চকবাজারে একটা চা বিস্কুটের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নাহিদ। দোকানে ভিড় নেই। কেবল একজন খদ্দের গম্ভীর মুখে সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করছে। নাহিদের কাছে দেশলাই আছে। তারপরও সে এগিয়ে গেল লোকটির দিকে। ঠোঁটে সিগারেট রেখে প্রায় ছিনিয়ে নিলো ভদ্রলোকের হাতের লাইটার। ভদ্রলোক এই অতর্কিত আক্রমনের বিপরীতে কিছু বললেন না। নীরবে নাহিদের দিকে তাকিয়ে থেকে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লেন। নাহিদ তার সামনের বেঞ্চে বসল। তার চোখের দৃষ্টি উদাস। চেহারায় একটা বিরক্তি নিয়ে দোকানিকে আদেশ করল,
‘ দুধ, চিনি বেশি দিয়ে এক কাপ কড়া লিকারের চা দিও তো, মামা।’
দোকানি এতোক্ষণ থমকে ছিল। এবার দ্রুত হাত চালালো। সামনের ভদ্রলোকটি নাহিদকে নীরবে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলেন,
‘ ভাই কী এই এলাকায় নতুন নাকি? আগে কখনো দেখি নাই।’
নাহিদ উত্তর না দিয়ে বিরক্ত মুখে বসে রইল। ভদ্রলোক এবার ভ্রু কুঁচকে ফেলে বললেন,
‘ বললেন না তো মিয়া? নতুন নাকি?’
নাহিদ বলল,
‘ নতুন নাকি পুরাতন সেইটা শুনে তোমার কী দরকার?’
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ কঠিন চোখে নাহিদের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হাসলেন। গা হিম করা শীতল হাসি। বললেন,
‘ দরকার তো কতোই থাকে।’
নাহিদের চোখে-মুখে তখনও আগের হামবড়া ভাব। সে দায়সারা গলায় বলল,
‘ জলিল ভাইয়ের ভাই-ব্রাদাররা কারো দরকারের ধার ধারে না।’
ভদ্রলোক অবাক হয়ে জানতে চাইলেন,
‘ জলিল! কোন জলিল?’
নাহিদ প্রায় ধমকে উঠে বলল,
‘ এই এলাকাতে থাকো আর জলিল ভাইকে চিনো না? তোমার আস্পর্ধা তো কম না, মিয়া?’
লোকটি এবার হাসল। আরাম করে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বলল,
‘ তুমি চিনো তারে?’
নাহিদ বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ চিনবো না? আমি জলিল ভাইয়ের ডানহাতের কাছাকাছি ধরনের ব্রাদার। ভাইকে মাঝে মাঝে বিভিন্ন পরামর্শ দেই। যদিও তার কারো পরামর্শের দরকার হয় না। সে ভয়ংকর জ্ঞানী মানুষ। মানুষের চোখ দেখে বুঝে ফেলতে পারে, ব্যথা কোথায়? পেটে নাকি মাথায়।’
ভদ্রলোক এবার হো-হো করে হেসে ফেললেন। দোকানি চায়ে চামচ চালাতে চালাতে বলল,
‘ জলিল ভাইয়ের কাছেই জলিল ভাইয়ের নাম নিয়ে ধান্ধা করেন মিয়া? আপনার তো কলিজা অনেক!’
নাহিদ আশ্চর্য হয়ে তাকাল। ধীরে ধীরে চোখে নিঁখুত ভয় ফুটিয়ে তুলে বলল,
‘ জলিল ভাই!’
তারপর কানে হাত দিয়ে করুণ গলায় অনুরোধ করল,
‘ বেশি চাপা মেরে ফেলছি, ভাই। কাজটা উচিত হয় নাই। আর কখনো করবো না। এবারের মতোন মাফ করে দেন।’
জলিল ভাই হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে থেকে উৎফুল্ল গলায় বললেন,
‘ তুই তো দেখি ভয়াবহ মিথ্যা বলিস। সবসময় বলিস নাকি মাঝে মাঝে?’
‘ সবসময় বলি।’
‘ তাহলে তো তোর এই কথাটাও মিথ্যা। কী করে বুঝব যে এইবার মিথ্য বলছিস না?’
নাহিদ দ্বিধান্বিত গলায় বলল,
‘ বুঝতে পারছি না।’
জলিল ভাই জিজ্ঞেস করলেন,
‘ নাম কী তোর?’
‘ নাহিদ আহমেদ।’
‘ চেহারা ছবি ভালো। কর্ম কী?’
নাহিদ হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
‘ কর্ম তেমন ভালো কিছু না। নামে ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। ক্লাস টাস তেমন করি না, কেবল পরীক্ষা দেই। কয়েকদিন একটা সংবাদপত্রে লেখালেখির চেষ্টা করেছিলাম। খুব একটা জমে নাই। দিছে ক্রাইম জার্নালিজমের মতোন সেক্টরে কর্মী বানাইয়া। কাজ করতে গিয়ে দেখি অপরাধী বলতে এই পৃথিবীতে কিছু নাই। থাকলে এই পৃথিবীর সকলেই অপরাধী। প্রত্যেকেই কারো না কারো অধিকার হরণ করছে। যারা করছে না তারা আসলে সুযোগ পাচ্ছে না। সুযোগের অভাবে সাধু সেজে থাকা লোকের চাইতে সুযোগ বের করে নিজের আসল রূপে স্থির থাকা মানুষ বেশি ভালো নয় কী? রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বলপ্রয়োগ মতবাদ নামে একটা মতামত আছে যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, যার যত জোর সে তত অধিকার ভোগ করবে এটাই জগতের নিয়ম। তোমার জোর নেই বলে যার জোর আছে সে অন্যায় করছে এরকম ভাবা তো উচিত না।’
জলিল ভাই গম্ভীর মুখ করে নাহিদের কথা শুনলেন। মাথা নেড়ে বললেন,
‘ তোর কথাবার্তা ভালো। ভেতরে বেশ জ্ঞান ট্যান আছে। আমাদের ধান্দায় ঢুকে পড়বি নাকি?’
নাহিদ বলল,
‘ জি না, ভাই। সবার কী আর ওরকম বুকের পাটা থাকে? খুব সম্ভবত কয়েক বছর ভুংভাং করে ঘুরে বাপ-মায়ের চাপে দুই নম্বরি করে কোনো রকমে একটা চাকরি জুটিয়ে নিতে হবে। ধান্দাও একটা কঠিন পরিশ্রমের কাজ।’
জলিল ভাই মাথা নাড়লেন। বললেন,
‘ কথা ঠিক বলেছিস। তোর কথাবার্তা খুব স্পষ্ট। স্পষ্ট কথা বলা মানুষ আমার পছন্দ।’
তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন,
‘ থাকিস কোথায়? এদিকে ঘুরাফেরা করার কারণ কী?’
‘ থাকি মিরপুর-১০ এ। এখানে এসেছি আপনার খুঁজে।’
‘ আমার খুঁজে!’ বিস্ময় জেগে উঠল জলিল ভাইয়ের চোখে।
নাহিদ পকেট থেকে একটা বিজনেস কার্ড বের করে জলিল ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিলো। হাসিমুখে বলল,
‘ এটা একটা কবিতার স্কুল। ছাত্র সংখ্যা বেশি না, চার পাঁচজন। এক রিটায়ার্ড বাংলা প্রফেসর এই স্কুলে পড়ান। খুব শখ করে স্কুলটা দিয়েছেন। কিন্তু কোনো ছাত্র নেই। আমি আর আমার আরেক বন্ধু ভর্তি হওয়ার আগে একা একা বসে কবিতা আবৃত্তি করতেন। একদিন চায়ের দোকানে দেখা হলো। আমার কথাবার্তা শুনে বললেন, আমার মধ্যে কবিতা টাইপ ব্যাপার আছে। চর্চা করলেই কবি হতে পারব। সাংবাদিক হওয়া সম্ভব না দেখে কবি হওয়ার চেষ্টা শুরু করলাম। স্যার বললেন, কবি হতে হলে সবার আগে সমাজের ভয়ংকর শ্রেণির মানুষের কাছাকাছি যেতে হবে। পৃথিবীর সব অর্থবহ কবিতার উৎপত্তি হয়েছে অন্ধকার থেকে।’
জলিল ভাই অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন,
‘ পাগল নাকি তুই? নাকি তোর স্যার পাগল? এমন আজিব কথা তো কোনোদিন শুনি নাই।’
নাহিদ মলিন মুখে বলল,
‘ আমিও শুনি নাই। তারপরও এলাকায় এলাকায় ঘুরছি। মাথায় একটু সমস্যা থাকলেও স্যার মানুষটা ভালো। তিনি একটা আদেশ দিয়েছেন, চাইলেই তো ফেলে দিতে পারি না।’
জলিল ভাই নির্বিকার মুখে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। নাহিদ বলল,
‘ আমার এক বন্ধুর কাছে আপনার নাম শুনেছি। ওর কাছেই খবর পেলাম প্রতি সোমবার আপনি এইদিকে আসেন। ভেবেছিলাম দূরে থেকে দেখে চলে যাব। দেখা হয়ে যাব বুঝিনি।’
জলিল ভাই জানতে চাইলেন,
‘ দূর থেকে দেখবি কেন? দূর থেকে দেখে সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের। আমি কী নায়িকা ঐশ্বরিয়া?’
নাহিদ বলল,
‘ কাছে আসতে ভয় পাব বলে দূর থেকে দেখতাম।’
‘ ভয় পাবি?’ জলিল ভাই ভ্রু কুঁচকে তাকালেন,
‘তোর মধ্যে তো কোনো ভয় পাওয়ার লক্ষ্মণ দেখছি না।’
‘ ভেতরে ভেতরে ভয় পাচ্ছি। যখন দেখিনি, তখন আরও বেশি ভয় করছিল। আপনার নামে ভয়ংকর ভয়ংকর গল্প শুনেছি তো সেজন্য।’
জলিল ভাই ভ্রু উঁচিয়ে তাকালেন। বললেন,
‘ ভয়ংকর গল্প শুনেছিস! বল, একটা ভয়ংকর গল্প বল তো শুনি।’
নাহিদ একটা ঢোক গিলল। বলল,
‘ কথাটা খুব খারাপ। কী করে বলব, বুঝতে পারছি না।’
জলিল ভাই হাসলেন। বললেন,
‘ খারাপ মানুষের কাজকারবার খারাপ হবে এমনটাই তো স্বাভাবিক। খারাপ কথাটা বল, শুনি।’
‘ শুনেছি আপনার মেজাজ সবসময় খারাপ থাকে। মেজাজ খারাপ করে রাখায় আপনি চ্যাম্পিয়ন। মেজাজ খারাপ হলে আপনি তাগড়া ছেলেদের ধরে খাসি বানিয়ে দেন। এটা আপনার শাস্তির বিশেষত্ব। লাশ ফালানোর ঝামেলা নাই অথচ বংশ নির্বংশ।’
জলিল ভাই হো-হো করে হেসে উঠলেন এবার। বললেন,
‘ ভালো শুনেছিস। ঘটনা সত্য।’
তারপর আমোদিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
‘ তোর সঙ্গেও এরকম কিছু ঘটতে পারে বলে মনে হচ্ছে?’
নাহিদ বলল,
‘ না, এরকম কিছু মনে হচ্ছে না।’
‘ কেন?’
‘ জানি না।’
জলিল ভাই বললেন,
‘ তোর ভাবনা সঠিক। তোর সঙ্গে এরকম ঘটনা ঘটবে না। কেন ঘটবে না ধারণা করে বল।’
নাহিদ একটু চুপ করে থেকে বলল,
‘ ধরণা করতে পারছি না।’
‘ তোর চেহারা খুবই ভালো। রাজপুত্রদের মতো দেখতে। বড়লোকের রাজপুত্র ছেলেদের আমি পছন্দ করি না। দেখলেই বিরক্ত লাগে। কিন্তু তোকে দেখে মায়া হচ্ছে। আমার ধারণা তোর মাথায় সামান্য সমস্যা আছে। রাজপুত্রের মতো দেখতে একটা ছেলের মাথায় দোষ আছে। এটা ভেবে মায়া হচ্ছে।’
নাহিদ কিছু বলল না। জলিল ভাই হাতের ইশারায় তাকে নিজের পাশে এসে বসতে বলল। নাহিদ উঠে এসে জলিল ভাইয়ের পাশে বসল। জলিল ভাই তার কাঁধে ডানহাতটা তুলে দিয়ে বললেন,
‘ খারাপ মানুষের মনে মায়া-দয়া থাকে না, এটা পৃথিবীর সবচাইতে ভুল কথা। যে যত খারাপ, তার মনে তত দয়া। বুঝলি?’
নাহিদ ঘাড় নাড়লো। মুখে ‘বুঝেছি’ বলার আগেই কোমরের এক পাশে ধারালো এক ব্যথা টের পেল। নাহিদ তার কোমরের দিকে তাকিয়ে দেখল পেটের ডানপাশ দিয়ে একটা ধারালো পাত বেরিয়ে এসেছে। কিছুটা রক্ত ছিটকে এসে পড়েছে তার চায়ের কাপে। চায়ের রঙ দেখাচ্ছে গাঢ় লাল। নাহিদ হঠাৎ কিছু বুঝে উঠতে পারল না। জলিল ভাই তার কোমরের চামড়ায় চাকুটা ঢুকিয়ে রেখেই একটা সিগারেট ধরালেন। নাহিদ খেয়াল করল, জলিল ভাইয়ের বাম হাত নড়ছে না। তিনি সকল কাজ ডান হাতে করছেন। তিনি সিগারেট ধরিয়ে নির্বিকার গলায় বললেন,
‘ তবে খারাপ মানুষের মায়াতে বিশ্বাস করা বোকামো। কেন বোকামো সেটা তোকে প্র্যাকটিক্যালি বুঝালাম। বুঝেছিস?’
নাহিদ কিছু বলল না। তার চোখ-মুখ ব্যথায় নীল হয়ে যাচ্ছে। সে এরকম কোনো আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলো না। জলিল ভাই সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে নির্বিকার গলায় বললেন,
‘ টেনশনের কোনো কারণ নাই। আমার হাত পাকা। চাকু পেশির মধ্যে দিয়ে ঢুকিয়েছি। ভেতরের জিনিসে কোনো ঝামেলা হয়নি। ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে হাসপাতালে নিয়ে গেলে বেঁচে যাবি৷ তোকে তার আগেই হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া হবে।’
নাহিদ কথা বলতে পারল না। তাকে কয়েক মিনিটের মধ্যেই কাছের এক হাসপাতালে নেওয়া হলো। ডাক্তার ক্ষত পরিক্ষা করে চিকিৎসা দিলেন। ঘটনাটা পুলিশ কেস। হাসপাতালের ডাক্তাররা পুলিশ কেসে হাত দিতে চায় না। কিন্তু জলিল ভাইয়ের সামনে পুলিশ কেসের প্রসঙ্গ এলো না। নাহিদকে আধাঘন্টা পর একটা বেডে দেওয়া হলো। চারদিকে ভয়ংকর কোলাহল। বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে বারোমাস রোগীর চাষ। ভেতরে, বাইরে, বারান্দায়, ফ্লোরে সর্বত্র রোগী আর রোগী। নাহিদ এই রোগীর মেলায় মুখ গম্ভীর করে শুয়ে রইল। দুপুর দিকে জলিল ভাই এলেন। সঙ্গে একটি ছেলে। তার হাতে প্রচুর ফলমূল। জলিল ভাই তার পাশে বসে বললেন,
‘ কী রে? খুব খারাপ লাগছে?’
নাহিদ বলল,
‘ না।’
জলিল ভাই হেসে বললেন,
‘ কিন্তু তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে অবস্থা খুব খারাপ। নড়তে চড়তে পারিস?’
‘ বুঝতে পারছি না। চেষ্টা করে দেখিনি।’
‘ দেখিসনি, এখন দেখ। আমার সামনে উঠে বস। কুইক।’
নাহিদ উঠে বসার চেষ্টা করল। কোমরের পাশে তীব্র ব্যথায় মুখের পেশি এক পলকের জন্য কেঁপে উঠলেও নাহিদ সেই ব্যথা গ্রাহ্য করল না। উঠে বসল। জলিল ভাই নাহিদের ধৈর্য দেখে খুবই চমৎকৃত হলেন। কিন্তু প্রকাশ করলেন না। বললেন,
‘ তোর কী আমার উপর খুব রাগ হচ্ছে?’
‘ না।’
‘ কেন? রাগ হচ্ছে না কেন? একজন তোর গায়ে চাকু ঢুকিয়ে দিলো আর তার প্রতি তোর রাগ হবে না?’
নাহিদ বিরস গলায় বলল,
‘ আপনার চাকু ঢুকানোর সাহস আছে তাই ঢুকিয়েছেন। আমার থাকলে আমিও ঢুকাতাম। কিন্তু কারো পেটে চাকু ঢুকানোর সাহস আমার নেই। আমি তেলাপোকাও মারতে পারি না।’
জলিল ভাই বললেন,
‘ তোর মধ্যে আসলেই কবিতা থাকার সম্ভাবনা আছে। একটু আগে মৃত্যুর কাছ থেকে ঘুরে এলি। এখন আরও ফরফর করে কবিতা আসার কথা। কবিতা এসেছে?’
নাহিদ বলল,
‘ না।’
‘ এলে আমাকে জানাবি। তোর কবিতা সবার আগে আমি শুনবো।’
‘ আচ্ছা।’
জলিল ভাই আশেপাশের কোলাহলের দিকে একবার আনন্দ নিয়ে তাকালেন। আমোদিত গলায় বললেন,
‘ এখানে থাকতে সমস্যা হচ্ছে?’
‘ একটু একটু হচ্ছে।’
‘ কী রকম সমস্যা হচ্ছে? সমস্যার ধরণ বল। সমাধান করা যায় কিনা দেখি।’
‘ চারপাশে প্রচুর শব্দ। অসুস্থ শরীরে শব্দ শুনতে ভালো লাগছে না। মাথাব্যথা করছে।’
জলিল ভাই তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে একটা কেবিনের ব্যবস্থা করতে বললেন। সরকারি হাসপাতালে এতো সহজে কেবিন পাওয়ার কথা না। কিন্তু তা নিয়ে জলিল ভাইকে খুব একটা চিন্তিত দেখাল না। তিনি নাহিদের পাশ থেকে উঠে যাওয়ার আগে বললেন,
‘ তোর পেটে চাকু ঢুকানোটা খুবই অন্যায় হয়েছে। কিন্তু নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। চাকুটা নতুন কিনেছি। মনে হচ্ছিল ঢুকালে খুব আনন্দ পাব। আনন্দ পেয়েছি। এই পৃথিবীতে একেক জনের আনন্দ একেক রকম। তুই মন খারাপ করিস না।’
নাহিদ মন খারাপ করেনি। পৃথিবীর কোনো কিছুতেই সম্ভবত তার মন খারাপ হয় না। শেষ কবে তার প্রবল মন খারাপ হয়েছিল, মনে নেই। জলিল ভাই যাওয়ার ঘন্টাখানেক পর নাহিদকে একটা কেবিন দেওয়া হলো। একটা কেবিনে দুটো করে সীট। পাশের সীটটা ফাঁকা।
নাহিদের ব্যথা সহ্য করার অসম্ভব মানসিক ক্ষমতা আছে। গুলি লাগা পা নিয়েও সে আনন্দের সঙ্গে ঘুরে বেরিয়েছে। চাকুর এই আঘাত তাকে কী রকম ভুগাবে বুঝা যাচ্ছে না। নাহিদ বিছানায় শুয়ে কোমরের কাছের জায়গাটা টিপে যখন ব্যথার পরিমাণ অনুমানের চেষ্টা করছিল ঠিক সেই সময় সৌধর কল এলো। সৌধ আজ কাওরানবাজার, তাদের অফিসে কাজ করছে। আগামীকাল তাদের ম্যাগাজিনের তৃতীয় আর্টিকেল প্রকাশ পাবে। বেশ কিছু আর্টিকেল, ফটোগ্রাফি, স্যাটায়ার আর্ট অনলাইনে পাবলিশের পর একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ ছাপানো ম্যাগাজিন ছাড়বে তারা বাজারে। অনলাইন থেকে পড়তে চাইলে নিতে হবে সাবস্ক্রিপশন। ম্যাগাজিন ছাপানো নিয়েও আছে নানান ফ্যাকড়া। আদিব হোসেনের সংবাদপত্র অফিসের নিজস্ব প্রেস থাকলেও তারা চাচ্ছে প্রথমে মোটামুটি মানের কোনো প্রেস থেকে ছাপিয়ে নিতে। তারপর কিছুটা পরিচিত হলে কয়েকটা প্রেস বদলে আদিব হোসেনের প্রেসে এসে স্থির হতে। এতে ম্যাগাজিনের মালিকানা নিয়ে একটা ধোঁয়াশা থাকবে। নাহিদরা এই ধোঁয়াশায় আরও ধোঁয়া দিতে আগ্রহী। সৌধ কয়েকদিন যাবৎ এসব অফিসিয়াল কাজে ডুবে আছে। হাতে ধরে দেখিয়ে না দিলে অফিসের কর্মচারীগুলো কাঠের পুতুলের মতোন বসে থাকে। একদম নড়তে চায় না। নাহিদ ফোন তুলতেই সৌধ জিজ্ঞাসা করলো,
‘ কী খবর তোর? ফোন দিলে রিসিভ করিস না। কোর্সের এসাইনমেন্ট কিছু করছিস?’
নাহিদ বলল,
‘ হু।’
কোর্সের এসাইনমেন্টটা হলো, জলিল ভাই। কোর্স এসাইনমেন্ট তাদের কোড ওয়ার্ড। শহরের আনাচে কানাচে ঘুরে, নানান জনের সঙ্গে কথা বলে, সেসব নিয়ে রিসার্চ করেও সন্তুষ্ট হতে পারছিল না নাহিদ-সৌধ। তাদের ক্রমেই মনে হচ্ছিল, সাবজেক্ট যেহেতু তৃণমূল। সেই তৃণমূলকে জানতে হলে এই শহরে ঘুরে বেড়ানো অসংখ্য চক্রগুলোর কোনোটিতে নিজেদের ঢুকতে হবে। দেখতে হবে। বুঝতে হবে। কীভাবে ঢুকা যাবে সেই চিন্তা থেকে কয়েকজনের জনের নাম, কয়েক রকমের পরিকল্পনার তালিকা করা হয়েছিল। আজ ছিল পরিকল্পনার দ্বিতীয় দিন। জলিল ভাই হাওয়া না দিলে নাহিদ যেতো তৃতীয় জনের কাছে। সৌধ জিজ্ঞেস করলো,
‘ কতটা করেছিস?’
‘ বুঝতে পারছি না। তবে মনে হচ্ছে, স্যার পাস মার্ক দিয়ে দিবেন।’
সৌধ বলল,
‘ তাহলে আমি সন্ধ্যায় তোর বাসায় আসছি। কপি করে নেব।’
তারপর হঠাৎ মনে হওয়ার মতো করে বলল,
‘ ওহ, হ্যাঁ। সুহানাকে মনে আছে? কর্নেল সাহেবের মেয়ে, উনি তো উনার সিভিটা পাঠিয়েছেন। উনার সিভি দেখে ঠিক বুঝতে পারছি না তার মধ্যে কী রকম কাব্য আছে। কোন বিষয়ে তিনি সুইটেবল। তুই একটু দেখবি?’
কাব্যের প্রসঙ্গ আসতেই হেসে ফেলল নাহিদ। কয়েকদিন আগে তারা খুব আনন্দের সাথে তাদের কাওরানবাজারের অফিসের নাম দিয়েছে,
‘ হে যুবক, এসো কবিতা পড়ি।’
বাইরের দেওয়ালে বিরাট কারুকার্য। দেখে উপায় নেই এটা কোনো ক্রাইম ম্যাগাজিনের অফিস হতে পারে। নাম শুনে আদিব হোসেন অনেকক্ষণ গম্ভীর হয়ে ছিলেন। কোনো কথা বলতে পারেননি। সব চাইতে মজা পেয়েছে কর্ণেল আর অফিসের ছেলেরা। সেই যুবকদের কবিতার আসরে একজন যুবতী চলে এসেছে। নাহিদ যুবতীর সিভি তার মোবাইলে পাঠাতে বলল। সুহানার সিভি দেখে হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্তে আসা গেল না। মেয়েটা এ বছর গ্রাজুয়েশন শেষ করেছে। ক্রিমিনোলজি নিয়ে মাস্টার্স করার ইচ্ছে আছে। কিন্তু কোনো অভিজ্ঞতা নেই। সুহানা কোন সেক্টরে কাজ করতে আগ্রহী সেসব কিছু লেখা নেই। নাহিদ সৌধকে বলল সুহানাকে স্বল্প পরিসরে একটা ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য এপ্রোচ করতে। সেটা অনলাইনে হতে পারে। সন্ধ্যায়, শার্প সেভেন পি.এম।
—————
ঝকঝকে নীল আকাশে তুলোর মতোন এক টুকরো মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে। সকাল থেকেই খুব রোদ। শহরটা চুলোয় দেওয়া তাওয়ার মতো উত্তপ্ত হয়ে আছে। মৌনি ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনে বসে নীরবে খিচুড়ি খাচ্ছে। আজকের খিচুড়ি হয়েছে অতিশয় জঘন্য। ঠান্ডা হয়ে যাওয়ায় খেতে বিষের মতোন লাগছে। মৌনি নির্বিকার মুখে সেই বিষ হজম করছে। দুইদিন হলো সে ঢাকা এসেছে। ঢাকা আসার উদ্দেশ্য ছিলো দুটো। এক. তার সাবলেট বাসাটা খুব বুদ্ধি খাটিয়ে পরিচিত কারো কাছে ভাড়া দিয়ে দেওয়া।
দুই. নিজের কিছু জিনিস অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলা।
মৌনি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে এক-দুই মাস দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াবে। বাসাটা এমনি পড়ে থাকলে অহেতুক ভাড়া গুণতে হয়। অন্য কাউকে ভাড়া দিলে সেই সমস্যাটা মিটবে। তারসঙ্গে নিজের হাজারখানেক বই নিয়ে টানাহেঁচড়া করার ঝামেলাও কমে যাবে। ভাড়া দেওয়ার মতো একজনকে সে পেয়েছে। মেয়েটা তাদের ডিপার্টমেন্টেই পড়ে। কিন্তু সমস্যা হলো, সে তিন মাসের জন্য বাসাটা নিবে। এর থেকে কম সময়ের জন্য হলে সে অন্য বাসা দেখবে। তার চাইতেও বড় সমস্যা, মৌনিকে তার বিছানাপত্র সরিয়ে দিতে হবে। সে খুব শুচিবাইগ্রস্ত। অন্য জিনিসগুলো রুমে থাকলেও অন্যের ব্যবহৃত বিছানা নাকি সে কোনোভাবেই ব্যবহার করতে পারবে না। মৌনি তার বিছানা এবং আনুষঙ্গিক জিনিস কোথায় রাখবে ভেবে পাচ্ছে না। সেই টেনশন থেকেই ক্যাম্পাসে এসেছে মিষ্টির সঙ্গে দেখা করতে। ক্যাম্পাসে এসে পড়েছে আরেক বিপদে। মিষ্টির ক্লাস শেষ হতে দেরি হচ্ছে দেখে নিজেও গিয়েছিল ক্লাস করতে। ডিপার্টমেন্টে গিয়ে ক্লাসের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতেই স্যারসহ সকলে তার দিকে অসীম বিস্ময় নিয়ে তাকাল। ক্লাসে তখন সেইদিনের সেই সুদর্শন স্যার। তিনি মৌনিকে দেখে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বললেন,
‘ পরীক্ষার আর পাঁচ মিনিট আছে। আপনি এতোক্ষণে আসছেন?’
মৌনির স্যারের চাইতেও অবাক হয়ে বলল,
‘ পরীক্ষা! কীসের পরীক্ষা দিচ্ছেন?’
মৌনির প্রশ্ন শুনে এক মুহূর্তের জন্য কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললেন স্যার। ক্লাসের সবাই তাদের হো হো হাসিতে একটু বিরতি দিলে বললেন,
‘ এদের পরীক্ষা শেষ হলে অফিস রুমে বসে পরীক্ষা দিয়ে যাবেন।’
তারপর থেকে ক্যান্টিনে এসে বসে আছে মৌনি। ডিপার্টমেন্টের গ্রুপগুলোতে তার কোনো এক্টিভিটি নেই। সেখানে কী কথা হয় মৌনি জানে না৷ এই স্যার কোন কোর্স পড়ান সেটাই বলতে পারবে না সে। সেখানে পরীক্ষা দিবে কী করে? এতোদিন কোনো ক্লাস করেনি, পরীক্ষা দেয়নি তাকে কী আদৌ ফাইনালে বসতে দিবে? ফাইনাল না দিতে দিলে অহেতুক এই দুই টাকার পরীক্ষা সে কেন দিবে? পরীক্ষায় বসার আগে স্যারকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে দেখতে হবে।
মৌনির ভাবনার মধ্যেই মিষ্টি এসে উপস্থিত হলো। পা থেকে মাথা পর্যন্ত কালো বোরকায় ঢাকা। হাতের আঙুলটি পর্যন্ত দেখা যাওয়ার উপায় নেই৷ মৌনি প্রথমে এই বোরকা মানবীকে চিনতে না পারলেও কণ্ঠ শুনে চিনলো। বলল,
‘ চায়ের অর্ডার দেব ভাবছি। তোর জন্যও দেব?’
মিষ্টি মৌনির সামনের ফাঁকা চেয়ারে বসে বলল,
‘ না। একটাই দে। আমি খাব না।’
মৌনি ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল,
‘ কেন?’
‘ নেকাব পরা তো। পাবলিক প্লেসে নেকাব খুলি না আমি।’
মৌনি কয়েক সেকেন্ড স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলো। একটা মানুষকে এতো দ্রুত বদলে যেতে দেখে তার অস্বস্তি হচ্ছে। পরিবর্তনটা যদি নিজের জন্য হতো তাহলে সম্ভবত এরকম লাগতো না। কিন্তু পরিবর্তনের কারণটা তো অন্য! মৌনি কথায় কথায় তার সমস্যার কথাটা জানাল। বলল,
‘ তোর ওখানে রাখা যাবে আমার জিনিসগুলো? মাস তিনেক পর নিয়ে নিতাম।’
মৌনির আবদারে মিষ্টি মন খারাপ করে বলল,
‘ আমি বাসায় থাকলে রাখা যেতো। কিন্তু আমি তো বাসা ছেড়ে দিয়েছি। কিছুদিন হলো হলে উঠেছি।’
মৌনি অবাক হয়ে বলল,
‘ বাসা ছেড়ে দিয়েছিস! কবে? কেন?’
মিষ্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ ঈশান চাচ্ছিল না বাসায় থাকি। আমার শরীর দূর্বল। প্রতিদিন এতটা পথ আসা-যাওয়া করলে আরও দূর্বল হয়ে পড়ব তাই হলেই উঠতে বলল। তাছাড়া এখানে সেফটিও ভালো।’
হলে উঠার কারণ শুনে ভ্রু কুঁচকে গেল মৌনির। ফার্মগেইট থেকে ক্যাম্পাসে আসতে কী এমন জার্নি করতে হয়, প্রশ্নটা করতে গিয়েও নীরব হয়ে রইল। বলল,
‘ তাহলে কোথায় রাখা যায় বল তো?’
মিষ্টির মধ্যে মৌনির সমস্যা নিয়ে তেমন একটা হেলদোল দেখা গেল না। ভীষণ কাছের বান্ধবীর এরকম অচেনা রূপ খুব আহত করলো তাকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ বাদ দে। আমি একটা ব্যবস্থা করে নেব। আজ সন্ধ্যায় শান্তিনগরের দিকে যাব ভাবছিলাম। ঢাকায় এসেছিই যেহেতু পায়ের চেকআপটা করিয়ে নেব। মাঝে মাঝে একটু ব্যথা করে। লম্বা সময়ের জন্য ঘুরতে বেরুব। এর মধ্যে আর কোনো ঝামেলা চাচ্ছি না। একা যেতে ইচ্ছে করছে না, তুই যাবি আমার সাথে?’
মিষ্টি আমতা আমতা করে বলল,
‘ আমি! না রে, সন্ধ্যাবেলায় ক্যাম্পাসের বাইরে যাওয়া ঈশান পছন্দ করে না৷ তাছাড়া দেরি হলে হলের গেইট বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আরেক সমস্যা।’
মৌনির কাপের চা ততক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। সে শীতল চায়ে চুমুক দিয়ে বলল,
‘ দূর! অতো দেরি হবে না তো। আর দেরি হলে আমার বাসায় থাকবি। সমস্যা কী?’
‘ সরি দোস্ত! ঈশান রাজি হবে না। রাতের বেলা বাইরে থাকা ঈশান একদম পছন্দ করে না।’
মৌনি একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে চুপ করে গেল। সে যে কবে মিষ্টির জন্য ‘বাইরে’ হয়ে গিয়েছে সে খবর সে কস্মিনকালেও টের পায়নি। মৌনিকে নীরবে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দেখে মিষ্টি এবার কাতর গলায় বলল,
‘ মৌনি প্লিজ মন খারাপ করিস না, দোস্ত। সম্ভব হলে আমি অবশ্যই যেতাম। ঈশান শুধু শুধু একটা ঝামেলা করবে। আমার আর ঝামেলা ভালো লাগে না রে।’
মৌনি প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না। ঠান্ডা চায়ে চুমুক দিয়ে নিবিড় চোখে মিষ্টিকে দেখল। মৌনির চেহারা বাঙালি মেয়েদের মতো একটু ভরাট ধরনের হলেও মিষ্টি বরাবরই রোগা। যে সকল মেয়েরা ছেলেদের আরাধ্য মিষ্টি সম্ভবত সেই ধরনের। ভীষন লম্বা, রূপবতী, সরু কোমর। ঢোলা বোরকার মধ্যেও মৌনির মনে হচ্ছিল মিষ্টির সেই লতানো শরীরে আগের চাইতে শীর্ণতা এসেছে। মৌনি প্রসঙ্গ বদলে বলল,
‘ তুই আরেকটু রোগা হয়েছিস মনে হচ্ছে? আজকাল খুব ডিপ্রেশনে থাকিস। নাকি ডায়েট করছিস?’
মিষ্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ এমনিই ওয়েট লস হয়ে কূল পায় না। আবার ডায়েট!’
‘ তা ওজন কমছে কেন?’
মিষ্টি এবার ফ্যাকাশে হাসল। বলল,
‘ পড়াশোনার চাপ। আর হলের খাবারের কথা তো জানিসই।’
মিষ্টির বাহানাটা ঠিক বিশ্বাস হলো না মৌনির। জানতে চাইল,
‘ তোদের রিলেশনশিপ কেমন চলছে?’
‘ ভালো।’
‘ কালাচাঁন এখন কোথায় আছে? আশেপাশে আছে নাকি? আমার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিস শুনে কেঁদে ফেলবে না তো!’
বলে নিজেই হাসল মৌনি। মিষ্টি একটু ঠেস দিয়ে বলল,
‘ তার আশেপাশে থাকার সময় আছে? বন্ধুদের সাথে ঘুরতে গিয়েছে সিলেট। সাত দিনের ট্রিপ।’
মৌনি ঠোঁট উল্টে বলল,
‘ বাব্বা! কালাচাঁন দেখি আমার ছায়া দেখে দেখে হাঁটে। আমিও তো যাচ্ছি সিলেট। প্রথমে অবশ্য শ্রীমঙ্গল যাব। আগামী পরশুদিন টিকেট। ওখানে গিয়ে মুখোমুখি হয়ে গেল খুব সিনেম্যাটিক একটা ব্যাপার হবে।’
মৌনি সিলেট যাচ্ছে শুনে উজ্জ্বল হয়ে উঠল মিষ্টির মুখ। আগ্রহ নিয়ে বলল,
‘ তুই শ্রীমঙ্গল যাচ্ছিস? ওরাও শ্রীমঙ্গল গিয়েছে। ওখানের একটা কটেজে উঠেছে। আমি কটেজের নাম বললে তুই ওখানে গিয়ে একটু খোঁজ নিতে পারবি, মৌন?’
মৌনি অবাক হয়ে বলল,
‘ খোঁজ নিবো? কী ব্যাপারে খোঁজ নিবো?’
তারপর হেসে ফেলে বলল,
‘ তুইও তোর বয়ফ্রেন্ডের মতো শার্লক হোমস হয়ে যাচ্ছিস নাকি? ওখানে কোনো মেয়ের সঙ্গে হেসে কথা বলছে কিনা সে সকল বিষয়ে তথ্য পাচার করবো? করলে কিন্তু খারাপ হয় না। ইন্টারেস্টিং!’
মিষ্টি বলল,
‘ খোঁজ নিয়ে দেখবি ওরা কে কোন ঘরে উঠেছে। কয়টা ঘর নিয়েছে।’
মৌনি ততোধিক অবাক হয়ে বলল,
‘ কয়টা ঘর নিয়েছে সেটা জেনে তুই কী করবি?’
মিষ্টি গম্ভীর গলায় বলল,
‘ দরকার আছে।’
মৌনি এবার একটু সচেতন হলো। কপাল কুঁচকে বলল,
‘ হোল্ড অন! হোল্ড অন! তুই কী কোনো ব্যাপারে সন্দেহ করছিস?’
মিষ্টি ইতস্তত করে বলল,
‘ ঠিক সন্দেহ না। কিন্তু আমার অস্বস্তি হচ্ছে।’
‘ অস্বস্তি! কী ব্যাপারে?’
‘ ওরা ওখানে আটজন বন্ধু মিলে গিয়েছে।’
‘ তো?’
‘ চারজন মেয়ে, চারজন ছেলে।’
মৌনি এবার হতবাক চোখে তাকাল। মিষ্টি যার কথায় পুরো শরীর ঢেকে রাখে, সন্ধ্যার পর বের হয় না, অপরিচিত নাম্বার থেকে আসা কল রিসিভ করে না, কোনো ছেলেবন্ধুর সঙ্গে কথা বলে না, ভার্সিটির প্রোগ্রামে যায় না, ট্যুরে যায় না, প্রিয় বন্ধুর বাসায় গিয়ে থাকে না, ফ্রেন্ডলিস্টে কোনো ছেলেবন্ধু রাখে না সেই ছেলেটি চারজন মেয়ে বন্ধু নিয়ে শ্রীমঙ্গলের এক নির্জন কটেজে বেড়াতে গিয়েছে। বিষয়টাকে কিছুতেই নিষ্পাপ নজরে দেখতে পারল না মৌনি। মিষ্টির দিকে তাকিয়ে কেবল একটি প্রশ্নই করতে পারল,
‘ একটা সম্পর্কে দুইজনের জন্য একইরকম নিয়ম থাকার কথা না?’
—————
গ্রীষ্মের রোদে চৌচির দুপুর। নাহিদের ঘরের ছাদ যেন একটু পরই গলে পড়বে মোমের মতোন। ছাদের সঙ্গে সখ্য করে নাহিদের শরীরেও অসম্ভব উত্তাপ৷ জ্বরের তেজে জ্বলে যাচ্ছে চোখ। বুকে অসীম তৃষ্ণা। কে জানে, কত লক্ষ বছর ধরে কেউ নাহিদকে এক গণ্ডূষ জল দেয় না। ঠান্ডা টলটলে জল। সদূর ময়মনসিংহে, দাদাজানের হিজলতলায় যে দিঘি, শান্ত শীতল, মন কেমন করা- ওই দিঘি থেকে কী কেউ একটু জল এনে দিতে পারে না তাকে? নাহিদের মন খারাপ হয়। ব্যথায় ছিঁড়ে যেতে চায় মস্তিষ্কের সমস্ত নিউরিন। ঠিক তখনই দিঘিপাড়ের শীতল হাওয়ার মতোন সুবাস নিয়ে কেউ একজন এলো তার ঘরে। রঙিন তার শাড়ির আঁচল। রঙিন আঁচলটা কোলের উপর টেনে সে বসল নাহিদের শিয়রের কাছে। নাহিদের সমস্ত ইন্দ্রিয় মুহূর্তের মধ্যেই চিনে ফেলল তাকে। নাহিদ চোখ খুলল না। জ্বর ক্লান্ত হাতে খপ করে ধরে ফেলল তার নরম হাত। এতো নরম কারো হাত হয়? কারো হাত থেকে কি এরকম হিজল ফুলের গন্ধ আসে? নাহিদ সেই হাতখানা নিয়ে রাখল তার গালের উপর। বলল,
‘ এতোক্ষণে এলে তুমি?’
সে কথার কোনো উত্তর দিলো না সেই মমতাময়ী। নীরবে নাহিদের কপালে হাত রাখল। সেই শীতল স্পর্শে চোখের পলকে নাহিদের লক্ষ বছরের তৃষ্ণা মিটে গেল। সেই কোমল হাত নাহিদের চুল, কপাল, চোখ, নাক, গাল ঘুরে এসে স্থির হলো বুকের ওপর। কানের কাছে মুখ এনে সেই অনেকদিন আগে যেরকম বলেছিল ঠিক তেমন ফিসফিস করে বলল,
‘ খুব কষ্ট হচ্ছে?’
এতো কাতর, এতো মধুর সেই স্বর! নাহিদের জন্য আর কে অধীর হয়েছিল এরকম? নাহিদ কোনো উত্তর দিতে পারল না। মাথাটা এগিয়ে এনে মুখ গুঁজে দিলো তার নরম কোলে। দু'হাতে তার কোমর জড়িয়ে ধরে বলতে চাইল,
‘ তুমি আমাকে একটু ভালোবাসো।’
বলা হলো না। তার আগেই গোলাপের পাপড়ির মতোন নরম দুটো ঠোঁট এসে স্থির হলো তার কপালে। পৃথিবীর সমস্ত স্নেহ যেন সে ধার করে এনেছে নাহিদের ওই জ্বরতপ্ত কপালটুকুর জন্য। বলল,
‘ সব ঠিক হয়ে যাবে।’
নাহিদ সে কথার প্রত্যুত্তরে আরও শক্ত করে মুখ গুঁজে দিলো তার নরম কোলে। তারপরও কী করে যেন সে ছাড়া পেয়ে গেল নাহিদের হাত থেকে। নাহিদকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে সে চলল দরজার দিকে। অস্থির নাহিদ হাত বাড়িয়ে চেপে ধরলো তার আঁচল। করুণ গলায় বলল,
‘ যেও না। প্লিজ, যেও না৷ কেন তুমি রেগে থাকো আমার উপর?’
সে মুখ ফিরিয়ে নাহিদের দিকে তাকাল। নাহিদ দেখল কেবল ওই অভিমানী দুটো চোখ। কাজল রাঙা, টলটলে চোখদুটোতে উপচে পড়ছে কথা! সে কথা পড়ে ফেলার আগেই আঁচল ছাড়িয়ে কেমন হারিয়ে গেল সে। এবার নাহিদ ধড়ফড় করে উঠে বসল। সারা শরীর ঘামে জবজব করছে। নাহিদ স্তব্ধ দৃষ্টিতে কেবিনের দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো। বুকের ভেতরটা হাপরের মতো উঠানামা করছে। নাহিদকে এমন আচমকা শব্দ করে উঠে বসতে দেখে মাথা উঁচু করে অসীম কৌতূহলে তার দিকে তাকিয়ে রইল কেবিনের নতুন রোগীটি। ভদ্রলোক বৃদ্ধ। নাহিদ তাকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
‘ ও এসেছিল?’
বৃদ্ধ জানতে চাইল,
‘ কে?’
নাহিদের চোখ কী এক অদ্ভুত কারণে ভরে উঠল জলে। রুদ্ধ হয়ে এলো কণ্ঠস্বর। নাহিদ তীব্র অস্বস্তিতে চোখ লুকিয়ে বলল,
‘ কেউ এসেছিল এই ঘরে?’
‘ না। কেউ আসেনি তো।’
তারপর একটু থেমে জিজ্ঞেস করলো,
‘ দুঃস্বপ্ন দেখছ বুঝি? তোমার ফোন বাজছিল অনেকক্ষণ ধরে৷ বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলো। ভালো লাগবে।’
নাহিদ কলের পুতুলের মতোন শিয়রের কাছ থেকে ফোনটা তুলে নিলো হাতে। স্থির চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ফোনের স্ক্রিনে। সন্ধ্যা সাতটা বাজে। সৌধ ভিডিও কল দিচ্ছে বারবার। নাহিদ কিছুক্ষণ মাথা চেপে ধরে বসে থেকে ফোন তুলল। কলে শুধু সৌধ না সুহানাও ছিল। সুহানা নাহিদকে দেখে কপাল কুঁচকে ফেলে বলল,
‘ আপনি হাসপাতালে কেন?’
তার প্রশ্নের ধরন দেখে মনে হলো, হাসপাতালে থাকা কোনো গর্হিত কাজ। কোনো সুবিবেচক মানুষ কখনো হাসপাতালে থাকতে পারে না। সুহানার প্রশ্ন শুনে এতোক্ষণে ব্যাপারটা খেয়াল করলো সৌধ। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলল,
‘ তাই তো! তুই হাসপাতালে ভর্তি হলি কখন?’
নাহিদ থমথমে কণ্ঠে বলল,
‘ কাজের কথা বল। আমি কখন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি সেটা জানতে ফোন করেছিসনি নিশ্চয়?’
নাহিদের চেহারার এই অস্বাভাবিক গাম্ভীর্য দেখে আর কথা বাড়াল না সৌধ। নাহিদ সুহানার দিকে তাকিয়ে রসকষহীন প্রফেশনাল গলায় বলল,
‘ সুহানা, আপনার সিভিটা আমি দেখেছি। সেখানে আপনার প্রিফারেন্সের কথা কিছু লেখা নেই। আপনি কী যেকোনো ধরনের কাজ করতে চান? নাকি আপনার নিজস্ব কোনো ভালো লাগা আছে? আপনার আগ্রহের ব্যাপারে জানতে পারলে আমাদের আর আপনার দু'জনের জন্যই সুবিধা হতো।’
তারপর সৌধকে ইশারা করতেই সৌধ তাকে একে একে সবগুলো কাজের ধরন বুঝাল। সুহানার এদের সঙ্গে কাজ করারই কোনো আগ্রহ নেই। তারপরও অতি অনাগ্রহে একটি সিলেক্ট করলো। নাহিদ বলল,
‘ ঠিক আছে। আপনাকে আধাঘন্টার মধ্যে আপনার প্রথম কাজ মেইল করে দিবে সৌধ। কালকে একটা আর্টিকেল বেরুবে। আপনাকে কাজটা আগামীকাল সন্ধ্যার মধ্যে শেষ করতে হবে। সন্ধ্যা মানে ঠিক সন্ধ্যা ছয়টা। আমরা আপনার থেকে আপনার বেস্টটা আশা করছি, সুহানা।’
নাহিদের কথা শেষ না হতেই সৌধ বলল,
‘ কাজের কথা শেষ। এবার বল, তুই হাসপাতালে কেন? চোখ-মুখের অবস্থা তো খুব খারাপ। কী হয়েছে?’
নাহিদ দায়সারা গলায় বলল,
‘ জলিল ভাই পেটে চাকু ঢুকিয়ে দিয়েছে!’
সৌধ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,
‘ কী! বলিসনি তো!’
‘ বললে কী হতো? জায়গাটা দৈব বলে ব্যথামুক্ত হয়ে যেতো?’
সৌধ থতমত খেয়ে বলল,
‘ তাই বলে বলবি না? কোন হাসপাতালে আছিস?’
নাহিদ খুব অনিচ্ছা নিয়ে হাসপাতালের নাম বলল। তারপর ধমক দিয়ে বলল,
‘ অফিসের কাজ বাজ ফেলে রেখে খবরদার হাসপাতালে আসবি না। তোর প্যানপ্যান শুনতে ভালো লাগছে না।’
তারপর সুহানার কথা খেয়াল হতেই কণ্ঠস্বরকে যথাসাধ্য স্বাভাবিক রেখে বলল,
‘ আপনি আসতে পারেন সুহানা। ধন্যবাদ।’
সুহানা বিরক্ত মুখে কল থেকে বেরিয়ে গেল। তার কেন যেন মনে হচ্ছে, নাহিদ তাকে শোনাতেই হাসপাতালের নামটা বলল। তার কী ধারণা, সে নাহিদকে দেখতে যাবে? পরমুহূর্তেই নিজের চিন্তায় নিজেই বিরক্ত হলো। তার কেন মনে হচ্ছে, নাহিদ তাকে শুনানোর জন্য মরে যাচ্ছে? সুহানা এমন নাটুকে হলো কবে থেকে?
সুহানা বেরিয়ে যেতেই সৌধ নাহিদের দিকে তাকাল। বলল,
‘ আমি আসছি।’
নাহিদ দৃঢ় গলায় বলল,
‘ না।’
‘ কেন?’
নাহিদ উত্তর দিলো না। ওর এখন কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। কোনো কারণ ছাড়াই বাচ্চাদের মতো হু হু করে কেঁদে ফেলতে ইচ্ছে করছে। সৌধর সামনে এমন অপ্রীতিকর ঘটনাটা ঘটে যাক তা নাহিদ চায় না। নাহিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অন্যমনস্ক গলায় বলল,
‘ আজ আসিস না।’
সৌধ তার কথা মেনে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলটা কাটতে নিতেই মৃদু স্বরে ডাকল নাহিদ,
‘ সৌধ?’
‘ হু?’
‘ ও আমাকে কোনোদিন ভালোবাসবে না সৌধ।’
পটিচিত কথাটা শুনে চট করে নাহিদের মুখের দিকে তাকাল সৌধ। চোখদুটো রক্তজবার মতো লাল হয়ে আছে। নাহিদের মনে আছে কিনা কে জানে তবে সৌধর সেদিনের কথাগুলো স্পষ্ট মনে আছে। সে জিজ্ঞেস করল,
‘ তোর কি জ্বর এসেছে?’
নাহিদ অন্যমনস্ক গলায় বলল,
‘ হু।’
সৌধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ আমি আসছি।’
নাহিদ সে কথা শুনলো কিনা বুঝা গেল না। ফিসফিস করে বলল,
‘ ও আমাকে কোনোদিন ভালোবাসবে না সৌধ।’
সৌধ অফিস থেকে বের হতে হতে বলল,
‘ না বাসলে না বাসলো। তোর কী মেয়ের অভাব?’
নাহিদের চোখ আরও লাল হয়ে উঠেছে ততক্ষণে। চোখ ফেঁটে জলের বদলে যেন রক্ত বেরুবে যেকোনো সময়। সে ওই রাঙা চোখে তাকিয়ে রুদ্ধ গলায় বলল,
‘ ওকে বলবি আমাকে যেন ভালোবাসে।’
‘ আচ্ছা, বলব।’
কথাটা বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সৌধ। নাহিদের এমন কোনো গোপন সত্য নেই যা সৌধ জানে না। তাহলে কে এই নারী? কার ভালোবাসা পাওয়ার এতো আগ্রহ নাহিদের? সচেতন নাহিদ তো কোনোদিন ভুলেও বলেনি তার কথা!
·
·
·
চলবে……………………………………………………