কামিনী - পর্ব ৬৫ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          যামিনী পালিয়ে গিয়েছে কথাটা যতটা না তীব্র হয়ে লেগেছে হেমলকের কানে তারচেয়ে বেশি তীক্ষ্ণ হয়ে ছুঁয়েছে হ্যাব্রোর অনুপস্থিতির কথাটা। 
সে তো বিস্মিতের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়ে কেবল তাকিয়ে রইল রানির দিকে। রানিও স্তব্ধ, চুপচাপ। তাকিয়ে আছেন ক্যামিলাস রাজ্যের সেনাপতির দিকে। 

হেমলক কিছু সময় চুপ থেকে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “আবার খোঁজ করো। যামিনীর পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে হ্যাব্রোর কোনো যোগসূত্র নেই আমার মনে হয়। আর যাই হোক, সে এই কাজ করতে পারে না।”

 “কেন পারে না?” প্রশ্নটি করে রানি তাকালেন বরাবর হেমলকের মুখের দিকে। একদম সোজা ভাবে। কোনো নড়চড় নেই, মুখ শক্ত তার। 
রানির এই ভাব গতি দেখে হেমলক যেন কিছুই বুঝতে পারল না। সংশয় হলো তার। রানি এমন কথা কেনই বা বলছেন? তবে কি রানি বিশ্বাস করে নিয়েছেন হ্যাব্রো যামিনীকে নিয়ে পালিয়েছে? কীভাবে রানি এটি বিশ্বাস করে নিলেন? আর কেউ না জানলেও সে তো জানে, পৃথিবীতে রানি কেবল এই একটি মানুষকে বিশ্বাস করেন অন্ধের মতন। রানির ধারণা, আর সবাই তাকে ধোঁকা দিলেও হ্যাব্রো তাকে ধোঁকা দেবে না কখনো। 
 সেই রানি আজ এমন প্রশ্ন করল কেন?

হেমলক নিজের অনুভূতিকে ধাতস্থ করে বলল,
 “পারে না কারণ ও তোমার ভরসার লোক।”

“আপনি তো ওকে চেনেন না। তাহলে এত বিশ্বাস কীভাবে?”

 “ওকে তো বিশ্বাস করছি না। আমি বিশ্বাস করেছি তোমায়। এবং আমি দেখেছি তোমার চোখে ওর প্রতি বিশ্বাসকে। তুমি একজন ভুল মানুষকে নিয়ে এত গর্ব করেছো এটা কখনোই আমি মানতে পারব না। এই পৃথিবীতে লোক চেনার মতন অভাবনীয় ক্ষমতা তোমার ভেতর দেখেছি আমি। সে তুমি ভুল হতে পারো না।” 
 হেমলক কথা বলে থামল। রানির দিকে তাকিয়ে দেখলো। কিন্তু রানির মুখাবয়ব দেখে বরাবরের মতনই সে বুঝতে পারল না কিচ্ছুটি। রানি কি হ্যাব্রোর বিশ্বাসঘাতকায় বেশিই কষ্ট পেলেন? এত চুপ হলেন কেন তাহলে?

পরক্ষণেই ছুটে এলো ইনান ণেকিতান ও মৃন্ময়ী। তাদের চোখ-মুখে উৎকণ্ঠা। ইনান এসে হড়বড়িয়ে বলল, “আপনার সেনাপতি নাকি যামিনীকে নিয়ে পালিয়েছে? আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। ও শেষমেশ এটা করল?”

মৃন্ময়ী বলল না কিচ্ছুটি। ও রানিকে আগাগোড়া বোঝার চেষ্টা করল। রানিকে কেন যেন আজকাল ওর সর্বজান্তা মনে হয়। ওর মনে হয় রানির চারপাশে যা-ই ঘটুক না কেন সেই সবকিছুর পেছনে রানির নিবিড় অবদান রয়েছে। রানি সবকিছুই জানেন এবং সর্বত্রই তার নিবিড় বিচরণ রয়েছে। তার আশেপাশে তার ইশারা ব্যতীত কিছুই হয় না। 
মৃন্ময়ীর মনের ভেতর হওয়া এই ধারণা সে প্রকাশ যদিও করে না। কেবল অপেক্ষা করে পুরো ঘটনার শেষটুকু জানার। 

—————

যামিনীর ঘোর কাটেনি এখনো। তাকিয়ে আছে সে অপলক হ্যাব্রোর দিকে। তার চোখে তীব্র অবিশ্বাস। হ্যাব্রোর মতন রানির প্রিয় লোক কিনা তাকে নিয়ে পালিয়েছে? এটি তার ভরসা হয় না। কেন যেন মন বলে এগুলো সব মিথ্যে। স্বপ্ন দেখছে সে। নিদ্রা ছুটে গেলেই যেন এই স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে। 

তার কাছে সন্ধ্যার পরের ঘটনাগুলো ছিলো কল্পনার মতন। 
 সে কারাগারে বসে ছিলো ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন হ্যাব্রোর আগমন হলো। এসেই তড়িঘড়ি করে বলল, “আমার সাথে চলুন, যামিনী। আমাদের পালাতে হবে।”

পালাতে হবে শব্দটা যামিনীর মাথায় তখন দ্বিধার দুয়ারের সৃষ্টি করল। সে বুঝতেই পারেনি হ্যাব্রো কী বলছে। তাকে দ্বিধান্বিত দেখে হ্যাব্রো পুনরায় বলল,
“আমি যা বলেছি এবং আপনি যা শুনেছেন পুরোটাই ঠিক। আমাদের সত্যিই পালাতে হবে।”

 যামিনী ভেবেছিলো এটা হ্যাব্রো ও রানির কোনো ছক হয়তো। তাই বিশ্বাস করতে চায়নি। কিন্তু হ্যাব্রো তাকে ভাববার বিশেষ সময়ও দেয়নি। কারাগারের দোর খুলেই টেনে ছুটতে লাগলো। কারাগারের পেছনে একটি দরজা আছে যে জঙ্গলের দিকে যায়, সে দরজা দিয়েই ছুটতে লাগলো তারা। যামিনী তখর ঘোরগ্রস্ত। হ্যাব্রো তাকে সাহায্য করছে এটা যতটা অবিশ্বাস্যকর তার চেয়ে বেশি অবিশ্বাস্যকর এটা যে— হ্যাব্রোর মতন সেনাপতি তার রানি কামিনীকাঞ্চনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন! 

তারা এখন অবস্থান করছে জঙ্গলের উত্তর পাশে। এদিকটায় আসে না কেউই। এখানে একটি ছোটোঘরও রয়েছে। ঘরটির সন্ধান অবশ্য যামিনীই দিয়েছে। দু'জনেই এখন হাঁপাচ্ছে। ঘরের এক দিকে মশায় জ্বালিয়ে দিয়েছে হ্যাব্রো। সে আলোয় চারপাশটা হলদেটে হয়ে আছে। ধিক্ ধিক্ জ্বলছে মশালের আগুনটা। 

 যামিনী তার দীর্ঘ ঘোর কাটায় জোর করে। তার দৃষ্টি সোজা হ্যাব্রোর দিকে। বুক থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস নামিয়ে শুধায়,
“আমায় বাঁচানোর কারণ?”

 হ্যাব্রো যামিনীর থেকে কিছুটা দূরে বসে ছিলো। শ্বাস নিচ্ছিলো ঘন ঘন। ছুটতে ছুটতে ঘেমে গিয়েছে। সবল বাহু গলিয়ে পড়ছে ঘামগুলো। মনে হচ্ছে মুক্তোর দানা। 
হ্যাব্রোর দৃষ্টি নিচে। সে ঘরের মধ্যিখানে কিছু শুকনো কাঠে আগুন জ্বালানোর প্রচেষ্টায় মগ্ন। প্রতিত্তোর করল,
“সবকিছু কারণেই হয়? অকারণেও কিছু জিনিস ঘটে বোধহয়।”

 “অকারণে ঘটে কিছু তা ঠিক। তবে রানি কামিনীকাঞ্চনের আদর্শ সেনাপতি অকারণে আমাকে বাঁচাবে এবং তার রানির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে তা মানা সম্ভব নয়।”

“কেন সম্ভব নয়?”

 “কারণ তুমি তোমার প্রাণ এই রাজ্য আর রানির জন্য সঁপেছেন তা কি আমার অজানা? তোমার প্রতিটা শ্বাসের পেছনের কারণও আমি বুঝি, সেনাপতি হ্যাব্রো। এতটুকু না বুঝলে আর কীসের প্রেমেই বা পড়লাম?”
 শেষ বাক্যটি বলার সময় যামিনীর কণ্ঠ একটু ধীর ও মোলায়েম হলো। প্রতিবার হ্যাব্রোর প্রতি তার নিজের ভালোবাসা স্বীকার করার সময় সে নরম হয়ে যায়। এতটা নরম যেন স্বর্গে ফোঁটা কোনো ফুল। 

হ্যাব্রো এবার চোখ তুলল। আগুন জ্বলেছে শুকনো কাঠ গুলোতে। সে আগুনের লালাভ ভাপে তার মুখটা অত্যাধিক উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে তার চোখের মনির উথাল-পাতাল বিচরণ। এক পর্যায়ে তার ঠোঁটে খানিক হাসি দেখা দিলো, 
“ধরে নিন আপনার প্রেমের জোরের কাছেই হ্যাব্রো হারিয়েছে নিজেকে। তাই বেইমানি করেছে রানির সাথে।”

 “এ-ও সম্ভব?”

“হয়তো।”

দু'জনের কথা থামতেই আবার নীরব হয়ে গেলো জায়গাটা। কেবল বাহিরের কিছু শব্দ, প্রাণীর বিচরণ, ও তাদের পদ-ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। 

যামিনীকে খুবই দুর্বল দেখালো। দেখালো ক্লান্ত ভীষণ। মনে হলো তার যেন একটি কাঁধ প্রয়োজন। প্রয়োজন একটু বিশ্রামের। 
সে হ্যাব্রোর আদুরে সেই চোখের ভাষাকে বিশ্বাস করল। বিশ্বাস করল সে স্বপ্ন দেখছে না। অবশেষে তার বহু বহু বছরের আকাঙ্খা, তপস্যা সত্যি হয়েছে। সত্যিই হ্যাব্রো তাকে বুঝেছে। তার ভালোবাসাকে বুঝতে পেরেছে। শেষমেশ তাকে হ্যাব্রো গ্রহণ করেছে। 

হ্যাব্রো আহ্লাদের স্বরে ডাকল তাকে, “আসুন এদিকটায়। আপনার বিশ্রাম প্রয়োজন। এখানে আরাম বোধ হবে আগুনের কাছটায়। উষ্ণ ভাব পাবেন।”
 হাত ছড়িয়ে ডাকল ছেলেটা। তার এই ডাক, এই আহ্লাদ কি অস্বীকার করার ক্ষমতা রাখে যামিনী? রাখে না যে। বহু বছর কেবল এই প্রেমটুকু দেখার আকাঙ্ক্ষা করে গিয়েছে সে। আজ সেই ডাক কীভাবে প্রত্যাখ্যান করবে সে?
হতে পারে সে শক্ত, কঠিন, অন্যায়কারী, বিশ্বাসঘাতক। কিন্তু তার ভেতর যে হ্যাব্রোর প্রেমকে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা নাই। স্রষ্টা তাকে সব দিলেও এই ক্ষমতা যে দেননি। হয়তো ইচ্ছে করেই দেননি। দুর্বলতা না থাকলে মানুষ হওয়া যায় কি? 

 যামিনী গুটি গুটি পায়ে এলো। এসে মাথা রাখল হেমলকের পায়ে। শুয়ে পড়ল কোনো কিছু বাছ-বিচার না করেই। যেন এই কোলটির সাধনা করে গিয়েছে চিরটাকাল। আজ সাধনার সেই ফল পেয়েছে। তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা অশ্রু। হ্যাব্রো তা ঠিকই দেখল। মনযোগ দিয়ে খেয়াল করল অশ্রুর বিন্দু কেমন শৌখিনতার সঙ্গে তার কোলে মিশে গেলো। হ্যাব্রো তার ডান হাতটি উঠিয়ে কাঁপা কাঁপা ভঙ্গিতে রাখল যামিনীর মাথায়। কত মমতা মাখানো ছিলো সেই হাতের সঙ্গে! 

যামিনী হ্যাব্রোর হাতটির উপর নিজের হাত রাখলো। চেপে ধরল সেই হাতটি। কম্পনরত কণ্ঠে বলল, 
“তোমার হাতটা কাঁপছে কেন, সেনাপতি হ্যাব্রো? আমাকে ধরতে ঘৃণা হচ্ছে বুঝি? ঘৃণায় কাঁপছে?”

 “ঘৃণায় দেখেছেন কেবল? ঘৃণায় কেউ কাউকে কখনো কোল পেতে দেয় কি?” 
নিজের প্রশ্নের বিপরীতে হ্যাব্রোর প্রশ্ন ভেসে আসতেই যামিনী হেসে ফেলল,
“তুমি বড়ো কথা জানো। কথায় পারি না।”

হ্যাব্রো আর জবাব দেয় না। যামিনীর মাথায় অনবরত বুলিয়ে যায় হাত। 
 যামিনী ফের নিজে থেকে বলে, “আমার আজ বড্ড আনন্দ হচ্ছে জানো? বহু বছর নিজেকে এত সুখী লাগেনি। বহু বহু বছর এত সুখ পাইনি।”

“সত্যিই কি তাই? এখনের ঘটনা বাদ দিলে যদি অতীতে যাই, রানি কামিনীকাঞ্চন কি আপনাকে সুখী করতে পারেনি? উনি তো আপনাকে কম কিছু দেননি। তা-ও উনার এই সমস্ত কিছু আপনার কাছে সুখ হতে পারেনি কেন, যামিনী?”

 যামিনী উত্তর দেয় রয়েসয়ে, 
“পারেনি। এতে সখীর কোনো দোষ ছিলো না হয়তো। দোষটা আমারই ছিলো। সখী যা ভালোবেসে দিয়েছিলো তা আমি গ্রহণ করেছিলাম হিংসা নিয়ে। তাই হয়তো সুখী হতে পারিনি।”

 “হিংসা? কীসের এত হিংসা?”

যামিনী এবার এক পলক হ্যাব্রোর মুখের দিকে তাকায়। নামিয়ে নেয় পুনরায় চোখ। জ্বলন্ত আগুনের দিকে তাকিয়ে ধিমে স্বরে বলে,
“বললে তুমি আবার আমায় ঘৃণা করবে কি, হ্যাব্রো?”

 যামিনীর মাথায় থাকা হ্যাব্রোর হাতটা আরেকটু নরম হয়, 
“করব না।” 
 হ্যাব্রোর কথায় ভরসা পেলো যামিনী। এরপর আগুনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমরা সুখেই ছিলাম জানো, হ্যাব্রো? খুবই সুখে ছিলাম। আমি, আমার পিতাশ্রী, আমার মাতা, ভ্রাতা… সবাই ভীষণ ভালো ছিলাম। কিন্তু তোমার রানি আমাদের সেই স্বপ্নের মতন সুখ কেঁড়ে নিয়েছিলো ভয়ঙ্কর পিশাচিনীদের মতন। আমাদের সব শেষ করে দিয়েছিলেন, সব।”
 কথা বলতে বলতে ভেঙে পড়ে যামিনী। চোখ থেকে বের হয় তার অনর্গল অশ্রু। 

হ্যাব্রো তাকে সান্ত্বনা দেয়। মনে কৌতূহল থাকা শর্তেও সে যামিনীকে থামতে বলে। কিন্তু যামিনী তখন তুমুল ঘোরে যেন আচ্ছন্ন। বলতে লাগলো,
“জানো? চরক রাজ্যের রাজা প্রভু রমেশকৃষ্ণ ছিলেন আমার পিতা। আমি কোনো পথের কন্যা ছিলাম না। আমি রাজার কন্যা ছিলাম।”

হ্যাব্রো চমকে উঠল। মুখ দিয়ে তার যেন কথা বের হচ্ছে না যেন। অস্ফুটস্বরে বলল,
“আপনি না বলে ছিলেন আপনার কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই? কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই?”

 “সে তো রানির রাজ্যকে ধূলিসাৎ করার জন্য বলেছিলাম।”
Page 2
          চারপাশের নিশুতি রাত আরও ঘনীভূত হতেই শোনা গেলো কিছু বন্য প্রাণীর ডাক। যামিনীর কণ্ঠ নীরবের চেয়েও নীরব হয়ে এলো ক্রমশ। ওর যে অতীত বিশেষ আনন্দদায়ক নয় তা-ই বলল ওর নরম স্বর। 
 হ্যাব্রো যামিনীর যন্ত্রণা বুঝেই থামিয়ে দিতে চাইল, “থাক, পরে বলবেন সেসব কথা না-হয়। আজ থাকুক।”

ঘোরগ্রস্ত যামিনী ক্রমশই তখন দুঃখে ডুবে যাচ্ছিলো। হ্যাব্রোর থামতে বলা ওর কর্ণগোচর হলো না বোধহয় ঠিক। ও আপনমনে বলল,
“রানির রাজ্য ধূলিসাৎ করতে আমি নিজের সব পরিচয়ই ধুয়েমুছে ফেলেছিলাম একেবারে। আর ধুয়েমুছে ফেলবো নাই-বা কেন? কে ছিলো আমার? আমাদের চরক রাজ্য আজ অন্য কারো দখলে। মাতা মৃত। ভ্রাতাও বোধহয় মৃত। নেই কেউ আজ। আমার প্রতিটা আপন মানুষকে রানি তার কপটতার সঙ্গে শেষ করে দিয়ে ছিলেন। কী দোষ ছিলো আমি আজও জানি না। গিয়েছিলাম আমি গুরুদীক্ষা নিতে। রাজ্যের সংবাদ পেয়ে ছুটে এসে দেখি সব শেষ। মাতার মৃত দেহ আছে কেবল চিহ্নস্বরূপ। পিতাকে বন্দী করেছেন। ভ্রাতার মৃতদেহ দেখার সৌভাগ্যটুকু হয়নি। সেই মুহূর্তে আমার পুরো বিশ্ব তছনছ হয়ে গিয়েছিলো। আমার রাজ্য, আমার আত্মীয়, পরিজন, পরিবার সব মিশিয়ে দিয়েছিলেন রানি ধূলোর সঙ্গে। আমি সব হারিয়ে ছিলাম। সব। আমার স্থানে তুমি থাকলে তুমি কি ক্ষমা করতে পারতে তোমার আদর্শ রানিকে? পারতে ভুলে যেতে সব?”

 শেষের প্রশ্নগুলো হ্যাব্রোর উদ্দেশ্যে যামিনী করলেও হ্যাব্রো উত্তর দিলো না। চুপ করে থাকলো। যেন তার কণ্ঠে শব্দের বড়ো অভাব। বাক্য হারিয়েছে অনাদরে। 
যামিনীর কণ্ঠে মোলায়েম ভাব সরতে আরম্ভ করল ধীরে ধীরে, 
“আমি তখনই ঠিক করে ছিলাম আমি রানিকে এর শাস্তি দেবো। ঠিক দেবো। আমার প্রজা ছিলো না, রাজ্য ছিলো না। তাই আমাকে নামতে হয়েছে চতুরতার সঙ্গে। আমি তাই তারই প্রাসাদে তারই সখী হয়ে উপস্থিত হয়ে ছিলাম। ধীরে ধীরে তার বিশ্বাস অর্জন করতে আরম্ভ করেছিলাম। তাকে নিজের চোখের সামনে বন্দী করতে চেয়েছিলাম। তাকে পুরোপুরি শেষ করে দিতে চেয়ে ছিলাম। কিন্তু… “

শেষের ‘কিন্তু’ শব্দটার পর যামিনীর কথা থামে। হ্যাব্রোর কৌতূহলী চোখ তখনও যামিনীর মুখমন্ডলে ঘুরে বেড়াচ্ছে অনবরত। বাকিটুকু শোনার এক তীব্র ইচ্ছে তার বুকে বাসা বেঁধেছে। প্রতিটা মানুষের পেছনেই গল্প লুকানো থাকে। যামিনীর পেছনেও তা-ই ছিলো। আর সেই গল্পগুলো কতটা দুঃখ, বিষাদ ও শোক মিশ্রিত হয় তা সেই গল্পগুলো শুনলে বোঝা যায়। 
হ্যাব্রো শুধালো, “কিন্তু কী?”

 “ঐ যে দুর্ভাগ্য আমার! বিশ্বজয় করতে এসে শেষমেশ কি-না আমি আটকে গেলাম দু’জোড়া চোখের মায়ায়। রানির আদর্শ সেনাপতির মায়ায়। বুঝে গেলাম, আমি একা মানবী রানিকে ঘায়েল করতে পারব না যতক্ষণ তার পাশে তার আদর্শ সেনাপতি হ্যাব্রো রয়েছে। তাকে মারতে হলে যে প্রথমে তোমায় মারতে হতো! যে দু’জোড়া চোখ আমায় মুগ্ধ করল তাকে আঘাত করার সাধ্যি আমারও কি আছে বলো? তাই আমি দিনে দিনে ভাবতে লাগলাম। রানির দুর্বলতা খুঁজতে লাগলাম। এবং অবশেষে বুঝলাম রানিকে তখনই মারা যাবে যখন তাকে এই রাজ্য ও এই রাজাসন থেকে সরানো যাবে। তাই সেটাই করলাম। তুমি হয়তো বুঝতেই পেরেছিলে তখনই যে, রানি নিজে নিজে কোথাও যাননি। আমি সরিয়েছি তাকে। তাই না? পেরেছিলে বুঝতে, আমি জানি। রানির প্রতিটা পদধ্বনি তোমার মুখস্থ। আর তুমি এই সামান্য বিষয়টা বুঝবে না তা আদৌ হতে পারে না।”

যামিনী একই অবস্থানে শুয়ে থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে হ্যাব্রোর মুখের দিকে তাকালো উত্তরের আশায়। হ্যাব্রো কোনো হটকারিতা করল না। অস্বীকারও করল না। বরং আকপটেই স্বীকার করল,
“আমি বুঝেছিলাম আপনিই কিছু করেছেন। রানি আমাকে না বলে এত বড়ো সিদ্ধান্ত কখনোই নিতেন না এতটুকু আমার জানা ছিলো। এতটুকু তো তাকে চিনে ছিলাম।”

“কেন এতটা চিনেছিলে তাকে? সেনাপতি তো কতই হয়! তোমার মতন তো কেউ নয়। কেন তুমি আলাদা? এই প্রশ্ন, এই হিংসে, এই আফসোসটা বোধহয় আমার চিরটাকাল থেকে যাবে।”

 হ্যাব্রো আর আগ বাড়িয়ে কথা বলল না। যামিনীও চুপ করল। তাকে ক্লান্ত লাগছিলো ভীষণ। চোখগুলো যেন তার টানছিলো ভীষণ। 
ঘরটির বাহিরে মড়মড় আওয়াজ হলো। যেন শুকনো পাতা পায়ে মাড়িয়ে হাঁটছে কেউ। গা হিম করা সেই শব্দ এসে বেশ বিঁধছে কানে। 

যামিনী নড়ল না মোটেও। চকিতও হলো না। বরং কণ্ঠ একটু উঁচুতে তুলে বলল,
“বাহিরে কে? হ্যাব্রোর আদর্শ রানি কামিনীকাঞ্চন? ভেতরে আসো, সখী। লুকিয়ে থাকাটা এ্যাজেলিয়া রাজ্যের রানিকে মানায় না। আসো।”
 আচমকা যামিনীর এহেন কথায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো হ্যাব্রো। হত-বিহবল হয়ে তাকালো যামিনীর মুখমণ্ডলের দিকে। যামিনীকে সে আগাগোড়া যেমনটা ভেবেছিলো যামিনী তেমনটা নয়। যামিনী খুবই ধূর্ত। খুব, খুব, খুব। নয়তো রানির এমন গোছানো বুদ্ধি এভাবে ধরে ফেলল! এভাবে?

  যামিনীর ডাকের মিনিট খানেকের ভেতরই সত্যি সত্যি রানি কামিনীকাঞ্চন ভেতরে প্রবেশ করলেন। তার পেছন পেছন এলো হেমলকও। রানিও আজ স্তম্ভিত। বিস্ফোরিত নয়নে একবার হ্যাব্রো একবার যামিনীর দিকে তাকাচ্ছেন। তিনি বুঝতেই পারলেন না যামিনী এমন চট করে কীভাবে বুঝে ফেলল তার উপস্থিতি! এতক্ষণ তো দিব্যি ছিলো সবটা স্বাভাবিক। 

যামিনীর চোখ বন্ধ আগের ন্যায়। ঠোঁটে দেখা দিলো হাসি। বলল,
“সখী, এত ভাবছো কেন? আমার মতন সামান্য যামিনীকে নিয়ে এতো ভেবো না। তোমার শরীরের সুঘ্রাণটা ভিন্ন। তুমি অনেকটা দূরে থাকলেও যেকেউ বুঝতে পারবে তোমার উপস্থিতি। এত বছর তোমার সাথে থেকে এতটুকু রপ্ত করতে না পারলে কীভাবে হবে?”

  আজকের যামিনী উন্মাদ নয়। শীতল ভীষণ। রানি কামিনী মাঝে মাঝে কঠিন বিপদের সময় এতটাই শীতল থাকেন। আজ যামিনীকে একইরকম লাগছে। 

হ্যাব্রো নড়তে চাইল। সে বুঝে গিয়েছে যামিনী তার পুরোটা চাল ধরে ফেলেছে। কিন্তু যামিনী তাকে উঠতে দিলো না। বরং কোমল আবদার করে বলল,
“মেরেই তো ফেলবে। তার আগে একটু শুয়ে নিই তোমার কোলে? বড়ো সাধ ছিলো এই জীবনের, তোমার সান্নিধ্য লাভের। সত্যি সত্যি না হলো মিছিমিছি না-হয় হোক!”

 “তুমি যদি বুঝতেই পেরেছিলে এটি আমাদের ফাঁদ ছিলো তবে পালালে না কেন?”

“সত্যি বলতে প্রথমে বুঝিনি। ঠিক যখন তোমার ঘ্রাণ পেলাম আর আমার মাথায় হ্যাব্রোর হাত পেলাম, তখন বুঝলাম এসকলই মিথ্যে। হ্যাব্রো আমার জন্য বড়োজোর করুণা করতে পারে। কিন্তু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া কিংবা কোল পেতে দেওয়ার মতন কাজ করতে পারে না। ওকে যে আমি চিনি!”

 “এই চেনাতে কী লাভ হলো যদি ধরেই রাখতে না পারলে? হ্যাব্রোকে চিনেও তুমি তাকে আগলাতে পারলে না। আমার উপর প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে কত কী করলে! একটিবার জানতে চাইতে কেন আমি এমনটা করেছিলাম! কেন তোমাদের রাজ্যের এ হাল করে ছিলাম। তা-না করে এমনটা কেন করলে?”

যামিনী এবার নিজেই ধীরে ধীরে হ্যাব্রোর কোল থেকে মাথা উঠিয়ে বসলো। চোখ গুলো ওর ভীষণ ছোটো। ভঙ্গুর দেখাচ্ছে মুখটি। 
“কখনো শুনেছো কেউ প্রতিশোধ নিতে এসে সন্ধি করে? আমার কাছে তুমি দোষী ছিলে, আছো আর থাকবে। এ সময়ে এসে আর নতুন করে কিছু জানতে চাই না। আফসোস নিয়ে এই যামিনী মরবে না, সখী।”

যামিনীর আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বর। হেমলক কেবল তাকিয়ে দেখতে লাগলো রানি কামিনীকাঞ্চনকে! হাতে তলোয়ার ধরে রেখেছেন রানি ঠিকই কিন্তু চোখে নেই তার কোনো তেজ, রাগ। রাগের বদলে বরং কণ্ঠে আভাস দেখা দিচ্ছে অনুরাগের। অথচ এই যামিনীই তো কত ক্ষতি করল। কেমন বিশ্বাসঘাতকতা করল। কিন্তু রানি এতটাই প্রেম দিয়েছেন এই মেয়েটিকে যে এই মুহূর্তে এসেও মেয়েটিকে আঘাত করতে ভাবছেন বারংবার। 

হেমলক এবার রানি কামিনীর বাহুতে হাত রাখল। চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করে মৃদু স্বরে বলল, 
“প্রতিপক্ষের বিপরীতে তলোয়ার ধরে রাখা হাত কাঁপা রানি কামিনীকাঞ্চনকে শোভা পায় না। রানি কামিনীকাঞ্চনের বৈশিষ্ট্য সেজন্যই ভিন্ন। অন্যায়ের সঙ্গে সে আপোষ করে না।”

  হেমলক যে রানির দুর্বলতা ধরতে পেরেছে তা রানিকে স্বস্তি দিলো। এবং সেই কথাগুলো রানির বুকে বল ফিরিয়ে আনলো। তার কণ্ঠ তাই এবার শক্ত হলো। চোখগুলো এবার ধীরে ধীরে কঠিন হলো। 
“আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তুমি ভালো করোনি, সখী। রানি কামিনীকাঞ্চন সবকিছুর ক্ষমা করে দেন কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতার না।”

রানির কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠল যামিনী, “তুমি কীই-বা শাস্তি দেবে আমায়? মৃত্যুদণ্ড? তোমার মনে হয় তা আমাকে ব্যথা দেবে? ভয় পাচ্ছি সেটাকে আমি?”

 হেমলক পিয়ার্স যেন অবাক না হয়ে পারছে না। এই যামিনীকে সে যেমনটা ভেবেছিলো মেয়েটা মোটেও তেমন নয়। এই মেয়েটাও ভীষণ অদ্ভুত। 

আচমকা মৃদু আর্তনাদ ভেসে এলো। মেয়েলি চিৎকার এসে কানে লাগতেই হেমলকের ধ্যান ভেঙে গেলো। চোখের পলকেই ঘটে গেলো ভিন্ন ঘটনা। যামিনী সবে উঠে দাঁড়িয়ে ছিলো। হয়তো রানির উপর পুনরায় আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু ঠিক সে সময়েই তার বুকের বা'পাশে ছুরি বসিয়ে দিয়েছে হ্যাব্রো। বিষয়টা এতটাই দ্রুত ঘটল যেন চোখের পলকেই দীর্ঘ একটি ঘটনা ঘটে গেলো। 
 যামিনীর চোখগুলো রীতিমতো বড়ো বড়ো হয়ে গিয়েছে। চোখের ভেতরের সাদা অংশে ভেসে উঠেছে লাল লাল ছাপ। সে একবার নিজের বুকে বিঁধে থাকা ছুরি সমেত হ্যাব্রোর হাতটির দিকে তাকাচ্ছে, আরেকবার তাকাচ্ছে হ্যাব্রোর দিকে। তার যেন বিশ্বাস হচ্ছে না হ্যাব্রো তাকে আঘাত করেছে। হ্যাব্রো! যে মানুষটা নারীকে দেবীর স্থানে ঠাঁই দেয় সেই মানুষটা তার বুকে আঘাত করেছে! কতটা ঘৃণা থাকলে এমন করে আঘাত করতে পারল তাকে? কতটা!

 রানি কামিনীকাঞ্চন এবার মুখ খুললেন। তার কণ্ঠ থেকে বের হলো সেই কঠিন বাক্য,
“এবার আঘাতে তোমার ব্যথা হচ্ছে তো, সখী? দুঃখ হচ্ছে তো? যাকে বুকে ঠাঁই দিয়েছো তাকে দিয়েই তোমাকে আঘাত করেছি। এবার বলো এই মৃত্যু যন্ত্রণার লাগছে তো? রানি কামিনীকাঞ্চনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলে ভয়ঙ্কর শাস্তি পেতে হয়ই যে, সখী! ভয়ঙ্কর শাস্তি বলতে কেবল কি দেহের মৃত্যুদণ্ড? না, না, সখী। কখনো কখনো দেহের মৃত্যুকে ভয়ংকর করতে আত্মাকে মারতে হয়। আমি সেটাই করলাম। এবার বলো, সখী, রানি কামিনীকাঞ্চনের শাস্তিতে কেমন লাগছে?”

 রানির ঠোঁটে ফুটে উঠল হাসি। বাঁকা হাসি। 
 সেই হাসির দিকে যামিনী তাকিয়ে রইল। অস্ফুটস্বরে বলল, “বড্ড শোক হচ্ছে, সখী। বড্ড শোক। মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলে ভালো কথা তাই বলে আত্মারও দণ্ড দেবে?”

 “তুমিও তো একই কাজ আমার সাথে করেছিলে, সখী বিশ্বাসঘাতকতা করে। এবার তুমিও বুঝো, আত্মার আঘাতে কেমন কাঁপে সব।”

“তোমায় আমি ঘৃণা করব, সখী। সবসময় ঘৃণা করব। আর হ্যাব্রো, আরেকটি বার জনম পেলে তোমায় ভালোবাসবো আমি, আবারও, আবারও, বহুবার। তুমি না-হয় মিছিমিছি একটিবার কোল পেতে দিও এমন করে আবারও? তারপর বুকে ছুরি মেরো। আমি মেনে নেবো। হাসিমুখে মেনে নেবো। এই দেখো হাসছি। হা হা হা। এই দেখো মেনে নিয়েছি তোমার দেওয়া এই তীব্র বেদনা। মেনে নিয়েছি সব। দেখো।” কথা বলতে বলতে লুটিয়ে পড়ল যামিনী। পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো। হ্যাব্রোর বুকপিঠ টানটান। মাথাটা সোজা। চোখগুলো ঈষৎ লালচে দেখাচ্ছে।

 রানি ছুটে সেই স্থান থেকে বেরিয়ে এলেন। সোজা হেঁটে দাঁড়ালেন জঙ্গলের বাহিরে একটি ঝর্ণার সামনে। রানির সাথে সাথে হেমলকও বেরিয়ে এসেছে। নিশ্চুপেই গিয়ে দাঁড়িয়েছে রানির সঙ্গে। ঝর্ণা থেকে অনবরত জল পড়ছে। হেমলক ভেতর ভেতর কত কথা গুছালেও বলার মতন শক্তি পাচ্ছে না। 
 যামিনীর মৃত্যু ভীষণ আকাঙ্ক্ষিত হলেও সেই মৃত্যুতে তীব্র বেদনার ছাপ দেখতে পেয়েছে সে রানির মুখে-চোখে। হ্যাব্রোর চোখেও হয়তো ছিলো কিছুটা!

ভোরের আলো ফুটতে আরম্ভ করেনি। তবে আকাশে কালো রঙ সরে গিয়ে ধূসর নীলাভ রঙে আচ্ছন্ন হতে শুরু করছিলো। বহুক্ষণ পর রানি কথা বলে উঠলেন। বৈরাগ্য নেমে এলো তার কণ্ঠে,
 “আমি কি এতই নিকৃষ্ট! আমায় ভালোবাসা যায় না? সখী শেষবেলাতেও ঘৃণা করে গেলো আমায়। এমন ভাগ্যই স্রষ্টা লিখে দিলেন আমাকে! এমন ভাগ্যই!”

সুঠামদেহী হেমলক এক হাতে রানির বাহু প্যাঁচিয়ে ধরল, “কে বলেছে তোমায় ভালোবাসা যায় না? যায় বলেই তো, আমি বেসেছি!”

“সখী জড়িয়ে ধরে যদি একটিবার বলত তার ভুল হয়ে গিয়েছে, আমি হয়তো ক্ষমা করে দিতাম! আমি হয়তো সব ভুলে যেতাম। ভুলে যেতাম সখী আমায় কতটা ঘৃণা করেছিলো। ভুলে যেতাম আমার বিপরীতে সে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলো। আমি সব ভুলে যেতাম জানেন। ও একটু জড়িয়ে ধরলে আমি গোটা দুনিয়া ছেড়ে দিতাম হয়তো হাসিমুখে। সখী কেন ভালোবাসলো না আমায়?” রানির কণ্ঠস্বর তীব্র শোকে আচ্ছন্ন শোনালো। শোকের সময় মানুষ নিজের দুর্বলতা জাহির করে বলেই হেমলক দেখতে পেলো একজন মোমের মতন নরম নারীকে। যে রানি নয়, অগ্নি ঝড়া কামিনী নয়… 
যে একটি ফুল কেবল। যে ভালোবাসার কাঙালি কেবল। যে ভালোবাসা পাওয়ার লোভে কেমন হা-হুতাশ করে কেবল! 

 হেমলক এই নরম রানিকে আরও শক্তপোক্ত ভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। এই রানিকে দেখতে পাওয়া খুবই দুর্লভ। মেয়েটা যে কখনোই দুঃখ ভাগ করেনি এর আগে। এমন করে শিশুসুলভ নেত্র মেলে জানতে চায়নি কেন তাকে ভালোবাসা যায় না। এমন করে অভিযোগ করে বলেনি, স্রষ্টা কেমন অবিচার করেছে তার সাথে। 
এই রূপ রানির বড়োই দুর্লভ। এক-আধবারই কেবল দেখতে পাওয়া যায়।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp