সূর্যের আলো মলিন হয়ে উঠেছে। উদ্যানে থেকে থেকে উড়ছে বালু। প্রজাদের চোখে-মুখে বেদনার ছাপ। তাদের সামনে দাঁড়ানো, দুই বাহু টান টান করে রাখা নারীটিকে তাদের যত্ন করতে ইচ্ছে করছে খুব। একটু আদুরে স্বরে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে— দুঃখ কি তোমায় বড্ড বেশিই জ্বালিয়েছে?
কিন্তু বলতে পারল না। তারা যে সামান্য প্রজা। রানিকে মুখের আহ্লাদটুকু দেওয়া ছাড়া গতি আছে কি?
রানির নিশ্চুপতা বেশিক্ষণের ছিলো না। তিনি নিজেকে ভেতর ভেতর আরও শক্ত করলেন বাকিটুকু বলার জন্য। তিনি যে রানি। প্রজারা চিরজীবন একই ভাবে ভুল বুঝে যাক তা কেমন করে হতে দিবেন? এত ঘৃণা সহ্য করার শক্তি তার ভেতরেও যে নেই।
রানি নতুন উদ্যমে পুনরায় বলতে আরম্ভ করলেন,
“আমি হয়তো নিজের স্বামীকে মারার মতন নিষ্ঠুর হতাম না। একটি চৌদ্দ বর্ষীয়া কন্যা কেমন করে এত সাহসী হয় আপনারাই বলুন? আমাকে এমন হতে বাধ্য করা হয়েছিলো। আমার তখন নতুন অনুভূতির সাথে পরিচয়। ভ্রূণ গর্ভে এলে কেমন করতে হয় আমার জানা ছিলো না। জানতাম কেবল, আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। একটি নিষ্পাপ শিশুর মাতা হবো আমি। যে আমাকে দুঃখ দেবে না। কিন্তু আমার স্বামী আমার সেই ফুলের কুঁড়ির মতন স্বপ্নকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিলো। একদিন মধ্যরাতে সে মদ্যপানে ডুবে ছিলো। নেশা তার শরীরের বাহুতে নৃত্য করছিলো দানবীয় বেশে। সে আমাকে বলল তার মনোরঞ্জন করতে। আমি তার সেই আবদার রাখতে নারাজ হই। গর্ভের শিশুটির কথা বলি। তার মনোরঞ্জনের জন্য শিশুটির ক্ষতি হয়ে যাবে। ভেবেছিলাম, সে পাষণ্ড হয়তো আমার বেলা। নিজের রক্ত, নিজের শিশুর বেলা নিশ্চয় উদার হবে। কিন্তু সে আমার ভাবনাকে ভুল প্রমাণিত করে দিয়ে ভয়ঙ্কর কাজ করে বসলো। আমাকে যতভাবে দণ্ড দেওয়া যায় দিলো। আমি যখন ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম সে আমার পেটে তীব্র আঘাত করল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বয়ে গেলো দুই পা বেয়ে। আমি বুঝতে যখন পারলাম আমার শেষ ভরসাটুকুও হারিয়ে ফেলেছি তখন আমার জ্ঞান হারিয়ে যায়। তীব্র ব্যথায় ভেবেছিলাম প্রাণও বোধহয় চলে গিয়েছিলো।”
রানি আর কথা বলতে পারছিলেন না। তার কণ্ঠে চেপে চেপে আসছিলো কথাগুলো। রাগে শরীর কাঁপছিলো। তার কত শখের শিশুটিকে সে শেষ অব্দি দেখতেও পারল না। কত পাষাণ এই পুরুষজাতি। কত হৃদয়হীন। নিজের সন্তানের প্রতিও এদের দয়া হয় না। কত নিষ্ঠুর!
কথা বলতে বলতে পুরুষজাতির প্রতি রানির ঘৃণা আরও বাড়ে। তিনি পণ্ডিত নরেশের দিকে সেই সমস্ত ঘৃণাভরা চাহুনি নিক্ষেপ করে। এবার তার কণ্ঠে অসহায়ত্ব সরে গিয়ে সেই অঢেল ঘৃণার আভাস পাওয়া যায়,
“এরপরও আমি তাকে ছেড়ে দিতাম? ছেড়ে দেওয়া আমার উচিত কার্য হতো বলে আপনি মনে করছেন, মহামহিম পণ্ডিত? অবশ্য মনে করবেনই না বা কেন? সেই পুরুষ জাতির একজনই তো আপনি, আপনারা। যারা এই পুরো পৃথিবীকে নিজের পদতলে পিষ্ট করতে চান বারংবার। যারা ভাবেন নারীর কণ্ঠ শুনবে না কোনো পঙ্খীও। কিন্তু আমিতো তা হতে দিতে পারি না। তাই আমার স্বামীর প্রাণ নিয়েছিলাম। কীভাবে জানেন? ওর, ওর শরীরের প্রতিটা অঙ্গ কেটে ওর থেকে আলাদা করে। ওর চোখ, জিহ্বা ওর থেকে ছিনিয়ে নিয়ে। আমার সাথে অন্যায় করে পার পেয়ে যেতো? কখনো না। কখনো না। ও ভুলে গিয়েছিলো বাঁধ দিয়ে জল সাময়িক ভাবে আটকানো যায়। কিন্তু যখন বাঁধ ভেঙে যায় তখন প্রলয়ঙ্কারী সেই জল সবাইকে গ্রাস করে নেয়। সবাইকে। আমি গ্রাস করে নিয়েছি ওকে। হ্যাঁ হ্যাঁ, আমিই সেই নারী যে নিজের স্বামীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পালন করিনি। যে কখনো স্বীকৃতি দিইনি নিজেকে বিবাহিতা বলে। কেন দেবো? আমি বিবাহ চিনতাম না, স্বামী বলে যাকে চিনেছি সে ছিলো পশু। তার চিহ্ন আমি নিয়ে ঘুরবো? অসম্ভব। অসম্ভব। আমার জীবন অন্য কারো খেলার গুটি নয় আর। আমি আমার জীবন নিয়ে এখন খেলছি। হ্যাঁ আমি চরিত্রহীন, আমি পাষণ্ড, আমি পাপী। চরিত্রবান যদি আপনাদের মতন হয় তবে আমি চরিত্রহীন হবো। বার বার, হাজারবার। আমি রানি কামিনীকাঞ্চন যেই জীবন ভোগ করেছি সেই জীবন কোনো নারীকে আমি ভোগ করতে দিবো না। কখনোই না। আজ আমার প্রতিজ্ঞা রইল এটা। সকলের সামনে। কোথাও, কেউ নারীদের এক বিন্দু আঘাত দিবে তার দশগুণ আঘাত তাকে ফেরত পেতে হবে। চরিত্রহনন করে পুরুষ যদি পুণ্যবান হতে পারে তবে এই পুণ্যের উপর আমার থুতু রইল মহামহিম, নরেশ।”
রানির চোখের তেজ যেন সমস্ত লোক সমাজকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে লাগলো। নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গিয়েছে চারপাশ। মানুষ যেন কথা বলতেই ভুলে গিয়েছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে হ্যাব্রো তার উদ্যমী স্বরে চিৎকার করে বলল,
“জয় রানি কামিনীকাঞ্চনের জয়। জয় রানি কামিনীকাঞ্চনের জয়।”
হ্যাব্রোর সাথে সাথে পুরো উদ্যাম ফেটে পড়ল একই বাক্যে, একই সুরে। ঘৃণার বদলে রানির নামে সেই উদ্যানেই লিখা হলো প্রেম, শ্রদ্ধা, সম্মান।
রানি কারো কাছে কোনো আশা রাখেননি। তিনি নিজেকে মনে মনে এতটাই শক্ত করেছিলেন যে তার এই অতীতের ব্যাখ্যা শুনে কেউ যদি তাকে তাচ্ছিল্য করে কিংবা ঘৃণাে চোখে দেখে তবে সেটা এই পৃথিবীর বিরাট অনিয়ম হিসেবে ধরে নিবে। পৃথিবীর লোকেরা যে অনিয়মই জানে।
কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে স্রোতের মানুষ ঢলে পড়ল প্রশংসায়, জয় জয়কারে।
রানি কিছুটা এগিয়ে গেলেন। পণ্ডিত নরেশের একদম নিকটে। এরপর খুবই ধীরে, প্রায় ফিসফিসিয়ে বললেন,
“কেমন লাগছে এই জয়ের প্রতিধ্বনি? পণ্ডিত হয়েও মূর্খের মতন হওয়া এই হারকে কেমন উদযাপন করছেন? না-কি আপনাকে আরও কিছু বলব উদযাপনের জন্য? কোনটা বলি বলেন তো? লাল রঙের মহেলের, দ্বিতীয় সারির ষষ্ঠ কক্ষটিতে একটি অর্ধ-উলঙ্গ নারী বক্ষে চুম্বন করার দৃশ্যটাও বর্ণনা করব কি? নারী, নারী, নারী বলে দুচ্ছাই করা পণ্ডিত নরেশ নিশিতে নারীর দেহকেই জড়িয়ে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে, সে কথাটি লোকে জানলে কেমন হবে? নারীরা চরিত্রহীন বলে বলে যে মানুষটা মুখে গঙ্গাজল ছেঁটায়, সে-ই যে চরিত্রহীন নারীর সাথে উষ্ণ আলিঙ্গনে মেতে থাকে এই কথাটিও কি বলবো? বলি? কেমন শোনাবে বলুন তো আপনার এই লীলার গল্প? দেখি লোকে তখন কাকে চরিত্রহীন বলে। আমাকে না আপনাকে…”
কথা শেষ করেই ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলেন রানি। চোখগুলোতে তার দুষ্টু চাহুনি। নরেশ পণ্ডিতের মুখ হতবিহ্বল। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। কী হবে তার ভেতরের কথা যদি লোক জানাজানি হয়ে যায়! সম্মান পাবেন কি আদৌ?
বড়ো বড়ো স্থানে তার কত বড়ো বড়ো নাম। তার কথাতে কত রাজা ওঠবস করেন। তারা এসব জানলে আর তাকে মান্য করবে? নিজের অস্তিত্ব ভয়ঙ্কর বিপদে অবস্থান করছে দেখেই নরেশ পণ্ডিত সেই স্থান ত্যাগ করল। রাজমাতা প্রাচী একবার পিছু ডাকতে নিলেও লিলির তীব্র নিষেধাজ্ঞায় তাকে থেমে যেতে হলো। একে একে সমস্ত পণ্ডিতই প্রায় চলে গেলেন। তারা জানেন রানি এখানে ঠিক কিন্তু তাদের মাথায় বসা গুরু যেখানে নেই সেখানে তারাও বা থাকে কেমন করে?
রাজমাতা নিজের হাতে চেপে থাকা লিলির হাতটি চরম ক্রোধ নিয়ে ঝেরে ফেলে দিলেন। তীব্র কণ্ঠে বললেন,
“আমায় আটকালে কেন? এখন এই যজ্ঞ হবে কীভাবে? রাজার আত্মির শান্তি কামনা করবো কীভাবে?”
“আমি করব যজ্ঞ।” রানি কামিনীর আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বরে রাজমাতা রীতিমতো চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালেন। মামীশ্রী বাঁধ সাধলেন সেই প্রস্তাবে,
“কিন্তু নারীরা কি যজ্ঞ করতে পারে?”
“পারে। অবশ্যই পারে। নারীদেরকে যদি দেবীদের আসন দেওয়া হয়ে থাকে তার মানে নারীরা কত উঁচুতে? তাদের সবকিছুতে অধিকার তাহলে সবার আগে।”
“তাই বলে সামান্য নারী কিনা করবে যজ্ঞ?” তাচ্ছিল্য ভরা বাক্য ছুঁড়ে মারলেন রাজমাতা।
“স্বামী যুদ্ধে গেলে স্ত্রী তাকে বিদায় না দিলে সেই স্বামীর অকল্যাণ হয়। শাস্ত্রে বলা আছে, যে স্থানে নারীরা পূজিত হয় সে স্থানে দেবতারা বিরাজমান থাকে। আর যে স্থানে নারীরা পূজিত হন না সে স্থানে সমস্ত শুভ কর্মই নিস্ফল। যেখানে শাস্ত্র নারীকে এত বড়ো স্থান দিয়েছে সেখানে আমি সাধারণ একটি যজ্ঞ করতে পারব না? রাজমাতা প্রাচী, আপনি নিজেকে সারাটি জীবন সামান্য নারী ভেবেই এলেন। অসামান্য মানুষ ভাবতে আর পারলেন না। করুণা আপনার ভাবনায়। নিজের প্রতি নিজেই বোধহয় সবচেয়ে বেশি অন্যায় করলেন! সদা স্মরণ রাখবেন— সমগ্র পুরুষ সমাজ তখনই আমাদের মূল্যায়ন করবে যখন আমরা নিজেরা নিজেদেরকে সেই আসনে বসাতে পারব। নয়তো সারাজীবন সামান্যই থেকে যেতে হবে। সামান্য নারীরা হয় না, রাজমাতা। সামান্য হয় ভাবনারা।”
রানির কথায় সে কী এক অনন্য জ্যোতি! পবিত্র কোনো মহাশক্তি যেন তাকে সমস্ত আশীর্বাদ ঢেলে দিয়েছে।
রাজমাতা হয়তো আরও কিছু বলতেন। কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়েছে হেমলকের পায়ের গতি। সে হেঁটে গিয়ে মুষ্টিমেয় করল রানির ডানহাতটি। গর্বে যেন তার বুক ভরে উঠেছে। ঠোঁটে সেই গর্বিত হাসি চাপিয়ে বলল,
“আমার স্ত্রী'র যজ্ঞে সহযাত্রী হবো আমিও। আমার স্ত্রী সামান্য নয়, সে অনন্য। সে সূর্যের মতনই তেজস্বীনি, চন্দ্রের মতন উজ্জ্বল, সে নদীর মতনই স্রোতস্বিনী, সে অম্বরের মতনই চঞ্চল। আমার পিতার আত্মা এরচেয়ে শান্তি আর কোথাও পাবেন না। আমার সাম্রাজ্যের দেবী আজ তার শান্তির আহ্বান করবে। এরচেয়ে সুখের আর কী হতে পারে? নারীশক্তি না থাকলে পুরুষও পরিপূর্ণ পুরুষ হতে পারে না, রাজমাতা। আপনি দেখুন। আমাদের রাজ্যের রানি আপনাকে জ্ঞানচক্ষু দান করেছে। দেখুন রাজমাতা এই ধরণীতে নারী সবচেয়ে জ্যোতির্ময়ী। তাদের গায়ে কলঙ্ক লাগানো যায় না। তাদের গায়ের কলঙ্ক পুরুষ জাতিরই তো লজ্জার। কারণ তারা সূর্যের আলো নিয়ে কথা বলছে সামান্য জোনাকিপোকা হয়ে!”
সূর্য হেলে পড়ল আকাশের কোলে। রাজ্যবাসী বিস্ময় নিয়ে দেখলো কেমন জ্বলন্ত চোখ, ঠোঁটে হাসি নিয়ে একটি নারী যজ্ঞ করছে। এমন চিত্র এর আগে কেউ কখনো দেখেনি৷ রানির এমন দাপটে ধরণী কাঁপলো। এমন সাহসে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দ্বিধান্বিত হলো নিজেদের শক্তি হারানোর ভয়ে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………