এত ব্যস্ত একটা জায়গা, যেখানে চারিদিকে ঘিরে আছে উঁচু উঁচু অট্টালিকা, ফুটপাথে শেষ বিকেলের অফিসফেরত ঘরমুখী মানুষের ঢল, যানবাহনের চলাচলে সরগরম পথ, সেখানে কান্না পেলেও কাঁদা সম্ভব নয়। খুব দ্রুতই নিজেকে সামলে ফেলল ঊষা।
এমন ভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করল যেন কিছুই হয়নি।
“এক্সকিউজ মী!”
পেছন থেকে শুনতে পেল ঊষা। অন্য কাউকে ডাকছে ভেবে দাঁড়াল না।
“এক্সকিউজ মী মিস!”
থমকে দাঁড়াল ঊষা। ওকেই ডাকছে নাকি?
কিন্তু কেন?
চোখে সপ্রশ্ন দৃষ্টি নিয়ে ঘুরে তাকাল ঊষা।
“মিস, এই কার্ডটা রেখে দিন। ভালো মনে করলে যোগাযোগ করবেন।”
“আরে কী আশ্চর্য কে আপনি?”
“ইউ আর নট ইন দ্যা রাইট মুড টু টক নাউ! আপনি একটু স্টেবল হয়ে যোগাযোগ করবেন। কথা হবে।”
ঊষাকে মোটামুটি হতভম্ব অবস্থায় ফেলে রেখে চলে গেল লোকটা। লোকটা চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পর হাতে ধরে রাখা কার্ডটা চোখের সামনে তুলে ধরল ঊষা।
কার্ডে লেখা আছেঃ
রাকিব আহমেদ
ওয়েব ডিজাইনার
লীড বাংলাদেশ লিমিটেড
তারপর একটা ফোন নাম্বার আর ইমেইল এড্রেস দেওয়া। মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারল না ঊষা।
পরে কোনো অবসর সময়ে সার্চ করে দেখবে ব্যাপারটা কী, এই ভেবে কার্ডটা গুঁজে রাখল পার্সের এক কোণায়।
কাঁধের ব্যাগটা অসম্ভব ভারি মনে হচ্ছে। সকালে যখন বের হয়েছিল তখন এতটা ভারি মনে হয়নি।
হয়ত তখন মনে আনন্দ ছিল বলেই। এখন বুকের ভেতর চেপে আছে একটা পাষাণভার, সামনে কেবলই অনিশ্চয়তা।
গায়ে ইয়েলোর দামি ড্রেস, মুখে ভারি মেক আপ, এই অবস্থায় বাসায় ফিরে গেলে ওকে ঠিক কীসের মধ্যে পড়তে হতে পারে জানে না ঊষা। আপু কিছু চোখা চোখা কথা শোনাবে নিশ্চিত।
কোনো ফ্রেন্ডের বাসায় চলে যাবে নাকি? সেখানে গিয়ে ড্রেসটা চেঞ্জ করে মেক আপ তুলে বাসায় ফিরবে?
ভাবতে গিয়ে মেজাজ বিগড়ে গেল ঊষার। আপুকে এত পাত্তা দেওয়ার কী আছে?
বাসায় দুটো টাকা দেয় বলে নিজেকে কী ভাবে সেই জানে। নাহ, মেক আপ তুলবে না, ড্রেসও চেঞ্জ করবে না ঊষা।
যা ইচ্ছা বলুক আপু। এভাবেই বাসায় ফিরবে ঊষা।
ট্র্যাফিক জ্যাম ঠেলে বাসায় ফিরতে ফিরতে সাতটা চল্লিশ বেজে গেল। আম্মু দরজা খুলে আতঙ্কিত গলায় বলল, “কোথায় গিয়েছিলি?”
জুতোর স্ট্র্যাপ খুলতে খুলতে সংক্ষেপে উত্তর দিলো ঊষা, “একটা প্রোগ্রাম ছিল।”
“পার্লারে সেজেছিস?”
উত্তর দিলো না ঊষা। ঘরে যেতে যেতে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল ঊর্মির সাথে।
কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল ঊর্মি। কিছু বলবে না বলবে না ভেবেও মুখ ফসকে বলে ফেলল ঊষা, “কী?”
“এই ড্রেসটা কবে কিনেছিস?”
“কিনিনি, অফিসের একটা প্রোগ্রামের জন্য দিয়েছিল।”
মনে মনে নিজের সাথে যতই ড্যাম কেয়ার ভাব দেখাক না কেন ঊষা আসলে এখনো অল্প অল্প ভয় পায় বড়ো বোনকে।
ঊর্মি ভ্রূ কুঁচকে বলল, “কী অফিস এটা যে প্রোগ্রামের জন্য ড্রেস দেয়?”
ঊষা ঝাঁঝালো স্বরে বলল, “তা দিয়ে তোমার দরকার?”
“নাহ, আমার আবার কী দরকার। শুধু বলছিলাম যে কোনো ঝামেলায় পড়ে যাস কিনা সেটা নিয়ে সাবধানে থাকিস।”
“থাকব। তোমার অত ভাবতে হবে না।”
“ড্রেসটা কি আমি একটা প্রোগ্রামে পরতে পারি? যদি তোর কোনো অসুবিধা না থাকে।”
“না, কোনো অসুবিধা নাই আমার। কী প্রোগ্রাম?’
“পরশু দিন একজনের মেহেদি। আমাকে দাওয়াত করেছে। কী পরে যাব সেটা নিয়ে চিন্তা হচ্ছিল…”
“নিও। আর কিছু লাগবে, ম্যাচিং পার্স, অর্নামেন্টস?”
“দিস, থাকলে।”
দুই বোনের মধ্যে আবার একটা ঝামেলা বেঁধে যায় কিনা তাই নিয়ে চিন্তিত ছিল আম্মু শাহিদা পারভিন। সেরকম কিছু হলো না বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে।
ঘরে ঢুকে কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে রাখতে রাখতে মুখ বাঁকাল ঊষা। আপু নিজেকে যতটা নীতিবাগিশ বলে প্রমাণ করতে ব্যস্ত, ঠিক ততটা আসলে নয় সে।
নাহয় জানতে চাইত কে দিয়েছে এই ড্রেস, কেন দিয়েছে, কী বৃত্তান্ত কী সমাচার। কিন্তু নিজের স্বার্থে লাগবে বলে ঠিকই চেপে গেল এখন।
ঊর্মির নৈতিকতার একটা খুঁত বের করতে পেরে মুখে নিষ্ঠুর হাসি খেলে গেল ওর।
অন্য দিকে নিজের ঘরে বসে ঊর্মি ভাবছিল, ঊষা এত সেজেছে কেন? কী চাকরি এটা ওর যেখানে এত ভারি মেক আপ করতে হয়? আবার নাকি অফিস থেকে ড্রেসও দিয়েছে।
এই অনুষ্ঠানটা যাক, তারপর ঊষাকে ভালো করে একদিন চেপে ধরতে হবে। কোনো বিপদে না জড়িয়ে যায় আবার।
পরশু দিন তুহিনের বোনের মেহেদি। কী পরবে সেটা নিয়ে এতক্ষণ ধরে চিন্তিত ছিল সে।
ঊষার ড্রেসটা পেয়ে সমস্যার সমাধান হলো আপাতত। এটা একটা এক্সক্লুসিভ পার্টি ড্রেস, আশা করা যায় ভালোই মানিয়ে যাবে।
সত্যি কথা বলতে, তুহিন যে এত বড়ো বাড়ির ছেলে, সেটা ওকে প্রথম দিন দেখে কল্পনাই করতে পারেনি ঊর্মি। সাদামাটা একটা লাল কালো স্ট্রাইপড পোলো টি শার্ট পরে ছিল ও।
আর পাঠাও ড্রাইভারের চেহারা অথবা পোষাকের দিকে কেই বা মন দিয়ে তাকায় ভাই? তখন তো ঊর্মির মাথায় ছিল প্রেজেন্টেশনের চাপ, যত দ্রুত সম্ভব অফিসে পৌঁছানোর তাড়া।
তুহিনকে ও ভালোভাবে লক্ষ্য করেছিল তৃতীয় দিনের দেখায়, যেদিন একটা নেভি ব্লু রঙের সেমি ফর্মাল শার্ট পরে এসেছিল ও, সাথে গ্যাভার্ডীনের প্যান্ট। বলতে নেই অনেক সুন্দর লাগছিল ওকে দেখতে।
সেদিনই ইনস্টাগ্রামে এড হয়েছিল ওরা। আর রাতে অবাক হয়ে দেখেছিল ঊর্মি, তুহিন ওর ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেছেঃ
একটা জন্ম এমনি এমনি কেটে গেলো।
একটা জীবন দেখতে দেখতে চলে যাচ্ছে।
একটা জন্ম রেখেছিলাম তোমার সঙ্গে কথা বলার,
একটা জীবন রেখেছিলাম কাঁঠালতলায় মাদুর পেতে
তোমার পাশে কাটিয়ে দেবো।
একটা জন্ম রেখেছিলাম বাঁশকাগজে স্টিলের নিবে
এমনি এমনি পদ্য লেখার,
একটা জীবন রেখেছিলাম তোমার জন্যে পদ্য লেখার
একটা জীবন এমনি এমনি চলে গেলো।
একটা জন্ম জোড়াতালির, ভাত কাপড়ের তক্কে তক্কে
একটা জীবন মাথা গোঁজার ফন্দি খুঁজে,
একটা জীবন বাক্স মাথায় ভুল শহরে
ভুল ঠিকানায় ঘুরে ঘুরে,
একটা জন্ম এমনি এমনি কেটে গেলো,
একটা জীবন দেখতে দেখতে চলে যাচ্ছে।
তোমার সঙ্গে ভালো করে কথা বলাই হলো না।
—————
তোমার সঙ্গে ভালো করে কথা বলাই হলো না! -
তারাপদ রায়
বুকের ভেতর ধুপধাপ নদীর পাড় ভাঙবার শব্দ শুনতে পেয়েছিল ঊর্মি। ইনবক্সে মেসেজ দিয়ে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিল, “এই পোস্টের অর্থ কী?”
তুহিনের সহজ সরল উত্তর ছিল, “কোনো অর্থ নেই। এক জায়গায় পেলাম লাইনগুলো, পোস্ট করতে ইচ্ছা হলো, করে ফেললাম!”
“ও আচ্ছা” হতাশ হয়েছিল ঊর্মি।
“মন খারাপ হলো?”
অপ্রস্তুত হয়েছিল ঊর্মি, “না তো! মন খারাপ হবে কেন?”
“যদি বলি আপনার জন্য পোস্ট করেছি, তাহলে তো বিশ্বাস করবেন না!”
“কিন্তু আমার জন্য তো করেননি!”
“তা ঠিক। স্পেসিফিক্যালি শুধু আপনার জন্য করিনি। কিন্তু আপনার কথাও মনে পড়ছিল অল্প অল্প।”
সেদিন রাতে আর কথা বাড়ায়নি ঊর্মি। কিন্তু এর ঠিক চারদিন পর অফিস থেকে বেরিয়েই দেখা পেয়ে গিয়েছিল তুহিনের।
“আপনি?”
“হারুনের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম!”
“হারুন ভাই তো আজকে অফিসে আসেনি!”
“জানি তো!”
“তাহলে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন যে?’
”যদি বলি আপনার জন্য, বিশ্বাস করবেন না তো?”
হেসে উড়িয়ে দিয়ে রিকশায় উঠে পড়েছিল ঊর্মি। কিন্তু কিছুক্ষণ পর চোখে পড়েছিল তুহিনের পোস্টঃ
“তুমি যেখানেই যাও
আমি সঙ্গে আছি
মন্দিরের পাশে তুমি শোনোনি নিঃশ্বাস ?
লঘু মরালীর মতো হাওয়া উড়ে যায়
জ্যোৎস্না রাতে
নক্ষত্রেরা স্থান বদলায়
ভ্রমণকারিণী হয়ে তুমি গেলে কার্শিয়াং
অন্য এক পদশব্দ
পেছনে শোনোনি?
তোমার গালের পাশে ফুঁ দিয়ে কে সরিয়েছে চূর্ণ অলক?
তুমি সাহসিনী,
তুমি সব জানলা খুলে রাখো
মধ্যরাত্রে দর্পণের সামনে তুমি--
এক হাতে চিরুনি
রাত্রিবাস পরা এক স্থির চিত্র
যে-রকম বতিচেল্লি এঁকেছেন;
ঝিল্লির আড়াল থেকে
আমি দেখি
তোমার সুঠাম তনু
ওষ্ঠের উদাস-লেখা
স্তনদ্বয়ে ক্ষীণ ওঠা নামা
ভিখারী বা চোর কিংবা প্রেত নয়
সারা রাত
আমি থাকি তোমার প্রহরী।
তোমাকে যখন দেখি, তার চেয়ে বেশি দেখি যখন দেখি না
শুকনো ফুলের মালা যে-রকম বলে দেয়
সে এসেছে
চড়ুই পাখিরা জানে
আমি কার প্রতিক্ষায় বসে আছি
এলাচের দানা জানে
কার ঠোঁট গন্ধময় হবে ...
তুমি ব্যস্ত, তুমি একা, তুমি অন্তরাল ভালোবাসো
সন্ন্যাসীর মতো হাহাকার করে উঠি
দেখা দাও, দেখা দাও
পরমুহূর্তেই ফের চোখ মুছি,
হেসে বলি,
তুমি যেখানেই যাও, আমি সঙ্গে আছি।”
(সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)
ইনবক্সে মেসেজ এসেছিল, “আজকের পোস্টটা আপনার জন্য। সত্যিই!”
সেই শেষ বিকেলে কর্মক্লান্ত ঘর্মাক্ত সব অফিস ফেরত মানুষের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে বাসায় ফিরে যেতে যেতেও এই ধূসর বিবর্ণ শহরটাকে ঊর্মির অনেক সুন্দর মনে হয়েছিল…
·
·
·
চলবে……………………………………………………