সাবলেট - পর্ব ১৬ - কয়েস সামী - ধারাবাহিক গল্প

ধপাস!

শব্দটা কানে আসতেই হঠাৎ চোখ খুলে গেল। এক মিনিট আগেও আমি গভীর ঘুমে ছিলাম, আর এখন পুরোপুরি জেগে আছি। কিংকর্তব্যবিমূঢ়! সত্যিই কি কিছু একটা শুনতে পেলাম? শব্দটা কি ঘরের ভেতরেই ছিল? নাকি বাইরে থেকে এসেছে? মাথা ঘুরিয়ে বেডসাইড টেবিলের ডিজিটাল ঘড়িটা দেখলাম। রাত ১টা ১৮। একেবারে মাঝরাত!

ধপাস! ধপাস!

আমি চোখ তুলে ছাদের দিকে তাকালাম। শব্দটা মনে হচ্ছে ঠিক আমার মাথার ওপর থেকেই আসছে। সিলিংয়ের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলাম। আমার তাকানোতেই যদি শব্দটা থেমে যেত তাহলে আমি আবার ঘুমিয়ে পড়তে পারব।

ধপাস! ধপাস! ধপাস!

দাঁতে দাঁত চেপে বিছানায় সোজা হয়ে বসে পড়লাম। আমার পাশেই নাবিলা দিব্যি ঘুমাচ্ছে। ও ইদানীং কানে ইয়ারপ্লাগ পরে ঘুমায়। ওর দাবি, আমি নাকি আজকাল খুব নাক ডাকি। তাই যে শব্দটা আমার কান ঝালাপালা করছে, সেটা ও টেরই পাচ্ছে না।

ধপাস!

তানজিনার সাথে ডিটারজেন্ট নিয়ে ঝগড়ার এক সপ্তাহ হয়েছে। একই ফ্ল্যাটে থাকছি ঠিকই, কিন্তু কথাবার্তা একেবারে নেই বললেই চলে। ড্রয়িংরুমে বা করিডরে দেখা হলেই সে আমার দিকে এমনভাবে তাকায় মনে হয় যেন পারলে ওর চোখ দিয়েই আমাকে ভস্ম করে ফেলবে। নাবিলা বলে, আমার নাকি তাকে ‘সরি’ বলা উচিত। কিন্তু আমি আসলে কিসের জন্য সরি বলব? ওর বেয়াদবির জবাব দিলেও কি আমাকে সরি বলতে হবে? 

তবে আমার গায়ের র‌্যাশটা কিছুটা কমেছে। প্রতিবার কাপড় ধোয়ার আগে আমাকে ওয়াশিং মেশিন ঘষে পরিষ্কার করতে হয়। তানজিনাকে আমি একবিন্দু বিশ্বাস করতে পারি না। আমার কিছুতেই মনে হয় না ও আমার বারণ শুনবে।

ধপাস! ধপাস!

আর এখন দেখা যাচ্ছে, আমাকে জ্বালাতন করার নতুন একটা পথ খুঁজে পেয়েছে।

রুমের ভেতর কী করছে সে? অ্যারোবিক্স? কুস্তি? নাকি মাঝরাতে ফ্লোরে লাফালাফি করছে? করতে চায় করুক। আমার তাতে কী? তবে রাত একটায় করবে কেন?

ধপাস!

ব্যাস। আর না। বিলকুল সহ্য হচ্ছে না।

আমি বিছানা থেকে নেমে পড়লাম। রাগে গা জ্বলছে। শুধু শর্টস পরে ঘুমাচ্ছিলাম, তাই গায়ে একটা স্যান্ডো গেঞ্জি চড়িয়ে নিলাম। আমি সাধারণত এর চেয়েও কম কাপড়ে ঘুমাতে পছন্দ করি— কখন ভাগ্য খোলে, কে জানে! কিন্তু দুঃখের কথা, তানজিনা সাবলেট ওঠার পর থেকে ওই দিকটা একদমই ‘স্লো’ হয়ে গেছে। ভাড়াটে এনেছিলাম সংসার খরচ কমাতে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি আগের চেয়েও বেশি টেনশনে থাকছি।

ঘর থেকে বেরিয়েই সোজা দোতলার সিঁড়ির কাছে গেলাম। কিন্তু সিঁড়িতে পা দিতেই ধপধপ শব্দটা হঠাৎ থেমে গেল। অন্তত এখন আর শুনতে পাচ্ছি না। তারপরও আমি নিজের বিছানায় ফিরে গেলাম না। তানজিনাকে জানাতেই হবে— রাত একটায় ও যা-ই করুক, এটা একদমই ঠিক না।

ওর দরজার সামনে পৌঁছাবার আগে একদম থামলাম না। দরজার নিচ দিয়ে আলো বেরোচ্ছে— মানে, ভেতরে লাইট জ্বালানো। আমি মুষ্টি দিয়ে দরজায় একের পর এক ধুমধুম করে ধাক্কা দিলাম। দেরি হলেও একসময় দরজাটা ঠিক খুলে গেল। তানজিনা দাঁড়িয়ে আছে— সেই ছোট হাতার টপ আর থ্রি-কোয়ার্টার পাজামা পরে, তাও আবার ওড়না ছাড়া। তবে আশ্চর্যজনকভাবে, আমার ভেতরে একটুও উত্তেজনা নেই, আছে শুধু বিরক্তি।

“আহসান ভাই।” সে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। “এত রাতে আমার দরজায়? কী সৌভাগ্য আমার!”

“তুমি খুব শব্দ করছ,” আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম। “রাত একটা বাজে। আমি ঘুমানোর চেষ্টা করছি।”

সে নিষ্পাপ মুখ করে চোখ পিটপিট করল। “আপনাকে দুঃসংবাদ দিতে হচ্ছে ভাইয়া— আমি তো শুধু বিছানায় চুপচাপ বসে বই পড়ছিলাম। কয়েস সামীর বই। সাবলেট। খুব মজার। পড়বেন?”

আমি ওর কাঁধের ওপর দিয়ে ঘাড় বাড়িয়ে ঘরের ভেতর তাকালাম— কী খুঁজছি আমিও জানি না। নাচের সরঞ্জাম? কোনো ভারী জিমের ডাম্বেল? তবে ও ভেতরে কী করছিলো সেটা আমার জানার দরকার নেই। দরকার শুধু— শব্দটা বন্ধ হওয়া।

আমি কড়া গলায় বললাম, “এগারোটার পর থেকে আওয়াজ কম করবে, ঠিক আছে? এটা ভদ্রলোকদের বাসা, জিম সেন্টার না।”

“আপনি যদি শব্দ হ্যালুসিনেট করেন, সেটা তো আমার দোষ না, ভাইয়া।”

শব্দ হ্যালুসিনেট? কী বলছে মেয়েটা! আমি পরিষ্কার শুনেছি। আমাদের বেডরুম পর্যন্ত ধপাধপ আওয়াজ যাচ্ছিল। আমি মোটেও কল্পনা করিনি।

আসলেই কি করিনি?

তানজিনা মাথা একটু কাত করল। “আপনাকে আজ খুব একটা সুস্থ দেখাচ্ছে না। মনে হয়, ভালো ঘুম দরকার আপনার।”

“টিপস দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ,” আমি বললাম, আর গালাগালির একটা লম্বা তালিকা কোনোমতে গিলে ফেললাম। “আমি যা বললাম— যা-ই করছিলে, ওটা বন্ধ করো।”

ওর মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি। “জি বস। ঠিক আছে। আর কিছু?”

“না। এইটুকুই।”

“ঠিক আছে।”

তারপর সে আমার মুখের ওপর দরজাটা ধাম করে বন্ধ করে দিল।

আমি ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম। নিজের বেডরুমের দিকে এগোতে থাকলাম। আচমকা ঘুম ভেঙে যাওয়ার ধাক্কায় আর তানজিনার সঙ্গে ঝামেলার কারণে আমার হার্ট এখনো ধকধক করছে। এক ঘণ্টার ভেতর আবার যদি ঘুম আসে তাহলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব। আর শুধু এটুকুই বলব— যদি আবার ওই শব্দ শুরু হয়, তাহলে আমার কাজের দায় আমি নিতে পারব না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp