?’
বাবার প্রশ্নে নিজেকে কেমন চোখের পলকে সামলে নেয় মেয়েটা। ও বরাবরই বাবার সামনে বাহাদুরি দেখাতে ভালোবাসে। বড়োদের মতো বুকটা চওড়া করে বলে -
‘উহুঁ। তুমি আছো তো।’
আদিল মৃদু হাসে। মেয়ের কপালে চুমু এঁকে আওড়ায়, ‘দ্যাটস মোর লাইক মাই গার্ল।’
হৃদি ভুলে যায় কিছুক্ষণ আগের উদ্বিগ্নতা। বাবার প্রশংসা মনে উচ্ছ্বাস এনে দেয়। দ্রুতো ঘুরেফিরে দেখায় পরনের সুন্দর বার্বি গাউনটি। গাউনটি আদিল ফ্রান্স থেকে আনিয়েছে। হট পিংক রঙের। কাপড়টা সাটিন। বুকের দিকে স্টোন, সিকুইন, গ্লিটার দিয়ে সাজানো। কোমর থেকে নিচ অবধি ফ্লেয়ার হয়ে নেমে ছুঁয়েছে জমিন। একদম রূপকথার রাজকন্যার মতো। মাথায় ক্রিস্টেলের ক্রাউন। খুব সাটাল —বাচ্চার চেহারা অনুযায়ী একটা মেকওভার দেয়া হয়েছে। কোকড়নো চুলগুলোতে ফুলের সাহায্যে সুন্দর হেয়ারস্টাইল করা। সবমিলিয়ে ফেয়ারিটেলের প্রিন্সেস লাগছে। আদিল মুগ্ধ হয়। পেছনেই দাঁড়ানো শান্তর উদ্দেশ্য বলে -
‘মেকআপ আর্টিস্ট ডিড আ গুড জব। পে হার মোর।’
শান্ত দৃঢ় কণ্ঠে প্রত্যুত্তর করে, ‘ওকে বস।’
আজ ওর পরনে পুরো কালো রঙের থ্রি-পিস স্যুট। মাথার চুল থেকে পায়ের জুতো পর্যন্ত কালোয় মোড়ানো। অন্য দিনের তুলনায় আজ একটু বেশি বিচক্ষণ, রুক্ষ, সতর্ক লাগছে দেখতে। কানে ব্লুটুথ-টা অন থেকেছে সারাদিন।
একটু পরপর এদিক-ওদিক নির্দেশনা দিয়ে চলেছে। একমুহূর্তের জন্যও সরছে না আদিলের আশপাশ থেকে।
‘ড্যাড, আমার প্রেজেন্ট কোথায়?’
হৃদি ভীষণ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে উত্তরের আশায়। আদিল ডান ভ্রু তুলে বলে -
‘উইশ-টুইশ রেখে সোজা প্রেজেন্ট চাই, হুম?’
হৃদি দু হাতে মুখ ঢেকে হেসে ফেলে। পরমুহূর্তেই ছুটে দু হাতে বাবার গলা জড়িয়ে আবদার করে -
‘উইশ মি ড্যাডি।’
আদিল বড়ো বাধ্য। মেয়ের মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে রেখেই মিহি কণ্ঠে বলে যায় -
‘হ্যাপিয়েস্ট বার্থডে টু ইউ মাই চাইল্ড।’
'হুম, তো এবার আমার প্রেজেন্ট চাই।’
আদিল বুঝতে পারে মেয়ে তার উপহার ভেবেই রেখেছে। আপাতত শুধু উপহারের নাম বলতে মুখিয়ে আছে। বলে -
‘কী চাই আমার রাজকন্যার? ড্যাড উইল গেট ইট ফর ইউ।’
হৃদি সামান্য সংকোচ করল। আড়চোখে একপলক শান্তকেও দেখে নিলো। আদিল চোখের দৃষ্টি দিয়ে আস্থা দিতেই চোখমুখ বুজে বাচ্চাবাচ্চা গলায় ট্রেনের গতিতে বলল -
‘আই ওয়ান্ট রোযা। ড্যাড, আই ওয়ান্ট হার। টু স্টে উইদ মি ফরএভার।’
শান্তর চোয়াল আজ ঝুলে আসেনি। নির্বিকার চোখমুখে ওমন দাঁড়িয়ে থাকলেও বেচারার চোখে একরকম তারা ভাসল কিছুক্ষণের জন্য। থমথমে মুখে শুনে গেলো হৃদির আবদারের মিষ্টি সুর। প্রত্যুত্তরে আদিল নিশ্চুপ। শান্ত, স্থির চোখে শুধু দেখেই গেলো। এতে হৃদি অসন্তুষ্ট হয়। হাঁসফাঁস করে ধরে বাবার বিশাল একটা হাত। শান্ত ভেবেই রেখেছিল তার বসের কোনো জবাব আসবে না। কিন্তু তাকে আশ্চর্যের সপ্তমে পৌঁছে দিলো আদিলের নির্বাক এক শব্দের জবাব -
‘হুম।’
শান্তর পাশাপাশি হৃদিও চমকে ওঠে। বড়ো বড়ো চোখে চেয়ে আওড়ায়, ‘হুম? ড্যাডি, আর ইউ সেয়িং হুম?’
‘হুম।’
হৃদি ঢোক গিলে, ‘হুম? হুম?’
আদিলের চোখ হাসে। ধূসর রঙা চোখের মণিতে তারা্রা ভাসে। খাদে নামে গভীর কণ্ঠের সুর -
‘হুম।’
—————
‘কীরে? এতক্ষণ লাগে? কতদূর?’
শান্তর প্রশ্নের সামনে এলেন নির্বিকার। সরু চোখে চেয়ে আছে রাস্তায়। সিগনাল পড়েছে। গাড়ি আপাতত ফুলস্টপ। কানের ব্লুটুথটা আরেকটু ভালোভাবে কানে ডুবিয়ে বলল -
‘লাগবে মিনিট দশেক।’
শান্ত বিরক্ত প্রায়, ‘এতক্ষণ লাগছেই বা কেনো? ঘুমাই গেছিস নাকি?’
এলেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো না। আড়চোখে তাকাল কার মিরোরে। তার সোজা পেছনে রোযা বসে আছে। হাতে লাল গোলাপের এক বিশাল বুকে। কিছুক্ষণ পরপর ফুলের ঘ্রাণ নিচ্ছে চোখ বুজে। তার পাশে নিপা বেগম। রাজু আর, আজিজুল সাহেব পেছনের গাড়িতে। এলেন কণ্ঠ নামিয়ে একপ্রকার ফিসফিস করেই বলল -
‘বস কোথায়?’
শান্ত তখন হাতের ইশারায় দোতলা থেকে নিচের বডিগার্ডদের নির্দেশনা দিয়ে চলেছে। ইতোমধ্যে নিচের ফ্লোরে অতিথিরা চলে এসেছে। বলল -
‘নামেনি। ওপরে। কেনো?’
এলেন ফের ফিসফিস করে বলল, ‘বস, বড়সড় একটা ধাক্কা খাবেন। আমি ফিউচার দেখছি চোখের সামনে।’
শান্ত আগ্রহী হয়। ডান ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করে, ‘কিছু হয়েছে?’
এলেন জবাব দেয় না আর। মিচকে হেসে কলটা ফট করে কেটে দেয়। সে জীবনে অনেক সুন্দরী নারীই দেখেছে। অনেক! সেই তুলনায় তার বস তো কয়েক ধাপ এগিয়ে। নিশ্চয়ই? এরপরেও এলেন মানতে বাধ্য, বলতে বাধ্য — মিস রোযা… শি ইজ টু মাচ বিউটিফুল। আর সে আঁচ করতে পারছে, তার বসের ভাবনাও হয়তোবা একই…বা তারচেয়েও বেশি হবে। বসের ধারণার বাইরে, মনে হয় তার কল্পনারও বাইরে…..তার সহ্য সীমানার বাইরে। নিশ্চয়ই?
—————
প্রবেশ পথে ছিলো শক্ত পাহারা। গেস্ট লিস্টের বাইরে একটা মানুষও ঢোকার অনুমতি পেলো না। যিনি অতিথি তার সাথের কেউ হলেও না। অর্থাৎ, লিস্টে আপনার নাম আছে মানে শুধু আপনিই প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছেন। পার্কিং এরিয়া জুড়ে সব নামিদামি গাড়ির সারি। বাল্বের আলোয় চারিপাশটা উজ্জল। রোযাদের গাড়ি প্রবেশ করেছে মির্জা বাড়ির ভেতরে। সরু পথ ধরে আসছে বাড়ির ফটকের দিকে। ক্লান্ত চটজলদি এগিয়ে এসে ব্যাকসিটের দরজা মেলে ধরল।
টকটকে লাল রঙের উঁচু জুতোয় সজ্জিত ডান পা এসে স্পর্শ করল চকচকে সরু পথ। শাঁড়ির লম্বা আঁচল সামলে বেরিয়ে এলো রোযা। মাথাটা একটু নুইয়ে ভেতর থেকে ফুলের তোড়াটা হাতে তুলে নিলো। সোজা হয়ে এবারে তাকাল চতুর্দিকে। সে আসতে আসতেই দেখেছে সজ্জিত পথ। গাছেদের গায়েও লাইটিং করা হয়েছে। বাগান এরিয়া জুড়ে অনেক অপরিচিত মুখের অধিপত্য। আপাতত অনেকের দৃষ্টি এদিকে। রোযা সামান্য কুণ্ঠিতবোধ করে দৃষ্টিগুলো অনুভব করে। ভেতরে অন্যরকম ভয় কাজ করে। সুঠাম দেহের সব লম্বাচওড়া পুরুষদের ভীষণ বিত্তশালী বলেই মনে হলো। যেখানে রোযা একটা পিপড়া মাত্র। যে কারো পায়ের তলে পিষে যেতে পারে। আর তাদের আগ্রহী দৃষ্টি তার ওপরই। হঠাৎ এলেন এসে ভীষণ দায়িত্ববোধ নিয়ে দাঁড়িয়েছে রোযার সামনে। একরকম সবার দৃষ্টির আড়াল করে দাঁড়ানো যাকে বলে। হাতের ইশারা দিয়ে প্রবেশের জন্য বলে -
‘মিস রোযা…. প্লিজ!’
আজিজুল সাহেব, নিপা বেগম গাড়ি থেকে নেমে তাজ্জব বনে গেছেন। পরপর সংকোচবোধ করছেন। তাদের কল্পনার চেয়েও বিত্তশালী অবস্থা সব। ভয়ে তাদের শরীর আঁটসাঁট হয়ে এসেছে। অন্যদিকে রাজু ভীষণ চঞ্চল। সবটা কৌতূহল নিয়ে দেখছে। তার পাশে বডিগার্ড না থাকলে এতক্ষণে ওদিকটা হেঁটে হেঁটে দেখতো। নিপা বেগম ছেলের হাবভাব বুঝে ফেললেন। চট করে ধরলেন ওর হাত। নিজের সাথে টেনে নিয়ে হাঁটা ধরলেন স্বামীর পেছন পেছন। আজিজুল সাহেব ক্রাচ ধরে হেঁটে এসে দাঁড়িয়েছেন মেয়ের পাশে। রোযা তখন পরিবার নিয়ে প্রবেশ করল ভেতরে। কিছুক্ষণের জন্য চিনতেই পারল না ভেতরটা। নিচের পুরো ফ্লোরের দৃশ্যই পরিবর্তন হয়েছে। তিন-চারজনের গ্রুপের জন্য ছোটো-ছোটো টেবিল-চেয়ার বসানো হয়েছে আধুনিকভাবে। মৃদু আওয়াজে টুন বাজছে। একপাশে কার্টুন এরিয়া। ওখানটা ডিজনিল্যান্ডের মতো সাজানো।
সিঁড়িপথে রেড কারপেট। সিঁড়ির হাতল ফুল দিয়ে সাজানো। মধ্যে বিশাল ডিজনি কেক দাঁড়া করানো। আনাচেকানাচে আলোয় ভরতি। সবটা দিনের মতো উজ্জ্বল। রাজু মুগ্ধ হয়ে বড়ো বোনের হাতটা টেনে ধরল। উত্তেজনায় ওর চোখমুখ জ্বলজ্বল করছে। রোযা নিজেও ভারি আশ্চর্য হয়েছে। দীর্ঘশ্বাসও ফেলল। নিজ মনে আওড়ালোও,
‘বড়লোকদের সব বড়লোকি ব্যাপার স্যাপার।’
এলেন পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলো। মাথাটা নুইয়ে আলতো গলায় প্রশ্ন করল -
‘কিছু বললেন, মিস রোযা?’
রোযা আড়চোখে চেয়ে চুপসে যাওয়া গলায় বলল, ‘উহুঁম, কিছু না।’
এলেন হাতের ইশারায় একটা পাশের টেবিল-চেয়ার দেখিয়ে আজিজুল সাহেব, নিপা বেগম এবং রাজুকে উদ্দেশ্যে করে বলল -
‘তাদের তবে বসিয়ে দিই?’
রোযা মাথা দুলিয়ে সম্মতি দেয়। সে আশেপাশে চেয়ে হৃদির খোঁজ করে। অবশ্য এদিকে মেয়েটা থাকলে তার খোঁজ করার প্রয়োজনও পড়তো না। পাখির মতো উড়ে আসতো। ভেবেই হেসে ফেলে নিঃশব্দে। ব্যাকুল হয় ওকে দেখার জন্য। এও বুঝতে পারে, বার্থডে গার্ল এখনো নামেনি। একপর্যায়ে খেয়াল করে, এলেন সরছে না… নড়ছে না। চুপচাপ তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। হুটহাট ব্লুটুথে ফুসুরফাসুর করছে। এলেনের এমন পাহারা দেয়া অস্তিত্ব যেমন রোযাকে ভড়কাচ্ছে তেমনি উপস্থিত অনেককে। ঘুরেফিরে অনেকে এদিকটাতেই তাকাচ্ছে। কিঞ্চিৎ কৌতুহলী হয়েই। রোযা চেষ্টা করছে দৃষ্টি গুলো অগ্রাহ্য করার। চাপা গলায় এযাত্রায় প্রশ্ন করল এলেনের উদ্দেশ্যে -
‘আপনার কোনো কাজ নেই?’
এলেনের ভদ্রতাসূচক সোজা জবাব, ‘আমার কাজই করছি।’
‘অ্যাহ?’
রোযা বুঝে পেলো না তার পেছনে দাঁড়িয়ে থেকে কী কাজ করছে? কেমন কাজ এটা? যতটুকু সে জানে, এলেন আদিল মির্জার দু-হাতের এক হাত। ওই হাত এখানে থাকার মানে আছে? এমনিতেই তো বডিগার্ড দিয়ে ভরতি। রোযা আর ভাবতে পারেনি। হলরুমের বাতিগুলো সব বন্ধ হয় কিছুক্ষণের জন্য। জ্বলে ওঠে সিঁড়ির বাতি। জন্মদিনের একটা টুন বাজছে এযাত্রায়। সিঁড়ির একদম মাথায় এসে দাঁড়িয়েছে হৃদি। পরপর তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে আদিল মির্জা। হৃদির হাত ধরে নামছে ধীরেসুস্থে। রোযা মুগ্ধ হয়। একদৃষ্টিতে দেখে পুতুলের মতো বাচ্চাটাকে। মিষ্টি করে হেসে হেসে নামছে।
এইমুহূর্তে সকল বাতি ফের জ্বলে ওঠে। হৃদি নিচেই তাকিয়ে ছিলো। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে কাউকে ব্যাকুল ভাবে খুঁজছিল ওর চোখজোড়া। রোযাকে দেখতে পেতেই কেমন চঞ্চল হয়ে ওঠে। উচ্ছ্বাস নিয়ে ডেকে ওঠে মুহূর্তে -
‘স্নো-হোয়াইট।’
আদিল চেয়েছিল পরিচিতদের মুখের দিকে। যারা হাতের ইশারা করছে ড্রিংকের গ্লাস সহ। হাসছে, ডাকছে। প্রত্যুত্তরে তাদেরও সে ইশারা করছিল। হঠাৎ মেয়ের সম্বোধন শুনে তাকাল নিজেও। ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে বাম দিকটায় তাকাতেই কেমন দৃষ্টি থমকাল। এবং লম্বা সময় তাকিয়েই থাকল। তার ধূসর চোখজোড়ার দৃষ্টি আর ফেরাতে পারল না।
হিপনোটাইজের মতো যখন অসাবধানতায় কদম বাড়াল, ওমনি পায়ের ব্যালেন্স হারিয়ে বসল। শরীর শুদ্ধ সে নড়ে উঠল। এইতো দুমড়ে মুচড়ে পড়বে ওসময় বেশ দ্রুতো সিঁড়ির হাতল ধরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলল। আশ্চর্য হলো একপ্রকার। নিজের কাণ্ডের ওপরই।
হৃদি ইতোমধ্যে বাবার হাত ছেড়ে ছুটেছে রোযার উদ্দেশ্যে। রোযাও এক হাতে ফুলের তোড়া ধরে অন্য হাতটা মেলে দিয়েছে বাচ্চাটাকে বুকে নেয়ার জন্য। হৃদি এসে জাপ্টে ধরল তার কোমর। ওকে জড়িয়ে নেয় রোযাও। হৃদির কণ্ঠে অভিমান উপচে পড়ছে -
‘তুমি এতো লেইট কেনো? আমি কতো অপেক্ষা করেছি জানো? সারাবেলা তোমাকে খুঁজেছি।’
রোযা মৃদু স্পর্শে ছুঁয়ে দেয় হৃদির নাক। বলে, ‘এইজন্যই তো চলে এলাম। চটজলদি। শুভ জন্মদিন, সোনা।’
হৃদি খিলখিল করে হেসে ফুলের তোড়াটার দিকে চেয়ে প্রশ্ন করে -
'আমার জন্য?’
‘হুম, ফর মাই হৃদি সোনা।’
হৃদি ফুলের তোড়াটা দু-হাতে বুকে জড়িয়ে কেমন মিষ্টি করে হাসতে থাকল। রোযা মুগ্ধ হলো। মুগ্ধতায় সে চারিপাশটা ভুলেই বসেছিল। ওসময় হঠাৎ এলেন কাশল হালকা গলায়। পরপর কাশলও শান্তও। রোযা এযাত্রায় খেয়াল করল শান্তকে। কখন এসে দাঁড়িয়েছে এখানে? পরপরই একজোড়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অনুভব করে মাথা তুলে তাকাল। গভীর ধূসর রঙা চোখের দৃষ্টিতে দৃষ্টির মিলন হতেই থমকে গেলো হৃৎপিণ্ড। কেমন শিউরে উঠল শরীর। আনমনা বিচলিতও হলো।
অদূরে আদিল এখনো দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি এখানেই। এখানে না ঠিক। তার ওপর। রোযা আর দৃষ্টি তুলে তাকায় না। সাহস করে না। কেমন গা ছমছম করছে তার। হৃদি হাতটা বাড়িয়ে দিলে আলতো ভাবে ধরে ছোটো হাতটা। ধরে দৃষ্টি হৃদিতে রেখেই দাঁড়িয়ে থাকল। বুঝতে পারল, অনুভব করল আদিল মির্জা এদিকেই এগিয়ে আসছে। রোযা দেখতে পাচ্ছে কালো জুতোজোড়া। জুতোজোড়া তার সামনে এসে থামতেই রোযা অনিচ্ছুক হয়েও মুখ খোলে -
‘গুড ইভিনিং, স্যার।’
আদিল প্রত্যুত্তরে শব্দ করে। ‘হুম’ এরপর একটু সময় নিয়ে বলতে নেয় -
‘ইউ….’
রোযা চোখ তুলে তাকাল। আদিল গম্ভীরমুখে বাক্যটা শেষ করল, ‘লুক নাইইইসস।’
রোযার শরীর শক্ত হয়ে আসে। স্পষ্ট দেখল, বাক্যটুকু বলতে বলতে আপদমস্তক তাকেই দেখল। কী অসভ্য লোকটা! রোযার কপালে গুটিকয়েক ভাঁজ পড়ল। অসন্তুষ্ট হলো। এধরনের প্রশংসা আদি্ল মির্জার মুখ থেকে বিরক্তিকরই শোনাল তার কাছে। সে বিরক্ত হয়েছে, তা চোখমুখে স্পষ্ট। এইজন্য দৃষ্টি নামায়। মুখ লুকোয়। ভাগ্যিস সামনে এটা বিত্তশালী কেউ একজন। নাহলে দুটো ঘুষি রোযা চটপট বসিয়ে দিতো। এককালে কতো ছেলেপেলে সে মেরে ছে তা অগুনিত।
আদিল অবশ্য বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারেনি। কাজ সূত্রে অনেক কাছের লোকজন এসেছে। তাই মেয়েকে নিয়ে সরে গেছে। অতিথিদের সাথে কুশল বিনিময় করছে। মেয়েকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। রোযা আর ওদিকে তাকাল না। হৃদিকেও দেখার চেষ্টা করল না। সে ভুলেও চোখে চোখ অবধি মেলাতে চায় না ওই লোকটার সাথে। কেক কাটা হলেই সে পরিবার নিয়ে বেরিয়ে যাবে।
পুরোটা সময় রোযা উপলব্ধি করছিল কড়া একজোড়া চোখের দৃষ্টি। তাকে কেউ দেখছে এমন অনুভূতি তাকে মিইয়ে দিচ্ছে। ছটফট করাচ্ছে। রোযা আলতো হাতে ছাঁড়া আঁচল পেছন দিয়ে টেনে ডান হাতে এনে ধরল। উদ্বিগ্নতা কমানোর একটা উপায় মাত্র। তাকাল বাবা-মায়ের টেবিলের দিকে।
নিপা বেগম আর রাজু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে হৃদি যেদিকটায় ওদিকেই সম্ভবত। ওদের তো ভীষণ আগ্রহ ছিলো বাচ্চাটাকে সামনাসামনি দেখার। টেবিলের থেকে একটু দূরে ধ্রুব দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত সে দেখাশোনা করছে ওদিকটা। রোযা কদম বাড়াল বাবা-মায়ের দিকে। উদ্দেশ্য বসবে! কিন্তু সে সুযোগ হয় না। পেছন থেকে এলেন ধীর গলায় বলে -
‘মিস রোযা! কেক কাটা হবে এখন।’
রোযা বুঝতে পারে। কেক কাঁটা হবে মানে তো সামনে দাঁড়াতে হবে। বসে লাভ নেই একমুহূর্তে জন্য। অগত্যা দাঁড়িয়ে থাকে। পর্যবেক্ষণ করে হাতের বড়ো ডার্ক রেড রঙা নেইলস গুলো। ওসময় হৃদির ডাক পড়ল -
‘স্নো-হোয়াইট, আসো।’
রোযা তাকাল মিষ্টি বাচ্চাটার দিকে। বাবার হাত ধরে সমানে বাম হাত নাড়িয়ে ডাকছে। রোযা ইশারায় বোঝায়, সে ওখানে যাবে না। তা মানল না মেয়েটা। ফের ডাকল -
‘আসো না, আসো।’
বাধ্য হয়ে রোযা এগোয় কয়েক কদম। অনেকেই এসে গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে এক জায়গায়। রোযা দাঁড়িয়েছে মস্তবড়ো কেকটার সামনে। ওকে কেকের আড়ালে দেখাই যাচ্ছে না একরকম। মাথাটা বের করে আড়ে আড়ে চেয়ে, বারবার রোযাকেই ডাকছে। কিন্তু রোযা, কখনো যাবে না। পাগল নাকি? সে হাতের ইশারায় বোঝাল তাকে ছাড়া কাটতে। সুরও তুলল -
‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউউ…..
হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার হৃদি….
হ্যাপি বার্থডে টুউ ইউ।’
এতে মেয়েটা মানে। বাবার ইশারায়, সবার দলবদ্ধ সুরে কেক কাটে। হাতে একটুখানি কেক নিয়ে তাকাল আদিলের দিকে। আদিল কোমর বেঁকিয়ে মাথাটা নুইয়ে আনে মেয়ের সমান। হাত থেকে কেক খেলো। একটুখানি! ব্যস, এরপরই কেক নিয়ে বাচ্চাটা রোযার দিকে ছুটে আসছে। রোযা অসহায় হয়। আবেগে আপ্লূতও। তার ভেতরে অনেকরকম অনুভূতির ঘূর্ণিঝড় বইছে যে! হৃদির চঞ্চল হাতে বাধ্যভাবে মাথা নুইয়ে খেলো একটুখানি। নিজেও ওর হাত থেকে একটু নিয়ে খাইয়ে দিলো। ফিসফিস করে জানাল -
‘হ্যাপি বার্থডে সোনা।’
জবাবে কেক মাখা ঠোঁট দুটো হৃদি বসিয়ে দিলো রোযার ঠোঁটে।
‘স্নো-হোয়াইট, তোমাকে একদম ডল লাগছে। আমি তো চোখ সরাতেই পারছি না। ইউ আর সো বিউটিফুল।’
রোযা হেসে ফেলল ফিক করে। ফিসফিস করে বলল-
‘তোমাকে লিটল বার্বি লাগছে। বার্বিডল।’
রাজু রোযার পেছনেই ছিলো। এযাত্রায় বেরিয়ে এলো পেছন থেকে সামনে। কেমন ভ্যাবলার মতন মুগ্ধ চোখে চেয়ে থেকে বলল -
‘হাই।’
হৃদি চোখ পিটপিট করে তাকাল। থমথমে মুখে পুরো রাজুকে অগ্রাহ্য করল। দৃষ্টি ফিরিয়ে আবারও রোযার দিকে তাকিয়ে হাসল। রাজু আশ্চর্য! হতভম্ব! রোযার এতে আরও হাসি পেলো। হাসি আটকে বলল -
‘সোনা, দিস ইজ মাই ব্রাদার।’
এবারে বোধহয় মেয়েটা আগ্রহ পেলো। ভালোভাবে তাকাল রাজুর দিকে। মিষ্টি করে হেসে ডাকল, ‘হ্যালো আংকেল।’
রাজু উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল। ভীষণ ব্যাকুল হয়ে আলাপ করার চেষ্টা করল। ওর যে পিচ্চিটাকে ভীষণ ভালো লেগেছে। কেমন পুতুল পুতুল দেখতে! অথচ হৃদির মোটেও আলাপ করার আগ্রহ নেই। ও রোযার কাছে থাকতেই আগ্রহী। ঘুরেফিরে বারবার রোযার আঁচলের তলায় ঢুকছে। রোযা রাজুর আপন বোন না হলে ভেবেই ফেলতো, এই মেয়েটা তার বোনের মেয়ে। এতটুকু ভেবেই সে জিহ্বা দিয়ে দাঁট কাঁটল। ইশ!
———
রোযা সহস্র চেষ্টা করেও দ্রুতো বেরুনোর পথ পেলো না। হৃদি পিছুই ছাড়ছে না। একটু পরপর এসে লেপ্টে আছে পাশে। বড়ো বড়ো চোখে দেখছে নিপা বেগম, আজিজুল সাহেব আর রাজুকে। তাদের পরিচয় জানতে পেরেই মেয়েটা এখন ভীষণ আগ্রহী। নিপা বেগমের সাথে হাতও মিলিয়েছে। বারবার করে জিজ্ঞেস করেছে -
‘তুমি স্নো-হোয়াইকে কোথা থেকে এনেছো?’
রোযার তখন এতো হাসি পেলো। মায়াও হলো ভীষণ। ইচ্ছে করল শক্ত করে ওকে বুকের ভেতর জাপ্টে রাখতে। রাখলোও। হৃদিকে কোলে বসিয়ে বুকে আগলে রাখল। তার পেছনেই ধ্রুব দাঁড়িয়ে আছে। অতিথিদের খানাপিনার মুহূর্ত চলছে। নিজে নিয়েই খাওয়া যাচ্ছে। নানান পদের ডিশেস শো করা আছে। পছন্দ মোতাবেক নিয়ে খাবে, এমন। রোযার খিদে নেই। সেই খাবে না। নিপা বেগম, আজিজুল সাহেব আর রাজু খেয়ে নিচ্ছে। এইযাত্রায় মরিয়ম বেগমকেও দেখতে পেলো। সে একাই এসেছে। সাহায্য করছে সবকিছুতে। নিজেই একফাঁকে এসে কথা বলে গেলো।
হৃদির চোখদুটো ঘুমে বুজে আসছে। আদিল অনেকক্ষণ আগেই মেয়েকে নিজে খাইয়েছে। ভরা মজলিশের মধ্যেই। ওইতো ওদিকটায় বসেছিল কয়েকজনকে নিয়ে। কেমন আলাপ করতে করতে মেয়েকে কোলে বসিয়ে খাওয়াল। ব্যাপারটা না চাইতেও রোযাকে মুগ্ধ করেছে। নিজের মেয়ের প্রতি আদিল মির্জার দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা বরাবরই রোযাকে আপ্লূত করায়। ওমন গম্ভীর মানুষটার এমন সফট দিক আছে, কল্পনাও করা যায় না। রোযা পারে না। তাই যতবার দেখে আশ্চর্য হয়। মুগ্ধ হয়।
‘ঘুমাবো।’
রোযা তাকাল। হৃদি প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে। বলল -
‘ওইতো মরিয়ম আন্টি। সে নিয়ে যাক রুমে। গিয়ে শুয়ে পড়ো কেমন?’
ঘুমঘুম কণ্ঠে বাচ্চাটা আবদার করে গেলো -
‘উহুঁম। তুমি চলো। আমার সাথে চলো।’
রোযা বাধ্য হয়। নিপা বেগমকে জানিয়ে হৃদিকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। সিঁড়ি ধরল। শাড়ি পরে ওকে কোলে নিয়ে উঠতে হিমশিম খেলেও অবশেষে পারল উঠে আসতে। হৃদির রুমে এসে ওকে বিছানায় শুইয়ে দিলো। নিজে পাশে বসে ঘুম পাড়ানোর মতো বুকে আদর করতে থাকল। হৃদি ঘুমের মধ্যেও একটু পরপর বলছে -
'স্নো-হোয়াইট, তুমি যেও না।’
রোযা মিহি কণ্ঠে আওড়ে যায়, ‘আছি আমি। ঘুমাও।’
সময় গড়াচ্ছে তো গড়াচ্ছে। হৃদির গা থেকে হাত সরালেই মেয়েটা পিটপিট করে চোখ মেলে চাইছে। কী বিচ্ছু! দেখতে দেখতে বেশ দেরি হয়ে গেল। বাইরেটা ঘুটঘুটে অন্ধকার।অবশেষে মেয়েটা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়েছে। হাত সরালেও ওঠেনি। রোযা ঘড়ির দিকে তাকাল। রাতের বারোটা। তার মাথায় হাত পুরো! বাবা-মা এখনো অপেক্ষা করছে নিশ্চয়ই? ইশ! রোযা তাড়াতাড়ি বেরোয় রুম ছেড়ে। ওপর থেকে উঁকি দিয়ে দেখল পুরো ফ্লোর ফাঁকা। একটা মানুষ মাত্র নেই! আশ্চর্য! অতিথিরা নাহয় ফিরেছে। তার পরিবার কোথায়?
রোযা হঠাৎ সতর্ক হয়। কিছু একটা অনুভব করে পিছু চাইতেই দেখল আদিল নামছে ওপর থেকে। তার হাতে মদের গ্লাস। পেছনে শান্ত, এলেন। রোযা পারে না চলে যেতে। ওই সামর্থ্য তার যে নেই। বাধ্য কর্মচারীরা মতো শান্ত ভাবে দাঁড়ায়। আদিল সিঁড়িগুলো বেয়ে নামতেই দৃষ্টি নিচে রেখে মিহি গলায় বলে -
‘প্রিন্সেস ঘুমিয়েছে, স্যার। এইজন্য বড্ড দেরি হয়ে গেল। আমার ফ্যামিলিও অপেক্ষা করছে। আজ তবে আসি, স্যার। গুড নাইট।’
আর এক সেকেন্ড সে দাঁড়াতে পারল না। ধৈর্য্যও যে হলো না জবাব শোনার। বড্ড তাড়ায় সে। এখান থেকে বেরুতে পারলেই যে শান্তি! দ্রুতো সিঁড়ি বেয়ে নামতে চাইল। এড়াতে চাইল ওই অদ্ভুত দৃষ্টি। তাকে অসহ্য করে তোলা লোকটার উপস্থিতি। অথচ আদিলের এক বাক্যে সে ভড়কে গেলো।
‘তাদের পাঠিয়ে দিয়েছি।’
রোযা চমকে ওঠে। দ্রুতো গতিতে ফিরে তাকাতে চাইলে শাড়ির সাথে হিল স্পর্শ করে। শাড়িতে জুতোর পাড়া পড়তেই শরীর সহ বেঁকে আসে পুরো সে। মুখ থবড়ে পড়তে নিতেই কেমন ঝড়ের বেগে আদিল এসে ধরল। এইসেই ধরা না। গভীর ভাবে ধরা যাকে বলে। যেই ধরায় পাতলা চামড়ায় দাগ ফেলতে পারে। আদিলের পুরুষালি রুক্ষ, অভদ্র ডান হাতটা সোজা গিয়ে পড়েছে রোযার লতানো শীর্ণ কোমরে। নরম পেটের কাছটায় স্পর্শ পেতেই রোযা চমকে ওঠে। শ্বাস বন্ধ হয়। মুখে মেঘ জমে। মাথা কাজ করে না। বোধগম্য হওয়ার আগেই তার দু-হাত কাজ করে। আদিলের বুক ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইল। বড্ড শক্ত করে। এতে আবার পড়তে নেয় হুড়মুড়িয়ে।
আদিল চোখ নাড়ায়। দৃষ্টি শক্ত হয়। অবাধ্যতা, অবজ্ঞা সে মোটেও বরদাস্ত করতে পারে না। তাই এবারে রোযাকে ধরে আরও দৃঢ়, আরও শক্ত করে। ঘনিষ্ঠ ভাবে। একঝটকায় টেনে এনে চেপে ধরে তার শক্তপোক্ত বুকের সাথে। ফের শীর্ণ কোমর খানা পেঁচিয়ে নিয়েছে তার হাতটা। পেটের নরম জায়গাটুকু ছুঁয়ে যেন মস্তিষ্কই কাজ করা বন্ধ করে দেয় একমুহূর্তের জন্য।কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে সব। শ্বাসও বন্ধ হয়ে আসে। উদভ্রান্তের মতো কেমন অবাধ্যের মতো আঙুল গুলো নিজে নিজে নড়ে। গভীর ভাবে ছোঁয় উদোম ধবধবে ফর্সা পেটের অংশটুকু। চাপ দেয় ওখানটায়। রোযার দমবন্ধ হয়ে আসে। মাথার ভেতরটা পুরোপুরি ব্লাংক হয়। পরমুহূর্তেই চোখের পলকে পিনপতন নীরবতা ভাঙে এক চড়ের তীব্র শব্দে।
সেই শব্দে কেঁপে পেছনে দাঁড়ানো এলেন আর শান্ত পর্যন্ত। হা হয়ে আসে তাদের মুখ। রীতিমতো স্তব্ধ তারা। রোযা চড় মেরে আর দাঁড়াতে পারল না। ওই শক্তি তার নেই। তার শরীর রীতিমতো কাঁপছে। থরথর করে। দৃশ্যমান রূপে। সে দ্রুতো সিঁড়িগুলো বেয়ে নামতে চাইল। দ্রুতো কদমে পালাতে চাইল।
আদিল তখনো কিংকর্তব্যবিমুঢ়। তার বাম গালটা ডান কাঁধের দিকে হেলে পড়ে আছে। তার পুরো শরীর বরফের মতো জমে আছে। এই পিনপতন নীরবতাটুকু ভাঙল পরমুহূর্তেই। রাগে, জেদে আদিল হাত সহ গ্লাসটা সিঁড়ির হাতলে মারতেই তীব্র শব্দের সাথে সাথে তার হাত কেটে গলগল করে র ক্ত ঝরতে থাকল।
রোযা মৃদু সীৎকার করে ওঠে ওই আওয়াজে। আরও জোরসে পা চালাতে চায়। অথচ পেছন থেকে আসা ভারি পদচারণের শব্দে তার কদমও কেঁপে ওঠে। পরপরই মনে হলো পাগলা এক ঘূর্ণিঝড় ঝড় এসে তাকে ধাক্কা দিয়ে রেলিং ঘেঁষিয়েছে। রোযা ব্যথায় ককিয়ে উঠতেও পারে না। পূর্বেই একটা র ক্তাক্ত হাত এসে টিপে ধরে তার গলা। মুহূর্তে তাজা, গরম র ক্তে মেখে যায় ওখানটা। র ক্ত গলা বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে ক্রমশ ভেতরে প্রবেশ করছে। র ক্তের গন্ধে রোযা আতঙ্কে কেমন শক্ত হয়ে গেছে। ভয়ে একরকম পাথর হয়ে আছে পুরো সে।
আদিল ফের অন্য হাতটা রাখল ওই কোমরে, যেখানে ছোঁয়ার জন্য সে চড় খেয়েছে! আদিল মির্জাকে চড় মারা! আদিল পেটে একরকম থাবা বসায়। খামচে ধরে। মাথাটা এগিয়ে নেয় রোযার মুখ বরাবর। নাকে নাক স্পর্শ করে। আর কিঞ্চিৎ মুখ বাড়ালেই লিপস্টিকে সজ্জিত ঠোঁটজোড়া ছুঁতে পারবে। আদিলের গরম, অস্থির, অবিন্যস্ত নিশ্বাস পড়তে থাকে রোযার গালে। গলায় আরও জোর দিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে আওড়াল এবারে -
‘শরীরে অনেক শক্তি, হুম? হাও এবাউট আই গিভ ইউ আ গুড রিজন টু ইউস দেম, মিস রোজ-আ….’
রোযা আতঙ্কে চেয়ে আছে। বড়ো করে চাওয়া চোখ দুটো একমুহূর্তে বুজে আসে। পরমুহূর্তেই তার শরীর ভার ছেড়ে দেয় পুরোপুরি। নির্জীব ভাবে লুটিয়ে পড়তে নেয় সিঁড়িতেই। আদিল দ্রুতো দু-হাতে ধরে ফেলল। আগলে নিলো একঝটকায়। এবারে যখন বুকে এনে পিষে ধরল শরীরটা, আর অবজ্ঞা করে না রোযা। কেমন শান্ত ভাবে পড়ে থাকে। অজ্ঞান হয়ে গেছে! আদিলের ক্তাক্ত হাতটাই ফের গিয়ে পড়েছে রোযার কোমরে। র ক্তের ছাপ পড়ে। রক্তি অবস্থা পেটের কাছেও। ওদিকে ধ্যান নেই আদিলের। সে অপলক দেখল রোযার মুখ। চোখ, নাক, ঠোঁট… সবকিছু এতো নিখুঁত। যেন খোদার বড়ো যত্নের তৈরি। আদিল হাত বাড়ায়। মুখের সামনে পড়া চুলগুলো আলতো হাতে সরিয়ে দেয়। বিড়বিড় করে আপনমনে -
'এতো সাহস, এতো স্পর্ধা নিমিষেই শেষ? হুম?'
একসময় নিজেই রোযার শরীরটা দু-হাতে পাজাকোলে তুলে নিলো। ওই ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নামল সিঁড়িগুলো বেয়ে। নিচের ফ্লোরের লিভিংরুমের সোফাটায় শুইয়ে দিলো লম্বালম্বি করে। ঝুঁকে বেহায়ার মতো দেখল এলোমেলো শাড়ি ভেদ হওয়া আপত্তিকর দৃশ্য। একপর্যায়ে লম্বা শ্বাস ফেলল। গায়ের কোট খুলে মেলে দিলো রোযার শরীরে।
এযাত্রায় শান্ত, এলেন এসে দাঁড়িয়েছে দূরত্ব রেখে। দুজানাই নীরব, নির্বিকার আপাতত। কোনো টুশব্দ করেনি। সাহস হচ্ছে না আজ শান্তরও। আদিল কথা বলে না। অস্থির ভাবে বসে রোযার মাথার কাছটায়। তাকিয়ে থাকে নির্নিমেষ। মৃদু আলোয় রোযাকে কল্পনার মতো সুন্দর লাগল। অশান্ত হয়েই আদিল একটা সিগারেট ধরাল বেশ দ্রুত ভঙ্গিতে। ঠোঁটে সিগারেট পিষে একটা টান দিয়েই, সিগারেট ঠোঁটে থাকা অবস্থাতেই...পিঠ স্পর্শ করাল সোফায়। মাথাটা সোফার হাতলে এলিয়ে দিলো। চোখ বুজল। ডান হাতটাও সোফার হাতলে। হাত থেকে তখনো ফোঁটা ফোঁটা র ক্ত পড়ছে ফ্লোরে।
সেই র ক্ত পড়ার শব্দটুকুও নিস্তব্ধতার মাঝে যেন শোনা যাচ্ছে।
শান্ত কিছু বলতে গিয়েও পারছে না। অথচ আদিলের র ক্তাক্ত হাতও সহ্য করতে পারছে না। কিছু বলার জন্য মুখ খুললেও শব্দ বেরুচ্ছে না। এবেলায় এলেনের হাতের টানে ওর সাথে বেরুতে বাধ্য হচ্ছিল। ওসময়তেই বাতাস যেমন কানে ফিসফিস করে ওঠে, ওমন মৃদু আওয়াজে গুঙিয়ে গাওয়া একটি গানের কিছু লাইনের সুর কর্ণগোচর হলো। থামল শান্ত, এলেনের পাজোড়া।
‘ Mere dil pe war kare
Teri ye adda…
Janiyeee….Tujhe na pata
Janiyeee…Hain aisa nasha
Janiyeee…Mere dil ko paar kare…..’
·
·
·
চলবে……………………………………………………