ভাব তরঙ্গ - পর্ব ০৭ - বেলা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

ভাব তরঙ্গ - বেলা শেখ
          ব্যস্ত রাস্তায় ছুটে চলা প্রাইভেট কার ধেয়ে আসে। অরুণিতা মুহূর্তেই ঘাবড়ে গেল। পেট জড়িয়ে রাখা প্রহরের হাত দুখানি এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরে ‘পাপা’ বলে চেঁচিয়ে উঠলো। এই বুঝি প্রজ্বলিত প্রদীপ নিভে যায় জোয়ারে। চারদিকে কেমন অদ্ভুত নিশ্চুপতা ঘুরে বেড়াচ্ছে। অরুণিতা চোখ খিচে অপেক্ষা করে। কিসের অপেক্ষা? ঝট করে চোখ মেলে পাশে তাকালো। গতিতে ছুটে আসা গাড়িটি খুব কাছে এসে ব্রেক কষে নিয়ে তাদের বাঁচিয়েছে। বলাবাহুল্য ড্রাইভার অনেক কায়িকশ্রম আর বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। অরুণিতা শুকনো ঢোঁক গিলে হেলমেট খুলে ফেলে। বাইক থেকে নেমে প্রহরকে বলে,

“ভয় পেয়েছো, ওলাফ?”

ছোট মুখটা আতংকিত। মনে হচ্ছে এই বুঝি ঠোঁট উল্টে কেঁদে দিবে। কিন্তু প্রহর কাঁদলো না। হ্যাঁ বোধক মাথা নেড়ে বোনের কোমর জড়িয়ে ধরল। অরুণিতা ভাইয়ের মাথায় হাত রাখল। কিছু বলার জন্য হা করলেও কারো দাবাং মার্কা থাপ্পড়ে কানের ভেতর অদ্ভুত ‘টং’ শব্দ শুরু হয়ে গেলো। অরুণিতার মনে পড়ে না এতোটা শক্ত মার কখনো সে খেয়েছে কি-না। একবার রাগের বশে ধাক্কা দিয়ে প্রহরকে ফেলে দেওয়ার দরুণ মায়ের হাতে কড়া থাপ্পড় জুটেছিল। সেই থাপ্পড়ের সাথে আজকের থাপ্পড়ের তুলনা করলে ধারের কাছেও সেটা আসতে পারে নি। অরুণিতার মনে হলো বাম গাল অবশ হয়ে গেছে।

“এ্যাঁই গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামিস, ট্রাফিক রুলস শিখিস নি? থাপ্পড়ে চাপার সবকটি দাঁত ভেঙে দেবো। মরার শখ হয়েছিল বুঝি? আমি যদি ব্রেক না কষতাম কি হতো? দু’টো লবণ, মরিচ, তেল ছাড়াই আলুভর্তা হতি। এ্যাঁই মেয়ে, কথা বলছিস না কেন? ওয়েট আ মিনিট… তোকে চেনাজানা লাগছে…”

থেমে যায় মানব। সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে দন্ডায়মান রমনীকে মনে করার চেষ্টা করে। কসরত করতে হয় না। চিনে ফেলে রমনীকে। বাইকের চাবি ছিনিয়ে নিয়ে বলে, “তুই আর গাড়ি পাস না? মরার জন্য আমার গাড়িই পছন্দ হয় বুঝি? তাহলে দাঁড়া এখানে তোকে পিষে ফেলি… আই মিন গাড়ি দিয়ে উড়িয়ে ফেলি তোকে।”

নিজ বাক্য নিজ শ্রুতিধরেই কটু শোনায় বিধায় শুধরে নেয় মানব। ওদিকে রাগে অপমানে অরুণিতার ছোট ছোট নেত্রযুগ্ম রক্তিম হয়ে আসে। ভোঁতা নাকের পাটা ফুলিয়ে আগুন ঝরা চোখে সামনের মানবকে হুঁশিয়ারি দেয়। প্রহর খানিকক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে মানবকে দেখে নেয়। একটু ভয় ভয় লাগলেও প্রাণপ্রিয় বোনের হয়ে প্রতিবাদী সুরে বলল,

“তুমি কি ব্যাড বয়?”

মানব ঘার ঝুঁকায়। বাচ্চা ছেলেটাকে দেখেই প্রথম যে শব্দ মাথায় আসে তা হলো, খরগোশ। সে আকাশচুম্বী রাগ দমিয়ে রেখে বলল, “না।”

“তাহলে আমার আপুনিকে মারলে কেন?”

মানব অরুণিতার দিকে তাকায়। নজর কাড়ে বোচা নাক খানি। সেথায় অহংকার টইটম্বুর। সে গুরুগম্ভীর গলায় বলল, “তোর আপার ভাগ্য ভালো এখানে কোনো পুকুর নেই। থাকলে ওকে চুবিয়ে ধরতাম। মাথামোটা, বেকুব, বেহুঁশ কোথাকার! একটুর জন্য পটল তুলিস নি দু’টো। এই তোকে লাইসেন্স কে দিয়েছে? লাইসেন্স বের কর দেখি।”

অরুণিতাকে ধমকে ওঠে মানব। প্রহরের ভালো লাগলো না। সে তেতে উঠল। আঙুল তুলে বলল, “তুমি কি ম্যাথ টিচার?”

মানব নাক মুখ কুঁচকে বলল, “না।”

“তাহলে এভাবে আপুনিকে ধমকাচ্ছো কেন?’

“এ্যাঁই খরগোশ, তোর সমস্যা কি?”

“আমি কি ক্যারোট খাচ্ছি?”

মানব ভারী বিরক্ত বোধ করে বলল, “না, কিন্তু ক্যারোট কোথা থেকে উদয় হলো?”

“তাহলে আমাকে খরগোশ কেন বললে?”

মানব অদ্ভুত চোখে প্রহরকে পরখ করে বলল, “কারণ তোর দাঁত দুটো খরগোশের মত। নিশ্চয়ই খরগোশের থেকে চুরি করে এনেছিস?”

প্রহর মানবকে অনুকরণ করে আপাদমস্তকে চোখ বুলিয়ে দাঁত কটমট করে বলল, “তোমাকে যে উল্লুক পুরের কালো ভাল্লুকের মতো লাগছে সেটা আমি বলেছি বলো?”

মানব আশ্চর্য হয়। এ ছেলের দেখি ঠোঁটের আগায় জবাব রেডি। পুরাই টেপরেকর্ডার। তবে কালো বলায় ইগোতে লাগলো। এরপর কি বলবে ভেবে পেলো না বিধায় মুর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে ধমকে বলল, “এই তোকে বললাম না লাইসেন্স দেখাতে?”

অরুণিতা এখনও থাপ্পড়ে আঁটকে। ব্যাপারটা তাঁর হজম করতে কষ্ট হচ্ছে। এই ভরা রাস্তায় এক আহম্মক তাঁকে থাপ্পড় মেরেছে। আবার তুই তোকারি করে ধমকাচ্ছে। এসব আদৌ হচ্ছে নাকি সে জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে! অরুণিতা ভয়ংকর রেগে আছে। লাইসেন্স বের করে মুখের উপর ছুঁড়ে মারে। মানব তাঁর বেয়াদবিতে আশ্চর্য বনে যায়। কি তেজ রমনীর! রাগে বোচা নাকের ডগা টকটক করছে। সে লাইসেন্স চোখ বোলাবে এরইমাঝে ট্রাফিক কনস্টেবল এসে উপস্থিত হয়।

“স্যার, এর লাইসেন্স আমি ক্যান্সেল করার ব্যবস্থা করছি। সাথে মোটা অংকের জরিমানা তো আছেই। আপনি বললে কেসটাও ঠুকে দেওয়া যেতে পারে। আপনি কাইন্ডলি রাস্তা ক্লিয়ার করুন। আবার দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। আপনার পরিচয়?”

কন্সেটেবল খুবই আন্তরিকতার সাথে বলল। মানব মুচকি হেসে হাত মিলিয়ে বলল, “সোহরাব শেখ। আর এই মাথামোটার নামে কেস ফাইল করাই যায়। লাইসেন্সের ফটোতে থাকা অত্যধিক সুন্দরীর সাথে এই থোবরার মিল নেই। কার না কার বাইক চুরি করে এনেছে।”

প্রহর চট করে বলতে নেয়, “এটা মাম্মাম….”

অরুণিতা তাঁর মুখ চেপে ধরে থামিয়ে দেয়। দাঁত কিড়মিড় করে কনস্টেবলকে বলল, “এটা আমার স্কুটি। আমার তাড়া ছিলো বিধায় ইউ টার্ন নিয়েছিলাম। আমার ভুল ছিলো মানছি কিন্তু উনি আমার সাথে মিসবিহেভ করেছে। ওনার সাহস কি করে হয় আমাকে থাপ্পড় মারার? আমি পাপাকে ফোন করছি। তারপর দেখে নিবে ওনাকে!”

“আমার তো ভয়ে হাঁটু কাঁপছে কনস্টেবল ভাই। আপনি কি আমাকে নিরাপত্তা দিবেন?”

পরিহাস করে বলে সোহরাব শেখ। অরুণিতা চোখ গরম করে চাইলে ভ্রু কুঁচকে নেয় সে। অরুণিতা কাঁধের ব্যাগ হাতড়ে ফোন খুঁজে। যদিওবা সে জানে তাঁর কাছে ফোন নেই। কনস্টেবল লাইসেন্স হাতে নিয়ে সন্দিহান চোখে অরুণিতার দিকে তাকালো। 

“নাম?”

“পাতা ইসলাম।”

অরুণিতা সামান্যও ঘাবড়ালো না। প্রহর চোখ বড় বড় করে বোনের দিকে তাকিয়ে রয়। অরুণিতা অতি সুক্ষতার সাথে তাঁকে চুপ থাকতে বললো। প্রহর বোনের ইশারা বুঝে চুপ থাকে। সোহরাব শেখ পকেটে হাত গুটিয়ে বলল,

“ডেইট অফ বার্থ অনুযায়ী স্কুটির মালিক চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। কিন্তু তোকে তো সুইট সিক্সটিন মাইনাস লাগছে। খুব জোর ফোরটিন; কম হলেও হতে পারে।”

“তুই তোকারি কেমন ভাষা? বাবা-মা ভদ্রতা শেখায় নি? অবশ্য ভদ্রতাবোধ থাকলে নিশ্চয়ই একটা মেয়ের গায়ে হাত তুলতেন না। অসভ্য লোক!”

অরুণিতা কথা ঘোরানোর চেষ্টা করে। সোহরাব শেখ ‘অসভ্য’ সম্বোধনে হাসলো। তাঁর মতো ভদ্রলোককে প্রথম কেউ অসভ্য বলে অভিযোগ করলো। ব্যাপারটা দারুণ তো! সে কনস্টেবলের থেকে লাইসেন্স নিয়ে শুধালো,

“বাপের নাম?”

“আতিকুর ইসলাম!”

“মায়ের নাম?”

“লাবনী আক্তার।”

সোহরাব করছা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, “কনস্টেবল ভাই, এখানে রহিম মিয়া আর পারুল লেখা। এক কাজ করুন একে জেলে পুরে দিন। নিশ্চিত স্কুটি চুরি করে এনেছে। আজকাল সুন্দরী মেয়েরা সেজেধেজে চুরি করতে বের হয়। জামানা আপগ্রেড হচ্ছে না?”

অরুণিতা সোহরাবের হাত থেকে লাইসেন্স ছিনিয়ে নিয়ে বলল, “ফাজলামি করেন আমার সাথে? এখানে আতিকু….”

থেমে যায় অরুণিতা। সত্যিই রহিম মিয়া আর পারুল লেখা। অরুণিতার মাথায় বাজ পড়লো যেন। নানুমা আর নানুর নামই তো সে বলেছিল। এঁরা আবার কারা? এখন কি হবে? অরুণিতা খানিকটা বিচলিত হলেও তা প্রকাশ করে না। গম্ভীর মুখে সামনের মানবের পানে তাকায় সরাসরি তাকায়। বেগুনি রঙের ঢিলেঢালা শার্ট। কালো জিন্স যা গিঁড়ার ঈষৎ উপড় অবদি। অরুণিতা মুখের দিকে তাকায়। প্রহর ভুলভাল নাম মোটেই দেয় নি, কালো ভাল্লুক। কালার সেন্সটুকুও নেই। এমনিতেই কালো তাঁর উপর বেগুনি রঙের শার্ট পড়েছে। আরো কালো ভূত লাগছে। সে ঠান্ডা মাথায় সব বলল,

“এটা মাম্মামের স্কুটি। আমার লাইসেন্স না থাকলেও আমি চালাতে পারি। পাপা শিখিয়েছে আমাকে। আর আঙ্কেল আপনার ফোনটা দিন। আমি পাপাকে ফোন করছি আপনি তাঁর সাথেই কথা বলুন না হয়। আমার পাপা সরকার জুয়েলারি ফ্যাশন হাউজের ওনার অ…”

“ওয়ে পাপা কি পারি বয়স কত তোর?”

অরুণিতা তাকে পাত্তা না দিয়ে কনস্টেবলকে বলল, “ওই জ্যামে আটকে ছিলাম আমি। ওখানে কিছু বখাটে ছেলে আমাকে ডিস্টার্ব করছিলো। আপনিও তো দেখেছিলেন। তাই বাধ্য ইউটার্ন নিয়েছিলাম। আমি ফাইন দিতেও রাজি। আপনি পাপাকে ফোন করুন একবার?”

কনস্টেবল কথা বাড়ালো না। বেশভূষায় বড়লোক ঘরনার লাগছে। মোটাতাজা ফাইন পাওয়া গেলে তারই পকেট ভরবে। তাই সে সোহরাবকে যেতে বলে অরুণিতাকে নিয়ে ফুটপাতে এসে মিমাংসা করে। অরুণিতা তিন হাজার টাকায় সব সামলে হাঁফ ছাড়লো। পাপাকেও ফোন করতে হয় নি। অরুণিতা ঝামেলা চুকিয়ে স্কুটিতে বসে। হঠাৎ মনে পড়লো চাবি ওই কালো ভাল্লুকটা ছিনিয়ে নিয়েছিল আর ফেরত দেয় নি। 

“আপুনি স্কুটি চালাচ্ছো না কেন?”

“চাবি ওই কালো ভাল্লুকের কাছে।”

প্রহরের চোখ দুটো বড় বড় হয়, “এখন কি হবে?”

“তোমার মাথা হবে।”

“আমার মাথা তো আছেই আবার হবে কেন?”

“ওলাফ, চুপ করবে?”

“আপুনি ওই দিকে দেখো?”

প্রহর আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে ফিসফাস করে। অরুণিতা সেদিকে লক্ষ্য করতেই কালো ভাল্লুকটার দর্শন মিলে। ফুটপাতে বসে চায়ের কাপে পাউরুটি ডুবিয়ে গিলছে। সাথে আরেকটা পিচ্চি মেয়ে। মেয়েটা ফুল বিক্রেতা। এই রাস্তায় প্রায়শই ফুল বিক্রি করতে দেখেছে সে। অরুণিতা প্রহরকে বলল,

“আঙ্কেলের থেকে চাবি নিয়ে আসো।”

প্রহর হনহনিয়ে চলে যায় চাবির জন্য। সোহরাব প্রহরকে দেখে ভ্রু উঁচিয়ে কি ইশারা করতেই প্রহর বলল, “আঙ্কেল, স্কুটির চাবি দাও?”

সোহরাব মুখের চা ছিটকে বেরিয়ে আসে ‘আঙ্কেল’ সম্বোধনে। প্রহর নাক ছিটকিয়ে দূরত্ব মেপে দাঁড়ালো। বলল, “আঙ্কেল ফাস্ট ফাস্ট দাও না?”

সোহরাব চট করে প্রহরের কান টেনে ধরে বলল, “এ্যাই হারামি, আঙ্কেল কাকে ডাকিস? বোনের মত থাবড়া খাওয়ার শখ জাগছে তোর?”

প্রহর চেঁচায়, “ছাড়ো আমার লাগছে! আপুনিই তো বললো আঙ্কেল ডাকতে। আর তোমাকে তো আঙ্কেলই লাগে। ছাড়ো আমার কান‌?”

অরুণিতা স্কুটি ফেলে এদিকেই আসছে। সোহরাব তার দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে প্রহরকে বলল, “খরগোশ, দুলাভাই না ডাকলে ছাড়বো না। ডাক দুলাভাই?”

প্রহর অবুঝ মনে ‘দুলাভাই’ ডাকে। অরুণিতা ততক্ষণে হাজির। রাগে বোচা নাক ফুঁসছে। সোহরাব প্রহরের কান ছেড়ে গাল টিপে দিলো। দাঁত কেলিয়ে বলল, “খরগোশরে তোর বোন এখন আমার।”

অরুণিতা হঠাৎ দুঃসাহসিক কাজ করে বসে। ঠাস করে চড় মেরে দেয় মানবের গালে। সোহরাব হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়। ঊনত্রিশ বছরের জীবনে প্রথমবারের মতো কেউ তার গায়ে হাত তোলার মতো দুঃসাহস দেখালো। তাও হাঁটুর বয়সী এক পিচ্চি মেয়ে যার দুধের দাঁত পড়েছে কি-না সন্দেহ। মুহূর্তেই শ্যামল মুখখানি গম্ভীর হয়ে আসে। হয়তোবা তারই ভুল। বাচ্চা মেয়েটার সাথে এমন মজা করা উচিৎ হয় নি। সবাই মজা নিতে জানে না। সে চাবি বের করে দেয়,

“আমি খুবই দুঃখিত। মজার ছলেই বলেছিলাম। সিরিয়াসলি নিবি ভাবতেও পারি নাই। নে চাবি?”

অরুণিতা শক্ত কিছু বলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। কিন্তু সোহরাবের কোমলতায় একটু দোনামোনায় ভুগে। তবে থাপ্পড়ের বদলায় থাপ্পড় মারতে পেরে পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করে। স্বীয় গালের ব্যথা ঘুচলো বুঝি। ভাবনার মাঝেই আকস্মিক কানে তাজা লাল গোলাপ জায়গা করে নেয়। অরুণিতা স্তম্ভিত চোখে তাকিয়ে। সোহরাব অত্যন্ত বিনয়ী সুরে বলল,

“অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী। পুরোপুরি বিদ্যা অর্জন না করে জনবহুল রোডে ড্রাইভ না করাই উত্তম। তোর জানের মায়া না থাকতে পারে কিন্তু জনগনের আছে। তোর জন্য তাঁরা কেন হয়রানির শিকার হবে? পঙ্গুত্ব বরণ করবে কেন? একটা ভুল তারপর সারাজীবনের কান্না। আমার গাড়ির সাথে দু’দুবার এক্সিডেন্ট হতে হতে বেঁচেছিস। মরলে তো ল্যাটা চুকেই যেতো। কিন্তু এদিক সেদিক হলে সারাজীবন বোঝা হয় অন্যের ঘারে ঝুলে থাকতে হতো। সে বাদ দে, তোর কপাল তুই খাবি, আমার কি! কিন্তু কথা হলো আমার গাড়ির সামনে আরেকবার আসলে তোকে কবরস্থানে পাঠানোর বন্দোবস্ত আমিই করবো। বি অ্যালার্ট সোনা!”

পুরো লেকচার অরুণিতার কানে ছাগলের ভ্যাঁ ভ্যাঁ লাগলেও শেষোক্ত ‘সোনা’ সম্বোধনে অরুণিতার বুকটা খচখচ করে। বাবার মুখটা মানসপটে ভাসে। সে অপলক দৃষ্টিতে মানুষটির প্রস্থান দেখে। 

—————

“অরুণাভ, আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না যে আমি শ্বশুরবাড়িতে বসে আছি। খুশিতে ডিজে গান লাগিয়ে নাচার খায়েশ জাগছে রে বন্ধু। আচ্ছা তোর ভাবী এখনও আসছে না কেন রে? তাঁকে দেখার জন্য আমার দু’নয়ন ব্যাকুল হয়ে আছে।”

অরুণাভ কটমট করে তাকালো। টুটুল পাত্তা দিলো না। দাঁতে নখ খুঁটে খানিকটা লাজুক হওয়ার ভান করে বলল, “আমার না লজ্জা লাগছে। প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি এলাম তাও খালি হাতে। মিষ্টি পান সুপারি কিছুই তো আনি নি। সবাই কি ভাবছে বল তো?”

“আরেক বার শ্বশুরবাড়ি শব্দটা উচ্চারণ কর, তোর জিভ আমি টেনে ছিঁড়ে ফেলবো। একদম চুপ!”

অরুণাভ চাঁপা স্বরে ক্ষোভ ঝাড়লো। এসেছে নাস্তে ‘শ্বশুরবাড়ি’ বলে কান খেয়ে ফেলছে। অরুণাভ বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালো। টুটুল টেনে পাশে বসিয়ে মিনমিনে সুরে বলল, “রাগিস ক্যান ভাই? আচ্ছা চুপ থাকলাম আমি।”

অরুণাভ বসলো। বন্ধুকে শক্ত কিছু বলবে তখনই আগমন ঘটে শোয়াইব আখতারের। তাঁর হাত ধরে দশ কি এগারো বছরের বাচ্চা মেয়ে ঝুটি নাচিয়ে হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে। হঠাৎ বাচ্চা মেয়েটা চেঁচিয়ে উঠলো। এক যুবক ঝুটি টেনে ধরেছে। অরুণাভ তাদের চেনার চেষ্টা করে। 

“বরুন, এই হলো বাদল আর বৃষ্টি। তোমার আরেক ভাই-বোন। ওঁরা কিন্তু তোমাকে চিনে। বাদল তো তোমার ডাই হার্ট ফ্যান। তোমার সাথে দেখা করবে বলে আজ বাড়ি থেকে বের হয় নি।”

বর্ষা খাবারের ট্রে টেবিলে রেখে অরুণাভের সাথে পরিচয় করায় তাদের। বাদল হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল, “হ্যালো ভাইয়া।”

অরুণাভ মুখটা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই গম্ভীর। সে ভদ্রতার খাতিরে ছোট্ট করে ‘হ্যালো’ বলল। টুটুল বন্ধুকে খোঁচা মেরে ফিসফিসিয়ে বলল, “কথা হলো বর্ষা-বাদল-বৃষ্টি তিনটা নাম তো একই লাউ আর কদু। তোর মায়ের কি কমনসেন্স নেই? দুনিয়ায় নামের অভাব পড়েছিল নাকি?”

“চুপ করবি?” 

অরুণাভ দাঁতে দাঁত চেপে বলল। এই পরিস্থিতিতে এই প্রশ্ন করা যৌক্তিক? মাথামোটা কোথাকার! টুটুল পরিস্থিতি গুলি মেরে দাঁত কেলিয়ে বলল, “না, তোর আরেক বোন কই?”

অরুণাভ শান্ত চোখে চাইলো বন্ধুর দিকে। বর্ষা দু’জনকেই খেয়াল করছিলো। তাদের গুসুরফুসুর অস্পষ্ট বিধায় শুধালো,

“কোনো সমস্যা বরুণ?”

“আমার নাম অরুণাভ সরকার। বরুণ বলা ডাকা বন্ধ করলে খুশি হবো। খুবই বিরক্ত লাগে।”

অরুণাভ বিরক্ত মুখে বলল। বর্ষার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে আসে। শোয়াইব বলল, “মায়ের সাথে এভাবে কথা বলে কেউ? দেখো তোমার মায়ের মুখখানি? এমন কোনো দিন নেই যেদিন বর্ষা তোমার কথা মনে করে কাঁদে না।”

অরুণাভ কর্কশ গলায় বলল, “এসব আমাকে কেন শোনানো হচ্ছে?”

“কারণ তুমি তোমার মা’কে কষ্ট দিয়ে কথা বলছো বরুণ।”

“আমি আমার মা’কে কষ্ট দেওয়ার কথা ভাবতেও পারিনা। সে আমার জান।”

অরুণাভের কথায় বর্ষার মুখটা জ্বল জ্বল করে উঠলো। চোখ জোড়া চিকচিক করে। ভাবে তাঁর ছেলেটা এখনও তাঁকে ভালোবাসে। কিন্তু তাঁর ভাবনায় জল ঢেলে অরুণাভ বলল,

“আমার মা তো আমার দুনিয়া। সে-ই যে মা আমাকে তাঁর মমতায় জড়িয়ে নিলো আর ছাড়ে নি। তাঁকে ছাড়া আমার ভোর হয় না। না সন্ধ্যা নামে। তাঁকে না ডাকলে আমার তৃপ্তি মিলে না। বাড়ির চৌকাঠে পা পড়লেই আমার মুখ দিয়ে আপনে আপ ‘আম্মু’ ডাকটা বেরিয়ে আসে। তাঁর হাসিমাখা মুখটা না দেখতে পেলে আমি অস্থির হয়ে পড়ি। আমি বলি আব্বুকে ছাড়া আমার চলবে না কিন্তু আদতে তা নয়। আমার তো আম্মুকে ছাড়া চলে না। আমার সব খুশিতে যার চোখ আনন্দে ভিজে যায় তাঁকে কষ্ট দেওয়ার কথা আমি অরুণাভ সরকার কখনোই ভাবতে পারি না।”

বর্ষার বুকটা দগ্ধ হয়। পেটের সন্তান অন্য কাউকে মা ডাকছে। আবার গর্বের সাথে তাঁর গুনগান গাইছে। মায়ের তা সয়? ও কি জানে না, সৎ সৎ-ই হয়; আপন কখনোই হতে পারে না। নারির টান বলেও তো কিছু আছে। সে অনেক কষ্টে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলল, “ভালো তো। তা তুমি যে আমার কাছে এসেছো তাঁকে বলে এসেছো কি?”

“সেটা আপনার ভাবনার বিষয় নয়। আর আমি আপনার কাছে আসি নি। ওই বুড়ি… আই মিন বৃদ্ধা মহিলা ফোন করে কাঁদছিলেন। তাঁর সময় নাকি ফুরিয়ে এসেছে। ম*রার আগে শেষ ইচ্ছা তাই পূরণ করতে এলাম। তাঁর বাঁচা ম*রা নিয়েও আমার কিছু যায় আসে না। বাট মানবিকতার খাতিরেই দেখতে আসা। আর হ্যাঁ তাঁর দোহাই দিয়ে আমাকে আর ফোন করলে ফল ভালো হবে না বলেদিলাম।”

অরুণাভ সোজাসাপ্টা কথা বলে। বর্ষা অবাক চোখে অরুণাভের দিকে তাকিয়ে। এই কি সে-ই বরুণ? যে লুকিয়ে চুরিয়ে এর ওর ফোন থেকে কথা বলতো তাঁর সাথে। ফিরে আসার আকুতি মিনতি করতো।‌ সে বলার মতো কিছু খুঁজে পেল না। শোয়াইব অরুণাভের মুখোমুখি সোফায় বসে বলল, 

“আচ্ছা ওসব বাদ দাও। এখন বলো কি খবর? বাড়ির সবাই ভালো আছে তো?”

“খারাপ থাকার কোনো কারণ দেখছি না।”

শোয়াইব হাসলো। ছেলে বাপের কোনো অংশে কম না। 

“এখন কি করছো? বিপিএলে দল পেয়েছো?”

“জি।”

“কোন দল?”

“ফরচুন বরিশাল”

“রংপুর রাইডার্সে যোগ দেওয়ার কথা শুনেছিলাম। তা খেলা কবে শুরু হচ্ছে?”

“সিডিউল বেরিয়েছে দেখে নিবেন। আমি আপনার কথায় বিরক্ত হচ্ছি। কাইন্ডলি বিরক্ত করবেন না।”

শোয়াইব বর্ষার দিকে একপল তাকিয়ে তৎক্ষণাৎ ড্রয়িংরুম থেকে প্রস্থান নেয়। বৃষ্টি বাবার স্থানে বসে অরুণাভকে বলল, “মম বলে তুমি আমাদের ভাইয়া। কিন্তু তুমি তো আমাদের সাথে থাকো না। তুমি কি পত্র আপুর মতো নানুর বাড়িতে থাকো? কিন্তু তোমার নানু বাড়ি তো এখানেই। তাহলে তুমি কোথায় থাকো?”

অরুণাভ থমথমে মুখে বলল, “আমি তোমাদের ভাইয়া না। তোমার মম ভুল বলেছেন।”

বৃষ্টি হেসে বলল, “আমি জানি তুমি মমের উপর রেগে আছো। মমের হয়ে আমি সরি বলছি ভাইয়া। তুমি প্লিজ মমের উপর রাগ করে থেকো না। মম তোমাকে অনেক লাভ করে।”

অরুণাভের ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি খেলে যায়। বাদলও মায়ের পক্ষ নিয়ে বলল, “মম তো সবসময়ই বলে আমরা তিন ভাই বোন। তুমি আমি আর এই পিচ্চি বৃষ্টি।”

“বাদল ভাইয়া ঠিক বলছে। তুমি আর রেগে থেকো না ভাইয়া। এখন থেকে আমরা সবাই একসাথে থাকবো। ড্যাডি, মম, তুমি, ভাইয়া আর আমি। এখন আমার ফ্যামিলিতে ফাইভ মেম্বারস। 

অরুণাভ, বাদল আর বৃষ্টির দিকে দৃষ্টিপাত করলো। কেন জানে না, তবে ওদের উপর রাগ বা বিরক্তি কোনোটাই আসছে না। সে বর্ষা নামক মহিলার দিকে সরাসরি তাকায়। এটা অস্বীকার করার মতো নয় মহিলা তাঁর জন্মদাত্রী। তারই গর্ভে দশমাস দশদিন ঠাঁয় হয়েছিল। তারই ছায়ায় বড় হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু নিষ্ঠুর মহিলা তাকে প্রত্যাখ্যান করে চলে গেছে। তাঁর কি একটুও বুক কাঁপে নি সেসময়? সে তো তখন দুধের শিশু ছিলো। অরুণাভের চোখ ভিজে উঠতে চায়।‌ সে সন্তর্পণে নিজেকে সামলে বলল,

“ওই বৃদ্ধার ঘরটা দেখিয়ে দিলে ভালো‌ হয়। আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে।”

“নানু হয় তোমার। নানু ডাকতেও সমস্যা আছে? নাকি তোমার আম্মু মানা করে দিয়েছে?”

অরুণাভ কিছু বললো না। বর্ষা চায়ের কাপ এগিয়ে দেয়। অরুণাভ ছুঁয়েও দেখে না। বর্ষা হতাশ হয়ে টুটুলকে দেয়। টুটুল মানা করলো না। ভবিষ্যত শ্বাশুড়ির উদ্দেশ্যে মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে চায়ে চুমুক দিয়েই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এক ফাঁকে বলে, “আপনার আরেক মেয়েকে দেখছি না যে আন্টি?”

“আরেক মেয়ে! আমার তো একটাই মেয়ে। এই যে বৃষ্টি!”

“পত্রলেখা আপনার মেয়ে না?”

“ওহ্ পত্রর কথা বলছো? ও তো আমার ছোট বোন পপির মেয়ে।”

“ওহ্ আচ্ছা। তা সে কোথায়? অরুণাভ তো অনুতাপে জর্জরিত। ও ব্যাট দিয়ে স্বেচ্ছায় মানুষের মাথা ফাটালেও অনিচ্ছায় এই প্রথম। নাক দিয়ে যেভাবে রক্ত বের হচ্ছিল আমরা তো ভয়ে বেকাবু।”

টুটুল দুঃখপ্রকাশ করে। বাদল বলল, “পত্র বোধহয় বার্থডে পার্টিতে যাবে। খালামুনি নিতে এসেছে তাকে। আমি ডেকে আনছি দাঁড়াও!”

তাঁকে ডাকতে যেতে হয় না। কাজের বুয়ার পেছন পেছন পত্রলেখাকে আসতে দেখা যায়। অরুণাভ সরাসরি তাঁর দিকে তাকালো। ধবল লং শার্ট আর ঢোলা জিন্স পরিহিত, গলায় ছোট ওড়না পেঁচিয়েছে। বলাবাহুল্য মেয়েটা অসম্ভব সুন্দর। যেন নিপুণ হাতে বানানো পুতুল। নাকের ব্যান্ডেজে মানুষকে অদ্ভুত লাগলেও পত্রলেখাকে লাগছে না। বরঞ্চ মেয়েটাকে ব্যান্ডেজেও মানিয়েছে। সে কি মনে করে বন্ধু টুটুলের দিকে তাকায়। যে কি-না বিমোহিত চোখে হা করে পত্রলেখাকে দেখে যাচ্ছে। চোখের পলক ফেলছেই না। নিমিষেই হিংসায় অরুণাভের গা জ্বলে ওঠে। পত্রলেখার উপর রাগ হয় আকাশচুম্বী। বর্তমানে তাঁর সবচেয়ে অতীব জরুরী কাজ প্রাণপ্রিয় বন্ধুর মাথা থেকে পত্রলেখা নামক পেত্নি ঝাড়তে ওঝাগিরি করা। 

“চোখ ফেরা নয়তো তুলে নিবো। মনে রাখিস অতিরিক্ত সুন্দরী মেয়েরা বেঈমান হয়। তোর বুকে ছুরি গেঁথে রক্তাক্ত করে অন্যজনের সাথে সুখে সংসার বাঁধবে।”

টুটুল কাঁদো কাঁদো মুখে বন্ধুর পানে তাকালো। অরুণাভ বন্ধুর কাঁধ চাপড়ে বলল, “ওই পত্রলেখা তোর টাইপের না। তোর জন্য সুশীল-সংস্কারী গোপি বউ টাইপ কাউকে আনবো প্রমিজ।”

“ওই বেনুনি টেনে বিরক্ত করার জন্য হলেও পত্রলেখাকেই চাই আমার। তুই যদি ভিলেনগিরি দেখাতে আসিস তোর সাথে বন্ধুত্ব এখানেই শেষ।”

অরুণাভের চোখ আটকায় পত্রলেখার লম্বা বেনুনির দিকে। এতো বড় বিনুনি? আনিকার বিনুনি কোমড় ছেড়ে দেয় কিন্তু এই মেয়ের হাঁটু ছেড়ে গেছে। অরুণাভ চোখ ফিরিয়ে বন্ধুর দিকে শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। টুটুল দুদিনের মেয়ের জন্য এতোদিনের বন্ধুত্ব শেষ করে দেওয়ার কথা বলতে পারলো? 

মুহূর্তেই মহল জমজমাট। পত্রলেখাকে নিয়ে আগ্রহের অন্ত নেই টুটুলের। বাক প্রতিবন্ধী পত্রলেখা নিজ সম্পর্কে বলতে না পারলেও বাদল আর বৃষ্টি সেই অভাব পূরণ করে দিয়েছে। টুটুলের সাথে সবারই ভাব জমে যায়। অরুণাভ বিরক্ত মুখে বসে থাকে; টু শব্দ করে না। বর্ষা ভেজা চোখে অরুণাভের কাঁধে হাত রেখে বলল,

“আসো তোমার নানুর সাথে পরিচয় করাই। ছোটবেলায় তাঁর কোল থেকে নামতেই চাইতে না। সারাক্ষণ তাঁর কাছেই থাকতে।”

অরুণাভ চুপচাপ উঠে যায় তাঁর সাথে। বর্ষা বাহু জড়িয়ে পায়ে পায়ে হাঁটে। মুগ্ধ চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কত বড় হয়ে গেছো তুমি! টিভিতে কিংবা সোসাল মিডিয়ার প্রকাশিত ছবিতেও তো ছোট লাগতো! এখন বড় লাগছে। তোমার নানু বলে তোমার চোখদুটো নাকি আমার মতো।”

অরুণাভ আলগোছে হাত ছাড়িয়ে দূরত্ব মেপে হাঁটে। বর্ষা হেসে বলল, “আমি জানি তুমি আমার উপর রাগ অভিমান পুষে রাখলেও ঘৃণা করো না। তোমার মনে এখনও আমার জন্য সফট কর্ণার আছে। আর থাকবেও না কেন? নারির টান আছে না? মা তো মা-ই হয়। যতই ভালোবাসা দেখাক মা তো আর হওয়া সম্ভব না। মুখে মেকি হাসি ফুটিয়ে হয়তো মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে কিন্তু মনে মনে ঠিকই বিরক্ত হয়। তাঁর পেট থেকে আসা ছেলেমেয়ের প্রতি দরদ দেখো আর তোমার প্রতি তার দরদ দেখো। আকাশ পাতাল ফারাক খুঁজে পাবে।”

অথচ সে এমনটা কখনো খুঁজে পায় নি। ভাবনা, ওলাফ থেকে তাঁকে এক চুল পরিমাণ কম স্নেহ দেওয়া হয় নি। আবার সহানুভূতি দেখিয়ে বেশি স্নেহ করাও হয় নি। তবে তাঁকে নিয়ে আহ্লাদ করা হয়। সে অধিকারের সাথে জেদ করতো তাকে যেন বেশি বেশি আদর করা হয়। অতঃপর আম্মু হাসিমুখে তাকে আদর করে বুকে জড়িয়ে নিতো। অরুণাভ তার জন্মদাত্রীর কথায় তিল পরিমাণ গুরুত্ব দিলো না। 

বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে এক বৃদ্ধা। বয়সের ছাপ তাঁর চোখে মুখে স্পষ্ট। অরুণাভকে দেখেই দন্তবিহীন চোয়ালে হাসলো। গুনগুনিয়ে গাইলো,

   ‘আইলা রে নয়া দামান, আসমানেরো তেরা
 বিছানা বিছাইয়া দিলাম, শাইল ধানের নেড়া।
              দামান বউ দামান বউ
            ও দামান বউ দামান বউ’

অরুণাভের কান ভারী হয়ে আসে। বুড়ির না মরণের ডাক এসেছে? এই তাঁর নমুনা! সে গলা পরিষ্কার করে এগিয়ে আসে। বর্ষা পরিচয় করিয়ে দেয়,

“তোমার নানু। আর পত্রলেখার মা, তোমার খালামুনি।”

অরুণাভ কি বলবে বুঝতে পারলো না। ছোট করে সালাম দিলো শুধু। পপি শুধালো, “তোর আগের পক্ষের সেই ছেলেটা?”

অরুণাভের মুখটা বিষন্ন হয়ে আসে। তাঁর পরিচয় আগের পক্ষের ছেলেটা! বর্ষা আবারও অরুণাভের বাহু জড়িয়ে ধরে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল, “হ্যাঁ আমার বড় ছেলে।”

জন্মদাত্রীর একথাটিও অরুণাভের মন ভালো করতে পারলো না। পপি বলল, “অরুণ ভাইয়ার মতোই গোমড়া মুখো। সে যাইহোক আমাকে যেতে হবে রে আপু। শপিংয়ের বাহানায় এসেছিলাম। দেরি হলে আবার কথা শুনতে হবে। আমার যে পত্র কে নিয়ে কি জ্বালা হয়েছে রে!”

বর্ষা চিন্তিত মুখে বলে, “আবার কি হলো? পত্র যাবে না?”

“যাবে। লাগেজও গুছিয়েছে। কিন্তু আমিই বললাম যাওয়ার দরকার নেই। আমার শ্বাশুড়ি ক্যাট ক্যাট করবে। ননদ গুলো তো ঝামেলা বাঁধানোর জন্য এক পায়ে খাঁড়া। পত্রকে নিয়ে গেলেই শুরু করে দিবে। ওনার ভাইয়ের ঘারে আমি বোঝা চাপাতে এনেছি।”

“কারিম কি বলে?”

“সে কিছুই বলে না। অথচ বিয়ের আগে কথা হয়েছিল পত্র আমার সাথেই থাকবে। ওনার ছেলেকে আমি আপন করে নিয়েছি অথচ আমার মেয়েকে ওনারা মেনে নিলো না আপু। পত্রর কথা ভাবলে মাঝে মাঝে আমারই ফাপড় আঁটকে আসে। ওর ভবিষ্যত কি আপু? ভেবেছিলাম বিয়ে দিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলবো। মাশাআল্লাহ নূরানী চেহারা সুরত দিয়েছে আল্লাহ পাক। কিন্তু বাক প্রতিবন্ধী। এখানেই বিয়ের কথাবার্তা শেষ। পড়াশোনাটাও করলো না। সারাজীবন ওকে কে পালবে? ভাবীর কথা শুনলেই তো পাঁচ আত্না সাধ। শুধু মায়ের জন্য পত্র এ বাড়িতে টিকে আছে। মায়ের কিছু হলে ওর কি হবে আপু?”

“পত্রর দাদুর বাড়িতে রেখে আসলেই পারতিস। হুদাই ঝামেলা টেনে এনেছিস!”

“ওনারা রাখলো না যে আপু। আর পত্রর বাপকে হারিয়ে আমিও তখন একা। ভেবেছিলাম মেয়েকে নিয়েই কাটিয়ে দিবো বাকিটা জীবন। কিন্ত…”

“থাক বাদ দে। একটা না একটা ব্যবস্থা হয়েই যাবে। না হলে আমার সাথে নিয়ে যাবো।”

“সত্যিই আপু? এটাই ভালো হবে। তুই নিয়ে যা ওকে। আমি শান্তিতে থাকতে পারবো একটু।”

বর্ষা নেহায়েত কথার কথা বলেছিল। কিন্তু পপি! বলেও দেখছি ফেসে গেলো। পত্রলেখাকে নিয়ে গিয়ে সে কি করবে? শোয়াইব অবশ্য কিছু বলবে না। কিন্তু তারই বাড়তি বোঝা মনে হবে। সে আমতা আমতা করে বলল, “শোয়াইবের সাথে কথা বলা দরকার। ওর ফ্যামিলিও তো আছে। তুই আগেই আশা ধরে বসে থাকিস না, কেমন?”

পপি বুঝতে পারে বোনের মনোভাব। ম্লান হেসে বলল, “রবিনটা মনে হয় পত্রকে পছন্দ করে। কিন্তু ভাইয়া ভাবী কখনোই মানবে না। উল্টো টের পেলে পত্রকে ঘার ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবে।”

“তোর না দেরি হচ্ছে? যাবি না?”

বর্ষা বোনের নিত্যদিনের কথায় বিরক্ত বোধ করে বলল। এই পপি বাঁচাল প্রকৃতির। একবার শুরু হলে শেষ করার নাম নেয় না। পপি ফোনের স্ক্রিনে সময় দেখে আপনমনে বিড়বিড় করতে করতে বিদায় নেয়। অরুণাভ চুপচাপ সবই শুনছিল। ‘পত্রলেখা’ সমাচার পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও আংশিক বুঝতে সক্ষম। খারাপ লাগে বেচারি পত্রলেখার জন্য!

“ওই দামান, বুড়িডার দিকে তাকাও একবার? নয়ন জুড়াই দেখি এট্টু?”

হঠাৎ বুড়ির চিনচিনে গলায় অরুণাভ তার দিকে ফিরলো। বর্ষা ভোরের বাহু ধরে শিয়রে বসিয়ে বলল, “কাছে বসো। মা’র ভালো লাগবে।”

অরুণাভ ইতস্তত বোধ করে। বৃদ্ধা তাঁর হাত ধরে বলে, “তোরে দেইখ্যা তো আমার আয়ু আরো দশ বছর বাড়লো রে দামান। কি দেখনাওয়ালা হইছোস মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ।”

অরুণাভ ছোট ছোট চোখে চায়। ফোনে বুড়ির কান্নাকাটিতে ভেবেছিল সত্যিই মর মর অবস্থা। কিন্তু এখন বুঝতে পারলো সব ফাঁদ। আসাই উচিত হয় নি।

“কি লো দামান? কি দেখোস?”

বৃদ্ধার কথায় মাথা নাড়ে অরুণাভ, “কিছু না।”

“বর্ষা বাইরে যা তো। নানু ভাইয়ের সাথে আমার কিছু কথা আছে। ভুলেও এটা জিজ্ঞাসা করিস না কি কথা। শুধু দূর হ এখান থেকে। আর হ্যাঁ পত্রকে পাঠিয়ে দিস। আমার ওষুধ খাওয়ার সময় হইছে মুখপুড়িরে জানাইস।”

বৃদ্ধা হঠাৎ গম্ভীর মুখে বর্ষাকে উদ্দেশ্য করে বলল। বর্ষা দ্বিরুক্ত না করে বেরিয়ে গেল। চৌধুরী বাড়ির একচ্ছত্র মালকিন করিমুন্নেসা চৌধুরী। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়লেও দাপট কমে নি। এখনো তাঁর এক কথায় সবাই পায়ে পড়তে বাধ্য।

একা ঘরে অস্বস্তি বোধ করে অরুণাভ। সাথে বিরক্তও হয় বটে। বৃদ্ধার চাহনি কেমন যেন। 

“সৎ মায়ে ভালোটালো বাসে?”

সৎ মা শব্দটি বড্ড অপছন্দের অরুণাভের। মাথায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এখনও ব্যতিক্রম নয়। তবুও তর্কে না জড়িয়ে নিজ রাগ সংবরণ করে বলল, “খুব বাসে।”

“সে জানা আছে। চুলে এমনি এমনি পাক ধরে নাই। তা সৎ মায়ের ঘরে ছাওয়াল কয়ডা?”

অরুণাভ বিরক্ত হলেও বলল, “দুজন।”

“মুখ বিষনার মতো বানিয়ে কথা বলছিস কেন রে?”

“আমার মুখ আমি যেমন খুশি বানাবো।”

বৃদ্ধা নাক মুখ কুঁচকে নেয়, “তোর বাপেও এমন ছিলো। আমি বর্ষারে পইপই করে বলেছিলাম এই ছেলের সাথে তোর বনবে না বিয়ে করিস না। গাধার বাচ্চা শুনলো না। শেষমেষ আমার কথাই ফললো, সংসার টিকলো না।”

বুড়ি থেমে নেই। এটা ওটা বলেই যাচ্ছে। অরুণাভের বিরক্তের পারদ আসমান ছুঁই ছুঁই। এখান থেকে নিস্তার পেলেই স্বস্তির শ্বাস ফেলবে। এরই মাঝে দরজা খটখটানোর আওয়াজ ভেসে আসে। বুড়ি হাঁক দিতেই অষ্টাদশী পত্রলেখা খাবারের ট্রে হাতে প্রবেশ করে। করিমুন্নেসার জন্য স্যুপ আর মাল্টার রস। 

“মুখপুড়ির মন কই উড়ু উড়ু করে? আমার ওষুধের সময় পার হয়েছে আক্কেল নাই?”

পত্রলেখা টেবিলে উপর শব্দ করে ট্রে রেখে। নিজ বিরক্তির জানান দেয়। স্যুপের বাটি হাতে নিয়ে করিমুন্নেসার মুখের সামনে ধরে। বৃদ্ধা স্যুপের বাটি হাতে নিয়ে বলল, “চামচ কি তোর ম*রা বাপে আইসা দিয়া যাইবো?”

পত্রলেখা চামচ দিচ্ছিলই। বৃদ্ধার কথায় ক্ষণিকের জন্য হাত থমকায়। শুষ্ক চোখে হুট করেই জল চিকচিক করে ওঠে। ক্ষণিকের মেহমানের দিকে চোখ পড়তেই অরুণাভ পত্রলেখার চোখাচোখি হয়। লজ্জিত বদনে পত্রলেখা নজর সরিয়ে নেয়। বৃদ্ধাকে চামচ দিয়ে টেবিলের উপর কিছু খুঁজে চলে। পেয়েও যায়।‌ কাঁপা কাঁপা হাতে কলম চালিয়ে কিছু লিখে বৃদ্ধার মুখ বরাবর ছুঁড়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে যায়। করিমুন্নেসা চেঁচায় পত্রলেখার উপর। অরুণাভ কি মনে করে কাগজটা হাতে তুলে নেয়।

‘বুড়ি তুই মর।’ ~ পত্র

পত্র লেখার তিন শব্দে লেখা পত্রে অরুণাভের হাসি পেলো।

“হাসো কেন দামান? কি লিখছে বোবাডায়?”

অরুণাভ বৃদ্ধার দিকে তাকায়। পত্রখানি বুক পকেটে রেখে মুচকি হেসে বলল, “আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করেছে।”

“মুখপুড়ি এই কামনা করবো না। ও আমার মরণ কামনা করছে আমি জানি। অথচ ও বুঝে না আমি মরলে ওঁর বাঁচা কতটা যন্ত্রণার হইবো। ওরে নিয়া অশান্তির শেষ নাই নানুভাই। মাঝেমধ্যে গলা টিপা মাইরা ফালাইতে মন চায়। কয়েকবার ধরছিলামও। কিন্তু কৈ মাছের পরাণ তাই মরে নাই।”

অরুণাভের গা শিরশির করে উঠলো। কি ভয়ানক কথাবার্তা! করিমুন্নেসা হেসে বলল, “আমারে আবার খারাপ ভাইবো না। ওর উপর মায়া লাগে আবার গোস্বাও আসে। ওর কথা বাদ দাও। তোমার কথা কও! তোমারে আমার ভালো লাগছে। সেদিন বিষ্টি দাদুভাই তোমার ছবি দেখাইলো। আমি তো প্রথম দেখায় প্রেমে পইড়া গেছি। তাই বর্ষারে হুমকি ধামকি দিয়া তোরে আনছি।”

খ্যাক খ্যাক করে হাসে করিমুন্নেসা। সেই হাসি বড়ই ভয়ানক। অরুণাভ তৎক্ষণাৎ বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। মনটা আরও বিষিয়ে উঠলো। বেচেইন মন হয়তো ভেবেছিল জন্মদাত্রীর সত্যিই তাঁর কথা মনে পড়ে। তাই ফোন করে দেখা করার খায়েস জাগায়। সে পকেট থেকে ফোন বের করে সময় দেখে বলল,

“সন্ধ্যা হয়ে এসেছে আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে।”

“আরেকটু বসো না দাদুভাই! বড় জামাই গাড়িতে করে রেখে আসবে নে।”

বৃদ্ধা অনুরোধ করে। অরুণাভ তাঁর অনুরোধে গলে না। কাঠ কাঠ সুরে বলল, “আমি গাড়ি এনেছি। আর আপনি আমাকে মিথ্যে বলে এনেছেন। বলেছিলেন আপনার শরীর খুব খারাপ। যেকোনো সময় যা কিছু হয়ে যেতে পারে। আপনার শেষ ইচ্ছে আমাকে একনজর দেখবেন। দেখেছেন? কাইন্ডলি আমাকে আর বিরক্ত করবেন না। আসছি ভালো থাকবেন।”

অত্যন্ত নিরস গলায় করিমুন্নেসা নারাজ হলেন। অরুণাভ তাঁর নারাজের ধার ধারলো না। তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে যায়। বর্ষা ডিনারের জন্য না হলেও শতবার অনুনয় করে অরুণাভ কানে তোলে না। পকেটে প্রিয় ভাই ওলাফের জন্য কেনা কিছু লজেন্স ছিল। একটা রেখে বাদবাকি বৃষ্টিকে দিলো। বৃষ্টি খুশিতে আত্মহারা হয়ে অরুণাভকে জড়িয়ে ধরে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে। অরুণাভ অস্বস্তিতে জমে যায়। ভাবনার কথা মনে পড়তেই সরিয়ে দেয় বৃষ্টিকে। ওলাফের সাথে তার খুব বেশি সখ্যতার জন্য ভাবনা অভিমান পুষে তাঁর থেকে দূরে দূরে থাকে। ভাবনা ‘ভাইটুস’ ডাকতো তাঁকে। ওলাফ যখন ‘ভাইটুস’ ডাকা শিখলো সে ‘ব্রো’ তে কনভার্ট করে নিলো সম্বোধন। আম্মু ঠিকই বলে। তাদের সরকার বংশের রগে রগে জেলাসি। 

অরুণাভ বাকি একটা লজেন্স নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পত্রলেখার সামনে হাজির হয়। মেয়েটা কুটুর মুটুর চোখে ঘুরঘুর করে শুধু। চোখে চোখ পড়তেই চোরের মতো নজর লুকিয়ে ফেলে। ওই চোখ দুটো তাঁর বড্ড চেনাজানা লাগে। কিন্তু স্মৃতি হাতড়ে কিছুই পায় না। পত্রলেখার চোখে মুখে এক অদ্ভুত মায়া ভরা। সে মায়ায় একরাশ বিষন্নতা ছাড়া কিছুই খুঁজে পাওয়া গেলো না। অরুণাভ হাতের লজেন্স বাড়িয়ে বলল,

“আ’ম সো মাচ স্যরি পত্রলেখা। আমার জন্য তোমাকে কতটা যন্ত্রণা সহ্য করতে হলো। তুমি করে বললাম বলে রাগ করলে?”

পত্রলেখার ভাসা ভাসা চোখের চাহনি অপরিবর্তিত। সে মাথা নেড়ে না বোঝালো। অরুণাভ মুচকি হেসে বলল, “লজেন্স নিবে না, পত্রলেখা?”

পত্রলেখা লজেন্স হাতে নেয়। চোখের মণিতে এখনো অরুণাভ সরকার জ্বল জ্বল করছে। চোখের পলক ঝাপটাতেও তাঁর অনিহা। অরুণাভ নাকের ব্যান্ডেজে আঙুলের ডগা ছুঁইয়ে দিয়ে বলল, “নাকটা জলদি ভালো হয়ে যাক।”

পত্রলেখা অবশেষে পলক ঝাপটায়। একবার, দু’বার, বারবার। বলার ক্ষমতা তো তাঁর নেই তাই কথাগুলো অব্যক্তই রয়ে গেল। অরুণাভ টুটুলকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে চৌধুরী ভিলা থেকে। 

টুটুলের মুখ থেমে নেই। তার মুখনিঃসৃত বাক্যের অধিকাংশই পত্রলেখাকে ঘিরে। পত্রলেখা এমন, পত্রলেখা তেমন, পত্রলেখা আসলে কেমন? অন্যসময় হলে অরুণাভ রেগে যেতো। কিন্তু সে রাগছে না। তাঁর মন তো টুটুলের বন্ধুত্ব শেষ করার কথাতেই পড়ে আছে। ও নিশ্চয়ই মজার ছলেই বলেছে কিন্তু তাঁর মনটা ছটফট করছে। সে মানতে পারছে না টুটুল এমনটা কেন বলেছে।

“কি রে মুড অফ করে রেখেছিস কেন?”

অরুণাভের তরফ থেকে জবাব আসে না। টুটুল বাহু ধরে মৃদু ধাক্কা দিলো।

অরুণাভের মাঝে ভাবান্তর দেখা গেলো না। টুটুল এবার জোরেই ধাক্কা দিলো তবুও বান্দা নিরেট বসে ড্রাইভ করছে। টুটুল সন্দিহান চিত্তে বলল,

“কই হারালি? বর্ষা আন্টির জন্য মন খারাপ? আরেকটু থাকলেই পারতি। অনন্ত ডিনার করতি। আন্টি কত করে সাধলো। তুই নিষেধ করায় মুখটা কালো করে রেখেছিল। আর আমি তো ডিনার করার জন্য মুখিয়ে ছিলাম। এই বাহানায় পত্রলেখার সাথে আরেকটু সময় কাটাতে পারতাম। ওর নাম্বার বা ফেসবুক আইডি জোগাড় করা যেতো। তোর জন্য সব ভেস্তে গেলো। শালা মনে রাখিস আমার কপালে পত্রলেখা না থাকলে আনিকাও তোর হবে না। এই ছোট মুখে বড় কথা বলে দিলাম।”

অরুণাভ আচানাক ব্রেক কষলো। বিমর্ষ মুখে বলল, “তুই একটুও ভেবেচিন্তে কথা বলিস না টুটুল। মনে এলো আর বলে দিলাম। নাম আমার গাড়ি থেকে?”

“বড়লোক বাপের বড়লোকি গাড়ি বলে ভাব নাও তাই না? থাক তুই তোর গাড়িতে।” 

বলে টুটুল গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। ধরাম করে দরজা লাগিয়ে শক্ত কিছু বলার প্রস্তুতি নেয়। অরুণাভ শোনে না। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে হারিয়ে যায় ব্যস্ত রাস্তায়। টুটুল আহম্মকে মতো দাঁড়িয়ে থাকে। রাগও হয় তবে যখন খেয়ালে আসে এটা তাঁর বাড়ির গলির রাস্তা তখন রাগ কিছুটা পাতলা হয়।

অরুণাভ স্পোর্টস ব্যাগ কাঁধে ফেলে দুই হাত সমানতালে ঘঁষে। গাড়িতে শীত না লাগলেও বাইরে বের হতেই শীতেরা জাপটে নিয়েছে। পেটের বাঘকে শান্ত করেই সোজা কম্বলের ভেতর লুকিয়ে পড়বে। তাঁর আগে আব্বুর কাছ থেকে ওলাফকেও চুরি করতে হবে। দরজা খুলতেই মিনু খালার দর্শন মিলে। অরুণাভ হাসলো, কিন্তু মিনু খালা হাসলেন না। যাওয়ার জায়গা করে দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। মুখখানা গম্ভীর। অরুণাভের হাসি হাসি মুখটা ছোট হয়ে আসে। এবার বাড়ি ফেরার পর মিনু খালা কেমন অদ্ভুত বিহেভ করছে। 

“মিনু খালা তুমি কি আমার উপর রাগ করেছো? আমি কি কোনো ভুল করেছি? আসার পর থেকেই খেয়াল করছি তুমি আমার সামনে আসছো না, কথা বলছো না।”

শু খুলতে খুলতে বলল অরুণাভ। মিনু শু তাকে সাজিয়ে রেখে ছোট্ট করে বলল, “তেমন কিছু না।”

“তাহলে কেমন কিছু? তুমি আমাকে ইগনোর কেন করছো মিনু খালা? আমি কি কিছু করেছি বলো?”

“চুলায় চা বসাইয়েছি উতলে যাইবে।”

মিনু খালা চলে যায় গম্ভীর মুখে। অরুণাভ ব্যথিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সবাই তাঁর থেকে দূরে কেন চলে যায়? নাকি সে-ই আঁটকে রাখতে জানে না। এতক্ষণ ক্ষুধায় পেট জ্বললেও এখন ক্ষুধা মরে গেছে। বিমর্ষ মুখে ঘরের দিকে পা বাড়ায় সে। 

“ওই ফোর টোয়েন্টি?”

অরুণাভ খুক খুক করে কাঁশলো। জিভে কামড় বসিয়ে ডাইনিং এরিয়ায় উঁকি দিলো। সরকার সাহেব তাঁর ক্লাস নেওয়ার জন্য বসে আছেন যে।

“পাঁচ মিনিটে ফ্রেশ হয়ে দশ মিনিটে আসছি।”

“এক্ষুনি আসার আর্জি জানাচ্ছি!”

“আশ্চর্য বাইরে থেকে আসলাম ফ্রেশ হবো না?”

“ওয়াশ রুম নিচেও আছে!”

অরুণাভ আত্মসমর্পণ করে। স্পোর্টস ব্যাগ রেখে ওয়াশ রুম হয়ে আসে। শীতে কন কন করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “কি বলবে বলো?”

অরুণ সরকার চেয়ার টেনে বসতে ইশারা করে। অরুণাভ বাধ্য ছেলের মতো বসলো। অরুণ ছেলের কাঁধে শাল ফেলে হটপট খুলে প্লেটে রুটি দেয়। অরুণাভ ঘাবড়ায় বৈ কি! এই নীরবতা কি ঝড়ের পূর্বাভাস? সে শালটা গায়ে ভালমতোন জড়িয়ে নিয়ে বলল, 

“আব্বু ওই ব্যাটমিন্টন খেলছিলাম। এতো রাত হয়েছে খেয়ালই হয় নি।‌ টুটুলও সাথে ছিলো। বিশ্বাস না হলে ফোন করতে পারো।”

“খাও তারপর কথা হবে!”

অরুণাভ রুটি ছিঁড়ে মুখে দিচ্ছিল। বাবার কথায় মুখে নেওয়া হয় না। মিথ্যে যে ফাঁস হয়ে গেছে বুঝতে বাকি নেই। সে ফ্যাকাশে মুখে বলল, “আগে কথা হোক তারপর খাবো।”

“খেতে বললাম না?”

ধমকায় অরুণ। অরুণাভ খায় না, থমথমে মুখে বলে, “আমার পেছনে স্পাই লাগিয়েছো তাই না? আমার সন্দেহই ঠিক তাহলে!”

“স্পাই লাগাই নি। আপনার সেফটির জন্য লিটনকে বলেছি চোখে চোখে রাখতে। হিরোগিরি দেখিয়েছেন, এখন ভিলেন পেছনে পড়ে আছে। আপনার ভয়ডর না থাকতে পারে, আমার আছে।”

অরুণাভ কিছুটা শান্ত হলেও রাগ পুরোপুরি কমে নি। সে কি ছোট বাচ্চা যে তাঁকে চোখে চোখে রাখতে হবে? সে নিজের খেয়াল নিজে রাখতে জানে, এই কথাটা আব্বুকে বোঝানোর সাধ্যি কার! সে রুটি দাঁতের তলায় ফেলে চিবোতে লাগলো।

“ওখানে যাওয়া খুব প্রয়োজন ছিলো? তোমার আম্মু জানলে কেমন রিয়্যাক্ট করবে?”

“জানবে না।”

“আমি যদি জানাই?”

“তুমি জানাবে না।”

“আমি জানাবো। জানুক তাঁর আদরের ছেলের, আম্মুর ভালোবাসা স্নেহের ছায়ায় পোষায় না।”

“আব্বু!”

অরুণাভ কাতর স্বরে ডাকল। অরুণ সরকার ছেলের মাথায় হাত রাখলো। বাবড়ি চুলের গোছা টেনে ধরে বলল, “কাজটা ঠিক করো নি কলিজা। তোমার আম্মু জানলে কষ্ট পাবে।”

“আ’ল ম্যানেজ। আম্মু কোথায়?”

“অরুণিতার ঘরে। খাও রুটি ঠান্ডা হচ্ছে।”

অরুণাভ বাবার দিকে ফিরে বলল, “আব্বু তুমিও বসো না?”

অরুণ সরকার বসে না। ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। হাতখানি স্নেহের সাথে ছেলের ঘার পিঠ টিপে দেয়। অরুণাভের আরাম লাগে। হেসে বলে,

“আব্বু, হাতটাও টিপে দাও না।”

অরুণ গম্ভীর সুরে বলল, “একদম হাসবে না। একদন্ডি স্বস্তি দাও না তুমি আমায়। তোমার চিন্তায় আমি কবে হার্ট অ্যাটাক করে বসি। মরেও তো আমি শান্তিতে থাকতে পারবোনা।”

মরার কথায় হাস্যোজ্জ্বল মুখে আঁধার ঘনিয়ে আসে। রাগ দেখিয়ে বলে, “আব্বু এসব উল্টোপাল্টা কথা বলবে না। আমি কিন্তু একেবারে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো। আর কখনোই ফিরবো না।”

অরুণ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল, “আচ্ছা বলবো না। খাও?”

“তুমি খেয়েছো?”

“খেতে ইচ্ছে করছে না, বললে কি সেদিনের মতো জোর করে খাইয়ে দিবে?”

অরুণাভ বাবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। ডানে বামে মাথা নেড়ে রুটি ছিঁড়ে বাবার মুখে দেয়। অরুণ ছেলের কান টেনে বলল, “বদ ছিলে, বদ আছো আর বদ-ই থাকবে! আর আমাকে জ্বালাবে।”

“তোমাকে ছাড়া আর কাকে জ্বালাবো বলো? বউটউ নেই তো আমার। থাকলে তাঁকেই জ্বালাতাম।”

শেষে মিনমিনে সুরেই বললো। অরুণ শুনতে পেলেও প্রতিক্রিয়া দেখালো না। ছেলের লাজ ভাঙলে বউয়ের জন্য আরও নির্লজ্জ হয়ে উঠবে। তাই সে এই বউ, বিয়ে এসব কথা উঠলেই বধীর হওয়ার অভিনয় করে যাবে। 

কাঙ্ক্ষিত জবাব না পেয়ে অরুণাভ নিরাশ হয়। তবে সেও হাল ছেড়ে দেওয়ার নয়। গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বলে, “তোমার ভাতিজি কই?”

অরুণ সরকার স্বাভাবিক ভাবেই বলল, “ওসব জেনে তোমার কাজ নেই। জলদি খাওয়া শেষ করে ঘুমুতে যাও। রাত কম হয় নি।”

অরুণাভ কিছু বলতে চায়। প্রহরের আগমনে বলা হলো না। অরুণ প্রহরকে কোলে তুলে নেয়। প্রহর বাবার গলা জড়িয়ে বলল, “পাপা, আপুনির জ্বর কমছে না কেন? মাথায় জলপট্টি দিয়ে দিয়ে এখন আমার হাত টায়ার্ড হয়ে গেছে দেখো? কিন্তু জ্বর তো যাচ্ছেই না।”

অরুণ ছেলের হাতে ঠোঁট চেপে ধরে বলল, “কমে যাবে। চিন্তা না করে আপনি ছোট সরকার এখন বাবার কোলে ঘুম দিন কেমন?”

প্রহর গোমড়া মুখে সায় জানিয়ে বাবার কাঁধে মুখ গুঁজে দিলো। ঘুমে তাঁর চোখ যুগল ছোট ছোট হয়ে এসেছে। অরুণাভ রুটি রোল বানিয়ে বোনের ঘরের দিকে পা বাড়িয়ে বলল, “আশ্চর্য! ভাবনার জ্বর আমাকে আগে কেন বলা হয় নি আব্বু?”

“আপনি তো সেলিব্রিটি মানুষ। ফোন করলে আপনাকে পাওয়া যায়?”

অরুণ ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে বড় ছেলের পিছু পিছু হাঁটে আর টিপ্পনী কাটে। অরুণাভ তাতে গুরুত্ব না দিয়ে বলল, “জ্বর কত উঠেছে? ডাক্তার আঙ্কেল এসেছিল কি?”

“হাইপার হওয়ার কিছুই নেই। নরমাল ফিভার। ডাক্তার এসেছিল ওষুধ দিয়ে গেছে। জলপট্টি দিতে বলেছে একটু পরেই জ্বর নামতে শুরু করবে।”

“এই ঠান্ডায় জলপট্টি? আব্বু ওর ঠান্ডা লেগে যাবে তো।”

বলতে বলতে অরুণাভ বোনের ঘরে প্রবেশ করে। অরুণ সরকারের গম্ভীর মুখে হাসিরা ফুটতে চায়। বোন অন্ত প্রাণ ভাইয়ের পাগলামো সহ্য করো এখন। বোনের ১০৩°ফারেনহাইট হলেও ফোর টোয়েন্টি ভাইয়ের মাথায় জ্বর উঠবে।

পাতা মেয়ের মাথা কোলে নিয়ে চুলের ভাঁজে ভাঁজে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। অরুণিতা জ্বরের ঘোরে উল্টোপাল্টা বকতে শুরু করেছে। কোথাকার কোন কালো ভাল্লুক তাড়া করেছেন। ভয়ে জড়সড় হয়ে পাপাকে ডাকছে। 

“পাপা, ওই দেখো কালো ভাল্লুক টা আসছে। আমাকে নিয়ে যাবে। আমি কোথাও যাবো না।”

পাতা মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে আদর করে ডাকে, “আম্মু, চোখ খোল। দেখ কেউ নেই। কেউ নিয়ে যাবে না।”

“মাম্মাম কালো ভাল্লুক আমাকে মেরেছে!”

বিড়বিড় করে অরুণিতা। পাতা দোয়া পড়ে মেয়ের গায়ে ফুঁ দেয়। কি যে হলো? না জানি কোন শকুনী চোখের নজর লেগেছে তাঁর মেয়েটার উপর। দরজা খোলার শব্দে পাতা সেদিকে তাকায়। অরুণাভকে দেখে বলল,

“ভোর সোনা কখন থেকে ফোন করছি। ফোন কেন ধরছো না তুমি? অরুটা জ্বরে ভুলভাল বকছে। ভয়ে কাঁদছে। তোমাকে, ভোরের বাবাকে ডাকছে অনবরত।”

অরুণাভ বিছানায় বসে অরুণিতার কপালে হাত রেখে তাপমাত্রা বোঝার চেষ্টা করে। কোমল স্বরে ডাকে, “ভাবনা? বোনু আমার? কি হয়েছে তোমার? দেখো তোমার ভাইটুস এসে গেছে।”

অরুণিতা চোখ খুলে না। ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দেয়। বিড়বিড় করে আবারও বলে কালো ভাল্লুক তাকে মেরেছে। অরুণাভ মায়ের দিকে তাকায়। পাতা ছেলের বলার ভরসায় না থেকে নিজেই আত্মসমর্পণ করে বলল, “কারো আদরের বোনকে আমি মারি নি।”

অরুণাভ মায়ের কোল থেকে বোনের মাথা সরিয়ে আনে। বাম গালে তিন আঙ্গুলের ছাপ স্পষ্ট। সামান্য ফুলেও গেছে। সে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “এসব কি আম্মু?”

পাতা চরম মাত্রায় হতাশ। কেউ তাঁর কথা বিশ্বাসই করছেনা। ভোরের বাবার সাথে এই নিয়ে একদফা কথাকাটাকাটি হয়েছে, আবার ভোর! 

“আমার তো দয়া মায়া নেই। জল্লাদ মা আমি তাই মেরেছি হ্যাপি?”

অরুণ সরকার বিছানার এক কিনারে ঘুমন্ত প্রহরকে শুইয়ে পাতার কথার জবাবে বলল, “মেরেছো কেন সেটা বলো! মেয়ে বড় হয়েছে সে কথা ভুলে যাও কেন, পাতাবাহার?”

“ওহ্ হো শয়তানের দেখছি নিজে দোয়া দরুদ পাঠ করছে!”

পাতা তেজস্বী স্বরে বলে ওঠে। অরুণ চোখ রাঙায়, “আমি শয়তান?”

“পড়লো কথা হাঁটের মাঝে যার কথা তার গায়ে বাঁধে!”

“পাতাবাহার!”

“আপনি শুধু শয়তান না। আপনি হলেন শয়তানের গুরুঠাকুর।”

অরুণ শান্ত চোখে সাবধান করে যায়। পাতা থোরাই ডরায়। সে প্রতিবাদী সুরে বলল, “ভোর সোনা বুঝি বড় হয় নি? সেদিন ভরা স্কুলে থাপ্পড় মেরেছিলেন সেকথা আমার কানেও এসেছে। কাউকে জ্ঞান দেওয়ার আগে একটু নিজের দিকটা বিবেচনা করেই জ্ঞান দিবেন।”

অরুণ সরকারের মুখে বুঝি কেউ ঝামা ঘষে দিলো। তবে সেও দমে যাবার নয়। রাশভারী সুরে বলল, “তোমার ভোর সোনা তো সাধুবাবা। আমার সোনা আমার মা। আর মায়েদের শুধু ভালোবাসা যায়। আমার মায়ের গায়ে হাত তুলে তুমি মোটেই ঠিক করো নি পাতাবাহার।”

দু’জনের আরেক দফা লেগে গেলো। কেউ কোনো অংশ কম যায় না। অরুণাভ শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল,

“আব্বু আম্মু অনেক হয়েছে। থামো তোমরা। না থামলে এখান থেকে বেরিয়ে আবারও ঝগড়া কন্টিনিও করো।”

ছেলের ঝাড়িতে থেমে যায় দুজন। পাতা কটমট চোখ অরুণের দিকে তাকায়। ‘আল্লাহ এদের কিভাবে বোঝাই যে আমি মারি নি। একবার থাপ্পড় দিয়ে আমার জন্মের শিক্ষা হয়ে গেছে। কিন্তু মারলো টা কে? এই কালো ভাল্লুক আবার কি জিনিস? জিনের আছর পড়ে নি তো আবার! ইয়া আল্লাহ!’ পাতা আপন মনে বিড়বিড় করে।

বাবা-মা ঝগড়ার ইতিতে অরুণাভ স্বস্তি ফিরে পেলো। বোনের হাতে তেল মালিশ করতে করতে বললো, “আব্বু, ভাবনার হাত পা ঠান্ডা বয়ফ হয়ে আছে। পায়ে একটু তেল মালিশ করে দাও তো!”

অরুণ হাতে তেল ঘঁষে মেয়ের পায়ের তালুতে মালিশ করে বলল, “হাইপার হওয়ার কিছুই নেই কলিজা। শান্ত হও।”

অরুণাভ শান্ত হয় না। মায়ের উপর রাগ করে বসলো। এভাবে কেউ মারে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp