ঢাকা তখন টগবগিয়ে ফুটছে রাজনৈতিক উত্তাপে। রাস্তায় রাস্তায় স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে মিছিলের ঢেউ, স্লোগানের গর্জন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে আগুনরাঙা হরফে লেখা ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। সকালে ঘর থেকে বের হলে নিশ্চিত করে বলা যেত না বিকেলে হরতাল ডাকা পড়বে কি না।
এমন এক অস্থির সময়ে ছায়া খুনিকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব এসে পড়ে ইন্সপেক্টর আরশাদ চৌধুরীর কাঁধে। রাজধানীর খুন-খারাবির মামলাগুলোতে তখন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চই একমাত্র ভরসা। আরশাদ চৌধুরী পঞ্চাশের কোঠায় পা রাখা একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। তার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল, অপরাধীর গায়ের গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারতেন সে কোথায় লুকিয়ে আছে। ডিবির জুনিয়র অফিসাররা কথাটা রসিকতা করেই বলত বটে, কিন্তু আরশাদ চৌধুরীর চোখ ধাঁধানো সাফল্যের হার দেখলে রসিকতাটাও সত্যি মনে হত।
তার সাথে জুটি বাঁধতে দেয়া হয় তরুণ করিৎকর্মা সাব-ইন্সপেক্টর তুষার দেওয়ানকে। টগবগে যুবক। ছায়া খুনির খুনগুলোর ফাইল তার মুখস্থ। কোন তারিখে, কোন সময়ে, কোন অস্ত্রে, কীভাবে খুন হয়েছে সব তার নখদর্পণে। তার সম্বল বলতে পকেটে রাখা একটা ছোট্ট কালো চামড়ার ডায়েরি, একটা মান্ধাতা আমলের জাপানি ক্যামেরা আর সোর্সদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক।
দুই বছর কেটে গেছে। দুই বছর খুনির কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। হঠাৎ করে সে ফিরে এসেছে। ইলিয়াস গাজী সংবাদ দিয়েছেন, এবার খুনির টার্গেট সিকান্দার হোসেন।
এই ইলিয়াস গাজী ধানমন্ডির এক জমকালো দোতলা বাড়িতে থাকেন। বাড়ির সামনের সবুজ ঘাসে ঢাকা লনে রঙিন পেখম মেলে ময়ূর ঘুরে বেড়ায় অবাধে। যখন তার একমাত্র ছেলে খুন হয় তখন হুঙ্কার দিয়ে সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত তুষারকে শাসিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার ছেলের খুনিকে না পেলে, তার রক্তের বদলা না নিতে পারলে তোমার চামড়া তুলে নেব, তোমার অস্তিত্ব মুছে দেব এই শহর থেকে।’
তুষার চোখে চোখ রেখে শান্ত সুরে বলেছিল, ‘গাজী সাহেব, চামড়া তোলার শখ থাকলে কসাইখানায় যান। আমি এই পোশাক পরেছি মানুষের সেবা করতে, আপনার মতো গডফাদারের হুমকি শুনে থরথর করে কাঁপতে নয়। আইনের হাত আপনার ক্ষমতার চেয়েও অনেক লম্বা। ধৈর্য ধরুন, সময় দিন। ছেলের বিচার চাইলে আইনের ওপর ভরসা রাখুন।’
কথাটা বলেছিল ঠিকই, কিন্তু খুনিকে ধরতে পারেনি আজও। দুই বছর কেটে গেছে। তবে তদন্ত থামায়নি সে, হাল ছাড়েনি এক মুহূর্তের জন্যও। যারা খুন হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের অতীত কলঙ্কময়। সবাই ছিল সমাজের পচন ধরা ক্ষত। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জোর করে, প্রলোভন দেখিয়ে মাদকে আসক্ত করত। কারও বিরুদ্ধে ছিল একাধিক ধর্ষণের অভিযোগ, যেগুলো প্রভাবের জোরে চাপা পড়ে গিয়েছিল। প্রত্যেকেই ছিল মানসিকভাবে বিকৃত, পাশবিক, নির্দয়। মানুষকে উত্যক্ত করে বেড়াত, কষ্ট দিত, মানুষের দুর্দশা দেখেই পেত অসুস্থ তৃপ্তি। খুন-খারাবি, গুম কিছুই বাকি রাখেনি এরা।
এদের প্রতিটি কর্মই যথেষ্ট ফাঁসির দণ্ড পাওয়ার জন্য। জীবিত থাকলে তুষার নিজেই একদিন এদের গ্রেফতার করত, আদালতে তুলে দিত।
কিন্তু কেউ একজন আইনের আগেই ন্যায়বিচার সেরে ফেলেছে!
এদের যে খুন করেছে, সে হয় কোনো পুরনো শত্রু যার হিসাব বাকি ছিল, নয়তো কোনো ভুক্তভোগী যার জীবন এরা ধ্বংস করেছে। প্রতিশোধের আগুন বুকে না জ্বললে, ঘৃণার বিষ রক্তে না মিশলে কেউ এভাবে পরিকল্পিতভাবে একের পর এক খুন করে না।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুনে খুনির পরিচয় পাওয়া গেছে। ইলিয়াস গাজীই নাকি প্রকাশ করেছেন। তুষার মেয়েটার ছবির দিকে বেশ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। মস্তিষ্কের ভেতর থেকে কেউ বলে, এই খুনগুলো কোনো ভুক্তভোগী করেছে, কোনো পেশাদার খুনি নয়। আরশিনু হয়তো ভুক্তভোগী, সে কোনো ক্ষতের প্রতিশোধ নিচ্ছে! পেশাদার খুনির চেহারা অন্যরকম হয়! তাছাড়া এ তো একটা মেয়ে, একজন নারী! মেয়েরা এতটা হিংস্র হয় না! নারী তো হয় স্বভাবসুলভ কোমল, নরম, মমতাময়ী। নাকি এই মেয়েটা আসলে খুনি নয়, খুনি অন্য কেউ? তাকে ফাঁসানো হচ্ছে?
তখন দুপুর। টেলিফোনটা কর্কশ শব্দে ডেকে ওঠে। ভেঙে দেয় তার চিন্তার জাল। তুষার দ্রুত রিসিভার তুলে নিয়ে বলে, ‘হ্যালো।’
‘এক্ষুনি আলোকপুরে যাও। খুনিকে দেখা গেছে।’
সে প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র নিতে বাড়ি এসেছিল। এরমধ্যেই মা জোর করে খাইয়ে দিয়েছেন। তুষার হাত ধুয়ে বের হতে গেলে মা হাতে একটা ছবি নিয়ে ঘরে ঢোকেন। বলেন, ‘বাবা, এই মেয়েটাকে দেখ। কলেজে পড়ে। দেখতেও মাশাআল্লাহ। তোর সাথে খুব মানাবে।’
তুষার জুতা পরতে পরতে বলে, ‘মা, আমি থানায় এমনিতেই অনেক আপদ সামলাই। ঘরে নতুন করে আরেকটা নারী-আপদ টেনে আনার কোনো শখ আমার নেই। একা আছি, শান্তিতে আছি।’
‘থাপ্পড় খাবি। নারী আপদ? ঘরটা তো অগোছালো করে যাস, সারাজীবন আমিই বান্দিগিরি করব? আমি আগলে রাখব? আমার এই ঘরে একজন লাগবে, তোকে আগলে রাখার জন্য হলেও লাগবে।’
‘ঘর গোছানোর জন্য কাজের লোক পাওয়া যায়। কিন্তু মাথায় অশান্তি ঢুকলে সেটা সরানোর কোনো ফোর্স নেই। বিয়ের পর বউয়ের আগলে রাখা মানেই হলো সারাদিন নজরদারি। আসামি জেলখানায় আর আমি নিজের ঘরে বন্দি থাকব! এমন ফালতু কেস আমি নিতে চাই না। আপাতত আমার জীবনে আসামিরাই থাকুক, অন্তত তাদের হ্যান্ডকাফ পরিয়ে কন্ট্রোল করা যায়। বউকে তো আর হ্যান্ডকাফ পরানো যাবে না!’
বলতে বলতে মা'কে কিছু বলতে না দিয়ে বেরিয়ে যায় তুষার।
আলোকপুর। ঢাকার উত্তর-পূর্ব প্রান্তের একটা প্রত্যন্ত এলাকা, যেখানে এখনও শহরের কোলাহল পুরোপুরি পৌঁছায়নি। আশেপাশে অনেক পাহাড়ি অঞ্চল আছে উঁচু-নিচু, অনেক ঘন জঙ্গল আছে। পলাতক অপরাধীরা নিজেদের আড়াল করতে এসব জায়গাই বেশি ব্যবহার করে।
জিপ ছুটে চলে প্রচণ্ড গতিতে আলোকপুরের দিকে। পুরো আলোকপুর তাকে চষে ফেলতে হবে। প্রতিটি গলি, প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি গাছের আড়াল তল্লাশি করতে হবে। ছায়া খুনি আরশিনুকে খুঁজে বের করতেই হবে, যে মূল্যেই হোক। জানতে হবে সে-ই কি করছে এই সব খুন, নাকি সে শুধুই একটা পুতুল? আর যদি সে-ই করে থাকে, তাহলে কেন? কোন ভয়ংকর অতীত তাকে এই পথে ঠেলে দিয়েছে?
দরজার চৌকাঠ স্পর্শ করার আগেই গুলনূরের পৃথিবী আচমকা দুলে ওঠে। চোখের সামনের দেয়ালগুলো যেন মরণ-ঘূর্ণিতে মেতেছে! টাল সামলাতে না পেরে দু-পা পিছিয়ে যায়। পিঠে কারও তপ্ত, প্রশস্ত বুকের উষ্ণ পরশ অনুভব হতেই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে জাওয়াদের পাথুরে মুখাবয়ব।
জাওয়াদ জানত, গুলনূরের টলমলে পা দুটো শরীরের ভার বইতে না পেরে যেকোনো মুহূর্তে নুইয়ে পড়বে। তাই ছায়ার মতো লেগে ছিল।
গুলনূর কনুই দিয়ে জাওয়াদের বুকে ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা করে। মাথার ভেতর তখন একগুঁয়েমির পারদ চড়ছে। সামনে দ্বিতীয় পদক্ষেপ ফেলতেই শরীরের অবশিষ্ট শক্তিটুকু কর্পূরের মতো মিলিয়ে যায়। হুড়মুড়িয়ে হাঁটু ভেঙে মেঝের দিকে পড়ে যেতে থাকে। জাওয়াদ ক্ষিপ্র গতিতে শক্ত হাতে তার দুই বাহু আঁকড়ে ধরে পতন রোধ করে। গম্ভীর স্বরে বলে, ‘জেদ কোরো না। এই শরীর নিয়ে তুমি এক পাও এগোতে পারবে না।’’
গুলনূর বুক ভরা হাহাকার নিয়ে বলে, ‘আমাকে যেতে হবে! আমাকে আটকে রেখো না।’
‘তোমার শরীরের অবস্থা ভালো নয়। প্লিজ, বোঝার চেষ্টা করো।’
গুলনূরের চোখের কোণে নোনা জল জমাট বাঁধে। আকুল হয়ে মিনতি করে, ‘আমাকে যেতে দাও।’
‘আমি কথা দিচ্ছি, একটু সুস্থ হলেই যেখানে যেতে চাও সেখানেই আমি তোমাকে পৌঁছে দেব।’
‘কথা রাখবে?’
‘রাখব।’
বলতে বলতে জাওয়াদ গুলনূরকে কোলে তুলে নেয়। অতি সন্তর্পণে কাঠের চারপায়া চৌকিটার ওপর শুইয়ে দেয়। মাথার নিচে বালিশটা ঠিক করে দিতে দিতে বলে, ‘এই অবস্থায় বাইরে পা রাখা মানেই মৃত্যুকে সেধে ডেকে আনা। পুরো পুলিশ প্রশাসন হন্যে হয়ে তোমাকে খুঁজছে। সাধারণ মানুষের চোখে তুমি একজন খুনি, অপরাধী। একবার হাতে পেলে ওরা তোমাকে ছিঁড়ে খাবে। কেন তুমি এই কাজ করেছ শোনার ধৈর্য বা মানসিকতা কারও নেই। দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাই সতর্ক থাকতে হবে।’
গুলনূর জাওয়াদের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, ‘তবে তুমি কেন আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছ না?’
এহেন প্রশ্নে জাওয়াদের চোখ দুটো অপমানে, অভিমানে কুঁচকে যায়। সে মুহূর্তকাল স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে গুলনূরের পাংশু মুখের দিকে। যে মানুষটাকে সে আগলে রাখতে চাইছে নিজের সর্বস্ব দিয়ে, সে কিনা পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার মতো কুৎসিত ভাবনা মনে ঠাঁই দিয়েছে!
জাওয়াদ গুলনূরের প্রশ্ন উপেক্ষা করে বলে, ‘সময় হয়েছে। ইনজেকশন দিতে হবে।’
‘ইনজেকশন?’
‘হু, ডাক্তার মাংসপেশিতে দিতে বলেছে।’
গুলনূর একটু নড়েচড়ে বসে বলে, ‘সিরিঞ্জ দাও, আমি নিজেই দিয়ে নেব।’
‘আগে কখনও দিয়েছ?’
‘না, কিন্তু চেষ্টা করলে পারব।’
‘কীভাবে? নিজের কাঁধে নিজে ইনজেকশন দেয় কী করে?’
গুলনূর জবাব খুঁজে না পেয়ে চুপ করে থাকে। মস্তিষ্ক দ্রুত হিসাব কষছে, মাংসপেশি মানে কাঁধের নিচে, ঊরু অথবা নিতম্ব। এর যেকোনো একটি স্থান জাওয়াদের সামনে উন্মুক্ত করতে হবে। ভাবতেই এক অসহনীয় লজ্জা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলে তাকে। অথচ আগে সে এমন ছিল না! পরিস্থিতির প্রয়োজনে অভিনয় করতে করতে আজ সেই মেকি লজ্জাই মনের গহীনে শিকড় গেড়ে বসে গেছে।
জাওয়াদ উঠে গিয়ে হারিকেনটা জ্বালায়। আধো-অন্ধকারে হলদেটে আলো ছড়িয়ে পড়ে। বাইরের পৃথিবী ততক্ষণে নিকষ কালো অন্ধকারে ডুবে গেছে; জানালার ওপাশ থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক ভেসে আসছে।
জাওয়াদ মিনিট দশেক সময় নিয়ে আনারস আর পেয়ারা কেটে প্লেট সাজিয়ে আনে। গুলনূরের শিয়রের কাছে প্লেটটা রেখে বলে, ‘খেয়ে নাও। সকাল থেকে পেটে দানাপানি পড়েনি। শরীরে শক্তি না থাকলে টিকতে পারবে না।’
গুলনূর অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অবাধ্য শিশুর মতো অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।
জাওয়াদ ভ্রু কুঁচকে বলে, ‘কী? খাবে না?’
‘না।’
‘এখান থেকে মুক্তি পেতে হলেও সুস্থ হওয়া জরুরি। না খেলে লড়বে কী করে?’’
গুলনূর তির্যক চোখে তাকায়। কিছু একটা ভেবে উঠে বসার চেষ্টা করলে জাওয়াদ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার পিঠে হাত দিয়ে সাহায্য করে।
এক টুকরো আনারস মুখে দিয়েই গুলনূর মুখ কুঁচকে ফেলে। বিরক্তি নিয়ে বলে, ‘অনেক টক!’
‘টকেই ভিটামিন-সি। অত বাহানা না করে খেয়ে ফেলো।’
খাওয়া শেষ হলে জাওয়াদ ড্রয়ার থেকে স্পিরিট আর তুলো বের করে। বোতলের ছিপি খুলতেই স্পিরিটের তীব্র, ঝাঁজালো গন্ধ মুহূর্তে ছোট্ট ঘরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। কমে আসে দুজনের মাঝখানের দূরত্ব। গুলনূর ঘাড় ঘুরিয়ে সশঙ্ক চোখে তাকায়। জাওয়াদ সিরিঞ্জে ওষুধ টেনে নেয়। নিডলটা উপরের দিকে তুলে কয়েকবার টোকা দেয়, যাতে বাতাসের বুদবুদগুলো বেরিয়ে যায়।
হারিকেনের আলোয় সিরিঞ্জের স্বচ্ছ তরল মিটমিট করে জ্বলছে।
জাওয়াদ ঘাড় ঘুরিয়ে গুলনূরের দিকে তাকায়। নিরাসক্ত স্বরে বলে, ‘ওদিকে ফিরো।’
গুলনূর হতচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কেন?’’
জাওয়াদ হঠাৎ বিরক্তিতে ফেটে পড়ে।
‘আদর করব তোমায়! হাতে ইনজেকশন দেখতে পাচ্ছ না? নাকি চোখে সমস্যা?’
তীক্ষ্ণ স্বরে গুলনূর মুহূর্তের জন্য চমকে ওঠে। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে জাওয়াদের দিকে। লোকটা কী অসহ্য বিরক্তিকর! মুহূর্তেই রেগে যায়!
জাওয়াদ হঠাৎ তেড়ে আসে। গুলনূরের কাঁধের কাপড়ের অংশটুকু শক্ত করে ধরে, সরাতে যায়…সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড অপরাধবোধ ধারালো ছুরির মতো বুকে বিঁধে যায়। ক্রোধের উত্তাপ মুহূর্তেই স্তিমিত হয়ে আসে। সে দ্রুত হাত গুটিয়ে নেয়।
কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতায় কেটে যায়। তারপর নরম কণ্ঠে বলে, ‘দেখো, সুস্থ হতে হলে এই ইনজেকশনটা নিতে হবে। আমাকে একজন চিকিৎসক ভাবো, তাহলে এত অস্বস্তি লাগবে না।’
গুলনূর কয়েক সেকেন্ড ভেবে ধীরে ধীরে পিঠ ফিরিয়ে বসে।
জাওয়াদ শ্রদ্ধার সঙ্গে গুলনূরের টপসের একটা পাশ ধরে আলতো করে টেনে কাঁধের নিচে নামিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। প্রলয়ঙ্কারী শিহরণ চারপাশ আচ্ছন্ন করে ফেলে। গুলনূর লজ্জায় কুঁকড়ে যায়।
জাওয়াদ থমকে দাঁড়ায়। তার চোখের সামনে গুলনূরের ধবধবে ফর্সা কাঁধ উন্মুক্ত হয়ে আছে। বুকের উপরিভাগের বেশ খানিকটা অংশ হারিকেনের স্বর্ণালী আলোয় ঝিকমিক করছে।
জাওয়াদ দৃষ্টি ফিরিয়ে স্পিরিট ভেজানো তুলো নিয়ে গুলনূরের উত্তপ্ত ত্বক স্পর্শ করতেই দুজন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো এক অপ্রত্যাশিত অনুভূতি টের পায়। কেউই সেটা প্রকাশ করে না।
জাওয়াদের হাত কাঁপে, নিশ্বাস আটকে আসে যখন তার দৃষ্টি স্থির হয় গুলনূরের গলার ঠিক নিচে, বুকের হাড় ছুঁয়ে নেমে যাওয়া ফাঁকা, কোমল জায়গাটায়।
সেখানে একটা অর্ধচন্দ্রের মতো জন্মদাগ! গোলাপি-বাদামি রঙের মিশেলে তৈরি! এতটাই কোমল যে মনে হচ্ছে ছুঁলেই বুঝি গলে যাবে! এমন জন্মদাগ সে কখনো দেখেনি!
বুকের গভীরে একটা নামহীন ঢেউ খেলে যায়। চোখ ফেরাতে চায়…পারে না। দৃষ্টি কয়েক মুহূর্তের জন্য আটকে থাকে গুলনূরের অরক্ষিত লাবণ্যে!
গুলনূর ঘাড় ঘুরিয়ে জাওয়াদকে তাকিয়ে থাকতে দেখে দ্রুত পায়ের কাছে পড়ে থাকা গামছাটা টেনে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে নেয়।
সঙ্গে সঙ্গে যেন জাওয়াদের গালে থাপ্পড় পড়ে। সে ঝটকা খেয়ে দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়। ভেতরে গ্লানিবোধ আর আকর্ষণের যুদ্ধ চলে কয়েক সেকেন্ড। মন নিজেকেই ধিক্কার দেয়, তিরস্কার করে: একটা অসুস্থ মানুষ, যে এই মুহূর্তে দুর্বল, যাকে সে নিজেই সকালে আঘাত করেছে, যার রক্ত তার হাতে লেগে আছে তার দিকে সে এভাবে তাকাচ্ছে! এই কি তার পুরুষত্ব! স্বচ্ছতা! নৈতিকতা!
দৃষ্টি নিচু করে, বিড়বিড় করে বলে, ‘সরি।’
সে নিজেকে জোর করে শুধু ইনজেকশন দেওয়ার নির্দিষ্ট জায়গাটিতে স্থির করে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্পিরিট ভেজা ঠান্ডা তুলো দিয়ে জায়গাটা আলতো করে মুছে বলে, ‘নিঃশ্বাস নাও।’
তারপর নিডলটা সাবধানে মাংসপেশিতে বিঁধিয়ে দেয়, ওষুধটা পুশ করে, তৎক্ষণাৎ নিডল বের করে, সঙ্গে সঙ্গে তুলোটা চেপে ধরে সেখানে। পরমুহূর্তেই গুলনূরের টপসটা টেনে উপরে তুলে দেয়।
গলা পরিষ্কার করে, কর্কশ স্বরে বলে, ‘পেয়ারার টুকরোগুলো খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আমি রান্না করে রাতে ডেকে দেব। তারপর ওষুধ খাবে।’
জাওয়াদ লজ্জায় গাঁট হয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়, গুলনূর পেছন থেকে বলে, ‘তুমিও একটু ঘুমিয়ে নাও।’
জাওয়াদ দরজার দিকে মুখ রেখেই বলে, ‘খেয়ে একেবারেই ঘুমাব।’
বলেই পালিয়ে যায়৷ সিভিল এভিয়েশনের সবচেয়ে কঠিনতম পরীক্ষাগুলোতে সে কখনো এভাবে ভয় পায়নি, বজ্রপাত থেকে বিমান বাঁচাতে গিয়ে এতটা ঘাবড়ায়নি! যতটা ঘাবড়েছে গুলনূরের খোলা কাঁধে ইঞ্জেকশন পুশ করতে!
মনে হচ্ছে কোনো পবিত্র সীমারেখা সে পার হয়ে এসেছে, যেখানে যাওয়ার অধিকার তার ছিল না।
পরদিন সকালে জাওয়াদ গুলনূরকে কোলে করে টয়লেটে নিয়ে যায়, তারপর আবার ফিরিয়ে আনে। একটা স্টিলের মগে কুসুম গরম পানি আর একটা প্লাস্টিকের গামলা নিয়ে গুলনূরের পাশে বসে। একটা নতুন টুথব্রাশে অল্প পরিমাণ বিনাকা টুথপেস্ট লাগিয়ে গুলনূরের চিবুকটা আলতো করে ধরে দাঁতগুলো মেজে দেয়।
কুলি করার সময় গুলনূরকে যাতে মাথা ঝুঁকিয়ে কষ্ট করতে না হয়, তাই গামলাটা তার চিবুকের ঠিক নিচে ধরে রাখে। এরপর একটা ছোট তোয়ালে হালকা গরম পানিতে ভিজিয়ে সারা মুখ মুছে দেয়।
রান্নাঘরে গিয়ে মাটির চুলায় কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালায়। বাজার থেকে আনা আতপ চাল ভালো করে ধুয়ে, ডাল মিশিয়ে নরম খিচুড়ি রাঁধে। গুলনূরকে খাইয়ে দেয়। খাওয়া শেষে ব্যান্ডেজ খুলে, ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে নতুন করে ড্রেসিং করে। একজন সেবক হয়ে ওঠে।
গুলনূর চোখ তুলে তাকায় না। তাকাতে পারে না। এসবের প্রতিদান সে দিতে পারবে না। জাওয়াদ তার সঙ্গে আবার জুড়ে যাচ্ছে। তার পক্ষে সম্ভব নয় সেই জুড়ে যাওয়াতে ইন্ধন দেওয়া, সেই সম্পর্কে সাড়া দেওয়া। আক্ষেপে, অসহায়ত্বে পরমুহূর্তেই মুখ লুকিয়ে শুয়ে পড়ে।
জাওয়াদ দ্বিধান্বিত কণ্ঠে ডাকে, ‘গুলনূর?’
গুলনূর দেয়ালের দিকে মুখ রেখেই বলে, ‘হু?’
জাওয়াদ সঙ্গে সঙ্গে কথা বলতে পারে না। সময় নেয়, ভাবে, মনে মনে শব্দগুলো সাজায়। তারপর ঠোঁট ভিজিয়ে বলে, ‘গতকাল রাতে…’
জাওয়াদ কথা শেষ করতে পারে না। গলায় আটকে যায় শব্দগুলো। তীব্র সংকোচবোধ হয়। ব্যাপারটা নিয়ে কৈফিয়ত দিতেও লজ্জা লাগছে। গুলনূর কি ভাবছে? সে কি ভাবছে যে, তার শরীরের কোনো এক গোপন ছন্দে, কোনো এক নিষিদ্ধ সৌন্দর্যে কামুকতা নিয়ে তাকিয়ে ছিল জাওয়াদ? কী লজ্জার কথা! জাওয়াদ কিছু না বলেই বেরিয়ে যায়।
গুলনূর অপলক চোখে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। সে জানে জাওয়াদ তার জন্মদাগটার জন্যই ওভাবে তাকিয়ে ছিল! তার জন্মদাগটাই অদ্ভুত সুন্দর! আকাশ থেকে খসে পড়া চাঁদের টুকরোর মতো।
সে বিশ্বাস করে, জাওয়াদের দৃষ্টিতে কামুকতা ছিল না। থাকলেও তার কিছু যায় আসে না। ভালোবাসা যেখানে থাকে, কামনাও সেখানে থাকে। এটাই স্বাভাবিক, এটাই প্রকৃতির নিয়ম। কেউ সেটা নিয়ন্ত্রণ করে রাখে, কেউ প্রকাশ করে ফেলে। কেউ জোর করে, কেউ অপেক্ষা করে।
রাতে হঠাৎ পেটের ভেতর থেকে খামচানোর যন্ত্রণা উঠে আসে। গুলনূর বুঝে ওঠার আগেই শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। মুখ দিয়ে উগরে বেরিয়ে আসে সব। চৌকির পাশে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে বমি। তীব্র দুর্গন্ধ নাকে এসে লাগতেই মাথাটা আরও বেশি ঝিমঝিম করে ওঠে, চোখের সামনে সবকিছু ঘোলাটে হয়ে আসে।
চারপাশে তাকায়। জাওয়াদ নেই। একদম একা সে। কাঁপা কাঁপা পায়ে চৌকি থেকে মেঝেতে নামে। উঠে দাঁড়াতে গেলেই চারপাশ ঘুরতে থাকে ঘূর্ণিপাকের মতো। এই নোংরা তাকেই পরিষ্কার করতে হবে। জাওয়াদের আসার আগেই সব মুছে ফেলতে হবে।
বমির দিকে তাকাতেই কষ্টের শেকল জড়িয়ে ধরে হৃদয়কে। চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে নরকতুল্য দিনগুলোর ছবি। যখন অসুস্থতায় ভেঙে পড়েছিল শরীর, যখন জ্বরের তাপে পুড়তে পুড়তে বমি করে ফেলেছিল অসহায় অবস্থায়, তখন... মাথায় তীব্র যন্ত্রণা হয় স্মৃতিটা মনে পড়তেই। পাষাণহৃদয় মানুষগুলো সেদিন তাকে সেই বমিই খেতে বাধ্য করেছিল। মুখে জোর করে গুঁজে দিয়েছিল। হাত-পা চেপে ধরে নির্মমভাবে গলার ভেতরে ঠেলে দিয়েছিল। কান্নার শব্দ পর্যন্ত বের হতে দেয়নি।
কী ভয়ংকর নিষ্ঠুর ছিল তারা! কী পাথরের মতো হৃদয়হীন!
নরপশুগুলো এখন আর বেঁচে নেই। তবুও ভয়টা এখনও থেকে গেছে। বুকের গভীরে বাসা বেঁধে আছে আতঙ্ক। অবচেতন মন আদিম ভীতিতে থরথর করে কাঁপে। এই বাড়িতেও তো সে একা! দুর্বল, অসহায় একটি নারী। আর আছে একজন পুরুষ মানুষ। সে ভালো মানুষ বটে, কিন্তু রাগের মাথায় যে ছেলে তাকে ঘরের ভেতরের ছাদের সঙ্গে ঝুঁলিয়ে রাখতে পারে, সে রাগে কী না করতে পারে! অবচেতন ভয় কি এত সহজে মন থেকে মুছে যায়?
গুলনূর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দেয়াল ধরে ধরে চুলার কাছে গিয়ে ছাই তুলে নেয় মুঠোভরে। বমির ওপর ছড়িয়ে দেয়। ছাই পড়তেই গন্ধটা কিছুটা চাপা পড়ে যায়। এবার মেঝে পরিষ্কার করতে হবে।
ঘাড় ঘুরিয়ে ঝাড়ু খোঁজে চারদিকে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে ক্রমাগত। মাথাটা ঘুরছে থেমে থেমে। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ হয়। জাওয়াদ ঢুকছে ঘরে।
চমকে ওঠে গুলনূর। মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়।
জাওয়াদ অবাক চোখে তাকায় তার দিকে। ‘কিছু লাগবে? উঠলে কেন?’
গুলনূর উত্তর দেয় না।
জাওয়াদ এগিয়ে আসে। নাকে এসে লাগ বমির গন্ধ। মেঝেতে ছড়ানো ছাই দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় তার। কিছু একটা ভেবে বলে, ‘বমি করেছ?’
এবারও গুলনূর নীরব থাকে।
জাওয়াদ আর কিছু বলে না। কোনো রকম অস্বস্তি প্রকাশ করে না। কোনো প্রশ্নও করে না। চুপচাপ ঝাড়ু হাতে নিয়ে মেঝে পরিষ্কার করতে শুরু করে। গুলনূর আড়চোখে দেখে সেদিকে। একটা পুরুষ মানুষ, তাও আবার জমিদার পুত্র, জমিদারি রক্ত যার শরীরে প্রবাহিত, সে তার বমি পরিষ্কার করছে। কোনো বিরক্তির ছায়া নেই। কোনো ঘৃণাও নেই চোখে-মুখে!
মেঝে পরিষ্কার করে জাওয়াদ এক গ্লাস পানি নিয়ে আসে।
গুলনূরের সামনে রেখে বলে, ‘কুলি করে পানি খাও।’
গুলনূর কুলকুচি করে মুখ পরিষ্কার করে পানি পান করে। ঠান্ডা পানি গলা বেয়ে নামতেই শরীরটা কিছুটা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। গ্লাসটা খালি করে জাওয়াদের দিকে এগিয়ে দেয়।
জাওয়াদ গ্লাস নিয়ে একপাশে রাখে। তারপর গুলনূরের দিকে ফিরে বলে, ‘এসো, শুয়ে পড়ো। দাঁড়িয়ে থেকো না। অন্তত তিনদিন বেড রেস্টে থাকো।’
হাত বাড়ায় তাকে সাহায্য করার জন্য। গুলনূর
এক ঝটকায় সরিয়ে দেয় সেই হাত। থম ধরা গলায় বলে, ‘আমার ওতো সেবা করতে হবে না।’
জাওয়াদ ক্রুর হাসি হেসে বলে, ‘তোমাকে সেবা করার জন্য যেন মরে যাচ্ছি আমি।’
‘মরেই তো যাচ্ছো।’
‘মরা মানুষ বলেই তো তেজ দেখিয়ে কথা বলতে পারছো। জ্যান্ত অবস্থায় তো ভয়ে কাছেই আসতে না!’
সে দুই মাস আগের দিনগুলোর কথা ইঙ্গিত করছে। যখন গুলনূর তাকে সমীহ করে চলত। যখন তার উপস্থিতিতে শ্বাস নিতেও ভয় পেত। যখন দূর থেকে দেখলেই চোখ নামিয়ে নিত।
গুলনূর জাওয়াদকে উপেক্ষা করে দেয়ালে ধরে ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চৌকির দিকে এগোতে থাকে। শুয়ে পড়তে হবে। শরীরটা আর সইছে না।
চৌকিতে পৌঁছানোর আগেই জাওয়াদ এগিয়ে এসে কোলে তুলে নেয় তাকে। এক হাত পিঠের নিচে, আরেক হাত হাঁটুর নিচে।
থতমত খেয়ে যায় গুলনূর। চমকে ওঠে, ‘কী করছো?’
জাওয়াদ ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে নির্বিকার স্বরে বলে, ‘হঠাৎ ক্ষেপলে কেন?’
গুলনূর ডাঙ্গায় তোলা কৈ মাছের মতো ছটফট করে বলে, ‘কোথায় যাচ্ছো তুমি?’
বাড়িটা এলাকা থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত, পাহাড়ের গা ঘেঁসে তৈরি। জাওয়াদ বাড়িটির ডান পাশ দিয়ে আরও উপরে উঠতে থাকে। পাহাড়ের চূড়ার দিকে। কয়েক কদম এগোলেই চূড়া।
গুলনূর হাত-পা ছুড়তে থাকে, ‘তুমি আমার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছো। নামাও আমাকে! কী করতে চাইছো?’
‘এতো হালকা কেন তুমি? হাওয়ার মতো লাগছে। বেশি বেশি ভাত খাবে।’’
বলতে বলতে চূড়ায় পৌঁছে যায়। গুলনূরকে কোলে রেখেই আকাশের দিকে মুখ তুলে বলে, ‘দেখো।’
গুলনূর তাকায় উপরের দিকে। মুহূর্তেই থমকে যায় তার নিশ্বাস। অর্ধচন্দ্র ঝুলে আছে আকাশে। কী অপরূপ! রূপালি আলো ঢেলে দিচ্ছে চারপাশে। পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা যায় দূর দূরান্ত পর্যন্ত। নিচে ছড়িয়ে আছে গ্রাম, বনভূমি। রাতের অন্ধকার ওই চাঁদের আলোয় পরাজিত হয়ে গেছে। মৃদুমন্দ বাতাস বইছে পাহাড়ের চূড়ায়। চুল উড়িয়ে দিচ্ছে। ঠান্ডা হাওয়া এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে মুখ। মনটা হালকা হয়ে আসছে অদ্ভুতভাবে। বুকের ভেতরের চাপা কষ্ট কিছুটা হলেও মুক্তি পাচ্ছে।
জাওয়াদ চাঁদের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, ‘চাঁদ আগে কখনো এতো ভালো লাগেনি। আজ লাগছে। এতো সুন্দর চাঁদ আমি কখনো দেখিনি।’
বলেই মুখ ঘুরিয়ে তাকায় গুলনূরের দিকে।
তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি। চোখের মণিকোঠায় খেলা করছে কীসের যেন দহন।
কোনো এক জাদুবলে, কোনো এক অলৌকিক উপলব্ধিতে গুলনূর বুঝে যায় সেই রহস্য! বুঝতে পারে জাওয়াদ কীসের কথা বলছে। সে আকাশের চাঁদের কথা বলছে না। সে বলছে গুলনূরের বুকের অর্ধচন্দ্রাকৃতি জন্মদাগের কথা।
সরাসরি বলতে পারছে না, “আকাশের চাঁদ তো কলঙ্কিত, কিন্তু তোমার বুকের ওই আধফালি চাঁদ কী ভীষণ পবিত্র! আমি ওই জন্মদাগটার প্রেমে পড়েছি গুলনূর। আকাশের চাঁদটা তো কেবল চতুর বাহানা।”
গুলনূরের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। অজানা এক অনুভূতির রং লাগে। চোখ সরিয়ে নেয় জাওয়াদের মুখ থেকে। আবার তাকায় আকাশের দিকে।
কিছুক্ষণ অতিবাহিত হতেই তার হুঁশ ফিরে। সে ধমকে ওঠে বলে, ‘আমার চাঁদ ভালো লাগে না। নামাও আমাকে, এখুনি নামাও। নামাও বলছি।’
জাওয়াদ পরোয়া করে না। সে স্থির দৃষ্টিতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। তার গলার এডামস অ্যাপেলটা ওপর-নিচ করছে। গুলনূরের চোখ আটকে যায় সেখানে। কী আশ্চর্য সুন্দর! জাওয়াদের বুকের সঙ্গে লেপ্টে থাকায় তার হৃৎস্পন্দনও শুনতে পাচ্ছে! ভালো লাগছে৷ অন্যরকম এক অনুভূতি। সে আবারও নিশ্চুপ হয়ে যায় অজান্তেই। জাওয়াদের সঙ্গে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে নীরবে।
চারদিকে নিস্তব্ধতা। শুধু বাতাসের মৃদু শব্দ। দূরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দুজন মানুষ। একজন আরেকজনকে কোলে নিয়ে। চাঁদ আলো ঢেলে দিচ্ছে তাদের ওপর।
জাওয়াদ আকাশের দিকে চোখ রেখেই হঠাৎ নরম গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘আমাকে ছেড়ে আসতে একটুও কষ্ট হয়নি তোমার?’’
প্রশ্নটা এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে গুলনূর অপ্রস্তুত হয়ে ওঠে।
দুজনের চোখাচোখি হয়।
গুলনূর তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নেয়। কঠোর হওয়ার চেষ্টা করে বলে, ‘না।’
‘আমি পুরোটাই তোমার প্রতিশোধের সেতু ছিলাম?’
‘হুম, তাই।’
‘চোখে চোখ রেখে বলো।’
গুলনূর তাকায়। সরাসরি চোখে চোখ রাখে। মিথ্যাটা বলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে বলে, ‘বললাম।’
কী?’ জাওয়াদ চোখ সরায় না।
‘তোমাকে ছেড়ে আসতে কষ্ট হয়নি। তুমি শুধুমাত্র আমার একটা গুটি ছিলে। দাবার ছক্কায় একটা মোহরা।’
জাওয়াদ কয়েক সেকেন্ড গুলনূরের নিষ্ঠুর দুটি চোখে তাকিয়ে থাকে। খোঁজার চেষ্টা করে সত্যিটা। তারপর তাকে মাটিতে শুইয়ে দেয়। কোনো কথা না বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে নেমে যেতে থাকে।
গুলনূর হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। অদ্ভুত তো! সে চিৎকার করে বলে, ‘ফেলে যাচ্ছ কেন? শিয়াল-কুকুরের ভোজ হওয়ার জন্য রেখে যাচ্ছ?’
জাওয়াদ থমকে দাঁড়ায়। বড় বড় পা ফেলে ফিরে আসে। পাথুরে গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘কী চাও?’
‘আলাদিনের চেরাগ চাই না। শান্তিতে ঘরে গিয়ে শুতে চাই।’
জাওয়াদ তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়। তবে একক কদমও নড়ে না। স্থির পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। গুলনূর ঘরে যেতে চেয়েছে তো, সে যাবে না। জেদ ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে। গুলনূরের কোনো ইচ্ছেই সে শুনবে না।
গুলনূর অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এ কেমন একরোখা মানুষ! ঠিক আছে! সেও দেখতে চায় এই 'পৌরুষের প্রদর্শনী' ঠিক কতক্ষণ চলে। কতক্ষণ পারে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে।
অনেকটা সময় কেটে যায়। চাঁদ একটু সরে গেছে আকাশে। বাতাস আরেকটু ঠান্ডা হয়েছে। জাওয়াদ এখনও স্থির। একটুও নড়েনি। গুলনূরের এবার মায়া হয়। পুরুষত্ব দেখানোর জন্য কষ্ট করেও দাঁড়িয়ে থাকবে!
সে নরম গলায় বলে, ‘নিজের গায়ের জোর প্রেমিকা বা স্ত্রীর জন্য তুলে রাখো। এসব পালোয়ানি দেখিয়ে আমাকে অন্তত চমকাতে পারবে না। ঘরে দিয়ে আসো, আমি ঘুমাব।’
জাওয়াদ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে, ‘চমকাচ্ছো না? অথচ তোমার বুকের ধুকপুকানি আমার পাঁজর অবধি এসে লাগছে। এটাকে তোমার পরাজয়ের শব্দ বলব, নাকি অক্ষম রাগের?’
গুলনূর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, ‘ওটা ঘৃণার শব্দ। কেবল একজন কাপুরুষই গায়ের জোরে একজন নারীকে বন্দি করে নিজেকে বিজয়ী মনে করতে পারে। তোমার পৌরুষ এতটাই ঠুনকো যে পেশি শক্তি ছাড়া কথাই বলতে পারো না! সবকিছুতেই জমিদারি জবরদস্তি তোমার!’
‘পৌরুষ দেখাচ্ছি না, তোমাকে তোমার সীমানা মনে করিয়ে দিচ্ছি। তুমি নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরের অপ্সরী ভাবতে পছন্দ করো। অথচ দেখো, আমার দুই হাতের ঘেরাটোপে তুমি কতটা অসহায়। চাইলেও ছুটতে পারো না। খোলা আকাশের নিচে আমার বাহুবন্দি হয়ে থাকাটা কি তোমার অহংবোধে খুব বেশি লাগছে?’
গুলনূর সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিতে পারে না। সে কবে নিজেকে অপ্সরী ভেবেছে?
সে-ও হারার পাত্রী নয়। গমগমে গলায় বলে, ‘অহংকার নয়, আমার রুচিতে লাগছে। তুমি কি ভাবছ এভাবে আমাকে বন্দি করে আমার মনের ওপর জয়তিলক এঁকে দিলে? জিতে গেছো?’
‘তোমার নিঃশ্বাস আমার ঘাড় পুড়িয়ে দিচ্ছে, ওটা কি তোমার হারের স্বীকারোক্তি নয়? আমি চাইলেই তোমাকে পাচ্ছি। তোমার ছোঁয়া, তোমার নিঃশ্বাস, তোমার… ‘’
‘চুপ করো। আর ওটা নিঃশ্বাস নয়, ওটা আগ্নেয়গিরির তপ্ত লাভা। তোমাকে ভস্ম করার জন্য ওইটুকুই যথেষ্ট। বাঘিনি খাঁচায় বন্দি থাকলেই বিড়াল হয়ে যায় না। সে বাঘিনিই থাকে।’
‘কিন্তু বাঘিনিকে বাগে রাখার চাবুকটা তো আমার হাতে!’
গুলনূর এবার দাঁতে দাঁত চেপে বলে, ‘আমাকে নামাবে, নাকি তোমার শার্টটা টেনে হিঁচড়ে ছিঁড়ে ফেলব?’
জাওয়াদ শব্দ করে হেসে ওঠে এইবার। ‘ছিঁড়বে? ছিঁড়ো। আমিও কিন্তু পিছিয়ে থাকব না।’’
‘কী করবে তুমি?’
জাওয়াদ কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, ‘তোমার জামাটার অবস্থাও কিন্তু আমার শার্টের মতোই হবে। তারপর চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে গুণব ঠিক কতগুলো জন্মদাগ নিয়ে ঘুরে বেড়াও তুমি। একটা একটা করে খুঁজে বের করব। হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখব কোনটা কেমন। ভালো লাগবে তখন?’
গুলনূর চেঁচিয়ে ওঠে, ‘চুপ করো৷ তোমাকে মেরে ফেলব আমি।’
জাওয়াদ হো হো করে হেসে ওঠে৷
·
·
·
চলবে……………………………………………………