সকল নিয়ম-অনিয়মের উর্ধ্বে হাঁটা জীবন সবসময় আলোচিত-সমালোচিত হয়েই থাকে। রানি কামিনীকাঞ্চনের ক্ষেত্রেও সেই নীতির অন্যথা হলো না।
সবচেয়ে বিখ্যাত পণ্ডিত নরেশকে ভরা সভায় যেই নারীটি প্রত্যাখ্যান করেছেন তার কথা ছড়িয়ে গেলো রাজ্য থেকে রাজ্যে। যারা জানতেন না এ্যাজেলিয়া রাজ্য নামের একটি রাজ্য রয়েছে এবং সেই রাজ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত রানিটির রাজত্ব রয়েছে তারাও চিনতে আরম্ভ করলেন রানিকে। তা-ও এই ঘটনাগুলোর জের ধরেই।
হেমলক গতকালের বিশেষ রাত্রিটির কথা ভেবে সকাল থেকেই ভীষণ উত্তেজিত ছিলো। তার আনন্দভরা মুখটির সুখী ভাব স্পষ্টই। যেন কোনো একটি রাজ্য জয় করে ফেলেছে সে যুদ্ধবিহীন। কেবল ভালোবেসে। আবার মনের ভেতর কিছুটা ভয়ও ছিলো। রানি তো নেশায় মত্ত ছিলেন, তিনি যদি হেমলককে ভুল বুঝেন! তিনি যদি হেমলককে বলে উঠেন, হেমলক তার সুযোগ নিয়েছে? তবে, তবে হেমলক সেই লজ্জা লুকানোর আর জায়গা পাবে কোথাও? সে যে সুযোগ নেয়নি, কেবল ভালোবাসা দিয়ে রানির সমস্ত যন্ত্রণা লাঘব করার চেষ্টা করেছে এতটুকু কথা কি সে রানিকে বুঝাতে পারবে?
ভয়, সংকোচ, দ্বিধা, আনন্দ… এই সমস্ত অনুভূতি যখন হেমলককে জেঁকে ধরেছিলো তখনই তার রানির সাথে দেখা হয়। রানি সদ্য রাজ বৈঠকখানা ছেড়ে সকালের খাবার খেতে এসেছেন। হেমলক রানির পছন্দের অনেককিছুই নিজে দাঁড়িয়ে থেকে প্রস্তুত করিয়েছে। খাবারের স্থানটি পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে যথারীতি রাজমাতা, রাজকন্যা, মামীশ্রী, পিতামহসহ আরও বিশেষ পরিচিত আত্মীয় স্বজন দিয়ে। রানির আসারই অপেক্ষা করছিলো সকলে।
রানি এলেন খুবই ব্যস্ত পায়ে। যেন তার রাজ্যের তাড়া। তিনি আসতেই সকলে তাকে সুপ্রভাত জানালো যথারীতি অন্যান্য দিনের মতনই। মৃদু ভেজা চুলের উপর রানির রাজমুকুটটি তার সৌন্দর্যের শোভা কেমন করে যেন আরও বৃদ্ধি করছে। সূর্যের আলো এসে বসেছে মুকুটের চূড়ায়। হেমলকের রানির সাথে চোখ মেলাতে অস্বস্তি হচ্ছিলো। কিন্তু পরক্ষণেই রানির স্বাভাবিক আচরণ তার সেই অস্বস্তি কমাতে আরম্ভ করল ধীরে ধীরে। সে মনে মনে শান্তি পেলো। যাক, সে যে বোকা বোকা ভাবনাগুলো নিয়ে ব্যস্ত ছিলো তা রানির ভাবনারও আশেপাশে নেই।
রানি খাবারের স্থানে মহা আয়োজনে একটিবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। নিজের সকল পছন্দের খাবার সেখানে উপস্থিত দেখে বুঝে নিলেন কার পরিচালনাতে আজ এত আয়োজন হয়েছে। কিন্তু তার অভিব্যক্তি ভেতরের সেই বুঝতে পারা মোটেও প্রকাশ করল না। বরং বেশ স্বাভাবিক ভাবেই তিনি খেতে আরম্ভ করলেন।
রানির সাথে সাথে খাবার তুলেছে সকলে। ভয়ে কেউ খেতে বসে টু শব্দও করছে না পাছে রানি যদি রেগে যান!
এই বিস্তর নীরবতা ছেদ করলেন স্বয়ং রানিই। পিতামহের দিকে তাকিয়ে খুব সাধারণ ভাবেই জিজ্ঞেস করলেন,
“এই রাজ্যে কোনো নিষিদ্ধ কুটির ছিলো? আর রাজপ্রাসাদে কখনো বাইজি কক্ষ ছিলো স্থায়ী?”
সকলে যেহেতু খাবারে ব্যস্ত ছিল তাই আচমকা অনাকাঙ্ক্ষিত কথায় সকলেরই ধ্যান রানির মুখের উপর পড়ল।
রাজমাতা প্রাচী ভ্রু কুঁচকালেন। পিতামহ রানির মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়ালেন,
“ছিলো।”
“আচ্ছা! হেমলকের পিতাশ্রীর জন্য কি সেই কক্ষের ব্যবস্থা ছিলো না আপনার জন্য?”
খুব অকপটেই জিজ্ঞেস করলেন রানি। লজ্জাসংকোচহীন ভাবে। যেন নিজের শ্বশুরের বিষয়ে এমন প্রশ্ন করা যায় অবলীলায়।
রানি সহজে প্রশ্নটি করলেও সহজে সেই প্রশ্ন সকলে হজম করতে পারল না। একেক আত্মীয় একেকজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে শুরু করে দিলেন। কস্মিনকালেও তারা বোধহয় এমন নির্লজ্জ নারী দেখেননি যে নিজের খুড়োশ্বশুরকে অবলীলায় এমন প্রশ্ন করতে পারে।
রাজমাতা সেই আলোচনায় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন, “আহা, হচ্ছে কী এসব? আপনি ভুলে যাচ্ছেন আপনি পিতামহের সাথে কথা বলছেন, রানি কামিনীকাঞ্চন। উনি আপনাদের কাছে পিতার মতনই শ্রদ্ধার। কেমন করে এসব প্রশ্ন করছেন?”
“পিতার মতন উনি আমার কাছে শ্রদ্ধার নয়। পিতার চেয়ে বেশিই শ্রদ্ধার। তাই খুব সহজে, বিশ্বাসযোগ্যতা পাওয়া যায় উনার কথাতে। এবং সেজন্যই উনাকে জিজ্ঞেস করেছি। নয়তো মিথ্যে শোনার ইচ্ছে থাকলে তো আপনাকেই জিজ্ঞেস করতে পারতাম, তাই না?”
প্রথম কথাটুকু খুব গম্ভীর ভাবে বললেও শেষের কথাটি বলতে বলতে রানির হাসি এসে পড়ল। রাজমাতা নিশ্চয় এবার জ্বলে উঠবেন আপন বেগে।
এবং রানির ভাবনা সঠিক প্রমাণ হলো। সত্যি সত্যি রাজমাতা রেগে গেলেন, “মানে! কী বুঝাতে চাইলেন? আমি মিথ্যে বলি?”
হেমলকের হাসি এলেও সে গিলে নিলো সেটা। তার রানিটিকে নিয়ে সে আর পারে না। মেয়েটা যে কী চায়! হুটহাট এমন মুখের উপর কথা বলে একেকজনকে জব্দ করে ফেলে! কাউকে মারতে হয় না সবসময়। ওর জিভ দিয়েই অর্ধেক কাজ করে ফেলে।
রাজমাতা প্রাচী উপস্থিত সকলের দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে নিলেন। সকলেই তাকে নিয়ে চাপা হাসছে। একেকটা কেমন নিমকহারাম! সারাজীবন তিনি সবাইকে আয়েসি জীবন দিলেন এখন এরাই নাকি তাকে নিয়ে মজা করছে! রানি কামিনীকাঞ্চন এই একটা বিষয় ঠিকই বলেছিলেন, আত্মীয় পোষার চেয়ে জন্তু পোষা ভালো। মনে মনে রাজমাতা রেগেমেগে গেলেন আরও।
“হেমলকের পিতা মানে আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা কখনো নারীর এসব ছলাকলায় আগ্রহী ছিলেন না।”
“তবে? বাইজি কক্ষের আয়োজন কার জন্য ছিলো?”
“হেমলকের মাতার জন্য- রানি উপমাকিশোরীর জন্য। উনি এসব বিষয়ে শৌখিন ছিলেন। উনার মনোরঞ্জনের জন্যই আমার ভ্রাতা বাইজি কক্ষের বন্দোবস্ত করে ছিলেন প্রাসাদে।” পিতামহ খাবার খেতে খেতে বললেন।
রানির হাত থেমে গেল। চোখ উঠিয়ে সরাসরি তাকালেন পিতামহের দিকে। ভেতর ভেতর তিনি ভীষণ চমকে গিয়েছেন। হেমলকের মাতার এমন শৌখিনতা! সে ব্যতীত কখনো কোনো নারীর এমন শৌখিনতা ছিলো বলে তার মনে হতো না। তারই সমস্ত কিছু ভিন্ন ছিলো। শখও ছিলো ভিন্ন। বাইজি নৃত্য উদযাপন করাও তার শখের একটি ছিলো। কিন্তু তিনি নিজের মতন আরেকজন ছিলো জানতেই চমকে উঠেছেন। কৌতূহলী হয়ে গিয়েছে তার মন। হেমলকের মাতা তাহলে সাধারণ চরিত্রের রানি ছিলেন না। ভিন্ন কেউই ছিলেন।
তার কৌতূহল বাড়ল আরও, “উনার এমন শখ ছিলো!”
“তা নয় তো কী? উনি ঘোড়া প্রতিযোগিতা হতে শুরু করে তীর নিক্ষেপ, তলোয়ার চালানো, অঙ্কন হতে গান সবকিছুতেই ছিলেন পারদর্শী। এমন নারী এবং রানির খোঁজ পাওয়া তো অসম্ভবই ছিলো। আপনাকে দেখার পর মনে হলো, না, পৃথিবীতে এমন নারী দ্বিতীয় আরেকজন আছে।”
পিতামহের কথা থামতেই রানি হেমলকের দিকে ধীরে তাকালেন। হেমলক মনোযোগ দিয়ে খাবারের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ তুলছে না। চোখ তুলে একটিবার দেখছে না এমনকি নিজের মাতার প্রসঙ্গ আসতেও মুখ খুলে একটি শব্দমাত্র বলছে না।
এই আলোচনা রাজমাতার মনে খচখচানিটা আরও বাড়ালো। তিনি প্রসঙ্গটিকে অন্য মোড়ে নিতেই তাচ্ছিল্য করে বললেন,
“একদম ঠিক। উনাদের দু'জনের মাঝে ভীষণ মিল। হেমলকের মাতারেও শেষমেশ চরিত্রের ত্রুটি প্রকাশ পেয়েছিলো। আর রানি কামিনীরও…”
রাজমাতার কথা সমাপ্ত হওয়ার আগেই সশব্দে জলের পাত্রটিতে ছুঁড়ে ফেলল হেমলক। দাঁড়িয়েও গেলো। তার চোখগুলো হঠাৎ ঈষৎ লাল দেখাচ্ছে। মুখের রগগুলো টান টান। অনেকটা রাগান্বিত স্বরেই বলল,
“আমার মাতার চরিত্র নিয়ে আপনাকে বলতে হবে না। আমি আর ছোটোটি নেই সেটা মাথাতে রাখবেন। মাতা সম্পর্কে আর একটি কথা শুনলে এর ফল খারাপ হবে। আর আমার স্ত্রীর নাম ঐ জিভে উচ্চারণ করার দুঃসাহসও করবেন না।"
রাজমাতা চুপ করে গেলেন। খাবার ছেড়ে উঠে গেলেন পিতামহও। দু'জনেই বেরিয়ে গেলো। একে একে উঠল সকলেই। যেই মুহূর্তে রাজমাতা উঠতে নিবেন ঠিক তখনই রানি আপনমনে বলে উঠলেন,
“চরিত্রহীন ছিলেন সত্যিই? নাকি আমার মতন একই দশা আপনারা তার সাথেও ঘটিয়ে ছিলেন? আমি ঠিক সবটাই বের করব। এবং যদি এমন কিছু সত্যিই ঘটে থাকে তবে আপনার ভ্রাতার চেয়েও খারাপ ফল আপনার হবে।”
—————
হেমলকের চিত্র অঙ্কনের কক্ষটি বৃহৎ। সেখানে প্রবেশের অনুমতি কারো নেই একমাত্র রানি ব্যতীত। সকালের খাবারের কক্ষের ঘটনাগুলো রানির মস্তিষ্কে বার বার ঘুরে-ফিরে আসছিলো। এত কথোপকথনের ভেতর হেমলক কেন একটি কথাও বলল না? শেষমেশ এতটা রেগেও গেলে কেন? হেমলকের মাতা রানি উপমাকিশোরীর সম্পর্কে জানার জন্য রানি কামিনীকাঞ্চনের মন বড়ো উতলা হয়ে উঠছিলো। তাই তিনি ঠিক করলেন হেমলকের থেকেই যা জানার জানবেন। তার মনে অনেক অনেক প্রশ্নরা ঘুরছে।
এই যে হেমলক তাকে এত ভালোবাসে তা কি এমনি এমনি? নাকি নিজের মায়ের কোনো ছাপ তার ভেতর খুঁজে পেয়েছিলো বলেই বাসে? হেমলকের মাতার সাথে এমন কী ঘটেছিলো? কোথায় বা তিনি? আছেন কেমন? জীবিত আছেন কি? রানির ঠিক মনে পড়ছে না হেমলকের মাতার মৃত্যু নিয়ে কিছু শুনেছেন কি-না। যদি না শুনে থাকেন, তার মানে তো সেই নারীটি জীবিত আছেন। তবে কোথায় তিনি?
এই এত এত প্রশ্নের ফয়সালা খুঁজতেই রানি হেমলকের চিত্র অঙ্কনের কক্ষটিতে প্রবেশ করলেন।
বিরাট একটি কক্ষ। এর আগে তিনি কখনো এখানটাতে তেমন আসেননি। এক দু'বার এলেও ততটা খেয়াল করেননি। আজ তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবটা খেয়াল করতে লাগলেন। কক্ষটিতে একটি জানালা রয়েছে। তবে সেটা কিছুটা উপরে এবং বেশ বাঁকানো। সূর্যের আলো সহজেই এখান দিয়ে বেঁকে কক্ষের মাঝামাঝি যেন পড়ে সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে। এবং রানি অদ্ভুত ভাবে খেয়াল করলেন কক্ষটির উপরের দিকে স্বচ্ছ কাঁচের আবরণ। বিস্তর আকাশ দেখা যাচ্ছি সেই কাঁচের আস্তর ভেদ করে। তিনি এই বিস্ময়কর জিনিসটি আগে কখনোই খেয়াল করেননি। হেমলকের এই কক্ষের নকশা পুরোপুরিই ভিন্ন এবং নিপুণতার সঙ্গে বানানো। কোনো খুঁত নেই, কোনো সাধারণত্ব নেই। সবকিছুই অদ্ভুত এবং অন্যরকম। ফুল রাখার জন্য যেই ফুলদানিটি রয়েছে সেটিও রূপোর তৈরি। মেঝেটা পুরোপুরি কালো, চকচকে। প্রতিটা জিনিস ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ভেবে এরপর সৃষ্টি করা হয়েছে তা নিখুঁত ভাবে খেয়াল করলেই চোখে পড়ছে।
“কী ব্যাপার! আমার কক্ষে যে আজ?” বলতে বলতে ভেতরে প্রবেশ করল হেমলক। তার চোখ-মুখ আগের মতনই শান্ত। সকালের সেই কথোপকথনের প্রভাব নেই কোথাও।
রানি কক্ষের প্রতিটা কোনা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে করতে শুধালেন,
“এই পুরো কক্ষের নকশা কাকে দিয়ে করিয়েছেন?”
হেমলক কাঠের কেদারাটা তুলে এনে রানির কাছে রাখলো। হাত ধরে রানিকে কেদারায় বসিয়ে দিলো। রানির দিকে একটু ঝুঁকে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেন? সুন্দর হয়নি?”
“বেশ ভালো হয়েছে। বললেন না তো কাকে দিয়ে করিয়েছেন?”
“তোমার কী মনে হয়?”
“আমার মনে হয় আপনার করা নকশাতেই এটি তৈরি হয়েছে তাই না?”
ঝুঁকে থাকা হেমলক রানির বুদ্ধিমত্তায় বেশ অবাক হলো। রানি ততক্ষণে তার দিকে ফিরে তাকিয়েছেন। চোখে চোখ পড়েছে দু'জনেরই।
“বুঝলে কী করে?” কিছুটা অবাকই হয়ে জিজ্ঞেস করল সে।
রানি এ পর্যায়ে কিঞ্চিৎ হাসলেন। বললেন, “আপনার ভেতর এই একটি বিশেষত্ব আছে যে আপনার চিত্র ও নকশার এতটাই আলাদা গুণ যে পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তেও সেটি থাকলে বুঝতে পারব যে এটি আপনার তৈরি।”
রানির মসৃণ মুখটির সামনে আসা চুলটিকে দুদণ্ড থাকতে দিলো না হেমলক। ফু দিয়ে উড়িয়ে দিতে দিতে বলল,
“আমায় তুমি এত গভীর ভাবে চিনে নিয়েছো দেখছি!”
“আপনাকে নয়, বলুন আপনার কলাকে। শিল্পীকে চেনার সাধ্য লোকেদের নেই। শৈল্পিকতাকে চেনা যায় বড়োজোর। শিল্পীরা হয় ইচ্ছের কান্ডারি। যতটুকু দেখায় অতটুকু কেবল এক অংশ মাত্র, বাকিটা থাকে লুকোচুরি।”
“তার মানে আমি এক অংশ দেখিয়েছি?” প্রশ্নের তালে তালে ডান ভ্রুটি উঁচু করে হেমলক।
রানি ঠোঁটে হাসি রেখেই মাথা নাড়েন, “হয়তো। আবার এক অংশের চেয়ে কমও হতে পারে। চিত্রশিল্পী হেমলক, পৃথিবীতে সবাইকে বিশ্বাস করা যায় একমাত্র..”
“একমাত্র পুরুষ ব্যতীত। তাই তো?” রানির মুখের কথা ছিনিয়ে নেয় হেমলক।
রানি ডানে-বামে মাথা নাড়ান, “না, পুরুষ নয়। একমাত্র মিষ্টিভাষী হাস্যোজ্জ্বল নারী ও শিল্পী ব্যতীত। মিষ্টিভাষী নারীরা হলো ছলাকলায় পারদর্শী। কখন, কাকে, কীভাবে ভোলাতে হবে তা তাদের এক হাতের ব্যাপার। হাসি দিয়ে সেই নারীরা সব বশে আনতে পারে। সব। আর দ্বিতীয় হলো শিল্পী। সে গীতিকার, গ্রন্থকার আর চিত্রশিল্পী… যে-ই হোক না কেন। তাদের বিশ্বাস করতে নেই। গীতিকার হাসতে হাসতে বিচ্ছেদ গাইতে পারেন, গ্রন্থকার সুখী জীবনে থেকেও কলমে দুঃখ লিখতে পারেন আর চিত্রশিল্পী সহজ জীবনে থেকেও জটিল উপস্থাপন করতে পারেন। তারা যতটুকু দেখায় তা খোলশমাত্র। যা দেখায় না সেটাই তাদের জীবন। যেটার খোঁজ সাধারণ মানুষ সহজে পান না কখনোই।”
হেমলক রানির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল এক ধ্যানে। রানি যে তাকে ইঙ্গিত করেই কথাগুলো বলছেন তা বুঝতে তার সময় লাগেনি। হেমলক তবুও কিছু মনে করল না। হাসল কেবল। রানি তার সাথে সহজ হয়ে গিয়েছে এটা খেয়াল হতেই তার ভীষণ আনন্দ লাগতে আরম্ভ করল।
তাদের এই একান্ত কথোপকথনের মাঝেই বাহির থেকে প্রহরীর কণ্ঠ পাওয়া গেলো। বিক্ষিপ্ত কণ্ঠে প্রহরীরা বলছে,
“রাজা হ্যাভেনের মুখ থেকে অনর্গল রক্ত বের হচ্ছে। রাজবৈদ্যকে সংবাদ পাঠাতে বলেছেন রাজামাতা।”
সেই তীক্ষ্ণ বাক্য রানির কর্ণগোচর হতেই তিনি চমকে উঠলেন। কেদারা ছেড়ে দাঁড়াতে নিলেই খেয়াল করলেন হেমলক তার বাহু ধরে রেখেছে শক্ত করে। চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।
রানি বুঝে উঠার আগেই সে রানির কানে ফিসফিসিয়ে বলল,
“হ্যাভেনের জন্য এখনও এত মায়া? তুমি তো সব জানো, এটা কি জানো, একজন পুরুষের জন্য পৃথিবীতে সবচেয়ে কষ্টকর জিনিস কোনটি? তার সঙ্গিনীর চোখে অন্য পুরুষের জন্য বিচলন দেখা, মায়া দেখা। ওখানেই পুরুষ মরে যায় বেদনায়। জানো কি তুমি তা? বুঝো কি?”
বলতে বলতে হেমলকের কণ্ঠ শক্ত হয়ে আসে।
রানি ওকে কিছুটা ঠেলেই সরিয়ে দেন। হুটহাট হেমলককে তিনি চিনতে পারেন না। কেমন যেন অদ্ভুত মানুষ হয়ে ওঠে সে।
কেদারা থেকে উঠে রানি কিছুটা ছুটেই যান হ্যাভেনের কক্ষের দিকে। কক্ষের দরজায় দাঁড়াতেই রাজমাতার তীব্র আর্তনাদ তার কানে ভেসে আসে,
“আমার পুত্র, আমার চোখের মণির কী হলো! এমন সাদা হয়ে যাচ্ছে কেন ওর শরীর? রাজবৈদ্য দেখুন না। দেখুন।”
রাজবৈদ্যর হাত স্থির। চোখ-মুখ স্তম্ভিত। বাতাসেই যেন ভেসে বেড়াতে লাগলো হ্যাভেনের চির ছুটির ঘ্রাণ।
·
·
·
চলবে……………………………………………………