কামিনী - পর্ব ৭০ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          রাজপ্রাসাদের এক খন্ড মানুষ যখন স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ঠিক তখনই রানিকে দেখালো নির্লিপ্ত। তার এত বড়ো সত্যিটি সামনে আসার পরেও তার ভেতর ভাবাবেগ দেখা গেলো না। তিনি যেন জানতেন এমন কোনো একদিন তাকে এই সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। 
 রাজমাতা প্রাচী অচিরেই ধ্যান ভেঙে হাসলেন। কিন্তু তা গোপনেই। তার কাছে যেন আকাশের চাঁদ এসে পড়েছে। এত মোক্ষম একটি অস্ত্র তার হাতে এসে গিয়েছে যে আনন্দের আর সীমা পেলেন না। আগ্রহী কণ্ঠে তিনি বললেন,
“রানি পূর্বে আরেকটি বিবাহ করেছিলেন সে কথাটি তো আমাদের অবগতই করেননি।”

 “করবে কীভাবে? লজ্জা বলতেও তো বস্তু আছে। কোন মুখে বলবে ও এগুলো?”
পণ্ডিতের চোখে-মুখে অতীতের রাগটি বেশ জ্বলজ্বল করছে। তার কথাতেই হেলা, অশ্রদ্ধার আভাস আছে। হ্যাব্রোর সেই অশ্রদ্ধা সইলো না। সে ক্রোধান্বিত স্বরে বলে উঠল, 
“মুখ সামলে কথা বলুন। আপনার সামনে দাঁড়ানো মানুষটি দুই দু'টি রাজ্যের রানি। তাই তাকে কোন সম্বোধনে বলা উচিত ভেবে বলুন।”

পণ্ডিত নরেশ খ্যাপে উঠল আরও, “চুপ করো তুমি। আমাকে বলবে আমি কীভাবে কথা বলবো? এত বড়ো দুঃসাহস তোমার? সামান্য সেনাপতি হয়ে এত কথা!”

 “পণ্ডিতমশাই, আপনার কথা আমার সঙ্গে তাই আমার সাথেই বলুন। আমার সেনাপতিকে টানবেন না সেসব কথাতে।”
রানির শান্ত, শীতল স্বর। চোখের ইশারায় তিনি হ্যাব্রোকেও থামতে বললেন। 

 পণ্ডিতমশাই এবার আর ক্রোধ সংবরণ করতে পারল না, “তোমার মতন নারীর সাথে আমার কথা বলতেও বাঁধে। পাপিষ্ঠ নারী।”

 “বাঁধলে বলারই বা কী প্রয়োজন? যেই কর্ম করতে এসেছেন তা বলেই তো চলে যেতে পারেন!”

রাজমাতা এবার ধমকে উঠলেন রানিকে, “আপনি কার সাথে কীভাবে কথা বলছেন? আস্পর্ধা দেখে অবাক হই! উনি আমাদের রাজ পণ্ডিত। উনাকে এভাবে অসম্মান করছেন কেন?”
 রাজমাতার কথায় চোখ ছোটো ছোটো করে তাকালেন রানি। রাজমাতা যে ইচ্ছেকৃত এই বিষয়টিকে বড়ো করতে চাচ্ছেন তা আর বুঝতে বাকি নেই তার। 

এবার সমস্ত পণ্ডিত গোষ্ঠী ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। সমস্বরে সকলে হৈ-হল্লা করে বললেন,
“না না, আমরা এখানে আর এক মুহূর্ত থাকবো না। যেই শুভকাজে এমন নারী থাকবে সে কাজে আমরা থাকব না।”

  রাজমাতা আকুতি করলেন। মামীশ্রী আকুতি করলেন। 
“আপনারা চলে গেলে রাজার আত্মার যে অমঙ্গল হবে!”

পণ্ডিতেরা সেসব কথা থোড়াই তোয়াক্কা করলেন! তাদের সেই একই কথা। 
 রাজমাতা এবার আরও সুযোগ পেলেন। রানিকে দুরছাই করে বললেন, 
“যাচ্ছেন না কেন এখান থেকে? এখন কি মৃত মানুষটাকেও শান্তি দিবেন না? আমাদের শান্তি তো কেঁড়েছেনই! একটা বিবাহ করে সেই পতির প্রাণ কেঁড়ে আমার পুত্রকে ধরেছেন। আমি ভেবেই পাচ্ছি না এত লজ্জাহীন কেউ হতে পারে! ছিহ্! যান এখান থেকে।”

 “আমার স্ত্রী কোথায় যাবে, রাজমাতা?” 
ভরাট, পুরুষালি স্বর। পরিচিত কণ্ঠের মালিককে চেনে সকলেই। রাজমাতা চোখ ফিরিয়ে দেখলেন হেমলক পিয়ার্স এগিয়ে আসছে। হনহনিয়ে। হাঁটার তালে তার বড়ো চুলগুলো নাচছে। ঘোলাটে চোখগুলো অদ্ভুত ভাবে নিবদ্ধ তার দিকে। 
 রাজমাতার মনে মনে খুশি আর ধরল না। তিনি তো মনে মনে হেমলকেরই অভাব বোধ করছিলেন। রানির পূর্বের বিবাহের কথাটি হেমলক জানলে কেমন প্রতিক্রিয়া দিতো তা দেখার খুব সাধ ছিলো তার। কিন্তু সেই সাধ যে এত দ্রুতই পূরণ হয়ে যাবে তা তিনি বুঝতে পারেননি। আজ যেন সব তার ভাবনার বাহিরে ঘটছে। সব ঠিকঠাক এগুচ্ছে! এই রানি কম কষ্ট তাদের দেননি, আজ এই খোলা উদ্যানে সেই কষ্টের মাশুল তিনি নিবেন অপমানে। 

পুত্রকে পেয়ে রাজমাতা মায়াকান্না জুড়ে দিলেন। 
 এগিয়ে গেলেন নিজে যেচেই কিছুটা। পুত্রের পেটানো, উন্মুক্ত বাহুটিতে হাত রেখে বললেন,
“পুত্র, এ তুমি কী করলে? নিজের এত বড়ো সর্বনাশ করলে? এই রাজ্যের লজ্জা কোথায় লুকাবে বলো? তুমি কি-না শেষমেশ একটি বিধবা নারীকে বিয়ে করলে!”

 হেমলক রানির পাশটায় এসে দাঁড়িয়েছিলো। 
 মায়ের কথায় আপনা-আপনি তার কপালে ভাঁজ পড়ল। সেই ভাঁজ রাজমাতার আনন্দ বাড়িয়ে দিলো দ্বিগুণ। রাজমাতা পুনরায় নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন,
“এই নারী তার আগের পতির প্রাণনাশের কারণ নাকি ছিলো। কীভাবে এমন অমানবিক নারীকে তুমি রাজ্যে তুললে? তোমার স্ত্রীর স্থান দিলে, পুত্র? এত বোকাতো তুমি নও!”

 “আপনার পুত্র বোকা নয়। ঐ মেয়ে অত্যাধিক চতুর। ও নিজের ভুবন ভোলানো রূপে পুরুষজাতিকে বশ করে। ওর চরিত্রের গুঞ্জন সকলে জানে। একজন দুশ্চরিত্রা রানি সে।”
 পণ্ডিত নরেশ কথাটি বলে থামতেও পারল না। হুংকার ভেসে এলো তৎক্ষণাৎ। তা-ও হেমলকের দানবীয় হুংকার,
“আর একটি শব্দ আপনার মুখ থেকে বের হলে আমি আপনার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো, মহামহিম পণ্ডিত নরেশ। আপনি ভুলে যাচ্ছেন আপনি আমার রাজ্যে দাঁড়িয়ে আমার স্ত্রীকে অপমান করছেন। এই আস্পর্ধা দেখাবেন না। তাহলে প্রাণ আপনার থাকবে না।”

  হেমলকের হুংকার এত তীব্র ছিলো যে সকলেরই পায়ে কাঁপুনি দিয়ে গেলো। রাজমাতা পুত্রের এহেন আচরণে বিস্মিত না হয়ে পারলেন না। তিনি ভেবেছিলেন হেমলক বোধহয় নিজের স্ত্রীর বিষয়ে এমন কথা শুনে আশাহত হবে। ভেঙে পড়বে কিন্তু হলো কি-না বিপরীত! তাহলে কি হেমলক সব জানতো?
পণ্ডিত নরেশ থতমত খেলেন এবার। হেমলকের হুংকারে যে ভয় পেয়েছেন তা তার চোখে-মুখে স্পষ্ট। তিনি আমতা-আমতা করে বললেন,
“আমি তোমার ভালোর জন্যই বলেছি পুত্র। একজন বিধবা নারী তোমার পিতার কার্যে বসলে তোমার পিতার আত্মা আদৌ শান্তি পাবে কি?”

 “ও বিধবা নয়। ওর স্বামী আপনার সামনে উপস্থিত। ওর স্বামী আপনার সামনে জীবিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে বর্তমানে তাহলে ও কীসের বিধবা হলো? আর বিধবা হলেও বা কি? বৈধব্যতা কি অশুচি? কারো মৃত্যু কারো জন্য অশৌচতা নয় তাই না?”

“ও ওর স্বামীর প্রাণনাশের কারণ ছিলো।”

 “আপনি দেখেছিলেন তা?”

দমে এলো পণ্ডিতমশাই, “না, শুনেছিলাম।”

 “শোনা কথাকেই কারো জীবনের সর্বস্ব বানিয়ে ফেলেছেন? এই আপনার জ্ঞান? এই আপনার ভাবনা, বিচার? শোনা কথা কি সত্যি হয় সবসময়?”

হেমলকের পরপর করা প্রশ্ন পণ্ডিত নরেশের যুক্তি ছিন্ন করল। রানি কামিনী সমস্তই দাঁড়িয়ে দেখলেন। তিনি এতক্ষণ মৌন থেকেছিলেন এ জন্যই যে, কে কী বলতে পারে শেষ অব্দি তা দেখবেন। কিন্তু সবার বলা যে থামিয়ে দেবে এমন করে হেমলক তা তিনি ভাবেননি। তবে হেমলকের শেষ কথাটিকে তিনি শুধরে দিলেন,
“শোনা কথাটি সত্যিই, হেমলক পিয়ার্স। আমিই আমার প্রথম স্বামীকে মেরে ফেলেছিলাম। এটি সত্য এবং নিখাঁদ সঠিক।”

  হেমলকের ক্রোধে শরীর কাঁপছিলো। তার মনে হচ্ছিলো পণ্ডিতদের জিভ কেটে দিতে। তার রানিকে নিয়ে এমন কথা বলার সাহস তাদের কীভাবে হয়! 
কিন্তু রানির কথা তাকে ভাষাহারা করে দিলো। রানির স্বীকারোক্তি তাকে বিস্ময়ের সমুদ্রে ডুবিয়ে ফেলল। 

রানি প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকালেন। উৎসব উপলক্ষে রাজ্যের বহু সংখ্যক প্রজারা এসেছে। সবাই ই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হেমলক সন্দিহান স্বরে বলল, “কী বলছো!”

 “ঠিকই বলছি। আমার সত্যিই পূর্বে বিবাহ হয়েছিলো। এবং আমি আমার সেই স্বামীকে হত্যা করেছি। এই কথাটি চন্দ্রের মতন সত্যি। এই কথাটিতে কোনো খাঁদ নেই।”
 কথা থামিয়ে রানি প্রজাদের দিকে তাকালেন। প্রজারা শান্ত হয়ে তার মুখের দিকে তাকানো। যেন তারা জানে, তাদের রানি অকারণে কিচ্ছুটি করেন না। আর অন্যায়তো আরও আগে করেন না।

রানি এবার পণ্ডিত নরেশের দিকে তাকালেন। তার প্রজাদেরকে দেখিয়ে আত্মবিশ্বাসী স্বরে বললেন, 
“দেখুন তো, পণ্ডিতমশাই, এখানে কোনো প্রজা টু শব্দ করছে কি-না? এই যে আমি স্বীকার করলাম আমি হত্যা করেছি তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখুন তো কেউ আমাকে ঘৃণা করছে কি-না? তারাও তো আপনার মতনই শুনেছে আমার এই কাজটির কথা। কেউ আমাকে দুশ্চরিত্রা, নষ্ট নারী বলছে কিনা?”

 পণ্ডিত নরেশ উত্তর দিলেন না। দেওয়ার মতন কিছু পেলেনও না বোধহয়। রানি পুনরায় বললেন,
“তারা আপনার মতন অর্ধসত্য জেনে বিচার করে না। এখানেই আপনার ও তাদের পার্থক্য। আপনি যখন আমার স্বামীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করতে গিয়েছিলেন আমি কতটুকু ছিলাম বলুন? তেরো কিংবা চৌদ্দ বর্ষীয়া কন্যা! ভীত চোখে, গায়ে দীর্ঘ দাগ। আপনি একটিবার জিজ্ঞেস করেছিলেন আমার সাথে কী হয়েছিলো? করেননি। বরং সেদিনও আপনি একই কাজটি করেছিলেন। আমাকে এসব কথা বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন। সেদিন আমি খুব নির্মম অবস্থায় ছিলাম তাই উত্তর দিতে পারিনি। আজ যুগ পেরিয়েছে। আমি নিজেকে বুঝিয়ে ফেলেছি। আজ আপনার উত্তর দিচ্ছি। উত্তর আমার প্রজাদেরও বলছি।”

 শেষ বাক্যটি রানি সবার দিকে তাকিয়ে বললেন। 

রানি শ্বাস ফেললেন। রোদের উষ্ণ আলো তার চোখেমুখে উপচে পড়ছে। চুল গুলো ধীরে উড়ছে। 

 “আমার তখন বিবাহ সম্বন্ধে ধারণা নেই। বিবাহ কাকে বলে আমি জানতাম না। আমার পিতা, আমার পিতা আমাকে সেই অবুঝ সম্পর্কে জোর করে জড়িয়ে দিলেন। বিবাহ বুঝার আগে আমার পতিকে চিনতে হলো। দেখলাম পতি মানে ভয়ঙ্কর কোনো জন্তু। যে আমাকে খুবলে খায় সকাল, বিকাল, রাত। যে জানালো পুরুষ মানে কেবলই যৌনতা। তারা নারীকে কেবল কামের বস্তু হিসেবে দেখে। তার পালঙ্কে মনোরঞ্জন করা আমার দায়িত্ব ছিলো। তার হুটহাট শখ ছিলো আমার গায়ে গরম কাষ্ঠ চেপে ধরা। আমার পিতা কিচ্ছুটি বলেননি। কারণ তিনিও তো একই পথিক ছিলেন। ফুলের মতন ছিলাম আমি। জগত চেনার আগেই আমি পুরুষকে চিনলাম। জানলাম ওরা খুব নোংরা। নারী ওদের কাছে ভোগ্যবস্তু। নারী কখনো তাদের আপন কেউ হতে পারে না। সৌন্দর্যতা নাকি আশীর্বাদস্বরূপ, সেই সৌন্দর্যতা আমার কাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। ঘৃণা আসে বলতে আমার। আজও সেই স্মৃতি আমাকে তাড়না দেয়। যাকে কোনো পুরুষ ভালোবাসেনি। না পিতা, না স্বামী। যাকে সকলে দেখেছে তাদের কামের চোখে। সেই অতটুকু বয়সে আবিষ্কার করলাম আমার ভেতর বেড়ে উঠছে আরেকটি ভ্রূণ। নিজেই তখনও অবুঝ। কিন্তু এতটুকু জানতাম, সন্তান কী জিনিস। তাকে কতটা মায়া করতে হয়। নিজে তা পাইনি তো সেজন্য আমার মনে তখন আশার আলো জাগলো। সন্তানকে আমি মায়া করব। কিন্তু, কিন্তু… “

 রানি থেমে গেলেন। তার বুক কাঁপছে। চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে তার সব। স্বামীর মনোরঞ্জন করতে তিনি কী করেননি!
 এমনকি উলঙ্গ হয়ে নাচতেও হয়েছিলো! কী বিশ্রী সেই স্মৃতি। ঘৃণায় তার মুখ তেতো হয়ে উঠল। 
হ্যাব্রো খেয়াল করল ঠোঁট কাঁপছে রানির। চোখ গুলো সমুদ্রের মতন ভাসা ভাসা। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp