জানালার কাঠের পুরনো ফাঁক গলিয়ে দুপুরের প্রখর রোদের তীক্ষ্ণ আলোকরশ্মি এসে পড়েছে ঘরের ঠিক মাঝখানের মেঝেতে। যেখানটায় রাখা চারপায়া চৌকির মতো পুরনো একটা খাট। খাটের উপরে বিছানো রঙিন সুতোয় বোনা জালি। ওটা আর আগের মতো টানটান নেই, ঘুমন্ত গুলনূরের শরীরের ভারে মাঝখান থেকে সামান্য দেবে গেছে, ঝুলে পড়েছে মাটির দিকে।
গুলনূরের দুটো হাত পেটের কাছে গুটিয়ে তুলে রাখা। দুই হাতের কব্জিতে, কপালে সাদা ব্যান্ডেজ জড়ানো। জাওয়াদ খাটের পাশে মেঝেতে বসে আছে। হাতপাখা দিয়ে বিরতিহীনভাবে বাতাস করে যাচ্ছে।
প্রায় দুইদিন হতে চলেছে ঘুমহীন সে। মাঝেমধ্যে ঝিমোচ্ছে, চোখ দুটো জ্বালা করছে, মাথাটা চিড়বিড় করছে যন্ত্রণায়। সেইসাথে একটা ভয়ংকর অপরাধবোধ কুরে কুরে খাচ্ছে ভেতর থেকে। রাগের বশবর্তী হয়ে গুলনূরের কী অবস্থা করেছে! নাক, মুখ, হাত, পা, কপাল…শরীরের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে ক্ষত নেই।
গুলনূর তো মিথ্যা কিছুই বলেনি, যা-ই বলুক না কেন, যতই নিষ্ঠুর হোক, সত্যি কথাই বলেছে। জাওয়াদ নিজেও জানে সে বৈধ সন্তান নয়। যাকে সে সারাজীবন ধরে বাবা বলে জেনে এসেছে, যার নামে নিজের পরিচয় দিয়ে এসেছে, সে আসলে তার প্রকৃত জন্মদাতা পিতা নয়। তার আসল বাবা এমন একজন মানুষ যাকে সে ছোটবেলা থেকে দেবতার মতো পূজা করে এসেছে, যাকে সে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ মনে করত! যে মানুষটা ছিল তার দুই বাহুর সমস্ত শক্তি, তার জীবনের ভরসার একমাত্র শক্ত স্তম্ভ, যার উপস্থিতিতে পুরো দুনিয়াটা তার নিজের মনে হতো, নিরাপদ মনে হতো…সেই মানুষটাই তার সকল দুঃখের কারণ! অনেক বড় পাপী, অনেক বড় অপরাধী! একইসাথে নিজের আপন রক্তের ভাই আর ভাবিকে ঠকিয়েছে শুধুমাত্র নিজের কামনা, নিজের লালসা চরিতার্থ করার জন্য।
এই মানুষটা নাকি তার জীবনের আদর্শ ছিল, তার রোল মডেল ছিল! ভাবত, এমন সৎ, এমন নীতিবান, এমন আদর্শবান মানুষ বোধহয় এই জগতে আর দুটো খুঁজে পাওয়া যাবে না!
জাওয়াদ ঘৃণা নিয়ে বিড়বিড় করে, ‘সব মিথ্যা, সব ভণ্ডামি।’
আসল দোষ তার জন্মদাতা পিতা আর জন্মদাত্রী মাতার। অথচ সেই সত্য উচ্চারণ করার অপরাধে শাস্তি পেয়েছে কি না গুলনূর!
জাওয়াদ পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে গুলনূরের ঠোঁটের উপর। নিচের গোলাপি রঙের কোমল ঠোঁটটা ফুলে গেছে, রক্ত জমে শক্ত হয়ে আছে। পুতুলের মতো নিখুঁত, চাঁদের মতো স্নিগ্ধ মুখটায় আজ কত কলঙ্ক! কত ক্ষত।
জাওয়াদ হাত বাড়িয়ে গুলনূরের ঠোঁটের ক্ষত স্পর্শ করতে গিয়ে মাঝপথেই থমকে যায়, দ্রুত হাত গুটিয়ে নেয় নিজের দিকে। ঠোঁট ছোঁয়ার অধিকার প্রেমিক কিংবা স্বামীর হয়। সে কে গুলনূরের?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে গিয়ে বসে পড়ে দেয়ালের পাশে রাখা পুরনো কাঠের চেয়ারটায়, যার একটা পা টলমল করছে। যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে যাবে৷ টেবিলের উপরে একটা সাদা কাগজ পড়ে আছে এলোমেলোভাবে, সেটা হাত বাড়িয়ে তুলে নেয়। সেখানে ডাক্তার ফারহানার ফোন নাম্বার লেখা আছে নীল কালিতে!
ভদ্রমহিলা হঠাৎ করে এসে দরজা খুলে দিয়ে তাড়াহুড়ো করে বলেছিলেন, 'পুলিশ আসার আগেই দ্রুত এই জায়গা ছেড়ে চলে যাও। পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবে যেন কেউ দেখতে না পায়। আর এই নাও আমার নাম্বার, প্রয়োজন হলে কল করবে।’
উনার স্বামী তখন প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে, মুখ শক্ত করে দূরে দাঁড়িয়েছিলেন। মুখের ভাবভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, ভদ্রমহিলা স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে, স্বামীর মতামতকে উপেক্ষা করে কাজটা করছেন। জাওয়াদ তখন গুলনূরকে বাঁচানোর তাগিদে, কিছু না ভেবে তাৎক্ষণিকভাবে সেই বিপজ্জনক জায়গাটা ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল, কিন্তু এখন তার মনের ভেতরে কৌতূহল কাজ করছে। ভদ্রমহিলা কেন এতটা সদয়, এতটা দয়ালু হয়েছিলেন তাদের প্রতি? কেন তিনি নিজের স্বামীকে উপেক্ষা করে একজন দাগি আসামিকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করলেন?
মাথাট প্রচণ্ড ভারী লাগছে। সে দেয়ালে হেলান দিয়ে গুলনূরের দিকে তাকায়। নিজের কাছেই প্রশ্ন করে, গুলনূরের কাছ থেকে সে আসলে কী চায়? কিছু প্রশ্নের উত্তর চায়, তারপর? তারপর কী করবে সে? তারপর কি তারা দুজন দুই দিকে চলে যাবে, দুটো আলাদা পথে?
যে গুলনূর পা টিপে টিপে নমনীয়, মোহনীয় কদমে হাঁটত…দেখলে মন মুগ্ধ হয়ে যেত, চোখ সরানো যেত না। যে গুলনূরের উপস্থিতি তার হৃদয়ে সুখের ঢেউ তুলত, আনন্দের জোয়ার আনত। মনে হতো গুলনূর তার বুকের ঠিক উপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে পালকের মতো হালকা পায়ে, ভেবেই সুখ সুখ অনুভব হতো… হৃদয়ে শিহরণ জাগত। সেই গুলনূর তো আর নেই। নেই কোথাও। পুরোটাই ছিল ছদ্মবেশ।
এই গুলনূরই আসল। এইটাই সত্যি। যার আসল নাম হয়তো আরশিনু। অদ্ভুত নাম। স্বভাবে হিংস্র, আচরণে রূঢ়। হাঁটার গতি দ্রুত, কর্কশ রুঢ় গলায় কথা বলে। মুখে হাসির রেখামাত্র ফোটে না। কত বিশাল পার্থক্য এই দুটো রূপের মধ্যে, দুটো চরিত্রের মধ্যে! অথচ বাইরে থেকে দেখতে একইমানুষ, একই মুখ, একই শরীর।
আগের কোমল, নম্র, লাজুক গুলনূরের সঙ্গে সে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল।
এই, এই আরশিনুর সঙ্গে ––– পরবর্তী শব্দটা কী হবে? কোন শব্দ দিয়ে শেষ হবে অসমাপ্ত বাক্যটি?
সে যা অনুভব করেছিল, ওটা কি ছিল? শুভঙ্কর বলে, ভালোবাসা। সত্যিই ভালোবাসা ছিল? নাকি শুধুই মায়া? আসলে ভালোবাসা কেমন হয়? কীভাবে বোঝা যায়? তার অনুভূতির নাম কী? কী নাম দেবে জটিল, বিভ্রান্তিকর এই অনুভূতির?
জাওয়াদ চোখ বুজে ক্লান্তিতে। মাথা হেলিয়ে দেয় চেয়ারের পেছনে। শরীরটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। অল্পক্ষণেই তলিয়ে যায় ঘুমের রাজ্যে।
যখন জানালার ফাঁক দিয়ে আসা আলোর তীব্রতা কমে আসতে থাকে, ঘরের ভেতরটা একটু ছায়াচ্ছন্ন, একটু শীতল হয়ে উঠতে শুরু করে, ঠিক তখনই গুলনূর তার দীর্ঘ অচেতন অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে চোখ খুলে জেগে ওঠে। তীব্র ব্যথায় চিলিক দিয়ে উঠে তার পুরো শরীর।
সে উঠতে গিয়ে টের পায়, তার সারা শরীরে এক দহনকারী ব্যথা ছড়িয়ে আছে৷ শরীরের প্রতিটি কোষ চিৎকার করে উঠছে। হাতের কব্জিতে কোনো শক্তি নেই, পায়ের গোড়ালিতে এমন যন্ত্রণা যে নড়াচড়া করতে গেলেই মনে হচ্ছে আগুন জ্বলছে সেখানে। অসহায়ভাবে সে আবার শুয়ে পড়ে জালিটার উপর।
হাত তুলে দেখে তাতে সাদা ব্যান্ডেজ বাঁধা। মাথায়ও ব্যান্ডেজ জড়ানো৷ এদিক-ওদিক তাকায়, চোখ পড়ে চেয়ারে ঘুমিয়ে থাকা জাওয়াদের উপর। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসতে শুরু করে সকালের স্মৃতিগুলো। মেঝেতে পড়ে গিয়ে রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল, রক্ত ঝরছিল শরীর থেকে, উপুড় হয়ে অচেতন হয়ে পড়ে ছিল। তারপর জাওয়াদ এসেছিল, তার কণ্ঠস্বর শুনেছিল। এরপরে কিছুই মনে নেই, সব অন্ধকার।
জাওয়াদ কি তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল? জুতা মেরে গরু দান করেছে? গুলনূর বিরক্তির সাথে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকায়, যেখানে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। জানালাটা বেশ উঁচুতে তৈরি, শুধু কয়েকটা উঁচু গাছের শীর্ষভাগ দেখা যাচ্ছে, যেগুলো হালকা বাতাসে দুলছে। একটা কাক কাকা করে ডাকছে কোথাও।
জাওয়াদ এখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে, সে এখন যাই করুক না কেন জাওয়াদ কিছুই টের পাবে না। এই চিন্তাটা মাথায় আসতেই গুলনূর আবার ঘুরে তাকায় জাওয়াদের দিকে, কৌতূহলী দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে তাকে।
কেমন অদ্ভুতভাবে বেঘোরে ভঙ্গিতে ঘুমাচ্ছে! একটা হাত টেবিলের উপরে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে, আরেকটা হাত চেয়ারের পাশ দিয়ে নিচের দিকে ঝুলে আছে শিথিলভাবে। ওর হাত দুটো খুব সুন্দর। যেন চিজেল দিয়ে খোদাই করে বানানো, পেশীবহুল, শক্তিশালী, খাড়া সোজা নাক, ঘন ভ্রু…চোখের পাপড়িগুলো এতটাই ঘন, এতটাই লম্বা যে কয়েক হাত দূরত্ব থেকেও সে স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে সেগুলো। আর ঠোঁটগুলো গোলাপি…না, ঠিক গোলাপি নয়, লালচে। হুবহু জন্মদাতা পিতার মতো দেখতে, একই আকার, একই বাঁক। চোখেমুখেও বাবার মতো একধরনের তীক্ষ্ণতা আছে। দাঁড়ি না রাখাতে, সবসময় ক্লিন শেভ করে রাখে বলে দেখতে আদুরে লাগে৷ তীক্ষ্ণ ভাবটা ঠিকঠাক ফুটে না৷
ওর চেহারার সবচেয়ে আকর্ষণীয় মোহনীয় অংশ হলো লম্বা, সুগঠিত গলার ঠিক মাঝখানের উঁচু, প্রশস্ত অংশটা, যেটাকে ইংরেজিতে অ্যাডাম্স অ্যাপল বলা হয়। যখন কথা বলে তখন ওটা নড়াচড়া করে। ওই অংশটাই তার পুরো চেহারাকে একটা অন্যমাত্রা দিয়ে দিয়েছে, একটা পরিপক্ব পুরুষালি ভাব এনে দিয়েছে। কার কেমন লাগে গুলনূর জানে না, তবে সে সেই প্রথম সাক্ষাৎ থেকেই ওই উঁচু অংশটা বিশেষভাবে খেয়াল করে এসেছে, মুগ্ধ হয়ে দেখেছে। তার মনে হয় ওই অংশটার কারণেই জাওয়াদের কণ্ঠস্বর এতটা সুন্দর, ভারী এবং আকর্ষণীয়।
ক্লিন শেভ করা অবস্থায় জাওয়াদকে দেখতে যতটা কোমল, আদুরে লাগে, তার কণ্ঠস্বর ঠিক ততটাই বিপরীত। একদম নেতৃত্ব দেয়ার মতো শক্তিশালী কণ্ঠ। যদি সে দাঁড়িটা রাখত, তাহলে তার উচ্চতা আর কণ্ঠের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে গিয়ে একেবারে ইতিহাসের পাতা থেকে বেরিয়ে আসা কোনো বীর সেনানায়কের মতো হয়ে যেত।
ছি, ছি..এই মুমূর্ষু অবস্থায় বসে সে এসব কী অদ্ভুত, অপ্রাসঙ্গিক চিন্তা করছে! সুস্থ অবস্থায়ও তো এই ধরনের চিন্তা করা উচিত নয়, এগুলো তার কাজ নয়। গুলনূর তড়িঘড়ি করে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেয় জাওয়াদের মুখ থেকে।
তাকে এখনই পালাতে হবে এখান থেকে। জাওয়াদের ঘুমন্ত অবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে এভাবে মুগ্ধ হয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে না দেখে, বরং সুবর্ণ সুযোগটা বুদ্ধিমানের মতো কাজে লাগিয়ে তার এখনই পালিয়ে যাওয়া উচিত এই জায়গা থেকে, যত দ্রুত সম্ভব।
গুলনূর সমস্ত শক্তি একত্রিত করে উঠার চেষ্টা করে। প্রতিটি জয়েন্টে ব্যথা। দাঁড়ানোর মতো কোনো শক্তিই অবশিষ্ট নেই পায়ে। হাল ছাড়লে হবে না৷ সে উঠার জন্য মরিয়া হয়ে, দাঁত চেপে চেষ্টা করতে থাকে। জীবনের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে কোনোমতে উঠে বসে জালির উপর, তারপর থরথর করে কাঁপতে থাকা পায়ে ধীরে ধীরে মেঝেতে পা রাখে।
চারপায়া খাট থেকে যেই না উঠে দাঁড়াতে যায়, তখনই জরাজীর্ণ খাটটা খটখট করে ওঠে। আচমকা শব্দে জাওয়াদ চমকে উঠে চোখ খুলে।
দরজা খোলা। সেদিকে তাকিয়ে গুলনূর দৌড়ে পালিয়ে যাবার উদ্দেশ্য নিয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করে পুরো শক্তি দিয়ে, কিন্তু তার দুর্বল শরীর মোটেও সহযোগিতা করে না। শক্তি হারিয়ে আবার খাটের উপর পড়ে যায় শব্দ তুলে।
জাওয়াদ ছুটে আসে গুলনূরকে ধরতে। গুলনূর রাগে, ক্ষোভে ফোঁস করে উঠে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে ওঠে, ‘একদম ছুঁবে না আমাকে। দূর যাও।'
জাওয়াদ কারোর চিৎকার সহ্য করতে পারে না, এটা তার বড় দুর্বলতা। তৎক্ষণাৎ সে নিজের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে দ্রুতগতিতে এগিয়ে গিয়ে গুলনূরের নরম গালে এক আঙ্গুল দিয়ে গুঁতো মেরে বলে, ‘ছুঁয়েছি। কী করবে করো।'
গুলনূর স্তম্ভিত হয়ে অবিশ্বাসের চোখে তাকায় জাওয়াদের মুখের দিকে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘এটা কী করলে এইমাত্র?’
'ছুয়েছি। দেখোনি? আবার ছুঁব?’
‘আশ্চর্য! আশ্চর্য!’ বলে গুলনূর চরম বিস্ময়ে নিজের কপালে হাত রাখতে গিয়ে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে, মুখ বিকৃত হয়ে যায়। কপালের ক্ষতটা যন্ত্রণায় টনটন করছে।
জাওয়াদ নিজের মেজাজ কোনোমতে দমিয়ে, অনেকটা নরম স্বরে বলে, 'শুয়ে পড়ো। তোমার শরীর ভালো না।’
‘খবরদার, দরদ দেখাবে না। শাস্তি যা দেয়ার ছিল, দিয়েছো। এইবার অন্তত যেতে দাও?’
‘আমি কল্পনাও করিনি এমন কিছু ঘটবে। ইচ্ছে করে কিছু করিনি।’
'তবুও তো হয়েছে? হয়নি? ঘটনা তো ঘটেই গেছে? শাস্তি পাওনা ছিল, পেয়ে গেছি। শেষ মামলা। এখন তুমি তোমার পথে যাও, আমি আমার পথে যাব।’
‘আমার কোনো পথ নেই, কোনো গন্তব্যও নেই।’ কেমন শূন্য সুরে বলে জাওয়াদ। গুলনূর কথা হারিয়ে ফেলে। বিভ্রান্ত হয়ে কয়েক সেকেন্ড কোনো কথাই বলতে পারে না, নীরব হয়ে থাকে।
জাওয়াদ যখন বলপূর্বক তাকে শুইয়ে দিতে যায়, তখন চিৎকার করে বলে, ‘খবরদার, জোরজবরদস্তি করবে না? আরে...আরে…কী করছো…গায়ে হাত দিচ্ছো কেন? ভারী অসভ্য তো৷ তোমার মতো ডাকাত আমি দুটো দেখিনি।’
'হু, আমি অনন্য।'
‘কচুর অনন্য। গুন্ডা তুমি, গুন্ডা। উঁচু বংশের গুন্ডা।'
‘ঠিক আছে ভালো মানুষ, চুপচাপ শুয়ে পড়ো।’
গুলনূর পরাজয় মেনে অনুনয়ের সুরে বলে, ‘ছেড়ে দাও। আর কী শাস্তি দিতে চাও? আর কী পেলে তোমার মন ভরবে, তোমার শান্তি হবে?’
‘গুলনূর কেন, কী কারণে আমার সঙ্গে এত বড় প্রতারণা করল? টোকাই আরশিনু কেন এতগুলো মানুষ খুন করল? শুধুমাত্র এই দুটো প্রশ্নের উত্তর চাই। দিতে পারবে?’
গুলনূর চমকে তাকায় জাওয়াদের দিকে। জিজ্ঞেস করে, ‘আরশিনু! আরশিনু নামটা কোথায় শুনলে, কোথায় পেলে?’
জাওয়াদ বিকারহীন গলায় বলে, ‘পত্রিকায়।’
মুহূর্তে গুলনূরের চেহারার রং পাল্টে যায়, রক্তশূন্য হয়ে পড়ে। ফ্যাসফ্যাসে গলায় জিগ্যেস করে, ‘ছবি ছিল?’
জাওয়াদ ছোট করে বলে, ‘ছিল।’
গুলনূর অস্থির হয়ে ওঠে। সিকান্দার এখনও জীবিত। ওই শুয়োরটাকে খুন করার আগেই সারা দেশের মানুষ খুনির আসল পরিচয় জেনে গেছে, মুখ চিনে নিয়েছে! আর দেরি করা যাবে না। এখনই চলে যেতে হবে এখান থেকে। আর এক মুহূর্তও দেরি নয়। প্রয়োজনে জাওয়াদকে কয়টা ছুরির ঘা দিয়ে হলেও এখান থেকে পালিয়ে যেতে হবে।
গুলনূর তার সমস্ত ইচ্ছাশক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়ায় কোনোমতে। পা দুটো থরথর করে কাঁপছে, যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়বে। কোনোমতে সে পা বাড়ায় দরজার দিকে। জাওয়াদ দেয়ালের মতো বুক পেতে দাঁড়ায় তার সামনে। বলে, ‘দরজা অবধিও যেতে পারবে না। তোমার শরীর ভালো না।’
গুলনূর দুই হাত দিয়ে পুরো শক্তি প্রয়োগ করে জাওয়াদের চওড়া বুকে জোরে ধাক্কা দিতে গিয়ে হতাশভাবে আবিষ্কার করে, তার কব্জিতে কোনো শক্তিই নেই। মাথাটাও ঘোরাচ্ছে। কী ভয়াবহ ব্যথা ছড়িয়ে আছে সমস্ত শরীরে।
সে মিনতি করে বলে, ‘দোহাই, যেতে দাও।’
জাওয়াদ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। গুলনূর বেদনাদীর্ণ চোখে তাকায় তার দিকে। ক্ষীণ স্বরে বলে, ‘বিশ্বাস করো, খুব প্রয়োজন।’
জাওয়াদ তাকে অবাক করে দিয়ে সামনে থেকে সরে গিয়ে নিরাসক্ত সুরে বলে, ‘যাও তাহলে। চলে যাও।’
কান্তারপুর।
জুলফা জানালার পাশে রাখা নরম কেদারায় পা তুলে বসে আছে নিথর হয়ে। বাম হাতের বাহুর পেছনে ত্বকে ঔষধি পাতার সবুজাভ তরল লেপ্টে রাখা, যেখান থেকে একটানা হালকা জ্বালাপোড়ার অনুভূতি ছড়িয়ে যাচ্ছে শিরায় শিরায়। যদিও এই শারীরিক যন্ত্রণা কিছুই নয় তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণের তুলনায়।
যে ঘরটিতে নাভেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল, সেই ঘরের শ্যাওলা-ধরা দেয়ালে একটি পুরাতন কাঠের তক্তা দাঁড় করিয়ে রাখা ছিল। যেখান থেকে একটা ধারালো লোহার টুকরো বেরিয়ে এসেছিল খাঁড়া হয়ে, সাপের ফণার মতো। নাভেদ চলে যাবার পরমুহূর্তেই, বেদনায় আচ্ছন্ন হৃদয় নিয়ে জুলফা অনিচ্ছাকৃতভাবে দুই পা পিছিয়ে গিয়েছিল। আচমকা পায়ের নিচে কিছু একটা অনুভব করে ভারসাম্য হারিয়ে দ্রুত পিছিয়ে যায় সে…ঠিক সেই মুহূর্তেই বাহুর পেছনের দিকে ধারালো লোহাটা বিঁধে গিয়েছিল। বেশ গভীর ক্ষত হয়েছে সেখানে। রক্ত ঝরে গেছে প্রচুর পরিমাণে। কাউকে না ডেকে নিজেই নিজের চিকিৎসা করেছে সংগ্রহ করে রাখা ঔষধি পাতা দিয়ে। শঙ্খিনী উদ্বিগ্ন হয়ে ডাক্তার, কবিরাজ ডাকতে চেয়েছিল বারবার, কিন্তু সে চায়নি। কেন চায়নি নিজেও জানে না।
তার পরনে একটি নীল শাড়ি। ব্লাউজ পরেনি। শুধুমাত্র শাড়ি জড়িয়ে রেখেছে শরীরে আলগোছে। ব্লাউজ পরলে কাপড়ের স্পর্শ বাহুর ক্ষতস্থানে লেগে আরও বেশি যন্ত্রণা অনুভূত হয়।
ঘন, কালো, লম্বা চুলগুলো এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে পিঠজুড়ে। চোখেমুখে কোনো সাজসজ্জার চিহ্নমাত্র নেই। বড্ড ফ্যাকাশে, প্রাণহীণ দেখাচ্ছে মুখখানা।
নাভেদের ছুরির মতো ধারালো কথাগুলো বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মনের কোটরে। কী নিষ্ঠুরভাবেই না বলেছে, ‘একইসাথে দুই পুরুষের বিছানায় শোয় কারা জানেন? বেশ্যারা।’
‘স্বামীকে রেখে যখন অন্য পুরুষের বিছানায় শোন, তখন মনে ছিল না স্বামীর কথা? তখন কোথায় ছিল আপনার সতীত্ব? এখন হঠাৎ স্বামী হয়ে গেলেন তিনি? এখন সুবিধা মনে হচ্ছে স্বামীর পরিচয় দিতে? যখন দরকার তখন স্বামী, যখন দরকার তখন প্রেমিক?’
কীভাবে পেরেছে তাকে বেশ্যা বলতে? কীভাবে? জুলফার এখন নিজেকে সত্যি সত্যিই তাই মনে হচ্ছে। হয়তো সে আসলেই তা-ই। নিজের কাছেই নিজেকে নোংরা, ঘৃণ্য, কলুষিত লাগছে। জুলফা শক্ত করে ঠোঁট কামড়ে ধরে যন্ত্রণা সহ্য করার জন্য, রক্ত বেরিয়ে আসে প্রায়। পরক্ষণেই একটি বিষণ্ণ হাসি ফুটে ওঠে তার মুখে।
যে মানুষটির জন্য, যার ভালোবাসার জন্য সে চরিত্রহীনা হলো, সবকিছু ত্যাগ করল, নিজের সম্মান, মর্যাদা, সংসার সব বিসর্জন দিল, সেই মানুষটিই এখন কিনা তাকে বলছে চরিত্রহীন, বেশ্যা! এই কি তবে নাভেদের সঙ্গে তার ভবিষ্যৎ জীবনের চিত্র? প্রতিদিন এভাবেই কি তিরস্কার, অপমান, লাঞ্ছনা সহ্য করে যেতে হবে? বড় ভুল হয়ে গেল কি জীবনে?
একই সময়ে এযাবতকালে শব্দরের বলা সকল প্রেমময় কথাগুলোও কানে বাজছে অনবরত৷ শব্দর বহুবার আকুল হয়ে বলেছে, সে তাকে বিশ্বাস করে, অন্ধের মতো বিশ্বাস করে! প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে! শুধু বলেই ক্ষান্ত হয়নি, প্রমাণও করেছে বারংবার।
কিন্তু সে সেই বিশ্বাস, ভালোবাসার মান রাখতে পারেনি। বরং এমন একজন মানুষকে ভালোবেসেছে, যে তাকে সর্বোচ্চ অপমানজনক, কলঙ্কিত গালিটা দিল নির্দ্বিধায়। একটি নারীর জন্য এর থেকে বড়, এর থেকে অসম্মানজনক আর কিছু হতে পারে কি? অবশ্য সে তো যোগ্যই এসবের! সে স্বামীকে ঠকিয়েছে, বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। স্বামীর ঘরে থেকে, স্বামীর দেওয়া নিরাপত্তার ছায়ায় থেকে, স্বামীর আশ্রয়ে থেকে প্রেমিকের বুকে মাথা রেখে শুয়ে ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন দেখেছে, আকাশকুসুম রচনা করেছে।
জুলফা দুই হাত দিয়ে শক্ত করে নিজের মাথা চেপে ধরে। এ কূল আর ও কূল...দুই কূলকেই যেন নদীর প্রবল, উন্মত্ত স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে, ডুবিয়ে দিতে চাইছে অতল গহ্বরে। সে বুঝতে পারছে না, কোন কূল তার আঁকড়ে ধরা উচিত, কোন দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত। মাথাটা যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে, বিস্ফোরিত হচ্ছে হাজার টুকরোয়। শান্তি পাচ্ছে না এক দণ্ড।
আহত হরিণের মতো কেদারার উপর কাত হয়ে শুয়ে পড়ে। ভালো লাগছে না এই পৃথিবী। আর ভালো লাগছে না। বাইরে তখন বাতাস বইছে। দিন শেষ হয়ে গাঢ় অন্ধকার নেমে আসছে ধীরে ধীরে।
মানুষটা আজও ফিরল না। কোথায় হারিয়ে গেছে?
হঠাৎ কারো স্পর্শে চোখ খুলে জুলফা। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতেই পারেনি। অনেকটা রাত হয়ে গেছে। বাইরে তখন মুষলধারে বর্ষণ। চারপাশ ঘন অন্ধকারে ঢাকা! মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আকাশ চিরে, ঝলসে উঠছে পৃথিবী। এত গরম পড়েছিল যে এই বৃষ্টিটার খুব প্রয়োজন ছিল। শীতল, সতেজ হয়ে উঠেছে চারপাশের আবহাওয়া।
শব্দর হাঁটুগেড়ে বসে আছে তার সামনে। বোধহয় অনেকক্ষণ ধরে তাকে দেখছিল! চোখের সামনে শব্দরকে দেখে চমকে উঠে বসে হড়বড়িয়ে বলে, ‘এসেছেন আপনি! দুইদিন কোথায় ছিলেন? জানেন আমি কী অবস্থায় ছিলাম? কত জায়গায় খুঁজেছি! আড়তে নেই, গুদামঘরে নেই, বাজারে নেই… কান্তারপুরের অলিগলি, সবখানে লোক পাঠিয়েছি। কোথাও নেই আপনি। এভাবে কেউ উধাও হয়ে যায়? একটা খবরও না দিয়ে?’
‘আমাকে খুঁজেছ তুমি!’
‘আমিই তো খুঁজব। আর কে খুঁজবে?’
শব্দর কিছু বলে না। তার পরনে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি। পাঞ্জাবিটা খুলে রাখা পালঙ্কের উপর। সে ধীরে ধীরে উঠে জুলফার পাশে বসে। বড় জানালাটা দিয়ে বাইরে তাকায়। ঝমঝমিয়ে, ঝরঝর করে বৃষ্টি নামছে।
তার বাহুতে, পিঠে পোড়া দাগ! ভয়ংকর, বীভৎস দেখাচ্ছে ক্ষতচিহ্নগুলো। জুলফার হৃদয় হুহু করে ওঠে। বুকের ভেতরটা মুচড়ে যায় বেদনায়।
যখন থেকে শুনেছে শব্দর তাকে তিন বছর যাবৎ ভালোবাসে, লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে দেখত দূর থেকে, তার খেয়াল রাখত অলক্ষ্যে, তখন থেকেই বুকের ভেতরটায় বড্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। সেই যন্ত্রণা আরও বেড়ে যায়, তীব্র থেকে তীব্রতর হয়, যখনই ভাবে — প্রাণ বাজি রেখে তাকে আগুন থেকে রক্ষা করা শব্দরকে সে কী কৌশলেই না ঠকাচ্ছে!
নাভেদের কথাগুলো সেই বেদনার আগুনে যেন ঘি ঢেলে দিয়েছে। এমন তীব্র অনুতাপ, এমন জ্বালাময়ী অনুশোচনা তো তার গত দুই মাসে কখনো কাজ করেনি। নাভেদের সঙ্গে বেশ ভালো সময় কাটিয়েছে। সঙ্গ উপভোগ করেছে। হাসিখুশি থেকেছে, ছুটে বেরিয়েছে স্বচ্ছন্দে। পাপ-পুণ্য নিয়ে ভাবার ফুরসতই হয়নি। তবে আজ কেন এভাবে হৃদয় পুড়ে যাচ্ছে? শব্দরের বাহুর, পিঠের পোড়া দাগ দেখে তার বুক কেন এত ভারী হয়ে আসছে? ইচ্ছে করছে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিতে, স্পর্শ করে মিলিয়ে দিতে ক্ষতগুলো।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, তার কুণ্ঠাবোধ হচ্ছে, সংকোচ হচ্ছে। অভিনয় করে সে এতদিন দুর্দান্ত অভিনয় করেছে। এখন যখন সত্যিকারের অনুভূতি কাজ করছে হৃদয়ে, তখন অধিকার দেখাতে বড্ড লজ্জা হচ্ছে। সে হাত বাড়াতে গিয়েও বাড়াতে পারে না, থমকে যায়।
গতকাল থেকে রান্নাঘরে, বাড়ির আঙিনায়, বাগানের চত্বরে সেদিনের আগুন লাগার ঘটনা নিয়ে কথা হচ্ছে। গৌতমের মা কী সুন্দর, কী আবেগঘন করে বলছিল, ‘ঈগল পক্ষীর মতো ছোঁ মাইরা বেগমরে আগুন থেকে বাঁচায়া আনছে জমিদার। কী যে মহব্বত বউয়ের জন্য না দেখলে তোরা বুঝবি না।’
জুলফা দেখেনি সেই দৃশ্য নিজের চোখে। কল্পনায় ভেবে যাচ্ছে, কীভাবে জীবনের অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ, সুঠাম দেহের মানুষটা তাকে মা হারা শিশুর মতো বুকে শক্ত করে আগলে রেখে আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বেরিয়ে এসেছিল। মনে এত সন্দেহ, হৃদয়ে এত অবিশ্বাস নিয়েও তাকে অক্ষত অবস্থায় নিয়ে বেরিয়েছিল সাহসের সঙ্গে! নিজের পিঠ, বাহু পুড়িয়ে তাকে অক্ষত রেখেছে। এই মানুষটাকে দুঃখ দিয়ে সে কি কখনো সুখী হতে পারবে? কোনোদিন শান্তি পাবে?
জুলফা ক্ষীণ কণ্ঠে বলে, ‘কথা বলবেন না?’
শব্দর ধীরে ধীরে ফিরে তাকায়। তার চোখ দুটো বড্ড বিষণ্ণ। সে হাত বাড়িয়ে জুলফার বাহুর ক্ষত আলতো করে স্পর্শ করে। জুলফা ব্যথায় ভ্রু কুঁচকে ফেলে।
শব্দর জিজ্ঞেস করে, ‘কীভাবে হলো এটা?’’
‘পড়ে গিয়েছিলাম।’
শব্দর জুলফার একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। বৃষ্টির ছন্দময় শব্দ শোনে। জুলফা পাশ থেকে শব্দরের মুখের দিকে চেয়ে আছে। কেমন ভয় ভয় করছে বুকের ভেতর। যার অন্তর পাপে ভরা, সেই ভয় পায। পাপ মানুষকে ভয় পেতে বাধ্য করে, কাপুরুষ বানিয়ে দেয়।
অনেকটা সময় পার হয়ে যায় নীরবতায়। যখন বৃষ্টির শব্দ থেমে আসে ধীরে ধীরে, আধো আধো অন্ধকারে মন কেমন করা কণ্ঠে শব্দর ডাকে, ‘জুলফা?’
জুলফা নড়েচড়ে বসে।
শব্দর বাইরে তাকিয়েই থমথমে গলায় বলে, ‘গাঙ্গের জলে ডুব দিলাম, বরফশীতল জল খেলাম, বৃষ্টির জলে ভিজলাম, তবুও অন্তরের আগুন নিভল না। সৃষ্টিকর্তার কাছে গিয়ে সেজদা দিলাম, তিনি বললেন, এই আগুন নিভাতে পারে যে, সে তুমি।’
‘আমি?’
শব্দর তাকায় তার দিকে। শীতল দৃষ্টি। খুব শান্ত গলায় বলে, ‘আমি এই ব্যথা আর বইতে পারছি না, জুলফা। মাত্র তিনদিন, অথচ মনে হচ্ছে দুশো বছর ধরে এই গ্লানি, এই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছি।’’
জুলফা বুঝেও ভান করে বলে, ‘কীসের ব্যথা?’’
‘জানো না?’
‘এতো অবিশ্বাস আমায়?’
‘তোমার চারপাশে যে অন্য কারো সুবাস।’
জুলফা বাকহারা হয়ে তাকিয়ে থাকে৷ মানুষটা কেমন ব্যাকুল, অসহায় হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ভেতরটা অস্থির হয়ে ওঠে। সব জানিয়ে দেবে? যা হবার হবে, ইচ্ছে করছে সব বলে দিতে। ঠকানো তো হয়েই গেছে। আর কষ্ট দিয়ে, আর মিথ্যা বলে কী লাভ? আজ হোক বা কাল, সে তো শব্দরকে ছেড়ে চলে যাবেই। তখন তো সব জানতে হবে তাকে। তবুও জড়তা কাজ করছে ভেতরে। ভয়ও হচ্ছে প্রচণ্ড।
জুলফা কিছু বলতে যায়, শব্দর আলতো করে তার ঠোঁটে আঙুল রেখে থামিয়ে দেয়। বেদনাভরা কণ্ঠে বলে, ‘শশশ, মিথ্যা বলো না। যদি সত্য বলতে না পারো, তবে চুপ থাকো। মিথ্যা বলে আমাকে আর অপমান করো না। হৃদয়টাকে আর পুড়িও না।’’
জুলফা মাথা নিচু করে চুপ থাকে। তার নিশ্চুপতা সত্য স্বীকার করে নেয়। শব্দর চোখ নামিয়ে হাসে, বিষাদের হাসি। হায় নিয়তি! হায় নিয়তি! পঁচিশ বছর নিজেকে কষ্ট দিয়েছে পাপমোচনের আশায়। একাকীত্বের কাঁটার নির্মম আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। তবুও পাপমোচন হয়নি। এই জুলফা, তার হৃদয়ের সিংহাসনে রাজত্ব করা রানিই কি না তার পাপমোচনের পথ!
শব্দর চোখের জল আটকে জুলফার থুতনি ধরে আলতো করে মুখ উপরে তুলে জিজ্ঞেস করে, ‘আমি কি খুব বুড়ো হয়ে গেছি, জুলফা? একটুও কি সুন্দর নই?’
প্রশ্নটা জুলফার বুক অবধি পৌঁছে বিদ্ধ করে ফেলে হৃদয়টা। সে অস্থির হয়ে শব্দরের কাছে সরে আসে। শব্দরের এক হাত শক্ত করে ধরে তার গভীর অরণ্যের মতো চোখ, পরিপাটি দাঁড়ি, লাল রঙা ঠোঁট এক পলক দেখে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলে, ‘আপনি খুব সুন্দর। সবচেয়ে সুন্দর।’
‘তবে কেন তুমি আমাকে ভালোবাসলে না, জুলফা?’
জুলফা অপরাধবোধে মরে যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে। এত তীব্র অপরাধবোধ কোথা থেকে আসছে? পাপ করার সময়, সুখ উপভোগ করার সময় এই অনুভূতি কোথায় ছিল? বুকের আগুনে তার চোখও জলে ভরে ওঠে, অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ে গালে।
শব্দর জুলফার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘আমার পাখি তার ঠিকানা ভুলে কার আকাশে উড়তে চায়? কোন দিগন্তে হারিয়ে যেতে চায়?’ একটু থেমে আবার বলে, ‘কেউ আছে তোমার হৃদয়ে? যেতে চাও তার কাছে? বলো, একবার বলো।’
জুলফার ঠোঁট দুটি কেঁপে ওঠে।
শব্দর বিহ্বল মানুষের মতো বলে, ‘চোখের কাজলের নিচে কাকে লুকিয়ে রাখো তুমি?
কার স্মৃতিতে রাতভর পুড়ে যায় তোমার বুক?
কার নামে নিঃশ্বাস নাও?
মুক্তি চাও, জুলফা? বলো, চাও? আমি তোমাকে মুক্তি দেব।'
জুলফার শরীর শিরশির করে ওঠে, কাঁপতে থাকে। হেঁচকি তুলে কেঁদে ওঠে হঠাৎ করেই। সে বুঝতে পারছে না তার ভেতরে কী হচ্ছে। শব্দরের শান্ত, নিরুপদ্রব কথাগুলো এতো তীব্র আলোড়ন তুলছে কেন বুকের ভেতর? মস্তিষ্ক ফেটে যাচ্ছে। সব সত্য বেরিয়ে আসতে চাইছে জোর করে।
জুলফার আচরণই সব উত্তর দিয়ে দিচ্ছে। তবুও শব্দর তার মুখ থেকে শুনতে চাইছে। সে এখন বিশ্বাস করে, এটাই তার নিয়তি! ভেতরে ভেতরে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে সে। তার করা পাপ তাকে যেন দূর থেকে উপহাস করে বলছে, ‘ব্যভিচারের সুখ অবশেষে পাচ্ছিস। কেমন লাগে নিজের স্ত্রীর পাশে বসে অন্য কাউকে ভাবতে? কেমন লাগে এই অপমান?’
শব্দর জুলফার দুই হাত ধরে আলতো করে নিজের গলায় চেপে ধরে। তারপর বেদনাভরা কণ্ঠে বলে, ‘সত্য স্বীকার করো, জুলফা। অথবা এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে আমাকে মুক্তি দাও। এভাবে ছলনা করে আর যন্ত্রণা দিও না। আমি আর পারছি না।’
প্রতিটি কথাই শান্ত। কোনো উত্তেজনা নেই। রুদ্ধশ্বাস কণ্ঠ নেই। শুধুই অনুনয়, শুধুই আকুতি।
জুলফা দুই হাত ছাড়িয়ে নিয়ে তড়িঘড়ি উঠে দূরে সরে যায়। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকাতে চেষ্টা করে। শব্দর উঠে এসে ধীর পায়ে, পুনরায় জুলফার দুই হাত ধরে নিজের গলায় চেপে ধরে। তারপর চোখে চোখ রেখে বলে, 'আজ, এখুনি, সব যন্ত্রণার অবসান হোক। হয় সত্য বলো, নয়তো শেষ করে দাও সব। তারপর চলে যাও।’
জুলফার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। আর সম্ভব না, আর সম্ভব না! এই মিথ্যার বোঝা আর বহন করা সম্ভব না! সে জোর করে হাত সরিয়ে নিয়ে শব্দরের পায়ে লুটিয়ে পড়ে। হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলে, ‘ভুল হয়ে গেছে! বড্ড ভুল হয়ে গেছে! মাফ করে দিন। আল্লাহর দোহাই লাগে, মাফ করে দিন। আমি ভুল করেছি। মহাভুল করেছি।’
জুলফা কখনো তার প্রেমকে 'ভুল' মানেনি। নাভেদের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তকে সে ভালোবাসা ভেবেছে, সত্যিকারের অনুভূতি মনে করেছে।
আজ কেন সেই প্রেমকে ভুল বলল সে জানে না। শুধু জানে, শব্দরকে সব জানাতে হবে। সে আর পারছে না মিথ্যার জাল বুনে রাখতে।
শব্দর চোখ বুজে। দুই ফোঁটা স্বচ্ছ জল গড়িয়ে পড়ে তার পুরুষালি গাল বেয়ে। ফ্যাসফ্যাসে গলায় হিমশীতল বরফের মতো জিজ্ঞেস করে, ‘কতটা গভীর তোমাদের সম্পর্ক?’
জুলফার হৃৎস্পন্দন থমকে আসে। রক্ত যেন জমে যায় শিরায় শিরায়। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে ওঠে নাভেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার প্রতিটি মুহূর্তের কথা। তার দেহের প্রতিটি ইঞ্চির খবর শব্দর ছাড়াও আরও কারো নখদর্পনে! কারোর স্পর্শে কলুষিত! এ কথা কী করে সইবে শব্দর?
মানুষ মুখে যতই বুলি আওড়াক না কেন, শরীর কিছু নয় বলে দাবি করুক, দিনশেষে শরীরই তো সবটুকু। শরীরই তো প্রেমের শেষ প্রমাণ। কোনো স্বামী, কোনো প্রেমিক সইতে পারে না, তার প্রিয়জনের শরীরের ভাগ অন্য কেউ পেয়েছে, ভোগ করেছে। শরীর তো প্রেমের সবচেয়ে গোপন অধিকার!
শব্দর চোখ খোলে। পুনরায় জিজ্ঞেস করে, ‘জবাব দাও। কতটা গভীর তোমাদের সম্পর্ক?’
এইবার তার কণ্ঠ থেকে চিড়বিড় করে বেরিয়ে আসে দমবন্ধ করা ক্রোধ। এতক্ষণের শান্ত, শীতল ভাবটা ধোঁয়ার মতো উধাও হয়ে গেছে!
শব্দরের কণ্ঠস্বরের আকস্মিক পরিবর্তন টের পেয়ে জুলফার হৃদয়ে যে সাহসটুকু জমা হয়েছিল সব কিছু স্বীকার করে নেওয়ার জন্য, সেই সাহস বাষ্পের মতো মিলিয়ে যায়। তার পক্ষে সম্ভব নয় বলা, প্রেমিকের সঙ্গে শুধু মনের সম্পর্ক নয়, শারীরিক ঘনিষ্ঠতাও ঘটে গেছে।
এতে শব্দর শুধু কষ্টই পাবে না, বরং ক্রোধের বশবর্তী হয়ে হয়তো তাকে মেরেও ফেলবে।
সে আরেকবার মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে, ‘কোনো গভীরতা নেই।’
শব্দর জুলফাকে পা থেকে টেনে তুলে দাঁড় করায়। অনুসন্ধানী চোখ দুটি সরাসরি জুলফার চোখের দিকে স্থির করে জিজ্ঞেস করে, ‘স্পর্শ করেনি? একবারও করেনি?’
জুলফার চোখ দুটি অশ্রুতে পূর্ণ হয়ে উঠেছে, জলের ঘন আস্তরণে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেছে। সে মাথা নাড়িয়ে অস্বীকৃতি জানায়। নাক টেনে ফোঁপানো গলায় বলে, ‘আমরা শুধু কয়েকবার দেখা করেছি কথা বলার জন্য।’
‘ছেলেটা কে? এই বাড়ির কেউ?’
জুলফা আবারও মাথা নাড়ায়, এই বাড়ির কেউ না।
সাথে সাথে শব্দরের হাতের বাঁধন তার বাহুতে শক্ত হয়ে ওঠে। যেখানে আগে থেকেই একটা ক্ষত আছে। ব্যথায় জুলফার মনে হয় যেন নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসবে বুক ফুঁড়ে।
শব্দর রেগে গেলে একেবারে অমানুষ হয়ে যায়। ভেতরে একবিন্দু মানবিকতাও অবশিষ্ট থাকে না। মাত্র কিছুক্ষণ আগেও সে কত শান্ত ছিল! কতটা নিয়ন্ত্রিত ছিল! এখন উত্তাল সমুদ্রের মতো তরঙ্গায়িত হয়ে উঠেছে, যার রাগের স্রোতে ভেসে যেতে পারে সবকিছু।
শব্দর চিৎকার করে বলে, ‘তাহলে কে? বলো আমাকে, ছেলেটা কে?’
‘কালি...কালিগঞ্জের।’
‘আগে থেকে চিনতে? পুরনো পরিচয় ছিল তোমাদের?’
জুলফা চোখ নিচু করে মাথা ঝাঁকায়, যার অর্থ দাঁড়ায় হ্যাঁ, তারা পরিচিত ছিল আগে থেকেই।
‘ওর নাম বলো। এখুনিই বলো। কুত্তার বাচ্চার পরিচয় দাও।’
জুলফা ফুঁপিয়ে ওঠে৷ সত্য স্বীকার করে কি ভুল করে ফেলেছে? শব্দর কি এতক্ষণ ধরে শুধুমাত্র তার পেট থেকে সব কথা বের করে আনার জন্যই এতো শান্ত আচরণ করছিল, নাকি সত্যিটা জানার পর রাগে ফেটে পড়েছে?
শব্দর আচমকা জুলফার গলা চেপে ধরে। রাগে-দুঃখে-ঘৃণায় তার সমস্ত দেহ যেন বিষাক্ত সাপের মতো নীলাভ হয়ে উঠছে। তারস্বরে চিৎকার করে বলে, ‘কার সঙ্গে দেখা করো তুমি? জবাব দাও!’
জুলফা প্রাণপণে শব্দরের শক্ত হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করে। শ্বাসনালী চেপে যাচ্ছে। বুকের ভেতরটা অক্সিজেনের জন্য হাহাকার করছে। সে অসহায়ের মতো হাত-পা ছুড়তে থাকে।
অবস্থা বেগতিক দেখে শব্দর গলা ছেড়ে দেয়। জুলফা মেঝেতে আছড়ে পড়ে, কাশির দমকে কেঁপে ওঠে।
শব্দর পাশের মার্বেল পাথরের সুন্দর ফুলদানিটা প্রচণ্ড লাথি মেরে ভেঙে চুরমার করে দেয়। টুকরোগুলো চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। তার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে রাগের আগুনে। বিশ্বাসঘাতকতার যন্ত্রণা বুক ফাটিয়ে দিচ্ছে। সে আগে থেকেই জানত এমন কিছু শুনবে। মনে মনে নিজেকে প্রস্তুতও করে রেখেছিল। তবুও সহ্য করতে পারছে না। চারপাশের প্রতিটি জিনিস তুলে ভেঙে চুরমার করে দিতে ইচ্ছে করছে।
একটার পর একটা জিনিস হাতে তুলে নিয়ে প্রচণ্ড শক্তিতে ছুঁড়ে মারে মেঝেতে। টেবিলের দামি ঘড়ি, সাজানো বই, ছবির ফ্রেম—একের পর এক সবকিছু মেঝেতে আছড়ে পড়ে ভেঙে যায়।
‘নাম বলো ওর! এখুনি বলো। নয়তো এই ঘরেই আজ তুমি মরবে, আমিও মরব!’
কথাগুলো বলতে বলতে ভয়ংকর জোরে কাঠের টেবিলে লাথি মারে। টেবিলটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেয়ে টলে ওঠে। ওপরের জিনিসপত্র পড়ে যায় নিচে।
জুলফা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে অনুনয় করে, ‘থামুন, আল্লাহর দোহাই থামুন! আর না… থামুন…থামুন।'
শব্দরের থামার কোনো লক্ষণই নেই। বরং তার ক্রোধ প্রতি মুহূর্তে আরও উগ্র হয়ে উঠছে। জুলফা আতঙ্কিত হয়ে ছুটে গিয়ে শব্দরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
শব্দর গর্জন করে ওঠে, ‘ছাড়ো! ছাড়ো বলছি।’
জুলফা ছাড়ে না। বরং আরও শক্ত করে চেপে ধরে। উন্মাদের মতো কাঁদতে শুরু করে। এ কোন ঝড়ের মুখে পড়েছে! এখান থেকে কীভাবে রক্ষা পাবে!
শব্দর রাগে কাঠ হয়ে বলে, ‘নখরামি করো না। বন্ধ করো তোমার ছলচাতুরী! হারামজাদাটার পরিচয় দাও! কাপুরুষটা কোন বাপের বীজ আমিও দেখতে চাই! ছাড়ো! শেষবার সাবধান করছি, ছেড়ে দাও আমাকে!’
জুলফা হঠাৎ একটা অপ্রত্যাশিত কাজ করে বসে। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে নিজেকে উঁচু করে শব্দরের টিয়া পাখির মতো লাল পুরুষালি দুটি ঠোঁট নিজের কোমল গোলাপি ঠোঁটে বন্দি করে নেয়। আকস্মিক আক্রমণে শব্দরের সমস্ত শরীর জুড়ে অদ্ভুত এক শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। পায়ের পাতা থেকে শুরু করে মেরুদণ্ড বেয়ে মাথার তালু পর্যন্ত বিদ্যুত খেলে যায়।
সে জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। বজ্র কণ্ঠে বলে, ‘সরে যাও।’
জুলফা আবার একই কাজ করে। শব্দর আবার সরিয়ে দেয়। জুলফা আবারও ফিরে আসে মরিয়া হয়ে। পরপর তিনবার একই ঘটনা ঘটার পর শব্দর হাত-পা ছেড়ে দেয়। লড়াই করার শক্তি হারিয়ে ফেলে। দেয়াল ঘেঁষে মেঝেতে বসে পড়ে পরাজিত সৈনিকের মতো।
জুলফা শব্দরের সামনে বসে। ভয়ে ভয়ে তার গাল স্পর্শ করে চোখের জল মুছে দিয়ে বলে, ‘ওর সাথে আমার আগে থেকেই সম্পর্ক ছিল। আমরা বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মা আর ভাই জোর করে আপনার সাথে বিয়ে দিয়ে দিল। আপনি তো জানেন, আমি রাজি ছিলাম না বিয়েতে। কান্নাকাটি করেছি। মিনতি করেছি। কিন্তু কেউ শোনেনি। মাস দুয়েক আগে ও আমাকে খুঁজে খুঁজে কান্তারপুর চলে আসে। আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিল। তাই কয়েকবার দেখা করেছি। কিন্তু আমি... আমি শপথ করে বলছি, আমি ওকে ভুলে যাব। আর কখনো দেখা করব না। আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, আমি এখন থেকে আপনি যা বলবেন তাই শুনব। আপনার আদেশ মেনে চলব। ওকে ছেড়ে দেন। আপনার যত ইচ্ছে আমাকে মারেন। আমাকে যা শাস্তি দিতে চান দেন।’
শব্দর মলিন হেসে জুলফার দিকে তাকায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘এত মায়া? এত ভালোবাসা? ওকে মেরে ফেলব সেই ভয়ে তুমি নিজেই মার খেতে রাজি তাও ওর নাম-পরিচয় দেবে না? এত ভালোবাসো?’
জুলফার গলা দিয়ে স্বর বেরোয় না। শুধু আঁচলের প্রান্ত দিয়ে চোখ মুছে। আবার ভিজে যায়।
জিনিসপত্র ভাংচুরের আওয়াজ দাসীরা শুনতে পেয়েছে। কানাঘুঁষা চলছে মহলে। খবরটা এসে পৌঁছেছে ললিতার কানেও। তিনি বসে আছেন সুফিয়ানের শিয়রে। হাতপাখা দিয়ে একঘেয়ে ছন্দে বাতাস করছেন অসুস্থ মানুষটার মুখে।
বোধহয় জুলফা ধরা পড়ে গেছে। ভারী দুঃসাহস মেয়েটার! মহলের সবার চোখে ধুলো দিয়ে প্রেম করছে ব্যবসায়ী নাভেদের সাথে।
ললিতা পুরোপুরি নিশ্চিত নন প্রেমিকের পরিচয় নিয়ে। তবে জুলফা যে প্রেমে পড়েছে, এটা একদম নিশ্চিত। ডাকিনীটার চোখমুখের ভাবটাই আলাদা। স্বপ্নিল দৃষ্টি, ঠোঁটের কোণে হাসি, গালে লাজুক লালিমা। প্রেমিক নাভেদ পাটোয়ারী হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে প্রবল। তাকেই দেখা যায় মহলের আশেপাশে, নানা অজুহাতে যাতায়াত করতে।
এখন শব্দর কী করবে সেটাই দেখার বিষয়। নিজের বউকে কী শাস্তি দেবে? উন্মাদের মতো রেগে গিয়ে সবকিছু ধ্বংস করে ফেলবে? জুলফা মাফ-টাফ চাইলে ক্ষমা করেও দিতে পারে।
শব্দরকে তার থেকে বেশি আর কে-ই বা চেনে! সহজ, সরল মনের একটা মানুষ শব্দর। যতটা গর্জায়, ততটা বর্ষায় না। রাগ দেখায় অনেক, কিন্তু ভেতরে ভেতরে নরম। অন্যের কথায় সহজেই প্রভাবিত হয়। যত বড় দুঃখই আসুক না কেন, মানিয়ে নিতে পারে নিজেকে। লজ্জা আর পিছুটান তাকে বেঁধে রাখে সবসময়। তবে রাগ-জেদের প্রাবল্য আছে ভেতরে। একবার রেগে গেলে হুঁশ-জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
জুলফার প্রতি কি এখন সেই ভয়ংকর রাগটাই জেগে উঠেছে? ধ্বংস করে দেবে সব? নাকি জুলফা তার যৌবনের জাদুতে, রূপের মায়ায় ভুলিয়ে ফেলতে পারবে শব্দরকে?
‘ললিতা, ললিতা?’ হঠাৎ ক্ষীণ কণ্ঠে ডেকে ওঠেন সুফিয়ান।
ললিতা চমকে ওঠেন। হাতপাখাটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল হাত থেকে। উৎসুক হয়ে ঝুঁকে বলেন, ‘কিছু লাগবে আপনার? পানি খাবেন? শরীর খারাপ লাগছে?’
সুফিয়ান অন্ধকারে আঙুল তাক করে কিছু একটা দেখিয়ে উৎসাহ নিয়ে বলেন, ‘দেখো, দেখো ললিতা। চাঁদপুর থেকে তোমার জন্য ইলিশ নিয়ে আসছি। ষোল কেজি আছে। পুরো ষোল কেজি! তোমার না ইলিশ খুব পছন্দ? সবাইকে নিয়ে রান্না করে খাও। আমাকেও খাওয়াও৷’
ললিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। বুকের ভেতরটা চাপা কষ্টে ভরে ওঠে। সুফিয়ান বিছানায় শয্যাশায়ী হওয়ার পর থেকে হঠাৎ হঠাৎ হারিয়ে যান অতীতে। ভুলে যান বর্তমান। কোথায় তিনি, কত বছর কেটে গেছে, কী তার অবস্থা— কিছুই মনে থাকে না। ষোল কেজি ইলিশ সুফিয়ান এনেছিলেন আজ থেকে সাতাশ-আটাশ বছর আগে।
ইলিশগুলো আকারে বিশাল ছিল। রূপালি রঙের চকচকে, আঁশগুলো ঝিকমিক করছিল সূর্যের আলোতে। দাসীদের নিয়ে ইলিশের কত রকম পদ রেঁধেছিলেন সেদিন! ইলিশ ভাজা, টকটকে হলুদ ঝোলে সর্ষে ইলিশ, কলাপাতায় মোড়া ইলিশ পাতুরি। সবাইকে নিয়ে কত আনন্দ করে খেয়েছিলেন! সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনও বুক ভরে যায়।
সেদিন একটা দুঃখের ঘটনাও ঘটেছিল। কিশোর শব্দরের গলায় কাঁটা আটকে গিয়েছিল। দম আটকে আসার মতো অবস্থা। ওক ওকে শব্দ তুলে বমি করছিল। আতঙ্কে, ভয়ে ললিতার কান্না থামার নামই নিচ্ছিল না। বুকের ভেতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিল তার।
বেইমানটার জন্য কত কেঁদেছেন, কত যত্ন করেছেন! জ্বর এলে রাতের পর রাত জেগে বসে থেকেছেন। অপাত্রে ঢেলেছেন জীবনের সব মায়া, মমতা, ভালোবাসা। বিনিময়ে পেয়েছেন লাঞ্ছনা, বঞ্জনা আর অবহেলা।
সুফিয়ান কাঁপা কাঁপা হাতে কিছু একটা দেওয়ার ভঙ্গি করেন বলেন, ‘এই নাও, শাড়িটা নাও। আমি তো ওতো বুঝি না। জানি না তোমার পছন্দ হবে কি না। রঙটা বড্ড ভালো লেগেছিল, তাই নিয়ে এসেছি তোমার জন্য। তুমি কি আমার উপর রাগ করে আছো? কথা বলছো না যে?’
তিনি থামেন। শ্বাস নেন। তারপর আবার বলতে থাকেন, ‘বুঝোই তো আমার অবস্থা। বহু বছর ধরে মাথার উপর কেউ নেই আমার। বাপ-মা, দাদা-দাদি, চাচা-চাচি সবাই মরে গেছে একে একে। সবাইকে হারিয়ে একা হয়ে গেছি। এই বিশাল জমিদারি আমাকেই সামলাতে হয়। হিসাব রাখতে হয় খাতায়। খাজনা আদায় করতে হয়। ব্যবসার কাজে দূরে দূরে যেতে হয়, মাসের পর মাস থাকতে হয় বাইরে। কিন্তু তোমার জন্য আমার মনটা সবসময় পোড়ে বুঝছো? কী খাও, কী খাও না, কেমন আছো, অসুখ-বিসুখ হয়নি তো এসব চিন্তা করি। শাড়িটা পরে একবার আসবে আমার সামনে? দেখি কেমন লাগে ?’
ললিতা সুফিয়ানের শূন্য হাত থেকে অদৃশ্য শাড়িটা নেওয়ার ভান করেন। সুফিয়ান হাসেন৷ ললিতার বুক পুড়ে যায়। চোখে জল চলে আসে। এই মানুষটা যদি মরে যায়, তাহলে তার কী হবে! তিনি কোথায় যাবেন? কার কাছে যাবেন? ছেলেটাও আর ছেলে নেই৷ শব্দর নিশ্চয়ই তাকে বের করে দেবে মহল থেকে! তখন কোথায় যাবেন তিনি এই বুড়ো বয়সে?
ললিতা স্বামীর কপালে হাত বুলিয়ে দেন। দ্রুতই ঘুমিয়ে পড়েন সুফিয়ান। শ্বাস নিচ্ছেন কষ্ট করে, ঘড় ঘড় আওয়াজ হচ্ছে বুকে। কফ জমছে ভেতরে, বেরোতে পারছে না।
বাইরে থেকে এখন আর কোনো আওয়াজ আসছে না। শব্দর হয়তো রাগ সামলে নিয়েছে এতক্ষণে। অথবা জুলফা বশ করে ফেলেছে।
ধীরে ধীরে শব্দরের শ্বাসপ্রশ্বাস শান্ত হয়ে আসে। বুকের ভেতরের ঝড়টাও থিতিয়ে এসেছে। সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে। মনে মনে ভাবতে থাকে, জুলফার সম্পর্কটা গভীর নয়। পুরনো প্রেম একেবারে ভুলতে পারেনি বলে দেখা-সাক্ষাৎ করেছে। মন থেকে মুছতে পারেনি। তাছাড়া সে নিজেও তো পবিত্র নয়। বরং তার নিজের গায়ে আরও বড় কলঙ্কের দাগ আছে। হোক না সেটা দুর্ঘটনা! দাগ তো দাগই থেকে যায়। কেউ কি আর দেখে সেই দাগ ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত? দাগের কি কোনো ভাষা আছে? থাকলে নিশ্চয়ই স্বাক্ষ্য দিতে পারত।
সে বাইরের কালো আকাশ থেকে চোখ ফিরিয়ে বলে, ‘যা হওয়ার হয়ে গেছে। অতীতের স্মৃতি পুড়িয়ে ফেলো। সব ভুলে গিয়ে সংসারে মন দাও। আমি তোমাকে একটা সুযোগ দিচ্ছি। শেষ সুযোগ। খবরদার…খবরদার জুলফা, কখনো যদি আমার হাতে ধরা পড়ো, ওখানেই মেরে ফেলব। আল্লাহর কসম, বাঁচতে দেব না। মনে যত প্রেমই থাকুক না কেন, কবর দিয়ে দাও। তুমি এখন আমার বউ। আমার সঙ্গেই তোমার পুরো জীবন কাটাতে হবে। সংসার করতে হবে। সন্তান জন্ম দিতে হবে। বুঝতে পেরেছ?’
জুলফা চোখের জল মুছে ফেলে আঁচলের কোণ দিয়ে। মাথা ঝাঁকায় সম্মতিতে। বুঝতে পেরেছে৷ কিছু সত্য গোপনই থাকাই ভালো।
শব্দর উঠে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়। পা বাড়ায় দরজার দিকে। জুলফা তাড়াতাড়ি বলে, ‘একটু বসুন। পোড়া জায়গাগুলোতে ওষুধ লাগিয়ে দিই?’
শব্দর থমকে দাঁড়ায় দরজার কাছে। পেছন ফিরে তাকায়। চোখাচোখি হয় দুজনের। তারপর চুপচাপ এসে নরম কেদারাটায় বসে পড়ে। জুলফা দ্রুত উঠে বাইরের দিকে ছুটে যায়। কিছুক্ষণ পর গরম পানি ফুটিয়ে একটা পরিষ্কার বাটিতে করে নিয়ে আসে। সাথে পরিষ্কার সাদা কাপড়, তুলা।
পোড়া জায়গাগুলোতে বড় বড় ফোস্কা পড়ে গেছে। চামড়া লাল হয়ে ফুলে আছে। ফোস্কার ভেতর পানি জমে ছিল। সেই ফোসকা কয়েকটা ফেটে গেছে। কিছু জায়গায় হলদেটে পুঁজ জমেছে। ব্যথা হচ্ছে নিশ্চয়ই। গায়ে জ্বরজ্বর ভাব। শরীর গরম। জুলফা সাবধানে ক্ষত পরিষ্কার করতে শুরু করে। পুঁজ ধুয়ে ফেলে।
শব্দর ব্যথায় কেঁপে উঠে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
জুলফা স্নেহ নিয়ে বলে, ‘একটু সহ্য করুন। সকাল হলেই মনির ভাইকে ডাক্তার আনতে পাঠাব।’
কথা শেষ করে আবার দৌড়ে যায় রান্নাঘরে। মধুর মাটির শিশি নিয়ে আসে। ঢাকনা খুলে সেখান থেকে খাঁটি মধু বের করে আঙুলে নিয়ে আস্তে আস্তে লাগাতে থাকে পোড়া চামড়ায়। ঠিক জানে না এটা সঠিক চিকিৎসা কিনা। তবে অনেক জায়গায় শুনেছে, পোড়ার ঘা শুকাতে মধু দারুণ কাজ করে। আগুনের বিষ নাকি মধুর মিষ্টিতে মরে।
শব্দর পুরোটা সময় চুপ করে বসে থাকে। অনুভব করে জুলফার উষ্ণ নিঃশ্বাস। আঙুলের স্পর্শ। পায়ের হালকা শব্দ। জুলফাকে ছুটে ছুটে তার সেবা করতে দেখে মনে মনে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়, জুলফা অন্য কাউকে ভালোবেসে মরে যেতে চাইলেও সে জুলফাকে কখনো ছাড়বে না কারো কাছে। এই মেয়ে তার। শুধু তার। তার বউ অন্য কারো স্পর্শে সুখ পাবে? অসম্ভব! সেটা কখনোই হতে দিবে না।
শব্দর হঠাৎ জুলফার মধু লাগানো আঙুলসহ হাত ধরে ফেলে। জুলফা চমকে উঠে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়। শব্দর এক টানে জুলফাকে নিজের বুকে টেনে নেয়।
জুলফার পুরো শরীরটা দুমড়ে-মুষড়ে পিষে যায় তার শক্ত বুকে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………