বাড়ি ফেরার পথে একটা ফার্মেসিতে ঢুকে স্কিন অয়েনমেন্টের একটা টিউব কিনে ফেললাম— কারণ জানি, এটা-ই একমাত্র জিনিস যার একটু হলেও কাজ করার সম্ভাবনা আছে। এখন ডাক্তার দেখানোর সামর্থ্য সীমিত, তাই আগে ব্যবহৃত অয়েন্টমেন্টটাই কাজ করবে বলে আশা করছি।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে চুলকানি আরো ভয়াবহ রকম বেড়ে গেল। সহ্যই হচ্ছে না। এমন অবস্থায় মন-মেজাজ এমনিতেই খারাপ। তার ওপরই দেখি হক সাহেবের বাড়ির গেটটা হঠাৎ খুলে গেছে। আর হক সাহেব উনার সেই বিখ্যাত লাঠি ঠকঠক করে আমার দিকেই আসছেন। আমাকে দেখতে পেয়েই চোখ রাঙালেন।
“আহসান সাহেব!” তিনি গর্জে উঠলেন। “আপনার গেটটা আগের মতোই ময়লা রয়ে গেছে!”
চেয়ে দেখি উনি মিথ্যা বলছেন না। কিন্তু আমি প্রায় নিশ্চিত— কাজে যাওয়ার আগেই আমি সব ময়লা ঝাট দিয়ে পরিষ্কার করেছি। আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমি অবশ্যই ঝাড়ু দিয়েছিলাম।
ঠিক কি না?
কিন্তু এখন তো জায়গাটা ময়লায় ভরে গেছে। হক সাহেব মোটেও বানিয়ে বলছেন না। আর সকাল থেকে এখন পর্যন্ত কে-ই বা এখানে এভাবে ময়লা ফেলে রাখবে? তাহলে... আমি কি গত সপ্তাহের কথা ভেবে ভুল করছি?
আজকের এমন একটা ভয়াবহ দিন কাটাবার পর আমার একদমই ইচ্ছে করছে না আবার এসব নিয়ে ঝামেলা করতে। কিন্তু না করলে এলাকাবাসিও আমাকে ভালো চোখে দেখবে না। আমি সবসময় চাই এলাকার সবার সাথে মিলেমিশে চলতে। আমার জন্য অন্য কারো অসুবিধা হোক এটা চাই না।
“আর,” তিনি যোগ করলেন, “আপনার দরজার সামনের ম্যাটটাও নোংরা!”
বুকের চুলকানিটা আরো কয়েক ধাপ বেড়ে গেল হঠাৎ। মনে হচ্ছে নিজের চামড়া নিজে ছিঁড়ে ফেলি। আর ইচ্ছে করছে ঐ ম্যাটটা তুলে এনে হক সাহেবের মাথায় আছাড় মারতে থাকি। তার মুখটা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত।
“তো?” তিনি ভ্রু নাড়ালেন।
আমি তার দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকালাম। কোনো কথা না বলে শার্টের কলার ধরে একটা টান দিলাম— বোতামগুলো চাপ সহ্য করতে না পেরে একে একে ছিঁড়ে গেল। শার্টটা পুরো খুলে চরম বিরক্তি নিয়ে ওটা ছুঁড়ে দিলাম গেটের ভেতরে বারান্দার ওপর। হক সাহেব হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। বাইরের হিমেল বাতাস আমার নগ্ন শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে গেল। আহ! কী শান্তি। যদিও বুকটা এতক্ষণে লাল হয়ে গেছে পুরোপুরি।
“দেখুন!” আমি বারান্দায় পা রেখে ম্যাটটা হাতে তুলে উনার সামনেই ঝাড়তে থাকলাম। “দেখুন, এটা পরিষ্কার করে নিচ্ছি। খুশি?”
এই প্রথম, বদমেজাজি বৃদ্ধটার মুখ থেকে কোনো কথা বের হলো না। যেভাবে ঠকঠক করতে করতে এগিয়ে এসেছিলেন সেভাাবেই আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন।
ঘরে ঢোকার আগে ফ্লোর থেকে শার্টটা তুলে দলা পাকিয়ে একটা বল বানিয়ে নিলাম। হক সাহেবের মতো আমিও গটগট করে ঘরে ঢুকলাম। ঘরটা এই মুহূর্তে শান্ত হয়ে আছে, কিন্তু দরজার পাশের শু-র্যাকে তানজিনার স্যান্ডেল রাখা আছে। তার মানে ও বাসায় আছে।
ভালোই হলো।
এখনই কিনে আনা অয়েনমেন্টটা গায়ে মাখতে ইচ্ছে করছে। তবে তার আগে আমি সোজা ওয়াশিং মেশিনের দিকে গেলাম। আমার লিকুইড ডিটারজেন্টটা মেশিনের পাশে মেঝেতে রাখা আছে। অন্য কোনো ডিটারজেন্টের প্যাকেট চোখে পড়ছে না। কিন্তু আমি নিশ্চিত তানজিনা লেবুর গন্ধওয়ালা কিছু ব্যবহার করছে, নিশ্চয়ই করছে।
নিজের বেডরুমে না গিয়ে আমি সোজা গেস্ট রুমের দিকে গেলাম। তানজিনার দরজার সামনে গিয়ে মুষ্টি দিয়ে ঠকঠক করে দরজায় টোকা দিতে থাকলাম। জোরে জোরে।
ও সাথে সাথে দরজা খুলে দিল না। তাই আবার টোকা মারলাম। আবার। কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলে গেল। সালোয়ার-কামিজ পরা তানজিনার চোখ আমাকে খালি গায়ে দেখে বড় বড় হয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য মনে হলো— ধ্যাৎ, আসার আগে একটা টি-শার্ট পরে আসা উচিত ছিল।
“আহসান ভাই?” সে অবাক চোখে বলল।
“তোমাকে লেবুর গন্ধওয়ালা ডিটারজেন্ট ব্যবহার বন্ধ করতে হবে,” আমি দুম করে বলে ফেললাম। “আমার দিকে ভালোভাবে তাকাও!”
ওর চোখগুলো আমার খোলা বুকের দিকে নিশানা করল। বুকের র্যাশটা আরো বেড়ে গেছে। ত্বকটা যেন জ্বলছে। ওর চোখে একটু হাসির ঝিলিক দেখা গেল যেন। “ তাকাচ্ছি...”
“আমি লেমন গ্রাসের গন্ধে ভীষণ অ্যালার্জিক,” আমি বুকের দিকে ইশারা করলাম। “ডিটারজেন্টে থাকা একটা কেমিক্যাল এটা। মেশিনে রেসিডিউ থেকে আমার কাপড়ে লেগে যায়। বলো তো— এটা কি দেখতে তোমার কাছে আরামদায়ক বলে মনে হচ্ছে?”
“না।” ওর ঠোঁটে হালকা হাসি। “একদমই না। কিন্তু আমি যদি সুগন্ধি ডিটারজেন্ট ব্যবহার না করি, আমার কাপড়গুলো ফ্রেশ গন্ধ ছড়াবে কীভাবে?”
“গন্ধ ছড়াক আর না ছড়াক আমার তাতে কিচ্ছু যায় আসে না,” আমি রেগে গিয়ে বললাম। “চাইলে কাপড়গুলো নিজ হাতে ধুয়ে নিতে পারো বা বাইরে লন্ড্রিতে দিয়ে দাও। যা খুশি করো। কিন্তু এখন থেকে ওয়াশিং মেশিনে কোনো লেবুর গন্ধওয়ালা ডিটারজেন্ট চলবে না। বুঝেছ?”
সে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “বেশ, খুব পরিষ্কারভাবে বুঝলাম।”
ও বিষয়টা সিরিয়াসলি নিচ্ছে না দেখে আমি আরো ক্ষেপে গেলাম। প্রথমে মেয়েটাকে কত ভদ্র-শান্ত মনে হয়েছিল! এতদিন ওর এই ভয়ংকর রূপটা লুকিয়ে রাখল কীভাবে?
“শোনো,” আমি বললাম, “আমি যদি আবার মেশিনে ওই গন্ধ পাই বা দেখি— তুমি এখান থেকে সোজা বের হয়ে যাবে। আমাদের কোনো লিখিত চুক্তি নেই। আমি যখন খুশি তোমাকে বের করে দিতে পারি।”
এবার ওর মুখের হাসি উবে গেল। “না আপনি সেটা পারেন না।” সে ঠান্ডা গলায় বলল। “বাংলাদেশে ব্যাচেলর বা সাবলেট ভাড়াটেরও অধিকার আছে। আপনি চাইলেই আমাকে নোটিশ ছাড়া বের করতে পারেন না। দরকার হলে আমি থানায় জিডি করব। আইন জানেন, মিস্টার এমবিএ?”
আর হ্যাঁ— ও হয়তো ঠিকই বলছে। সাবলেট বা মেসের ক্ষেত্রে কোনো আইন আছে কি না আমি ঠিক জানি না। জানবোই বা কীভাবে? এভাবে কখনো কাউকে সাবলেট দিতে হবে এটা তো কখনো ভাবিনি। তবে মনে হচ্ছে অন্তত এক মাসের নোটিশ না দিয়ে মনে হয় না বের করে দেয়াটা ঠিক হবে। তানজিনা যদি জিডি করে বসে, তাহলে কী করতে হবে সেটাও জানা নেই আমার। তবে এটুকু বুঝতে পারছি, পরিস্থিতি আমার বিপক্ষে।
আমি ভেবেছিলাম ও হয়তো নীরবে আমার থ্রেট সয়ে যাবে। এখন বুঝতে পারছি, আমি ভুল ভেবেছিলাম।
কথাগুলো বলে তানজিনা আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল। আমি চমকে এক পা পিছিয়ে গেলাম। সে ডিটারজেন্ট বদলাবে কি না জানি না, কিন্তু এতটুকু নিশ্চিত— আমি পরিস্থিতি আরো খারাপ করে ফেলেছি। আর যদি আমাকে আরও কয়েক মাস অন্তত এই মেয়ের সঙ্গে থাকতে হয়, ওকে সহ্য করার উপায়টাও আমার শিখে নিতে হবে। এভাবে ওকে নিয়ে বেশি চিন্তা করলে আমি বোধহয় পাগল হয়ে যাব। আর তাছাড়া, এটাও তো ঠিক যে, আমাদের ওর ভাড়ার টাকাটা দরকার। আমার টেম্প জবের বেতন তো হাস্যকর।
এক হাতে মুঠো করা ছেঁড়া শার্ট নিয়ে ঘুরে দেখি, করিডরের শেষ মাথায় নাবিলা দাঁড়িয়ে আছে। আর স্থির হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তবে মনে হচ্ছে ও হয়তো আমাদের ঝগড়াটা শোনেনি। না শুনলেই ভালো। তাহলে ও কেন ভ্রু কুঁচকে এভাবে তাকিয়ে থাকবে? ওহ! অবশেষে বুঝতে পারলাম। ও আসলে আমার খালি গা দেখে অবাক হয়েছে।
ধুর ছাই!
“নাবিলা,” ওর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম। “বাপারটা...আসলে... যেমন দেখাচ্ছে তেমন না।”
“ওহ রিয়েলি?”
ওর চোখের এই সন্দেহের দৃষ্টি আমাকে প্রায় দু’টুকরো করে দিল। কীভাবে ও ভাবতে পারে আমি তানজিনার সঙ্গে এমন কিছু করব? নাবিলা তো জানে আমি তানজিনাকে ঘৃণা করি।
“আমরা শুধু কথা বলছিলাম,” আমি বললাম। “আসলে ঝগড়া হচ্ছিল। ও আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।”
“আর তোমার শার্ট...?”
আমি নিচে তাকালাম। ডান হাতে শার্টটা মুঠো করে ধরা। এর চেয়ে খারাপ সিচুয়েশন আর হতে পারে না। “আমি ঘরে ঢুকেই এটা খুলেছি, কারণ আমার গায়ে খুব জ্বালা করছে। আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখো।”
করিডরটা একটু অন্ধকার— কেন জানি এই ফ্ল্যাটের এনার্জি সেভার বাল্বগুলো ঠিকমতো আলো দেয় না। তবু এতটুকু আলো আছে যে সে আমার বুক আর হাতে ছড়িয়ে থাকা র্যাশগুলো দেখতে পেল। সাথে সাথে ওর চোখ বড় হয়ে গেল।
“হায় আল্লাহ, আহসান,” সে আঁতকে উঠল। “ভয়ংকর অবস্থা! কীভাবে হলো?”
আমি মুখ বাঁকালাম। “তানজিনা নিশ্চয়ই ওয়াশিং মেশিনে লেবুর ফ্লেভারের ডিটারজেন্ট ব্যবহার করছে। এটাই হবে। সে মানছে না, কিন্তু এ ছাড়া এমনটা হওয়ার কারণই নেই।” আমি ওয়াশিং মেশিনের দিকে তাকালাম। “আমাকে এখনই মেশিনটা ঘষে পরিষ্কার করতে হবে আর সব কাপড় আবার ধুতে হবে।”
নাবিলার মুখটা নরম হয়ে এল। “তুমি কি শিওর? ঠিক আছে। আমিও আসি?”
“না, আমি একাই পারব।” আমি আবার বুকের ওপর নখ বোলালাম। এত নাটকের মধ্যে চুলকানিটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। এখন আবার পরিবেশ শান্ত হওয়ায় সেটা আবার পুরো জোরে ফিরে এসেছে। “তবে... পিঠে অয়েন্টমেন্ট লাগাতে তোমার সাহায্য খুব দরকার হবে।”
নাবিলা চোখ টিপে হাসল। “ওকে। ডান।”
শুকরিয়া, নাবিলা আমাকে বিশ্বাস করেছে। আমার জীবনের প্রায় সবকিছু ইতিমধ্যে ভেঙে পড়েছে। আর এখন যদি নাবিলাকেও হারাই, জানি না আমি কী করব। আমি হয়তো সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাব।
·
·
·
চলবে……………………………………………………