পরনের ঢিলেঢালা কুর্তি মুঠোয় ভরে আয়নায় নিজেকে দেখে। সবার আগে ফুলো পেট দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বড় শ্বাস টেনে আঁটকে মেদ ঢাকার বৃথাই চেষ্টা। অরুণিতার গম্ভীর চোখ জোড়া ভিজতে চায়। নিজের উপরই অসম্ভব রাগ জমে। আঁটকে রাখা শ্বাস ফেলে বিছানায় মরার মতো পড়ে রয় বেশ সময়। উপলব্ধি করে যাঁরা খুব সহজেই কাঁদতে পারে দুনিয়ায় তাঁরা দুনিয়ায় সবচেয়ে সুখী মানুষ। উঠে বসে অরুণিতা। ওড়না গলায় পেঁচিয়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। ড্রয়িংরুমে আসতেই সেই অসহনীয় ডাক।
“এই মোটু? এদিকে আয়?”
অরুণিতা গম্ভীর মুখে এগিয়ে আসে। রূপক চিপস খাচ্ছিলো। চিপসের প্যাকেট বাড়িয়ে বললো, “মোটু বললাম বলে রাগ করলি নাকি? শোন তোকে তো ভালোবেসে মোটু ডাকি। তাই রাগ করলেও আমি ডাকবোই।”
অরুণিতা চিপস নিলো না গম্ভীর সুরে বলল, “ডাকলে কেন সেটা বলো?”
রূপক খানিকটা সময় নিয়ে বলল, “তোর ওই ফ্রেন্ড মনিকা, কেমন রে?”
অরুণিতার গাম্ভীর্যের ভরপুর চোখ দুটো ছোট ছোট হয়ে আসে, “ইউ লাইক হার?”
রূপক খানিকটা মিইয়ে যাওয়া সুরে বলল, “তেমন না। আসলে মেয়েটি আমার ফ্রেন্ডলিস্টে এড আছে। প্রায়শই নক দিয়ে খোঁজখবর নেয়।”
অতি সংগোপনে প্রেম প্রস্তাবের কথা এড়িয়ে যায় রূপক সরকার। অরুণিতা অবিচল ভঙ্গিতে বলল, “খারাপ না, ভালোই। ভাইটুসের পেছনে পড়ে ছিল পাত্তা না পেয়ে তোমার দিকে ঝুঁকেছে।”
রূপকের মুখটা কালো হয়ে আসে। ‘সব রমনীর নজর কেন ব্রোর উপর গিয়ে পড়ে’ বিড়বিড় করে বড় ভাইগিরি দেখানোর অভিপ্রায়ে হুট করে তেতে উঠলো,
“ওসব ফালতু মেয়েদের সাথে কিসের বন্ধুত্ব? ওর সাথে মিশবি না খবরদার। আর আমার হয়ে দু’টো চড় মেরে দিবি। ফালতু মেয়েছেলে!”
“সি’জ মায় ক্লাসমেট নট ফ্রেন্ড। ইভেন আই ডোন্ট হ্যাভ এনি ফ্রেন্ড।”
“তানজু তোর ফ্রেন্ড না? মেয়েটা কিন্তু কিউট আছে। সেদিন আমাকে দেখে মুচকি হাসছিলো।”
“তোমার লজ্জা করে না?”
“আশ্চর্য লজ্জা করবে কেন?”
“চাচিমনিকে বলবো?”
ব্যস রূপক সরকারের হাস্যোজ্জ্বল মুখটা ভোঁতা হয়ে আসে। মচমচে শব্দ করে চিপস খেয়ে বলল, “ওত বড় উপকার করার দরকার নাই বোন। তোদের দার্জিলিং ট্যুরের কি হলো?”
“ক্যান্সেল হয়ে গেছে। ভাইটুসের বিপিএল আছে না?”
“অরু শোন?”
অরুণিতা ফিরে আসে। রূপক চিপস খেতে খেতে বলে, “অদ্রিতার ফেসবুক আইডি কোনটা?”
অরুণিতা তাকে উপেক্ষা করে মায়ের ঘরের দিকে যায়। রূপক ভাইয়া যে নিছক মজার ছলে বলে তাঁর জানা হয়ে গেছে। মেয়েদের দেখলেই তো হাঁটু কাঁপে তাঁর। প্রতিমধ্যে অরুণিতার দেখা হয় আনিকার সাথে। আনিকা তাঁকে দেখেই জানতে চাইলো,
“ফোর টুয়েন্টি কই রে? সকাল থেকে দেখতে পেলাম না? পুলিশ টুলিশ নিয়ে গেলো না তো?”
অরুণিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পাপা কর্তৃক নির্ধারিত ভাইয়ার আরেক ডাক নাম ‘ফোর টুয়েন্টি’। অবশ্য নামটা একেবারেই বেখাপ্পা বলা চলে না। ভাই লাইফে শুধু একটা জিনিস নিয়েই সিরিয়াস, সে ক্রিকেট। বাকি সবে তাঁর গা ছাড়া ভাব। সারাদিন টুটুল ভাইয়ার সাথে টইটই করে ঘুরে বেড়াবে। পাড়ায় মহল্লায় ম্যাচ খেলবে। জিতলে জমিয়ে পার্টি করবে। মহল্লায় ভাই যে টিমের হয়ে মাঠে সেই টিম কখনো হেরেছে বলে মনে হয় না। তাই ছোট বড় প্রতিটি টুর্নামেন্টে ভাইয়ের খোঁজ করি হয়। একদল ছেলেপেলে আসবে ভাইকে নিতে। তারপর পাপা নয়তো মাম্মামের কাছে ঝাড়ি খাবে একদফা। সেই ঝাড়িতে তাঁরা মন খারাপ করে না বরং এনজয় করে। সাথে ভাইকে নিয়ে চলে যায়।। সন্ধ্যার আগে ভাইয়ের বাড়ি ফেরার আদেশ দেওয়া হলেও তাতে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভাই মাঝ রাতে চোরের মতো ঘরে ঢুকবে। তাতেও কাজ হয় না। পাপা ছেলে না ফেরা অবদি দুচোখের পাতা এক করবে না। ছেলে ফিরলে তাঁকে দু’টো ধমক দিয়ে তবেই সে বিছানায় পিঠ ঠেকাবে।
“কি রে কোথায় হারালি?”
“কোথাও না আপু। ভাইটুস বোধহয় টুর্ণামেন্ট খেলতে সাভার গেছে। তুমি ভাইটুসকে ফোন করছো না কেন?”
“তোর ফোরটুয়েন্টি ভাই আমার ফোন ধরবে?”
“সে ফোর টুয়েন্টি নয় আপু। আর হ্যাঁ আর কারো ফোন না ধরলেও তোমার ফোন সে মিস করবে না। করেই দেখো!”
আনিকা ফোন বের করে সন্দিহান সুরে শুধালো, “কারো ফোন না ধরলেও আমার ফোন কেন ধরবে?”
“হয়তোবা তুমি স্পেশাল।”
অরুণিতা খুবই স্বাভাবিকভাবেই বলল। আনিকা আরো কিছু শোনার জন্য মুখিয়ে রইলো। কিন্তু অরুণিতা কাঙ্ক্ষিত কিছু শোনালো না বিধায় ফোন কানে চেপে বলল,
“শয়তান সেদিন আমার চুলে চুইংগাম লাগিয়েছে। মহল থমথমে ছিলো বিধায় চুপ ছিলাম। নয়তো চাচ্চুকে বলে ওকে ন্যাড়া করিয়েই ছাড়তাম। রিসিভ করেছে কথা বলি ওয়েট!”
অরুণিতা চলে যেতে নিলে আনিকা বাহু ধরে আটকে দিল।
“ওই ফোর টুয়েন্টি কই তুই?”
ওপাশ থেকে ভারী শ্বাসের আওয়াজ আসে। নিশ্চয়ই মাঠে খেলছে। আনিকা অধৈর্য হয়ে উঠলো, “বাংলা সিনেমার নায়িকাদের মতো অশ্লীল ভঙ্গিতে শ্বাস নিচ্ছিস কেন বে?”
“যা বলার জলদি বল? আমি ব্যাট করতে নেমেছি। পানি খাওয়ার বাহানায় যাস্ট দুমিনিট সময় বের করেছি।”
ওপাশ থেকে অরুণাভ হাঁপায়। সদ্যই দৌড়ে মাঠের একপ্রান্তে এসেছে। আনিকা ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমি এখানে টেনশনে মরি আর তুই মনের সুখে খেলছিস?”
“সুখ কিংবা দুঃখ দুইয়ের সঙ্গী ক্রিকেট। আমার প্রথম প্রেম সে বুঝেছিস?”
আনিকার রাগ হলো। সে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলল, “সেদিন তৈমুরের সাথে দেখা করতে গেলাম না? তো ওই লোক ওনার বাড়িতেও নিয়ে গিয়েছিল। আন্টির সাথে দেখা করার জন্য। ভদ্রমহিলা শ্বাশুড়ি হিসেবে খারাপ না, ভালোই। মা মা ডেকে কান পঁচিয়ে ফেলেছে।”
অরুণাভ ঘামে ভেজা মুখটায় রুমাল ঘষে, কিছু বলে না। আনিকা আবারও বলতে শুরু করল, “তো ঘটনা হলো মহিলা ফোন করেছিল। তাঁর ভাতিজির বার্থডে পার্টি হবে আজ সন্ধ্যায়। আমাকে যাওয়ার জন্য ফোর্স করছে। আমি নিষেধ করলেও আম্মুকে ধরেছে। আর আম্মু রাজি। সে এখন আমাকে ফোর্স করছে।”
“তো আমাকে কি করতে বলছিস তুই?”
আনিকা এমন প্রশ্ন আশা করে নি মোটেই। ঠোঁট ঠোঁট চেপে ভাবলো। সত্যিই তো? সে এসব এই গাধাটাকে কেন বলছে! সে বাহানা দেখায়,
“বলছিলাম এই কারণে, আসলে বার্থডে গার্লকে গিফট দিতে হবে না? আমার হাতে টাকা নেই। তুই কি কিছু টাকা ধার দিবি? হ্যালো শুনতে পাচ্ছিস?”
ওপাশ থেকে ফোন কেটে দেওয়া হয়েছে আগেই। আনিকা ফোনের স্ক্রিনে কিছুপল তাকিয়ে রইলো। মুখে হাসি লেগে থাকলেও চোখের পানি চিকচিক করছে।
“আনিপু?”
“হু?” নিজেকে সামলে অরুণিতার দিকে ফিরে বলল, “তোর কাছে হাজার দুয়েক টাকা হবে অরু?”
অরুণিতা শান্ত চোখে চায়। কাঁধে নরম স্পর্শ করে বলল, “আপু ভাইটুস রেগে আছে।”
“ওর রাগের কি হলো?”
“তোমার কান্নার কি হলো?”
আনিকা নজর লুকায়। অরুণিতা ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল, “তোমাদের বুক ফাটে কিন্তু মুখ ফোটে না। ভেতর ভেতর পুড়বে দু’জনেই অথচ ভাব করবে না।”
“কি বলছিস অরু? তোর কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।” আনিকা অবুঝ হওয়ার চেষ্টা করলো। অরুণিতা চোখ উল্টিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করে বলল, “বুঝতে হবে না ফিটার খাও। অসহ্য।”
রাগ দেখিয়ে অরুণিতা চলে যায়। আনিকা গোমড়া মুখ বানিয়ে পিছু ফিরতেই চমকে ওঠে। হাতের ফোন ফসকে পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। আনিকা অপ্রস্তুত হেসে থতমত খেয়ে বলে,
“আম্মু তুত..মি এ…খানে? এ..এভাবে কে দাঁড়ায়। ভয় পেয়েছিলাম আমি।”
“ঘরে আসো আনিকা। কথা আছে!” রুবি গম্ভীর মুখে বলে চলে যায়। আনিকা হতাশ বদনে তাঁর পিছু হাঁটে। তবে সবের মাঝেও তাঁর ভরসা, ফোর টুয়েন্টি তাকে কোনো না কোনো বাহানায় ঠিকই আঁটকে নিবে।
—————
ব্যাথিত হৃদয়ে ভাইটুসের দেওয়া বউ পুতুলটার মাথায় একটু পরপরই জলপট্টি দেয় প্রহর সরকার। থার্মোমিটার মুখে তাপমাত্রা রেকর্ড করে। কি দেখলো কে জানে। দুঃখ প্রকাশ করে বলে,
“৪২০ লিটার জ্বর। তোমার তো মরে যাওয়ার কথা। তুমি মরছো না কেন? তুমি মরলে পাপা আমাকে মানুষ বউ এনে দিবে। জলদি মরে যাও না পুতুল বউ।”
“বউয়ের আশা ভুলে যান। আপনার পাপা আপনাদের দুই ভাইকে বিয়ে করাবে না।”
পাতা ছেলের মুখে খাবার দিয়ে বলে। প্রহর খাবার মুখে নিয়েই হড়গড় করে বলে, “কেন কেন? পাপা নিজে বিয়ে করেছে তাহলে আমাদের কেন বিয়ে করাবে না?”
কি সুন্দর বড়দের মতো লজিক টেনে আনলো। পাতা হাসে, “এতো বউ বউ করলে তো জ্বালা। আগে বড় হ তারপর বিয়ে করাবো।”
“ভাইটুসের সমান?”
“হ্যাঁ বাবা হ্যাঁ। ”
“তাহলে ভাইটুসকে কেন বিয়ে করাচ্ছো না?”
পাতা তেতে ওঠে, “এতো কথা বলিস কেন? আরেকটা কথা বললে তোর মুখ আমি সেলাই করে দিবো।”
“আমার মুখ কি কাপড়?”
“কাপড় কেন হবে?”
“তাহলে তুমি সেলাই কেন করবে?”
“ওরে আল্লাহ একে কেউ থামা!”
“আমি কি রিকশা?”
“রিকশা কোত্থেকে এলো আবার!” পাতা অতিষ্ট বোধ করে। প্রহর বড়দের মতো ভাব নিয়ে বলল, “তাহলে আমাকে থামতে কেন বলছো?”
“একদম মিউট।”
“আমি কি টিভির চ্যানেল যে বাটন টিপলে মিউট হয়ে যাবো।”
“মার খাবি?”
“মার কি খাওয়া যায় মাম্মাম? মার তো ব্যথা অনুভব করার একটা মাধ্যম মাত্র।”
পাতা হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারে না। কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, “আব্বা, তোকে এসব বড় বড় কথা কে শেখায় বলতো?”
প্রহর হাসে। খরগোশের মতো ঈষৎ উচু, বড় দাঁত দুখান দেখিয়ে বলল, “পাপা।”
“আসুক তোর পাপা। তাঁর ঠ্যাং না ভেঙেছি তো আমার নাম বদলে ‘তারাবানু’ রাখবো।”
“সো সুইট নেম মাম্মাম।”
পাতা কটমট করে তাকালো। প্রহর মুচকি হেসে বলল, “মাম্মাম তুমি কি রেগে আছো?”
পাতার কপাল কুঁচকে গেল। প্রহর হেসে বলল, “পাপা বলে, রাগলে তোমাকে ব্যাঙের বাচ্চার মতো লাগে।”
‘শালার জামাই বাড়ি ফিরো, তোমার কপালে আজ দুঃখ আছে’ পাতা বিড়বিড় করে ছেলেকে ধমকালো। ধমকে আদুরে মুখটা এইটুকুন হয়ে আসে। আর কথা বলে না। চুপচাপ খাবার খেয়ে নেয়। পাতা থমথমে মুখে খাবার টুকুন খাইয়ে মুখ মুছে দেয়। তারপর ছেলেকে বুকে টেনে আদর করে সাড়ামুখে। গোমড়ামুখো ষপ্রহর মিটিমিটি হেসে দেয়। পাতা গালে ঠোঁট দাবিয়ে রেখেই বলল, “আমার জানটুসরে মন চায় বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখি। পাকা বুড়ো হয়েছে একটা।
“একজন বাপের প্রাণভোমরা তো আরেকজন মায়ের জানটুস। আর আমি বার্গারের ভেতর থাকা অবহেলিত টমেটো স্লাইস।”
তৃতীয় কারো আওয়াজে পাতা ও প্রহর দুজনেই দরজার দিকে ফেরে। অরুণিতা সরকার গম্ভীর মুখে এগিয়ে আসে। পাতা হেসে দিলো।
“তুই তো রাস্তায় বসে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদছিলি। তোর পাপার মায়া হলো, কোলে তুলে নিলো। ব্যস কাহিনী শুরু।”
অরুণিতা ছোটবেলার মতো হাউমাউ কান্নায় ভেঙে পড়ে না। ঠোঁট বাঁকিয়ে একটুখানি হাসার চেষ্টা করে। মেঝেতে বিছানো মাদুরে বসে মায়ের কোলে মাথা গুঁজে দিল। পাতা ছেলেকে বুক থেকে সরিয়ে মেয়ের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে বলল, “আম্মু, কি হয়েছে?”
“কিছু না মাম্মাম। ওই লোক গুলো কি কেস তুলে নিয়েছে?”
“না নিয়ে উপায় আছে? তোর পাপা তাদের নাড়ি নক্ষত্র টেনে বের করেছে। তবে আমার চিন্তা হচ্ছে ওঁরা ভোরের কোনো ক্ষতি না করে।”
“ডোন্ট ওয়ারি মাম্মাম। পাপা এমনটা হতেই দিবে না। ভাইয়ার গায়ে মশা পড়ার আগেও পাপা টের পেয়ে যায়। ওইদিন স্কুলেও কেমন হাজির হলো।”
অরুণিতা ঠোঁট চেপে হাসলো। পাতা তাঁর থুতনি ধরে ‘মাশাল্লাআহ’ বলে চুমু দিয়ে বলল, “তোদের পাপা তোদের কতটা চোখে হারায় তোরা যদি বুঝতিস! ভাগ্য করে একটা বাপ পেয়েছিস। তোদের জন্য হাসতে হাসতেই জান দিয়ে দিবে।”
পাতা হাসতে হাসতেই বলে কিন্তু কোথাও একটু খারাপ লাগা কাজ করে। নিজ পিতার কথা স্মরণে আসে। বছর হবে কথাও হয় নি। হয়তোবা ওনার মনেও পড়ে না পাতা নামক কোনো প্রাণী আছে। এক যুগের বেশি হবে অভিমান করে বাপের ভিটেয় পা রাখেনি। বাপটি তাঁর একবার নিতেও আসে নি। বলেও নি কেন আসো না পাতা? অথচ সে জানে বড় মেয়েকে প্রতিটি উৎসবে বাড়ি আনা হয়। মাঝেমাঝে দুঃখ লাগে তাঁর। দোষটা কি ছিলো তাঁর?
“মাম্মাম চলো বাইরে থেকে ঘুরে আসি। এমনিই ঘুরবো এখানে ওখানে। তারপর পাপার অফিসে গিয়ে পাপাকে চমকে দিবো। পাপা তোমাকে দেখে অনেক খুশি হবে।”
পাতা মেয়ের দিকে ছোট ছোট চোখে চায়। অরুণিতা মায়ের কোল থেকে মাথা তুলে বলল, “ওহ্ হো পাতাবাহার, নাক উঁচু ম্যানারলেস অরুণ সরকারকে মাঝে মধ্যে সারপ্রাইজ দিয়ে চমকেও তো দিতে পারো। আচ্ছা এক কাজ করো তোমার ওই জলপাই রঙের শাড়িটা পড়ো তো। ওটায় তোমাকে হেব্বি লাগে। পাপা তো পলকহীন দেখতেই থাকবে।”
পাতা অবাক হয় বৈ কি। মেয়েটা স্বভাব বিরোধী আচরণ করছে না? এতো কথা সচরাচর বলে না সে। মেয়ের জোরাজুরিতে তৈরি হয় পাতা।
—————
মিটিং রুমে বায়ার্সদের গয়নার নিউ কালেকশন প্রদর্শন করছিলো অরুণ সরকার। হঠাৎ ফোনের টুংটাং শব্দে ডেস্কে রাখা ফোনের উপর নজর বিদ্ধ হয়। কথার ফাঁকেই ফোনটা হাতে তুলে নেয়। লক খুলে হোয়াটসঅ্যাপে ঢু মারতেই অধর জুরে হাসি খেলে যায়।
‘ওহে নাক উঁচু ম্যানারলেস অরুণ সরকার, আপনার সোনার রাজ্যে আপনার পাতাবাহার প্রবেশ করেছে। হুঁশিয়ার থাকুন। আধ পাকা চুল রক্ষার্থে মহিলা স্টাফদের দূরে রাখুন।’
~অরুণিতা
অতি সন্তর্পণে হাসিটুকু গাম্ভীর্যতায় ঢেকে নেয় অরুণ সরকার। ফোন কাছে রেখে দ্রুত মিটিং শেষ করার চেষ্টা করে। একটু পরেই পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট সুজন এসে জানালো, “বস, ম্যাম এসেছেন।”
“কফি দাও তাকে। আর জানিও আমার একটু সময় লাগবে। মিটিং সবে শুরু হলো। আধাঘণ্টার আগে শেষ হবার নয়।”
“বস ম্যাম এতক্ষণ বসে থাকবে? মিটিং কি পোস্টপন্ড করা যায় না?”
“না। তোমাকে যেটা বললাম সেটা করো।”
সুজন ফিরে আসে। বস এতো নিরস কেন? অন্যকেউ হলে মিটিংয়ের পা*ছায় গুল্লি মেরে বউয়ের কাছে ছুটে যেতো। আহারে বেচারি ম্যাম!
“ম্যাম, আপনার জন্য দুঃখে বুক ফেটে যায় আমার। দুনিয়ায় ছেলের অভাব পড়েছিল নাকি? ওই ঢ্যামনা বুড়োকেই চোখে পড়লো! একটুও রসকষ নেই। আপনি মাশাআল্লাহ এখনো সুন্দরী আছেন। কেউ বলবেই না আপনার বিয়ে হয়েছে প্লাস বাচ্চা কাচ্চা আছে। অথচ বস বুড়িয়ে গেছে। বসের তো উচিত আপনাকে মাথায় তুলে রাখা।”
আফসোসের অন্ত নেই সুজনের। পাতা খুক খুক করে কাঁশলো। মাথায় পরিপাটি স্কার্ফ টেনে অভ্যাসবশত ঠিকঠাক করে নিল।
“কাহিনী কি ভাইয়া?”
সুজন দুঃখি দুঃখি মুখ বানিয়ে বলল, “আর বলবেন না। বস মিটিংয়ে। আমি গিয়ে বললাম ম্যাম এসেছে। চমকালো না, খুশিও হলো না। পেঁচার মতো মুখ বানিয়ে বলল, ‘কফি দাও তাকে। আর জানিও আমার একটু সময় লাগবে। মিটিং সবে শুরু হলো। আধাঘণ্টার আগে শেষ হবার নয়।’ মানে কতটা বেরসিক ভাবুন একবার।”
পাতা হাসলো, “মিটিং হয়তো খুব জরুরী।”
“বউয়ের চেয়ে জরুরি কিছু আছে ম্যাম?”
পাতা থতমত খেয়ে গেল। সুজন সবসময় তাঁর স্যারের উপর ক্ষেপে কেন থাকে? এদিক সেদিক হলেই তাঁর কাছে বসের নামে কান ভাঙাবে।
“ভাইয়া কি হয়েছে?”
সুজন তাঁর দুঃখের কথা খুলে বলে, “আর বলবেন না ম্যাম। বাচ্চাদের স্কুল ছুটি। বউটা ক'দিন হলো ঘ্যান ঘ্যান করে সবাই মিলে কোথাও ঘুরে আসতে। আমিও রাজি হয়ে যাই। সব প্ল্যান করলাম। কিন্তু বাগরা দিলো বস। হাতে পায়ে ধরলাম তবুও ছুটি দিলেন না। বলে, ‘বউয়ের কথামত চললে ভাঙা থালা নিয়ে রাস্তায় বসতে হবে।’ রেগে বউ আমার বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে।”
ব্যপারটা খুবই দুঃখজনক হলেও সুজনের বলার ভঙ্গিমায় পাতার হাসি পেলো। সে সান্ত্বনা স্বরূপ বললো, “আমি আপনার বসকে বলে ছুটির ব্যবস্থা করে দিবো।”
“থাক ম্যাম। তাঁর দরকার নেই। আমার বউ রাজি হবে না। সে আরেক রগচটা মানুষ।”
পাতার খারাপ লাগলো বৈ কি। নাক উঁচু ম্যানারলেস লোকটা আসলেই বেরসিক।
“ম্যাম জানেন কি হয়েছে? নতুন মডেল সাবিনা আছে না? উঠতি বয়সী মেয়ের আবেগ বেশি। বসের পেছনে চিপকে থাকে। ফটোশুট করবে সেখানে বসের কাজ কি? নাহ্ সে বসের অনুপস্থিতিতে ফটোশুট করাবে না। পুরাই গায়ে পড়া মেয়ে মানুষ। আমি অবশ্য ঠেস দিয়ে দুয়েকবার বুঝিয়েছিলাম বসের ওনার বয়সী ছেলে মেয়ে আছে। কিন্তু বেহায়া মেয়ে তবুও বস বস করবে। মন চায় ঠাস করে দু’টো লাগিয়ে দেই। আর বসকেও বলিহারি। মেয়েটাকে কিছুই বলে না। নীরবে নিভৃতে যেন আশকারা দেয়। ম্যাম বসকে একটু টাইট দিবেন।”
পাতার কপালে ভাঁজ দেখা গেল। সে খানিকটা গম্ভীর মুখে বলল, “এই সাবিনা অফিসে আছে?”
“জি ম্যাম আজ সন্ধ্যায় ফটোশুট আছে। ওই এখনই এসে বসে আছে। আপনি বসুন আমি এক্ষুনি ডেকে আনছি। শাকচুন্নীটাকে আজ উচিত শিক্ষা দিবেন।”
বলতে বলতেই সুজন বেরিয়ে যায় সাবিনা কে ডাকতে। পাতা কিছু বলতেও পারলো না। সাবিনা এলে পাতা একটু নড়েচড়ে বসলো। ওয়েস্টার্ন পরিহিতা মেয়েটা বেশ সুন্দরী। ভোরের বয়সীই হবে। সুজন যেভাবে এক্সপ্লেইন করলো তেমন কিছুই খুঁজে পেল না। মিষ্টভাষীর সাথে অনেকটাই চঞ্চলা। খুব সহজেই তার সাথে দুনিয়ার গালগল্প জুড়ে দিলো। অরুণ সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ মেয়েটা। তবে সেখানে খারাপ কিছুই নজরে আসলো না, সবটাই শ্রদ্ধাবোধ। তবুও পাতার একটু হিংসে হলো বৈ কি। সে মেয়েটার হাত থেকে রেহাই পেতে সুজনকে ইশারা করে। সুজন তাকে পাঠিয়ে দিলো।
“দেখলেন ম্যাম? বস বলতে অজ্ঞান। যাকে পাবে তার কাছেই বসকে নিয়ে প্রশংসার ঝুলি খুলে বসবে। অফিসে তো কানাঘুষো চলে বস আর মেয়েটার মাঝে চক্কর….”
“ভেবেচিন্তে কথা বলবেন ভাইয়া। মেয়েটা আপনার বসের মেয়ের বয়সী। আপনার বসের স্বভাব চরিত্র আপনার জানা। তারপরও এরকম… এটা যদি মজা করেও বলে থাকেন খুবই লেইম মজা।”
পাতা অত্যন্ত কঠোরভাবে ব্যক্ত করে। সুজন লজ্জায় পড়ে। সে নেহায়েত মজার ছলে বলেছিল। ম্যাম সিরিয়াসলি নিবে বুঝতে পারে নি।
“আমি খুবই লজ্জিত ম্যাম। বলতে বলতে মজার ছলেই মুখ ফসকে বেশি বেরিয়ে গেছে। অফিসে বসকে নিয়ে কানাঘুষা হয় না। বসকে আমার থেকে ভালো কে চিনে। তাঁর চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র। এখন ফুলে মৌমাছি ঝিকিঝিকি করলে ফুলের তো দোষ নেই। আমি আন্তরিক ভাবে ক্ষমা প্রার্থী ম্যাম। প্লিজ বসকে কিছু বলবেন না। চাকরি তো যাবেই সাথে আমাকে উল্টো লটকিয়ে পেদাবে।”
পাতা কথা বাড়ায় না। সুজন চলে গেলে চুপচাপ কফিতে চুমুক বসায়। ফুরফুরে মনটা বিষিয়ে গেছে। প্রিয় পুরুষের সাথে অন্য কারো নাম সহ্য হয়? হোক তা মজার ছল বা মিথ্যে অপবাদ। পাতা মন খারাপি নিয়ে অপেক্ষা করে। আধা ঘন্টার কথা বলা হলেও ঘণ্টা ফুরোতে চললো। পাতার অভিমান হয়। সে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসে। সুজনকে চকলেট কেক আর কফির ট্রে হাতে আসতে দেখা যায়।
“ম্যাম আমি খুবই দুঃখিত। আমি বুঝতে পারছি আপনি আমার কথায় কষ্ট পেয়েছেন। আমার খুব খারাপ লাগছে। আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। তাই ভাবলাম আপনাকে চকলেট কেক খাওয়াই যদি আপনার মন ভালো হয়।”
“সেসবের দরকার নেই ভাইয়া। আমি চলে যাচ্ছি।”
সুজন সিরিয়ালের শ্বাশুড়ির মতো রিয়্যাকশন দিয়ে বলল, “চলে যাবেন মানে? বসুন আপনি। নিশ্চয়ই বসের উপর রাগ করে চলে যাচ্ছেন। আসলে বস মিটিং খতম করে আপনাকে নিয়ে বেরুবে ভেবেছে। অরুণিতা’স কিচেনে লাঞ্চ করে আপনাকে নিয়ে আউটিংয়ে বেরুবে। সারাবেলা ঘুরবেন। রাতে স্কাই ভিউ রেস্টুরেন্টের রুফটপ ডিনারের জন্য বুকড করেছেন বস। আপনি দাঁড়ান আমি বসকে বলছি। ওনার কাছে বউ আগে নাকি মিটিং, আজ বলতেই হবে। ওয়েট আ মিনিট ম্যাম!”
ট্রে পাতার হাতে ধরিয়ে সুজন চলে যায় বসকে ডাকতে। পাতা ট্রে রেখে নিজেও চলে যায় লিফটের দিকে। অভিমানী চোখজোড়া ভরাট।
অরুণ সরকার গম্ভীর মুখে বায়ার্সদের সাথে কথা বলছে। মিটিং শেষ হওয়ার নাম নিচ্ছেই না উল্টো মনে হচ্ছে আরও আধঘন্টা নেবে। অরুণ হাতঘড়িতে চোখ বুলিয়ে নেয়। পাতাবাহার নিশ্চয়ই অপেক্ষা করতে করতে গাল ফুলিয়ে নিয়েছে। সুজন এসে রেড সিগন্যাল দিতেই অরুণ সব ছেড়েছুড়ে কেবিনে যায়। পাতাকে না পেয়ে কালবিলম্ব না করে লিফটের দিকে ছুটে। পাতাকে লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্বস্তি পায়। দ্রুত পায়ে হেঁটে এগিয়ে যায়। ততক্ষণে লিফটের দরজা খুলে গেল। পাতা ভেতরে প্রবেশ করতেই অরুণ ডাকলো,
“পাতাবাহার লেট মি এক্সপ্লেইন। ডোন্ট প্রেস দা বাটন। পাতাবাহার প্লিজ!”
পাতা এমন ভান করলো যেন শুনতে পেলো না। সে বাটন প্রেস করে। দরজা বন্ধ হতে উদ্যত হয়। কিন্তু বন্ধ হলো না, অরুণ সরকার বা পা ঢুকিয়ে দিয়েছে কি-না! আবারও খুলে গেলো লিফটের দরজা। অরুণ লম্বা শ্বাস ফেলে ভেতরে প্রবেশ করে বলল,
“প্রেস করতে নিষেধ করেছিলাম পাতাবাহার।”
পাতা চোখ মুখ শক্ত করে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। অরুণ খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে লিফটের বাটন ক্লিক করলো। দরজা বন্ধ হতে শুরু করেছে। পাতা আড়চোখে দেখে। অরুণ টাইয়ের নট ঢিলে করে শান্ত সুরে বলল,
“লেট মি এক্সপ্লেইন মাইসেলফ।”
পাতার শ্বাস আটকে আসে। হাতের দামি পার্স পড়ে যায়। চোখ বড় বড় করে হাত ছুঁড়তে থাকে ছাড়া পাবার জন্য। অরুণ সরকার খুবই ধৈর্য সহকারে তাকে যাবতীয় কিছু এক্সপ্লেইন করে যায়।
—————
অরুণাভ সরকার ওন দ্য ফায়ার। তাঁর ভেতরের ক্ষোভ তাঁর ব্যাটের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। এপর্যন্ত পাঁচটা ক্রিকেট বল হারিয়ে ফেলেছে ছক্কা হাঁকিয়ে। আর বাকি মাত্র দুই বল বাকি। ম্যাচ জিততে রান দরকার পাঁচ। অরুণাভ একটা ডটবল খেলে লাস্ট বলে আবারও ছক্কা হাঁকিয়ে ম্যাচটি জিতে যায়। কিন্তু বিপক্ষ দল মানতে নারাজ। তারা গন্ডগোল বাঁধানোর চেষ্টা করে। প্রাইজ মানি দশ হাজার এমনি এমনি হাতছাড়া করবে নাকি? তাঁরা আম্পিয়ারের উপর কারচুপির অভিযোগ দিয়ে হট্টগোল বাঁধায়। আম্পিয়ারকে মারতে উদ্যত হয়। অরুণাভ ক্ষিপ্র গতিতে ঝামেলার কেন্দ্রস্থলে আসে। যে ছেলেটা বেশি গলা চালাচ্ছিল। তাঁর নাম সজীব। বয়স আটাশ ঊনত্রিশের মার নেই। বিশের কোঠায় পা দেওয়া অরুণাভ তাঁর বুকে ধাক্কা দিয়ে গর্জে ওঠে,
“কি ভাবো টাকি নিজেকে হ্যাঁ? হেরে গিয়ে এখন নাটক পাতানো হচ্ছে? আমি যতদূর জানি আম্পিয়ার তোমাদের পক্ষ থেকে নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন তাঁকে আমাদের দালাল বলে ঝামেলা বাঁধাচ্ছো! সমস্যা কি তোমাদের?”
সজীব কয়েক কজম পিছিয়ে যায়। রাগত স্বরে বলে, “এই শা*লা গায়ে হাত দিবি না? নিজের গন্ডিতে থাক।”
“তুমিও নিজ গন্ডিতে থাকো। সিনিয়র বলে সম্মান দিচ্ছি নইলে এতক্ষণে মাটিতে বসে কাতরাতে। পা ধরে মাফ চাইতে।”
উপস্থিত জনরার মধ্যে কেউ কেউ বাহবা দেয়। সিটি বাজায়। সজীব রাগে ফুঁসে অরুণাভের নীল জার্সির কলার টেনে ধরে। অরুণাভ শক্ত চোখে চায়। দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সংবরণ করে বলে,
“কলার ছাড়!”
“ছাড়বো না। দেখি তোর কত ধার। শা*লা মাদা...”
অরুণাভ হাঁটু উঁচিয়ে মেইন পয়েন্টে লাগিয়ে দেয়। সজীব সেথায় হাত চেপে কলার ছেড়ে মাটিতে বসে পড়ে। চোখে মুখে যন্ত্রণার ছাপ। অরুণাভ এতেই ক্ষ্যান্ত হয় না। ক্ষ্যাপাটে ভঙ্গিতে হামলে পড়তে নেয় কিন্তু বাঁধ সাধলো টুটুল। বন্ধুকে টেনে ঝামেলা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়।
“তুই সবসময় ঝামেলাকে নেমন্তন্ন কেন করিস? এমন একটা দিন নেই যেদিন তুই ঝামেলা পাকাবি না। তোর না হওয়া শ্বাশুড়ির মতো আমারও তোর এই উগ্রপনা স্বভাব পছন্দ না। আর এখন তো আব্বা একশ চুয়াল্লিশ ধারা জারি করেছে তোর সাথে মিশলে আমাকে বাড়িতে ঢুকতে দিবে না।”
অরুণাভ জবাব দেয় না। পানির বোতল ছিনিয়ে মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। মেজাজ তাঁর এখনও আপার ফ্লোরে সালসা ড্যান্স করছে। টুটুল আর কিছু বলে না। বন্ধুকে শান্ত হওয়ার সময় দেয়। অরুণাভ ভেজা জার্সি পাল্টে গায়ে সফেদ শার্ট জড়ায়। মাঝরাস্তায় কোমড়ে তোয়ালে পেঁচিয়ে টাওজার পাল্টে জিন্স পড়ে নেয়। বাবড়ি আধভেজা চুলে ঘনঘন আঙুল চালিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো। নোংরা কাপড় ব্যাগে ভরতে ভরতে বলল,
“আমি সেখানে যাচ্ছি। তুই কি আমার সাথে যাবি?”
“বর্ষা আন্টিদের ওখানে?”
“হুঁ।”
“সত্যিই যাবি? পাতা মিস জানলে কষ্ট পাবে অনেক।”
অরুণাভ বন্ধুর দিকে তাকায়। টুটুল বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে বলল, “আচ্ছা যাবো। কিন্তু…”
“আমি শুধু ওই মুমূর্ষু বুড়ির সাথে দেখা করতে যাচ্ছি টুটুল। বুড়িটা কাল রাতেও ফোন করে কাঁদছিল।”
টুটুল হেসে বলল, “নানু বল শা*লা।”
অরুণাভ ব্যাগ কাঁধে তুলে গাড়ির দিকে অগ্রসর হয়। বিরক্ত মুখে বলে, “ আমার একটা বোন আছে। সো আমাকে শা*লা বলবি না।”
“আমি তোর বোনকে বিয়ে করছি তাই আমি শা*লা বলার হক রাখি।”
অরুণাভ কটমট করে বলল, “টায়রার মতো ভাবনাও তোর আরেক বোন।”
টুটুল নাক মুখ কুঁচকে নিয়ে ভলল, “গোমড়ামুখো অরুর কথা কে বলছে? আমি তো পত্রলেখার কথা বলছি। সেও তো তোর বোন।”
অরুণাভের মুখটা নিমিষেই গম্ভীর হয়ে আসে। দ্রুত পা ফেলে গাড়িতে উঠে বসে।
“পত্রলেখা আমার বোন নয়।”
“প্রহর আর অরুণিতা যেমন তোর ভাই-বোন। তেমনি বর্ষা আন্টির মেয়ে পত্রলেখাও সম্পর্কে তোর বোন হয়। আন্টিকে তো মা ঠিকই মানিস। তাহলে পত্রলেখাকে বোন মানতে কিসের সমস্যা? কি মিষ্টি একটা মেয়ে! আমি তো প্রথম দেখাতেই ফিদা।”
অরুণাভ চুপ থাকলো। সেদিন সবচেয়ে বড় ঝটকা খেয়েছিল যখন পত্রলেখাকে নিতে ওই মহিলাটি এসেছিল। সে তো জানতো ওনার শুধু একটা ছেলে আছে নামটা যেন কি? ওহ্ হ্যাঁ বাদল।
“তবে মেয়েটার জন্য খারাপ লাগলো। উপর ওয়ালা সবাইকেই এক, না এক দিক থেকে আঁটকে দেয়। ওমন ফুটফুটে মেয়েটা বোবা ভাবতেই গা ছমছম করে। আহারে!”
টুটুল দুঃখপ্রকাশ করে। অরুণাভের চোখের ক্যানভাসে পত্রলেখার মুখটা ভেসে আসে। ওই শান্ত নির্মল চাহনি, ভাসা ভাসা চোখ দু’টো খুব চেনাজানা লাগে তার কাছে। কোথাও তো দেখেছে। কিন্তু কোথায় দেখেছে মনে করতে পারে না অরুণাভ। টুটুল সমস্ত রাস্তা পত্রলেখাকে নিয়ে এটা ওটা বলে যায়। অরুণাভ চুপচাপ শুনে প্রত্যুত্তরে কিছু বলে না। এখন তো পত্রলেখা নামটাও শোনা শোনা লাগছে। এক বিলাসবহুল বাড়ির গেইটের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে অরুণাভ মনে মনে কয়েকবার ‘পত্রলেখা’ নামটি জপে।
—————
“আপুনি, শাড়িতে তোমাকে অনেক সুন্দর লাগে। একদম বউ বউ লাগে। কিন্তু তোমার তো বর নেই। আমি পাপাকে বলবো তোমার জন্য হ্যান্ডসাম দেখতে একটা বর খুঁজে আনতে।”
এই মুহূর্তে জ্যামে আটকে আছে তাঁরা। আধা ঘন্টা হবে রাস্তার সব গাড়ি নিথর পড়ে আছে।
জ্বিরক্তিতে মুখটা তেতো হয়ে আছে অরুণিতার। তার উপর এর বকর বকর। অরুণিতা বিরক্ত মাখা কন্ঠে বলল, “তুমি সবসময় বর-বউ-বিয়ে নিয়ে কেন পড়ে থাকো কেন? চুপ থাকো নইলে এখানেই নামিয়ে চলে যাবো।”
ধমকে প্রহরের মুখটা চুপসে যায়, “তুমি আমাকে একা ফেলে যেতে পারবে আপুনি? তোমার কষ্ট লাগবে না?”
অরুণিতা আড়চোখে স্কুটির পেছনে বসা ছোট ভাইটিকে দেখে নেয়, “না লাগবে না।”
“তোমার কষ্ট লাগবে না কারণ তুমি আমাকে ফেলেই যাবে না।”
প্রহর দাঁত দেখিয়ে মিষ্টি করে হাসলো। অরুণিতা কিছু বললো না। হ্যালমেট খুলে খোলা চুল পেঁচিয়ে নেয়। প্রহর স্বীয় হুডিতে আটকানো ক্লিপ খুলে বোনের হাতে দিয়ে বলল,
“আপুনি ওই পঁচা ছেলে গুলো কেমন করে তাকিয়ে আছে দেখো? ও আল্লাহ ওই পঁচা ছেলেদের চোখে মরিচের গুঁড়ো লাগিয়ে দাও না?”
প্রহর আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর কাছে আর্জি জানালো। অরুণিতা চুল বেঁধে নিয়ে ছোট ভাইয়ের গাল টিপে পাশে তাকালো। পাশের প্রাইভেট কারে কিছু উটকো ছেলেপুলে এদিকে তাকিয়ে ভ্যাটকাচ্ছে আর সিগারেট টানছে। অরুণিতা ভাবান্তর দেখায় না। এমন ভাব ধরলো যেন ওসব মশামাছি ব্যতিরেকে কিছুই না। ছেলেগুলো মজা পেলো না। তাঁরা তো রিয়্যাকশন চেয়েছিল! সিগারেট টেনে ধোঁয়া অরুণিতার দিকে ছুঁড়ে বিরক্ত করে।
ওদিকে প্রহর রেগে টমেটো হয়ে যায়। আসমানের দিকে তাকিয়ে ছেলে গুলোর নামে আবারও উপর ওয়ালার কাছে শাস্তি দাবি করে। একসময় নিজেই ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে। ঢাকনা খুলে পানি ছুঁড়ে মারে প্রাইভেট কারের ছেলেগুলোর দিকে। রাগে ক্ষোভে চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
“এই ডার্টি ডার্টি ছেলে, আমার আপুনির দিকে তাকাস কেন? তোদের চোখে আল্লাহ গরম লোহা ঢুকিয়ে দিবে দেখিস।”
পাঁচ বছরের ছেলে পঁচিশ বছরের দামড়া ছেলেদের আঙুল তুলে শাসাচ্ছে ভাবা যায়? অরুণিতা প্রহারের হাত টেনে কোমড়ে রাখে।
“রাস্তার কুকুর ঘেউ ঘেউ করবেই, প্রহর। তাদের সাথে লাগতে নেই। যাস্ট ইগনোর।”
ছেলেগুলো তেতে উঠল। কিন্তু ছোট্ট প্রহরের চেঁচানোতে অনেকেই সচেতন দৃষ্টি ফেলেছে। ট্রাফিক পুলিশও এগিয়ে আসে। ছেলেগুলো দমে গাড়ির গ্লাস উঠিয়ে নেয়। অরুণিতা স্কুটি ঘুরিয়ে ইউটার্ন নেওয়ার কথা ভাবে। এভাবে জ্যামে আটকে থাকার চেয়ে পাপার অফিসেই ফেরা যাক। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে একটু স্পেস নিয়ে পাশের ব্যস্ত রাস্তায় স্কুটি আনে। বিপত্তি একটা ঘটেই গেলো।
ব্যস্ত রাস্তায় ছুটে চলা প্রাইভেট কার ধেয়ে আসে। অরুণিতা মুহূর্তেই ঘাবড়ে গেল। পেট জড়িয়ে রাখা প্রহরের হাত দুখানি এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরে ‘পাপা’ বলে চেঁচিয়ে উঠলো।
—————
নব ঘুরিয়ে ঘরে প্রবেশ করে পপি চৌধুরী। লাস্যময়ী মহিলার কপালে ঈষৎ বিরক্তের রেখা ফুটেছে। ফোনে ডুবে থাকা মেয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, “পত্র, কখন থেকে নক করছি? শুনতে পাও না?”
পত্রলেখা খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পেছন ফিরে তাকালো। মা’কে দেখে ফোন বন্ধ করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো। পপি চৌধুরীর দৃষ্টি পত্রলেখার ব্যান্ডেজ করা নাকের উপর পড়তেই জানতে চাইলো, “নাকে ব্যান্ডেজ কেন? কি হয়েছে, পত্র?”
পত্রলেখা কিছু বললো না। পপি চৌধুরীও দুবার শুধালেন না। এগিয়ে এসে মেয়ের গালে হাত রাখলেন।
“তুমি কি লাগেজ গুছিয়েছো, পত্র?”
পত্রলেখা খাটের নিচ থেকে বেবি পিংক কালারের একটা মাঝারি আকারের লাগেজ টেনে বের করলো। পপি চৌধুরীর মুখটা ম্লান হয়ে আসে। সে খানিকটা ইতস্তত বোধ বললেন, “আমি ভাবছি তোমার ওখানে যাওয়া ঠিক হবে না, পত্র। ও বাড়ির সবাই কেমন রিয়্যাক্ট করে কে জানে! কারিম যদিও বলেছিল তোমাকে নিতে কিন্তু সেভাবে জোর দেয় নি। তুমি কি তবুও যেতে চাইছো?”
পত্রলেখা লাগেজটার দিকে একধ্যানে তাকিয়ে। পপি চৌধুরী মেয়ের গালে নরম স্পর্শ করে বলল, “ওঁরা নানান কথা বলবে। ওদের কথা শুনে তোমার মন খারাপ হবে। তাই যাওয়ার দরকার নেই মা। আমি তোমার হয়ে পুষ্পকে হ্যাপি বার্থডে বলে দেবো। মন খারাপ করলে?”
পত্রলেখা মাথা নাড়লো, মন খারাপ করে নি। সে লাগেজ খুলে র্যাপিংয়ে মোড়ানো একটি রঙিন বক্স মায়ের কাছে দেয়। বক্সের উপরে ছোট চিরকুটে ‘Happy Birthday Pushpa’ লেখা। পপি চৌধুরী পার্স থেকে কিছু টাকা বের করে পত্রলেখার হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, “তোমার মন খারাপ হলেও আমি কিছু করতে পারবো না পত্র। আমার হাত পা বাঁধা। আমি রবিনকে বলে দিবো তোমাকে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাবে। আমি যাচ্ছি হ্যাঁ?”
পপি চৌধুরী মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে দরজা ভেজিয়ে চলে যান। পত্রলেখা হাতের টাকা গুলো অবহেলায় ফেলে দেয়। পা দিয়ে লাগেজ ঠেলে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেয়। বিছানা ঘেঁষে হাঁটু মুড়িয়ে উদাস বসে রয়। একসময় ভাসা ভাসা চোখ বেয়ে অনর্গল অশ্রু ফোঁটা পতিত হয়। সে তো যেতে চায় নি। মা নিজেই জোর করলো, লাগেজ গোছাতে বলল। তাই একবুক আশা জমিয়ে মায়ের প্রতিক্ষায় প্রহর গুনছিলো। মায়ের সাথে ছোট বোনের জন্মদিনের পার্টিতে যাবে।
দরজা ঠেলে ভেতরে আসে কেউ। পত্রলেখা আশা নিয়ে দরজার দিকে ফেরে। মা নিশ্চয়ই মত পাল্টে তাঁকে নিতে এসেছে।
“মামুনি? আপনের খালমুনি ডাকতাছে। আপনের নাক ফাটাইছিলো না? হেয় পোলায় আইছে।”
কাজের বুয়ার কথায় পত্রলেখা গালের পানি মুছলো। মেঝেতে পড়ে থাকা হাজার টাকার নোট গুলো ঠেলে দেয়। কাজের বুয়ার চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। তড়িঘড়ি সবকটা নোট তুলে নিয়ে গিঁটে বাঁধতে বাঁধতে বলে,
“মামুনি আপনে মেলা ভালা। এই টাকাডি দিয়া আমি সামিনার জন্যে ভালোমন্দ কিছু নিয়া যামু। পোয়াতি মানুষ কত কিছুই খাইতে মন চায় কিন্তু খাওয়াইতে পারি না। যাই হউক দোয়া দিলাম আপনের সব দুক্ক জলে ঝাঁপ দিক। এক রাজপুত্তুর আসুক আর আপনেরে পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়াইয়া সুখের রাজ্যে নিয়া যাউক।”
পত্রলেখা শুনলো কি শুনলো না বোঝা দায়! কাজের বুয়া করুণার চোখে তাকিয়ে দেখে পত্রলেখাকে। ইচ্ছে করে মাথায় হাত বুলিয়ে একটু মনভরে দোয়া দিতে। কিন্তু সে তো কাজের বুয়া। মালকিনরে ছুঁইলে যদি ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয় তাই দূর থেকেই দোয়া দিলো।যদি সুখের দেখা পায় বেচারি মেয়েটা।
·
·
·
চলবে……………………………………………………