সাবলেট - পর্ব ২০ - কয়েস সামী - ধারাবাহিক গল্প

          নাবিলার বেস্ট বান্ধবী তিশার হাজব্যান্ড জাহিদের কল পেয়েই বুঝতে পারলাম এই কলটার পেছনে নাবিলার হাত আছে।

লিপস্টিক সংক্রান্ত ঘটনার আজ দুই সপ্তাহ হয়ে গেল। এ নিয়ে তানজিনাকে কিছু বলিনি, কিন্তু নাবিলার সেই আবিষ্কারের পরদিন তানজিনা যেভাবে ‘সব জানি’ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েছিল, তাতে আমার সন্দেহ আরও পোক্ত হয় যে কাজটা ও-ই করেছে। আর আমি পুরোপুরি নিশ্চিত, ওয়াশিং মেশিনে ও কিছু একটা করেছে বলেই আমার কাপড়ে অমন চুলকানি হচ্ছিল। কারণ নাবিলা যেদিন থেকে আমার কাপড় লন্ড্রিতে দিচ্ছে, তখন থেকে আর কোনো সমস্যা হয়নি। র‌্যাশও এখন একদম উধাও।

নাবিলা আর আমার সম্পর্কটা এখন একটু ভালো— যদিও ওর ভেতর একটা সন্দেহজনক ভাব এখনো আছে। ও কি সত্যি সত্যি বিশ্বাস করেছে যে আমি তানজিনার সাথে লুকিয়ে কিছু করছি না। আমার মনে হয় করেছে। কিন্তু একই সময় আমাকে নিয়ে যে ও যথেষ্ট চিন্তায় আছে এটাও বুঝতে পারছি। আজ বিকেলে ও তিশার সঙ্গে বেড়াতে যাবার পর ওর হাজব্যান্ডের ফোন আসা আমাকে এই কথাই বুঝিয়ে দিচ্ছে।   

অফিস থেকে ফেরার পথে বাসা থেকে যখন মাত্র দুই মিনিট দূরে তখনই পকেটে রাখা ফোনটা ভাইব্রেট করতে শুরু করেছিল। আজ বাড়ি ফিরতে কোনো তাড়া ছিল না। আবহাওয়াটা আজ খুব সুন্দর, শরতের শেষ বিকেলের মতো। তাই ধীরেসুস্থে ধানমন্ডির ফুটপাত ধরে হাঁটছিলাম। তাই ভাবলাম, জাহিদের কলটা ধরে ফেলি আর হাঁটার গতি একটু বাড়িয়ে দেই। তাহলে আরো তাড়াতাড়ি বাসায় পৌঁছে যাব। আর তখন ‘দরজার কাছে চলে এসেছি’ বলে কলটা কেটে দেওয়ার অজুহাত দিতে পাারব। কল রিসিভ করতেই জাহিদের হাসিখুশি কণ্ঠ কানে এল, “আহসান ভাই! কেমন আছেন?”

“ভালো,” আবারো মিথ্যা বললাম। “আপনি কেমন আছেন?”

“ভালো ভালো ভালো।” এক শব্দ তিনবার বলার অভ্যাসটা আজ আরও বেশি বিরক্তিকর লাগছে। কিন্তু আমার এই বিরক্তিভাবটা প্রকাশ করলাম না। “আর নাবিলা ভাবি কেমন আছে?”

“জানি না। তিশাকে জিজ্ঞেস করেন, ওরা তো আজ একসাথেই আছে।”

জাহিদ হেসে উঠল। “শোনেন আহসান ভাই, একদিন আমার সাথে আড্ডায় বসবেন নাকি? অনেক দিন তো একসাথে বসা হয় না।”

আমার আসলে মনেই পড়ছে না কবে আমরা একসাথে বসে আড্ডা দিয়েছিলাম। ‘চৌধুরী অ্যান্ড খান’-এ যখন চাকরি করতাম, মাঝেমধ্যেই অনেকে মিলে অফিসের পর কফি বা ডিনারে যেতাম। হয়তো আমি আর জাহিদ সবার সাথে মাঝেমধ্যে গিয়েছি। কিন্তু শুধু আমি আর জাহিদ? না, ওটা কখনো হয়নি। আর এখন তো একদমই ইচ্ছে করছে না। যে কোম্পানি আমাকে বরখাস্ত করেছে, সেই কোম্পানিতে কাজ করা একজনের সাথে আড্ডা দিতে আমার রুচিবোধ হবে না। এর মধ্যে আবার ঐ লোকটা আমার চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় আছে!

“দেখি,” আমি বললাম। আমার যে মতামত নেই, এটা ও নিজেই বুঝে নিক। 

“আমার মনে হয় মজা হবে,” সে বলল। “তিশা আর নাবিলা ভাবি যখন এত ভালো বন্ধু, আমার মনে হয়— আমরাও একসাথে বেশ ভালো সময় কাটাতে পারব।”

আমি এখন স্টার কাবাবের পাশ দিয়ে যাচ্ছি। কাবাবের ভেসে আসা গন্ধে খিদে পেয়ে গেল। বাড়ি ফিরতে তাড়া থাকলেও এক মুহূর্ত থেমে শিক কাবাব আর পরোটা কিনে নেওয়ার কথা ভাবলাম। আর তখনই মনে পড়ল, আগের মতো যখন-তখন টেকআউট করার বাজেট এখন আমার পকেটে নেই। “আমি এখন ভীষণ ব্যস্ত ভাই।”

“ওহ তাই? সব ঠিক আছে তো ভাই?” 
“হ্যাঁ, সব ঠিক আছে। শুধু ব্যস্ত। তবে, ভালো কাজে ব্যস্ত— এই আরকি।” 
“শুনে খুব ভালো লাগল। ভালো ভালো ভালো।” 
“যাই হোক,” আমি চোয়াল শক্ত করে বললাম, “আড্ডায় যেতে আমার আপত্তি নেই, ব্যস্ততাটা একটু কমে যাক। বুঝতে পারছেন?” 
“অবশ্যই,” জাহিদ বলল, “কিন্তু আজই একটা দিন ঠিক করে ফেলি না?” 
“উমম। ঠিক আছে।” আমাদের গলিতে ঢুকে পড়েছি, আমাদের বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে। “কিন্তু এখন আমি বাসায় পৌঁছে গেছি। দরজা খুলতে হবে। তাই... পরে আরেকদিন কথা বলি?”

সে আবার হাসল। “আপনি কি আমাকে এড়িয়ে যেতে চাইছেন, ভাই?”
“না না, একদম না। দেখা তো হবেই। দেখা হলে আমারও ভালো লাগবে।” আমি দ্রুত হেঁটে গেটের দিকে এগোলাম। 
“দারুণ দারুণ দারুণ হবে, বুঝলেন?” 
পকেট থেকে চাবি বের করতে গিয়ে হিমশিম খেলাম। “কিন্তু এখন...”
“আগামী বুধবার কেমন হয়?”
অজুহাত খুঁজে পাচ্ছি না। “উম...”
“দারুণ!” সে বলল। “গুলশানের ‘গ্লোরিয়া জিন্স’-এ রাত আটটায় দেখা হবে। জায়গাটা চেনেন তো?”
অবশ্যই জানি। সেটা আমাদের আগের অফিসের কাছেই। আমাকে যদি ওর সাথে আড্ডাটা দিতেই হয়, তাহলে এমন ক্যাফেতে আমি যাব না যেখানে আমার পুরনো সহকর্মীদের সাথে দেখা হয়ে যায়। ওদের সাথের দেখা করার আমার কোনো দরকার নেই।
“এর চেয়ে বরং ‘নর্থ এন্ড’-এ দেখা করি,” আমি বললাম। ওটা আমাদের দু’জনের বাসা থেকেই কাছে।

“ওকে,” সে বলল। “অনেকদিন পর আড্ডা হবে তবে!” 
“হ্যাঁ,” ওর কথাটা যে ভুল সেটা ধরিয়ে দিয়ে কলটা আরো লম্বা করার রিস্ক নিলাম না। 

আমি একদম মিথ্যা বলছি না। আমার কাছে অফিসের দিনগুলোকে অনেক লম্বা মনে হয়। বয়সে ছোট অফিসারদের স্যার স্যার করতে ইচ্ছে করে না। এখন আমার শুধু একটু রিল্যাক্স করার ইচ্ছে। কিন্তু দরজা খুলতেই আমার শরীরটা ঠান্ডা হয়ে গেল। ড্রয়িংরুমে তানজিনা বসে আছে। 
তানজিনা তার চিরচেনা সালোয়ার-কামিজ পরেছে, তবে আজ পোশাকটা একটু বেশি জমকালো— কালো জর্জেটের কামিজ, আর... বেশ সাজগোজ করেছে। দেখতে... দারুণ লাগছে। ও কি এখন কারো সাথে বেড়াতে যাবে? যদিও তানজিনাকে কোনো ছেলের সাথে কল্পনা করাই কঠিন। ওর যা স্বভাব। ওর মতো কুটবুদ্ধিওলা কারো প্রেমে কোন ছেলে পড়বে?
“হ্যালো, আহসান ভাই,” সে বলল। 
“কোথাও যাচ্ছ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। 
“হয়তো।”
ও একটু হেসে ব্যাগ থেকে একটা আয়না আর লিপস্টিক বের করল। আয়না খুলে ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাতে থাকল। খেয়াল করে দেখলাম রংটা গাঢ় লাল। বুঝতে আমার আর কিছু বাকি থাকল না। 

এটা ঠিক সেই শেড, যেটা আমার শার্টের কলারে ছিল।
“লিপস্টিকটা কোথায় পেয়েছ?” প্রশ্নটা আর আটকাতে পারলাম না। 
সে ঠোঁট টিপে মিষ্টি হেসে বলল, “আপনাকে কেন বলব?”
আমার চোখে ভেসে উঠল, তানজিনা আমাদের বেডরুমে ঢুকে আমার শার্টগুলোর কলারে লিপস্টিক ঘষছে। ও চেয়েছিল নাবিলা লাল দাগটা দেখুক, আর আমি ঝামেলায় পড়ি। এই মেয়েটার সমস্যাটা কী? আমি ওর সাথে এমন কী করেছি যে আমাকে এতটা ঘৃণা করে? ও কেন আমার আর নাবিলার সংসার নষ্ট করতে এত মরিয়া?
“তুমি না একটা জঘন্য মেয়ে,” আমি চিৎকার করে উঠলাম। 
তানজিনা আয়নাটা আবার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল। রক্ত-লাল ঠোঁটে হাসিটা মিলিয়ে গেছে। “এক্সকিউজ মি? আপনার সামনে লিপাস্টিক লাগিয়েছি বলে আমি জঘন্য হয়ে গেলাম?”
“তুমি যা করেছ, সেটা লুকোবার চেষ্টা করো না মেয়ে। খুব খারাপ হবে বলে দিচ্ছি!”
তানজিনা লিপস্টিকটা ব্যাগে রেখে ব্যাগটা চেইন টেনে বন্ধ করল। “আমার কথা বেশি না ভেবে আপনার নতুন চাকরি নিয়ে ভাবুন। সেটাই আপনার জন্য ভালো হবে।”  
রাগে আমার গা পুড়ে যাচ্ছে যেন। “আমার চাকরি নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। ওটা ভালোই চলছে।”
সে ভ্রু তুলে বলল, “হ্যাঁ? ভাবাটা আসলেই কঠিন। বিশেষ করে, আপনার আগের কোম্পানিতে যা হয়েছিল...”
আগের কোম্পানিতে যা হয়েছিল? এর মানে কী? ও কী সবকিছু জানে?
তানজিনা ঘড়ির দিকে তাকাল। “যাই হোক, আমাকে বের হতে হবে। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
“থামো।” আমি ওর পথ আটকে দাঁড়ালাম। “তুমি কী বলছ? আমাকে ওই কথা কেন বললে?”
“ওহ আহসান ভাই,” সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আপনার উচিত অন্যদের নিয়ে কম ভাবা, আর নিজেকে নিয়ে বেশি চিন্তা করা। আপনাকে দেখতে একেবারে বিধ্বস্ত লাগছে কিন্তু।”
এই বলে সে আমাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। আল্লাহ, আমার যদি যথেষ্ট পরিমাণ টাকা থাকত, আজই ওকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতাম। 
আমি আঙুল দিয়ে চোখ কচললাম। আামকে কি সত্যিই এত খারাপ দেখাচ্ছে? বাথরুমের আয়নায় গিয়ে দেখে নেওয়ার লোভ হচ্ছে, কিন্তু যা দেখতে পাবো, তা নিশ্চয়ই আমার ভালো লাগবে না। ঘুমহীনতা আমাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
কিন্তু ও আমার চাকরি নিয়ে ওই মন্তব্য করল কেন? তানজিনা আমাকে ঘৃণা করার আগে, আমাদের মধ্যে তো কয়েকদিন ভালো কথাও হয়েছিল। কিন্তু তখনো তো আমি ওকে কখনো বলিনি কেন আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। সে কি আসলেই জানে ব্যাপারটা? নাকি আমার সাথে খেলছে? আমার বরখাস্ত হওয়ার ডিটেইলস ওর জানাটা প্রায় অসম্ভব। যদি না...

আমার বুকটা হঠাৎ করে ধড়ফড় করতে থাকল। তানজিনা কি কেবল ‘কাকতাল’ হয়ে আমার ঘরে এসেছে? নাকি শুরু থেকেই সে সবকিছু প্ল্যান করে করেছে?

সে কি এখানে আমাকে টার্গেট করেছে? নাকি আমার সর্বনাশ করার জন্যই এখানে এসে উঠেছে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp