আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ৫৬ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

আজ ওদের মন ভালো নেই
          সাব্বিরের ড্রয়ারে জমতে থাকা মোমগুলো অবশেষে কাজে লেগেছে। খাবার টেবিলে সারিবদ্ধ ভাবে জ্বলছে তিনটি মোম। খিচুড়ির সঙ্গে ডিম ভাজি করা হয়েছে। বাইরে এখনও রিমঝিম ছন্দ তুলে নৃত্য করছে বৃষ্টি কন্যারা। বৃষ্টিকে বরাবরই আকাশের কান্না বলেই জেনে এসেছে সাব্বির। আজ হঠাৎ অনুভব করছে, বৃষ্টি আকাশের কান্না নয়, নৃত্য। সারাদিনব্যপী তাদের কীসের এতো আনন্দ কে জানে? 

সাব্বির মাথা নিচু করে এক মনে খাবার খাচ্ছে। বৃষ্টির ঝমঝম আওয়াজ ভিন্ন আশেপাশে কোথাও কোনো উচ্চবাচ্য নেই। কাঁঠালচাঁপার খুশবুটা আবার ফিরে এসেছে। তার সঙ্গে মিশে গিয়েছে মিথির গায়ের নারীসুলভ গন্ধ। মিথি গোসল সেরেই খেতে বসেছে। সাব্বির যে সাবানটা রোজ মাখে, সেই সাবানই সম্ভবত গায়ে মেখেছে। অথচ একদম অন্যরকম, কোমল এক সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। সাব্বির এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না, মিথি সত্যিই এসেছে। যদি এসেও থাকে তাতে সাব্বিরের কী রকম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত– বোধগম্য হচ্ছে না। সাব্বির নীরবে তার খাবার শেষ করলো। খাওয়ার সময়টুকুতে মিথিও টু শব্দটি পর্যন্ত করলো না। এতো নিস্তব্ধতায় সাব্বিরের হঠাৎ সন্দেহ হলো, মিথি আসলেই তার কল্পনা নয় তো? সাব্বির টের পাচ্ছে তার জ্বর খুব দ্রুত বাড়ছে। জ্বরের ঘোরে হিল্যুসিনেশন হচ্ছে না তো? এর আগে একবার খুব জ্বর হলো। সেদিনও তো বারবার হিল্যুসিনেশন হচ্ছিল। বৃষ্টিকে মিথি ভেবে কী কেলেংকারী অবস্থা! সাব্বির চোখ তুলে একবার মিথির দিকে তাকাল। তারপর তাকিয়েই রইলো অপলক। মিথি একমনে খাবার খাচ্ছে। কমলা আর ঘিয়ে রঙের মিশেলে একটা নরম সুতি শাড়ি তার পরনে। ভেজা চুলগুলো থেকে টপটপ করে জল গড়াচ্ছে। দুধে-আলতা গায়ে এখনও ফোঁটা ফোঁটা জলের চিহ্ন। তীক্ষ্ণ নাসা, আয়ত চোখ, পলিশ করা গালে যেন পিছলে পড়ছে মোমের হলদে আলো। এতো সৌন্দর্য একসঙ্গে একজন মানুষের মধ্যে কী করে থাকতে পারে কে জানে! মিথি খাবার শেষ করে চোখ তুলে তাকাল। স্বাভাবিক গলায় বলল,
‘ চা খাবেন তো, সাব্বির? আপনি বারান্দায় গিয়ে বসুন। আমি চা করে আনছি।’ 
সারাদিনের বৃষ্টিতে থৈথৈ হয়ে আছে বারান্দা। এমন তীব্র জ্বর নিয়ে এখন বারান্দায় বেরুনো উচিত হবে না। কিন্তু এই সহজ কথাটা বলতে পারল না সাব্বির। নড়লও না। আগের জায়গাতেই স্থির বসে থেকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইল মিথির দিকে। মিথি তার দৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করে একটা মোম হাতে চলে গেল রান্না ঘরের দিকে। মিনিট পনেরো পর চায়ের কাপ হাতে ফিরে এসে সাব্বিরকে একইভাবে বসে থাকতে দেখল মিথি। পাথরের মতো মুখ করে নীরবে সে তাকিয়ে আছে গলতে থাকা মোমের দিকে। মিথি চায়ের কাপটা সাব্বিরের সামনে নামিয়ে রেখে তার পাশেই চেয়ার টেনে বসল। জিজ্ঞাসা করল, 
‘ কী ভাবছেন?’ 
সাব্বির খানিকটা চমকে মিথির দিকে তাকাল। মিথি চায়ের কাপটা দেখিয়ে বলল, 
‘ আপনার চা।’ 
সাব্বির দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে চায়ের কাপটা হাতে নিলো। মিথি একটু উদ্বিগ্ন গলায় বলল, 
‘ আপনার জ্বর খুব বেড়েছে নাকি? চোখ-মুখ কেমন লাল হয়ে গিয়েছে। দেখি?’ 
বলে সাব্বিরকে কোনোরকম উত্তরের সুযোগ না দিয়ে হাত বাড়িয়ে তার শীতল হাতটা রাখল সাব্বিরের জ্বর তপ্ত কপালে। কপালে ঠান্ডা স্পর্শ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেলল সাব্বির। কানে বাজল মহাদেব সাহার সেই বিখ্যাত কবিতা– 
‘ বহুদিন ভালোবাসাহীন, 
বহুদিন উথালপাথাল 
বহুদিন কারো হাত পড়েনি কপালে 
বহুদিন দু'চোখের অশ্রু কেউ মোছায়নি আর…’ 
সাব্বির চোখ মেলে তাকিয়ে ক্লান্ত, অসহায় গলায় জিজ্ঞাসা করল,
‘ কেন মিথি?’ 
মিথি সে কথার উত্তর না দিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
‘ আপনার জ্বর তো খুব বেশি। আবার ডেঙ্গু বাঁধালেন না তো?’ 
সাব্বির অধিকতর ক্লান্ত গলায় বলল,
‘ আমি খুব ক্লান্ত মিথি। আমাকে শান্তি দিন। আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করবার শক্তি আমার আর নেই। কেন বুঝতে পারছেন না মিথি? আমার সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক সম্ভব নয়। আপনাকে দেবার মতো কিছুই নেই আমার কাছে। একটা বিবাহিত দাম্পত্যে যা দরকার তা আমি দিতে পারবো না কখনো। I won’t be able to meet your intimate needs.’ 
মিথি তার হাতটা সরিয়ে নিয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে জিজ্ঞাসা করল,
‘ কেন পারবেন না?’ 
‘ কারণ আমার নিজেকে হিংস্র পশু মনে হয়। যে রক্ত ধারা থেকে আমার সৃষ্টি সেখানে কী রকম হিংস্রতা আছে তা আপনি জানেন। আমি কারো ক্ষতির কারণ হতে চাই না। কাউকে দুঃখ দিতে চাই না। চুপিচুপি এই পৃথিবীতে এসেছি আমি। আমাকে এভাবেই কটা দিন বেঁচে থেকে চলে যেতে দিন, মিথি। প্লিজ!’ 
মিথি বলল,
‘ কিন্তু আমার তো আপনাকে চাই।’ 
‘ আমি একটা জড়বস্তু বই কিছু নই মিথি।’ 
‘ তারপরও আমার আপনাকেই চাই।’ 
‘ কেন মিথি? আমাকেই কেন?’ 
মিথি এই প্রশ্নের উত্তর দিলো একটু সময় নিয়ে। মোম জ্বলা আলোয় ভারী চশমার আড়ালে সাব্বিরের প্রায় হারিয়ে যাওয়া চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে বিমুগ্ধ কণ্ঠে বলল,
‘ আপনার মতোন এতো সুদর্শন তো আর কাউকে লাগেনি সাব্বির।’ 
সাব্বির নীরবে মিথির দিকে তাকিয়ে রইলো। প্রতিমার মতোন নিঁখুত সুন্দর মিথি নাকি তার সাধারণ চেহারায় মুগ্ধ! এমন হাস্যকর প্রলাপ শুনে ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলল সাব্বির। মাথা নেড়ে বলল,
‘ আপনি পাগলের মতোন কথা বলছেন মিথি। আমি নিজেকে নিয়েই অতিষ্ঠ। আপনাকে দুঃখ দিচ্ছি এই ভাবনা আমার জীবনকে আরও দূর্বিষহ করে দিবে। আমি চাই আপনি ভালো থাকুন।’ 
মিথি লম্বা দম নিয়ে বলল,
‘ আমার জীবনটা আর পাঁচটা সাধারণ বাঙালি মেয়েদের মতো নয়, সাব্বির। হেঁশেল, সংসার এসবের মধ্যে আটকে নেই আমার জীবন। আবেগ বলতে কোনো জিনিস আমার মধ্যে নেই। আমি খুব প্র্যাকটিক্যাল। তাই এমন সিনেম্যাটিক কথা আমাকে বলবেন না। আমি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ভেবেচিন্তেই নিয়েছি। আপনার ধারণা, আমি আপনার প্রতি দয়া দেখিয়ে, করুণা করে ছুটে এসেছি? এতো সময় আছে আমার হাতে? আপনি আমাকে যেরকম জানেন আমি আসলে সেরকম নই। আমি প্রয়োজনের বাইরে কাউকে করুণাও করি না। চলে গিয়ে ফের আপনার কাছেই ফিরে আসার পেছনে আমারও কিছু রিজন আছে।’ 
সাব্বির মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছিলো। মিথি তার দিকে একটু ঝুঁকে এসে চোখে চোখ রেখে বলল,
‘ আপনি যা আমাকে দিতে পারবেন না, তা আমিও আপনি ছাড়া অন্য কারো থেকে নিতে পারবো না। এখানে আপনি আর আমি সমান অসহায়, সাব্বির।’ 
সাব্বির এর উত্তরে কী বলবে ভেবে পেলো না। মিথির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বলল,
‘ এটা আপনার বাজে ধারণা মিথি। এসব কিছু না। চেষ্টা করলে সব সম্ভব।’ 
মিথি হাসল, 
‘ সেটাই তো। চেষ্টা করলে সব সম্ভব। আপনিও একটু চেষ্টা করে দেখুন। দেখবেন ধীরে ধীরে সব সম্ভব হচ্ছে।’ 
সাব্বির অধীর হয়ে বলল,
‘ আপনি বুঝতে পারছেন না, মিথি। আপনি যা পারেন। আমি তা পারি না। আপনার আর আমার ব্যাপারটা একইরকম নয়। I have trauma. কিন্তু আপনার তো সেরকম নয়। অনেকেই একটা ইমোশনাল সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আরেকটি সম্পর্কে জড়ায়। এটা খুবই সাধারণ ঘটনা।’ 
মিথি সহজ গলায় বলল,
‘ আপনি আমার জন্য একটা ট্রমাই হয়ে গিয়েছেন, সাব্বির। ফিজিক্যাল নিডস্ আর যাই বলেন সেটা আমার আপনার কথা মনে পড়লেই মাথায় আসে। এসব ভাবনা কাজের মধ্যে বিরক্ত করে। যে ভাবনা আমার আপনার জন্য আসছে সেটা অন্য কারো মাধ্যমে তো পূরণ করা সম্ভব না। বিয়েশাদি নিয়ে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। আপনি চাইলেই আমি আপনাকে ডিভোর্স দিতে পারি। কিন্তু ডিভোর্সের পর আমার সঙ্গে আপনার একটা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রাখতে হবে। আর ইউ রেডি ফর ইট?’ 
সাব্বির কেশে উঠলো। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে মিথির দিকে তাকাল। মিথি ইতোমধ্যেই তার চিরাচরিত স্ট্রেইট ফরওয়ার্ড আন্দাজে চলে এসেছে। এখন তার কথায় কোনো রাখ-ঢাক থাকবে না৷ এই মুহূর্তে তার সঙ্গে আলোচনায় যাওয়ার অর্থ হলো স্বইচ্ছায় নিজেকে বিব্রত করা। সুতরাং, সাব্বির চুপ করে রইলো। মিথি তাকে চুপ করে থাকতে দেখে উঠে দাঁড়াল। ততক্ষণে বিদ্যুৎ চলে এসেছে। চায়ের কাপ দুটো তুলে নিয়ে বলল,
‘ আমি ঘুমাতে যাচ্ছি। আপনিও আসুন। জ্বর নিয়ে এখানে বসে থাকার দরকার নেই। ভয় পাবেন না। আপাতত আমার পরিকল্পনা কেবল ঘুমোনো।’ 
সাব্বির সেকথার উত্তর না দিয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে স্থবির হয়ে বসে রইলো। সে জানে না কী করবে। মিথিকে কী করে বুঝাবে! তার চাইতেও চিন্তার বিষয়, মিথি কী সত্যিই আজ তার ঘরে ঘুমাবে! 

—————

চমৎকার সকাল। 
মৌনি চোখ মেলেই দেখল, তার পাশে বসে আছে দারুণ রূপবতী একটি মেয়ে। হাতে চায়ের কাপ। মেয়েটি মৌনির দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে৷ ঘুম ভাঙা চোখেই ভারি অবাক হলো মৌনি। মেয়েটি তাকে তাকাতে দেখে বলল,
‘ গুড মর্নিং, মৌপু।’ 
কণ্ঠটা পরিচিত লাগছে। মৌনি এবার ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখল, মেয়েটি ঋতি। ঋতি তার হাতের কাপটা মৌনির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
‘ তোমার জন্য চা এনেছি, মৌপু।’ 
মৌনি একবার ভাবল একটা ধমক দিয়ে এসব চা-ফা এর নাটক বের করে দেবে। তারপর মন বদলে উঠে বসল। চশমাটা পরে হাত বাড়িয়ে কাপটা নিয়ে বলল,
‘ তুই এমন সাত সকালে চা নিয়ে বসে আছিস কেন? এখন তো আমার ঘুম থেকে উঠার সময় না।’ 
ঋতি বলল,
‘ জানি। তারপরও বসে আছি। আসছি থেকে তোমাকে তো পাচ্ছিই না মৌপু। রাতে আমরা ঘুমিয়ে পড়লে শুতে আসো। উঠে দেখি তুমি ঘুমোচ্ছ। তারপর কোন ফাঁকে উঠে আবার সেই জঞ্জালখানায় চলে যাও। সেখানে তো আবার সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ। তাই আজকে তোমার পাশে বসে আছি। যেন তোমার ঘুম ভাঙলেই দেখা পাই।’ 
মৌনি হাসল। এবার আসলেই কারো সঙ্গে আড্ডা দেবার সময় পাচ্ছে না। খুব একটা ইচ্ছে যে হচ্ছে এরকমও না। ঋতি মন খারাপ করে বলল,
‘ এইবার বাড়িটা কী যে ফাঁকা ফাঁকা লাগছে! তুমিও সারাদিন ব্যস্ত থাকো। ইশতিয়াক ভাই তো সারাদিন হাসপাতালে। মিথি আপুটাও এলো না।’ 
মৌনি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
‘ নাহিদও তো আসেনি বোধহয়। দেখলাম না তো।’ 
ঋতি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ নাহিদ ভাই কী আর আসবে? সেই যে ঝামেলা হলো। তারপর একবারও এ বাড়িতে আসেনি ও। নাহিদ ভাই আসেনি বলে দিব্য, আরিফ ভাই আসতেও দেরি করছে। সবাই দিনদিন কেমন ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছে তাই না, মৌপু?’ 
মৌনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ এই তো জীবন!’ 
তারপর চোখে-মুখে দুষ্টুমির ছাপ নিয়ে বলল,
‘ ওসব ছাড়! তোর স্টেশনওয়ালার কী খবর বল। এখনও প্রেমে ডুবে আছিস?’ 
ঋতি হেসে বলল,
‘ আগের মতো নেই। তবে মাঝেমাঝে মনে পড়ে বুক ব্যথা করে। কী যে সুন্দর দেখতে!’ 
‘ তাকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না?’ 
ঋতি ঠোঁট উল্টে বলল, 
‘ পেলাম না তো। স্টেশনে গেলেই কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আশেপাশে খুঁজি। যদি আবার দেখা হয়। কিন্তু…!’ 
মৌনি হেসে বলল,
‘ আবার দেখা হলে কী করতি?’ 
‘ দেখতাম।’ 
‘ ব্যস?’ 
‘ আর কী করব?’ 
‘ এপ্রোচ করার চেষ্টা করবি না?’ 
ঋতি আঁতকে উঠে বলল,
‘ না বাবা। ওসব আমাকে দিয়ে হবে না।’ 
মৌনি হো হো করে হেসে উঠল এবার। বলল, 
‘ ব্যাপারটা পাগলের কারবার হলেও তুই একদম সঠিক রাস্তায় আছিস। শোন ঋতি, মানুষ এক জীবনে কারণে-অকারণে প্রেমে পড়ে। আল্লাহর এমন চমৎকার সৃষ্টি চারপাশে। তাদের দেখে প্রেমে পড়লে দোষের কিছু না। প্রয়োজনে একশোবার প্রেমে পড়বি। প্রেম চমৎকার একটা ব্যাপার। কিন্তু কখনো প্রেম করবি না।’  
ঋতি অবাক হয়ে বলল,
‘ কেন? প্রেম না করতে পারলে সেই প্রেমে পড়ে কী লাভ?’ 
মৌনি হাসল, 
‘ এইযে একটা সুখ সুখ অনুভূতি হচ্ছে, এই অনুভূতিটা অনুভব করতে পারছিস এটা লাভ। প্রেমে পড়া মজার। কিন্তু প্রেম করতে শুরু করলে দেখবি এই মজাটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। প্রেম করলে সবার আগে হারিয়ে যায় প্রেম। আরেকটা ব্যাপার হলো, পুরুষ। পুরুষ মানুষ ইজ নট গুড ফর হেল্থ। একজন পুরুষের সহস্রাধিক শেড থাকে। এই শেড গুণতে গুণতেই একসময় দেখবি ভালো থাকার মানসিক শক্তি আর নেই। তাই সিঙ্গেল থাক, প্রেমে পড়, প্রেমে জড়ানো থেকে দূরে থাক, সুখী থাক। বুঝেছিস?’ 
ঋতি মাথা নাড়ল। চিন্তিত গলায় বলল, 
‘ ঠিক বলেছ। পুরুষ মানুষের আসলেই অনেক শেড। নাহিদ ভাইকেই দেখো না? আমাদের সাথে একরকম আবার বাইরে আরেকরকম। নাহিদ ভাইকে দেখে কোনোদিন মনে হয় সে খারাপ কিছু করতে পারে? অথচ সবার মুখে মুখে তার নামে খারাপ কথা। কিছু না করলে কী মানুষ এমনিই বলে, বলো? কই বাকিদের নিয়ে তো বলে না।’ 
মৌনি কিছু বলল না। ঋতি বলল,
‘ নাহিদ ভাই নাকি খারাপ পাড়ায় যায়। আমার তো ভাবতেই ভয় লাগছে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে দেখো? নাহিদ ভাইয়ের সামনে যেতেই অস্বস্তি লাগবে এখন।’ 
মৌনি জিজ্ঞেস করলো, 
‘ আর এই খবর তোকে কে দিলো?’ 
‘ নতুন পাড়ার সেলিম চাচা বলেছেন। উনারও তো এসব দোষ আছে। উনার সঙ্গে নাকি নাহিদ ভাইয়ের দেখা হয়ে গিয়েছে ওখানে গিয়ে। উনিই সারা পাড়া চাওড় করেছেন।’ 
মৌনি হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল,
‘ উনি গেলে সমস্যা নেই। নাহিদ গেলেই দোষ?’ 
ঋতি একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ উনার সঙ্গে নাহিদ ভাইয়ের তুলনা? নাহিদ ভাইয়ের একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। উনি কিছু করা মানে আমাদের গোটা বাড়িকে অপদস্ত করা এটা উনি জানেন না? তোমার এটা দোষের মনে হচ্ছে না?’ 
‘ কারো দোষ গুণ পরিমাপ করা তো আমার কাজ না ঋতি৷ নাহিদ যদি ওখানে গিয়ে আনন্দ পায় তাহলে যাক। কিন্তু ও তো ভন্ডামী করছে না। ও কিছু করলে সরাসরি করে। সবার সামনে বলে। কিন্তু কিছু মানুষ আছে যারা নিজের আসল সত্তাকে গোপন রেখে সরলতার মুখোশ পরে থাকে। তোর কী মনে হয়? এদের মধ্যে কে বেশি ভয়ংকর? কে বেশি ক্ষতি করতে পারে আমাদের? যে মুখোশের আড়ালে থাকে সে? নাকি যার কোনো রাখঢাক নেই, সে?’ 
ঋতি অসহায় মুখে মৌনির দিকে তাকিয়ে রইলো। মৌনি হেসে বলল, 
‘ আয় তোকে একটা গল্প শোনাই। তারপর তুই বুঝবি, পুরুষ মানুষের সাইকোলজি কত বিচিত্র। তাদের চাহিদা কত বিচিত্র।’ 
তারপর একবার ঘাড় ফিরিয়ে ঘড়ি দেখে নিয়ে বলল,
‘ আধাঘন্টা গল্প করব। তারপর আমাকে তৈরি হতে হবে। আজ একবার ঢাকা যাব।’ 
 গল্প শুরু হলো। মৌনির গল্প বলার ভঙ্গিমা অপূর্ব। ঋতি আচ্ছন্নের মতোন শুনে যেতে লাগল এক বিস্ময়কর পুরুষের গল্প। 

—————

আকাশে প্রখর রোদ। সেই রোদের মধ্যে হেঁটে দাদাজানের হাসপাতালের বারান্দায় উঠে এলো ইশতিয়াক। ডাক্তারি পেশা ইশতিয়াকের ভালো লাগে না। অথচ দিনদিন এখানেই জড়িয়ে পড়ছে লতাপাতায় আচ্ছন্ন বটবৃক্ষের মতো। ভাল্লাগে না, ভাল্লাগে না করেও নানান ডিগ্রি হাঁকানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। কবে শেষ হবে এই যুদ্ধ কে জানে? যুদ্ধ শেষের পরই বা ইশতিয়াক কী করবে? ডাক্তারি ছাড়া আর কিছু তো পারেও না সে। ইশতিয়াকের মাঝে মাঝে মনে হয়, তার জীবনে যাপন করবার আর কিছু অবশিষ্ট নেই। নারীদের প্রতিও তার আগ্রহ নেই। দাদাজান সম্ভবত ব্যাপারটা বুঝেছেন। বিয়ের জন্য হঠাৎ পাত্রীর উদয় করার চেষ্টা করছেন না। নাহিদের ভাষ্য অবশ্য ভিন্ন। সেদিন সে সব শুনে অবাক হয়ে বলল,
‘ তোমার যে নারীদের প্রতি আগ্রহ নেই সে কথা তুমি জানলে কী করে?’ 
প্রশ্নটা অদ্ভুত হলেও ভাববার মতো। জীবনে কোনো মেয়ের সঙ্গে সেভাবে জড়ায়নি ইশতিয়াক। নারী শব্দটা ভাবলেই মাথায় আসে ছেলেবেলায় ওই অর্ধদিনের টেলিফোন প্রেমিকা আর প্রভা। প্রভা মেয়েটা ভারি যন্ত্রণা করে। আগে বাসায় এসে যন্ত্রণা করতো। ইশতিয়াক গ্রামে শিফট হয়ে যাওয়ার পর কোথা থেকে ফোন নাম্বার জোগাড় করে হোয়াটসঅ্যাপে বিরক্ত করে। চাইলেই ব্লক করা যায় কিন্তু ইশতিয়াক জানে এই মেয়েকে দমানো সম্ভব নয়। সারাদিন ম্যাসেজ করতে করতে ক্লান্ত হয় না মেয়েটা? ইশতিয়াকের অসহ্য লাগে। নাহিদ সেদিন বলছিল, 
‘ একটা প্রেম টেম করো তো ভাই। পুরুষ মানুষ বুদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়ার পর টানা দশ বছর নারী বিবর্জিত থাকলে তারা আর মানুষ থাকে না, গাছ হয়ে যায়। তোমার অবস্থা হয়েছে একই। গাছ হয়ে আছো তাই জীবনের স্বাদ পাচ্ছো না। একটা প্রেম করো। দেখবে জীবনটা কী চমৎকার!’ 
প্রেম! প্রেম জিনিসটা ইশতিয়াকের পক্ষে আদৌ সম্ভব? একবার কী চেষ্টা করে দেখবে? কিন্তু প্রেমে পড়ার মতোন মেয়ে পাবে কোথায় ইশতিয়াক? প্রভাকে দিয়ে চেষ্টা করবে? ভাবতেই চোখ-মুখ কুঁচকে গেল ইশতিয়াকের। এই মেয়েটাকে কেন যেন তার একেবারেই সহ্য হয় না। ইশতিয়াক আনমনা হয়ে নিজের চেম্বারে গিয়ে বসলো। কিছুক্ষণ কিছু ফাইল উদ্দ্যেশ্যহীন উল্টেপাল্টে দেখে মোবাইল বের করে অন্যমনস্ক মনে চলে গেল প্রভার হোয়াটসঅ্যাপে। মেয়েটা কাল রাতে প্রায় পঞ্চাশেক ছবি পাঠিয়েছে। শাড়ি পরা ছবি। ইশতিয়াক সীন করেনি। আজ কী মনে করে দেখল। শাড়িতে মেয়েটিকে বেশ বড় বড় লাগছে। দু'চোখে উপচে পড়ছে চঞ্চলতা। মেয়েটার চুল যে এতো লম্বা আগে কখনো খেয়াল করেনি ইশতিয়াক। ছবি পাঠিয়ে সে আবার জানতে চেয়েছে, 
‘ কেমন লাগছে আমাকে বলুন তো? একদম আপনার বউয়ের মতো লাগছে না? চলুন, বিয়ে করে ফেলি।’ 
ইশতিয়াক ম্যাসেজটা দেখে একটু বিরক্ত চোখে তাকাল। 
‘ পাগল ছাগল।’ 
কথাটা বিড়বিড় করে বেরিয়ে গেল হোয়াটসঅ্যাপ থেকে। হোয়াটসঅ্যাপ থেকে বেরিয়ে ফেসবুকে ঢুকল। আনমনা হয়ে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ নাহিদের একটি পোস্ট চোখে পড়ল। অনেকগুলো মেয়ের সঙ্গে ছবি তুলেছে সে। তার মধ্যে দুটো ছবিতে কেবল একটি মেয়ে। ইশতিয়াক অবাক হয়ে দেখল, মেয়েটি প্রভা। ইশতিয়াককে দেওয়া ছবিগুলোতে যে শাড়ি পরেছে সেই একই শাড়ি এই ছবিগুলোতেও। দু'জনের ছবি তোলার ভঙ্গিমা দেখে মনে হচ্ছে, 
দু'জনের মধ্যে খুবই সহজ, সুন্দর সম্পর্ক। ইশতিয়াক সেখান থেকে একটা ছবি নিয়ে প্রভাকে পাঠাল। জিজ্ঞেস করলো, 
‘ তুমি নাহিদকে কী করে চিনো?’ 
প্রভা সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিলো, 
‘ দেবরকে চিনবো না?’ 
ইশতিয়াক কী বলবে ভেবে পেল না। ধমক দেবে? নাকি চুপ করে থাকবে? অনেক কিছু ভেবে শেষ পর্যন্ত কোনো উত্তরই দিলো না। প্রভা সোৎসাহে লিখল, 
‘ তার কাঁধে হাত রেখেছি বলে বুঝি আপনার ঈর্ষা হচ্ছে?’ 
একটু আগের ম্যাসেজটা ইশতিয়াকের ইহজীবনের প্রথম ম্যাসেজ ছিলো। এবার দ্বিতীয় ম্যাসেজটি পাঠাল। বিরক্ত হয়ে লিখল, 
‘ আমার ঈর্ষা হবে কেন?’ 
প্রভা লিখল, 
‘ বুঝি বুঝি! সুন্দরী বউ অন্য কোনো ছেলের কাঁধে হাত রাখলে মেজাজ তো খারাপ হবেই।’ 
ইশতিয়াক লিখল, 
‘ আশ্চর্য!’ 
‘ আপনি চিন্তা করবেন না, হাতটা দেবর হিসেবে রেখেছি। দেবর তো ছোট ভাইয়ের মতো।’ 
ইশতিয়াক বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ নাহিদ তোমার ছোট ভাইয়ের মতো না। ও তোমার চাইতে কমপক্ষে তিন বছরের বড়।’ 
‘ তারমানে স্বীকার করছেন সে আমার দেবর?’ 
ইশতিয়াক আশ্চর্য হলো। সে কখন স্বীকার করলো? এই মেয়ে কী পাগল? নাকি সেই পাগল হয়ে যাচ্ছে দিনদিন? 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp