আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ৫৫ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

আজ ওদের মন ভালো নেই
          বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। সাব্বিরের বাড়ির উঠোনে থৈথৈ জল। বাতাসে ভাসছে কাঁঠালি চাপার সৌরভ। সাব্বির মোমবাতি হাতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দু'চোখে তার সীমাহীন বিস্ময়। 
‘ মিথি, আপনি!’ 
স্তব্ধ গলায় শব্দ দুটো ছিটকে বেরিয়েই থমকে গেল তার কণ্ঠস্বর। বৃষ্টি নামলেই তার দু-কামরার আটপৌরে বাসা ম ম করে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে। আজও চারদিক ম ম করছে। কাঁঠালি চাপা আর ভেজা মাটির সৌরভে এমন এক অকল্পনীয় সন্ধ্যা তার সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে যে, হঠাৎ আর কোনো কথা খুঁজে পেল না সে। ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থেকে বোকার মতো প্রশ্ন করলো, 
‘ কেমন আছেন আপনি, মিথি?’ 
সে প্রশ্নের উত্তর দিলো না মিথি। দীর্ঘ সময় বৃষ্টিতে ভিজে নীলাভ রঙ ধরেছে তার চেহারায়। ঠোঁটদুটো রঙহীন। চোখজুড়ে বিষণ্ণতা। সাব্বিরের এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এ কোনো মানবী নয়। এ যেন কোনো বিষণ্ণ শিল্পীর গড়া প্রতিমা। নয়তো এমন নিঁখুত সুন্দর মুখ কারো হতে পারে? দু'তলায় ক্যাসেটে গান বাজছে। শীতল হাওয়ার সঙ্গে ভেসে আসছে তার টুকরো টুকরো কথা, 
‘ যেতে যেতে পথে পূর্ণিমা রাতে 
চাঁদ উঠেছিল গগনে,  
দেখা হয়েছিল তোমাতে-আমাতে 
কী জানি কী মহা লগনে 
চাঁদ উঠেছিল গগনে। 
এখন আমার বেলা নাহি আর 
বহিব একাকী, বিরহের ভার….’ 
সেই টুকরো কথাকে আরও কয়েক টুকরো করে দিয়ে মুখ খুললো মিথি। ভারি ক্লান্ত গলায় জানাল,
‘ আজ থেকে আমি এখানেই থাকব।’ 
এখানে থাকবে! আকস্মিক ঘটনার ঘোর থেকে বেরিয়ে হঠাৎ যেন কিছুই বোধগম্য হলো না সাব্বিরের। অবাক বিস্ময়ে সে কেবল দেখল মিথি তাকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে গেল ভেতরে। সাব্বির দরজা বন্ধ করে মিথির দিকে ফিরে তাকাল। মিথির ভেজা শাড়ি চুইয়ে পড়া জলে ইতোমধ্যেই সয়লাব হয়ে গিয়েছে ফরাশ। সাব্বির ভেতর গিয়ে দ্রুত একটি তোয়ালে এনে দিলো। চুলায় খিচুড়ি ফুটতে আরম্ভ করেছে। বদ্ধ, অন্ধকার ঘরে কাঁঠালি চাপার খুশবুকে হার মানিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে খিচুড়ির সুবাস। মিথি তোয়ালেটা হাতে নিয়ে হাত, মুখ আর চুল মুছতে মুছতে বলল,
‘ খিচুড়ি বসিয়েছেন নাকি?’ 
সাব্বির প্রত্যুত্তরে মাথা নাড়ল। মিথির হঠাৎ আগমন তাকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। বলার মতো কোনো কথা সে খুঁজে পাচ্ছে না। 
‘ আজ বুয়া আসেনি?’ 
সাব্বির এবারও মাথা নাড়ল। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
‘ আপনি চা খাবেন তো মিথি? আপনি বসুন আমি আপনার জন্য চা করে আনছি।’ 
মিথি ভেজা ব্যাগটা টি-টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, 
‘ এখন আর চা খাব না, সাব্বির সাহেব। আপনার খিচুড়ি বোধহয় হয়ে এসেছে। একেবারে খিচুড়ি খাবো। খিচুড়ির সঙ্গে আর কিছু করেননি?’ 
সাব্বির দ্বিধাগ্রস্ত মুখে মাথা নাড়ল। খিচুড়ির সঙ্গে আর কিছু করা হয়নি। মিথি বলল, 
‘ শুধু খিচুড়ি খেতে ভালো লাগবে না। কষ্ট করে দুটো ডিম ভাজি করে ফেলুন তো। শাড়িটা বদলেই খেতে বসব। সারাদিন খাবার সময় পাইনি। খুব ক্ষুধা পেয়েছে।’ 
সাব্বির কিছু বলল না। মিথিকে আজ কেমন অচেনা লাগছে। কিছুক্ষণ তার দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে বলল,
‘ এই ভর সন্ধ্যায় বৃষ্টিতে ভিজে কোথা থেকে এলেন মিথি?’ 
মিথি ভেজা কাপড়ে টি-টেবিলের উপর বসল। বলল,
‘ একটা টেলিভিশন চ্যানেলে ইন্টারভিউ ছিল। সেখান থেকেই এলাম। কাজ শেষ করে বেরিয়ে দেখি ভাই-বোনেরা সকলেই বাড়ি যাচ্ছে। আমিও এলাম। আমার বাড়ি তো এটাই হওয়ার কথা। তাই না, সাব্বির সাহেব?’ 
প্রশ্নটা করে সাব্বিরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো মিথি। সাব্বির হঠাৎ কোনো উত্তর দিতে পারলো না। মিথির প্রশ্নটিকে নীরবে এড়িয়ে গিয়ে অপ্রস্তুত কণ্ঠে বলল,
‘ আপনার ঘরে আপনার একটা শাড়ি সম্ভবত আছে। আপনি শাড়ি বদলে নিন। আমি ডিম ভাজি করে আনছি।’ 
মিথি বলল,
‘ বেশ যান। তার আগে আপনার সঙ্গে দুটো কথা আছে। এখানে এসে বসুন তো। আসুন।’ 
সাব্বির চেহারায় প্রচ্ছন্ন এক দ্বিধা নিয়ে মিথির মুখোমুখি বেতের সোফায় বসল। মিথি খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
‘ আপনি আমাকে খুব জঘন্যভাবে অপমান করেছেন। আমাকে না জানিয়ে হঠাৎ আমাকে ডিভোর্স লেটার পাঠানোটা আপনার উচিত হয়নি। আমি খুবই অপমানিত বোধ করেছি। নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয়েছে। আমি কি এতোটাই তুচ্ছ, বলুন তো?’ 
সাব্বির কোনো কথা বলতে পারল না। হতবাক দৃষ্টিতে মিথির দিকে তাকিয়ে রইলো। মিথি বলল, 
‘ আপনি আমাকে তুচ্ছ ভাবলেও আমি তুচ্ছ নই। আপনার ভেতরের হীনমন্যতা, দুঃখকে আমি কিছুটা সময় দিয়েছিলাম। আপনার দুঃখকে শ্রদ্ধা করে আপনার থেকে সরে গিয়েছিলাম। আপনারও উচিত ছিলো, আমার অনুভূতিকে শ্রদ্ধা করা। আপনি জানেন আমি আপনাকে ভালোবাসি। এটা জেনেও হঠাৎ আমাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়ে, আপনি কি নিজেকে আমার সামনে খুব আরাধ্য প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন? নাকি আমাকে ছোট করতে চেয়েছিলেন। বলুন তো?’ 
সাব্বির কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে চোখ তুলে মিথির দিকে তাকাল। বলল, 
‘ আমাদের তো বিচ্ছেদ হওয়ারই কথা ছিলো মিথি।’ 
‘ না। এরকম বিচ্ছেদ আমাদের হওয়ার কথা ছিলো না, সাব্বির। আপনি একাকিত্ব চেয়েছিলেন। দূরত্ব চেয়েছিলেন। আমি আপনার ইচ্ছেকে শ্রদ্ধা করে দূরে সরে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি সবসময় আপনার স্ত্রী রূপে থাকতে চেয়েছি। এটা আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছে। আপনি কেন আমার ইচ্ছেকে সম্মান করতে পারলেন না, সাব্বির?’ 
সাব্বির কিছু বলল না। মিথি বলল,
‘ আমার নামটা আপনার সঙ্গে থাকাও কী আপনার জন্য বেদনাদায়ক? আপনার জীবনে আমি এতো বড়ো ব্যথা?’ 
সাব্বির দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বলল,
‘ আপনার জীবনে এগিয়ে যাওয়ার অধিকার আছে। আমার জন্য অপেক্ষা করে কেন নিজের জীবন নষ্ট করবেন মিথি?’ 
এতোক্ষণ শান্ত থাকলেও এবার তপ্ত চোখে তাকাল মিথি। কঠিন গলায় বলল,
‘ সেটা আপনি ডিসাইড করে দিবেন না, সাব্বির। আমার জীবন আমি এগিয়ে নিবো নাকি থমকে রাখবো সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।’ 
সাব্বির প্রত্যুত্তরে নীরব বসে রইল। মিথি উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা ফের কাঁধে তুলে নিয়ে বলল,
‘ আজ থেকে আমি এখানেই থাকব। আপনার ঘরে আপনার সাথে। আপনি যেহেতু আমার ইচ্ছেকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেননি। নিজের স্বার্থে আমার অনুভূতিকে অপমান করতে দু’বার ভাবেননি। আমিও আপনার অনুভূতির কথা ভাববো না।’ 
বলে গটগট করে সাব্বিরের ঘরের দিকে চলে গেল মিথি। সাব্বির নীরবে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। দরজার কাছে গিয়ে একবার ফিরে তাকাল মিথি। সহজ গলায় বলল,
‘ একটু পানি গরম করবেন তো। শরীর কুটকুট করছে। মনে হচ্ছে গোসল করতে হবে।’ 
সাব্বির কিছু বলল না। মিথি বিস্মিত, স্তম্ভিত, হতবাক সাব্বিরকে পেছনে রেখে দরজার আড়ালে হারিয়ে গেল। ওই ঘরে ঘোর অন্ধকার। এখনও বিদ্যুৎ আসেনি। এই অন্ধকার ঘরে মিথি বাস্তব নাকি জ্বরের ঘোরের কল্পনা তখনও বোধগম্য হচ্ছে না তার। আরেকটা জিনিস বোধগম্য হচ্ছে না, তা হলো আইনি নোটিশ। মিথিকে কোনোরকম আইনি নোটিশ সে পাঠায়নি। মুখে মুখে মিথিকে মুক্ত করতে চাইলেও আইনি কাজগুলোর দিকে এগোনোর সাহস তার হয়নি। কোথাও না কোথাও সে হয়তো চাইছিলো, মিথি তার না হলেও তার নামে থাকুক। মিথির বৃহৎ জীবনের কার্ণিশে সে কালো দুঃখ হয়ে হলেও বেঁচে থাকুক। তাহলে তার হয়ে কে পাঠাল এই নোটিশ? মোমের অল্প আলোয় পাথরের মূর্তির মতো অনেকটাক্ষণ একাকী স্থবির হয়ে বসে রইলো সাব্বির। 

—————

তখন সন্ধ্যা। 
আকাশের গায়ে বেখেয়ালী প্রেমিকার ল্যাপটে যাওয়া কাজলের মতোন গাঢ় প্রলেপ এঁকে দিয়েছে কেউ। সমস্ত বিকেল বৃষ্টি হওয়ায় বাতাসে তখনও মিশে আছে জল। ভীষণ শীত শীত করছে। বসন্তের বাড়িতে হঠাৎ যেন পুত্র-কন্যা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে গা কাঁপানো পৌষ। একটা খাঁদির চাদর গায়ে নীরবে ছবি আঁকছে মৌনি। ভ্রু জোড়া কুঁচকে আছে। খোলা জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঝাপটা দিচ্ছে তার চোখে-মুখে। 
‘ তুই কী চাচ্ছিস আমি তোকে একটা থাপ্পড় দিয়ে গাল টাল ফাটিয়ে দেই, কমলা?’
হঠাৎ আঁকা থামিয়ে গম্ভীর হয়ে গেল মৌনি। যাকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্নটা করলো সে দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিলো একটু সময় নিয়ে। মৌনি যখন ছবি আঁকে, ঘুমায় অথবা লিখে তখন তার ঘরের দরজা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকে । এই সময় বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে হাঁটতে হয়। আশেপাশে সামান্য আওয়াজেও ভয়ংকর ক্ষেপে যায় মৌনি। দরজায় উঁকিঝুঁকি তার অন্যতম অপছন্দের বস্তু। কমলা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মুখ কাঁচুমাচু করে বলল,
‘ আপনার নামে একটা খাম আসছে, আপা৷ ঋতি আপা কইলেন আপনাকে দিতে।’ 
মৌনি পেছন ফিরে তাকাল। কঠিন গলায় বলল,
‘ দরজায় নক করে সেটা সরাসরি বলবি। উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলি কেন?’ 
‘ আপনার ছবি আঁকা দেখছিলাম আপা।’ 
‘ আমার ছবি আঁকা এমন কোনো অমৃতের চিজ না যে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে হবে। এরপর থেকে আমার আঁকার সময় উঁকিঝুঁকি দিতে দেখলে থাপ্পড় দিয়ে তোর গাল ফাটিয়ে দিবো। খামটা ওই লাকড়ির গাদার উপর রেখে যা।’ 
কমলা মাথা হেলিয়ে দ্রুত এগিয়ে এসে খামটা লাকড়ির গাদার উপর রাখল। পুরোটা সময় মৌনি কঠিন দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলো তাকে। ফিরে যাওয়ার সময় হঠাৎ মন বদলে মেয়েটাকে পিছু ডাকল মৌনি। বলল,
‘ এই শোন!’ 
কমলা দরজার কাছ থেকে ফিরে দাঁড়িয়ে আতঙ্কিত গলায় বলল,
‘ জি আপা।’ 
মুহূর্তেই গলার স্বর বদলে ফেলল মৌনি। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে অপেক্ষাকৃত কোমল গলায় বলল,
‘ আমাকে এক কাপ চা দিয়ে যা তো। চিনি ছাড়া চা, কড়া লিকার। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আনবি। পারবি না?’ 
কমলা মাথা নেড়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল। কমলা যাওয়ার পর মৌনি দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে রং-তুলি ছেড়ে জানালার কোল ঘেঁষে দাঁড়াল। এই জানালা দিয়ে দাদাজানের তিনতলার একাংশ আর গাছগাছালির আড়ালে দিঘিপাড়ের ছায়া দেখা যায়৷ মৌনি এতোদিন তিনতলায় তাদের শোবার ঘরটা দখল করে ছিলো। সম্প্রতি ভাই-বোনেরা আসতে শুরু করেছে। সবাই এলে শোবার ঘরটা বোনেরা মিলে ভাগাভাগি করে থাকতে হয় বলে মৌনি আঁকার জন্য বেছে নিয়েছে হাতিশালের অদূরে এই পরিত্যাক্ত কুঁড়ে ঘর। এক সময় ঘরটাকে ধানের আড়ত হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এখন লাকড়ির স্তুপ জমিয়ে রাখা হয়েছে। মৌনি পেছন ফিরে লাকড়ির স্তুপটির দিকে তাকাল। সেদিন মৌনি এখানে দুটো নেউলকে উঁকিঝুঁকি দিতে দেখেছে। কমলা চা নিয়ে এসেছে। মৌনি চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে আবার জানালার বাইরে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড উদাসমুখে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বলল,
‘ থেংকিউ কমলা।’ 
কমলা লজ্জা পেয়ে মাথা নোয়াল। মৌনি আপা মানুষটা খুব অদ্ভুত। কখনো ধমকায়, কখনো হাসি-মজা করে। কিছু করে দিলে ‘থেংকিউ’ দেয়৷ সেদিন তিনতলা থেকে নামতে গিয়ে ভুলে কমলার পা মাড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে পায়ে হাত দিয়ে সালামের মতো করে বলল, 
‘ সরি!’
কমলা হতবাক। সে এই বাড়ির কাজের মানুষ। ভুলে তার পা মাড়িয়ে সালাম করা পাগলের কারবার। কমলা অবশ্য শুনেছে, কবি মানুষেরা কিছুটা পাগল ধরনের হয়। মহিলা মানুষ কবি কী করে হয় এটা যদিও রহস্য। কমলা বাপের জন্মে শুনেনি, কোনো মহিলা মানুষ কবি হয়েছে। কবি হয় পুরুষ মানুষ। কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ সবাই তো পুরুষ। 
‘ একটু আগে আমি ধমক দিয়েছি বলে তোর মন খারাপ হয়েছে?’ 
মৌনির প্রশ্নে সচেতন হয়ে তাকাল কমলা। ঘাড় নাড়িয়ে জানাল, মন খারাপ হয়নি৷ মৌনি বলল,
‘ মন খারাপ হওয়া উচিতও না৷ পৃথিবীর নিয়মই এরকম। প্রত্যেক মানুষই তার অধীনস্থ মানুষকে গালিগালাজ করে আরাম পায়। অধীনস্থ মানে বুঝিস?’ 
কমলা ফের মাথা নাড়ল। মৌনি বলল,
‘ অধীনস্থ মানে হলো কারো অধীন। তোর হয়ে যদি কেউ কাজ করতো মেজাজ খারাপ থাকলে তুইও তাকে বকতি। বকতি না?’ 
কমলা কিছু না বুঝেই মাথা নাড়ল। বলল,
‘ জি। বকতাম।’ 
মৌনি একদম সহজ গলায় বলল, 
‘ গুড! আজ কেবল বকেছি। আরেকদিন আমার ঘরে উঁকিঝুঁকি দিলে মেরে তোর গালের হাড় নাড়িয়ে দেব। এখন দেখ তো, ছবিটা কেমন হয়েছে?’ 
কমলা অর্ধসমাপ্ত ছবিটির দিকে তাকাল। নানান রঙে হাবিজাবি ছবিটির কিছুই তার বোধগম্য হলো না। মনে হচ্ছে ছবি আঁকতে না জানা কোনো শিশু রঙ নিয়ে ইচ্ছেমতো মাখামাখি করেছে। ঘর, গাছ, লতা-পাতা না থাকলে সে আবার কেমন ছবি? কিন্তু সে কথা মুখে বলার সাহস পেল না। বলল,
‘ সুন্দর হয়েছে।’ 
‘ কিছু বুঝেছিস?’ 
কমলা এবার ঘাবড়ে গেল। হ্যাঁ অথবা না, যা বলবে তাতেই তার বিপদ। হ্যাঁ বললে মৌনি যদি জানতে চায়, কী বুঝেছিস বল? কমলা ফ্যাকাশে মুখে চুপ করে রইল। মৌনি বলল,
‘ এটা একটা বইয়ের প্রচ্ছদ। প্রচ্ছদ মানে বুঝিস? বইয়ের কভার। এগুলোকে বলে এবস্ট্রাকট আর্ট। 
এই সময়ের খুব জনপ্রিয় একজন লেখকের বইয়ের প্রচ্ছদ হবে এই ছবিটা।’ 
কথা বলতে বলতে ফের জানালার বাইরে তাকাল মৌনি। সন্ধ্যার ঘোলাটে আঁধার ফুঁড়ে হাতিশালের দিকে হেঁটে যাচ্ছে একটি ছায়ামূর্তি। ছেলেটা মিশকাত বুঝতে পেরে চোখ-মুখ কুঁচকে গেল মৌনির। কমলাকে বলল,
‘ এই ছেলেটার ঘটনা কী বল তো? সারাদিন ঘরে বসে থেকে কী করে? বোম টম বানায় নাকি?’
কমলা অবাক হয়ে বলল,
‘ কী বলেন আপা! বোম দিয়ে সে করবেটা কী?’ 
মৌনি বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ কী আর করবে? বোম দিয়ে মানুষ কী করে? মানুষ মারে। সে-ও তাই করবে। নয়তো মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে এই অজপাড়া গাঁয়ে এসে লুকিয়ে থাকবে কেন?’ 
‘ সে একটু লাজুক কিসিমের মানুষ আপা।’ 
মৌনি একটু বিরক্ত হয়ে তাকাল। ছেলেটাকে তার সন্দেহ লাগে। ধর্মের প্রতি নিয়োজিত প্রাণ। অথচ কোনো দাঁড়ি টাড়ি নেই; ক্লিন সেইভ। মৌনি জানতে চাইল, 
‘ ছেলেটাকে তোর কেমন লাগে?’ 
‘ ভালোই। কারো সঙ্গে তেমন কথাটথা বলে না। সকালে পোলাপাইনরে আরবি পড়ায়। নিজে রেঁধেবেড়ে খায়। মাঝেমধ্যে দাদাজানের সঙ্গে বসে গপসপ করে। মেয়েছেলে আশেপাশে গেলে মাথানিচু করে বসে থাকে।’ 
মৌনি বলল,
‘ কাকে তোর বেশি ভালো লাগে? এই ছেলেকে নাকি ইশতিয়াক ভাইকে?’ 
কমলা উত্তর দিলো না। মৌনি পাথরের চোখে লক্ষ্য করলো তার ফরসা গালদুটোতে আসা জাফরান রঙ। সে মনে মনে বিরক্ত হলো। ইশতিয়াক ভাইকে নিয়ে এই মেয়ের লজ্জার বাহার আজকাল বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। দয়ার সাগর দাদাজান কে জানে কবে এর সঙ্গেই ইশতিয়াক ভাইয়ের কপাল জুড়ে দিয়ে বসে থাকেন। নিম্নবিত্তের প্রতি ঘৃণা না থাকলেও একটা জাত্যভিমান আছে মৌনির। বিয়ে, প্রেম এসব সমানে সমানে হওয়াতেই সে বিশ্বাসী। কোথায় কমলা আর কোথায় সুদর্শন, শিক্ষিত ইশতিয়াক ভাই। মৌনি বিরক্তমুখে চায়ের কাপটা ফিরিয়ে দিয়ে কমলাকে চোখের সামনে থেকে বিদেয় হতে বলল। মন-মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে তার। গ্রামের বাড়িতে অধিকাংশ সময় ছুটি কাটাতেই আসতো সে। কয়েকদিন হৈ-হুল্লোড় করে ঢাকায় ফিরে কাজে মন দিতো। এবার এখানে বসে কাজ করতে হচ্ছে। কাজের জন্য নতুন নতুন পরিবেশ মৌনির পছন্দ নয়। তারওপর কাজ করতে হচ্ছে, জোরের ওপর। হাতে জমে থাকা কাজগুলো শেষ করে কোথাও একটা ঘুরে আসবে মৌনি। কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া থেকে কে জানে কোন বিষণ্ণতা সিন্দাবাদের ভূতের মতোন ঘাড়ে চেপে বসেছে। কিছুতেই সঙ্গ ছাড়তে রাজি হচ্ছে না। মৌনি ফের আঁকায় মনোযোগ দিলো। রঙ-তুলিতে জোরপূর্বক ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করতেই বন্ধ দরজাটা খুলে গেল শব্দ করে। মৌনি ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। দরজার কাছে মাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ কী সমস্যা, আম্মু?’ 
মৌনির মা খুবই শান্ত মানুষ। তিনি ধীর পায়ে হেঁটে এসে একটা লাকড়ির গাদার উপর বসলেন। বললেন, 
‘ একটু কথা বলি তোর সঙ্গে।’ 
মৌনি শান্ত চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, 
‘ ওখানে বসো না। ওই লাকড়িগুলোর মধ্যে একটা নেউলের বাসা। যেকোনো সময় মাথা বের করে দাঁত বসাতে পারে।’ 
ভদ্রমহিলা মৌনির কথায় চমকে উঠে দাঁড়ালেন। অবাক হয়ে বললেন, 
‘ তুমি মজা করছো আমার সঙ্গে?’ 
মাকে ওমন ভয় পেতে দেখে হো-হো করে হাসল মৌনি। উঠে দাঁড়িয়ে নিজের বসার টোলটা মায়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
‘ মজা করছি না। এখানে বসো।’ 
মাসুমা বসলেন না। সন্দিহান চোখে একবার ওদিকে তাকিয়ে বললেন,
‘ তুমি এসব সাপ-নেউলের মধ্যে এসে বসে আছো কেন?’ 
‘ বসে আছি না। কাজ করছি। তুমি কী বলবে তাড়াতাড়ি বলে ফেলো। আমার মেজাজ খারাপ। কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না।’ 
মাসুমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 
‘ তোমার তো সবসময় মেজাজ খারাপ থাকে। আমি কথা বলতে চাইলেই শুনি মেজাজ খারাপ। এতোদিন ধরে বাড়িতে আছো। তুমি তো একবারও আমার কাছে আসো না, মৌনি। আমার তো আর কোনো ছেলেমেয়ে নেই। আমারও তো তোমার সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছে করতে পারে।’ 
মৌনি রঙ টিন-কাঠের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। বলল,
‘ আমি ব্যস্ত থাকি, আম্মু।’ 
‘ তোমার বাবা এলে ব্যস্ততা থাকে না?’ 
মৌনি হাসল, 
‘ বাবা তো আসেন না।’ 
‘ যখন আসেন?’ 
প্রত্যুত্তরে ফের মলিন হাসল সে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, 
‘ তুমি আমাকে কিছু ব্যথা দিয়েছ, আম্মু। দিনের বেশিরভাগ সময় তুমি আমাকে ভালোবাসো। কিন্তু মাঝেমধ্যে আমার মনে হয়, তুমি বুকের ভেতর তীব্র প্রতিহিংসা লুকিয়ে রেখেছ আমার জন্য। কেউ নিঁখাদ ভালো না বাসলে তার কাছে আমার যেতে ইচ্ছে হয় না।’ 
এতো সহজে, এতো সরলভাবে মেয়ের মুখে এতো কঠিন একটা কথা শুনে হতবাক হয়ে গেলেন মাসুমা। হতভম্ব কণ্ঠে বললেন, 
‘ তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা নিঁখাদ না!’ 
‘ নিঁখাদ যে নয়-ই সেটা নিশ্চিত হয়ে বলছি না, আম্মু। বলেছি, আমার মনে হয়। কী, কখন মনে হবে এটা তো আমার হাতে নেই। আমার ধারণা খুব শীঘ্রই এই মনে হওয়া কেটে যাবে। তখন আমি আবার তোমার কাছে যেতে শুরু করবো৷’ 
মাসুমা প্রত্যুত্তরে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। মৌনি তার রক্তশূণ্য মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ কয়েক মাস ধরে খুব কাজের চাপে আছি তো তাই হয়তো এরকম হচ্ছে। মানসিক চাপে থাকলে আমার পৃথিবীর সবাইকেই অসহ্য লাগে। চাপ কেটে গেলে অসহ্যভাবও কেটে যায়। তুমি এটা নিয়ে খুব বেশি ভেবো না, আম্মু।’ 
মাসুমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, 
‘ এতো কাজের চাপ নেওয়ার তো কোনো দরকার নেই, মৌনি। তোমার বাবা আর আমার সব সঞ্চয়ই তো তোমার। এসব ছেড়ে কিছুদিন আরাম করো। আমি তোমার এই মাসের খরচ দেব। কাল বরং তোমার নানুবাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসো। দেখবে, ভালো লাগবে।’ 
মৌনি নিষ্প্রাণ গলায় বলল,
‘ তোমার থেকে খরচ কী করে নেবো, আম্মু? আমার হাত,পা, চোখ, মস্তিষ্ক সবই তো সুস্থ আছে। সুস্থ-সবলভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থেকেও অন্যের রোজগারের দিকে তাকিয়ে থেকে জীবন চালাতে তো দাদাজান আমাদের শেখাননি।’ 
মাসুমা এই পর্যায়ে কঠিন চোখে তাকালেন। কিছুটা বিদ্রোহী হয়ে উঠে বললেন, 
‘ আমরা তোমার অন্যকেউ নই মৌনি। তোমার বাবা-মা। দাদাজান তোমাকে কী শিখিয়েছেন তার চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমি তোমাকে কী শেখাচ্ছি। এজন্যই আমি চেয়েছিলাম তোমাকে তোমার নানাবাড়িতে রেখে বড়ো করতে। উনার মতিভ্রম শেষ পর্যন্ত তোমাকেও গ্রাস করেছে।’ 
দাদাজানের প্রতি মায়ের এই গোপন ক্ষোভ আবিষ্কার করে মনে মনে বেশ অবাক হলো মৌনি। দাদাজানকে তারা কেউই পছন্দ করে না। তারপরও তার বিরুদ্ধে এই বাক্যস্ফূরণ অসহ্য ঠেকলো কানে। তীর্যক কণ্ঠে বলল, 
‘ ভাগ্যিস দাদাজানের মতিভ্রম আমাকে গ্রাস করেছিল, আম্মু। নয়তো আমি জানতাম কী করে, এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য আমার কেবল মৌনি হয়ে উঠাই যথেষ্ট? আর কেউ না থাকলেও, আর কোনো পরিচয় না থাকলেও কেবল মৌনি পরিচয়েই আমি আনন্দের সঙ্গে কাটিয়ে দিতে পারি দীর্ঘ একশো বছর।’ 
মেয়ের এলোমেলো কথায় ক্লান্ত লাগল মাসুমার৷ হতাশ গলায় বললেন, 
‘ তুমি পাগল হয়ে গিয়েছ, মৌনি। এসব ছেড়ে কাল তুমি আমার সঙ্গে তোমার নানুবাড়ি যাবে। কয়েকদিন সেখানে থেকে ঢাকা চলে যাবে। তোমাকে কতবার বলেছি, এই বাড়িতে তুমি বেশিদিন থাকবে না। এখানে থাকার মতোন কোনো পরিবেশ নেই।’ 
মৌনি মায়ের সঙ্গে আর কোনো তর্কে না জড়িয়ে নিজের কাজে ফিরে গেল। কঠিন গলায় বলল,
‘ নানুবাড়িতেও থাকার মতো পরিবেশ নেই মা। আমি ওখানে যাব না৷ তুমি এখন আসতে পারো। আমার আর কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না।’ 
মাসুমা অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, 
‘ তোমার নানুবাড়িতে থাকার মতো পরিবেশ নেই?’ 
‘ না নেই।’ 
‘ কেন নেই?’ 
মৌনি তার অর্ধসমাপ্ত ছবিটির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মায়ের দিকে ফিরে বলল,
‘ কেন নেই সেটা তো আমি জানি না আম্মু। তবে সেখানে গেলেও আমার একইরকম মনে হয়। মনে হয়, ভালোবাসার আড়ালে কোথাও যেন গচ্ছিত হয়ে আছে তীব্র প্রতিহিংসা। আমি আরাম পাই না। কোনোদিন আরাম পেলে, যাব। তুমি এখন আসো প্লিজ। আর কোনো প্রশ্ন করো না। বড় হতে হতে আমার কাছে অসংখ্য প্রশ্ন জমে গিয়েছে আম্মু। এখন প্রশ্ন শুনলেই আমার মেজাজ খারাপ হয়।’ 
মাসুমা জানতে চাইলেন, 
‘ কীসের এতো প্রশ্ন তোমার? প্রশ্ন থাকলে প্রশ্ন করো। সমস্যার সমাধান হয়ে যাক।’ 
মৌনি হাসল। মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বলল, 
‘ উত্তরগুলোই তো সমস্যা, আম্মু। প্রশ্ন থাকলে অতো সমস্যা ছিলো না৷ প্রশ্নের উত্তরগুলো আমি ধারণা করতে পারছি বলেই সমস্যাটা হচ্ছে। তুমি যেমন আমার কোনো উত্তরই নিতে পারছো না। আমিও পারছি না। উত্তরগুলো মেনে নিতে কিছুটা সময় দরকার আমার। সময় দাও। লক্ষ্মী মেয়ে তুমি, আমাকে বিরক্ত করো না। কেমন?’ 
মাসুমা কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। ফ্যালফ্যাল চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মৌনি মাকে এমন জড়বস্তুর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পরম মমতায় তাকে টেনে নিলো বুকের ভেতর। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
‘ প্রশ্নের উত্তর যাই হোক, তার সঙ্গে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই আম্মু। তোমাকে আমি সবসময়ই ভালোবাসি।’ 
মাসুমা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ বিষণ্ন মুখে বসে থেকে কমলার রেখে যাওয়া খামটা খুললো মৌনি। রেজিস্ট্রি করা খাম। হাতিরঝিলের কোনো এক অফিস থেকে হৃদয় নামের কেউ পাঠিয়েছে। মৌনি খামটা খুলতেই হাতে এলো প্রায় হাজার তিরিশেক টাকা। সঙ্গে একটা শুভেচ্ছাবাণী। মৌনি বুঝল, মিথির টেলিফিল্মের গল্পটার সম্মানী হিসেবেই পাঠানো হয়েছে এই এমাউন্ট। গল্পটা মৌনি ফ্রিতেই দিয়েছিল। টাকাটা আশা করেনি বলেই কিছুটা আশ্চর্য হলো। মৌনির মনে হলো, এই টাকাগুলো যেন তার এলোমেলো মস্তিষ্কের জট খুলার একটা পথ দেখিয়ে দিলো। এই পরিবেশ, এই পরিচিত মানুষ, পরিচিত প্রশ্ন ক্রমেই অসহ্য লাগছে তার। মনে হচ্ছে, নিজের জীবনের গল্পটা ঘঁষেমেজে আবার নতুন করে লিখতে পারলে ভালো হতো। তার এমন চমৎকার গল্পটা কোন অশুভ লগ্নে এমন এলোমেলো নিরামিষ হয়ে গেল? কেন হলো? মৌনি ক্লান্ত শ্বাস ফেলল। অপরিচিতদের ভিড়ে কোথাও হারিয়ে যেতে পারলে মনটা শান্ত হতো। ছবি বিক্রির কিছু টাকা ছিলো হাতে। আজ আরও কিছু এলো। এবার হাতের কাজগুলো শেষ করেই নিরুদ্দেশ হবে মৌনি। পিছুটান তো নেই তার কোনো।

—————

রাস্তার ধারে ধারে ফকফকা হলুদ আলো। 
একটা ছাপরা হোটেলে ডিমের ঝোল দিয়ে মাত্রই এক প্লেট ভাত খেয়ে উঠেছে নাহিদ। হাতে সিগারেট। সিগারেটে সুখ টান দিয়ে রাস্তায় নেমে এলো ওরা। ম্যাগাজিনের দ্বিতীয় আর্টিকেলটাও প্রকাশ পেয়ে গিয়েছে গতকাল। এই দেশটা ভারি আজব দেশ। রাস্তার ধূলিকণা থেকে আরম্ভ করে রাজধানীর চাকচিক্যে ঢাকা ওই প্রাসাদগুলো পর্যন্ত বিস্তৃত দূর্নীতি, অপরাধ, ভন্ডামী। এখানে সরল বলে কেউ নেই। সুযোগের অভাবে অসহায়ত্বের মুখোশ পড়ে আছে কেবল। নাহিদ এই পথে যত হাঁটছে ততই বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করছে, এই পথ কত অন্ধকার! অল্প বয়সে ঝোঁকের বসে একটা লোমহর্ষক সত্য উদঘাটন করে নিজেকে সে ভেবে নিয়েছিল দারুণ কিছু। চেয়েছিল, এই পৃথিবীর সকলকে জানিয়ে দিতে সকল মিথ্যা, কপটতা। পারেনি বলেই প্রচন্ড জেদে এই ক্রাইম ম্যাগাজিনের যাত্রা। এই যাত্রায় চলতে আরম্ভ করে সে বুঝেছে, কত নির্বোধ আর ছেলেমানুষ ছিলো সে! যে সত্য-মিথ্যার ধোঁয়াশা সে সবাইকে জানাতে চায় সে তো আদতে সকলেরই জানা। টং দোকানের চা ওয়ালা থেকে আরম্ভ করে ক্ষমতার সর্বচ্চে যারা আসীন হয়ে আছেন, সকলেই। সকলেই জানে উপরমহলে এমন চুরি হয়, ডাকাতি হয়, নিমকহারামি হয় এবং যারা এই নিয়ে কথা বলে তাদেরকে খুব সাবধানে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাই দুপুরের ডালভাতের মতোন সাধারণ এই খবরগুলোর কথা এখন কেউ মুখ ফুটে বলে ফেললে ‘এ কোন নতুন পাগল’ ভেবে মুখ তুলে একবার তার দিকে তাকায় কেবল লোকজন। অতোটুকুই হৈচৈ; তারপর আবার নীরব হয়ে যায় সব। এক ফাঁকে; সিটি করপোরেশনের লোকেরা যেমন করে কুকুর সাফ করে তেমন করেই শিল্পপতি, সন্ত্রাসী, নেতাদের চক্র নীরবে সাফ করে দেয় নতুন পাগলটিকে। কোথাও একটু আহা উঁহু রব হয়তো উঠে। যেমন উঠে থরে থরে কুকুর মেরে ফেলার পর। পুরোনো সত্য নতুন করে আর নাড়া দেয় না কাউকে। কয়েকজন প্রগতিশীল মানুষ হয়তো-বা দুই-একদিন খোঁজ খবর রাখে। তারপর তারাও আগ্রহ হারায়। সংবাদপত্রের সাংবাদিকরাও ক্যামেরা নিয়ে ছুটে তারকাদের পিছু। তাদের সকলেই যেন জেনে গিয়েছে, এই দেশের এই হলো ভবিতব্য। এর থেকে উত্তরণের কোনো উপায় নেই। নাহিদেরও এই অন্ধের দেশে আয়না বেঁচার শখ নেই কোনো। তবে একটা আয়না তৈরি করে যেতে চায় সে। একটা সমাজের আয়না। যে সমাজকে সকলেই জানে কিন্তু স্বীকার করে না। যে সমাজ রাতের অন্ধকারে জেগে উঠে। দিনের বেলার সমাজে যেমন ছোট-বড়, ধনী-গরীব, কামার-মুচি আছে। এই সমাজেও আছে। খালি চোখে দেখা পথচারী শিশু, অসহায় ভিক্ষুক, সরল দারোয়ান, ড্রাইভার, নিশিকন্যা থেকে আরম্ভ করে সরকারী অফিসার, নেতা, সমাজসেবক, ব্যবসায়ী সকলেরই এক ভয়ংকর বাস্তব চেহারা ফুটে উঠবে এই আয়নায়। নাহিদ তাদের অপরাধী করবে না। দোষারূপ করবে না। কেবল নির্লিপ্ত মুখে লিখে যাবে তাদের আয়নায় ধরা পড়া চেহারার কথা। তাদের সেই চেহারার পেছনের মনস্তত্বের কথা। বড় বড় অট্টালিকার আড়ালে ঘটা বহুরূপী ঘটনার কথা অনেকেই আন্দাজ করতে পারে। ওতে আর বিশেষ কিছু নেই। নাহিদ তাই প্রথমে বেছে নিয়েছে এই পথের গল্প। ম্যাগাজিনের তৃতীয় অঙ্কে সেই গল্পের সঙ্গে থাকবে কিছু যৌনতা। বাঙালি যৌনতার প্রতি বড় দুর্বল। তাদের দুই লাইন সাধু পবিত্র কিছু পড়ানো কঠিন। কিন্তু যৌনতা অথবা নারীঘটিত ইশারা দিলে তারা নিরলসভাবে পড়ে যেতে পারে একশো একটি পদ্য। 

নাহিদ ততক্ষণে সিগারেটে শেষ টান দিয়েছে। সৌধ মনের সুখে শিষ বাজাচ্ছে। আদতে অন্ধকার, সুনসান পথ হলেও কান খাড়া করলেই অনুভব করা যায় নিশাচরদের নীরব নজর। নাহিদ-সৌধ আরেকটু এগিয়েই একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে একটি নিশিকন্যাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। আসমানি নীল আর কমলা রঙের জংলি ছাপের একটা শাড়ি পরে আছে মেয়েটা। খুব কাছে দাঁড়িয়ে তার সস্তা মেকাপের আস্তরণ না দেখলে দূর থেকে বেশ মনে ধরার মতোন শরীর। কয়েকদিনের আসা-যাওয়ায় এখানকার বেশ কিছু নিশিকন্যার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তাদের। এই মেয়েটাকেও চেনে। মেয়েটার নাম, বেলী। মিথ্যা নাম। এই পেশায় সম্ভবত সত্য নাম বলার নিয়ম নেই। নাহিদ আর সৌধ কয়েকবার এদের সঙ্গে খাতির জমানোর চেষ্টা করেছে। তেমন কাজ হয়নি। এরা টাকা চেনে। টাকার বদলে পোশাক খসায় কিন্তু ভেতরের খবর খসায় না। এদের মধ্যে অনেকেই আছে যাদের সঙ্গে সব ধরনের মানুষের যোগাযোগ। বেকার, ব্যবসায়ী ,অফিসার, সন্ত্রাস, নেতা কে এমন আছে যে ওদের কাছে আসে না? এদের অনেকে সরাসরি বিভিন্ন নিষিদ্ধ ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। বেলী মেয়েটা নাহিদ আর সৌধকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় সে বুঝেছে এরা খদ্দের নয়। ওরা বেলীকে পাশ কাটিয়ে নীরবে কিছুদূর গেল। সৌধ মুখ ভরে একটা গালি দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
‘ কেমন মুখ ঝামটা দিলো দেখেছিস? শরীর বেঁচে খায় আবার এতো ত্যাঁদড়ামি!’ 
নাহিদ বলল,
‘ এটা ওর ব্যবসা। ব্যবসায় লাভ ক্ষতি সবাই দেখে। সমস্যা হলো, এদের সঙ্গে এভাবে খাতির জমানো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।’ 
সৌধ বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ এদের সঙ্গে খাতির জমিয়ে আমাদের কী লাভ? মা*-টা থাকুক তার মতো।’ 
‘ লাভ আছে। এই সেক্টরে কাজ করতে হলে সব জায়গায় খাতির থাকতে হবে, মামা।’ 
‘ তাহলে এখন কী করবি? এই মাইয়ার এমন ভাব দেখেও কথা বলতে যাবি? জীবনটা হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস না ভাই। আর এগুলোও উপন্যাসের নিশিকন্যা না। এইগুলা খুব সেয়ানা। বোন ডাকবি আর গলে যাবে– তা হবে না।’ 
নাহিদ হেসে বলল,
‘ তাহলে যা ডাকলে গলবে তাই ডাকতে হবে।’ 
সৌধ সরু চোখে তাকাল। বলল,
‘ তোর উদ্দেশ্য কী? এই পঁচা শামুকে পা কাটবি?’ 
নাহিদ নির্লিপ্ত গলায় বলল,
‘ ছেলে মানুষের জন্য আবার পঁচা শামুক, ভালো শামুক কী? তাছাড়া এই মেয়েই যে কাজে লাগবে এরকম না। এদের মধ্যে ঢুকতে হবে। কেবল উপর উপর টাকা পয়সা দিয়ে এদের মধ্যে ঢুকতে পারবি? এরা কেবল খাস খদ্দেরকেই ভক্তি করে। এদের মধ্যে ঢুকলে ঢুকতে হবে ঢুকার মতো করেই।’ 
সৌধ একবার ঘাড় ফিরিয়ে দূরে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে তাকাল। তারপর নাহিদের দিকে ফিরে বলল,
‘ আমাদের অফিসের হাসান ভাইকে কাজটা দিলে হয় না? তার তো এমনিতেও এই পাড়ায় চলাচল।’ 
নাহিদ বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ ওই বালটাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। সে আসে, শুয়েটুয়ে চলে যায়। কাজের কাজ কিচ্ছু হয় না। তবে ওর মাধ্যমে এখানে আমাদের যোগাযোগটা আরেকটু দৃঢ় করা যাবে।’ 
বলে একটু থামল নাহিদ। কিছুক্ষণ মগ্ন হয়ে কিছু ভেবে ঘড়িতে সময় দেখল। বলল,
‘ সাড়ে বারোটা বাজে। এখন তো হাতে কোনো কাজ নেই আমাদের। চল, আজকেই ফার্স্ট ট্রাই দেই।’ 
‘ আজকেই?’ ঢোক গিলল সৌধ। ফিসফিস করে বলল,
‘ ভদ্রঘরের ছেলে হয়ে এসব করবো?’ 
নাহিদ ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে মেয়েটার দিকে হাঁটতে লাগল। সৌধ দৌঁড়ে ওর পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল,
‘ দোস্ত, তোর নানা কিন্তু হাজী মানুষ।’ 
নাহিদ বিরক্ত হয়ে বলল, 
‘ তো?’ 
সৌধ কিছু বলল না। নাহিদ বলল, 
‘ যদি দু'জনে মিলে একশো টাকায় রাজি হয় তাহলে যাব।’ 
সৌধ চোখ-মুখ কুঁচকে বলল,
‘ ছি!’ 
নাহিদ নির্লিপ্ত গলায় বলল,
‘ মেয়েদের মতো এতো ছি ছি করবি না। এই সেক্টরে কোনো ছি-ফি নেই।’ 
সৌধ মিনমিন করে বলল,
‘ কিন্তু তাই বলে আজকেই? একটা মানসিক প্রস্ততি…’ 
প্রত্যুত্তরে নাহিদ কপাল কুঁচকে বলল, 
‘ তুই কী মেয়ে মানুষ যে তোর মানসিক প্রস্তুতি লাগবে? ছেলেদের যেখানে রাত, সেখানেই কাত। ব্যাপারটাকে কাজ হিসেবে নে দেখবি সহজ ব্যাপার।’ 
সৌধ মুখ গুঁজ করে চুপ করে রইল। ওরা এগিয়ে গিয়ে মেয়েটির কাছাকাছি দাঁড়াতেই দূর থেকে একটা গাড়ির হেডলাইট এসে পড়ল তাদের উপর। নাহিদ-সৌধর চোখদুটো কড়া আলোয় ঝলসে দিয়ে গাড়িটা তাদের পাশে এসে থামল। আকস্মিক আলোর ঝাপটায় নাহিদ হঠাৎ কিছুই দেখতে পেল না। তবে পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো গাড়ির ভেতর থেকে। 
‘ আরে, নাহিদ-সৌধ? তোমরা এখানে?’ 
গাড়িতে ফতেহ সিদ্দিকী সাহেবকে বসে থাকতে দেখে ভাবনাতীত আনন্দিত হলো সৌধ। আনন্দের অতিশয্যে প্রায় কেঁদে ফেলে বলল,
‘ আসসালামু আলাইকুম স্যার। কেমন আছেন?’ 
ফতেহ সাহেব সালামের জবাব নিয়ে বললেন, 
‘ ভালো আছি।’ 
তারপর আড়চোখে একবার বারবনিতাটিকে দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
‘তোমরা এতো রাতে এখানে?’ 
 ড্রাইভিং সীটের পাশে সুহানাকে বসে থাকতে দেখে নাহিদ কী উত্তর দেবে ভেবে পেল না। সুহানা ভ্রু কুঁচকে বেলী মেয়েটিকে লক্ষ্য করছে। বাবার প্রশ্নে এবার নাহিদদের দিকে তাকাল। নাহিদ-সৌধ অপ্রস্তুত হয়ে একে-অপরের দিকে তাকাল। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
‘ কাজে এসেছিলাম, স্যার।’ 
ফতেহ সাহেব বললেন,
‘ এতো রাতে কাজ?’ 
নাহিদ হাসল, 
‘ আমাদের কাজ রাতের বেলাতেই তো আরও বেশি, 
স্যার।’ 
উত্তরটা শুনে ভ্রু-জোড়া আরো একটু কুঁচকে গেল সুহানার। ফতেহ সাহেব বললেন, 
‘ আমরা এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে আসছি। গল্প-গুজব করতে করতে এতো রাত হয়ে গেল। তোমরা এখন ফিরলে চলো আমি পৌঁছে দেই।’ 
নাহিদ প্রস্তাবটা সহাস্যে নাকচ করার আগেই একরকম তোড়জোড় করে গাড়িতে উঠে বসল সৌধ। বলল,
‘ জি স্যার। আমরা ফিরছিলামই এখন। আজকে বাইকও আনিনি। তাই একটু বিপদে পড়ে গিয়েছিলাম। এই নাহিদ? উঠে আয়। স্যার পৌঁছে দিবে বলল।’ 
নাহিদ কড়া চোখে একবার সৌধর দিকে তাকিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘ এভাবে তুই ম্যাগাজিন দাঁড় করাবি?’ 
সৌধ বলল,
‘ ম্যাগাজিন যে আজ শুয়ে পড়েনি তাতেই আলহামদুলিল্লাহ।’ 
নাহিদ কঠিন চোখে বন্ধুর দিকে তাকাল। সৌধর থেকে চোখ ফেরাতে গিয়ে সামনের লুকিং মিররে চোখ পড়ে গেল। আয়নায় আরও দুটো চোখের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে গেল তার। চোখদুটো সুহানার। তাদের ফিসফাস কথায় ভ্রু-কপাল কুঁচকে আয়নার ভেতর দিয়ে নিরক্ষণ করছে তাদের। নাহিদদের মনে যে খুবই অসৎ উদ্দেশ্য তা যেন আরো এক লক্ষ বছর ধরে তার জানা। নাহিদ সহজভাবে চোখ ফিরিয়ে নিলো। ফতেহ সাহেব ড্রাইভ করতে করতে বললেন, 
‘ তোমাদের দুটো আর্টিকেলই আমি পড়েছি। চমৎকার হয়েছে। কে লিখেছে? লেখার জন্য আলাদা কাউকে নিয়োগ দিয়েছ?’ 
নাহিদ বলল,
‘ আমিই লিখেছি। লেখক খুঁজছি। আমরা যেরকম চাই সেরকম পাওয়া যাচ্ছে না। যাকে তাকে নিয়ে তো কাজ করাও সম্ভব না।’ 
ফতেহ সাহেব সামান্য অবাক হয়ে বললেন, 
‘ তুমি লিখেছ! চমৎকার। তথ্য সংগ্রহ, কনটেন্ট আইডিয়া, লেখা, প্রচারণা সব তুমি একা করছো নাকি?’ 
‘ একা না। সৌধ আর আমি। অফিসে বেশ কয়েকজন স্টাফ আছে। কিন্তু ওদের মধ্যে বেশিরভাগই আমাদের আইডিয়াটা ঠিক করে ক্যারি করতে পারছে না। আমাদের এমন জনবল দরকার যাদের চিন্তা আধুনিক। নতুন কিছু সৃষ্টি করার স্পৃহা আছে। চেষ্টা আছে। আদিব সাহেব খুঁজে খুঁজে সব ওল্ড স্কুল সাংবাদিক এনে ভরিয়ে ফেলেছেন।’ 
ফতেহ সাহেব মাথা নাড়লেন। কিছুক্ষণ ভেবে গম্ভীর মুখ করে বললেন, 
‘ আমি তোমাদের ক্রাইম এনালাইসিসে সাহায্য করতে পারব। তোমাদের সঙ্গে তাল মেলানোর মতোন তারুণ্য এখনও সম্ভবত কিছুটা আছে। আর সুহানা? তুইও তো জয়েন হতে পারিস ওদের সাথে।’ 
সুহানা চমকে একবার সামনের আয়নার দিকে তাকাল। নাহিদও তাকাল একই সময়। দুই সেকেন্ডের চোখাচোখি। সুহানা বলল,
‘ আমি?’ 
‘ কেন নয়? ক্রিমিনোলজিতে পড়াশোনা করছিস। এই সুযোগে তোরও কিছু এক্সপেরিয়েন্স হবে। নতুন কিছু এক্সপ্লোর করতে পারবি।’ 
‘ বাবা আমি কয়েকমাস পর লন্ডনে চলে যাচ্ছি।’ 
‘ যখন যাওয়ার যাবি। আপাতত ঢুকে পর। তাছাড়া তোমাদের কাজটা তো অনলাইনেও করা যাবে, কী বলো নাহিদ? মাঠ পর্যায়ের কাজ তো নয়।’ 
নাহিদ বলল,
‘ জি স্যার। অনলাইনেও সম্ভব। আমরা কনটেন্ট আইডিয়া, রি-রিড করার জন্য লোক খুঁজছি। তার সঙ্গে সাইকোলজিস্ট খুঁজছি। যারা ক্রিমিনালদের অ্যাকশন এন্ড রিয়েকশন নিয়ে কাজ করে।’ 
ফতেহ সাহেব আমোদিত কণ্ঠে বললেন, 
‘ গ্রেট! এই সুহানা তুইও তাহলে কাজে ঢুকে পড়। নাহিদ? ওকে নেওয়া যাবে তো তোমাদের টিমে?’ 
নাহিদ ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে বলল,
‘ উনি চাইলে কেন নয়? তবে সেক্ষেত্রে উনার সিভিটা আমাদের প্রয়োজন হবে। উনার পড়াশোনা, অভিজ্ঞতা, আগ্রহ এসবের উপর ভিত্তি করে আমরা উনাকে উনার কাজটা বুঝিয়ে দেব। আমাদের কিছু শর্ত থাকবে। তার মধ্যে একটি হলো, চাকরি ছাড়ার দুই মাস আগে আমাদের ইনফর্ম করতে হবে। যেন এই সময়ের মধ্যে আমরা আমাদের প্রয়োজন মতো ইমপ্লয় নিয়োগ দিতে পারি। স্যালারি উনার চাহিদা মতো হবে কিনা সেটাও বিবেচ্য। সব ঠিক থাকলে…’ 
সুহানার ভ্রু কুঁচকে গেল। মুখটা তেতো লাগছে। এই ছেলেটিকে সে বুঝতে পারছে না। ছেলেটা কী বেশি স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করছে? 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp